অরূপ ভট্টের ওয়াইফাই জোন

দেখবেন হারুনের টি স্টল থেকে হোসেনের মুদি দোকান পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে অসংখ্য ইয়াংবয়সী ছেলে। প্রত্যেকেই হাতে স্মার্টফোন নিয়ে উবু হয়ে বসে আছে।

কখনো যদি বিকেলের দিকে আমাদের এলাকায় আসেন—দেখবেন হারুনের টি স্টল থেকে হোসেনের মুদি দোকান পর্যন্ত রাস্তার দু’ধারে অসংখ্য ইয়াংবয়সী ছেলে। প্রত্যেকেই হাতে স্মার্টফোন নিয়ে উবু হয়ে বসে আছে। বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত আপনি এই সমাবেশ দেখবেন। সমাবেশটা ‘অরূপ ভট্ট’ নামের একটা বেনামি ফ্রি ওয়াইফাই জোনকে কেন্দ্র করে বেশ অনেকদিন ধরে জমজমাট হয়ে আছে। অত্র এইটুকু জায়গায় এসে উল্লিখিত তিনটি ঘণ্টাজুড়ে চাইলে আপনিও অরূপ ভট্টের ফ্রি ওয়াইফাই জোনের একজন—গর্বিত কিনা জানি না তবে —ব্যবহারকারী হতে পারেন।

কে প্রথম ফ্রি এই ওয়াইফাই জোন আবিষ্কার করেছিল, বলা মুশকিল। তবে অরূপ ভট্ট সম্পর্কে কারো কাছ থেকেই বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। শুধু হারুন টি স্টলের হারুন ভাই আর হোসেনের মুদি দোকানের হোসেন ভাই—এ দুজনের দাবি, অরূপ ভট্টের সঙ্গে তাদের চেনাজানা ছিল।

কেমন ছিল সেই চেনাজানা?

হারুন ভাইয়ের ভাষ্যে, লোকটা একটু গম্ভীর ধরনের ছিল। বছর খানেক আগে প্রতিদিন বিকেল চারটায় একটা ল্যাপটপসহ সে তার দোকানে এসে বসত। কানে হেডফোন লাগিয়ে কারো সঙ্গে কথা বলত। এবং সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত টানা কথা বলে যেত সে। এতে হারুনের যেন লস না হয় সেজন্য সারাক্ষণই চা, সিগারেট কিংবা হালকা নাস্তা পানির অর্ডার করতে থাকত।

হোসেন ভাইয়ের ভাষ্যের আগে তার মুদি দোকান সম্পর্কে একটু ভূমিকা দেওয়া প্রয়োজন। সেটা হলো, হোসেন ভাইয়ের মুদি দোকান এই এলাকার একমাত্র মুদি দোকান, যেটা সারারাত খোলা থাকে। সারাদিন তার বড় ছেলে দোকানদারি করে বাসায় ফিরে গেলে নৈশদোকানদারির উদ্দেশ্যে দোকানে এসে বসেন চির অনিদ্রার রোগী হোসেন ভাই। আমরা যারা বেশি রাত করে বাসায় ফিরি—বহুদিন ধরেই হোসেন ভাই আমাদের জন্য এক ধরনের আশির্বাদ হিসেবে বহাল আছেন।

তো হোসেন ভাইয়ের ভাষ্যেও, লোকটা একটু গম্ভীর ধরনের ছিল। ফজরের আজানের ঠিক আধা ঘণ্টা আগে অরূপ ভট্ট তার দোকানে আসত। বেশির ভাগ সময়ই সিগারেট, বিস্কিটের প্যাকেট আর যে কোনো একটা কোল্ডড্রিংক কিনত। কানে থাকত হেডফোন। দোকানের সামনের সিঁড়িতে বসেই বিস্কিট আর কোল্ডড্রিংকটা শেষ করত সে। খেতে খেতে কথা বলত। শেষে সিগারেট টানতে টানতে এবং কথা বলতে বলতেই বিদায় নিত।

হারুন এবং হোসেন, দুজনের প্রতিই আমার প্রশ্ন ছিল, লোকটার নাম যে অরূপ ভট্ট সে ব্যাপারে তারা নিশ্চিত হলো কীভাবে। পরীক্ষা করতে চেয়ে হারুনের এবং হোসেনের কাছে আমি আমার নাম জানতে চাইলাম। দেখা গেল হোসেন আমার নাম জানলেও, অনেক দিনের কাস্টমার হওয়া সত্ত্বেও হারুন আমার নাম বলতে পারল না। ফলে এই ব্যাপারটা রহস্যময় যে, দুজনের কেউই মনে করতে পারল না কীভাবে অরূপ ভট্টের নামের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে তারা।

একটা সম্ভাবনা ছিল যদি বাকির খাতায় নাম থাকে, কিন্তু তন্ন তন্ন করেও কোথাও সে নাম খুঁজে পাওয়া গেল না। ধরে নিলাম, হয়ত নিজেই কখনো কোনো প্রসঙ্গে বলে থাকবে। যদিও এই ধরে নেওয়া খুব একটা মজবুত ধরে নেওয়া না। তবে, বিশেষত, হারুনের দেওয়া টাইম ফ্রেমটাকে যদি বিবেচনায় আনি, তাহলে এই ধারণাই পোক্ত হয় যে, বর্তমানে বিখ্যাত ফ্রি ওয়াইফাই জোনের মালিক অরূপ ভট্টই তার দোকানে আসত। সম্ভবত ভট্ট সাহেব স্কাইপে কারো সঙ্গে কথা বলত, আর ওই প্রয়োজনেই চাহিদামাফিক রেন্জের মধ্যে নিজের একটা ওয়াইফাই জোন তৈরি করে নিয়েছিল।

সেক্ষেত্রে হোসেন ভাইয়ের কাছে আমার জিজ্ঞাসা ছিল, ফজরের আজানের আধা ঘণ্টা আগে এসে ভট্ট সাহেব কতক্ষণ থাকত? জানা গেল, ঠিক ফজরের আজান পর্যন্তই নাকি থাকত। হুট করে উঠে বিল মিটিয়ে ফিরে যেত। হারুনের টি স্টল থেকে বেরিয়ে সে যেদিকে ফিরত, আর হোসেনের দোকান থেকে উঠে সে যেদিকে ফিরত—দিক দুটো পরস্পরবিরোধী। অর্থাৎ অরূপ ভট্ট থাকত (বা এখনো আছে) এ দুই দোকানের মাঝামাঝি কোথাও।

আমিও দুয়েকবার অরূপ ভট্টের ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবহার করেছি। বিশেষত লন্ডনপ্রবাসী ফেসবুক ফ্রেন্ড ও পরবর্তীতে তারচেয়েও বেশি কিছু হয়ে উঠতে উঠতেও আর হয়ে না ওঠা প্লেভার সঙ্গে যখন স্কাইপে কথা হতো—তখন। অবশ্য অরূপ ভট্টের মতো আমি ল্যাপটপ নিয়ে ঘুরতাম না, স্মার্টফোনেই স্কাইপ ইনস্টল করে নিয়েছিলাম। আর সেই সূত্রেই ভাবনাটা মাথায় এলো, ভোররাতে হোসেন ভাইয়ের দোকানের সিঁড়িতে বসে অরূপ ভট্ট কি ফোন কলই করত, নাকি সেগুলোও স্কাইপ কল ছিল?

সন্দেহ দূর করতে একদিন রাত সাড়ে চারটায় আমিও হোসেন ভাইয়ের দোকানের সিঁড়িতে গিয়ে বসি। আর ফোনে ওয়াইফাই সার্চ করে বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে সীমাবদ্ধ ওয়াইফাই জোনের আরেকটি ফ্রি টাইম ফ্রেম আবিষ্কার করি।

ব্যাপার হলো আমার সেই প্রেম না হওয়া লন্ডনী প্রেমিকা প্রায়ই মনের ভুলে আমাকে অরূপ অরূপ বলে ডাক দিয়ে ফেলত। এটা অবশ্য এজন্য হতে পারে যে আমার নিজের নামও এর খুব কাছাকাছি—আরিফ। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা খুব অপমানজনক ছিল আমার জন্য। এতে আমার মধ্যে স্পষ্ট সন্দেহ তৈরি হয় যে, নিশ্চয়ই আমার আগে প্লেভার অরূপ নামের কারো সঙ্গে সম্পর্ক ছিল, আর বলাবাহুল্য এখনো তাকে ভুলতে না পারার জ্বালাগুলোই আমার ওপর প্রেম হয়ে বর্ষিত হচ্ছে; যেটা মেনে নেওয়া কঠিন। কিন্তু প্লেভা কিছুতেই এমনকি এটাও স্বীকার করে নি যে অরূপ নামে কাউকে সে অন্তত চিনত কখনো। এ নিয়ে দুয়েকবার আমাদের মধ্যে উল্লেখ করার মতো ঝগড়াঝাটি হওয়ার পরও নিয়মিত বিরতিতে সে যখন মাঝে মাঝেই আমাকে অরূপ সম্মোধন করে বসতে থাকল, সম্পর্কটাকে টেনে নেওয়াই আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াল। আর কে না জানে, শেষ পর্যন্ত সেটাই ছিল আমাদের ব্রেকআপের প্রধান কারণ।

কিন্তু যে কারণে সাম্প্রতিক এই গোয়েন্দাগিরি—তা হলো; আমার বন্ধু সাদলী ও তার প্রেমিকা ইতি। সাদলী-ইতির প্রেম কাহিনী নিয়ে নতুন করে কিছু বলার দরকার আছে বলে মনে করি না। ছয় মাস আগের জাতীয় দৈনিকগুলো ঘাটলেই ওই সংক্রান্ত সকল খবর এমনিতেই পেয়ে যাবেন।

ঘটনার পর পরই স্কলারশিপ নিয়ে ইতি অস্ট্রেলিয়া চলে গেল। সপ্তাহ দুয়েক আগে বদলি সংক্রান্ত কী একটা কাজে সাদলী যখন ঢাকায় আসে, বরাবরের মতোই আমার বাসায় ওঠে। এটা অলিখিত, কিন্তু ধ্রুব, আমি চট্টগ্রাম গেলে কিংবা সাদলী ঢাকায় এলে—পরস্পর পরস্পরের বাসায় একধরনের হালকা চালে আমরা উঠে পড়ি। তো সারা রাতের আড্ডা শেষে ভোরের দিকে উত্তেজিত হয়ে সাদলী জানাল ওর ল্যাপটপে অরূপ ভট্ট নামের একটা ওয়াইফাই জোন কানেক্ট হতে চাইছে। ভেবেছিল পাসওয়ার্ড প্রটেক্টেড হবে, কিন্তু ক্লিক করতেই কানেক্ট হয়ে গেছে। ঘড়িতে সাড়ে চারটা বাজে দেখে ‘আমি তো আগেই জানতাম’-সুলভ একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিই আমি। বলা বাহুল্য, শুয়ে পড়ার আগে একবার ইতির সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ফ্রি ওই নেটওয়ার্কই ব্যবহার করেছিল সাদলী।

আশা করি ইতোমধ্যেই বা কিছুক্ষণ আগে থেকেই আন্দাজ করতে পারছেন যে, সাদলীর ভাগ্যেও এক্ষেত্রে কী ঘটেছিল। হ্যাঁ, ইতিও সাদলীকে সামান্য অন্যমনস্কতায় অরূপ বলে ডাকতে শুরু করে দিয়েছে। আর সেইসূত্রে সাদলীও একরকম নিশ্চিত হয়ে পড়েছে যে, অস্ট্রেলিয়ায় ইতির সঙ্গে সম্প্রতি যেই ছেলেটার ঘনিষ্ঠতা হয়েছে, ওর নাম অরূপ। সেদিন ফোনে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সাদলীর কান্নাকাটি শুনে আমি থ হয়ে যাই। আর ওর ভুল ভাঙাতে গিয়ে টের পাই যে, আমার নিজের ভুলও ভেঙে গেছে। মূলত, একই রকম চেহারার এ দুটো ঘটনাই আমাকে উক্ত গোয়েন্দাগিরিতে নিযুক্ত করে।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই সূত্রেও ঘটনাটাকে বেঁধে ফেলা যায় নি। হারুনের টিল স্টল থেকে হোসেনের মুদি দোকান পর্যন্ত রাস্তায় উবু হয়ে থাকা অনেকের সঙ্গে কথা বলেও; তাদের পরিচালিত সম্পর্কগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো জটিলতার প্রমাণ বা স্বীকারোক্তি আদায় করতে পারি নি। প্রধানত আমার প্রশ্ন করার ধরনটাই ছিল হাস্যকর, “আপনার প্রেমিকা কি ভুল করে আপনাকে অরূপ নামে ডাকে?” দুয়েকজন তো ফ্রি ওয়াইফাই ব্যবহার করার খোঁটা হিসেবে নিল প্রশ্নটাকে, তেড়ে এসে মারতেও চাইল একজন। ফলে বিপদজনক এই জিজ্ঞাসাবাদ বন্ধ করতে হয়েছে। তবে আমার এবং সাদলীর দৃঢ় বিশ্বাস, এদের মধ্যেই কেউ কেউ, কিংবা কে জানে, হয়ত সবাই একই সমস্যায় আক্রান্ত।

আক্রান্ত ইতিকে সহজভাবে মেনে নিয়েছে সাদলী। আমিও প্লেভাকে মেসেজ পাঠিয়েছি, জানিয়েছি আমার ভুলের কারণেই ও আজ আক্রান্ত। একটু আগেই দেখি ও রিপ্লাই করেছে, its too late arup!

More from তানিম কবির

জুঁই

যখন ট্রেন ছাড়ল, আমার জানালা ঘেঁষে প্লাটফর্ম ধরে হাঁটতে হাঁটতে কথাটা ও...
Read More