(প্রকাশিতব্য উপন্যাসগ্রন্থ ‘অচিরকাল’ থেকে এক অধ্যায়)

সংশয়
ট্রেন চলে যাওয়ার পর ক্ষুদ্র স্টেশনটি আরও ক্ষুদ্র হয়ে পড়ে।

প্ল্যাটফর্ম থেকে দূরে একটি ইঞ্জিনবিহীন গুডস ট্রেন, শব্দহীন, ছাড়া-বাড়ির মত নিঃসীম, মূল লাইনের পাশের একটা লাইনের উপর দশ পনেরোটা বগি নিয়ে, একটি স্তব্ধ মহা-কেওড়া পোকা হয়ে দাঁড়ানো, ঐ বাঁকা লম্বা কুটিল স্থিরতা দেখে মনে হয় সময় থেমে গেছে। বহুদিন সে দাঁড়িয়ে আছে একই স্টেশনে, একই যায়গায়।

কিন্তু সত্যিই কি মাথাহীন ট্রেনটা এই স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে বহুদিন? নাকি সময়ে সময়ে সে একটি নতুন ট্রেন দেখছে আর ভাবছে একই ট্রেন?

দূর থেকে স্টেশনটির দিকে তাকিয়ে আছে টুকু। একবার তার মনে হয় একটা মালবাহী ট্রেনই বহুদিন পড়ে আছে স্টেশনের পাশে; কোনো অজ্ঞাত কারণে। আরেকবার মনে হয়, না, থেকে থেকে, বিভিন্ন দিনে, সে ভিন্ন ভিন্ন ট্রেন দেখছে, কিন্তু মালবাহী ট্রেনগুলো দেখতে সব প্রায় একই রকম বলে সে বিভ্রান্ত হয়ে ভাবছে একই ট্রেন। “একটি পরিত্যাক্ত ট্রেন বহুদিন একটা স্টেশনের পাশে দাঁড়িয়ে আছে” এই চিন্তা, বা বিভ্রান্তি, তার অবস্থানের সাথে যুৎসই, এভাবে ভাবতে ভালো লাগছে, কিন্তু তবু এটা সত্য নাও হতে পারে।

বহু ট্রেনকে এক ট্রেন, বা এক ট্রেনকে বহু ট্রেন ভাবার এই বিভ্রান্তি শুধু তার, আর কারও নয়, এরকম চিন্তার মধ্যে কোনো আরাম আছে নাকি, যা এই মুহূর্তে তার দরকার?

ইঞ্জিনহীন বগিগুলো পরিত্যক্তভাবে স্থির আছ। কোনো কোনো বগি হা করে খোলা। বগির নিচের চাকাগুলো অন্ধকার, পরিশ্রান্ত, চলাচলহীন; যেন ওরা চাকা নয়, কিছু মরচে পড়া কালো গোল শূন্যতা। বহু পথ পার হয়ে বহু স্টেশন অতিক্রম করে এখানে পৌঁছে স্তব্ধ হয়ে গেছে। ট্রেনের চাকার সাথে স্তব্ধতা যায় না; তাই এই স্তব্ধ চাকাগুলোকে, ট্রেনটাকে অবাস্তব লাগছে, এবং যা অবাস্তব তা উল্লেখযোগ্য। লোহার জন্তু এক, ধুকছে মুখ নিচু করে, প্রলম্বিত হয়ে গেছে। সে যতটা লম্বা, তার চেয়ে তাকে আরও বেশি লম্বা দেখায়।

টুকুর চিন্তায় মালগাড়িটা তার শারীরিক আকার আকৃতির সীমারেখা পার হয়ে গেছে।

টুকু হাঁটতে শুরু করে। স্টেশনের পাশের চায়ের দোকানটা তার গন্তব্য।

সে জানে না আজ কৃপা আসবে কিনা।

কিন্তু কৃপা আসে।

স্টেশনের পাশের চায়ের দোকানের টুলের উপর পাশাপাশি কৃপা আর টুকুকে বসে থাকতে দেখা যায়। চায়ের দোকানদার কাপড় মোড়ানো হাতল ধরে চুলার উপর থেকে কেটলি নামিয়ে কাপে গরম চা ঢালতে ঢালতে বিকাল পার করে দিলে, প্রত্যেকদিন দেখা কিন্তু তবু জানতে না পারা কোনো মানুষের মত সন্ধ্যা উপস্থিত হয় আর চারদিকে এক বিরাম নেমে আসে।

টুকু আর কৃপা অনেক কিছু ভাবছে কিন্তু খুব একটা কথা বলছে না। যেন ওরাও সন্ধ্যার গাছপালা। গাছগুলোকে দেখে মনে হয় ডালপালা মাটির দিকে নামিয়ে, ওরাও অনেক কিছু চিন্তা করছে।

নিঃশব্দ ডালগুলি ঝুঁকে প্রায় পথের উপর নেমে আসে।

পরের দিন টুকু চাকরির প্রয়োজনে ঢ শহর ছেড়ে দূরের একটা শহরে চলে যায়। কয়েক মাস পরে ঢ শহরে ফিরে দেখে বহু কিছু বদলে গেছে।

পরে শীত, বছরের সেই সময়, আসে, যখন সকল গাছের উপর বৃষ্টির ক্রম অনুপস্থিতির ফলে, স্তরের পর স্তর ধুলা জমে, গাছের পাতাগুলো প্রথমে সাদা হয়, পরবর্তীতে সিমেন্টের গুড়ার রঙ ধারণ করে, শেষে, একসময়, দেখতে চূর্ণ শিশা বা পারদের মত হয়। পাতার দিকে তাকানো যায় না। মনে হয় প্রকৃতি অ্যাজমায় ধুকছে, নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। ভয়াবহ বেকাদায়, কঠিন ব্যতিক্রমের মধ্যে বেঁচে আছে গাছ। ধুলা যে শুধু গাছের পাতায় আর ডালে জমে তা নয়, পাতার শিরার মধ্যে, রগের মধ্যেও জমে। আসলে, এ শহরের সব কিছুর উপরে এবং ভিতরে ধুলা জমে। বইয়ের মলাটে, ছাদের উপর, গাড়ির চালে, মানুষের মাথার উপরে, তাদের ফুস্ফুসে, হৃদয়ে। শহরের ভিতরের বিভিন্ন কনসট্রাকশনের সাইট থেকে, শহরের বাইরের দূর দূরান্ত থেকে ভেসে আসা কালো ধুলা শূন্যে ওড়ে, যেখানে সুযোগ পায় সেখানেই বসে যায়। যে কোনও দিকে তাকালেই গাছের দুরবস্থা খুব স্পষ্টভাবে দেখা যায়, এবং মনে হয়, শুধু গাছ নয়, সারা শহরই ফুসফুসে অ্যাসবেস্টরের গুড়া নিয়ে ধুকছে। রৌদ্রের তেজ কমে যায়; দিন ছোট হয়ে আসে; সব কিছুর ভিতরে বৃষ্টির জন্য এক হাহাকার গুমরাতে থাকে।

সময়টা টুকুর জন্য খুব খারাপ। পর্যুদস্ত গাছপালা, ফুটপাত, ছাদ তাকে খুব আক্রান্ত করে। শিশা রঙের পাতার নিচে সে একা একা বসে থাকে আর চিন্তা করে। গাছের পাতায় যত ধুলা জমে টুকুর মনে এই সন্দেহ তত বেশি দানা বাঁধে যে কৃপা তার সাথে সময় কাটিয়ে আর আগের মত আরাম… আনন্দ পায় না। হয়তো তখন সে পার্কে একটা গাছের নিচে বসে আছে, গাছ থেকে তাকে খুব একটা আলাদা করা যাচ্ছে না, দূর থেকে তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সেও এক ডাল, কিম্বা এক ধূসরিত কাণ্ড, বা মাটির উপরে উঠে আসা ভুলোমনের এক ময়লা শিকড়।

বিভিন্ন আপাত বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে গভীর যোগাযোগ আছে বলে মনে হয় টুকুর।

কৃপা আগের চেয়ে কম আসে। যখন আসে তখন প্রথমে সে কিছুটা বিষণ্ন থাকে কিন্তু কথা বলতে শুরু করলে কিছুক্ষণের মধ্যে তার বিষণ্ণতা কেটে যায়, এবং তাকে আনন্দিত দেখায়। তবু টুকু সংশয়ে কাঁপে। সত্যিই কি কৃপা আনন্দিত? তার হাসি কি আগের চেয়ে একটু ঝাপসা নয়? টুকু ভাবে জীবনের আটপৌরে সত্যের চেয়ে আরও অতল কোনো সত্য তার সম্মুখে উপস্থিত হয়েছে, সীমাহীন রহস্যের মত। যেন সে কৃপার অন্তরাত্মার দীর্ঘশ্বাস শুনতে পায়।

সত্য বদলায়। কৃপার নিবিড় অতলস্পর্শী অভ্যন্তরে বহু অগাধ গ্যালাক্সি মোচড় দিতে থাকে। কিন্তু চারদিকে বড় বেশি ধুলা, গাছের পাতায়, নিজের মনে। অনেক বৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন। বৃষ্টি হলে কৃপার, তার… মন অকৃত্রিম সবুজের মত হেসে উঠবে, স্বচ্ছ হবে, তখন বাস্তবতা যেমন ঠিক তেমনিভাবে তাকে দেখতে পাবে সে। কিন্তু বৃষ্টি হয় না, গাছের পাতায় আরও ধুলা জমে, কথোপকথনের মাঝখানে কৃপা অন্যমনস্ক হয়ে যায় আর টুকু ভাবে সে ধুলার ভারে নুয়ে পড়া ঐ সব গাছ, ধূসর ও পর্যুদস্ত।
ভয়ঙ্কর এক অস্থিরতা পেয়ে বসে টুকুকে। কোনো মুক্তি সে পায় না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কৃপার জন্যই কষ্ট হয় টুকুর, নিজের জন্য নয়। প্রথম দিকে নিজেদের নিয়ে কথা বলত ওরা। কিন্তু এখন আর সে রকম হয় না। কৃপা এখন মূলত তার প্রেমিক দৃক-কে নিয়েই কথা বলে। দৃকের সাথে কৃপার সময় ভালো যাচ্ছে না। আর টুকুর সময় ভালো যাচ্ছে না কৃপার সাথে। তার জীবনের সব কিছুর মধ্যে ঘুরে ফিরে এক অনতিক্রম্য দ্বিধা দেখা দিতে থাকে। যে জীবন সে জানে না তাকে নিয়ে সে ভাবে। নিজেকে সে প্রশ্ন করে, কতটুকু জানো তুমি কৃপাকে? হয়ত সে মাত্র সামান্যই জানে তাকে। পরমুহূর্তে ফিস ফিস করে নিজেকে বলে, আসলে আমিই তাকে সম্পূর্ণ জানি। পরে আবার সে হাসে, রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিড় বিড় করে নিজেকে প্রশ্ন করে, “কোনো মানুষ কি কোনো মানুষকে সম্পূর্ণ জানতে পারে? নিজকেই পারে না। আবার অন্যকে।”

তবু, এক অভূতপূর্ব অযৌক্তিক বিষণ্ণতার মত টুকুর মনে হয় সে কৃপাকে সম্পূর্ণতই জানে, সে-ই তৈরি করেছে তাকে। সে বিড় বিড় করে, আমি নিজেকে জানি না, কিন্তু কৃপাকে জানি। অন্যকে জানতে হলে নিজেকে জানতে হবে কেন?

আমি নিজকে তো দেখি না। তাই নিজেকে জানি না।

কিন্তু কৃপাকে দেখি, তাই কৃপাকে জানি।

এমনকি এও সম্ভব যে আমি নিজেকে জানি না বলেই কৃপাকে জানি।

কখনো কখনো তার এরকমও মনে হয় সে-ই নিজেকে এবং কৃপাকে নির্মাণ করে চলেছে, এই প্রক্রিয়া অশেষ।

অনেক রাতে রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটবার সময়ে — এইভাবে অনেক রাতে উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তা দিয়ে হাঁটা টুকুর অভ্যাস — পৃথিবীর সারি সারি বন্ধ দোকানের নামানো শাটারগুলি তার মুখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে জানতে চায় কী সে জানে, কী সে করতে যাচ্ছে। তখন কী কী উপায়ে কৃপার সময় আরেকটু আনন্দময় করে তোলা যায় তা নিয়ে সে খুব গবেষণা করে, একা একা। অনেক বিকল্প পথ বিবেচনা করে, কিন্তু কোনো গত্যন্তর পায় না শেষ পর্যন্ত; সে টের পায়, এই ব্যাপারে তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা কম।

হয়তো টুকু দেখতে আরও ভালো হলে তার সাথে সময় কাটানো কৃপার জন্য আরেকটু আনন্দের হতো।

কিছুদিন কৃপা তাকে এড়িয়ে চলে, কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়, কয়েকদিন অফিসে আসে না, টুকুর ফোন ধরে না, টুকুর ম্যাসেজের জবাব দেয় না। টুকু বুঝতে পারে সে দৃক-এর কাছে ফেরত যেতে সক্ষম হয়েছে এবং খুব আনন্দে আছে। হয়ত কোথাও দুজনে মিলে ছুটি কাটাতে গিয়েছে।

টুকুর খুব কষ্ট হয় কিন্তু তা যেন নিজের জন্য কষ্ট হওয়া নয়। সে যে ধর্তব্যের মধ্যের কোনো মানুষ নয় তা সে জানে। সে আবার একা একা ঘুরে বেড়ানোর রুটিনে ফেরত যায়। কৃপার সাথে যে সব যায়গায় যেত সেইসব যায়গায় একা যায়, নিঃসঙ্গ-ভাবে দাঁড়িয়ে, মনে মনে কৃপা ও তাকে দূর থেকে দেখে। কোনো নতুন আইডিয়া খোঁজে। কিন্তু কিছুতেই তার কোনো লাভ হয় না। অফিস শেষ করে ক্যাফেতে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে, তার সামনে সময় বিন্দু বিন্দু ঝরে, জমে।

একসময় মনে মনে চাকরি ছেড়ে দিয়ে অজানা অন্য কোনো এক শহরের দিকে হাঁটতে শুরু করে টুকু, যদিও জানে বাস্তবে তার পক্ষে চাকরি ছাড়া কোনোদিনই সম্ভব হয়ে উঠবে না।

ঠিক তখন হঠাৎ একদিন তাকে ফোন করে কৃপা। এতদিন কেন সে তার কল রিটার্ন করে নি বা ম্যাসেজের জবাব দেয় নি তার কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে, টুকুকে কোনো কিছু বলবার সুযোগ না দিয়ে, টুকুকে তার সাথে দেখা করতে বলে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে, নিজের ভিতর থেকে উঠে আসা অভিমান বা পাহাড়-সমান ক্ষয়-বোধ চাপা দিয়ে, টুকু রাজি হয়, কৃপা অভিমান বোঝে কিনা তার জানা নাই।

টুকু বুঝতে পারে কোথাও কোনো ঝামেলা হয়েছে, আবার তার সাথে সময় কাটানোর মত ব্যর্থতা কৃপার জীবনে তৈরি হয়েছে। টুকু ভাবে, আমার কাছে সে যা, তার কাছে আমি তা নই, এই সত্য আমাকে মেনে নিতে হবে।

অবশ্য এও তার মনে হয়, হয়ত কোথাও এমন সত্য আছে যা সে আদৌ জানে না, যেমন জানে না কৃপার কাছে তার অর্থ কি, কেন ঘুরে ঘুরে কৃপা ফিরে আসে তার কাছে, কেন বেশিদিন থাকতে পারে না তাকে ছেড়ে। সে কি শুধুই দৃকের কথা তাকে বলতে চায় বলে? আর তাকেই বা কেন সে দৃকের কথা বলতে চায় বারবার? হয়ত, টকু ছাড়া, কৃপার আর কেউ নেই, যাকে সে দৃকের কথা বলতে পারে।

দুঃখ
একটা ক্যাফেতে সামনা-সামনি বসে আছে কৃপা আর টুকু। কৃপাকে দেখার সাথে সাথে টুকুর মন ভালো হয়ে গেছে।

পৃথিবীর সব দুঃখ কষ্ট, কৃপার এতদিনের অবহেলা ভুলে কৃপার দিকে তাকায় টুকু। এখন সে শুধু কৃপার দিকেই তাকিয়ে আছে, পৃথিবীর আর কোনো কিছুর দিকে নয়। এই তার এক অভ্যাস, অনেকদিন পর কৃপার সাথে দেখা হলে এইভাবে কিছুক্ষণ সব ভুলে তার দিকে তাকিয়ে থাকে সে। খানিক বিস্ময়ের সাথে বুঝে নেবার চেষ্টা করে কে এই মানুষ যে এক মুহূর্তের মধ্যে তাকে এমনভাবে আনন্দিত করে দিতে পারে, বুঝতে চায়, সে-মানুষটা কেমন আছে।

অলঙ্করণ. সাঈদ রূপু

কৃপার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে তার কখনও ক্লান্তি আসে না।

প্রত্যেকবার কৃপার সাথে দেখা হলে টুকুর ভয় হয়, হয়তো এইবারই কৃপার সাথে তার শেষ দেখা। এরপর কৃপা তাকে ভুলে যাবে।
কৃপা আগের থেকে অনেক শুকিয়ে গেছে। অন্ধকার কুয়ার মত এক মেলানকলিক সৌন্দর্য তৈরি হয়েছে শীর্ণতর কৃপার মধ্যে।
কৃপাও কিছুক্ষণ চুপচাপ টুকুর মুখের দিয়ে তাকিয়ে থাকে, সেও কিছু একটা বুঝে নেবার চেষ্টা করে, হয়তো বুঝেও যায়। টুকু কেমন আছে তা সে আর জানতে চায় না। হঠাৎ সে গাছের ডালের মত দুএকবার কেঁপে ওঠে। একসময় বলে, “আরেকটা মেয়ের প্রেমে পড়েছে দৃক। সে আমার থেকে ছোট, অনেক সুন্দর। ফিগার বেটার। জায়গা মত দারুণ। কবায় একটা কনফারেন্সে ওদের পরিচয়। মেয়েটার নাম স্পৃহা।”

টুকু বিস্মিত এবং… যেন… ব্যথিত। তার কি খুশি হওয়া উচিৎ? কিন্তু দৃক স্পৃহার প্রেমে পড়ার মানে ত এই নয় যে কৃপা টুকুর প্রেমে পড়বে। কৃপাকে রেখে অন্য কারো প্রেমে পড়ে কীভাবে, কেউ? কৃপার বেদনার্ত মুখ দেখে কৃপার জন্য কষ্ট হয়। একজন মানুষ বিভিন্ন মানুষের কাছে কত বিভিন্ন সব অর্থ যে বহন করে, এই পৃথিবীতে।

টুকু সব কিছু জানতে চায় না। সে বুঝতে পেরেছে দৃকের সাথে কৃপাও কবা গিয়েছিল, সম্ভবত দুজন এক রুমেই থেকেছে, এবং তাই কৃপা তার ফোন ধরে নাই। এসবের কোন ফাঁকে স্পৃহা সংঘঠিত হয়ে গেছে। টুকুর ফোন কৃপা ধরে নি, তবু টুকুকেই কৃপার বলতে হল দৃক আর স্পৃহার কথা — এটা কি কৃপার জন্য এক পরাজয়? এখন তার মুখে তিক্ততা, কষ্ট আর ব্যর্থতার মিশ্রিত ছায়া।
নানা রকম গল্প বলে কৃপা কষ্টের বোধ কাটিয়ে উঠতে চায়। যদিও টুকু তার সম্মুখে উপস্থিত, তবু হয়তো টুকুকে সে দেখে না। সে তার নিজের গল্পগুলোই দেখে চোখ মেলে। গল্প বলতে পারা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কথা তার শক্তি, কথা বলতে বলতে সে মানসিক জোর অর্জন করে। এবং সে যেভাবে কথা বলে, পৃথিবীর আর কেউ সেভাবে কথা বলে না।

কোথায় যেন চলে যায় সে। টুকু নম্রভাবে উপস্থিত হয়ে থাকে। পরে আবার টুকুকে দেখতে পায় কৃপা, বলে, “চল, আমরা একটু হাঁটি।”

রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করে ওরা। এ শহরের খুব কাছাকাছি কোনো নদী বা সমুদ্র নাই। বিস্তীর্ণ এবং দীর্ঘ জলরাশির অভাব রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মানুষ অনুভব করে নাকি? জলরাশি পরিবেষ্টিত শহরে যারা থাকে তাদের প্রতি অচেতন হিংসা অনুভব করে নাকি ওরা? প্রতি পদক্ষেপে সমুদ্র বা নদীর অভাব মনে পড়ে না হয়ত, তবু, কোথাও যেতে পারলে ভালো হত, এরকম এক চিন্তা ওদের মনে জাগে। পথের এক নিয়ম, বহু কিছু অনুভূত হয় কেবল হাঁটার সময়। নিঃশব্দে পাশাপাশি হাঁটতে থাকে দুজন, যেন একসাথে রাস্তা দিয়ে হাঁটার জন্যই ওরা আজ দেখা করেছে।

বিকট সব শব্দে, নানান যানবাহন চলছে পাশ দিয়ে, এক মুহূর্তের বিরাম নাই। কৃপার হাঁটা ছন্নছাড়া, টুকুর ভয়, হঠাৎ একটা গাড়ি বা রিক্সার চাকা না ওর পায়ের উপর দিয়ে চলে যায়, এখানে যেহেতু কোনো ফুটপাত নেই। সে কৃপাকে কিছু না বলে আলগোছে তার হাত ধরে তাকে রাস্তার দিক থেকে সরিয়ে নিজের অন্য পাশে নিয়ে আসে। এখন কোনো গাড়ি বা মটর সাইকেল হঠাৎ তার পায়ের উপর উঠতে পারবে না, ধাক্কা দিতে পারবে না পিছন, এখন কৃপা আর রাস্তার মাঝখানে টুকু। মটর সাইকেলকেই টুকুর ভয় বেশি, এ শহরের মটর সাইকেল চালকরা উদ্দত, বেপরোয়া, তারা কোনোও ট্রাফিক আইনের ধার ধারে না, ফুটপাতের উপর দিয়ে মটর সাইকেল চালায়, ট্রাফিক সিগনাল অমান্য করে, যে কোনো দিক থেকে যে কোনো দিকে চলে যায়। কোনো নিয়মের পরোয়া তারা করে না। ফলে তাদের চাকা, মানুষের পায়ের উপর উঠে আসতে, খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। কোনো ট্রাফিক সিগনালে দাঁড়িয়ে, মোটর সাইকেল চালকদের উন্মত্ত ব্যবহার দেখে বোঝা যায়, আমরা জাতি হিসাবে কী।

হঠাৎ কৃপা, যানবাহনের শব্দ পার হয়ে যাতে তার কথা শোনা যায়, এই জন্য প্রায় চিৎকার করে বলে, “অনেক কিছু হয়েছে কবাতে। স্পৃহার বাস্ট লাইন খুব সুন্দর, আমার চেয়ে অনেক বড়।” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলে, “সে জানে কীভাবে নিজের সম্পদ ব্যবহার করতে হয়; এবং করেও, উঠতে, বসতে, হাঁটতে; নিশ্চয়ই সেই সময়েও।”

টুকু হতভম্ব। শরীর নিয়ে এভাবে কথা বলে না কৃপা। কিন্তু কৃপার কথা শেষ হয় নি। বাতাসের মধ্যে কোনো কিছু কাটার সমান্তরাল ভঙ্গি করে বলে, “একদিন ড্যাগার দিয়ে কেটে সব সমান করে দেব; বাঁকা একটা ড্যাগার আছে আমার। বদমাইস… বুক দেখায়। অন্য কোথাও গিয়া দেখা, এইখানে ক্যান।” সে চিৎকার করে ওঠে, “এই, এইখানে ক্যান, এ…?” তার চিৎকারে রাস্তার কেউ কেউ মুখ ঘুরিয়ে তাকে দেখে।

কৃপার মুড চেঞ্জ হয়ে যায় এবং সে সশব্দ হেসে ওঠে। তার হাসির শব্দে টুকু কল্পনায় তাকে পূর্ণাঙ্গভাবে দেখতে পায়। অসম্ভব সুন্দর সে। কিন্তু কেবল আমার চোখেই এত অসম্ভব সুন্দর নাকি সে? কৃপার মুখ, শরীর, একেবারে পারফেক্ট — পাহাড়, নদী বা কোনও ফলের মত সিমেট্রিকাল, নিখুঁত। টুকুর খুব ইচ্ছা হয় এই রাস্তার মধ্যেই তাকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু সেসব দিকে সে যায় না; এমনকি তার হাতও সে ধরে না। বরং বলে, “বুঝলাম তার বাস্ট লাইন… ইত্যাদি। কিন্তু তাতে কী?”

ক্রমে, কৃপা কক্সবাজারে হোটেলের রুফটপ পার্টির কথা, সেই পার্টিতে দৃক কীভাবে সারাক্ষণ শুধু স্পৃহার সাথে কথা বলেছে, তার সাথে পাঁচ মিনিটও কথা বলে নাই, এবং পার্টি শেষ হওয়ার পর সারারাত সে যে আর কৃপার রুমে ফেরে নি এইসব, হাঁটতে হাঁটতেই বলে, তাকে বিষণ্ন দেখায়।

টুকু ভয়ে ভয়ে তাকে একটা ভুল প্রশ্ন করে বসে, “তোমরা কি এক রুমে থাকতে?” “না তো কী? ওই রাতে ও রুমে ফেরে নি।” “তার মানে ওরা সেই রাত একসাথে ছিল।” টুকুর এই মন্তব্যে কৃপা রাস্তার মধ্যেই চিৎকার করে বলে, “এই কথা তুমি না বললেও পারতে। তুমি আসলেই একটা গাধা।” কিছুক্ষণ হিস হিস করার পরে, “তোমাকে আমার এইসব বলাই ভুল হয়েছে। তুমি কে? তোমাকে কেন বলছি এইসব? এই গল্পে তোমার কোনো ক্লেম নাই তো।”

টুকু আহত বোধ করে। কিন্তু তা অভিব্যক্তিতে ফুটতে দেয় না, বরং কৃপার হাত ধরে, “প্লিজ কৃপা, একটা উপায় নিশ্চয়ই বের হয়ে যাবে।” কিন্তু এখন হাত ধরাটাও ভুল ছিল, কৃপা এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নেয়, “বাল হবে। কিছু হোক তা আমি চাই তোমাকে কে বলল? সে, দৃক… আসলে আমার জন্য কিছুই না, একটা সংখ্যা মাত্র।”

দুজনকেই ঘৃণা করতে ইচ্ছা করলেও টুকু বরং বুঝদার হওয়ার চেষ্টাই করে যায়, রাস্তার বিশৃঙ্খল শব্দের সাথে গলা অ্যাডজাস্ট করে বলে, “প্লিজ, মাথা ঠাণ্ডা করো। প্লিজ।”

কৃপার রাগ তাতে আরও বাড়ে, “তুমি কেন আমাকে এত প্লিজ প্লিজ করছ? যাই গিয়ে আমি, যাই।” কিন্তু সে যায় না। তাকে অনুনয় করতে দেখতে চায় না কৃপা, এরকম মনে হয় টুকুর।

অলঙ্করণ. যাইয়ার আযান

প্রাক-সন্ধ্যার অনিশ্চিন্ত আলোর ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে লেকের পাড়ে পৌঁছায় ওরা। সন্ধ্যার আগের মুহূর্তে সারি সারি গাছের ছায়া জলের উপর প্রাগৈতিহাসিক মাছের মত, সময়ের ছায়ার মত, ভেসে আছে। কিম্বা ঐ ছায়াগুলো কালাতিক্রমণের তিমি, গ্রহের কেন্দ্র থেকে পানির উপরে উঠে এসেছে সন্ধ্যা দেখতে। ফলে টুকুদের মনে হয়, সন্ধ্যা নামে না, অদৃশ্যের জঠর থেকে ওঠে। ফোটা ফোটা অস্তিত্বের মত বহু পাখি উড়ে উড়ে তাদের আবাসস্থলের দিকে ফিরে যাচ্ছে — মনে হয় অনেকগুলো কাটা হাত উড়ছে। কিন্তু ওরা পাখি। সন্ধ্যার উপদ্রুত ক্ষণ দেখা দেয়, চারদিকে সব নিশ্চুপ,নিশ্চল হয়ে যায়, দাঁড়িয়ে থাকে, সন্ধ্যার প্রতি গার্ড-অফ-অনার দেবার মত। একটি ডাল বা পাতাও কাঁপে না কোথাও, বিদ্যুতের তারও নড়ে না। এই সন্ধ্যা যেন বহু আগের এক সন্ধ্যা, এক দূরে চলে যাওয়া বন্ধু। সেই অনিস্তীর্ণ বন্ধুকে দেখতে দেখতে ওরা এক হয়ে যায়, নিজেদের অস্তিত্ব আলাদা ভাবে টের পায় না আর। চারিদিকে শব্দহীন প্রলম্বিত গান, এক খেয়াল। সময়ের স্টিল ফ্রেমে আটকে গেছে সব এক মুহূর্তের জন্য। এই মুহূর্তই অনন্তকাল। যৌথভাবে সব দেখে ওরা। শব্দহীনতাকে শোনে। দেখে যে পাখি ও মানুষের ঘরে ফেরা, তাদের ঘর, বা ঘরের ধারণা প্রায় এক কিন্তু তবু তা এক নয়। এই সন্ধ্যায় সব স্পষ্ট হয়, এবং আরও অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। সব কিছু ঢেকে দেয়া সন্ধ্যার স্থিরতার ভিতরে মানুষও স্থির হয়ে আসে নাকি কিছুটা? কৃপাও শান্ত হয়ে গেছে। তার মধ্যে আগের সেই রাগ আর নাই। কৃপা, সন্ধ্যায়, সবসময়েই, শান্ত। কৃপাকে সন্ধ্যায় রেগে উঠতে বা রেগে থাকতে টুকু কোনোদিন দেখে নাই। পরে তার রাগ ফিরে আসতে পারে; কিন্তু এখন সে অসম্ভব নরম, সন্ধ্যার পৃথিবীর মতই শব্দহীন, এখন তার হাত ধরলেও সে অমত করবে না; বরং তার হাত হয়ত মুঠার ভিতরে বাষ্প হয়ে যাবে। পৃথিবী এক ব্ল্যাকহোলের মধ্যে ঢুকে পড়ে দুএক মুহূর্তের অবসর খুঁজছে।
পরে ওরা লেকের দিকে পিঠ দিয়ে রেলিং-এ ঠেস দেয়। হাঁটু ভাজ করে, পিছনের রেলিং-এর উপরে একটা পা রেখে টুকু ওকে জিজ্ঞেস করেছিল, ওরা ঘাসের উপর গিয়ে বসতে পারে কি না। কিন্তু সে রাজি নয়। সে এইখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে চায়। ওরা খুব কাছাকাছি দাঁড়ায় ও টুকু তার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনে। ধীরে ধীরে তার বুক বাতাসে ওঠানামা করছে। একবার তা ডুবে বাতাসের নিচে চলে যায়, তারপর ভুস করে, যেন তার স্তন বাতাসের শুষুক, বাতাসের উপরে চলে আসে। টুকুর খুব ইচ্ছা করে তাকে স্পর্শ করতে, বা বলতে, যাই ঘটুক, টুকু তার সঙ্গে থাকবে। আশেপাশে তেমন লোকজন নেই। কৃপা ঘাড় ঘুরিয়ে টুকুর দিকে তাকিয়ে হাসে, এবং কোনো কটু কথা না বলে, বরং নরমভাবে জানতে চায়, “কী হল মন খারাপ কেন।” এবং টুকুর হাত নিজের হাতের মধ্যে তুলে নেয়। টুকু সন্ধ্যার আড়ালে আলগোছ এক মুহূর্তের জন্য চুমু খায় কৃপাকে। কিম্বা এরকম কিছু কল্পনা করে। তারপর কী ভেবে যেন বলে, “শোনো আমরা দুজনেই একটা উপন্যাসের চরিত্র। বাস্তব না। একজন আমাদের লিখছে।”

কৃপা শব্দ করে হাসে। আংশিক অন্ধকারের ভিতরে আশপাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া লোকদের তোয়াক্কা না করে কৃপা টুকুকে পরিপূর্ণ চুমু খায়। তারপর ধাক্কা দিয়ে নিকটে সরিয়ে দেয়, বলে “তুমি কচু”, ঠোঁট মুছে বলে, “হ, কইছে।”… কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, “ক্লিশে; ভয়ানক ক্লিশে।”

চারদিকে বাতাস। দুজন শরীরে, ঘাড়ে, হাতের খালি জায়গায়, মুখে, সে বাতাস অনুভব করে।

কৃপা টুকুর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে “কে লিখছে? হুম? কে লিখছে আমাদের?”

দুএক মুহূর্ত ভাবে টুকু, “আমি। অন্য আরেক নামে।”

“কেন তোমার নিজের নামের কী হইল?”

“আমার কোনো নাম নাই। তুমি লক্ষ্য করো নাই?”

“হ, করেছি। টুকু। টুকু একটা নাম হল?” কৃপার ‘হ’ বলাটা অদ্ভুত; মনে হয় তা পৃথিবীর অনাবিষ্কৃত এক ভাষা। সে প্রায়শই প্রমিত-অপ্রমিত মিশিয়ে কথা বলে। সে যখন হ এর মত করে হ বলে তখন মনে হয় সবকিছু হ হয়ে গেছে, সবকিছু এখন সম্ভব। টুকুর মনে হয় কৃপাকে এইরকম হ বলতে সে হাজার হাজার বছর ধরে শুনছে। কৃপা পুনরায় বলে, “তোমার মতন নামহীন কেউ নাই এই ভুবনে।” টুকুর মনে হয়, এই কথা দিয়ে সে আরও অনেক গভীর কী কথা যেন বলল।

প্রশ্ন করে কৃপা, “কী নিয়ে লিখবে?”

“প্রেম। ভয়াবহ পরাজয়। এইসব। যে কোনো গভীর প্রেমই পরাজয়। এরকম একটা বিষয় নিয়ে লিখব। উপন্যাস। যেখানে একটা লোক একটা বিল্ডিং-এর মধ্যে ঢুকে আর কোনোদিন বের হওয়ার পথ খুঁজে পাবে না।”

কৃপা হাসে, “এই বই কেউ পড়বে না।” জিজ্ঞেস করে, “গভীর প্রেম আছে নাকি? গভীর প্রেম। হেহ্‌।” এবং, “লোকটা কে? মানে যে লোকটা হারিয়ে গেল।”

“আমার বাবা।” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে টুকু আরও বলে, “একটা ছেলে শুধু সার্কাস দেখতে যায়, আর সার্কাস চলে যাওয়ার পর তাঁবুর নিচে চাপা থেকে সাদা হয়ে যাওয়া ঘাসের উপর বসে থাকে। ছেলেটা আমি।”

“বাহ” কৃপা কেমন নিশ্চিত ভাবে, একটু আগে যা বলেছিল তার ঠিক উলটা কথা বলে, “খুব ভালো হবে। উপন্যাসটা যেন বড় হয়। পড়তে পড়তে যেন কখনও শেষ না হয়। শেষ হলেও যেন শেষ না হয়।” কৃপা এইরকমই। একটু আগে একজনের স্তন কেটে ছোট করে ফেলতে চাচ্ছিল, এখন টুকুকে বলছে উপন্যাসটা বড় করতে, অশেষ করে তুলতে।

“হ্যাঁ। ঐভাবেই লিখব। আমার খুব নাম হবে। অনেক লোক তোমাকে ইন্টার্ভিউ করতে আসবে।”

“জানি। তখন তুমি থাকবা না বলে আমি খুব কাঁদব। আর যারা ইন্টার্ভিউ করতে আসবে ওদের বলব, লোকটা এমন হাঁদা ছিল কোনোদিন আমাকে বুঝতে পারে নাই। কোনোদিন আমাকে ধরে রাখে নাই। আমাকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মরতে হইছে। কতজনের কাছে যাইতে হইছে। সে ভেবেছে আমি ওদের কাছে যাচ্ছি ওদের কাছে যেতে চাই বলে, ওদের ভালোবাসি বলে, মনের সুখে। কিন্তু বোঝে নাই সবই করছিলাম তার কাছে যেতে পারছিলাম না বলে। এমন গাধা কোনোদিন জানে নাই যে সে ধরে রাখছে না বলে আমাকে দরজায় দরজায় ঘুরতে হচ্ছে।” হঠাৎ নিঃশব্দে কাঁদতে শুরু করে কৃপা, অন্ধকারে তা বুঝতে টুকুর দুএক সেকেন্ড লাগে টুকুর। ল্যাম্পোস্টের আলোয়, অথবা নক্ষত্রের আলোয় টুকু দেখে তার ঠোঁট বাঁকা হয়ে গেছে, তার গালের উপর দিয়ে গড়িয়ে নামছে ফোটা ফোটা লবণাক্ত পীড়া।

টুকুর শিরদাঁড়া সোজা হয়ে যায়। “আমি একদম সহ্য করতে পারি না তার কান্না,” টুকু ভাবে। এবং হতভম্ব, না, বরং, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকে বাম হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে। কথা বলতে বলতে কৃপা যে এভাবে কাঁদবে তা সে কোনোদিন ভাবতেই পারে নি, “এই এই কী করো, কী করো, ডোন্ট ক্রাই, প্লিজ ডোন্ট ক্রাই।” এ রকম কিছু একটা সে বলে। এসব সময়ে টুকু সব কিছু দুইবার দুইবার বলে।

বেতন বাড়ে কমে
নানা দিক থেকে সময় আসে; আর নানা দিকে, কোন দিকে যেন, আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যায়; হামাগুড়ি দিতে দিতে, ছুটতে ছুটতে।

বছরের শেষ দিন। অফিসের অন্ধকার এক কোনায়, দেয়ালে লাগানো টেবিলের সামনে বসে, সারাদিন কাজ করে টুকু, বিকালের দিকে দেয়ালের প্রতি তাকিয়ে, চুপচাপ বসে থাকে। আজ — ইনক্রিমেন্ট পাবার দিন। সে ছাড়া আর সবাই ইনক্রিমেন্ট লেটার হাতে পেয়ে গেছে। তার ডাক এখনও না পড়ায়, ভয়ানক টেনশনে ভুগতে ভুগতে, সকাল থেকেই টেনশন শুরু হয়েছে, এখন বিকালে টুকু ভাবে, তাহলে কি এ বছরও আমি ইনক্রিমেন্ট পাব না? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই পাব না; না, নিশ্চয়ই পাব।

ইনক্রিমেন্টের অনিশ্চয়তায় কুঁজো হয়ে যায় সে, টেবিলের উপর নুয়ে পড়ে, তাকে ছোট দেখায়, এবং টেবিলটাকে দেখায় আগের চেয়ে উঁচু।

তার চেয়ারের উঁচু নিচু করার লিভারটা ঠিক মত কাজ করে না; সে অদ্ভুত রকম একমুখী, নিম্নমুখী, তাকে শুধু নিচু করা যায়। অনেক ভুগে সে জেনেছে একবার নিচু হলে চেয়ারটা আর উঁচু হয় না। নাকি হয়? হয়ত হয়, একটু একটু করে। না হয় না। চেয়ারটা সবচেয়ে নিচু অবস্থাতেই এখন আছে। এই অবস্থানের আর পরিবর্তন হবে না। কিন্তু, টেবিলটাকে আগের চেয়ে উঁচু লাগছে কেন তবে? তাহলে কি আমি নিজে বামুন হয়ে যাচ্ছি? নাকি… চেয়ারটা এখনও নিচু হচ্ছে, সবচেয়ে নিচু অবস্থান থেকে আরও নিচুতে চলে যাচ্ছে, ধীরে ধীরে, আমাকে কিছু না বলে? হ্যাঁ, তাই হবে। চেয়ারটা ক্রমাগত নিচু হচ্ছে, তাই টেবিলটাকে ক্রমাগত উঁচু মনে হচ্ছে। আমি দৈর্ঘ্যে ছোট হয়ে যায় নি। কিন্তু মানুষ তো বয়স হলে ছোট হয়ে যায়। না। আমার সে রকম বয়স হয় নি। কখন যে চেয়ারটাকে আবার নিচু করলাম। চেয়ারটা যদি বদলানো যেত। স্বাভাবিক একটা চেয়ার যদি পেতাম, যেটাকে প্রয়োজন মত উঁচু-নিচু করা যায়, তাহলে কি যে ভালো হত।

অন্ধকার ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় তার মন। নিজেকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চায়, বেশ কিছু নতুন ক্লায়েন্ট আমি এনেছি, পুরানো ক্লায়েন্টেদের ব্যবসা বাড়াতে কাজ করেছি, এবার আমি নিশ্চয়ই কিছু না কিছু ইনক্রিজ পাব।

সমসাময়িকদের মধ্যে তার বেতন সবচেয়ে কম। গত বছর ইনক্রিমেন্ট-এর বদলে তার বেতন কমিয়ে দিয়েছিল তার বস হামিদ। অজানা কারণে সে টুকুকে একদম দেখতে পারে না। তাকে টুকু ভীষণ ভয় পায়। তার কথা ভাবলে এমনকি চিন্তার ভিতরেও সে তোতলাতে শুরু করে। তোতলাতে তোতলাতে সে ভাবে, আমাকে ডাকছে না কেন এখনো, যা হয় তা হয়ে যাক, এই টেনশন আর নিতে পারছি না। হয়ত আমাকে শুধু ইনক্রিমেন্ট না, প্রমোশন দেবে, তাই দেরি হচ্ছে ডাকতে। আহ, প্রমোশন, ভাবতেই কী যে আনন্দ।  দুপুরে কৃপা বলে গেছে তার ডাবল প্রমোশন হয়েছে, বেতন বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। আমারও নিশ্চয় একটা কিছু হবে। এক ধরনের ডেসপারেট আত্মবিশ্বাস জন্ম নেয় তার মধ্যে, তারপর তা উবে যায়; মরুভূমিতে হঠাৎ নেমে আসা এক ফোটা বিফল বৃষ্টির মতন। মর্মমূলে ভয় প্রবেশ করে। চেয়ারে বসে একা একা কাঁপতে শুরু করে টুকু। তার বদ্ধমূল ধারণা, এবারও সে ইনক্রিমেন্ট পাবে না।

একই চিন্তা বার বার করতে করতে সে পর্যুদস্ত হয়ে যায়। সে বিড় বিড় করে নিজের মনকে বলে, ওরে শুয়োরের বাচ্চা মন, আমাকে একটু শান্তি দাও। তুমি এবার থামো। তার আশে পাশে কোনো মানুষ নাই। কেউ তার বিড় বিড় করা শোনে না।

আগে টুকুর অফিস ছিল একটা অফিস-রুমের মধ্যে, আরেকজনের সাথে। কিন্তু পরে টুকুকে সে রুম থেকে সরিয়ে, অফিসের মূল বসার যায়গার বাইরে, একটা চারদিক বন্ধ চারকোনা, দরজা জানলাহীন ঘরে, ঘরটা মূলত ফটোকপি মেশিনের, এখানে পাঁচ ছয়টা বিশাল ফটোকপি মেশিন বসানো আছে, সরিয়ে আনা হয়েছে। এই ঘরের এক কোনায়, দেয়াল ঘেষে, তার টেবিল, চেয়ার। মেশিনগুলোকে পিছনে রেখে সে বসে। এখানে কোনো জানলা নেই। দিনের অনেকটা সময় নানা রকম দ্বিধা দ্বন্দ নিয়ে, ঐ দেয়ালের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, নিজের সাথে কথা বলতে বলতে কাটিয়ে দেয় টুকু, নিজের সাথে কথা বলা যেন তার চাকরির অংশ। তার কথা বলার প্রসঙ্গ খুব বেশি না, বেতন, কৃপা এইরকম দুএকটা মাত্র। ফটোকপি মেশিনের স্থানের ভিতরে এসে তার একটা সুবিধাই হয়েছে বলা যায়, কেউ তাকে বিড় বিড় করতে দেখে না। সে জানে না কৃপা তাকে চায় কিনা। কেন কৃপা তোমাকে চাইবে, ভালোবাসবে? তোমাকে ভালোবাসার কোনো কারণ কি কৃপার আছে? না, নাহ, সে রকম কোনো কারণ নেই।
তবু তার মন মানে না। অপ্রাসঙ্গিক কথা, প্রাসঙ্গিক কথার মত ভেবে দেখা, তার অভ্যাস।

সারাদিন অটোমেটিক মেশিনগুলো গুঞ্জন করে, বিরতিহীন ভাবে প্রিন্টেড কাগজ উগরে দেয় চ্যাপ্টা মুখ দিয়ে। ওদের ভিন-গ্রহের কোনো জন্তু মনে হয়, যাদের লক্ষ্য কাগজে কাগজে পৃথিবীর মানুষকে ডুবিয়ে মারা। ওদের পেটের ভিতর থেকে উগরে দেয়া কাগজ জমতে জমতে একদিন এই বিল্ডিংটা ভরে যাবে; কাগজের চাপা পড়ে এ দালানের সবাই মারা যাবে। তারপর দলান ছাড়িয়ে কাগজ বেরিয়ে পড়বে বাইরে; স্ট্রিট ভরিয়ে দেবে; আকাশ পর্যন্ত উঁচু হয়ে উঠবে — প্রকৃতির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে; কাগজের নিচে চাপা পড়ে দম বন্ধ পৃথিবী সব কিছু সহ মারা পড়বে। এসব সে ভাবে। কখনও ঘুমের ভিতরে ফটোকপি মেশিনের গুঞ্জন শুনতে পায়, এবং তার মনে হয় সে কাগজের নিচে ডুবে, পানিতে ডোবার মত, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে। ছোট ছোট হাতির মত ফটোকপি মেশিনগুলো তাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে, তাকে পাড়া দিয়ে দিয়ে, মেরে ফেলছে। এই হচ্ছে টুকুর, অনেক স্বপ্নের মধ্যে, একটি স্বপ্ন।

মেশিনগুলো টুকুর সাথে নানা বিষয় নিয়ে কথা বলে। ওরা কৃপার কথা, তার বেতনের নিম্নগতির কথা, জানে। একটা মেশিন, কতগুলো কাগজ উগড়ে দিতে দিতে বলল, তুমি ইনক্রিমেন্ট পাবে না। তার পাশের মেশিনটা, তখন সে কাগজ-বমি করছিল না, বলে, না, পাবে, তুমি পাবে। তার পাশের পাশের মেশিন বলে, তুমি কাউকেই পাবে না। না ইনিক্রিমেন্ট, না কৃপাকে। কৃপা তোমাকে ভালোবাসে না। আজ বছরের শেষ দিন, কই সে তো তোমাকে শুভেচ্ছা জানায় নি, সে যেখানে পার্টি করতে যাবে, সেখানে ডাকে নি। এই মেশিনটা সবচেয়ে পুরানো তাই তার অন্তর্দৃষ্টি সবচেয়ে গভীর। টুকু মেশিনগুলোর দিকে ঘুরে তাকায়। বলে, থামো থামো, এত কথা বোলো না। আমার রিলাক্সড হওয়া দরকার, তোমাদের কথা শুনলে আমার চলবে নাকি।

একসময় মেশিনের গুঞ্জন কমে আসে। লোকজন কাজ গুটিয়ে ব্রেক-আউট রুমের দিকে যাচ্ছে নিউ-ইয়ার্স পার্টিতে যোগ দিতে, ডেস্কগুলো শূন্য হয়ে যাচ্ছে, কেউ আর কম্পিউটার থেকে কিছু প্রিন্ট করার হুকুম দিচ্ছে না, সেন্ট্রাল ফটোকপি রুম নিস্তব্ধ হয়ে আসছে। তাহলে হামিদ আজ বোধহয় আমার চিঠি আর দেবে না, কাল বা পরশু দেবে, টুকু বিড় বিড় করে নিজেকে জানায়। ঠিক তখনই তার টেবিলের ফোনটা বেজে ওঠে, টুকু চমকে উঠে রিসিভার তুলে কানে লাগায়, যা সে ভাবছিল তাই, ফোনের অপর প্রান্তে হামিদ, সে বলল, “আমার রুমে আসো, এক্ষনি। উড়ে চলে আসো, আমার হাতে সময় নেই।” টুকু দ্রুতবেগে চেয়ার ছেড়ে উঠতে গেলে তার হাঁটু টেবিলের কোণার সাথে বেদম এক ধাক্কা খায়, সে “উফ” করে ওঠে, হাঁটুর যত্ন নেবার সময় তার হাতে নেই, তাকে উড়ে যেতে বলা হয়েছে, সে দ্রুতবেগে হাঁটতে শুরু করে, খুড়িয়ে দু এক কদম যেতে না যেতেই, তার হাঁটা আবার ঠিকঠাক হয়ে যায়। সে হাঁটুর ব্যথার কথা ভুলে গেছে।

হামিদের রুমের দিকে পড়িমরি করে হাঁটছে টুকু, সে যেখানে বসে সেখান থেকে হামিদের রুম অনেক দূরে। একটা খোলা বসার জায়গা পার হতে হয় তাকে, আইলের দুই পাশে, সারি সারি ডেস্ক। তারপর পার হয় এমন পথ, যার একদিকে দেয়াল, আরেক দিকে, বড় সাহেবদের সারি সারি বসার কক্ষ। আগে যে রুমে সে বসত সেই রুমের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কাচের দেয়ালের ঐ পাশে তার পূর্বের চেয়ারের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে, ওই চেয়ারে কৃপা বসে আছে, ডাবল প্রমোশনের পর কৃপাকে এই রুমটাই দেয়া হয়েছে তাহলে, তাই হবে, তাই হবে। কার সাথে হেসে হেসে গল্প করছে কৃপা, লোকটার পিঠই সে শুধু দেখতে পায়, ছুটতে ছুটতে। তাদের দুজনের গল্প করবার ভঙ্গির মধ্যে এমন এক স্থিরতা আছে যা কেবল আত্মবিশ্বাসী মানুষের মধ্যে দেখা যায়।
এই তো আমার জীবন। আমি ভালো আছি। রুম থেকে উৎখাত হয়ে সেন্ট্রাল ফটোকপি মেশিনের রুমে স্থান পাওয়া, নিজ টেবিল থেকে, যদিও তাকে বলা হয়েছে উড়ে যেতে, উড়ে যাওয়ার ক্ষমতা তার নাই, হেঁটে হেঁটে বসের রুমের দিকে যাওয়া, যেতে যেতে কাচের দেয়ালের ওপাশে কৃপাকে ঘনিষ্ঠ হয়ে কারও সাথে গল্প করতে দেখা, এ-ই আমার জীবন, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। কল্পনায় সে দেখতে পায়, কৃপা স্মিত হেসে ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাচ্ছে লোকটির কথায়। অথচ আমার ইনক্রিমেন্টের খবর নাই, আমি যাচ্ছি বধ্যভূমির দিকে। জীবন এইরকমই। যত সে হামিদের রুমের কাছাকাছি আসে তত তার হৃৎপিণ্ডের গতি বাড়তে থাকে। এখন আর কোনো কিছুর উপর তার কন্ট্রোল নেই।

হামিদ, একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসাবে, একটা বিশাল অফিস কক্ষের অধিকারী। রুমের এক মাথায় কাচের জানলা, জানলার সামনে এক্সিকিউটিভ টেবিল, জানলার উপর সাটার নামানো, জানলার এই পাশে তার বিশাল চেয়ার, যেখানে সে এখন বসে আছে, জানলা পিছনে রেখে। সে কখনো জানলার সাটার সরায় না, অতিরিক্ত আলো হামিদের পছন্দ নয়। ঘর কিছু অন্ধকার থাকলেই বরং সে চাহনি দিয়ে সকলের অন্তরাত্মা দেখতে পায়। পুরো আলো, বা পুরো অন্ধকার নয়, আধো অন্ধকার আধো আলোতেই তার সুবিধা। কাচের দরজার ঐ পাশে টুকুকে দেখে হাতের ইশারায় তাকে ভিতরে আসতে বলে হামিদ।
দরজা ঠেলে হামিদের কক্ষে ঢুকে হেঁটে হেঁটে তার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রায় এক যুগ লেগে যায় টুকুর।

হামিদ তাকে বসতে বলে না, বসতে না বললে হামিদের ঘরে বসার অনুমতি তার নেই, ফলে সে টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মনে মনে কাঁপতে থাকে।

হামিদ তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।

টুকু যে ভীত সেটা সে দেখতে পায়, উপভোগ করে, বলে, “গ্লোবাল রেসিশন চলছে,” এবং কিছুক্ষণ পজ দিয়ে তাকিয়ে থাকে টুকুর মুখের দিকে, রিসেশনকে সে কেন যেন রেসিশন বলে, “আর তুমি তোমার বেতন,” ডান হাত শূন্যে বৃত্তের মত ঘুরায় কিছুক্ষণ হামিদ, “ইনক্রিমেন্ট এইসব নিয়ে ভীত?” মনের আনন্দে হাসে দুএক মুহূর্ত, এবং কথা চালিয়ে যায়, “কাম অন… ও হ্যাঁ, কী যেন নাম তোমার?” টুকু খুব ভালো করেই জানে যে হামিদ তার নাম জানে। তবু তার নাম জিজ্ঞেস করায় সে আরও ভীত হয়ে পড়ে, এবং অটোমেটিক রোবট রেসপন্সের মত, তোতলাতে তোতলাতে বলে, “ট… টু… আমার নাম টুকু, হা, হামিদ ভাই।”
হামিদ আরও হাসে। “তুমি কি গাধা নাকি, নিজের নাম বলছ আমাকে? ভাবছ তোমার নাম ভুলে গেছি? আমি একটু ঠাট্টা করলাম আর কি। আজ বছরের শেষ দিন না? লিলাক্স, লিলাক্স।” সে রিলাক্স শব্দটাকে কখনও কখনও লিলাক্স বলে, মশকারি করবার ইচ্ছায়, ফিলিপিনো বা থাইদের উচ্চারণকে ব্যঙ্গ করে, সে ঐসব দেশে ঘন ঘন যায়, কেন, তা সবাই জানে। কিন্তু টুকু কথা বলার জন্য মুখ হা করতেই হামিদ হাতের অসহিষ্ণু ভঙ্গি করে টুকুকে থামিয়ে দিয়ে বলতে থাকে, “থাক। বলতে হবে না, তুমি আমার ঠাট্টা ধরতে পেরেছ। নিজের নাম বলে কথা। তবে হ্যাঁ, সত্য হল এই যে, তোমার নাম ট-ও না, টু-ও না, টুকুও না, তোমার নাম হইল গিয়া অংশটুকু।” অংশটুকু? এটা নতুন। যদিও হামিদ প্রায়শই তার নাম বিকৃত করে, তবু এই বিকৃতি, “অংশটুকু”, নতুন। টুকুর মনে হয়, হামিদের দেয়া বিকৃত এই নামের মধ্যে তার জীবনের এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। সে কিছু বলে না। কথা বলতে গেলে সে এখন তোতলাবে। নিজ নামের বিকৃত সংস্করণের মুখামুখি হয়ে সে ভীষণ ভয় পায়। দুএক মুহুর্তের জন্য কোথাও হারিয়ে যায় হামিদ; বা হারিয়ে যাওয়ার অভিনয় করে। এও হয়ত এক ধরনের টেকনিক, মানুষকে পর্যুদস্ত করবার। হারিয়ে গিয়ে বা হারিয়ে যাওয়ার অভিনয় করে সে টুকুকে বুঝিয়ে দেয় টুকু কার্যত অস্তিত্বহীন। তারপর, “ও, হ্যাঁ, তোমাকে যে কারণে ডেকেছি,” বলে, একটা সাদা খাম বাতাস থেকে বের করে টেবিলের উপর দিয়ে টুকুর দিকে ঠেলে দেয়। ঠেলা খেয়ে খামটা স্লাইড করতে করতে, যেন তুষারের উপর দিয়ে স্কি করছে, এভাবে, টেবিলের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে থাকে। কিন্তু টেবিলের সীমা ছাড়িয়ে মেঝেতে পড়ে যাওয়ার আগেই, টুকু তার কাঁপা হাতকে যতটা স্থির করা যায় ততটা স্থির করে, খপ করে খামটাকে ধরে ফেলে, গভীর সমুদ্রে ভেসে যেতে যেতে যেভাবে মানুষ খড়কুটা আঁকড়ে ধরে, অনেকটা সেভাবে।

হামিদ একটু কাশে। কাশল কেন সে? ভাবে টুকু, হাতে আগুনের মত জ্বলজ্বলে সাদা খাম, তার শরীর থেকে একটু দূরে, বুক সমান উচ্চতায়, স্থির। সে একবার খামটার দিকে তাকায় আবার হামিদের মুখের দিকে, শোনে হামিদ বলছে, “শোনো অংশ সাহেব। ঐ যে বললাম গ্লোবাল রেসিশন, তোমাকে এবারও কিছু দেয়া গেল না। ইন ফ্যাক্ট, মানে, আসলে, তোমার বেতন টুয়েন্টি পারসেন্ট কমে গেল। হুম। কমেই গেল বলা যায়। কেউ কমায় নি, আমিও না। নিজে নিজেই কমে গেল তোমার বেতন। হি হি। দুএক বছর যেতে না যেতে তোমার বেতন নিজ থেকে কমতে কমতে মাইনাস হয়ে যাবে। তখন বেতন তো আর পাবেই না বরং এখানে কাজ করবার জন্য কোম্পানিকেই টাকা দেবে তুমি। এরকম একটা কম্পানির অভিজ্ঞতা, এর একটা ভ্যালু আছে তো, সুতরাং বেতন পাওয়ার বদলে, এখানে কাজ করতে পারছ বলে, তোমাকেই উলটা বেতন দিতে হবে কম্পানিকে। তারপর আছে… ঐ গ্লোবাল ইয়ে। আচ্ছা তখন না হয় দেখা যাবে। এখন তো এই বেতনে চলবে তোমার। তাই না? নিশ্চয়ই। চলবে। চলবে না কেন? বিয়ার টিয়ার, ওসব তুমি খাও বলে শুনেছি, একটু কম খাবে আর কি।” ঠা ঠা হাসি সহকারে ভীষণ গ্লোবাল মজা পেতে পেতে এইসব বাকোয়াজ কথাবার্তা বলে হামিদ। টুকুর ইচ্ছা করে ঘুষি মেরে লোকটার মুখ ফাটিয়ে দিতে কিম্বা তার সাথে অনেক সময় ধরে তর্ক করতে। তার শুধু ইনক্রিমেন্ট নয়, প্রমোশন হওয়া উচিৎ, একশবার উচিৎ। কিন্তু সে কিছুই বলতে পারে না। বরং খামটা হাতে নিয়ে মৃদু মৃদু কাঁপতে থাকে। সে জানে পৃথিবী যুক্তিগ্রাহ্য কোনো স্থান নয়, ফেয়ার প্লে বলে কিছু এখানে নেই। তখন হয়ত কোনো অদৃশ্য থাপ্পড়ে তার ঠোঁট কেটে রক্ত পড়ে। টুকুর পর্যুদস্ত অবস্থা দেখে হামিদ যতক্ষণ হাসবে ভেবেছিল, তার চেয়ে খানিকটা কম সময় ধরে হাসে, এবং আচমকা বলে, “যাও।”

নিজ টেবিলের দিকে ফিরে যেতে যেতে টুকু দেখে অফিস নির্জন হয়ে পড়েছে। সবাই ব্রেক-আউট রুমে চলে গেছে পার্টিতে যোগ দিতে। টেবিলে ফিরে এসে ভাবে, সেও কি যাবে? কিন্তু তার আগে কিছু হিসাব মেলানো দরকার। চেয়ারে বসে হিসাব মেলানোর দিকে ঝুঁকে পড়ে সে। বাড়ি ভাড়া কমাতে পারবে না। বরং বাড়িভাড়া কিছুটা বেড়ে যাবার সম্ভাবনাই বেশি। কারও সাথে শেয়ার করে থাকা শুরু করবে নাকি সে? সেটা একটা বিকল্প হতে পারে। অসম্ভব। শেয়ার কোনো বিকল্প নয়। আরও অনেক পথ খোলা আছে। তাকে বাসে আসা যাওয়া করতে হবে, রিক্সা কমাতে হবে, সিএনজি একেবারে ছেড়ে দিতে হবে। প্রমোশন হলে সে কার লোন পেত, একটা গাড়ি কিনতে পারতো। কিন্তু তা এখন হবার নয় আর। অন্য চাকরি খুঁজলে কেমন হয়? না। অন্য চাকরি সে পাবে না। ইন্টারভিউতে গুছিয়ে কথা বলতে পারে না সে। কে তাকে চাকরি দেবে? খাওয়ার খরচ একটা বিরাট ব্যাপার। এই খরচ কমাতে হবে নানা দিক থেকে। যাতায়াতের খরচ, খাওয়ার খরচ, এই দুইটাই তাকে কমাতে হবে, বাড়িভাড়া যেহেতু কমানো সম্ভব না। মাঝে মাঝে দুএক বেলা না খেয়ে বা প্রায় না খেয়ে থাকতে হবে। পারবে সে, না খেয়ে, বা “প্রায়” না খেয়ে থাকতে। অনেক হাঁটতে হবে। ভাত না খেয়ে কলা পাউরুটি খেয়ে থাকতে হবে, আর কোনো গত্যন্তর নেই তার। পারবে সে, সারভাইব করতে, এই বেতনেও।

সময়ের পরিবর্তন ফটোকপি রুমের মধ্যে বোঝা যায় না। জানলা না থাকায় বাইরের আলো কিম্বা অন্ধকার, ভিতরে আসে না। এক স্থায়ী রাত্রির মধ্যে এই কক্ষ বাস করে। চারদিকের দেয়াল নিরেট, ভিতর ও বাহির আলাদা, সারাদিন সারারাত। তবু, এখন, রুমের ভিতরের আলোকে একটু বেশি ঘনীভূত দেখায়, বাল্ব-এর আলোকে অনেক শক্তিশালী মনে হয়, ফলে বোঝা যায়, বাইরে প্রাকৃতিক আলো হারিয়ে গেছে অনেক আগে। সন্ধ্যাও পার হয়ে গেছে।

নিজেকে ক্লান্ত লাগে টুকুর। বাড়ি চলে যাবে কিনা ভাবে। বসে থাকতে থাকতে সাতটা বেজে যায়, তারপর আটটা।

টুকু চেয়ার ছেড়ে উঠবার শক্তি জড়ো করতে পারে না বলে বসে থাকে। কল্পনায় নিজেকে লিফট দিয়ে নেমে যেতে দেখে। ব্রেক-আউট রুম থেকে পার্টি জমে উঠবার শব্দ ভেসে আসছে থেকে থেকে। এক রকমের ঝিমুনি আসে, হয়ত নিজের অজান্তে চোখ বন্ধ হয়ে যায়। সব ফটোকপি মেশিন নিঃশব্দ হয়ে গেছে কত আগেই। ঘুমিয়ে পড়ে টুকু। কিম্বা সে জেগেই আছে। তার চোখ কি বন্ধ? না, খোলাই আছে মনে হয়। সে কি টেবিলের উপর হাত রেখে, হাতের উপর মুখ রেখে, চোখ বন্ধ করে আছে? না, সে সোজা হয়েই বসে আছে মনে হয়। হঠাৎ সে ঘাড়ের উপর কারও হাতের আলতো স্পর্শ অনুভব করে, এবং টের পায় এই স্পর্শ কল্পনা নয়, চেতনাজাত নয়, এবং স্পর্শ মাত্রই, চমকে উঠে সোজা হয়ে বসে। মুখ ঘুরিয়ে দেখে কৃপা তার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে। টুকু কিছু বলতে পারার আগেই কৃপা বলে, “এই তুমি এইভাবে বসে আছ যে? লাবণ্য তোমার এখানে কী করছিল?” কোনো উত্তর দেয়ার সুযোগ হয় না টুকুর। কৃপা কথা বলতে থাকে, “রফিক লাগছে আমার পিছনে আজ রাতে। শুইতে চায় আমার সাথে। তোমার মত লুজার দেখি নাই তো। কী করো এখানে একলা বসে? সবাই ব্রেক-আউট রুমে। আর তুমি নিজের টেবিলে।” টুকু বলার চেষ্টা করে, “আমি লুজার না। ব্যর্থ হয়ত। কিন্তু লুজার না। আমার কল্পনা, বোধ, এসব হারিয়ে যায় নি। এসব হারিয়ে না গেলে কেউ লুজার হয় না; আমি লুজার না।” কিন্তু কিছু বলা হয় না তার। কৃপা বলে, “আসো আমার সাথে, ব্রেক আউট রুমে চলো। বাঁচাও আমাকে রফিক-এর হাত থেকে।” রফিক তার কলিগ, যার সাথে সে অফিস রুম শেয়ার করে। আজ বিকালে, হামিদের রুমের দিকে যাওয়ার সময়, টুকু ওদের দেখেছিল কথা বলতে। তখন তার মনে হয়েছিল ওরা খুব নিবিষ্টভাবে কথা বলছে। কৃপাকে খানিক নেশাগ্রস্ত দেখাচ্ছে।

পার্টি
ব্রেক-আউট রুমে দুতিন ঘণ্টা চলতে চলতে পার্টিটা ততক্ষণে বেশ জমে গেছে, কোনো বাধ্যবাধকতা নেই আর, জীবনের সব অবৈধকেই বৈধ ও সহজ লাগছে, লম্বা ব্রিজের উপর দিয়ে চলে যাওয়া ট্রেনের মত গুম গুম করছে মানুষ। পার্টি রুমে ঢোকার সাথে সাথে ওদের দুজনের কানে এসে আঘাত করে সেই নিরবিচ্ছিন্ন গুম গুম, সকলেই চিৎকার করে কথা বলছে, জোরে জোরে হাসছে। কৃপা বার থেকে একটা বিয়ার এনে দেয় টুকুকে, সে নিজেও বিয়ার খাচ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে রফিক আর লাবণ্য এসে যোগ দেয় ওদের সাথে। রফিককে আসতে দেখেই কৃপা চোখের ইশারায় টুকুকে বলে, দেখো যা বলছিলাম এতক্ষণ, কী বিড়ম্বনা। কিন্তু সে যে এই বিড়ম্বনা থেকে উদ্ধার পেতে চায়, সেরকম কিছু টুকুর মনে হয় না।

রফিক আর লাবণ্যের উদ্দেশ্য ভিন্ন ভিন্ন। রফিক চায় কৃপাকে সরিয়ে নিয়ে যেতে, আর লাবণ্য চায় টুকুর সাথে থাকতে, হয়ত সারারাত। কিছুটা সময় চলে গেলে রফিক কৃপার কানে কানে কিছু বলে টুকুর দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসে এবং কৃপার হাত ধরে তাকে অন্য এক কোনার দিকে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় কৃপা একবার তার দিকে বিষণ্ণভাবে তাকায় কি, এই বোঝাবার জন্য যে সে যেতে চায় না, কিন্তু বাধ্য হচ্ছে যেতে? টুকু ভাবে, রফিকের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও, এসব বলছিল সে আমাকে একটু আগে, এবং বিহ্বল বোধ করে — অনিশ্চয়তা সিন্দাবাদের বুড়ির মত বসে আছে তার অন্তরের কাঁধে। সময় কাটছে। লাবণ্য তার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়, তাকে জিজ্ঞেস করে, “কী অবস্থা তোমার, হাউ ওয়াজ ইয়োর ইয়ার।” ফলে যে বাক্যালাপ সে কৃপার সাথে করতে চেয়েছিল তা সে লাবণ্যের সাথে করে, জীবন এইরকম, একজনকে বলতে চাওয়া কথা প্রায়শঃই অন্য কাউকে বলে মানুষ। হামিদের সাথে বিকালের দিকে, নাকি সন্ধ্যার দিকে, যা ঘটেছিল, টুকু সেসব ধীরে ধীরে লাবণ্যকে জানায়।

লাবণ্য বলে, “তোমার বস একটা শুয়োরের বাচ্চা। তোমাকে অংশটুকু ডেকেছে?”

“হ্যাঁ।”

“তুমি একটা থাপ্পড় মারলে না কেন? চাকরির ভয় করে চাকরি করতে পারবে না কোনোদিন।”

“তা ঠিক। হি হি।”

“ঐ দেখো হারামজাদাটি কোনায় বসে কেমন মদ খাচ্ছে বন্ধু পরিবেষ্টিত হয়ে, লোকগুলো কেউ এই কম্পানিতে চাকরি করে না, ফ্রি মদ খেতে এসেছে, বলো, সে কি অন্যায় করছে না?, অথচ দেখ আড়চোখে সবাইকে এমনভাবে দেখছে, যেন বাকিরা অন্যায় করছে, সে না। আই অ্যাম শিওর এই মুহূর্তে সে মনে মনে প্ল্যান করছে, ভাবছে, আজ রাতে কাকে বিছানায় নেয়া যায়। সবাই দাঁড়িয়ে আছ, আর ওনারা আছেন বসে, এত প্রিভিলেজড ওরা নিজেদের ভাবে। দেখো ঐ মধ্যবয়স্ক হারামজাদা-হারামজাদিদের। ফ্যাট, আগলি, ইনসিকিওরড, কে কাকে কত বাজে কথা বলতে পারে তার অশ্লীল প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে আর হা হা হি হি করছে। রূপাভাবই অদের একমাত্র আনন্দ, ওদের কথা ভাবলেও নিজেকে কদর্য লাগে, দেখো, কেমন প্রতিযোগিতা করছে ওরা রুচিহীন হওয়ার, সবচেয়ে অশ্লীল যে হতে পারবে তার জন্য পুরস্কার আছে বোধহয় আজ রাতে। মহিলা দুইজনকে দেখ, বোধহয় হামিদের বন্ধুদের স্ত্রী-ফিস্তিরি হবে। ইনভাইটেড। অফিস পার্টিতে বন্ধুদের কে ইনভাইট করে বলো তো? তাও তো নিজের স্ত্রীকে ডাকে নাই। দেখো ঐ মহিলাদের। ফিজিক্যালি অ্যান্ড মেন্টালি এর চেয়ে কুৎসিত মানুষ তুমি দেখেছ কখনও এর আগে? পুরুষগুলা? ডিকম্পোজড। ফিফটি হওয়ার আগেই ওদের মরা উচিত ছিল। ওরা এইরকম কারণ ওদের জীবনে কোনো প্রেম নাই। বহুদিন হয়ে গেল ওদের জীবনে কোনো প্রেম নাই, কিন্তু অনেক ভোগ আছে, তাই ওরা এইরকম বীভৎস, কুৎসিত। ওরকম হওয়ার আগেই যেন আমার মৃত্যু হয়। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি এরকম কোনোদিন হব না। মরবো তার আগে। যাব নাকি শুয়োরের বাচ্চাকে একটা থাপ্পড় মারতে? কী করে একটা মানুষের বেতন বছরের পর বছর ধরে কমিয়ে দেয়? তুমি যে ক্লায়েন্টদের ম্যানেজ করো তাদের গ্রোথ এন্তার কোম্পানিতে সবচেয়ে ভালো। তারপরও কী করে সে তোমার বেতন কমিয়ে দেয়? এরচেয়ে তোমাকে রিজাইন করতে বলাও মোর অনারেবল হত। কিন্তু ওই হারামজাদার কোনো অনার নেই।”

লাবণ্যের এক্সট্রিম বার্তায় টুক কিছু বিহ্বল হলেও তার কথার আপেক্ষিক সত্যতাও সে স্পষ্ট দেখতে পায়। কথা ঘুরাবার জন্য বলে, “না, না, রিজাইন করা সম্ভব না আমার পক্ষে। চাকরি গেলে আমি মাঠে মারা পড়ব, আর কোনো চাকরি পাব না আমি। আমি না খেয়ে মারা যাব। এ বয়সে আর ছাত্র পড়িয়ে চালাতে পারব না নিজেকে।”

লাবণ্য উত্তেজিত হয়ে ওঠে, “ঘোরার ডিম। তুমি নিজের সম্বন্ধে কিছু জানো না। আত্ম-বিশ্বাসহীনতাই তোমার একমাত্র রোগ। তুমি অনেক চাকরি পাবে। এর চেয়ে ভালো চাকরি পাবে। কেউ কেউ জানতে বুঝতে শিখতে সময় নেয়। বিষয়টা হল নিজেকে জানা নিয়ে। তোমার হয়ত নিজেকে জানতে একটু সময় লাগছে। কিন্তু একদিন তুমিও নিজেকে জানবে, তখন তুমি সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে। শুধু হামিদের এই চক্কর থেকে বের হতে হবে তোমাকে।”

এরকম কিছু যে হবে না তা টুকু জানে। কোনোদিন সে কিছু হবে না, সে যা চায় তা সে কোনোদিন পাবে না, বহু কিছু হয়ত পাবো পাবো হয়ে উঠবে, কিন্তু তবু শেষ পর্যন্ত সেসব সে পাবে না, এসব সে জানে। কিন্তু এ নিয়ে লাবণ্যকে কিছু বলে না। আস্তে আস্তে লাবণ্যর রাগ পড়ে যায় এবং সে স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে। হয়ত সে আগাগোড়াই স্নিগ্ধ ছিল, এখন আরও স্নিগ্ধ হয়েছে। দুনিয়াসুদ্ধ সবাইকে ঝাড়ি দিতে পারায় এখন সে ঝলমলে। টুকু ভাবে, হামিদের চেয়ে আমার বয়স অনেক কম বলেই কি হামিদ আমাকে এত অপছন্দ করে? হামিদ মধ্যবয়স্ক কিন্তু টুকু যুবক। এই সত্যই কি সব কিছুর মূলে? হতে পারে, তাই তো মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে। তার মনে পড়ে, লাবণ্য, সেও একা থাকে কৃপার মত। এখন অনেকেই এরকম একা থাকে। একা একটি বাসায়, এইভাবে একা থেকে যাওয়াই, তাদের থাকা। তারপর লাবণ্যর কথা শোনা যায়, “তোমার বস আজ রাতে আমার সাথে যেতে চায়। কিন্তু… তুমি যাবে আমার সাথে?… না, তা যাবে না। জানি আমি। তুমি যেতে চাও কৃপার সাথে। কিন্তু কৃপা? তার দৃক কোথায়? সে তো শেষ পর্যন্ত দৃকের সাথেই যাবে! নাকি রফিক পাবে তাকে আজ? দেখো, তাহলে, কত প্রশ্ন ঘিরে ধরছে আমাদের: হামিদ কি লাবণ্যকে পাবে, লাবণ্য কি পাবে টুকুকে, টুকু পাবে কি কৃপাকে, কৃপা কি যাবে দৃকের কাছে, না কি রফিক তাকে হাত ধরে নিয়ে যাবে আরও গভীর কোনো অতলে? ভাবো তো, উফ, ভাবলেই মাথা ঝিম ঝিম করে, কী জটিল বৃত্ত… কী জটিল বৃত্ত-জটিলতা। এবং… কী ভয়ঙ্কর অর্থহীন। তোমার কী মনে হয়, টুকু, অংশটুকু? হাহা, অংশটুকু, তোমার বসের ক্রিয়েটিভিটি আছে বলতে হবে। মিস্টার খণ্ডিত, মিস্টার অপূর্ণ… দারুণ। অসম্পূর্ণ তুমি, পক্ষপাতিত্বপূর্ণ, একতরফা। জানো নাকি তুমি, কে তোমাকে ভালোবাসে? নাহ। মনে হয় না। তুমি ভালোবাসাহীন থাকবে, আজীবন, কারণ তুমি অজ্ঞ, পার্সিয়ালি ব্লাইন্ড। চলো, আমরা এখান থেকে ভেগে যাই এখন।” লাবণ্যের স্লিম সুন্দর শরীর তার দিকে ঝুঁকে পড়ে কথা বলতে বলতে। তার নিবিড় নিতম্বে ঢেউ জাগে। বুদ্ধিতে বুদ্ধিতে আর অপরূপ মায়ায় তার মুখ পুকুরের পানিতে ভেসে ওঠা তারার মত জ্বলছে। টুকু ভাবে, কেমন হয় তার সাথে গেলে আজ রাতে? সেও ত বেশ টিপসি হয়ে পড়েছে। কোথাও এই মুহূর্তে যুদ্ধ করতে গিয়ে মারা পড়ছে অনেক শিশু, আর সে ভাবছে, কার সাথে যাওয়া উচিত তার আজ রাতে। এখন পৃথিবী এরকমই। সেইসব শিশুদের মুখ তার চোখে ভাসে, কেবল দুএক মুহূর্তের জন্য। ওরা ড্যান্স ফ্লোরের দিকে চলে যায়।

তারপর সব কেমন অগোছালো, বিচ্ছিন্নময় হয়ে পড়ে। লাবণ্য কোথায় হারিয়ে যায়। কেউ তাকে হাত ধরে নিয়ে গেছে। হামিদ, বা অন্য কেউ। চারদিকে অনেক বঙ্কিম ভ্রূ, তবু কেউ টুকুর সাথে নাই, সে একা এক কোনায় দাঁড়িয়ে তার গ্লাস ধরে আছে, কোনো হৃদয় নয়, হাত নয়। কখন যে তারা ব্রেক আউট রুম ছেড়ে একটা বড় হল রুমে পৌঁছে গেছে, এবং কীভাবে, তা সে নিশ্চিন্তভাবে বলতে পারবে বলে মনে হয় না। আদৌ কি তারা একটা রুম থেকে আরেকটা রুমে এসেছে, না কি রুমটাই নিজে থেকে বদলে, বড় হয়ে গেছে, সকলের অজান্তে? কখনো কখনো টেবিল, খাট, চেয়ার, রুম বা একটা বিল্ডিংকে জীবন্ত মনে হয় টুকুর, মনে হয় তারা নড়ে চড়ে, হাঁটে, রূপান্তরিত হয়, বড় ছোট হয়, কথা বলে, অবিরাম, ঘন ঘন। নিজেকে শ্রীহীন মনে হয় তার। এরকম ভাবে বলেই কি এই মুহূর্তে কেউ তার সাথে নাই? তার চিন্তার ভঙ্গিই তার একাকীত্বের জন্য দায়ী, তার বয়স বা চেহারা নয়। এবং সে লক্ষ্য করে, বিমূর্ত ধারণা নিয়েই সে বেশি ভাবে, এবং মাত্র কয়েকজন মানুষকে নিয়ে। এই মুহূর্তে সে তার ইনক্রিমেন্ট না পাওয়া নিয়েও ভাবছে না। চারপাশে কোথাও যে রফিক ও কৃপাকে দেখা যাচ্ছে না, তারা দুজনে মিলে কোথাও উধাও হয়েছে, এমনকি তাও যেন ভাবনার কোনো বিষয় নয়। তাহলে তুমি কী নিয়ে ভাববে এই মুহূর্তে? এরকম একটি ধারালো ব্লেডের মত প্রশ্ন সে নিজেকে করে। ঠিক তখনই, নিজের প্রশ্নের কোনো উত্তর দেবার আগেই, কোথাও থেকে কৃপা এসে উপস্থিত হয়, এবং তাকে জিজ্ঞেস করে, “এই একা একা কথা বলছ আবার?” তাকে আগের চেয়ে বেশি সজ্জিত মনে হয়। কোনো সাজঘরে কি গিয়েছিল সে ইতিমধ্যে? তার ঠোঁট মারাত্মক লাল লিপস্টিকে রঞ্জিত। এখন যা সে পরে আছে, তাই কি সে পরেছিল সন্ধ্যা থেকে? কারও সাথে গিয়েছিল আশে পাশের কোনো হোটেল রুমে, সাথে এক ছত্র ‘চেঞ্জ অফ ক্লোথস’ নিয়ে? তাকে দেখে মনে হয় সে সদ্য স্নান করা, সদ্য রূপচর্চা করা। নাহ, এসব নয় বোধহয়, হলরুমের আধো-অন্ধকারই তার ভুলভাল চিন্তার উৎস। কৃপা যখন খুব কাছে আসে, তখন তাকে বরং মলিন আর বিষণ্ণ দেখায়, রক্তের মত লাল ঐ লিপস্টিক আসলে লাল নয়, কালো। কৃপাকে যে সে ভালোবাসে তা তার ওষ্ঠরাগ বা অঙ্গসজ্জার চেয়ে বেশি সত্য, সকল সত্যের চেয়ে বড় সত্য, কৃপার বিষণ্ণতা টুকুকে সে কথা মনে করিয়ে দিল। সে কিছুটা কৃপার দিকে সরে আসে, তার ইচ্ছা করে কৃপার ঠোঁটের রঙ, বা রঙহীনতা শুষে নিতে। কৃপা রহস্যের মত উল্লেখ করে, “লাবণ্য কই, লাবণ্য? তোমাকে ছেড়ে চলে গেছে তাহলে? কোথায় গেছে, জানো? হামিদের কাছে চলে গেছে হয়ত, তোমাকে না পেয়ে।”

টুকু, “কি করে জানলে তুমি?”

“জানি। আমার জানা ভুল হয় না।”

“সবার ধারণাই কখনো না কখনো ভুল হয়।”

“ও রে বাবা। তুমি ডিফেন্ড করছ লাবণ্যকে, আমার বিরুদ্ধে গিয়ে? তাহলে থাকো তুমি তোমার নিজের সাথে।” এই বলে কৃপা আবার উধাও হয়ে যায় মাতাল জনারণ্যে।

এই শহরে কোনো কিছু গোপন না, সবাই সব কিছু জানে। কেবল সে ছাড়া। সে প্রায় কিছুই জানে না, অসহায়ের মত মৃদু হেসে এরকম ভাবে টুকু। কিম্বা সে হয়ত আদৌ হাসে না।

আজ একটা অসম্ভব, অনিশ্চিত, অদ্ভুত, অস্বাভাবিক দিন, কিম্বা রাত, কিম্বা অস্বাভাবিক দিন আর রাত, কিম্বা সারাদিনরাত ধরে শুধু অস্বাভাবিক, অদ্ভুত একটি রাত । বার বার বেতন কমা অস্বাভাবিকই, গভীর ধকলের, যে ধকল সামলে নেয়া কষ্টকর। তারপর এই পার্টি। এ আরেক ধকল। এনিগমা। সে তো বাসায় চলে যাওয়ার জন্য মনে মনে প্রস্তুত হয়েই উঠছিল, কিছুক্ষণ পর চলেও যেত, কিন্তু কৃপা তাকে এই পার্টিতে ডেকে আনল। কেন আনল? তা পরিষ্কার নয়। এই সে তার কাছে এসে দাঁড়ায়, এই সে কোথায়-কোথায় উধাও হয়ে যায়। এই তাকে নিকটের মনে হয়, এই মনে হয় সে আমার কেউ না। তারপর লাবণ্য, কত গল্প করল, কিন্তু এখন সে কোথায়? হয়ত চলেই গেছে পার্টি ছেড়ে, হামিদের সাথেই হয়ত, কিন্তু যাবার আগে বলেও গেল না যে যাচ্ছে। হায়, সকলের কাছেই আমি এক বিকল্প? দ্বিতীয় বা তৃতীয় অগ্রাধিকার? আহ, এইভাবে ভেবো না টুকু। যার যার জীবন তার তার। এসবই, এইভাবে আসা আর এইভাবে চলে যাওয়া, ওদের অধিকার। তাহলে আমিও চলে যাই, ভাবে টুকু, আমি গেলে কেউ হয়ত লক্ষ্যও করবে না। এই ভেবে ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে সে দূরে কৃপাকে দেখে। সে অনেকের সাথে ঘুরে ঘুরে কথা বলছে, খুব গ্রেসফুল, খুব লীলায়িত। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে, এক দল ছেড়ে আরেক দলের কাছে যাচ্ছে ঘুরে ঘুরে, যেন সে এই পার্টির হোস্ট। ছোটখাটো এক স্টেডিয়ামের মত বড় এই হলরুম। থরে থরে টেবিল সাজানো, মাঝখানে মাঝখানে অনেক খোলা যায়গা। সামনে মঞ্চ, সেখানে অনেকেই নাচছে, লাইফ ব্যান্ডের সাথে। উপরে নানা রঙের বেলুন, মাঝরাত্র ঘনিয়ে এলো প্রায়। অনেকক্ষণ ধরে সবাইকে অবজার্ভ করে টুকু, অতন্দ্র নজরদারি তার; অন্যদের পর্যবেক্ষণ করতে করতে সে নিজের বেদনা ভুলে যেতে পারে, এই এক ক্ষমতা বা অক্ষমতা তার আছে। এ পার্টিতে সে বহিরাগত, বেমানান আগুন্তক — কিন্তু অনেকগুলো বিয়ার খাওয়া হয়ে গেছে, এখন একবার বাথরুমে যাওয়া দরকার।

বাথরুম। আধো অন্ধকার। প্রশ্রাব করা শেষ। ট্যাপ খুলে বেসিনের আয়নার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে… কে চমকে ওঠে? নিজেকে চিনতে পারে না যে। কে লোকটা? আয়নায় যাকে সে দেখছে সে অন্য কেউ। গভীর নৈরাশ্য ও অবসাদ অনুভব করে টুকু। যেখানে সে দাঁড়ানো, ঠিক সেখানে সে দাঁড়ানো নাই, দাঁড়িয়ে আছে নিজের পিছনে। তার বিদ্যমানতার কোনো অর্থ নাই। সারাদিনের সমস্ত পরাজয়ের ওজন আয়নায় দেখা দিয়েছে। তার মুখ বদলে গেছে, সে অন্য কেউ হয়ে গেছে। আয়নার দিকে তাকিয়ে তার ঘুম পায়। আয়নার দিকে তাকিয়ে কারো ঘুম পায় নাকি? তার পায়। যে তার চেয়ে একটু পিছনে দাঁড়িয়ে আছে, তার দিকে সে তাকায়। তার যা নাই, পিছনের অবাস্তব লোকটার তা হয়ত আছে, যা অবাস্তব তা উল্লেখযোগ্য। কিন্তু পিছনে আসলে কেউ নেই। খোলা ট্যাপ থেকে কুল কুল করে পানি পড়ছে। সেই শব্দে তার অন্যান্য সময়ের কথা মনে পড়ে, কোনো বিকাল বা সন্ধ্যার নীরবতা কিম্বা গভীর রাত্রের বাতাস। কিন্তু পিছনে কিছু নেই; সামনে? সবই পিছনে? তাহলে এখন, এই মুহূর্ত কী? এই বাথরুম? ঐ আয়না? পুনরায় সে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকায়। তার প্রতিবিম্ব আর সে এক নয়। প্রতিবিম্বের অনেক ডাইমেনশন, সে নিজে খুব সাদাকালো। প্রতিবিম্বের চোখের দিকে তাকায়; ভয়ঙ্কর গভীর; ওই গভীরতা তার নাই; ঐ দৃষ্টির পিছনে যে আছে সে অন্য কেউ, তাকে টুকু চেনে না। সে-ই আসল টুকু; সে, এই টুকু, কেউ না। এরকম কল্পনা করে সে। তার মনে হয় কল্পনাতেই সে বিদ্যমান, বাস্তবতায় নেই। এভাবে সে নিজের মুখোমুখি হয়, টয়লেটের আয়নায়, অথবা কার মুখামুখি হয়, তা সে জানে না, অথবা, সে ভাবে, আমি বেশ টিপসি। তাহলে আমার আরও খাওয়া দরকার, কেননা পুরাপুরি মাতাল হওয়া একটা অপশন হতে পারে। আর পুরাপুরি মাতাল হয়ে যেতে পারলে, কে জানে, হয়ত, অনেক কিছুই সম্ভবপর হয়ে যাবে। শেষবারের মত আয়নার দিকে তাকিয়ে তার মনে হয় প্রতিবিম্বের মধ্যে এক নয় অনেককে দেখছে সে। সে মুচকি হাসে। প্রত্যেক মানুষই অনেক মানুষ। সে, “ছাড়ো এসব, আয়নার দিকে তাকিয়ে এসব ভাবা নতুন কিছু নয়।” তাহলে আমি একটু কাঁদব নাকি? কিন্তু সে কাঁদে না। তার প্রতিবিম্ব তাকে অতিক্রম করে চলে যায়, তার পিছনে যে আছে সেও প্রতিবিম্বের সাথে সংহতি প্রকাশ করে। এবং কাঁদে।

হলরুমে ঢোকার পথে রফিক ও কৃপার সাথে দেখা হয়, কোথাও গিয়েছিল, এখন ফিরছে পার্টি রুমে। যেহেতু কৃপা রফিকের সাথে আছে, টুকু কৃপার সাথে কথা বলবে কি বলবে না বুঝতে পারে না, তবু তার দিকে তাকিয়ে হাসে। পার্টি রুমের ভিতরে ঢুকে কৃপা রফিককে বলে, “তুমি যাও। আমার টুকুর সাথে একটা কথা আছে। তুমি এগোও।” রফিক কিছুটা হতভম্ব হয়ে দূরে চলে গেলে কৃপা টুকুর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, “চলো, আমরা এখান থেকে পালাই। এখনই। এখনই। আমি আর পারছি না।“
টুকুর হাত ধরে টেনে তাকে বাইরে নিয়ে আসে কৃপা, এবং মুহূর্তের মধ্যে এলেভেটরের সামনে ওদের দেখা যায়। দুজনেই বেসমেন্টের কার পার্কে নেমে যায়, কৃপা গাড়ির সামনে এসে বলে, “চল আমার বাসায় যাই। আমার এসব টানাটানি ভালো লাগছে না।” কোনো টানাটানির কথা কৃপা বলছে, তা টুকু আন্দাজ করতে পারে। কৃপা ব্যথিত ও উত্তেজিত। আজ রাতে সবাই তাকে চেয়েছে। সবাই ভেবেছে কৃপা সহজলভ্য; এবং আজ রাতেই তাকে পেতে হবে, এই থার্টিফার্স্ট নাইটেই, কেননা এইসব রাতেই সহজ-লভ্যদের আরও সহজে পাওয়া যায়, বেশি সম্ভাবনা এসব রাত। এইসব রাতে পাওয়ার মত মেয়েকে এইসব রাতে না পেলে আর কখন পাবো? টুকু টের পায়, ওরা তাকে, না জেনে না বুঝে, নানা কুপ্রস্তাব দিয়েছে, এবং ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে কৃপার মন। মুহূর্তে সব টের পায় টুকু, এবং কৃপার হাত ধরে, বলে, “হ্যাঁ চলো তোমার বাসাতেই যাই। অন্য কোনো পার্টিতে গেলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।” এই কথা বলে সে কেঁপে ওঠে। সে নিজেও তো চেয়েছে কৃপাকে। কিন্তু তাকে পাবার জন্য, সহজ কোনো পথের দিকে কি গিয়েছে আজ রাতে অন্যদের মত, নিজের অজান্তে? না সে তেমন কোনো অনুচিত অমানুষিক পথে যায় নি, কখনও যাবে না।

কৃপা গাড়ি চালিয়ে ভূগর্ভস্থ কার পার্ক থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নামে। টুকু কৃপার পাশের সিটে, পুনরায়।

পথ
এ শহরের পথ এক ভয়াবহ দোজখ। লক্ষ লক্ষ মানুষ আর যানবাহন বিশৃঙ্খল ভাবে চলছে রাস্তা দিয়ে, ধাক্কাধাক্কি, চিৎকার, চেচামেচি করছে অকারণে, হর্ন বাজাচ্ছে কী এক আক্রোশে। ভিক্ষুকরা গাড়ির দরজায় নক করছে। বছরের শেষদিনে রাত্রির হকাররা জোর করে পথচারীদের, ট্রাফিকজ্যামে আটকে পড়া গাড়ির আরোহীদের গছিয়ে দিতে চাইছে তাদের পণ্য, ফুল বা অন্য কিছু। কেউ কেউ গাড়ির কাচ নামিয়ে গালিগালাজ করছে ভিখারী বা হকারদের। অনেকেই সারি সারি চলন্ত গাড়ির ভিতর দিয়ে রাস্তা পার হয়ে চলে যাচ্ছে নির্বিকারে। হাজার হাজার গাড়ি চলছে বা থমকে থমকে গড়াচ্ছে বা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। এ শহরের রাস্তার ট্রাফিক জ্যাম মাদার অফ অল ট্রাফিকজ্যাম, এই পৃথিবীর, এই শহর পৃথিবীর বসবাস অযোগ্য শহরগুলির মধ্যে অন্যতম। চোখাচোখির যুদ্ধক্ষেত্র এ-শহরের রাস্তা। সকলে সকলের দিকে তীব্র আক্রমণাত্বক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, দৃষ্টি দিয়ে পরস্পরকে মাপছে, যেন কী এক প্রতিযোগিতায় নেমেছে পরস্পরের সাথে, যেন মেরে ফেলতে চাইছে সবাই সবাইকে চোখ দিয়ে, বলছে, আমি তোর থেকে ছোট নই কোনো অংশে। ভিক্ষুক বিক্ষুব্ধ ভাবে তাকিয়ে আছে যে ভিক্ষা দিল না তার দিকে। যে ভিক্ষা দেবে না সে মহা বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে আছে হাতপাতা বা গাড়ির কাচে বার বার নক করতে থাকা অসভ্য ভিক্ষুকের দিকে। পথচারী তাকিয়ে আছে বাসের লোকদের দিকে রেগেমেগে; যে অন্যায্যভাবে রাস্তা পার হচ্ছে, সে রেগে তাকিয়ে আছে গাড়ির লোকদের দিকে, যেন এইভাবে রাস্তা পার হওয়াই সঠিক, গাড়ির লোকদের হর্ন বাজিয়ে বা অন্যভাবে প্রতিবাদ ভীষণ অন্যায়। প্রাইভেট গাড়ির লোকজন খুনে দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পথচারী আর রাস্তা পারাপার-কারিদের দিকে, অন্যান্য গাড়ির যাত্রিদের দিকে। কে কার দিকে কত নিষ্ঠুর, কত কঠোর বা তাচ্ছিল্যভরে তাকাতে পারে তার এক প্রতিযোগিতা চলছে মুহূর্তে মুহূর্তে। কোনো কারণ ছাড়াই সবাই হর্ন বাজাচ্ছে, যে হর্ন, একত্র হয়ে ঊর্ধ্বে উঠে যাচ্ছে, এবং মিল্কিওয়ে থেকে শোনা যাচ্ছে বলে টুকুর ধারণা। কী যে বিপুল ক্ষমাহীনতা, অসভ্যতা চারদিকে। কারও মনে কারও জন্য কোনো দয়ামায়া আছে বলে মনে হয় না। নিষ্ঠুরতার এ এক অনন্য মাত্রা, পৃথিবীর আর কোনো শহরের লোক নিষ্ঠুরতার এই মাত্রায় আজও পৌঁছাতে পেরেছে কিনা জানা নাই টুকুর। হয়ত ভবিষ্যতে পৌঁছাবে। একদিন সারা পৃথিবী যা হবে এই শহর ইতিমধ্যেই তা হয়ে বসে আছে নাকি? নরকের খিচুড়ি পাক করার গরম ডেকচির মত এইসব রাস্তায় নেমে মানুষের গভীর নারকীয় ভবিষ্যৎ যেন দেখতে পাওয়া যায়। মূল্যবোধ ধসে যাওয়ার প্রণতি এই রাস্তা। গ্লানি হয় টুকুর।

কিন্তু আজ রাতে সে রাস্তা নিয়ে ভাবতে চায় না। একটা ভালো ব্যাপার হল এই যে কৃপা রাস্তায় শান্ত থাকে, রাস্তার কোনো ঘটনা, জ্যাম বা ট্রাফিক-নাটক তাকে উত্তেজিত করতে পারে না, যেন সে এই শহরের বা এই পৃথিবীর নয়। এসবে তার মনের অতলতা টের পাওয়া যায়, টুকু টের পায়, বার বার।

কৃপা শান্ত ভাবে সামনে এগুতে থাকে, চারদিকে রিক্সার পর রিক্সা, সারি সারি ভয়ানক সব বাস — এ শহরে এমন কোনো বাস নেই যার বডিতে ডেন্ট নাই — তালগোল পাকানো বিশৃঙ্খল অগুনিত কার, চলমান গাড়ির সামনে দিয়ে দলে দলে রাস্তা পার হতে থাকা পথচারি, মটরবাইক, শত শত সিএনজি, উন্মাদের মত ছুটতে থাকা মটরবাইকগুলো, শুধু রাস্তা নয়, সমানে ফুটপাতের উপর দিয়েও চলছে পথচারীদের তোয়াক্কা না করে, সব সিগনাল অমান্য করে, কখনও পথচারীদের পায়ের উপর দিয়ে, কিম্বা বিভিন্ন পায়ের মাঝখান দিয়ে — সব কিছুর সাথেই কৃপা আপস-মীমাংসা করে নিঃশব্দে, প্রায় ভাবলেশহীনভাবে।
চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে একধরনের ঘুমপাড়ানিয়া ভাব আছে। টুকু চোখ বন্ধ করে এবং ঘুমিয়ে পড়ে, সারাদিনের টেনশনের পর এই ঘুম, যেন ব্রহ্মাণ্ডের শান্ত হাত তার কপাল ছুঁয়েছে, চোখ দুটি বুজিয়ে দিয়েছে, এটা তার খুব দরকার ছিল। কিন্তু, এক মুহূর্ত পরে, একজন বৃদ্ধা ভিখারি আঙুলের গাঁট দিয়ে গাড়ির জানলার কাচে, ঠক ঠক শব্দে ক্রমাগত নক দিতে থাকলে, ভয়ানকভাবে চমকে উঠে ঘুম ভেঙে যায় টুকুর, সে সোজা হয়ে বসে, আচমকা নিবিড় তন্দ্রা থেকে জেগে উঠে সবকিছু সুদূরপ্রসারী অবাস্তবতা মনে হয়, এবং কেন সে জেগে উঠেছে তা বুঝতে পেরে মাথায় আগুন ধরে যায়। কৃপা বুঝতে পেরে তার হাত চেপে ধরে, “এই, শান্ত থাকো, রাগ কোরো না, শি নোজ নো বেটার।” এবং ইশারায় মহিলাকে মাপ করতে বলে। কিন্তু মহিলার মাপ করার কোনো ইচ্ছা নাই; সে নক করতেই থাকে, নকের শব্দ বাড়তে থাকে, বৃদ্ধা মহিলার চেহারায় বিরক্তি, অসহিষ্ণুতা ও রাগ, যেন বলছে, “থার্টিফারস্ট নাইটে মজা মারছ, কিন্তু ভিক্ষা দিবা না, ফাইজলামি পাইছ?” সিগনালের জট খোলার আগ-মুহুর্তে কৃপা জনালার কাচ নামিয়ে, টুকুর উপর দিয়ে ঝুঁকে, তাকে দশ টাকা দেয়। এ শহরে এখন কাজের অভাব নেই, চেষ্টা করলে অনেক রকম কাজ পাওয়া যায়। তবু এই মহিলা, তার বয়স হয়েছে, কিন্তু কাজ সে পাবে, বা এরকম আরও অনেকেই ভিক্ষা করা চালিয়ে যাচ্ছে। এ এক প্রাগৈতিহাসিক অভ্যাস ও আলসেমি, কোনো পরিশ্রম করতে না চাওয়া। অথবা সে প্রফেশনাল ভিখারিও হতে পারে, হয়ত জড়িয়ে আছে নানান ভাগ বাটোয়ারায়। অনেক সিন্ডিকেট আছে যারা মানুষের শরীর বিকৃত করে তাদের দিয়ে ভিক্ষা করায়। নানাভাবে মানব-শরীর বিকৃত করে, সেসব দেখানোই তাদের মার্কেটিং। শুক্রবার এরা গড়িয়ে গড়িয়ে রাস্তা দিয়ে যায় নানা সুরে কোরাস গাইতে গাইতে; মসজিদের আশে পাশে ভিড় করে। সেসব টুকুর চোখে ভাসে, মহিলার আঙুলের গাঁটের অমানবিক আচরণে টুকুর তন্দ্রা পুরাপুরি কেটে গেছে। ভয়ঙ্করভাবে চিৎকার করতে ইচ্ছা করলেও সে কিছু না বলে চুপচাপ বসে থাকে।
অবশেষে ওরা কৃপার বাসার সামনে পৌঁছায়। তবে, পৌঁছাতে নাও পারত। এ-শহরের পথে নামা যত সহজ, পথ পার হয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো তত সহজ নয়।

কৃপার ভাড়া করা, ফ্রি ফারনিশড ফ্ল্যাট, অনুকূলভাবে সুরক্ষিত বড়লোক আবাসিক এলাকার ভিতরে, একটা ছয়তলা বিল্ডিং-এর পাঁচতলায়, অবস্থিত। গাড়ি পার্ক করে লিফট পর্যন্ত পৌঁছানোর মধ্যে কোনো দারোয়ান-নাটক হয় না। এ শহরের যে সব মেয়েরা একা থাকে, তাদের সবার দিকে, বাড়ির দারোয়ানের রংরসপূর্ণ সন্ধানী দৃষ্টি সদা সোহাগে খোলা, কৃপা বা লাবণ্যের কাছ থেকে নানা গল্প শুনে টুকুর তা জানা আছে। কৃপার বাসায় এর আগে সে এসেছে, দারোয়ানটিকেও সে দেখেছে। কৃপার কাছ থেকে তার নানান কীর্তি-কাহিনী শুনে লোকটাকে তার বেশ পরিচিতই মনে হয়, যদিও তার সাথে কোনোদিন তার কথা হয় নি। আজ দারোয়ান কেমন বিষণ্ণ ভঙ্গিতে একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকে, কাছে এসে কোনো প্রশ্ন করে না, কিছু বলে না, হাসেও না দূর থেকে। যেন সে ভবিষৎদ্রষ্টা, এমন কিছু সে এখন দেখেছে যা তাকে বাক্যহারা করে দিয়েছে।

লিফট আসে, লিফটে শুধু ওরা দুজন। পরস্পরের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। কৃপা মুখ তুলে টুকুর দিকে তাকায়, একটু হাসে। তার চোখে কি আহবান? কেঁপে ওঠে টুকু। কৃপা চাচ্ছে সে তাকে চুমু খাক, এই ভেবে সে কৃপাকে চুমু খায়, চুম্বনরত অবস্থায় কৃপা কিছু বলার চেষ্টা করে, কিম্বা সে রকম নয়। কয়েক যুগ পার হয়ে যায়, তবু চুম্বন শেষ হওয়ার আগেই লিফট পাঁচতলায় আসে। কৃপা বলে, “এ কী অবাস্তবতা।” কী সে বোঝায় এই মন্তব্যে তা অস্পষ্ট হয়েই থেকে যায় টুকুর কাছে। আজীবন।

তার ঘরে
ঘরে ঢুকে, দুইজন একটি সোফার দুই কোনায় বসে। দুএক মুহূর্ত কেটে যায়। দুজন দুজনের দিকে, ম্রিয়মাণ মানুষের মত তাকায়, এবং হাসে। এই হাসিটার দরকার ছিল। সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর হয়। এক মুহূর্তে দুজন সোফার মাঝখানে আসে এবং পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে। ওদের দেখে মনে হয়, কে দেখে ওদের?, মহা সমুদ্রে জাহাজডুবি হয়েছে, ওরা অকুল পাথারে ভাসছে, কিন্তু ডুবে মরতে চাচ্ছে না, তাই এই আলিঙ্গন, এবং পরস্পরকে জড়িয়ে ধরাই ভেসে থাকার একমাত্র উপায়।

একটু পরে ওরা লিপ্ত হয়ে ভালোবাসে।

ভালোবাসা কি বলা যায় একে? হ্যাঁ ভালোবাসাই তো। ভালোবাসা ছাড়া আর কী? টুকু যখন কৃপাকে নগ্ন করছিল, তখন সে অস্ফূটে বলে, “না, না।” পরে, “আমার মাতাল অবস্থার সুযোগ নিচ্ছ কমরেড? কেউ দেখছে না বলে? নাও তাহলে।”
তবু মনে হয়, এ প্রেম, অন্য কিছু নয়। জীবনই সেই আকুল পাথার এবং মহা সমুদ্র, যেখানে মানুষের জাহাজ প্রতিদিন ভেঙে যায়, প্রতিদিন গড়ে ওঠে। কত পথ ঘুরে, কত অন্ধকার স্রোত পার হয়ে এইখানে এই ভালোবাসায় পৌঁছাতে হল ওদের। তবু পূর্ণতা কি পেয়েছে ওরা এই মুহূর্তে? পেয়েছে, আবার পায় নি। কেমন অপূর্ণ হয়ে আছে, যেন পুরাপুরি পাওয়া যাচ্ছে না পরস্পরকে, পুরাপুরি কোনোদিন পাওয়া যায় না, দ্বিতীয়বারের মত কৃপাকে কাঁদতে দেখে টুকু, তখনও তারা সঙ্গমরত। বিহবল টুকু কৃপার চোখ মুছে দেয়।

প্রথম মিলন যেন ইচ্ছার বিরুদ্ধে শেষ হয়ে যায়। দ্বিতীয় মিলনের সময় মনে হয় সবকিছু শ্লো মোশনে চলছে, ওরা যেমন চায়, যেভাবে চায়, সব সেভাবেই হচ্ছে, ওদের সময় অনেক। পরস্পরকে নিয়ে যেন এক গভীর গবেষণায় লিপ্ত ওরা, হারিয়ে যাওয়া কোনোকিছু খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায় পরস্পরের অন্ধকারে, আলোয়, নামছে ত নামছেই। কোনো এক অনতিক্রম্য বেদনাকে অতিক্রম করবার, পুষিয়ে দেবার চেষ্টা করছে। সব যেন চরম, তীব্র ও অশেষ। যত অন্বেষণ, তত তীব্রতা, তত পাওয়া, তত না পাওয়া, তত অন্বেষণ, তত তীব্রতা। ছাদ, মেঝে, বিছানা, সব ঘুরছে।

এ শহরে সব ঘরই কোনও না কোনও পথের পাশে, তুমি পাঁচ তলার উপরে থাকো, বা দশ তলায় — ঘরে থেকে পথের শব্দ শুনবেই। কিন্তু কিছুক্ষণের জন্য ওরা সেই পথকেও এমনকি শুনতে পায় না। নিজেদের নিঃশ্বাসের শব্দও শোনে না।

পরে একসময় টুকু বলে, “তোমার কোনো কিছু ছোট নয়, সব গোল এবং পূর্ণ… ।” কয়েকদিন আগের এক বিকালের কথার দিকে ইঙ্গিত করল সে। কৃপা হাসে, বলে, “এখন আমাতে মজে আছো, তাই আমার সব তোমার পূর্ণাঙ্গ লাগছে। একসময় আর লাগবে না।” টুকু অনেকক্ষণ শুয়ে থেকে বলে, “সেই সময় তো আসতে দেয়া যায় না” এবং ওরা আবার মিলিত হয়। কিন্তু যতবারই ওরা মিলিত হোক না কেন, প্রতিবারই প্রথম বার মনে হয়, কারণ নতুন কিছু পেয়ে যায় প্রতিবার।

ওরা টের পায়, যত চেষ্টাই করুক, পরস্পরকে সম্পূর্ণভাবে পাবে না ওরা, সেরকম পাওয়া যায় না এই পৃথিবীতে। কারোর সব কিছু কেউ পায় না, উপভোগ করতে পারে না। যতবারই ওরা মিলুক না কেন, বহু কিছু পাওয়ার বাইরে থেকে যাবে।

কৃপা শেষ রাত্রের দিকে বলে, “এখন তুমি জানো। জানো না? এখন তোমার হাতে এই প্রমাণ।” সারারাত ওরা জেগে থাকে, এবং বিক্ষিপ্তভাবে কিছুটা ঘুমায়।
#

Write A Comment