অধিকাংশ লেখকের মতো নভেলাকে উপন্যাস বলে চালাতে রাজি নন চঞ্চল আশরাফ

কবি ও লেখক চঞ্চল আশরাফ একটি নভেলা লিখেছেন। ঈদসংখ্যার জন্য তিনি এই ফিকশনটি লিখেছেন। তবে কোন ঈদসংখ্যার জন্য, তিনি বলেন নি।

১৮ দিনে লেখা এই নভেলার নাম ‘বেইলি রোড’। পরে এটি বই আকারে প্রকাশিত হবে। বেইলি রোডের বিষয়বস্তু কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে এক বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যে জড়িত হতে চায়। অথবা নিজেকে জড়িত ভাবতে চায়। আর জড়িত আছে কি-না তা বুঝতে গিয়ে সে আরো বিচ্ছিন্ন হতে থাকে।

হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাস লিখতে পারেন নি, লেখার চেষ্টাও করেন নি। উনি তো এগুলি উপন্যাস ভেবেই লিখেছিলেন! বাজারের নানা ডামাডোলে বাঙালি ভুলেই গেছে যে উপন্যাস কাকে বলে। হুমায়ূন আহমেদ আসলে লিখেছেন ডায়ালজিক ফিকশন। সংলাপের পর সংলাপ। আর ডান দিকটা তো সাদাই থেকে যায়। কোনো ডিটেইলিং নাই।

ব্যক্তিটি তার স্ত্রীর কাছ থেকেও দূরে সরে যায়। এমনকি যে নারীর প্রতি তার আবেগ ছিল বলে সে ভাবত, তার কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রচলিত কথাসাহিত্যে যেমন থাকে, এই নভেলায় ঘটনা বলে কিছু নেই, পরিণতি নেই। তবে ব্যক্তি অপেক্ষা করে ঘটনার জন্যে। চরিত্রের থেকে মানুষের সম্পর্ক ও সম্পর্কহীনতার ভেতরচেহারা এই নভেলার মূল বিষয়। এক কথায় ব্যক্তির মানসিক বিচ্ছিন্নতার দর্শন ।

পড়ুন ‘বেইলি রোড’ নভেলার কিছু অংশ:

নিজের অক্ষমতা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে অঞ্জন, মরুভূমির কোনও বাসিন্দা যেমন নদীতীরের মানুষের কাছে শস্যের গল্প শুনে অপ্রাপ্তি ও ঈর্ষায় অন্যমনস্ক হয়ে যায়, এই মুহূর্তে তাকে ঠিক সেরকম দেখায়। রীতা দরজায় দাঁড়িয়ে বলে, ‘সব ঠাণ্ডা হয়ে গেল, ওষুধ খাবে কখন!’ এইমাত্র তার মনে হয়, অন্তত একটা বিষয়ে সে নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারবে না- দূরে স’রে গেলেও যে শুশ্রূষা রীতা তাকে দিচ্ছে, বা দিতে গিয়ে তার প্রতি লকলকিয়ে ওঠা এত দিনের সমস্ত সন্দেহ ও ঘৃণাকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে, তা যদি অসুস্থ হওয়ার আগে অনুমান করা যেতো — এটা কেন তার পক্ষে সম্ভব হলো না!

 

…ঢেউয়ের পর ঢেউ আসে আর তার শরীরের তলা দিয়ে তীরে আছড়ে পড়ে; অনেক মুহূর্ত পার ক’রে ভাটার টান বুঝে ওঠার আগে প্রতিবারই এক অনির্ণেয় আচ্ছন্নতায় ডুবে থেকেছে, যেন সে বিপুল ও সংখ্যাতীত সমুদ্রতরঙ্গের ওপর ব’সে আছে — শুধু এই অনুভবে জীবন কাটিয়ে দিতে পারে, পারে না। নিজের বুকের উপর দু’হাত রেখে শুয়ে থাকে অঞ্জন, তার মনে হয় যে, সেই সন্ধ্যায় সে কলাতলীতে গিয়েছিল না, আসলে পৃথিবীর কোথাও সে যায়নি, কখনও না; কিন্তু কোথাও যাওয়ার ছিল তার, অথবা ছিল না; বা, কেউ আসলে কোথাও যেতে পারে না, নিজের জন্য নির্ধারিত ও অনিবার্য স্থবিরতা থেকে কখনও কখনও মাথা দোলায়, হাত-পা নাড়ে, নতুন কোনও দৃশ্য দেখার পর ভাবে, বেশ তো জায়গাটা!

 

…খুব তীব্র বেগে হাওয়া বইছে, এত বাতাস আসে কোত্থেকে? সমুদ্রঘূর্ণি, না শূন্যতা থেকে? সব পাতা না ঝরিয়ে এই হাওয়া থামবে ব’লে তো মনে হয় না। এক অবর্ণনীয় তীব্রবিপুল তাণ্ডবের মধ্যে, উড়ন্ত-অস্থির ঝরাপাতার মধ্যে দিকহারা ও বিপন্ন ক’রে তা উপভোগ করার জন্য তারেক আর জয়া তাকে এখানে বসিয়ে বেখেছে? এগারো দিন আগে নিজের উরুতে যে-জ্বলন্ত সিগারেট ঠেসে ধরেছিল, বা, যে-সিগারেট তাকে দিয়েছিল চার বছর আগের এই রাতে, অঞ্জন ভাবে, তা কি জয়ার হাতে আজ উঠে এলো নতুন এক সর্বনাশের সঙ্কেত নিয়ে? নিজের দহনক্ষত থেকে কী অনুভূতি গোপন হাহাকারের মতো নির্বুদ্ধিতা নিয়ে জেগে উঠতে পারে, পরীক্ষা করতে গিয়ে, যেন কেউ দেখে না ফেলে এমনভাবে, উরুর সেই পোড়া জায়গায় সে হাত রাখে। বলে, ‘অনেক রাত হয়ে গেছে, আমাকে উঠতে হবে।’

‘বেইলি রোড’ কেন নভেলা হলো এই প্রসঙ্গে লেখক বলেন, “নভেল বলতে যা বোঝায় এটা তা না। এটা হচ্ছে বড় গল্পের চেয়ে বড় কিন্তু উপন্যাসের চেয়ে ছোট। প্রথমত, আমি আয়তনের কথা বলছি। এটা বই আকারে বের হলে আয়তন আরো বাড়বে হয়তো। এটি নভেলা কারণ, নভেলের বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি এতে নেই। যদিও আমাদের এখানে উপন্যাস নামের অনেক রচনা উপন্যাসই নয়, অধিকাংশই নভেলা। অনেক সময় তাও না। সেগুলোর বেশির ভাগকেই ঈদসংখ্যায় উপন্যাস বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। এই কাজটা আমি করতে পারি নি। নভেলাকে উপন্যাস বলে চালিয়ে দিই নাই।

চঞ্চল আশরাফ, জন্ম. দাগনভুঁইয়া, ফেনী ১২ জানুয়ারি, ১৯৬৯ । ছবি. তারিকুল ইসলাম মিঠুন ২০১৩

চঞ্চল আশরাফ, জন্ম. দাগনভুঁইয়া, ফেনী ১২ জানুয়ারি, ১৯৬৯ । ছবি. তারিকুল ইসলাম মিঠুন ২০১৩

তিনি বলেন, “ব্যক্তির সমম্যা নিয়েই তো উপন্যাস। ব্যক্তি তার সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য সংগ্রাম করে। সেই সংগ্রামের সাথে একটি সমাজ এবং আরো অনেক বিষয়আশয় জড়িয়ে যায়। কিন্তু এই নভেলায় তেমনটি ঘটে নি। ব্যক্তি তার সংকট নিয়ে নিজের মধ্যে নিমজ্জিত হতে হতে একেবারে আউটকাস্ট হয়ে পড়ে। বড় একটা পটভূমি নিয়েই গড়ে ওঠে উপন্যাস। বেইলি রোড এ ব্যাক্তির সমস্যা আছে, উত্তরণের সংগ্রামও আছে কিন্তু সামগ্রিকতার দিকে এটা যাচ্ছে না। বিচ্ছিন্নতার একটা রূপক হয়তো সৃষ্টি হয়েছে এতে। এইসব বিবেচনায় এটাকে উপন্যাস বলা যায় না। ফলে বৈশিষ্ট্য ও আয়তনের দিক থেকে এটা নভেলা।”

বেইলি রোড এ ব্যাক্তির সমস্যা আছে, উত্তরণের সংগ্রামও আছে কিন্তু সামগ্রিকতার দিকে এটা যাচ্ছে না। বিচ্ছিন্নতার একটা রূপক হয়তো সৃষ্টি হয়েছে এতে। এইসব বিবেচনায় এটাকে উপন্যাস বলা যায় না।

নভেলাটি কয় পৃষ্ঠার তা মনে না থাকলেও লেখক জানালেন, এটি প্রায় সাড়ে দশ হাজার শব্দের মধ্যে লেখা। লেখক মার্কেজের লেখা সম্পর্কে বলেন, মার্কেজের কিন্তু অধিকাংশ রচনাই নভেলা। যেমন, ‘মেমোরিজ অব মাই মেলাংকলি হোরস’।

আমাদের দেশের উপন্যাস সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “উপন্যাস আসলে আমাদের বাংলা ভাষায় বছরে দু একটা লেখা হলেও হতে পারে। কিন্তু তাতেও সন্দেহ আছে। একটা জাতির জীবনে বছরে যদি দুইটা উপন্যাস লেখা হয়, মানে দশ বছরে বিশটা উপন্যাস, তাহলে তো সাহিত্যে বিপ্লব ঘটে যাওয়ার কথা। একটাও যদি হয় টেনেটুনে, এইসব ঈদসংখ্যায় আমরা উপন্যাস লিখে ভরিয়ে ফেলছি কই কোনো বিপ্লব তো দেখছি না গত পঁচিশ বছরে।”

উপন্যাস আসলে আমাদের বাংলা ভাষায় বছরে দু একটা লেখা হলেও হতে পারে। কিন্তু তাতেও সন্দেহ আছে। একটা জাতির জীবনে বছরে যদি দুইটা উপন্যাস লেখা হয়, মানে দশ বছরে বিশটা উপন্যাস, তাহলে তো সাহিত্যে বিপ্লব ঘটে যাওয়ার কথা।

হুমায়ূন আহমেদের নভেল প্রসঙ্গে লেখক বলেন, হুমায়ূন আহমেদ উপন্যাস লিখতে পারেন নি, লেখার চেষ্টাও করেন নি। উনি তো এগুলি উপন্যাস ভেবেই লিখেছিলেন! বাজারের নানা ডামাডোলে বাঙালি ভুলেই গেছে যে উপন্যাস কাকে বলে। হুমায়ূন আহমেদ আসলে লিখেছেন ডায়ালজিক ফিকশন। সংলাপের পর সংলাপ। আর ডান দিকটা তো সাদাই থেকে যায়। কোনো ডিটেইলিং নাই। অবশ্য কিছু মজার মজার কেরিকেচার আছে। পাঠক হয়তো এগুলো পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়লো, ভাবলো বিকালটা ভালোই গেল।

চঞ্চল আশরাফ বেইলি রোড নভেলাটি ১৮ দিনে লিখে শেষ করলেও এই ১৮ দিনের মাঝে ২-৩দিন তিন অন্য কিছু লিখেছেন। প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০-৬০০ শব্দ লিখেছেন।

চঞ্চল আশরাফের সর্বশেষ বই সাহিত্যের পরিভাষা প্রথম ভাগ বের হয়েছে রোদেলা থেকে। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে।

Flag Counter

About Author

নওয়াজ ফারহিন অন্তরা
নওয়াজ ফারহিন অন্তরা

স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ছেন। জন্ম- ঢাকা, মে ১৯৯৩।