(দ্বিতীয় কিস্তির লিংক)

পুরো সময়টা মৌসুমীর বর মাহফুজ হাসিহাসি মুখে কার্পেটের দিকে চেয়ে বসে ছিল।

“যাই হোক। আমরা সবাই আছি। আপনার বান্ধবী আছে, মাহফুজ আছে। ভাইয়া আসুক। চাকরি না হোক, ব্যবসা কিছু একটা ফাঁইদা বসা যাবে। নতুন সরকার অনেক ডায়নামিক, পোস্টঅফিস পুরাপুরি প্রাইভেটাইজ কইরা ফেলতেছে। আমরা পোস্টঅফিসের ফ্র্যানচাইজ ব্যবসা করুম। একটা সাবার্বে পোস্টঅফিস দিমু, ইন্ডিয়ান বাঙালি পাকি মিল্লা কয়েকটারে নিয়োগ দিমু। কী মিয়া মাহফুজ… কিছু কও! প্ল্যান ঠিক আছে তো?”

“বুদ্ধি ভাল। এমনেও তো নতুন সরকার আইসা আমারে ছাঁটাই করছে…”, মাহফুজ উদাসভাবে হাসিহাসি মুখে বলল।

“হ… গোল্ডেন হ্যান্ডশেইকের টেকাগুলি এইখানে ইনভেস্ট করবা। দুইতিনজন পার্টনার হইলেই দাঁড়ায়া যাবে! কী কও পার্টনার? বিশ্বাস ভাঙবা না তো?”, লোকটি হাতের জুসের গ্লাস এগিয়ে ধরলেন। ফ্যামিলি পার্টিতে যথাযথ জুস চলে।

মাহফুজ কোনাকুনি দেয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ পর্যন্ত একমাত্র মেয়েরা ছাড়া কেউ বলতে পারবে না আমি কারো বিশ্বাস ভাঙছি!”

এই কথাটা চরম হিট হল ব্যাটালোকগুলির মধ্যে। এসব যথাযথ সীমানার ভিতরের চুটকিগুলিকে ‘চালাকচোদা’ চুটকি বলা হত। সুবর্ণা দড়াম করে আছাড় খেল মাহফুজ মজুমদার হুজুরের ঐ এক কথায়। গোরানের বাসার শ্যাওলা শ্যাওলা ব্যালকনির কোণায় পড়ার টেবিল পেতে বসার দিনগুলি, টেবিলের উপর নোটবই দাগিয়ে মুখস্থ করার দিনগুলি, সুবর্ণার ছোট ছোট বুকে ব্যথাজাগা দিনগুলি — আহারে সেই দিনগুলিকে জটিল করে তুলেছিল যে বজ্জাত লোকটা… তার মতো লাগতে থাকে হঠাৎ মাহফুজকে। “মাহফুজ, আপনি এত শয়তান! আমার সৎ বাপও আপনার কাছে লজ্জা পেত। উপরতলায় দরজা আটকায়া চটি পড়েন নাকি সারাদিন, আব্বু?” (– সুবর্ণা, নীরবে)।

পাশের ঘরে বাচ্চাদের হাউকাউ অকস্মাৎ বেড়ে গেল। মৌসুমীর বড় মেয়েটাকে আরেকজন ভাবির ছেলে চড় দিয়েছে। সুবর্ণা ঐ ঘরে দৌড়ে গেল। বাচ্চাগুলোর এখনো স্যরি বলার বয়স হয় নাই। তারা কৌতূহলে স্থির হয়ে ছিটিয়ে ছিল। চড় মারা ছেলেটা দূরে দাঁড়িয়ে ফুঁ দিয়ে দিয়ে একটা লম্বা খেলনা বাঁশি বাজানোর চেষ্টা করছিল, সম্ভবত সবার মনোযোগ নিজের সুবোধ সেলফের দিকে টানার জন্য। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে একটা আস্ত আখ দাঁতে ছিলে খাওয়ার চেষ্টা করছে। আন্দাগুন্দা বাঁশির শব্দের মধ্যে চাইনিজ সিল্কের ফ্রিলফ্রিলদেওয়া ফ্রকের ঘের বিছিয়ে টেডিবেয়ারে হেলান দিয়ে আখতারিবাঈ ফয়েজাবাদির মতো তেহজিব সহকারে কাঁদছিল সুবর্ণার বড় মেয়েটা। “আল্লাহ্‌! আরমান তোমাকে মারছে আপু? আমি আরমানকে বকে দিব! আচ্ছা? পিট্টি দিয়ে দিব! ওকে?”, সুবর্ণা হাবিজাবি বলতে লাগল। মৌসুমীর বড় মেয়ে রিটালিয়েশন শিখবে আরো বড় হয়ে। আপাতত সে বারবার ঘ্যানঘ্যান করে বলতে লাগল, “দাদি যাব! দাদি যাব!”

সুবর্ণা বলতে লাগল, “ওকে আপু। দাদির কাছে যাব… অফ কোর্স আমরা যাব। কান্দে না ময়না। আমি তোমাকে দাদির কাছে নিয়ে যাব আপু…।” সুবর্ণাকে এই বাচ্চাগুলি আন্টি ডাকত? নাকি আপু ডাকত?

“আই থিঙ্ক শি সেইড ড্যাডি। নট দাদি!”, পাশ থেকে একটা ট্যাটনা বাচ্চা বলে উঠল।

মৌসুমীর মেয়ে দাদি দাদি রবে লাগাতার কান্দন ধরল। সুবর্ণা ড্যাডি বস্তুটার মুখোমুখি হতে চাইল না। “দাদি যাব, আপু। নিশ্চয়ই দাদি যাব আমরা!”, এইসব বলতে লাগল।

সুবর্ণার ছোট বোনটাও ‘ড’কে ‘দ’ বলত অনেকদিন পর্যন্ত।

*
অতিথি ভাবিরা রান্না ছাড়াও অনেককিছু পারতেন। যেমন, গান। কিন্তু মোটের উপর তাঁরা পুরুষদের আসরে গলা ছেড়ে গান গাইতেন না। মাহফুজ ও আরো কয়েকজন তা পছন্দ করত না।

“নিশাত ভাবি, একটা গান বলেন। প্লিজ ঋতুপর্ণের ঐ সিনেমার ফোক গানটা একটু বলেন না!”, ডিনারের পর মৌসুমী বলল।

“কোন্‌টা?”, নিশাত ভাবিকে দেখে মনে হচ্ছিল উনি দাওয়াতে আসার আগে আগেই মাথায় নারকেল তেল মেখে এসেছেন।

“ঐ যে চোখের বালি সিনেমাটায় ছিল। আইশ-ওয়ারিয়ার মনের অবস্থা বুঝানোর জন্য যেইটা…”

“ওহ! জীবন ছাড়িয়া না যাইস্‌ মোকে?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ!”

“ছেলেরা শুনতে পাবে তো! আর তারপর তোমার হুজুর আমারে ঝাঁটাপিটা করবে!”, সঙ্গীতগর্বী নিশাত ভাবি খোঁচা দিতে ছাড়েন না।

“আরে ধুরো… কালকেই আমার দোস্তো চইলা যাইতেছে। আবার তো সেই হুজুরের পুরান সংসারে ব্যাক! আজকে একটু মন খুইলা মাস্তি কইরা নেই”, মৌসুমীর জিহাদি মনোভঙ্গি খোঁচার উর্ধ্বে।

নিশাত ভাবি পারদের মতো গলা করে গান করলেন। অসাধারণ দম উনার। বাতাস উনার হুকুমবরদার। সুতরাং সুর আর নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের খেলাধুলা ছাড়া মেয়েদের আসরে আর কিছু ছিল না।

“আরে ও জীবন রে,
জীবন ছাড়িয়া না যাইস্‌ মোকে
তুই জীবন ছাড়িয়া গেইলে আদর করিবে কায় জীবন রে?
আরে দোনো জনে বুদ্ধি করিয়া রে
আরে ও জীবন আইস্‌লাম ভবের মাঝে,
আরে তুই জীবন ছাড়িয়া যাইস্‌লুং নিধুয়া পাথারে জীবন রে।।
আরে কচুপাতের পানি যেমন রে,
আরে ও জীবন টলমল টলমল করে
আরে ঐ মতো মানুষের দেহা কহন টলিয়া পড়ে জীবন রে।।
আরে ভাই বল ভাতিজা বল রে
আরে ও জীবন সম্পত্তির ভাগী
আরে আগে করবে ভাগবাট্‌রা পিছে করবে গতি জীবন রে।।
আরে ধান কাটে ধানুয়া ভাই রে
আরে ও জীবন কাটিয়া ছাড়ে নাড়া
আরে তুই জীবন ছাড়িয়া গেইলে মান্‌ষে কইবে মড়া জীবন রে।।
আরে তুই জীবন ছাড়িয়া গেইলে রে
আরে ও জীবন কান্দে বাপ রে ভাই
আরে শ্মশানঘাটে সোনার দেহা পুড়িয়া করিবে ছাই জীবন রে।।
আরে ও জীবন রে,
জীবন ছাড়িয়া না যাইস্‌ মোকে
তুই জীবন ছাড়িয়া গেইলে আদর করিবে কায় জীবন রে?”

গান শেষ হলে সুবর্ণা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, “বাহ, ভাবি! এটা কোন্‌ অঞ্চলের ভাষা?”, কিন্তু মৌসুমী চোখের পানি আটকাতে পারল না। আরো তিনভাবি পরে বসে ছিল সুবর্ণা। জীবনের মতো খিদায় আঁকড়ে ধরল মৌসুমী সুবর্ণাকে। সুবর্ণার ঘাড় ভর্তি মৌসুমীর চোখের জল কচুপাতের পানি যেমন টলমল টলমল করতে লাগল।

“দোস্তো, তুই কালকে চলে যাবি। চলে যাবি দোস্তো”। সুবর্ণা আশা করছিল মৌসুমী “চলে যাবি? চলে যাবি?” করে কাঁদবে, আর সে মৌসুমীকে উত্তরে বলবে “ধুরো বেক্কল… এই শহরেই তো আছি। প্রতিদিন কথা হইব… দেখা হইব!”।

কিন্তু মৌসুমী সরল ব্যথার স্টেটমেন্ট। “চলে যাবি।”। “চলে যাবি” এর পর দাঁড়ি। কোনো প্রশ্নবোধক চিহ্ন বাকি ছিল না মৌসুমীর কাছে। সেরকানকে সব দিয়ে এসেছিল সে।

ভাবিরা চোখ নামিয়ে কান্না কান্না ভাব করলেন। এই দেশের ফুললতাদুঃখ তাঁরা ঐদেশের ভাব ও ভাষা দিয়ে বোঝার ইনসিন্‌সিয়ার চেষ্টা করলেন। এতে তাঁদের বুকের উথালপাথাল আরো বেড়ে গেল। এরকম উথালপাথালকে আপনারা পাত্তা দেন না সাধারণত। কিন্তু এরকম উথালপাথাল হয়।

সুবর্ণা মৌসুমীর চোখের নিচে হাত দিয়ে ওর ভেজা গাল ডলে ডলে দিচ্ছিল। “কোন্‌ অঞ্চলের ভাষা আবার কেমন বালের প্রশ্ন? আমার নিজের পাছায় লাত্থি মারা উচিত!” (– সুবর্ণা, নীরবে)।

নিশাত ভাবি হাসতে হাসতে বললেন, “আইশ-ওয়ারিয়ার মনের অবস্থা কইলাম আর কানতেছ তুমি! নিজেরে আইশ-ওয়ারিয়া মনে কর নাকি, মৌসুমী?”।

এসবের মধ্যে ভাবিদের বররা লিভিং রুম থেকে হাউকাউ করে উঠলেন। শহরে স্মরণকালের ভয়াবহতম ঝড় আসছে। পরদিন ইমার্জেন্সি ডিক্লেয়ার করেছে রাজ্য সরকার।

*
সেই রাতে সুবর্ণার ঘুম ভেঙে গেল তীব্র ঝড়ে আর উপরতলার বেডরুমের মারদাঙ্গা শব্দে। স্বপ্ন-স্বপ্ন ঘোরের মধ্যে সে অনেকক্ষণ ধরেই ঝগড়াঝাঁটিমূলক একটা ঘটনার মাঝখানে ছিল। পরদিন ঝড়বন্দি হওয়ার চিন্তায় মৌসুমীদের বাসা থেকে একে একে হু-হু করে বেরিয়ে গিয়েছিল সবাই রাত দশটার মধ্যেই। অন্য সময় হলে ভাবিরা ঘরদোর একটু গুছিয়ে দিয়ে যেতেন। সবাই চলে যাওয়ার পর বাসন মাজা, বাচ্চাদের ঘর পরিষ্কার করা — এই টাইপের গার্হস্থ্য টপিকে রেগুলার গোছের খিটিমিটি কিছু হয়েছিল বুঝি মৌসুমী আর মাহফুজের। সুবর্ণার ঘুমের মধ্যে সেটা বাড়তে বাড়তে অস্ফূট হাঙ্গামার রূপ নিল।

ঝড়ের কোপে সারাবাড়ির কাচের জানালা আর কাচের ঘেরাটোপ মার্কা চাইল্ডপ্রুফ রেলিং বিপজ্জনক আওয়াজ তুলছিল। সুবর্ণা পা টিপে অপরাধীর মতো গেস্টরুম থেকে বেরিয়ে কার্পেট বিছানো কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উপরতলার বেডরুমের বাইরে গিয়ে দাঁড়াল।

“আর তোমার মা, হারামজাদি… উনি যখন আমার প্রেগন্যান্ট অবস্থায় বলছেন তোমার কাজিনদেরকে যেন দশপদ রেন্ধে খাওয়াই… হাজির বিরিয়ানি পাঁক করে দেই… তখন তোমাদের লজ্জা করে নাই? শালারা তো বিদেশ আইসা মরতে আমার বাসায়ই আইসা উঠে প্রত্যেকবার। হোটেলে যাইতে পারে না এত নোলা থাকলে?”

“আমার মা’কে গালি দিবা না, বিচ! আমার মা যাদের ব্যাপারে বলছেন তারা সব আমার রক্তসম্পর্কের ভাইবোন। তোমার মতো আসমান থেকে টপকানো বন্ধুবান্ধব দিয়ে ঘর ভর্তি করার অভ্যাস আমাদের ফ্যামিলির কারোই না!”

“খুব ভাল করছি ঘর ভর্তি করছি। তোমারে সবক শিখানো দরকার ছিল। আমার বন্ধুরও জায়গা আছে এই বাসায়, যদি আমার জায়গা থাকে। আর… আর আমার রক্তসম্পর্কের ভাইবোন নাই দেখে খোঁটা দিলা! কুত্তার বাচ্চা! তোর মনে নাই আমার রক্ত তুই কীভাবে মারছস! আমার পেটে ছেলে আসছিল। তুই পয়সার লোভে আমারে গিনিপিগ বানাইছিলি… আমারে মেডিক্যাল স্কুলের মিডিসিন টেস্টে ঠেইলা পাঠাইছিলি! প্রেগন্যান্ট অবস্থায় আমারে ঐসব…”, মৌসুমী আধো আধো কথা বলতে থাকল আর কাঁদতে থাকল।

সুবর্ণার পায়ের উপর দিয়ে অন্ধকারে একটা ডিমওয়ালা তেলাপোকা হেঁটে গেল। এই দেশেও তেলাপোকা আছে? ঐদেশ থেকে আমদানি হয়ে আসে বোধ হয়।

“মৌসুমী, ঐটা আমার দোষ ছিল না। তুমিই বলছিলা পয়সা পয়সা…”

“বাচ্চা বয়সে বিদেশ আসছি। কত কী ভাবছিলাম! ইউনিভার্সিটি এডুকেশনটাও হইল না আর। আর তুই আমারে কত না ধর্মের দোহাই দিছস! বল্‌, তোর ধর্মে কোথায় আছে শাশুড়ির গু সাফ করার কথা? কোথায় আছে হাজব্যান্ডের বাপমারে নিজের বাপমায়ের মতো পূজা করার কথা? বল কয় নাম্বার সুরার কয় নাম্বার আয়াতে আছে? তুই কত্ত বড় হুজুর!! তুই খুনী। তুই আমার ছেলের খুনী খুনী খুনী…”, অতিনাটকীয় ‘খুনী খুনী’ শব্দটা এখন দুটো অচীৎকৃত শব্দের রূপ নিল।

দুটো শব্দ — একটা ছিল ঘুষি মেরে দেয়াল ফুটো করার তীব্র ভোঁতা শব্দ, আরেকটা ছিল একটা ‘কোঁৎ’মতন অমানুষিক শব্দ।

সুবর্ণা অনেকক্ষণ বুঝতে পারল না সেই মুহূর্তে তার ঘরের দরজায় ধাক্কাধাক্কি করা উচিত কিনা। সে অন্ধকারে গুটিয়ে থেকে বাপমায়ের ঝগড়া শুনতে অভ্যস্ত ছিল।

“হ্যালো হ্যালো… ইয়েস টেইক মাই অ্যাড্রেস প্লিজ। মাই ওয়াইফ জাস্ট হিট মি উইথ আ ওয়াটার বটল। ইয়েস… অন মাই টেস্টিকল। মাই লেফট টেস্টিকল। ইয়েস, প্লিজ সেন্ড সামওয়ান… ইয়েস”, মাহফুজ ইচ্ছা করে মুমূর্ষু গলা করে ফোনে কাকে যেন কথাগুলি বলল।

*

ওদের হিংস্র ঝগড়া মিটে গিয়েছিল। তার মূল কারণ পরদিন ভোরের রুদ্র মোহাম্মদ প্রকৃতিউল্লাহ। স্টেটজোড়া ইমার্জেন্সি। এর মধ্যে একে অন্যকে না-পারতে মেনে নেওয়া ছাড়া গতি ছিল না।

রাতে পুলিশ এসেছিল, মাহফুজ ফোন করার পাঁচ মিনিটের মাথায়। পুলিশ দেখে মৌসুমী-মাহফুজ দম্পতি একটা সিঙ্গল ইউনিট হয়ে গিয়েছিল এবং বলেছিল “উই আর আ কাপল ফ্রম ব্যাংলাড্যাশ। উই জাস্ট হ্যাড আ মাইল্ড মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং। নো… নোবডি অ্যাকচুয়ালি হিট নোবডি। নো… স্যরি। আওয়ার মিসটেইক। ইয়েস, উই হ্যাভ ট্যু কিডস। নো, উই নেভার ফাইট ইন ফ্রন্ট অফ দেম। ইয়েস, উই আন্ডারস্ট্যান্ড উই মে লুজ দেয়ার কাস্টডি ইফ উই কিপ ডুইং দিস। হু, শি? শি ইজ জাস্ট আ ফ্রেন্ড ফ্রম ব্যাক হোম! নো নো নো… শি ইজ আওয়ার গেস্ট। শি হ্যাড নো রোল টু প্লে ইন দিস!”

barnaliart3aউন্মাদ শোঁ শোঁ বাতাসের মধ্যে ডেকের পিছনে দাঁড়িয়ে মহিলা পুলিশটা মৌসুমীকে চাপাচাপি করে স্বীকার করিয়ে নিতে চাইছিল যে সে ম্যারিটাল অ্যাবিউজের শিকার। “ভয় পেও না, তুমি ভয় পেও না!” বলে মহিলাটা মৌসুমীকে বারবার ভয় দেখাচ্ছিল। “দিস ইজ আ ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রি। উই টেইক দিজ ইস্যুজ সিরিয়াসলি। ইফ ইউ আর আ পার্ট অফ দিস কান্ট্রি, ইউ মাস্ট নট ফিয়ার!”। হয় তুমি আমাদের, নয় তুমি ওদের! কী চমৎকার! মৌসুমী যদি সুবর্ণার মতো ভীতু মেয়ে হত, তাহলে ভয়েই স্বীকার করে ফেলত মাহফুজের করা/ না-করা সব অত্যাচার অনাচারের কাহিনী। কিন্তু মৌসুমী শক্ত মেয়ে। ঠাণ্ডা বাতাসে লাল হয়ে যাওয়া গাল নিয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে একটা গোঁয়ার সিঁদকাটা চোরের মতো চুপ হয়ে রইল সে। নাকি এরকম পুলিশনীর খপ্পরে আগেও পড়েছিল ও?

“ভাইয়া, এখন ঘুমাতে যান। এমনিতেও বের হওয়ার উপায় নাই। ঘুমানো ছাড়া সারাদিন আর কিছু করারও নাই”, সারারাত লিভিংরুমে বসে মধ্যস্থতা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গিয়ে ভোরবেলা মাহফুজকে বলল সুবর্ণা।

মৌসুমী পাশে বসে তখনো ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। বাচ্চাগুলো নিজেদের ঘরে অঘোরে ঘুমাচ্ছিল। ঝড় যত তীব্র হচ্ছিল, শান্তি তত এগিয়ে আসছিল। সুবর্ণার আজকে নতুন বাসায় ওঠা হল না। এই পুরো ঘটনার কতটুকু প্রভাব সুবর্ণা নিজের শরীর পেতে নেবে সেই ব্যাপারে সে ধন্দে ছিল। “আই হ্যাভ ওভারস্টেইড মাই ওয়েলকাম। হেল, ইন দিস হাউজ আই ওয়াজ নেভার ওয়েলকামড!” (– সুবর্ণা, নীরবে)। কান পেতে ওদের ঝগড়া শোনাই কাল হয়েছে। সুবর্ণা এখন অপমানের ফলটা গিলে ‘আসমান থেকে উদয় হওয়া বন্ধু’ তকমার খোসাটা কীভাবে ফেলে দেবে? আর নগ্নভাবে নিজের জমি রিক্লেইম করার যে প্রয়াসে মৌসুমী সুবর্ণাকে এনে ফেলেছে কুৎসিত ঝড়ের মাঝে, তার জন্য মৌসুমীকে ক্ষমা কীভাবে করবে ও? মৌসুমী শুধু সেরকান নয়, সবাইকে নিজের বারগেইনিং চিপ হিসাবে ইউজ করতে পারে। সুবর্ণাকেও, ওর ধর্মকেও, ওর নিজের বাচ্চাকেও।

মা আর সৎ বাপের গোরানের সংসার থেকে পারলে কি সুবর্ণা ছোটবেলাতেই বেরিয়ে যেত না? উফ! এখান থেকে বের হতে পারবে তো? পারবে, পারবে! ইমার্জেন্সি উঠিয়ে নিলেই বেরিয়ে যাবে।

“সুবর্ণা… তুমি ওকে বুঝাও প্লিজ। ওকে বুঝাও। আর প্লিজ মনে করে দেখ… ঐ নাইটি আর ঐ গোলাপি ডিলডো না-কি জানি… ঐসব তোমারই… মানে তোমার কিনা সেইটা মনে করে দেখ!”, প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলল মাহফুজ। সুবর্ণা অন্যদিকে চেয়ে থাকল। এই প্রথম মাহফুজ না-লুকিয়ে চোখ খুলে সুবর্ণার দিকে তাকাল। সুবর্ণা জানত যে ঐ মুহূর্তে মাহফুজের দিকে তাকালে সে আপসে-আপ স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে নাইটি ওর, ডিলডো ওর, সব দোষ ওর, পৃথিবীর সমস্ত নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার প্ররোচনা ওর! হুজুর মানুষ মাহফুজ এমন নির্বিবাদে এমন লজ্জাজনক সব কথা বউয়ের সামনেই পরনারীকে বলছে — সততার তাড়া খেয়ে কতখানি ডেসপারেট হলে এমনটা হতে পারে! মাহফুজের দিকে তাকালে সুবর্ণা হয়তো মায়াবশত মাহফুজের সব ডেসপারেশনের দায়িত্ব নিজের নষ্ট কাঁধে নিয়ে নিত। আপনারা যে কেউ হলে তা-ই করতেন।

“জ্বি… বাট আমার মনে হয় না ঐসব আমার। তবু বুঝাব। চিন্তা কইরেন না; আপনি সোফায় একটু লম্বা হয়ে ঘুম দেন!”, সুবর্ণা তাকাল না মাহফুজের দিকে। আপনারা কী ভাবছেন? ‘ভাগ্যিস!”?

সকালের দিকে চিল্লানোসোরাস গেঁদাবাচ্চার শব্দতরঙ্গে বাচ্চাদের ঘরের দিকে ভেসে গেল মৌসুমী। গেঁদার মুখের মধ্যে ডান দুধের বোঁটা গুঁজে দিয়ে মাতালের মতো, ক্লান্ত প্রসূতির মতো, কচুপাতের পানির মতো টলমল টলমল করে মৌসুমী আবার লিভিং রুমে হেঁটে এল। সুবর্ণার উপর দুনিয়ার সব মমতা ঢেলে দিয়ে বলল, “ঐ… আমার বাম দুধটা খাবি?”।

সুবর্ণা উচ্ছ্বসিত হয়ে ঘর্ঘর আওয়াজ করল। বাতাসে কাচের জানালা আবার পাগলা হয়ে গিয়েছিল। কার বাসায় যেন চাইমের ঘণ্টি বেজে যাচ্ছিল অশরীরী পৌনঃপুনিকতায়। রাস্তার ওপারে টালির ছাদদেওয়া সুখী সুখী বাড়িগুলি ওস্তাদ হাস্‌সু খানের মতো কড়ক্‌-বিজলি তান ফিরিয়ে আনতে গিয়ে নিজেদের পাঁজরা প্রায় ভেঙে ফেলতে ফেলতেও সংসারশিল্পে কোমল হয়ে ছিল।

মৌসুমী নিজের টপের আরো দুটো বোতাম খুলে তার টায়ারের মতো চর্বির আরেকটা থাক অনাবৃত করল। “এত বড় মেয়ে”… মৌসুমী চোখ দিয়ে আশেপাশে সোফার চিপায় হারিয়ে যাওয়া খেলনাপাতি বাটিচামচ খুঁজতে লাগল। সুবর্ণা ইতস্তত কৌতূহলে মুখ নামিয়ে আনল।

“এই, এই… তোমরা সিক্‌-গিরি কইর না…”, ঘুমের ঘোরে সোফার উপর পাশ ফিরতে ফিরতে বিড়বিড় করে বলল মাহফুজ মজুমদার।

#

মুনি পন্ডস, মেলবোর্ন ২৪ জুন ২০১৪

 

SHARE
Previous articleলিভিং উইদ আইটেম সং
Next articleহোস্টেল (২)
বর্ণালী সাহা
বর্ণালী সাহা মূলত ছোটগল্প এবং অণুগল্প লেখেন। তাঁর গদ্যভাষায় প্রাধান্য বিস্তার করে বাজার, সঙ্গীত এবং প্রবাস। অধুনা মেলবোর্ন প্রবাসী এই লেখক দিনের বেশিরভাগ সময় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের চর্চায় ব্যয় করেন। পাশাপাশি তিনি তাঁর প্রথম ছোটগল্প সংকলনের পিছনে শ্রম দিচ্ছেন। ভ্রমণ, রান্না, সুডোকু, তিনতাস এবং হাই ইনটেনসিটি ব্যায়ামে তাঁর আগ্রহ আছে।