Pages Menu
TwitterRssFacebook
Categories Menu

Posted by on Jun 27, 2014 in সাক্ষাৎকার | Comments

‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্প নিয়ে হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে আলাপ

‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ গল্প নিয়ে হাসান আজিজুল হকের সঙ্গে আলাপ

হাসান ভাইয়ের এই সাক্ষাৎকারটা আমি নিছিলাম ২০০৮ সালে। ফোনে। ল্যান্ডফোনে। উনি সে সময় ছিলেন ওনার রাজশাহীর বাসায়। সকালের পরে দুপুরের কাছাকাছি একটা টাইমে জানুয়ারি মাসে ঢাকা থিকা ফোন কইরা ইন্টারভিউটা নেই আমি।
হাসান ভাইয়ের আরো দুইটা ইন্টারভিউ আমার নেওয়া আছে। একটা ঔপন্যাসিক ও নাট্যকর্মী লীসা গাজীর তদারকিতে নেওয়া, ওই ২০০৮ সালেই। আরেকটা বোধকরি ২০১১ সালে নেওয়া।
হাসান ভাইরে আমি প্রথম দেখি ১৯৯১/৯২ সালে আমার বন্ধু লীসা গাজীদেরই রাজশাহীর সরকারী বাসার দোতলা থিকা, কোনো একটা অনুষ্ঠানে, রাতে। লীসার মাধ্যমে পরিচয় ঘটে নাই।
পরিচয় হয় তারও পরে, সম্ভবত ১৯৯৩ সালে। সেই সময়ের নতুন পরিচয় হওয়া বন্ধু মাসরুর আরেফিনের সঙ্গে ওনার বাসায় গেছিলাম, রাজশাহীতে। আমরা খুলনা থিকা ট্রেনে কইরা গেছিলাম কি রাজশাহীতে? মনে নাই। এরপরও অনেক বারই হাসান ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ হইছে নানা জায়গায়। কখনো সাহিত্য নিয়া আলাপ হয় নাই।  তাঁর ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ নামকরা এবং গুরুত্বপূর্ণ গল্প। এই গল্প নিয়াই ইন্টারভিউটা। আমি টেলিফোনে ইন্টারভিউ নেয়ার প্রস্তাব করলে উনি দিতে রাজি হন। তবে ‘আত্মজা’ গল্প ছাড়াও অনেক কিছুই আসছে আলাপে।  – ব্রাত্য রাইসু

ব্রাত্য রাইসু

গল্পটা…

হাসান আজিজুল হক

হ্যাঁ…

রাইসু

ছিষট্টি সালে লেখা দেখতেছি।

হাসান

ছেষট্টি সালে লেখা। যতদূর মনে হয় ছেষট্টি সনের শীতের শেষ দিকটায় লেখা।

রাইসু

এটা কি আপনি খুলনা থাকার সময়?

হাসান

খুলনায় থাকার সময়।  আমি তখন দৌলতপুর ব্রজলাল কলেজের অধ্যাপক। এবং ব্রজলাল কলেজ তো খুলনা শহর থেকে যশোরের দিকে।  তার মানে উত্তরের দিকে হচ্ছে তোমার সাত মাইল। আর আমি থাকতাম কিন্তু ফুলতলা বলে একটা জায়গা। এটা হচ্ছে খুলনা শহর থেকে চৌদ্দ মাইল। এই খুলনা শহর থেকে চৌদ্দ মাইল এবং দৌলতপুর কলেজ থেকে তাইলে হবে এই আট মাইলের মত।

আমি প্রতিদিন যেতাম-আসতাম এবং একটা সময় যেতাম না। বাড়ি থেকেই যাতায়াত করতাম।

রাইসু

আপনার বয়স কত তখন?

হাসান

তখন বয়স আমার হবে, ছেষট্টি সালে আমার বয়স হবে ছাব্বিশ, ছাব্বিশ কি সাতাশ, হ্যাঁ, ছাব্বিশ হওয়ারই সম্ভাবনাই বেশি।

রাইসু

আপনার তখন প্রথম বই বেরিয়ে গেছে?

হাসান

প্রথম বই উনিশ শ চৌষট্টি সালে বেরিয়েছে। এটা হচ্ছে তোমার উনিশ শ চৌষট্টি সালে… ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’। তখনও আমি কিন্তু ঐ বাড়িতেই। দৌলতপুর কলেজের, কী বলে তোমার ফুলতলার ওই বাড়িতেই আমরা। আমরা কিন্তু ওই বাড়িটাতে ঢুকেছি ১৯৬১ সালে।

কারণ আমি তো তোমার… পশ্চিম বাংলার বর্ধমানে তো আমার জন্ম, তারপর আমি সেখানকার গ্রামের স্কুল থেকে তো মেট্রিক পাশ করি, নাম ছিল তোমার সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট একজামিনেশন, হ্যাঁ? ওইখান থেকে আমি চলে আসি আমার দুলাভাইয়ের কাছে, দৌলতপুর কলেজে। ভর্তি হবার জন্যে। ওইখান থেকে সাতান্ন সালে, হ্যাঁ, পাকিস্তানি আর্মির হাতে নিগৃহীত, পীড়িত এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ থেকে বিতাড়িত হয়ে, সাতান্ন সালে আমি রাজশাহী চলে আসি। রাজশাহী আসতে বাধ্য হই। তখন আমি অনার্স-এর ফাস্ট ইয়ার। তার মানে…

রাইসু

এটা হল সাতান্ন সালে আপনি রাজশাহীতে আসতেছেন?

হাসান

হ্যাঁ সাতান্ন সালে আর কি। আর চুয়ান্ন সালে আমি এসেছি প্রথম এই দেশে, ওখান থেকে।

রাইসু

তাইলে আবার খুলনা গেলেন কেন?

হাসান

সেইটা বলছি। সাতান্ন সালে আমরা… আমি চলে এলাম। আর আগে থেকেই তো আমার ভগ্নি আর ভগ্নিপতি তারা তো ওই দৌলতপুর কলেজেই ছিল। ওদের কাছেই লেখাপড়া করার জন্য আমি এসেছিলাম। তিন বছর পরে সেই সময়টা ভগ্নিপতি এবং আমার বোন আর কি, জানু আপা, ওরা কেউ ওখানে ছিলেন না। আমি প্রচণ্ড তোমার, মানে, পলিটিকস এবং ছাত্র রাজনীতির বিশেষ করে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে ভীষণভাবে জড়িয়ে গিয়েছিলাম। দেশের রাজনীতিতেও অনেকটা জড়িয়ে গিয়েছিলাম। ফলে আমাকে ওই শেষ পর্যন্ত সাংঘাতিক ভাবে নিগৃহীত হতে হয় এবং তাড়িয়ে দিল আর কি। তাড়িয়ে দিল এই শর্তে… না তাড়ালে একবারে…

রাইসু

শেষই করে দিত। মানে একদমই তাড়ায় দিত।

হাসান

হ্যাঁ, বলল যে তোমার… সার্টিফিকেটও দেব না, তুমি মানে মানে বিদায় হও। তখন আমি রাজশাহী গভমেন্ট কলেজে এসে ভর্তি হলাম। সেটা হচ্ছে থার্ড ইয়ার। তখনকার দিনের থার্ড ইয়ার মানে এখনকার দিনে ফাস্ট ইয়ার অনার্স। তখন দু’বছরে অনার্স ছিল। আটান্ন সালে আমি অনার্সটা পাশ করি আর কি। হ্যাঁ, এবং আটান্ন সালে আমি প্রথম ঢাকায় যাই। সেটা আর বলবার মত বিষয় ।

আটান্ন সালেই মার্চ মাসে আমি অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দেবার জন্য, প্রস্তুত হবার জন্য তিন মাস আমি পরমানন্দে ঢাকাতে কাটিয়ে ছিলাম। আচ্ছা ষাট সালে পাশ করলাম। তার পরে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হল যে আমরা কী করব।

আমার বড় ভাই আগে থেকেই ঢাকায়,  আমি এম এ পাশ করলাম, এবং এখানে চাকরি পাওয়া তখন খুব সহজ।

রাইসু

এই ঢাকায়?

হাসান

ঢাকায় বা অ্যানি হোয়্যার ইন ইস্ট পকিস্তান। আর আমার ভগ্নিপতি এবং আমার বোন তো আগে থেকেই আছেন। বাড়িতে আছে মা-বাবা আর একটা ছোট ভাই। এখন কী করা যাবে? ওরা ওখানে থাকবে, নাকি আমরা সবাই এখানে চলে আসবো? কাজেই আমি কিন্তু নিপীড়িত হয়ে, হিন্দুগণের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে, ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে কিন্তু ওখানে থেকে আসি নি। সম্প্রদায়িকতা আমার ক্ষেত্রে কোনো ব্যাপারই নয়। এটা লোকে অনেকে ভুল করে যে ওখানকার মুসলমানরা ওখান থেকে এ হয়ে এসছে, তা নয়, তা মোটেই নয়।

স্বেচ্ছায়, শেষ পর্যন্ত বাবা মা বলল যে ঠিক আছে, আমার মেয়ে রয়েছে, জামাই রয়েছে, তোমার বড় ভাই রয়েছে, তুমিও ওখানে লেখাপড়া করলে —  এই সব নানান কারণে আমি চলে এসছিলাম। কিন্তু আমার ছোটভাই আসে নি। ছোটভাই বহু বছর পরে এসছিল। আমার ছোটভাইকেও চিনতে পারো, সে গণসাহায্য সংস্থায় আনুভাই বললে সবাই চিনবে। হ্যাঁ, ওই ফর মাহমুদ হাসানের সঙ্গে কাজ করছিল। যাই হোক, একষট্টি সালে আমরা এক্সচেঞ্জ করে চলে আসি। তোমাকে এমনি পটভূমিটা বললাম।

আমি কিন্তু নিপীড়িত হয়ে, হিন্দুগণের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে, ইত্যাদি ইত্যাদি কারণে কিন্তু ওখানে থেকে আসি নি। সম্প্রদায়িকতা আমার ক্ষেত্রে কোনো ব্যাপারই নয়। এটা লোকে অনেকে ভুল করে যে ওখানকার মুসলমানরা ওখান থেকে এ হয়ে এসছে, তা নয়, তা মোটেই নয়।

রাইসু

না না, পটভূমিটা বলা দরকার তো।

হাসান

একষট্টি সালে আমরা চলে আসি। তখন সেই অর্থে চিরকালের জন্য নিজের জন্মভূমি ছেড়ে,  সব পরিবার পরিজন নিয়ে এবং এক দিক থেকে অত্যন্ত দুস্থ অবস্থায়, অনিশ্চিত অবস্থায়, একটা স্যাটলড ভূমিকেন্দ্রিক পরিবার, সচ্ছল ভূমিকেন্দ্রিক পরিবারের মানুষ, আমরা এখানে এসে একেবারে অগাধ পানিতে পড়ে গেলাম।

কারণ এখানে সমাজটা  চলতো সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাবে। তা আমরা, আমি তো আমাদের বাড়িটা একচেঞ্জ করে পেয়েছিলাম,  বাড়িটা খুব সুন্দর। খুবই, এখনও খুব সুন্দর!

রাইসু

খুলনায়?

হাসান

হে খুলনায়, ওই যে ফুলতলায়। চৌদ্দ মাইল দূরে আর কি,  একবারে রাস্তার উপরেই।

রাইসু

এইটা কী, কাদের বাড়ি ছিল?

হাসান

এটা ছিল এক ভদ্রলোক তিনি, তিনি তখন কোলকাতায় বসবাস করছেন, অলরেডি আর কি, একজন কেয়ারটেকার রেখে তিনি…

রাইসু

আপনাদের বাড়িটা নিয়া এই বাড়িটা দিয়ে দিলেন আপনাদের?

হাসান

আমাদের বাড়িটা নিলেন আর একজন। তিনি আবার ময়মানসিংহের লোক। ওটাও অনেক জটিল ব্যাপার আর কি।

ময়মনসিংহের লোকের সঙ্গে আমাদের জমি এবং বাড়ি… তিনি জমি দিলেন, আমরা তাকে বাড়িটা বিক্রি করে বাড়ির টাকা নিলাম, জমি নিলাম। আর এই খুলনার এই ভদ্রলোকের কাছে,  এদের কাছে টাকা দিলাম কিন্তু ডিড হলো এক্সচেঞ্জ।

এই বাড়িটা চমৎকার বাড়ি, তুমি এখনও গেলে খুব ভাল লাগবে। আমার ওই ছোট ভাই, বিয়েথা করে নি, যে আগে আসতে চায় নি ও দেশ থেকে,  সেই এসে তো এখন সে থাকেও ওখানে। কিন্তু ওই গণসাহায্যের নানান গোলমালের ফলে ও গণসাহায্যে আর থাকে নি, চলে এসেছে। কিছুই করে না সে, ওই বাড়িতে থাকে। বাড়িটা অবিকল যেমন ছিল তেমনি আছে। একতলা বাড়ি কিন্তু দোতলার চাইতেও উঁচু। কারণ স্প্লিন্টই হচ্ছে তোমার প্রায় এক মানুষ সমান উঁচু।

রাইসু

কী জিনিস উঁচু?

হাসান

স্প্লিন্ট, মানে ভিত্তিটা। ভিতটাই। সেটা প্রায় এক মানুষ সমান উঁচু।

রাইসু

আচ্ছা, বর্ষার সময়ের কথা ভাইবা বোধহয় বানাইছে।

হাসান

না, ওই এলাকায় তখনকার দিনে বাড়িঘরদোর ওইভাবেই তো মানুষ করতো। হ্যাঁ, ওখানে বর্ষার প্লাবন তো ওই জায়গাটাতে নাই। ওটা অনেকটা আগেকার দিনের জমিদাররা-টমিদার… ওই গোলগোল থাম আছে,  ডবল ডবল থাম, তারপর তো প্রচুর সেগুন কাঠ, বাজে খরচ করেছে, সেই সব সেগুন কাঠ দিয়ে চারিপাশে তোমার ছাদ থেকে একধরনের ঝাঁজরি নামিয়ে দিয়েছে, এইসব আর কি। তারপরে সঙ্গে একটা পুকুর আছে। পুকুরে বাঁধা ঘাট আছে, মানে একেবারে রূপকথার যে সমস্ত কাহিনী শোনা আর কি, বাধা ঘাটওয়ালা পুকুর, প্রচুর গাছপালা।

ওই বাড়িটাতে আমরা চলে এসেছি সিক্সটি ওয়ানে। আর আমি তারপরে চাকরি-ফাকরি এটা-ওটার জন্যে, তখন রাজশাহীতে ছিলাম, তারপরে সিরাজগঞ্জে গেলাম, তারপরে আমি গেলাম খুলনা গার্লস কলেজে। ওই খুলনা গালর্স কলেজে আমি তেষট্টি সনে গিয়েছি।

রাইসু

আপনার বয়স তো তখন তেইশ।

হাসান

তখন আমার বয়স তেইশ, ওখানে গিয়েছি…

রাইসু

আপনি বিবাহিত তখন?

হাসান

আমি বিবাহিত হচ্ছি একষট্টির ফেব্রুয়ারিতে।

রাইসু

মানে আপনি যখন আসছেন এই দেশে তখনই?

হাসান

হ্যাঁ, একষট্টির ফেব্রুয়ারিতে।

রাইসু

আর এই দেশে আসছেন?

হাসান

এপ্রিল বোধহয়, মনে হচ্ছে আর কি।

রাইসু

ও, আপনে বিয়ে করে চলে আসছেন?

হাসান

হ্যাঁ হ্যাঁ।

রাইসু

ও তার মানে বিয়েটা আপনি করছেন হচ্ছে, যেহেতু দেশভাগ হইছে এবং চলে যাচ্ছেন সেইজন্যে?

হাসান

না না না না না, আগে থেকেই বিয়ের…  এলাম যখন তখন বৌকে নিয়েই চলে এলাম এই আর কি। তা এখন খুলনা গালর্স কলেজে তো এলাম, খুলনা গালর্স কলেজে বছর দু একের মতো ছিলাম আর কি। তখন ওই বাড়ি থেকে আমি যাতায়াত করতাম, চৌদ্দমাইল বাসে যেতাম বাসে আসতাম। গল্পে আছে আমার, এই রকম অনেক কটা গল্পে এই এই ইয়েটাই তো প্রায়…

রাইসু

এই ভৌগোলিক অবস্থানটা আছে?

হাসান

হ্যাঁ হ্যাঁ,  বিশেষ করে তোমার ওই ‘বিমর্ষ রাত্রির প্রথম প্রহরে’ এই বাসজার্নিই আছে। এই বর্ষার মধ্যে,  রাস্তা খারাপ, তার ভেতর দিয়ে বাস চলছে। একজন অধ্যাপক তার বোনকে বিয়ে দেয়ার আশায় সে তার এক ঢাকায় থাকা আধুনিক বন্ধুকে কোনরকম প্যাঁচ-কৌশল করে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসছে বাসে করে। এসব গল্প আছে তো আমার।

রাইসু

এটা কি ‘অন্তর্গত নিষাদ’, না?

হাসান

এটা হচ্ছে যে ‘বিমর্ষ রাত্রিপ্রথম প্রহর?

রাইসু

ও ওইটা তো আগের গল্পের।

হাসান

হ্যাঁ হ্যাঁ, অনেক আগের।

রাইসু

মানে ‘সমুদ্রের স্বপ্ন’ বইতে?

হাসান

সমুদ্রের স্বপ্ন বইতে। তার মানে ওই এলাকায়,  তখন ওই এলাকার ছবিগুলো…

রাইসু

ও, তখনও তো আপনি ওই এলাকাতেই আপনি আছেন,  রাইট।

হাসান

হ্যাঁ, ওই এলাকায় আছি। কিন্তু অনেক গল্পে কিন্তু রাঢ় আসছে তখন।

রাইসু

এমনি কি আপনি পশ্চিমবঙ্গে থাকার সময় কি কোন গল্প লিখছিলেন, না?

হাসান

নাহ।

রাইসু

এইখানে আসার পরে গল্প লেখা শুর করলেন?

হাসান

হ্যাঁ, পশ্চিমবঙ্গে থাকার সময় তো অনেক কিছু লিখেছিলাম…

রাইসু

আপনার প্রথম গল্প কি শকুন?

হাসান

উপন্যাস লিখে ফেলেছিলাম,  শিকার কাহিনি লিখেছিলাম, গোয়েন্দা গল্প লিখেছিলাম,  বুঝতে পেরেছো না?

রাইসু

ওগুলি নাই?

হাসান

ওগুলো কাল গ্রাস করেছে।

রাইসু

কোনো বইয়ে দেন নাই ওগুলি?

হাসান

না। ওসব স্কুলে থাকার সময়ের।

রাইসু

অনুশীলন?

হাসান

অনুশীলনও নয়। সাহিত্যিক হব, সেই শখে।

রাইসু

‘সমুদ্রের স্বপ্ন’টা বের করলেন কি খুলনা থেকে?

হাসান

এই ইয়ে ‘সমুদ্রের স্বপ্ন’?

রাইসু

হুম।

হাসান

তখন আমি খুলনায়। বেরুল বোধহয় অক্টোবরে,  উনিশ শ চৌষট্টির অক্টোবরে।

রাইসু

এটা কারা বের করল?

হাসান

এটা বের করল লেখক সংঘ। এই যে ‘পরিক্রম’ পত্রিকা ছিল যাদের।

রাইসু

আপনার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ হইল?

হাসান

মুনির চৌধুরী ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। তারপরে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আমাদের সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কিছুদিন ছিলেন, তারপর কিছুদিন ছিল আমাদের রফিকুল ইসলাম।

রাইসু

তো তারা আপনার বই বের করল কেন?

হাসান

তখন ওই পরিক্রম এ দু’একটা লেখা বেরিয়েছিল। তারপরে ‘সমকাল’ এ দু একটা লেখা বেরিয়েছিল। হ্যাঁ, সমকালে তো ‘শকুন’ বের হয়।

রাইসু

আচ্ছা আচ্ছা।

হাসান

‘সমকাল’ এ শকুন বের হয় ছেষট্টি সালের মার্চ মাসে। ছেষট্টি সালের মার্চ মাসে ‘সমকাল’ পত্রিকায় ‘শকুন’ বের হয়। এবং রাতারাতি নামটা মোটামুটি ভাবে যারা পড়ে-টরে তারা…

রাইসু

এটা তো আপনি লিখছেন হচ্ছে ষাইট সালে, দেখা যাচ্ছে।

হাসান

এটা লেখাটা আমার ঠিক সেন্সে নাই। হ্যাঁ, না, ষাট সালেই তো। আমি ভুল বলছি। ষাট সালেই প্রকাশিত হয়েছিল ওই গল্প।

রাইসু

তো ষাইট সালে আপনি কলকাতায় না?

হাসান

না।

রাইসু

চলে আসছেন এইখানে?

হাসান

ষাট সালে ওই যে তোমাকে বললাম,  আমি যে ষাট সালে পাশ করেছি রাজশাহী থেকে। রাজশাহী থেকে ষাট সালে পাশ করেই আমি তো আবার এখানে আবার একটা সিটি কলেজে ঢুকেছিলাম। সেইটা আমার জীবনের প্রথম কলেজ। ওই কলেজে থাকাকালীন আমি পূর্বমেঘ পত্রিকায় অনেক কিছু লিখি। তার মধ্যে তোমার বৃত্তায়ন বলে উপন্যাসটি লিখি। ‘শকুন’ বলে গল্পটি পূর্বমেঘ-এ না দিয়ে তোমার ই-তে দিই, কী বলে, তোমার পূর্বমেঘ এ না দিয়ে ওটা তোমার দেই সমকাল এ দেই আর কি।

আর পূর্বমেঘ এ দিয়েছিলাম, ‘একটা আত্মরক্ষার কাহিনী’, দিয়েছিলাম। আরো অনেক লেখাই তখন পূর্বমেঘ পত্রিকায় বেরিয়েছিল। আমি ওখান থেকে ৬১ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহী ছেড়ে দিয়েছি। এই যে পাবনায়,  সিরাজগঞ্জে, সেখানে আমি বসে লিখেছি বেশ কিছু গল্প, তার মধ্যে ধরো ক্ষুধা বলে আমার একটা গল্প আছে, ওই যে  বাসেত যে লম্বা হয়ে উঠছে। হ্যাঁ তারপরে তোমার…

রাইসু

ওইটা কোথায় দিছেন আপনি? প্রথম বইতে তো নাই আপনার।

হাসান

হ্যাঁ, ‘সমুদ্রের স্বপ্নে’ আছে। হ্যাঁ, ‘সমুদ্রের স্বপ্নে’ আছে।

রাইসু

কী নামে ওইটা — ‘তৃষ্ণা’?

হাসান

‘তৃষ্ণা’ নামে আছে।

রাইসু

‘ক্ষুধা’ না ‘তৃষ্ণা’ এইখানে?

হাসান

হ্যাঁ হ্যাঁ ‘তৃষ্ণা’ নামে আছে। তারপরে তোমার ‘উত্তরবসন্তে’ বলে মানে মাইগ্রেট করার একটা…

রাইসু

গল্প আছে?

হাসান

অভিজ্ঞতা। সরাসরি। কেবল মাত্র তখন একষট্টি সালে এসেছি তো। ওই যে বাড়িটার কথা তোমাকে এতক্ষণ বললাম।

রাইসু

ওইটার বিররণ আছে ওইখানে, না?

হাসান

ওই বাড়িটার এক ধরনের বিবরণ আছে। খুবই বিমর্ষ একটা পরিবেশ। উত্তরবসন্ত তো খুব… এই আফজাল নাকি একসময় গল্পটা পড়ে পাগল হয়ে গিয়েছিল। পরে সে এটা রূপ দিয়েছিল তোমার টেলিভিশন নাটকে। কোথায় যেন পড়লাম আমি আর কি — আফজাল হোসেন।

রাইসু

সাতক্ষীরার লোক তো উনি। আর আপনে তো লিখতেছেন খুলনার?

হাসান

ও ও একজায়গায় লিখেছে, গল্পগুলো পড়ে প্রায় পাগল হয়ে গেলাম। এর সঙ্গে যোগাযোগ করি কার সঙ্গে যোগাযোগ করি এইটাকে আমরা ই করব। করেছিল বোধহয়,  যাই হোক। এইসব গল্প কিন্তু আমার সিরাজগঞ্জে বসে লেখা। আর এমনকি ওই ‘তৃষ্ণা’ গল্পটা সিরাজগঞ্জে বসে লেখা। আরো দু-একখানা গল্প লিখে থাকতে পারি আর কি। তারপরে আমি খুলনায় চলে এলাম। খুলনায় আমি তেষট্টি সালে যখন এসেছি, তখন বেশ ভালই গল্প জমে গেছে।  এবং ওই পরিক্রমা এ দু-একটা গল্প  বেরিয়েছে আর কি। ‘বিমর্ষ রাত্রি প্রথম প্রহর’ যেটা বলছিলাম তোমাকে,  ওটা কিন্তু পরিক্রমা এ বেরিয়েছিল।

(চলবে)

ছবি. Teerath Kumar Majumder, উইকিপিডিয়া

Flag Counter