বেশ আগের ঘটনা। প্রায় সাত আট বছর।

একটা পরিবারের মধ্যে যে কত রকম অন্ধকার সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে এবং লোভ, হিংসা, রাগ এসব মানবীয় কারণে সবচেয়ে চেনা মানুষটাও যে অচেনা হয়ে ওঠে ও অপ্রত্যাশিত কাজ করে বসে তার উদাহারণ এই ঘটনা।

মুশফিকের নতুন চাকরি। চাকরির শুরুতেই পোস্টিং নীলফামারীর সৈয়দপুরে। প্রাইভেট ব্যাংকের চাকরি, বেতন যথেষ্টর চেয়েও ভাল। চাকরির আবেদনের শর্তেই লেখা ছিল বাংলাদেশের যে কোনো জায়গায় কাজ করার ব্যাপারে আপত্তি থাকা যাবে না। ঢাকাতে বড় হলেও মুশফিক তখন ঢাকা ছাড়ার ব্যাপারে প্রচণ্ড আগ্রহী। সাত-আট বছর আগের ঢাকা এখনকার মত বসবাস অযোগ্য না হলেও, তখনও বসবাসের জন্য অসহ্য একটা শহর ছিল।

সৈয়দপুরের সেই ঘটনার পরে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে মুশফিকের। এবং সেটাই হয়ত স্বাভাবিক। সে ধার্মিক হয়েছে। শুধু আমাদের গ্রুপটার সাথেই না, যে কোনো যোগাযোগ ও সম্পর্কের ক্ষেত্রেই পরিশীলিত ও সাবধানী হয়ে উঠেছে সে।

মুশফিকের পরিকল্পনা ছিল সৈয়দপুরে গিয়ে এক সপ্তাহ বা দশ দিনের জন্য স্থানীয় একটা হোটেলে উঠে অফিস শুরু করবে। এর মধ্যে ছোট বা মাঝারি সাইজের একটা বাসা খুঁজে বের করবে।

পরিকল্পনা এই পথে থাকলেই হয়ত ভাল ছিল, কিন্তু পরিকল্পনার রাস্তা বদলে দিল মুশফিকের ভগ্নীপতি চন্দন। মুশফিকের একমাত্র বোন শারমিনের স্বামী। শারমিনের বয়স যখন সাড়ে সাত, তখন মুশফিকের জন্ম। সাড়ে সাত বছরের ছোট হলেও ভাই-বোনের সম্পর্ক অনেকটা পিঠাপিঠি ধরনের। বোন ভাইকে যেমন আদর করত, ভাইও বোন ছাড়া অন্য কিছু বুঝত না।

শারমিনের কাছে থেকে শুনে চন্দন মুশফিককে ফোন করে জানাল সৈয়দপুরে তার এক মামাত বোনের বিয়ে হয়েছে। সে তাদের সাথে কথা বলবে, মুশফিকের ওখানে গিয়ে হোটেলে ওঠার দরকার নেই। স্বাভাবিকভাবেই মুশফিক রাজি হয় নি। সে বলেছিল ভগ্নীপতির মামাত বোনের শ্বশুরবাড়িতে যেয়ে ওঠার কোনো ইচ্ছাই নেই। এর চেয়ে কোনো রকম সংকোচ ছাড়া রাস্তায় থাকাও তার জন্য অনেক আরামের হবে। পাল্টা যুক্তি দিয়ে চন্দন বলেছিল সংকোচের কথা চিন্তা করলে সেখানে থাকা নাকি রাস্তার থেকেও সুবিধাজনক, কারণ সেখানে শুধু তার মামাত বোন আর তার স্বামী ছাড়া আর কেউ থাকে না। চন্দনের জোরাজুরিতে শেষপর্যন্ত আর কোনো উপায়ান্তর না দেখে মুশফিক রাজি হয়েছিল।

সৈয়দপুর যাওয়ার তিন দিন আগে ভদ্রলোক নিজেই মুশফিককে ফোন করেছিল। চন্দনের মামাত বোনের স্বামী রায়হান। তার কথাবার্তা খুবই আন্তরিক। মুশফিকের সাথে প্রথমবারই ফোনে এমনভাবে কথা বলছিল যেন মুশফিক তার পূর্বপরিচিত। ভদ্রলোক মুশফিককে বলেছিল, আপনি শুধু কষ্ট করে সৈয়দপুরে পৌঁছাবেন, পরের দায়িত্বটা আমাদের। আমাদের ফ্যামিলির একজন মেম্বার হিসাবে এখানে থাকবেন।

মুশফিককে রায়হান ফোনে আগেই বলেছিল সে তাকে বাসস্ট্যান্ডে রিসিভ করবে। অথচ সে যখন মাঝরাস্তায় তখন সেই লোক ফোন দিয়ে জানাল হঠাৎ জরুরি কাজ পড়ে যাওয়ার কারণে সে থাকতে পারবে না, কিন্তু তাতে সমস্যা নেই, তার দোকানের একজন কর্মচারী বাসস্ট্যান্ডে থাকবে।

সেই কর্মচারীর কাছে মুশফিকের ফোন নাম্বার দেওয়া ছিল। সে নিজেই মুশফিককে খুঁজে বের করে যথেষ্ট খাতির যত্ন করে মুশফিককে সেই বাড়িতে পৌঁছে দিল।

গেট দিয়ে ঢুকে বাড়িটা দেখে মুশফিক ভীষণ মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। যদি কখনো সেই ঘটনার প্রসঙ্গ ওঠে রায়হান এখনো সেই বাড়িটা নিয়ে তার মুগ্ধতার কথা বলে। স্টিলের গেট দিয়ে ঢুকলেই প্রথমে চোখে পড়ে  সাদা রঙের একতলা একটা বাড়ি। সামনে মাঝারি সাইজের উঠান। বাড়িটার ছাদে নকশা করা রেলিং। উঠানের শেষ প্রান্তে সাদা রঙের একতলা সেই বিল্ডিং আর এই প্রান্তে ছোট একটা টিনশেড বিল্ডিং, ক্রিম রঙের। গেট দিয়ে ঢুকলে শুরুতেই, হাতের ডানে পড়ে সেই টিনশেড বিল্ডিং। দুই বিল্ডিং এর মাঝখানে ঘাসে ঢাকা উঠান। উঠানের বাম পাশে কংক্রিটের রাস্তা, রাস্তার শেষে একটা টিনের ছাউনি, সম্ভবত গাড়ি রাখার জায়গা। আর উঠানের ডানপাশের দেয়াল ঘেঁষে একটা জবা গাছ, একটা মেহেদি গাছ, কয়েকটা পাতা বাহারের গাছ, একটা মোজাইক করা বেঞ্চ।

চন্দনের মামাত বোন, রায়হানের স্ত্রী বন্যা বাড়িতেই ছিল। অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি নিয়ে সে অপেক্ষা করছিল। বন্যার বয়স তখন মুশফিকের মতই, ২৬-২৭, বা বড়জোর ২৮। খুবই হাসিখুশি ও সহজ স্বভাবের।

মুশফিককে সে প্রথমেই বলেছিল, ভাইয়া, এখানে নিজের মনে করে থাকবেন, কোনোরকম সংকোচ করলে কিন্তু আমরা কষ্ট পাব।

মুশফিক হেসে বলেছিল, যে কয়দিন থাকব নিজের মত করেই থাকব।

বন্যা উত্তর দিয়েছিল, যে কয়দিন মানে! যতদিন সৈয়দপুরে থাকবেন এখানেই থাকবেন। অন্য কোথাও তো যেতে দিব না।

মুশফিকের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল সামনের সেই টিনশেডে। দুটি ঘর। কিছু আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো-গোছানো। অবশ্য আসবাবপত্র বলতে বেশি কিছুও না। সে যে ঘরে থাকবে সেখানে একটা খাট, একটা ওয়াড্রোব, ওয়াড্রোবের উপর একটা টেলিভিশন, আর একটা গোলাকার টেবিল ও তার সাথে চেয়ার। পাশের ঘরে বেতের সোফা, একটা শোকেস ও পুরাতন একটা আলমারি। থাকার জায়গাটা মুশফিকের পছন্দ হয়েছিল। ঘরে বেশ অনেকখানি জায়গা, স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করা যায়। পিছনের জানালা খুললেই বাইরের রাস্তা। ঘরে বেশ আলো-বাতাস পাওয়া যায়। পরে বন্যা জানিয়েছিল তাদের আত্মীয়-স্বজন বেড়াতে আসলে এই ঘর ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে রায়হানের বড় ভাই ডাক্তার, ঢাকায় থাকে, সে কালেভদ্রে স্ত্রীসহ সৈয়দপুরে আসলে এখানেই থাকে।

রাতে যখন রায়হানের সাথে কথা হল দেখা গেল মুশফিক যতটা আন্দাজ করেছিল এই লোক তার চেয়েও অমায়িক। ভদ্রলোক ব্যবসায়ী। স্বভাবগতভাবেই  সবসময় একটা তাড়াহুড়ার মধ্যে থাকেন। মুশফিকের ভগ্নীপতি তাকে বলে দিয়েছিল এরা অনেক পয়সাওয়ালা। মুশফিক বুঝতে পারল উপর থেকে যতটা বোঝা যায়, এদের টাকা-পয়সার পরিমাণ তার থেকেও বেশি। তবে একটা ব্যাপার চোখে সামান্য বাধে, স্ত্রীর সাথে ভদ্রলোকের বয়সের পার্থক্য প্রায় ১০-১২ বছর। বয়স ৩৮ এর কম না।

মুশফিক সেখানে থেকেই নিয়মিত অফিস শুরু করল। সকালে অফিসে চলে যায়। বিকালে অফিস ছুটির পরে ছোট্ট মফস্বল শহরে পায়ে হেঁটে একটু ঘোরাফেরা করে সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে চলে আসে। সকালে বের হওয়ার আগে ওই বাড়ির কাজের মেয়েটা নাস্তা দিয়ে যায়। সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে ফ্রেশ হওয়ার পরে কোনোদিন বন্যা, কোনোদিন কাজের মেয়েটা চা নিয়ে আসে। আর রাতে প্রতিদিন কাজের মেয়েটাকে সাথে করে বন্যা নিজেই খাবার নিয়ে আসে।

রায়হানের সাথে দেখা হয় কম। সে বেশ রাত করে বাসায় ফেরে। প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে এসে মেইন গেটে তালা লাগিয়ে যায়। তখন কোনো কোনো দিন মুশফিক জেগে থাকলে এসে খোঁজ-খবর নিয়ে যায়, দুই মিনিট কথা বলে যায়। মুশফিকের মনে হয়েছে এই লোক প্রকৃত ব্যবসায়ী। কিছু মানুষ থাকে যাদের টাকা-পয়সা উপার্জনই একমাত্র লক্ষ্য, কিন্তু টাকা পয়সা ভোগ করার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র আগ্রহ থাকে না, এই লোক সেই ধরনের।

রায়হান-বন্যা দম্পতির সত্যি অসাধারণ আন্তরিকতা ছিল। মুশফিকের কখনো মনে হয় নি সে তাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের পরিচিত, মনে হয়েছে সে তাদের নিজেদেরই পরিচিত, কাছের কেউ। কিন্তু তাদের দিক থেকে যে ঘনিষ্ঠতা ছিল, মুশফিক তার নিজের স্বভাবগত আড়ষ্টতার কারণেই সেই ঘনিষ্ঠতায় সমানভাবে সাড়া দিতে পারে নি। একটা পরিবারে বাইরের একজন মানুষ হিসেবে তার নিজেকে আশ্রিত মনে হত সবসময়।

মুশফিকের চিন্তা ছিল এখানে থাকতে থাকতেই পছন্দমত একটা বাসা খুঁজে বের করবে। সবকিছু ফাইনাল হয়ে গেলে তাদেরকে জানাবে।

রায়হান ও বন্যাকে সে প্রায়ই বলত যে এখানে থাকা-খাওয়া বাবদ একটা পরিমাণ টাকা যেন তারা তার কাছে থেকে নেয়। সে যদি এখানে পেইং গেস্ট হিসাবে থাকতে পারে তাহলে তার জন্য সুবিধা হয়। বন্যার উত্তর ছিল, আরে পাগল নাকি! আর এই প্রস্তাবে রায়হান প্রতিবারই হেসে বলত, সে দেখা যাবে! যার অর্থ, প্রশ্নই আসে না!

শুক্রবারে রায়হান বাসায়ই থাকত। সকালের পরে দোকানের কর্মচারী বা ম্যানেজার গোছের কেউ আসলে তার সাথে হিসাব-পত্র নিয়ে বসত। দুপুরের পরে আসত বয়স্ক এক গানের শিক্ষক। তার সাথে হারমোনিয়াম নিয়ে বারান্দায় রেওয়াজে বসত বন্যা। বেশিরভাগই নজরুল সঙ্গীত গাইত। মুশফিকের গান-বাজনার প্রতি কোনোকালেই কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে এটা বুঝতে পারত বন্যার গানের গলা অসাধারণ না, খুবই মাঝারি মানের, কিন্তু সুরের উপর তার বেশ আয়ত্ত আছে। হয়ত অনেক ছোটবেলা থেকেই গান শিখছিল। একটা গান খুবই চমৎকার গাইত। প্রতি শুক্রবার সে অবশ্যই একবার এই গানটা গাইত:

“মাঝরাতে মোর আঁধার ঘরে
কে যে ক্ষণে ক্ষণে আসা যাওয়া করে”

মুশফিক সৈয়দপুরে গিয়েছিল মার্চের ১৯ তারিখে। এপ্রিলের মাঝামাঝি সে পছন্দমত একটা বাসা খুঁজে পায় এবং মাসের শেষে সেখানে ওঠার পরিকল্পনা করেছিল। রায়হান বা বন্যা কাউকে জানায় নি, ভেবেছিল সেখানে উঠার এক সপ্তাহ আগে তাদেরকে বিষয়টা জানাবে।

এরই মধ্যে ঘটনাটা ঘটে। বন্যা দুই-তিন দিনের জন্য গিয়েছিল দেবীগঞ্জ। দেবীগঞ্জ তার বাপের বাড়ি। সাথে করে কাজের মেয়েটাকে নিয়ে গিয়েছিল।

মুশফিক সকালে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হবে। বারান্দা থেকে নামার সময় লক্ষ্য করে গেটের কাছে, কংক্রিটের রাস্তার ধারে কেউ উলটা হয়ে পড়ে আছে। সে দৌড়ে কাছে গিয়ে দেখে সেটা রায়হান। পরনে লুঙ্গি এবং গেঞ্জি। মুশফিক মনে করেছিল স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাক। সোজা করার পরে বুঝতে পারে দেহে প্রাণ নেই। কংক্রিটের উপর পড়ে কপালের ডান পাশে থেঁতলে গেছে। কোটর থেকে চোখ বেরিয়ে এসেছে। তখন মুশফিক খেয়াল করে গলায় নীল রঙের প্লাস্টিকের একটা দড়ি পেঁচানো। সে এই দড়িটা তার বারান্দায় টানিয়েছিল কাপড় শুকাতে দেওয়ার জন্য। গলায় দড়ির দাগ কেটে বসে গেছে।

মুশফিক বুঝে উঠতে পারে না সে কী করবে, কাকে ডাকবে। সে তো এখানে কাউকে চেনেও না। সে তখন তার ভগ্নীপতি চন্দনকে ফোন করে সবকিছু খুলে বলে। তারপর রায়হানের আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতরা আসতে শুরু করে। আশেপাশে জানাজানি হয়ে যায়। লোকজনের ভিড়ে বাড়ি ভরে যায়। উঠানে দাঁড়ানোর জায়গা পর্যন্ত নেই এমন অবস্থা। সবাই জানতে চায় কীভাবে এই ঘটনা ঘটল, ঘটনার শুরু কোথা থেকে। মুশফিক যেহেতু কাউকে চেনে না, তাকেও কেউ চেনে না, ফলে তাকে নিয়ে শুরু হয় কানাঘুষা। মুশফিকের জন্য ঘটনা বিপদজনক দিকে মোড় নেয়!

আত্মীয়-স্বজন যারা এসেছিল তাদের মধ্যে শুধু একজনের সাথেই মুশফিকের ভালোমত পরিচয় ছিল। চন্দনের ছোট ভাই নোমান। সে-ই মুশফিকের কাছে থেকে ঘটনা জেনে অন্যদেরকে জানায়।

পুলিশ আসে। বন্যা এসে পৌঁছানোর আগেই পুলিশ আলামত সংগ্রহ করে লাশ পোস্টমর্টেমের জন্য নিয়ে যায়।

পরের দিন জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মুশফিককে থানায় যেতে হয়। লাশের ময়নাতদন্তে দেখা যায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। পিছন থেকে গলায় দড়ি পেঁচিয়ে টেনে ধরা হয়েছিল, এক পর্যায়ে পড়ে গিয়ে কপালে আঘাত লাগে। এই ঘটনায় বন্যা খুব ভেঙে পড়ে। লাশ দাফনের পরের দিন অফিস থেকে জরুরি ছুটি নিয়ে মুশফিক ঢাকায় চলে আসে।

মুশফিক ধারণা করেছিল হয়ত ব্যবসায়িক শত্রুতার কারণে রায়হান খুন হয়েছে। ঢাকায় আসার পরে জানতে পারে, ওই রাতে নাকি ওই বাড়িতে ডাকাতিও হয়েছিল। ঘটনার উত্তেজনায় বন্যা প্রথমে টের পায় নি। পরে দেখে আলমারির জিনিস তছনছ করা হয়েছে এবং আলমারির ভিতরে ৬৮ হাজার টাকা ছিল সেটা নেই।

দুইদিন পরে পুলিশ এসে মুশফিককে গ্রেফতার করে ঢাকা থেকে নীলফামারী নিয়ে যায়। সে জানতে পারে হত্যা এবং ডাকাতির মামলায় প্রধান সন্দেহভাজন আসামি হিসাবে তার নাম ঢোকানো হয়েছে। এর পিছনে অবশ্য কারণও ছিল। সারা বাড়ি তল্লাশি চালানোর সময় মুশফিক যে ঘরে থাকত সেই ঘরের ওয়াড্রোবের উপরের ড্রয়ারের তালা ভেঙে কাপড়ের ভাঁজে ৬৮ হাজার টাকার বান্ডিল পাওয়া যায়। ওই একটামাত্র ড্রয়ারেই তালা দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। চাবি তখনও ঢাকায় মুশফিকের কাছে।

মাত্র ৬৮ হাজার টাকার জন্য মুশফিক একজনকে খুন করেছে আবার সেই টাকা তালা দিয়ে রেখে ঢাকায় চলে এসেছে—এই কথা যতই হাস্যকর শোনাক, তখন ঘটনা পরম্পরায় সেটা তা শোনায় নি। আর পুলিশ কেসে তো এই ঘটনা আরো সিরিয়াস।

মুশফিক পরিস্থিতির জটিলতার মধ্যে পড়ে যায়। পুলিশ এই ঘটনার সুরাহাও করতে পারছিল না, আবার মুশফিকের বিরুদ্ধে শক্ত প্রমাণও হাজির করতে পারছিল না। মুশফিকের ভগ্নীপতি চন্দন তখন মুশফিকের জন্য বেশ দৌড়াদৌড়ি করছিল, কিন্তু কোনো সুবিধা করতে পারে নি। মামলা নিম্ন আদালতে ছিল, মুশফিকের জামিন আটকে যায়।

 

২.
শেষপর্যন্ত কাকতালীয় ও খুব অদ্ভুতভাবে এই রহস্যের সমাধান হয়, আসল ঘটনা বের হয়ে আসে। মুশফিক বলে সৃষ্টিকর্তা নিজে ব্যাপারটাতে হস্তক্ষেপ করেছিল বলেই সে এটা থেকে বের হতে পেরেছে। আমরা যতই হাসি, যতই বলি যে তাহলে তো সব রহস্যেই সৃষ্টিকর্তা হস্তক্ষেপ করতেন, সৃষ্টিকর্তার তো হস্ত নাই, তিনি তো নিরাকার; মুশফিক পাত্তা দেয় না।

যে ঘটনার মাধ্যমে সমাধান হয়েছিল সেটার সাথে মুশফিকের সংশ্লিষ্টতা ছিল না, মুশফিক তখন জেলে। ফলে পুলিশের বয়ানে ঘটনাটা যে রকম সেটাই একমাত্র অবলম্বন।

তবে যদি কোনো ডিটেকটিভ এই ঘটনার প্রোটাগনিস্ট হিসেবে কাজ করত তাহলে গল্প হিসেবে এই পুরা ঘটনার সার্থকতা পরিপূর্ণ হত।

এখানে হয়ত বলে রাখা ভাল যে রায়হানের ওই ঘটনার পরে, প্রায় মাসখানেক পরেই সৈয়দপুরে আরো একটা খুনের ঘটনা ঘটে।

রায়হান খুন হওয়ার মাস দুয়েক পরের কথা।

পার্বতীপুরের অনাথ কর্মকারেরা কয়েক পুরুষ ধরে গয়নার কারিগর। কয়েক পুরুষ ধরে তাদের গয়নার ব্যবসা। এখন তার বয়স ৮০’র উপরে। বাপের আমলের সেই লক্ষ্মী অলঙ্কার বিতান এখনো নিজেই চালান। একমাত্র ছেলে জীবন কর্মকার। ব্যবসা বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই হোক আর বাপের সাথে ব্যক্তিত্বের সমস্যার কারণেই হোক এখন একটু দূরেই আলাদাভাবে নিজেই ব্যবসা শুরু করেছে—শ্রাবণী জুয়েলার্স।

সেই শ্রাবণী জুয়েলার্সেই এক লোক পাথর বসানো একটি আংটি নিয়ে আসে দরদাম করার জন্য। আংটিতে বসানো পাথরটি ছিল নীলা। জীবন কর্মকার সেই লোককে দোকানে বসিয়ে রেখে অনাথ কর্মকারের কাছে আসে পাথর সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য। হাতে নিয়ে ভারি লেন্সের চশমা দিয়ে একবার দেখেই অনাথ কর্মকার বুঝতে পারে পাথর অরিজিনাল, কিন্তু তার চেয়েও আরও বড় একটা ব্যাপার ধরে ফেলে সে—এই আংটি তার নিজের হাতেই তৈরি। প্রকৃত ঘটনা হল এই আংটি আর পান্না বসানো আরো একটা আংটি একসাথে বানিয়েছিল অনাথ কর্মকার। ৪০ বছরেরও বেশি সময় আগে।

অনাথ কর্মকারের বাল্যবন্ধু ছিল ধীরেন ঘোষ। ছোটবেলা থেকে দুজনে একসাথেই পার্বতীপুরে বড় হয়েছে, পরে ধীরেন ঘোষরা পার্বতীপুর ছেড়ে সৈয়দপুরে গিয়ে ব্যবসা শুরু করে। তরুণ বয়সে দুই বন্ধুরই ছিল ভ্রমণের নেশা। সংসারজীবনে প্রবেশের পরও প্রায়ই সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে দুই বন্ধু একসাথে বেরিয়ে পড়ত। সেরকমই একবার পাঞ্জাব ঘুরে রাজস্থান হয়ে আসার সময় জয়পুরে এক ইহুদী লোকের সাথে পরিচয় হয়েছিল ধীরেন ঘোষের। সেই ইহুদী ছিল যাযাবর, এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরত, রত্ন পাথরের ব্যবসা করত। তার কাছে থেকে একটা নীলা আর একটা পান্না কিনেছিল ধীরেন। অনাথই তাকে পরামর্শ দিয়েছিল পাথর দুটি চমৎকার। দেশে আসার পরে ধীরেনের কথাতেই পাথর দুটি দিয়ে তাকে দুটি রুপার আংটি তৈরি করে দিয়েছিল অনাথ।

ধীরেন ঘোষ আংটি দুটি সবসময় পরতেন। নয় বছর আগে তিনি মারা যাওয়ার পর থেকে তার ছেলে ধীমান আংটি দুটি সবসময় হাতে রাখত। প্রথমদিকে ধীমান ছিল একটু বখে যাওয়া, বাপ মারা যাওয়ার পরে নিজেদের পারিবারিক মিষ্টির ব্যবসা কনভার্ট করে বেকারী খুলেছিল সে, ঘোষ বেকারী। শহরের ভিতরেই দোকান।  ধীমান ঘোষদের সাথে অনাথ কর্মকারের পারিবারিক যোগাযোগ বজায় ছিল।

তিন সপ্তাহ আগে একদিন সকালে, সৈয়দপুরে পাইকারি কাপড়, চাদর যে দোকানগুলিতে বিক্রি হয়, তার পাশের গলিতে ড্রেনের পাশে একটা লাশ পাওয়া যায়। পৌরসভার যেসব কর্মীরা সকালে রাস্তা-ঘাট ঝাড়ু দিত তারা প্রথমে দেখতে পেয়েছিল। পরে দেখা যায় সেটা ধীমান ঘোষ। মাথায় গভীর আঘাতের চিহ্ন, কোনো কিছু দিয়ে মাথায় জোরে বাড়ি মারা হয়েছিল। পাজরের নিচে দুইবার ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।

সেই ধীমান ঘোষের হাতের পিতৃপ্রদত্ত দুটি আংটির একটিই আবার ঘুরে এসে পড়েছে অনাথ কর্মকারের হাতে। ধীমানের অকাল মৃত্যুর খবর জানতেন তিনি। অনাথ কর্মকার বিচক্ষণ মানুষ। উত্তেজিত না হয়ে তিনি খুবই ঠাণ্ডা মাথায় ঘটনার দিকে আগালেন।

জীবন কর্মকার সেই লোককে তার কাছে নিয়ে আসলে অনাথ কর্মকার জিজ্ঞাসা করে, আংটির মালিক কে?

সেই লোক উত্তর দেয়, আমিই। আমাদের পারিবারিক জিনিস।

অনাথ কর্মকার অভিজ্ঞ মানুষ। সে আস্তে আস্তে বলে, কার কাছ থেকে কিনছেন? মিথ্যা বলবেন না, মিথ্যা বললে ঘটনা অনেকদূর যাবে।

অনাথ কর্মকার ভাল মত চাপ দিলে সেই লোক জানায় সে পার্বতীপুরেরই। কয়েকদিন আগে তাদের এলাকার  এক মহিলার কাছে থেকে ১২ হাজার টাকায় দুটি আংটি কিনেছে। আরেকটা আংটিও তার বাড়িতেই আছে। অনাথ এবং জীবন কর্মকার তার ঠিকানা রেখে দিয়ে তাকে চলে যেতে বলে। এবং অনুরোধ করে সে যেন টুঁ শব্দটি না করে।

এরপরে অনাথ কর্মকার ধীমানের মা’কে সাথে নিয়ে পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে।

জীবন কর্মকারের দোকানে আসা ওই লোকের কাছে যে অল্পবয়স্ক মহিলা আংটি বিক্রি করেছিল পুলিশ তাকে ধরে। সেই মহিলা পার্বতীপুরেরই, বিয়ে হয়েছে পাশের সৈয়দপুরে। সে জানায় তার স্বামী তাকে এই আংটি দুটি দিয়ে বলেছিল তার বাপের বাড়িতে গিয়ে ওই এলাকার পরিচিত কারো কাছে বিক্রি করতে।  পুলিশ তার স্বামীকে গ্রেফতার করে। ৩০-৩২ বছর বয়স। নাম জুয়েল, সৈয়দপুরের স্থানীয়। বখাটে ধরনের বলতে যা বোঝায়, তাই ছিল। পরবর্তীতে দুটি মাইক্রোবাস কিনে রেন্ট-এ-কারের ব্যবসা শুরু করেছে। একটাতে সরাসরি সে নিজেই ড্রাইভার।

জুয়েল স্বীকার করে ধীমান ঘোষকে আসলে সে-ই খুন করেছে। এবং মারার পরে হাত থেকে আংটি দুটি খুলে নিয়েছে। কিন্তু ধীমানকে খুন করার পিছনে তার মোটিভ কী? পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জুয়েল যখন জানায় কোন ঘটনা আসলে তাকে ধীমানকে খুন করা পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেল, তখনই আমাদের মুশফিকের বিনা দোষে খুনের মামলায় আটকে যাওয়ার পিছনের রহস্য স্পষ্ট হল। সেটাই আসলে এই গোলকধাঁধার কেন্দ্র।

ধীমানকে খুন করেছে জুয়েল। আর, দুই মাস আগে বন্যার স্বামী রায়হান খুন হয়েছে ধীমান এবং জুয়েল দুজনের হাতেই। কাজটা করার জন্য জুয়েলের সাথে ধীমানই যোগাযোগ করেছিল প্রথমে। তবে এইখানে আরো এক ব্যক্তির নাম বেরিয়ে আসে। দেখা যায় এই গোলকধাঁধার কেন্দ্রে ছিল একজনের একটা অপূর্ণ প্রেমের সম্পর্ক এবং আরেকজনের লোভ।

ধীমান ঘোষ আর জুয়েল দুজন মিলে রায়হানকে খুন করলেও, পরিকল্পনা আরেকজনের। সৈয়দপুর বাজারে রায়হানের রড সিমেন্টের দোকান থেকে সামান্য দূরেই ধীমানের বেকারীর দোকান, ঘোষ বেকারী। এক দোকান থেকে আরেক দোকান দেখা না গেলেও, হাঁটা পথে এক-দেড় মিনিটের বেশি লাগত না। যে এই ঘটনার পরিকল্পনাকারী,  সেই লোকের সাথে ধীমানের আগে থেকেই হয়ত জানাশোনা ছিল। তবে ঘটনার বেশ কিছুদিন আগে থেকে সেই লোক ধীমানের সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে। সে প্রস্তাব দিলে, তার সাথে ধীমানের দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে  কাজটা করার সমঝোতা হয়।

তখন ধীমান জুয়েলের সাথে যোগাযোগ করে। পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য সে তার সাহায্যকারী হিসাবে জুয়েলকে সাথে নেয়। জুয়েলকে ধীমান বলেছিল কাজটাতে তার কোনো ঝুঁকি নাই। ঘটনা এমনভাবে ঘটবে ও এমন সময়ে ঘটবে যে কেউ অন্যকিছু সন্দেহ করার সুযোগই পাবে না। আর পরিকল্পনা এত নিখুঁত যে চান্স মিস হওয়ারও সুযোগ নাই। কাজ শেষে, অর্থাৎ রায়হানকে মারার পরে জুয়েল পঞ্চাশ হাজার পাবে।

কিন্তু ঘটনার পরে, মূল যে পরিকল্পনাকারী, সে ধীমানকে পুরো টাকা দিলেও ধীমান জুয়েলকে দিয়েছিল সাকূল্যে পনের হাজার টাকা। জুয়েল এমন একটা অবস্থায় পড়ে গিয়েছিল যে সে কাউকে কিছু বলতেও পারছিল না, বার বার চেষ্টা করেও তার পাওনা টাকা উদ্ধার করতে পারছিল না। ধীমান ঘোষকে কোনো রকম ব্ল্যাকমেইল করার বা ক্ষমতা দেখানোর সুযোগ যেহেতু জুয়েলের ছিল না, সে ভেবেছিল তাকে শেষমেশ ভয় দেখিয়ে বা শাসানোর মাধ্যমে যদি কোনো কাজ হয়, কিন্তু বাদানুবাদের এক পর্যায়ে সে মেজাজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ধীমানকে আক্রমণ করে।

ধীমান ঘোষের হত্যাকে এক ধরনের দুর্ঘটনা বলা গেলেও, রায়হানের খুন ছিল সুপরিকল্পিত।

যার নাম বেরিয়ে আসে সেই লোকটা হল চন্দনের ছোট ভাই নোমান। মূল পরিকল্পনাকারী সে-ই। রায়হানের সাথে নোমানের কোনো শত্রুতা ছিল না। রায়হানের জানামতে তো অবশ্যই না। কিন্তু নিজের অজান্তেই শত্রু হিসাবে নোমানের টার্গেটে পড়ে যায় রায়হান। ঘটনার শুরু বছর দুই-আড়াই আগে থেকে। বিয়ের আগে বন্যার সাথে নোমানের প্রেম ছিল। বন্যার বিয়ের পর জিনিসটা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। বন্যার দিক থেকে তা হয়েও গিয়েছিল, কিন্তু নোমান ঝুলে থাকে। সে-ই বন্যার সাথে যোগাযোগ রাখত। বন্যা সাড়াও দিত না, আবার পুরোপুরি এড়াতেও পারত না। রায়হানকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা প্রথমে পাগলামি চিন্তা হিসাবে নোমানের মাথায় আসলেও পরে সে আর এই চিন্তা থেকে বের হতে পারে নি।

জিজ্ঞাসাবাদে জুয়েল জানিয়েছিল সেই রাতে তারা, অর্থাৎ জুয়েল ও ধীমান ঘোষ আগে থেকেই পিছনের টিনের ছাউনিতে লুকিয়ে ছিল। রায়হান গেটে তালা লাগাতে বের হলে অন্ধকারে পিছন থেকে দড়ি দিয়ে তার গলা পেঁচিয়ে ধরে তারা। নোমানের কথা মতোই তারা আলমারি তছনছ করে টাকার দুইটা বান্ডিল নিয়ে নোমানকে দিয়েছিল।

পুলিশের জেরায় নোমান বলেছিল, যেদিন সকালে মুশফিক রায়হানের লাশ পেয়েছিল ওইদিনই দুপুরের পরে সে সুবিধামত টাকার বান্ডিলটা মুশফিকের ড্রয়ারে রেখে দেয়।

নোমান স্বীকার করেছে যে এই ঘটনার বা পরিকল্পনার ব্যাপারে বন্যা কিছুই জানত না।

জুয়েল এবং নোমানকে এই মামলায় আসামী করা হয়। তাদের জবানবন্দি সহ এই মামলা আবার কোর্টে ওঠে। মুশফিক বের হয়ে আসে।

এরপরে বন্যা একদিন মুশফিকের সাথে দেখা করতে এসেছিল। মুশফিকের কাছে ক্ষমা চেয়ে বার বার আক্ষেপ করছিল, ওইদিন সে দেবীগঞ্জ না গেলে এই ঘটনা ঘটতে পারত না। মুশফিক বন্যাকে দোষ দিতে পারে নি। বন্যা জানিয়েছিল সে একদিন একা জেলে গিয়ে নোমানের সাথে দেখা করে এসেছে, নোমানকে জিজ্ঞেস করেছিল কীভাবে সে এই কাজটা করতে পারল! নোমান কোনো উত্তর দেয় নি। এক পর্যায়ে নোমান বলেছিল মুশফিককে ফাঁসানোর কোনো ইচ্ছাই নাকি তার ছিল না, ঘটনার শুরুতে মুশফিকের কথা তার মাথায়ই ছিল না। মুশফিকের বোন শারমিনই নাকি মুশফিককে ফাঁসানোর বুদ্ধি দিয়েছিল। সে সেটা আর পুলিশের কাছে বলে নি।

মুশফিক বন্যাকে অবিশ্বাস করতে চায় নি।  সে বিষয়টা নিয়ে ভেবেছে। মুশফিক না থাকলে তাদের পৈতৃক বাড়ি এবং যতটুকু সম্পত্তি আছে সেটা পরবর্তীতে সম্পূর্ণই শারমিনের ছেলেরই পাওয়ার কথা।

Write A Comment