অা নাইট উইথ ব্রাত্য রাইসু

রাইসু বলল, সেও নাকি রাতে হাসপাতালে থাকবে! এটা শোনামাত্র আমার প্রিয় বন্ধু “টা টা” বলে চলে গেল।

১.
আমার বন্ধু ঊর্মির বন্ধু ইমরান গুরুতর অসুস্থ। নাকে নল, হাতে স্যালাইন সহযোগে ঢাকা মেডিকেলে শুয়ে আছে। আমার যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

হাসপাতালে গেলে আমি অসুস্থ হয়ে যাই। যাকে দেখতে যাই তার পাশের বেডে আমাকে ভর্তি করাতে হয়। এইজন্য কোনো বন্ধু,বান্ধব,আত্মীয়,স্বজন ভয়ানক অসুস্থ হলেও আমি হাসপাতালে যাই না। কেউ কিছু মনেও করে না।

কিন্তু ইমরানের ব্যাপারটা আলাদা। এইখানে তার কোনো বন্ধু নাই। যা আছে সব ফেসবুকে, তাও সবই আবার লেডিস। তাদের সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে ঘরে ঢুকতে হয়। ইমরানের আম্মা থাকেন চট্টগ্রাম।

সেদিন আবার হরতাল। ঊর্মি আমাকে ফোন করে কাঁদো কাঁদো স্বরে যখন বলল, “ওইখানে থাকার কেউ নাই রে…” তখনও আমি খুব একটা পাত্তা দেই নাই।

কিন্তু সমস্যা হল আমার ছোটবোন তিথিকে নিয়ে। সে আবার ইমরানের ফেসবুক ফ্রেন্ড। সে প্যাঁ প্যাঁ শুরু করল রাতে হাসপাতাল থাকবে। তাই কী আর করা! সন্ধ্যা ছয়টার পরে আমি আর তিথি হাসপাতালে হাজির হলাম।

২.
ওয়ার্ড নং ২১৫, ঢাকা মেডিকেলের দোতলা। এত পরিষ্কার ওয়ার্ড আমি জীবনেও দেখি নাই।

রোগীর সংখ্যাও কম। বেশির ভাগই আবার সিরিয়াস রোগী। মুখে অক্সিজেন বা নাকে বা পায়ুপথে নানা রকম নল। কিংবা হাতে স্যালাইন। কিংবা শরীরের আরো নানা জায়গা থেকে হরেক রকম তার ঝুলে আছে।

ওখানে বসে বসে ফোন করা শুরু করলাম। রাতে হাসপাতালে থাকতে পারবে এমন কাউকে পাওয়া গেল না। এদিকে আমার বন্ধু বান্ধবরা আসতে শুরু করল। উপদেশ দিতে শুরু করল, আমরা দুইটিমাত্র মেয়ে কিছুতেই যেন রাতে হাসপাতালে না থাকি।

সব কিছু মিলিয়ে আমি দিশাহারা, এমন সময়ে আমার এক প্রিয় বন্ধু এসে হাজির। সে আসার পরে আমি চা খেতে নামলাম। আমি ফিরে আসার পরে তিথি গেল ভাত খেতে।

৩.
তখন রাত দশটার মতন বাজে । আমি ইমরানের বেডের উপর কোনো রকমে বসে থাকলাম। কিছুক্ষণ পরে আমার চারপাশে একেবারে ভিড় জমে গেল। কৌতূহলী জনতার ভিড়।

জনতা মানে রোগীদের সঙ্গে থাকা লোকজন। তাদের মনে নানান রকম প্রশ্ন।

যেমন, এই রোগী আমার কে হয়?

—তার বাপ মা কোথায়?

—তার কাছে শুধু মেয়েরা আসে কেন?

সকাল থেকে নানা কিসিমের মেয়েদের আসা যাওয়া ছিল এই বেডে। তার উপরে মেয়েগুলার চলাফেরাও অন্যরকম।

ডাক্তার ডাকে “এক্সকিউজ মি” বলে, নার্স ডাকে “এক্সকিউজ মি” বলে, নলকে বলে টিউব, “স্যালাইন দিবেন?”-রে বলে “স্যালাইন পুশ করবেন?”

তাই উনাদের খুব কৌতূহল।

আমার চুল ছোট, ছেলেদের শার্ট গায়ে। আমার বয়স যে এত বেশি উনারা বুঝতে পারেন নাই বোধহয়। আমাকে ঘিরে ধরে প্রশ্নে প্রশ্নে তাই দিশাহারা করে ফেললেন।

আমার রীতিমত কান্না পাচ্ছিল তখন। ইমরানের জ্ঞান নাই। এখানে সারারাত কীভাবে যে থাকব ভাবতে ভাবতে তিথিসমেত আমার প্রিয় বন্ধুটি হাজির। আমি তাকে এতক্ষণের কাহিনি বিস্তারিত বললাম।

সে লক্ষী ছেলের মত বলল—“আমি রাতে থাকব নে,তুমি যাও গা।”

সেইটা কি আর হয়!

ইমরানের জ্ঞান ফিরলে সে কী ভাববে! তাই আমি ভাবলাম একটা রাত থাকি এইখানে। তিথিও থাক,আমার প্রিয় বন্ধুটিও থাক। সাথে একটা ছেলে থাকলে লোকজন আর ডিস্টার্ব করবে না।

এই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমি ভাত খেতে নামলাম।

৪.
হাসপাতালের কাছেই নাজিমুদ্দীন রোড। সেখানে এক হোটেলে ঢুকে মনের শান্তিমতন ভাত খেলাম। ভাত খেয়ে শান্তি আরেকটু বাড়াবার লক্ষ্যে চা নিলাম। চায়ের রঙ এর মধ্যেও কেমন শান্তি শান্তি ভাব আছে।

তখন রাত বারোটা। হঠাৎ মনে হল আমার মোবাইলটা কেমন একটু আওয়াজ করছে। সেইটা বের করার আগেই দেখি মুখের ওপর এক জোড়া কুঁচকানো ভ্রু। মহাকবি ব্রাত্য রাইসু দাঁড়িয়ে আছেন।

তিথি বলে, রাইসুর নাকি জন্ম থেকেই ভ্রু ওরকম কুঁচকানো।

যাই হোক, আমি তাকে বসতে বললাম। সে তার স্বভাব অনুযায়ী চিল্লাফাল্লা শুরু করে দিল। দোকানের ভিতরে এই চিল্লাচিল্লি নতুন পরিবেশের সৃষ্টি করল। লোকজন ঘাড় ঘুরায়ে আমাদের দেখতে লাগল। আমি আমার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী মুচকি মুচকি হাসি সহকারে তার সাথে আলাপের চেষ্টা করলাম।

বললাম, চা খাবা?

রাইসু বলল, খাব।

তারপর হোটেল বয়কে বলল, “স্ট্রং লিকার,সুগারলেস, এক কাপ চা!”

হোটেল বয় হা করে কিছুক্ষণ রাইসুর দিকে তাকিয়ে থাকল। আমি তাকে সহজ বাংলা ভাষায় বুঝায়ে বললাম কী ধরনের চা দিতে হবে।

সে এক কাপ চা এনে দিল।

রাইসু চা পিরিচে ঢেলে বিভিন্ন ঢঙ করতে লাগলো। আমার সাথে ঝগড়া করবার চেষ্টাও করল।

আমি বুঝলাম এর এক নাম্বার কারণ, আমার সাথের বন্ধুটি। দুর্ভাগ্যবশত সে ছেলে দেখতে খুবই সুন্দর। সে কিছুক্ষণ রাইসুর বকবকানি শুনে বাইরে চলে গেল। আমি বিল দিয়ে বের হয়ে দেখি বন্ধুটি সব শান্তি জ্বালায়ে পোড়ায়ে সিগারেট ধরাচ্ছে।

এদিকে রাইসু বলল, সেও নাকি রাতে হাসপাতালে থাকবে!

এটা শোনামাত্র আমার প্রিয় বন্ধু “টা টা” বলে চলে গেল।

৫.
আমার একটু মেজাজ খারাপ হল বই কি। আমি রাইসুকে ঝাড়ি মারা শুরু করলাম।

সবকিছুতে একটা ভেজাল না করলে তার ভাল লাগে না। তাছাড়া সে জীবনেও সারা রাত হাসপাতালে থাকবে না। হুদাই আমার বন্ধুটাকে এত ডিস্টার্ব দিল।

রাত দুইটা বাজলেই রাইসু কাঁদতে কাঁদতে বাসায় চলে যাবে। তখন আমি আর তিথি কী করবো!

রাইসু বলল, না, সে নাকি আজকে সারারাতই থাকবে!

আমি দুনিয়ার বিরক্তি নিয়ে হাসপাতালে ফিরলাম।

রাইসুকে দেখে তিথি গালভরা হাসি দিল।

বলল, “কী? রাজা ব্রাত্য রাইসু থাকবেন নাকি আজকে?”

রাইসু বলল,  “জি, সারারাত থাকব।”

তিথি এবার আমাকে গালাগাল শুরু করল, “এই ভেজালটারে কেন নিয়া আসছো? এইটা দুনিয়ার লোকজনের সাথে ঝগড়া লাগাবে। এইটা নার্সদের সাথে খারাপ ব্যবহার করবে। ডাক্তারনিদের সাথে প্রেম করবে। তারপর তোমার সাথে ঝগড়া করবে। তারপর বলবে আমার ঘুম আসতেছে, আমি যাইগা, খোদা হাফেজ…।”

প্রত্যেকটা কথাই সত্যি হবার আশঙ্কা ১০০ ভাগ। আমি মুখ অন্ধকার করে বসে থাকলাম। রাইসুর সাথে কথা বন্ধ। ইমরান অজ্ঞান কিংবা ঘুম। তিথি বই পড়া শুরু করল।

বাইরে তখন বাতাস বইতে শুরু করল। বসন্তের রাত। রাইসু শুরু করল গান—“তুমি হঠাৎ-হাওয়ায় ভেসে-আসা ধন— / তাই হঠাৎ-পাওয়ায় চমকে ওঠে মন।”

তাও আবার যেই সেই ভলিউমে না!

তখন রাত বাজে দুইটা। বেশিরভাগ রোগীর সাথে থাকা লোকজন ঘুমে।

হাসপাতালে আসলে বোঝা যায় মানুষের খাওয়া আর ঘুম কী জিনিস। এই নোংরার মধ্যেই তারা একটা পাটি কিংবা বেডশিট বিছায়ে ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাচ্ছে। সারি সারি লাইট জ্বলতেছে। ব্লিচিং পাউডারের অসহ্য গন্ধে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। তার উপর নানা ধরনের রোগী একটু পরপর বিভিন্নভাবে চিৎকার করে উঠতেছে। এক বয়স্ক রোগী অনবরত কাঁদতেছে। এর মধ্যেই সবাই ঘুমাচ্ছে। কী আশ্চর্য!

রাইসুর গানের চোটে আশপাশের কেউ কেউ উঠে বিরক্তি বিরক্তি চোখে তাকাচ্ছে।

তিথি আমাকে বলল, এইটারে চুপ করাবা?

আমি রাইসুকে বললাম, এইটা হাসপাতাল। প্লিজ চুপ করো।

রাইসু বলল, আমি বাথরুমে যাব।

আমি বললাম, সেইটা বললেই তো হইত। এইখানে গান গাওয়ার কী মানে?

৬.
এই ওয়ার্ডে আসার পথের মধ্যেই একটা টয়লেট আছে। আমি রাইসুকে সেখানে নিয়ে গেলাম।

টয়লেটের তীব্র গন্ধে দম প্রায় বন্ধ হয়ে আসতেছে। তার সামনেই বিভিন্ন লোক বিভিন্নভাবে শুয়ে বসে ঘুমাচ্ছে।

রাইসু চিৎকার করে বলল, আরে! এখানে আনছো কেন?

আমি বললাম, তো কই আনব? এইটাই তো বাথরুম!

রাইসু বলল, এইটা তো মেল টয়লেট!

আমি তো অবাক! বললাম, তুমি কি ফিমেল টয়লেটে যাবা নাকি?

রাইসু নির্দ্বিধায় বলল, অবশ্যই! তুমি জানো না আমি নারীবাদী?

রাইসু বাংলাদেশের এক নাম্বার নারীবাদী। সে মেয়ে ডাক্তার ছাড়া ডাক্তার দেখায় না। যে দোকানে মেয়ে দোকানি আছে সেইখান থেকে জিনিসপত্র কেনে। মেল টয়লেটে যায় না। বডিস্প্রে কিনে ফে কোম্পানির।

আবার আমার দেখা শ্রেষ্ঠ নারী (ছলাকলা ক্যাটাগরি) হিসেবে তাকে আমি অনেক আগেই স্বীকৃতি দিয়ে ফেলছি, এমনকি নারী দিবসে শুভেচ্ছাও জানাইছি।

সুতরাং আমি আর কথা না বাড়ায়ে তিথিকে ডেকে আনলাম। তিথি মেয়েদের টয়লেট চেনে। ও আমাদেরকে সেখানে নিয়ে গেল।

রাইসু ভিতরে যাওয়ার পরে ও রাইসু কীভাবে হাঁটে সেইটা অভিনয় করে দেখাতে লাগল। আমার মন একটু ভাল হল। আমি হাসতে শুরু করলাম।

এদিকে দেখি মেয়েদের বাথরুম থেকে কিছুক্ষণ পরপরই বিভিন্ন বয়সী পুরুষেরা বের হচ্ছে।

আমি অবাক হয়ে গেলাম। এরা সবাই কী নারীবাদী নাকি? কী আশ্চর্য!

তিথি বলল, মেয়েদের টয়লেট তুলনামূলক পরিষ্কার থাকে। তাই এরা সবাই এখানে আসছে। নারীবাদ-টারিবাদ সব নাকি ভুয়া।

রাইসু ততক্ষণে হাজির। এবার তিথি ভিতরে গেল।

তিথি আসার পরে রাইসু বলল, এবার তুমিও যাও।

আমি বললাম, না,আমি যাব না। আমি মারা যাব এখানে গেলে।

রাইসু বলল, “যাবা না মানে? অবশ্যই যাবা।” বলেই আমার হাত ধরে টানাটানি শুরু করল।

আমি বললাম, আরে রাই, তুমি বাড়াবাড়ি করতেছ কেন? আমার তো বাথরুমে যাওয়ার দরকার নাই! এইগুলা কোন ধরনের বাড়াবাড়ি?

রাইসু বলল, কেন দরকার থাকবে না কেন? আমরা গেছি না? তোমার যাইতে সমস্যা কী?

আমি বললাম, আরে ভাইরে আমার বাথরুম পায় নাই।

রাইসু বলল, বাথরুম পাবে না এইটা কী ধরনের কথা? তোমার কি রেচনতন্ত্র নাই?

এই পর্যায়ে তিথি বলে উঠল, আপনার নাম ‘ব্রাত্য রাইসু’ না হয়ে ‘বিরক্তিকর রাইসু’ হওয়া উচিত!

ব্যস! এইবার তিথি আর রাইসুর ঝগড়া শুরু হয়ে গেল।

৭.
আমরা তিনজন ওয়ার্ডে ফিরে গেলাম। কিন্তু ততক্ষণে আমার রেচনতন্ত্র কাজ করতে শুরু করল। ঘড়িতে মাত্র রাত তিনটা বাজে। আটটার আগে কেউ আসবে না। কীভাবে যে এত সময় কাটাবো!  চিন্তায় পড়ে গেলাম।

তিথি আবার বই পড়া শুরু করল। আমি বসে আছি। হঠাৎ ওয়ার্ডে এক বিলাতনিবাসী বাঙালি মেয়ে এসে হাজির। হাতে মোমবাতি।

এমনিতেই সারি সারি লাইটের আলোতে চোখ কটকটায়। আর সে মেমসাহেব কিনা ভাবছে এখানে ইলেকট্রিসিটি নাই। তাই মোমবাতি নিয়ে পৃথিবী শান্ত করছে।

তার উপর এমন ভঙ্গি করে হাঁটতেছে যে আশপাশের স্যালাইনের তারে আগুন ধরে যাচ্ছে। রাইসু তার পিছনে দৌড় দিল। আর তারের আগুন নিভাতে লাগল।

একসময় মেয়েটা একটা রোগীর বেডশিটে আগুন দিয়ে ফেলল। সেই রোগী সিরিয়াস রোগী।সে তার বউকে নিয়ে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছিল।

বেডশিটের আগুন থেকে আগুন ধরে গেল তার লুঙ্গিতে। তারপর হইহই হইহই কাণ্ড। ওদের চিল্লাফাল্লা শুনে বিলাতি মেয়েটা যেন একটু লজ্জাই পেয়ে গেল।

সে আর রাইসু ইমরানের বেডের কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর তারা দুজনে কী যে ফালতু ন্যাকা ন্যাকা আলাপ শুরু করল তা লেখার মত ধৈর্য্য আমার নাই।

আমি আর তিথি একজন আরেকজনের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়ে থাকলাম।

এইদিকে ওই আগুনলাগা রোগীর বউ গলা ফাটায়ে চেঁচাচ্ছে। আগুন নিভে গেছে কিন্তু এইটা নিয়ে জামাই-বউয়ের মধ্যে ঝগড়া লেগে গেছে।

রোগীর বউয়ের ধারণা নিশ্চয়ই এই বিলাতী মেয়ের সাথে তার জামাই খারাপ কিছু একটা করেছিল। তাই মেয়েটা তার লুঙ্গিতে আগুন লাগায়ে দিছে!

আর এদিকে জামাই রাগে দুঃখে অপমানে বউকে সমানে লাথি মারছে তো মারছেই।

এক পর্যায়ে এই ঝগড়া আরো হিংস্র হল। তখন আশেপাশের কেউ একজন উঠে রোগীর গালে ঠাস করে একটা চড় বসায়ে দিল।

বলল, ‘‘হালার পুত, অসুইখ্যা বেডা, এত্ত গায়ের জোর আইছে কোনহানতে?’’

বেচারা রোগী থাপ্পড় খেয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল। কিন্তু বউ তো আর থামে না। ওই পাশের ব্যাটার ডায়লগটাই নানাভাবে এক্সটেনশন করে করে করে বলতে থাকল।

বেচারার মাথা খারাপ হয়ে গেছিল নিশ্চয়ই। সে নিজের গায়ের সবগুলা তার এক ঝটকায় খুলে ফেলল। তারপর আরেক ঝটকায় ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে গেল।

তার বউ চুপচাপ বেডের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে শুয়ে অনবরত পা নাড়তে থাকল। এরকম ভঙ্গি বাংলা সিনেমায় অনেক দেখা যায়। বিলাতি মেয়েটা তখন হি হি হি হি করে হেসে উঠল।

আমার এমন রাগ হল যে আমি মেয়েটাকে ঘাড় ধরে ওয়ার্ড থেকে বের করে দিলাম।

৮.
ফিরে দেখি রাইসু চিৎকার করে কাঁদছে। তিথি তাকে থামানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। বেশির ভাগ রোগী ঘুম। খালি ওই রাগারাগি বেডের মহিলা বসে আছে।

আর এদিকে রাইসুর কান্নার চোটে আমাদের রোগী ইমরান জেগে গেছে। আমাকে দেখা মাত্র রাইসু আরো জোরে জোরে কাঁদতে লাগল। কাঁদে আর হাসপাতালের নোংরা মেঝেতে গড়াগড়ি খায়।

আমি একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ এটা সেটা বলে ম্যানেজ করার চেষ্টা করলাম।

শেষে আর উপায় না দেখে ইমরানকে বেড থেকে নামিয়ে রাইসুকেই সেখানে শুইয়ে দিলাম। রাইসু চোখের পানিতে ইমরানের বালিশ ভিজায়ে ফেলল।

এদিকে আমাদের গুরুতর রোগী ইমরান হাতের নল নিয়ে স্যালাইন স্ট্যান্ড এর পাশে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে। যে কোনো মুহূর্তে অজ্ঞান হয়ে যাবে। ঘুমে ওর এক চোখ বন্ধ। আরেক চোখ কোনো রকমে খুলে কী হচ্ছে তা বোঝার চেষ্টা করছে।

তিথি ওর বই দিয়ে রাইসুকে বাতাস করছে। আমি রাইসুকে নানাভাবে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছি।

হাজার হোক, হাসপাতালের বেড রোগীর মৌলিক অধিকার। ইমরানকে এ অবস্থায় কতক্ষণই বা রাখা যাবে?

৯.
রাইসু কাঁদতে কাঁদতে বলল, এইটা তুমি কী করলা পারমিতা, এইটা কী করলা?

আমি একটু নরমভাবে বলতে চাইলাম, আরে এইটা কি এই সবের জায়গা? তুমি সিচুয়েশন বুঝো না কেন? এইটা একটা সিরিয়াস জায়গা না?

রাইসুর কান্না থামেই না। বলল, তুমি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতেছ। তুমি দুনিয়ার সব তরুণ কবিদের সাথে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতেছ।

মেজাজটাই খারাপ লাগল। গলা একটু চড়েও গেল। বললাম, কী ষড়যন্ত্র করতেছি রাসপুটিন?

রাইসু অবলীলায় বলল, আমার সম্পত্তি দখলের ষড়যন্ত্র!

হাহ্! রাইসুর সম্পত্তি! তিনটা ফেইসবুক আইডি, কয়েকশো ফেসবুক গ্রুপ আর পেইজ, কয়েকটা ওয়েবসাইট, ঢাকা শহরের সব মাইয়াদের মোবাইল ফোন নম্বর লিখা একটা সবুজ মলাট খাতা, কয়েকটা কবিতা আর কয়েকটা ছবি (বেশিরভাগই আমাকে মুখে মুখে গিফট করে দিছে), একটা কম্পিউটার আর কয়েকটা মরা মরা গাছ। আমি নাকি এই সম্পত্তি দখলের চেষ্টা করতেছি! হাসবো না কাঁদব বুঝতে পারতেছি না।

রাইসুকে নিয়ে এই এক জ্বালা! সারাক্ষণ সে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মধ্যে থাকে। যেন সে এক নবাব সিরাজউদ্দৌলা! দুনিয়ার সবকিছু যেন ওরে নিয়ে ষড়যন্ত্র করতেই বসে আছে।!

আর অভিযোগেরও কি বাহার!

‘তরুণ কবিদের সঙ্গে’…   জানি না কেন, রাইসু সারাক্ষণই আমাকে এ কথা বলতে থাকে। কোন তরুণের সঙ্গে আমি রাইসু নিয়া কথা বললাম এক আল্লাহ্ জানে, দুই রাইসু জানে!

অবশ্য রাইসুর একটা দারুণ বিতর্কিত প্রভাব সব বয়েসের সাহিত্যিক, আধা-সাহিত্যিক, কবি, উপকবি, পাতিকবি, সাংবাদিক, এনজিওবিদ, কলামিস্ট, বিশেষজ্ঞ—সবার মধ্যেই আছে। এরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার মত করে রাইসুকে পাঁচ ওয়াক্ত গালি দেয়। গালি দেয়, সমালোচনা করে আবার রাইসুকে গোপনে স্তুতিমূলক ইনবক্সও করে।

আর রাইসু যেসব মেয়েকে তার কবিতায় ট্যাগ করে তাদেরকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায়। যারা গ্রহণ করে তাদেরকে এরপর ইনবক্স করে। ইনবক্স তো করে—করেই ওইসব মেয়ে একটু পাত্তা দিলেই একেবারে মিষ্টি মিষ্টি সাহিত্য আলাপ, এরপরে প্রেমের খাজুরা আলাপ শুরু হয়ে যায়! এ কোটায় অবশ্য মাঝবয়েসি লোকরাই বেশি, তবু সব দোষ কেন তরুণ কবিদের ঘাড়ে?

আর রাইসুর বান্ধবীরাও তো কম যায় না এ দৌড়ে! ছেলেরা না হয় রাইসুর ট্যাগড মেয়েদের প্রতি ‘ও কি যেন এনু রে!’ ভাব পোষণ করে, মেয়েদের তো আর এই কারণ নাই!

রাইসুর ‘পরবাসী বিবাহিত একদা শুকনা এখন মোটা বান্ধবী সমিতি’র কাণ্ডও প্রায় একই রকম। রাইসু কোনো মেয়েকে ট্যাগ করলেই এরা দলে দলে ঝাঁপায়ে পড়ে যে কোনো মূল্যে সে মেয়ের সাথে খাতির করার জন্য!

এইসব মাঝবয়সী মহিলা ও পুরুষদের নিয়া আমরা যে কী পরিমাণ হাসিতামাশা করি, এইটা যদি তারা জানতো, তাহলে লজ্জায় দুনিয়া ছেড়ে মহাবিশ্বে গিয়ে আশ্রয় নিত বলে আমার ধারণা।

১০.
আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে গিয়ে রাইসুর কান্নাকাটির চোট একটু কমে গেছে। কান্না থামানোর পরে সে যা শুরু করল তা আরো বিরক্তিকর।

হাসপাতালে তো বিভিন্ন ধরনের শব্দ হয়। কেউ ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে ওঠে। রাইসুও তার অনুকরণে চিৎকার করে।

কেউ কাঁদে উহু হু হু। তখন রাইসুও উহু হু হু করে কাঁদে।

কেউ কাশে খক খক। রাইসুও কাশে খক খক।

কেউ ব্যথায় ‘ও মারে ও মারে’ করে। সঙ্গে সঙ্গে রাইসুও ‘ও মারে ও মারে’ করে।

এদিকে নাকে নল নিয়ে, হাতে নল নিয়ে ইমরান আর চোখ খুলে দাঁড়াতে পারতেছে না। তিথি ইমরানের অবস্থা দেখে আমার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকায়ে আছে।

রাইসুর দিকে ইঙ্গিত করে, তিথি আমাকে বলল, এইটারে এখান থেকে সরাবা?

আমি বললাম, আমি কী করব?

বলল, আপাতত এইখান থেকে নিয়ে যাও। যে কোনো সময় গণধোলাই খাবে কিন্তু বলে রাখলাম। বাসায় দিয়ে আসাই বেটার।

তিথির কথা ঠিক।

আমি রাইসুকে বললাম, “দেখো, দেখো আকাশে কী সুন্দর চাঁদ! কী সুন্দর বসন্তের বাতাস। চল নিচে গিয়ে চা খেয়ে আসি।”

এসব ভুজুংভাজুং দিয়ে আমি রাইসুকে নিয়ে নিচে নামলাম।

সত্যি সত্যিই চাঁদ উঠছে। আর বাতাসও আছে।

আমি রাইসুকে কাকুতি মিনতি করে বললাম, তুমি বাসায় চলে যাও, রাই।

রাইসু খ্যান খ্যান করে বললো, কোন বাসায়?

আমি বিরক্তি চেপে মধুরতম স্বরে বললাম, তোমার বাসায়!

সে ঝনাৎ ঝনাৎ করে বলল, আমার বাসা মানে? কোথায়?

আমি আরো কোমল কণ্ঠে বললাম, কোথায় আবার? পান্থপথ! বড়ই ‘বন্ধুর’ যেই পথ!

রাইসু একটু ভেবে বলল, নাহ্, আমি ওখানে যাব না।

মেজাজাটাই চড়ে গেল। বললাম, কেন যাবা না?

রাইসু উল্টা আমাকে মেজাজ দেখায়ে বলল, তুমি জানো না কেন যাব না?

আমি জানি।

রাইসু আবার পারতপক্ষে তার বাসার বাইরে যায় না। যদি কখনো বাইরে যেতে বাধ্য হয়, তাহলে একলা একলা সে ফিরতে পারে না।

মফস্বল থেকে আসা এক উপকবি আছে যার জীবনের একমাত্র সাধনা রাইসুর ষোল তলার বাসা। সে উপকবির কাছে ষোল তলায় থাকাও একটা মহাকাব্য।

সে প্রতিদিন রাতে তার বউসহ রাইসুর বাসার সামনে এসে দাঁড়ায়। দুইজনে মিলে হা করে রাইসুর ষোল তলার দিকে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে থাকে। আর বাসায় গিয়ে একটা করে কবিতা উৎপন্ন করে। তাই আমি পড়লাম মহা ফাঁপড়ে।

রাত প্রায় চারটা বাজে। রাইসুকে নিয়ে হাসপাতালে ঢুকলে তিথি মহারাগ হবে।

আমি রাইসুকে বললাম, ভাই, রাই তোমারে আমি পৌঁছায়ে দিয়ে আসি। তুমি বাসায় গিয়া ঘুমাও প্লিজ ।

রাইসু কিছুতেই রাজি হতে চাইল না। এদিকে আমার বাথরুমে যাওয়া দরকার। এইখানের কোনো বাথরুমে যাওয়ার কথা আমি ভাবতেও পারি না। তার উপর প্রচণ্ড ক্লান্ত লাগতেছে।

বাসায় সারারাত জাগা এক জিনিস। আর বাইরে সারারাত ছোটাছুটির মধ্যে থাকা আরেক ব্যাপার। আমার ঘুম নাই কিন্তু ক্লান্ত লাগতেছে অনেক। বসন্তের বাতাস সেই ক্লান্তি মনে হয় আরো বাড়ায়ে দিল। শরীর ভেঙে ঘুম আসা শুরু করল। মনে হচ্ছে চায়ের দোকানের বেঞ্চির উপরেই শুয়ে পড়ি।

১১.
আমি একটা রিকশা নিয়ে রাইসুর বাসার দিকে রওনা নিলাম। মনে মনে ভাবলাম রাইসুর বাসায় গিয়ে বাথরুমে ‍গিয়ে আবার এই রিকশাতেই চলে আসব।

রিকশার মধ্যে রাইসু তার বিখ্যাত গলা ছেড়ে দিয়ে গান শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শাহবাগ পৌঁছে গেলাম। সেইখানে তখন অনেক দেশপ্রেম হচ্ছে।

দেশপ্রেমিকদের মধ্যে অনেক মেয়ে আবার রাইসুর বন্ধু। বন্ধু মানে রাইসুর সাথে মিষ্টি মিষ্টি চ্যাট করে। কিন্তু শাহবাগে পাবলিকের সামনে কথা বলে না।

শাহবাগের কাছাকাছি আসতেই রাইসু চিৎকার শুরু করল, রিকশা ঘুরাও রিকশা ঘুরাও, এইদিকে না, এই দিকে যাব না।

আমি তো অবাক। বললাম, কেন এইদিকে কী হইছে?

রাইসু বলল, এইদিকে আমার কয়েকটা ফেসবুক ফ্রেন্ড আছে।

বিরক্ত হয়ে আমি বললাম, তো?

রাইসু বলল, এইদিকে যাওয়া যাবে না। ওরা যদি তোমার লগে আমারে দেইখা ফেলে তো আমার সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাবে। ঘুরায়ে চলো।

আমার মেজাজ তখন সপ্তমে। আমি বললাম, ফালতু কথা বইলো না, আমার সাথে দেখলে যে তোমার বাজারদর বাইরা যাবে সেইটা কও।

রাইসু এবার হেসে ফেলল।

বলল, ভাইরে ওদের বয়ফ্রেন্ড আমারে পিটাবে। তাড়াতাড়ি ঘুরাও।

বয়ফ্রেন্ড পিটাবে? জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? আবার কী করছো?

রাইসু বলল, কিছু না। কবিতা ট্যাগ করছি।

এবার হাসলাম আমি। বললাম, ট্যাগ দিতে কে কইছে?

এইদিকে রিকশা ঘুরানোর আগেই দুইটা পুলিশ এসে হাজির। বুঝলাম ওরা চেক করতে চায়। ঝগড়াঝাটি শুনে হয়তো সন্দেহ হইছে। রাইসু ভয় পেয়ে গেছে।

বলল, দেখছো দেখছো, ওই ফালতু মাইয়াগুলার কারণে কী বিপদ ডেকে আনছো?

আমার ভয় পাবার প্রশ্নই আসে না।

আমি বললাম, আমি ঢাকা ভার্সিটির স্টুডেন্ট।

পুলিশ দুইটা কিছুই চেক করল না। আমাকে বলল, আপা নামেন। আপনাকে আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে।

paromita-galpo-2
“পুলিশ দুইটা কিছুই চেক করল না। আমাকে বলল, আপা নামেন। আপনাকে আমাদের সাথে থানায় যেতে হবে।” অলঙ্করণ. সাঈদ রূপু

সাহস কত! আমি বললাম, থানায় যেতে হবে মানে? আমি ঢাকা ভার্সিটির স্টুডেন্ট!

মোটা পুলিশটা বলল, আচ্ছা এই ব্যাপার। এই জিনিস নিয়া আপনি কোথায় যাচ্ছেন? আপনারা ঢাকা ভার্সিটিতে পড়েন বইলা কি সাত খুন মাপ হইয়া যাইব?

আমি তো অবাক! কোন জিনিস!, আমি বললাম।

“এই যে এইটা”—মোটা পুলিশ রাইসুর মোটা পেটে একটা গুঁতা দিল।

“কেন উনাকে নিয়ে গেলে কী হইছে? উনাকে নিয়ে যাওয়া কি নিষেধ নাকি?” —আমার মাথা গরম হয়ে গেল হঠাৎ।

“চলেন দেখি থানায় চলেন।” বলতে বলতে আমাকে আর রাইসুকে শাহবাগ থানায় নিয়ে গেল।

১২.
শাহবাগ থানার ওসির নাম রামপ্রসাদ চক্রবর্তী। আমি ভাবলাম, যাক হিন্দু মানুষ, আমাকে একটু ফেভার তো করবেই।

কিন্তু কিছু বলা কওয়ার আগেই ওসি সাহেব আমাকে লকারে ঢুকিয়ে রাখল। আমি একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলাম।

আমি চিৎকার করে উঠলাম, আরে এইসব কী! আমাকে কেন আটকায়ে রাখছেন!

উনি বলল, দাঁড়ান, প্রভোস্ট আসুক, সাংবাদিক আসুক।

আমি বললাম, কেন? আমি কী করছি সেইটা বলতে পারতেছেন না? আমাকে কী দোষে এখানে আটকানো হইছে?

বলল, শোনেন, আপনার নাম কী?

আমি বললাম, পারমিতা—পারমিতা হিম।

ওসি বলল, কোন ডিপার্টমেন্ট আপনি? আইডি কার্ড দেখি?

আমি কার্ড দেখালাম। বললাম, দেখেন আমার ফ্রেন্ড ডিএমসিতে ভর্তি। ওর ওইখানে রাতে আমি থাকতেছি। আমার তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে ভাই।

ওসি বলল, আপনি এখন কোন জায়গা থেকে আসতেছিলেন?

উত্তর দিলাম, মেডিকেল। আপনি রিকশাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন।

বলল, আপনি এই মাদকদ্রব্যটা কোথায় পাইলেন?

আমি তো অবাক! গলার স্বর কেঁপে গেল, বললাম, কোন মাদকদ্রব্য?

ওসি একটুও অবাক না। বলল, যেইটা আপনার সাথে ছিল।

আমি গলা খাঁকাড়ি দিয়ে বললাম, আমার সাথে তো কিছু ছিল না!

ওসি একেবারে গড় গড় করে বলল, আপনার কাছে মারাত্মক নেশাদ্রব্য পাওয়া গেছে, দামি, বিদেশী।

মাথা খারাপ নাকি? বললাম, কী বলেন? আমার কাছে কিছুই ছিল না। প্লিজ। আমার কথা শোনেন।

ওসি বলেই যাচ্ছে, কতদিন ধরে করেন এইসব? বাবা মা জানে?

আমি রেগেই গেলাম, মুখ সামলায়ে কথা বলেন। আমি কোনো নেশা করি না। ড্রাগ নিয়া ঘুরিও না।

ওসির যেন বিশ্বাসই হল না। বলল, কিন্তু আপনার সাথে তো ড্রাগ পাওয়া গেছে।

জেদ চেপে গেল, বললাম, কোথায়? কোন ড্রাগ?

ওসি একটা আঙুল তুলে বলল, এই যে। আপনি কি অস্বীকার করতেছেন রাত চারটায় আপনি রিকশায় এই মাদকদ্রব্য নিয়া যাচ্ছিলেন না?

আমি হা করে দেখলাম ওসি রাইসুর দিকে আঙুল তাক করে আছে। আমি ভালভাবে দেখতে থাকলাম। আশেপাশে আর কিছু নাই।

জিজ্ঞাসা করলাম, কোনটা মাদকদ্রব্য? আমি বুঝতেছি না।

ওসি রাইসুর ভুঁড়িতে হাত রেখে বলল, এইটা কী? আপনিই বলেন?

আমার তো মাথাই খারাপ হয়ে গেল! বললাম, এইটা মানে? এইটা মানুষ, আপনি চোখে দেখেন না? শোনেন “এইটা কী?” “এইটা কী?” বলবেন না। আপনি কইরা বলেন। উনি লেখক—কবি মানুষ। সম্মান দিয়া কথা বলেন।

ওসি বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বলল, তাই! নেশা কইরা এমন অবস্থা যে নেশার জিনিসরে কবি মনে হয়! ভালো তো, ভালো না!

আমি বললাম, আপনি কি ননসেন্স না আর কিছু? মানুষটারে দেখতেছেন না—না?

ওসি এবার ধৈর্য্য নিয়ে বলল, জ্বি আপা, দেখতাছি। এইটা একটা মাদকদ্রব্য। দামি, বিদেশী মাদকদ্রব্য। এইটা একটা ভয়ঙ্কর ড্রাগ। মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের আন্ডারে মামলা হবে। আপনারা ভাল ফ্যামিলির মেয়ে হয়ে কেন যে এগুলা করেন! আপনি যেমনে এইটারে নিয়া যাইতেছিলেন আপনার সাহস আছে বলতে হয়।

ওসির কনফিডেন্সে আমি একদম দমে গেলাম। আমার মাথায় তখন একটাই বুদ্ধি আসল।

আমি রাইসুর নাম ধরে চিৎকার শুরু করলাম। এবং রাইসু আমার দিকে তাকালোও না।

কী এক ক্যালেন্ডারের দিকে নিষ্পলক চেয়ে আছে যেন সে জীবনেও ক্যালেন্ডার দেখে নাই!

আমি ডাকতে ডাকতে টায়ার্ড হওয়ার একটু আগে খেয়াল করলাম সে নড়াচড়াও করতেছে না, আমার কথা শুনতে পাচ্ছে এমন কোনো ব্যাপারও তাকে দেখে মনে হচ্ছে না।

এদিকে থানার দারোগা থেকে শুরু করে হাবিজাবি লোক পর্যন্ত পিতির পিতির করে হাসতেছে আমাকে দেখে। আমার জাস্ট গা জ্বলতেছে। এমন সময় কে যেন বলল, “সাংবাদিকেরা এখনো আসতেছে না কেন? হেরাও মজাটা পাইত!”

আমার চোখের সামনে তখনই কালকের পত্রিকার হেডলাইন ভাসা শুরু করল।—

‘‘গভীর রাতে বিদেশী মাদকদ্রব্য সহ ঢাবি তরুণী গ্রেফতার’’।

আর ‘দৈনিক অপরাধকণ্ঠ’ কী ছাপবে সেটা তো ভাবতেই পারছি না।

আমার তখন মনে পড়ল ‘প্রথম আলো’র ভার্সিটি করেসপন্ডেন্ট জাইফ তো আমার বন্ধু!

আমি সাথে সাথে তাকে ফোন করলাম। একবার, দুইবার, তিনবার। সে ফোন ধরে না।

‘কালের কণ্ঠ’র দুর্জয়কে ফোন দিলাম। ধরে না। একে একে সবাইকেই ফোন দিলাম। কেউই ধরে না।

অবশ্য এই রাত সাড়ে চারটা বাজে না ঘুমায়ে কেনই বা তারা আমার ফোন ধরবে!

এদিকে থানার লোকজন অসভ্যদের মতন তামাশা দেখতেছে। আমার বসা দেখতেছে, উঠা দেখতেছে, হাঁটা দেখতেছে, ভুরু কুঁচকানো দেখতেছে, গালে হাত দেয়া দেখতেছে।

একজন তো জিজ্ঞেস করে ফেলল, তোমার চোখ লাগাইতে কত টেকা লাগছে?

আমি বিরক্তিতে ফেটে গিয়ে বললাম, কী!

কেলানার মত করে বলল, ওই যে বিলাইয়ের চোখ লাগাইছো! এত টেকা কেমনে পাও তোমরা? স্টুডেন্ট না?

ততক্ষণে আমার ভাষা নাই, শরীরে কোনো শক্তি নাই, এদিকে বাথরুমে যাওয়া দরকার খুবই, কেউ ধরতেছে না ফোন, মুখের সামনে এতগুলা লোকজন, লাথ্থাইতে মন চাচ্ছে কিন্তু কিছু করতেও পারতেছি না, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন।

ওসিকে ডাকলাম। বললাম, ভাই, ফ্রেশরুমে যাওয়া দরকার।

উনি অশ্লীলভাবে হাসলেন।

আমি বললাম, ভাই, হাসার কী হইল?

হাত নেড়ে বলল, আসেন, আসেন। আপনি আমারটাতেই যান। আসামিদের বাথরুমে গেলে আপনার নেশা ছুটে যাবে।

আমি চুপচাপ উনার পেছনে পেছনে গেলাম। দেখলাম টাইলস করা বাথরুম। যথেষ্ট পরিষ্কার। আরো অবাক হলাম যখন দেখলাম ইংলিশ কমোডের ফ্ল্যাশ পর্যন্ত ঠিক আছে!

এমন সময় খেয়াল হইল আমার মোবাইল প্যান্টের হাঁটুর নিচের বামদিকের পকেটটা অনেক ফুলে আছে। ওহ! সেই পাঁচ হাজার টাকা! ঊর্মি দিয়ে গেছিল রাতে যদি ইমরানের কিছু ইমার্জেন্সি দরকার হয়!

আমি এতক্ষণ হাসপাতাল, তিথি, ইমরান সব একদম ভুলে গেছিলাম। সত্যি সত্যি যদি এখন ইমরানের কিছু প্রয়োজন হয়! তিথি নিশ্চয়ই আমাকে ইচ্ছামত গালি দিচ্ছে! আর কিছু করার নাই্। ঊর্মির এই টাকাই সম্বল। মনে মনে ঊর্মিকে সরি বলে বাথরুম থেকে বের হয়ে আসলাম।

ওসিকে বললাম, দাদা, একটু শুনবেন?

ওসি শুনল। নিলাম শুরু করলাম দুই হাজার টাকা দিয়ে। পরে বাড়তে বাড়তে পাঁচ হাজার টাকাতেই দফারফা হল।

আমি এক ছুটে থানা থেকে বের হয়ে রিকশা নিলাম। একটু সামনে এগোতেই আমার মাথায় হাত।

আমি তো সম্মানিত মাদকদ্রব্যটিকে থানায় ফেলে এসেছি!

এখন আবার কোন মুখেই বা থানায় যাব! আর গিয়ে কিই বা বলব।

আমার মনে হইল রাইসুর একটা উচিত শিক্ষাই হোক এবার। থাক ওইখানে। আরো কিছুদূর এগোতেই কেমন খারাপ লাগা শুরু হল। পুলিশ তো তাকে মানুষ হিসেবেই শনাক্ত করতে পারে নাই!

সাত পাঁচ ভেবে আমি রিকশা ঘুরাতে বললাম। থাক, যা আছে কপালে!

১৩.
রিকশাটা গাঞ্জাচত্বর ওরফে ছবির হাট পর্যন্ত গেছে তখন দেখি এক অভূতপূর্ব দৃশ্য!

রাইসু তিন চারটা মেয়ের মাঝখানে বসে মহা আনন্দে কথা বলছে আর গরুর বট খাচ্ছে। এই তার এক স্বভাব। যেইখানে গরুর ভুড়ি পাবে, সেইখানেই খাবে। এ কারণে গরুরা যে কত খ্যাপা রাইসুর উপরে!

আমি তো পড়লাম মহা ফাঁপড়ে! এখন তো ওইখানে গিয়ে ডাক দেয়াও সম্ভব না। মেয়েদের সামনে ডাকলে তো পরে আমাকে দোষ দিবে এই বলে যে, আমি তার সম্ভাবনা নষ্ট করছি।

আবার না ডেকেও উপায় কী! সে যখন কোনো মেয়ের সাথে থাকে, মোবাইলটা ফ্লাইট মোডে রেখে দেয়। যারা ফোন করে তারা ভাবে নেটওয়ার্ক বা এ জাতীয় প্রবলেম বুঝি! ইচ্ছা করে টেলিটক সিম নিছে, হুদাই সব দোষ টেলিটকের ওপরে চাপায়।

ফোন করলে যেহেতু পাবো না এখন আমি করবোটা কি! কাঁচুমাচু করে দূরে দাঁড়ায়েই রাইসুর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলাম।

রাইসু গরুর বট খেতে খেতে বলল, কেমন আছ হে পারমিতা?

যেন তার সাথে কতদিন পরে দেখা!

আমি বললাম, আমি হাসপাতাল যাচ্ছি। তুমি কি যাবা?

সে খুব মজা হচ্ছে এমন ভঙ্গিতে বলল, হ্যাঁ যাব।

তারপর কিছুক্ষণ মেয়েগুলার সাথে ন্যাকামি ট্যাকামি শেষ করে সে রিকশায় এসে বসল।

রিকশা চলা শুরু করলে বলল, রাত জাগলে তো আমার রিংকল পড়বে মুখে। চোখের নিচে কালি পড়বে, আয়ু কমে যাবে।

আমি চিৎকার করে বললাম, তোমার কি কোনো লজ্জা টজ্জা নাই? তুমি থানায় এমন করলা কেন? একটা কথা কি তুমি বলতে পারতা না? আমাকে এমন হ্যারাস করার কী দরকার ছিল?

রাইসু বিড় বিড় করে বলল, “তোমার বয়স আমি ভালবাসি।”

হঠাৎ এই কবিতা শুনে আমার মাথায় একদম খুন চেপে গেল।

আমি সেই মুহুর্তে সিদ্ধান্ত নিলাম রাইসুকে ধাক্কা মেরে রিকশা থেকে ফেলে দিব। একটা ভালো মোমেন্টের আশায় আমি রাস্তার দিকে তাকায়ে থাকলাম।

এমন সময় রাইসু বলল, আচ্ছা, ইমরানের সাথে তোমার কী বলো তো?

“কী মানে?” বলেই আমি ধাক্কা মারার চেষ্টা করলাম। এবং অবশ্যই সেইটা ব্যর্থ হল।

রাইসু বলল, কী, ব্যাপার কী তোমার? ইমরানের কথা বলতেই এত ক্ষেপে গেলা?

আমি চিৎকার করলাম, জাস্ট শাট আপ!

রাইসু বলল, “শাট আপ?” কীসের শাট আপ? ইংলিশ মারতেছ কেন? একটা পোলার লগে রাত কাটানোর জন্য এত আগ্রহ কেন তোমার?

আমি দাঁত কিড়মিড় করে বললাম, পোলাটা হাসপাতালে রাইসু, অজ্ঞান।

রাইসু ফটাফট বলল, অজ্ঞান না আমাকে দেখে ভান করতেছে?

আমি তো আগ্নেয়গিরির মত ফুঁসে উঠলাম, তোমার সমস্যাটা কী?

রাইসু নির্বিকার। বলল, কী ব্যাপারে?

আমি বললাম, আমার ব্যাপারে। আমি ইমরানের সাথে থাকি আর কিমরানের সাথে থাকি তোমার কী? দ্যাটস নান অফ ইওর বিজনেস!

রাইসু মাথা নেড়ে বলল, অবশ্যই মাই বিজনেস। তোমার আম্মা না বলছে তোমারে দেখেশুনে রাখতে!

আমি তো অবাক! বললাম, কখন বলল সেইটা?

রাইসু বলল, ওই যে স্টেশনে! আমারে না বললো!

ওইটা তো ভদ্রতা হিসেবে বলছে। বলতে হয় তাই। তুমি আমার কোনো ব্যাপারে নাক গলাবার কোনো চেষ্টাও করবা না, খবরদার!

রাইসু বলল, এহ্। “আমার ব্যপার!” তোমার ব্যাপার আবার কী!

আমি বললাম, আমার ব্যাপার মানে আমার ব্যপার।

রাইসু বলল, তুমিটা আবার কে? এইসব টিনএজগিরি দেখাবা না। স্বাধীনতা ঘোষণা করতে আসছে, যত্তসব!

রাগে দুঃখে ক্ষোভে আমার তখন মাথা ফর ফর করছে। রিকশা ডিএমসির সামনে চলে আসল।

আমি বললাম, তুমি এইখানে থাকো। ওয়ার্ডে যাবা না।

রাইসু বলল, মানে? কেন যাব না? এতদূর সাহস তোমার! এই তোমার স্বাধীনতার নমুনা!

আমি তো কিছুই বুঝলাম এখানে স্বাধীনতার কী হইল! বললাম, মানে?

রাইসু বলল, ওখানে একা গিয়া কী করবা তুমি শুনি?

আমি অসম্ভব রেগে গেলাম, বললাম,রাইসু আমার ধৈর্য পরীক্ষা করো না, আমি মারামারি শুরু করব।

রাইসু বলল, আহ কী ডেসপারেট ! ছেলের কোনো ছেলে বন্ধু নাই! দুই বোনকে এখানে থাকতে হবে! কথা একখান! কোনো ধানাইপানাই চলবে না। আমি তোমার সঙ্গে যাব।

আমি সরাসরি বললাম, তিথি ক্ষেপবে। এতক্ষণ পরে যাইতেছি তার উপরে আবার তোমারে নিয়া!

রাইসু নির্বিকার। বলল, তুমি বড় না তিথি বড়?

১৪.
আমি ততক্ষণে হাঁটা শুরু করে দিছি। প্রত্যেকটা মানুষ ঘুমাচ্ছে। কারো গায়ের উপর তেলাপোকা যাচ্ছে। কারো কারো চাদরে পারা দিয়ে আমি সামনে যাচ্ছি। কারো মুখে হাতে পায়ে অজস্র নল, দেখলে ভয় লাগে। কারো লুঙ্গি উঠে আছে অশ্লীলভাবে। ব্লিচিং পাউডারের কড়া গন্ধ। তার উপর সারি সারি টিউবলাইট।

কেমন যেন অবসাদগ্রস্ত মনে হইল নিজেকে। এ হতাশার কোনো শেষ বা শুরু নাই। কোনো কারণও নাই, মানেও নাই। কিন্তু মনে হল আমি ক্লান্ত, খুবই ক্লান্ত।

ইমরান সার্জারি ওয়ার্ডে। এর আগে মা ও প্রসূতি ওয়ার্ড আর পরে মানসিক ওয়ার্ড। এদিকে গেলে এক ঝামেলা, মেন্টাল রোগীদের দেখতে হয়, হাতে পায়ে শিকল বাঁধা,অদ্ভুতভাবে হাসে, কেউ কেউ বিশ্রী ভঙ্গিও করে, গা শিরশির করে দেখলে। আবার মা ও প্রসূতি’র সামনে দিয়ে আসলে রাইসু ঘাটে ঘাটে দাঁড়ায়ে যায়।

আমি রাইসুকে বললাম, সোজা হাঁটবা, এদিক ওদিক তাকাইলে আমি তোমাকে মেন্টাল ওয়ার্ডে ভর্তি করায়ে দিব।

রাইসু বলল, মেন্টাল কেন? মা ও প্রসূতিতে দাও!

আমি হেসেই ফেললাম, বললাম, কেন? তুমি কি মা নাকি প্রসূতি?

রাইসু ঘাড় নেড়ে বলল, কিছুই না, থাকলাম অ্যাজ এ গেস্ট!

আমি আর কথা বাড়ালাম না। কথা বলাটাই একটা মস্ত ভুল। এত ধৈর্য্য আমার কোথা থেকে যে আসল তাই ভাবতেছি। ইমরানের ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি সে জ্বরে শেষ। তিথি বই পড়তেছে তখনো, নাম—‘দেয়াল’।

আমাকে দেখে বই থেকে মুখ না তুলে বলল, সাপোজিটোরি দিতে বলছে, ডাক্তার। বলেই সাপোজিটোরিটা আমার দিকে আগায়ে দিল।

আমি সেটা রাইসুকে দিয়ে বললাম, আমি আর তিথি বাইরে যাই, তুমি ওকে এইটা দিতে হেল্প করো।

রাইসু চিৎকার করে উঠল, মাথা খারাপ! আমি কেন ওরে সাপোজিটোরি দিতে যাবো! আমি কী চট্টগ্রামের লোক নাকি!

কীসের মধ্যে কী! মেজাজটা আরো খারাপ হইল।

বললাম, তাইলে আসছ কেন? থাকলা কেন? আমার বন্ধু থাকলে তো আমারে হেল্প করত, তুমি কি কারণে আসছ? ফ্যাশন করতে?

রাইসু বলল, আমার খুশি আমি আসছি, তোমার কী তাতে? তুমি আমার পার্সোনাল ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে পারো না!

সবচেয়ে লজ্জার ব্যাপার হল ইমরান তখন জেগে আছে। ভাগ্য ভালো ও চোখ বন্ধ করে আছে। তবে তিথি আমার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকায়ে আছে।

আমার মনে হচ্ছে এ সব যদি মিথ্যা হইত! যদি বাসায় যেতে পারতাম! যদি ঘুমাতে পারতাম! এ মুহূর্তে আমার ফালতু বিছানাটার চেয়ে আর কোনো কিছু আমার প্রিয় বলে মনে পড়ছে না।

এদিকে তিথি নার্সকে ডাকতে গেছে। রাতে একজন নার্স আর একজন ডাক্তার থাকার কথা। দুইজনেই রুম বন্ধ করে ঘুম। ডাক্তার তো তাও একবার উঠছিল, নার্স কিছুতেই সাড়া দিচ্ছে না। তিথি আরো জোরে জোরে নক করল।

নার্স ভেতর থেকে খেকিয়ে উঠল, কে?

তিথি ভড়কে গিয়ে বলল, আমি তিথি।

দরজার ওইপাশ থেকে নার্স বলল, তিথি আবার কী?

তিথি দুর্বল কণ্ঠে বলল, হেল্প লাগবে আপনার। একটু আসেন।

নার্স বলল, মারা গেছে না যাবে?

তিথির চেহারা দেখে আমি নিজেই গেলাম।

বললাম, এই যে আপা, আমার পেশেন্টকে সাপোজিটারি দিতে হবে। জ্বরে মরতেছে।

নার্স বলল, আর কাউরে বলেন। পাশের বেডের কাউরে বলেন, আমি পারতাম না।

এমন সময় রাইসু বলে উঠল যে তার নাকি পেট ব্যথা করতেছে।

আমি সিরিয়াসলি নিলাম, বললাম, বেশি ব্যথা?

রাইসু বলল, হ্যাঁ, খুব। আমাকে ডাক্তার দেখাও।

এই তো পড়লাম আরেক বিপদে! বললাম, এখন ডাক্তার পাব কই? সকালে আউটডোরে দেখাব নে?

রাইসু বলল, না না আমাকে ‘প্রসূতি ও মা’র ওইখানে নিয়ে যাও।

আমি অবাক হয়ে বললাম, কেন!

রাইসু বলল, পেট ব্যথা না! ওখানের ডাক্তার বলতে পারবে।

কী রকম একটা ফালতু কথা! বিরক্তি নিয়েই বললাম, তোমার কি লেবার পেইন নাকি?

রুমে যেন বজ্রপাত হল। রাইসু হেই হেই করে উঠল। বলল, মানুষের অসুস্থতা নিয়ে ফাজলামি!

আমি রাগের চোটে রাইসুকে ধাক্কা দিয়ে রুম থেকে বের করে দিলাম।

এরপর ইমরানের সাপোজিটোরির ব্যবস্থা করতে করতে অনেকক্ষণ কেটে গেল।

১৫.
হঠাৎ দেখি ঘড়িতে ছয়টা বাজে। মনে হল, রাইসু কই দেখে আসি।

প্রসূতির ওইখানে নাই,মানসিক ওয়ার্ডেও নাই, মহাকবিকে পাওয়া গেল নাক-কান-গলা ওয়ার্ডে। ওখানে এক মহিলা ডাক্তারের সাথে বসে বসে কথা বলতেছে সে। আমি চুপচাপ ওদের পেছনে দাঁড়ালাম।

ডাক্তারনি বলল, রাতে কী খেয়েছেন?

রাইসু বলল, কিছু খাই নাই।

ডাক্তারনি বলল, একেবারেই  কিছু না?

রাইসু বলল, অনেক হিমশিম খাইছি অবশ্য।

আমার মন চাইল রাইসুর কানের ওপরে জোরে একটা বাড়ি মারি। ঠিক তখনই ডাক্তার আর রাইসু দুজনই আমার দিকে তাকাল, তাই আমি আর চাপড়টা মারতে পারলাম না।

ডাক্তার বলল, আপনার নাক কান গলার কোনো সমস্যা থাকলে বলেন, এইটা তো নাক কান গলা ওয়ার্ড।

রাইসু বলল, আমার কানে কেমন কেমন জানি লাগে!

ডাক্তারনি বলল, কোথাও কখনো কানে আঘাত বা ব্যথা পেয়েছিলেন?

রাইসু আমার দিকে আঙুল তুলে বলল, হ্যাঁ, এই যে পারমিতা, আমার কানে আঙুল ঢুকায়ে দিছিল!

ডাক্তারনি আমার দিকে হা করে তাকায়ে থাকল। আমি রাইসুর দিকে। ডাক্তারনি আমাকে বলল, এরকম একটা উইয়ার্ড লোকের সাথে আপনি থাকেন কীভাবে!

এটা ঠিক যে আমি উইয়ার্ড লোকদের সাথেই মিশতে পছন্দ করি। কারণ বাকি সবাইকে প্রেডিক্ট করা যায়। কখন হাসবে, কখন রাগ করবে, কখন মোবাইল বের করবে সব আগে থেকে বলে দেয়া যায়। তাই ভদ্রলোকের চেয়ে উইয়ার্ড লোকই আমার পছন্দ। তবুও মানুষের ফাজলামির তো একটা সীমা থাকে! সারাটা রাত আমি ধৈর্য্য ধরে ছিলাম। এই ভোর ছয়টা বাজে এসে আমার কেমন মাথা আউলায়ে গেল। আমি রাইসুর কান ধরে হিড়হিড় করে তাকে টেনে নিয়ে গেলাম।

রাইসু চেঁচাচ্ছে আর বলতেছে, কই যাও, কই যাও, কই যাও!

আমি বললাম, হিমাগারে যাই রাইসু।

রাইসু বলল, হিমাগার? এইটা আবার কী!

আমি বললাম, মর্গ। গেলেই দেখবা।

মর্গে গিয়ে দেখি কোথাও কেউ নাই। সারি সারি ট্রে। আমি একটা খালি ট্রের দরজা খুলে সেখানে রাইসুকে রেখে দিলাম। এরপর দরজাটা ভাল মতন বন্ধ করে দিলাম।

তারপর বিদায়ের স্বরে বললাম, টা টা রাসপুটিন।

মর্গের কলাপসিবল গেটের তালা লাগাচ্ছি এমন সময় দেখি রাইসু পা দিয়ে ধুপধাপ বাড়ি দিচ্ছে ট্রের দরজায়।

আর চিৎকার করে বলতেছে, পারমিতা ১, পারমিতা ১, পারমিতা ১…।

১৯ জুন, ২০১৩

More from পারমিতা হিম

নারগিস (৪)

আমরা সেখানে অলিতে গলিতে হাঁটতাম আর যেই যেই বাড়ি পছন্দ হত সে...
Read More