‘উত্তম ও মানসীর রহস্যময় প্রেম’ উপন্যাস থেকে প্রথম অধ্যায়

ঘটনার শুরু খুবই সাধারণভাবে। অবশ্য গুরুতর ঘটনাগুলার শুরুটা এ রকম স্বাভাবিকভাবেই হয়। সেইদিন একটা দাওয়াত পাইলাম পুরান ঢাকায়। আমাদেরই কোনো এক বন্ধুকে দাওয়াত করছে তারই কোনো এক বন্ধু। এই রকম নিজে চিনি না, কোনো বন্ধুর বন্ধুর দাওয়াতে খুব বেশি হলে দুইজন যাওয়া যায়। কিন্তু দাওয়াত পাইলাম আমরা চারজন। তাই আমি একটু ইতস্তত করলাম—যাওয়া ঠিক হবে কিনা!

যেই বন্ধু সরাসরি দাওয়াতপ্রাপ্ত, মানে যার বন্ধুর অনুষ্ঠান, তার নাম সাদমান। সাদমানের সাথে আমার বেশ খাতির। প্রেমট্রেম পুরাপুরি হয় নাই, তবে হবার বেশ সম্ভাবনা আছে। সে আমাদের চারজনকে বলল, এটা ওর বন্ধুর গার্লফ্রেন্ডের জন্মদিনের দাওয়াত। একশজন মুফতে গেলেও কোনো অসুবিধা হবে না। কিন্তু যে ওই দাওয়াতে যাবে না তার জীবনে একটা বড়সড় ঘটনা মিস হয়ে যাবে।

আমি জানতে চাইলাম, ঘটনাটা কী?

সাদমান শুধু হাসল। মুখে কিছুই বলল না। বাকি তিনজন যাবার জন্য রেডি।

পুরান ঢাকার এইসব তেহারি-বিরিয়ানি খাওয়ার শখ অনেকের আছে। পুরান ঢাকার নাম শুনলেই আমার বন্ধুরা চোখের সামনে কাচ্চি বিরিয়ানি দেখে। কাবাবের সুগন্ধ তাদের মাথায় ম-ম করতে থাকে। পেটে মোচড় দেয়। জিহ্বায় পানি আসে। কিন্তু আমার আসে হাঁচি। এইসব মসলাজাতীয় খাদ্যপ্রেম কোনোকালেই আমার ছিল না। ফ্রি পাইলেও না। পুরান ঢাকা মানে আমার কাছে একটা গ্যাঞ্জাইমা, লুঙ্গি পরা লোকে ভরা, চিপা গলির এরিয়া। তারপরেও যেতে মন চাইল সেইখানে। হুদাই এইসব বন্ধুবান্ধবের সাথে ঘোরাঘুরি করে সময় নষ্ট করা তখন একটা অভ্যাসই ছিল। সাদমান প্রায়ই আমাকে ওর সাথে এখানে-ওখানে নিয়ে যায়। ওর সাথে গেলে বিচিত্র ধরনের সব লোকজন দেখা যায়! আমার পড়ার সাবজেক্ট সাইকোলজি। মেধা তালিকায় পেছনে থেকে কুড়ায়ে পাওয়া সাবজেক্ট না। আমার প্রায় সব ক্লাসমেট ইকোনমিকস, ল, ইংলিশ পড়তে চাইছিল। পায় নাই তাই বাধ্য হয়ে সাইকোলজি পড়ে। তবে আমি শখ করেই এ সাবজেক্টে ভর্তি হইছি। আমার লক্ষ্য দেশের নামকরা সাইকিয়াট্রিস্ট হওয়া। এজন্য আমি একাডেমিক পড়াশোনা সিরিয়াসলি করি। ক্লাস করি, বইগুলি পড়ি আর এর পাশাপাশি নানান টাইপের লোকের সাথে ঘোরাঘুরি করাকে আমার সাবজেক্ট-রিলেটেড কাজ বলেও মনে করি।

সাদমানের বন্ধুর দাওয়াত, সেটা নিয়ে আবার কত রহস্য! না জানি কী হবে সেইখানে! তাই আমিও ওদের সাথে রওনা দিলাম সাদমানের বন্ধুর গার্লফ্রেন্ডের জন্মদিনের দাওয়াতে।

পুরান ঢাকার ওই বিরিয়ানির দোকানে ঢুকে আমার মাথায় হাত। দোকানে কোনো মেয়েই নাই। যে প্রেমিকার জন্মদিন, তাকেও দেখা গেল না। প্রেমিকা কী, ওই লম্বা চিপা টেবিলে আমাদের বয়সী বিভিন্ন সাইজের ছেলে, যথারীতি আমাকে দেখে অবাক হয়ে হাঁ করে তাকায়ে থাকল। সাদমানের মারফতে তাদের কাউকে কাউকে আমি আগে থেকেই চিনি।

আমি একটা জানালার পাশে বসলাম। ওই জানালা দরজার চেয়েও বড় আর সেটার পাশেই বিশাল জঞ্জালের মতন যেন পৃথিবীর সব কালো তার পেঁচায়ে আছে। নিচে পুরান ঢাকার চিপা রাস্তা। সেখানে অজস্র রিকশার টুংটাং শব্দ, বড় বড় ট্রাক এসে প্রায় পুরা রাস্তা কিছুক্ষণ দখল করে রাখে। এইসব গ্যাঞ্জামের মধ্যেই খুব সাজগোজ করা লোকজন ঘোড়ার গাড়িতে বিকট শব্দে হিন্দি গান বাজায়ে নাচতে নাচতে কোথাও যাচ্ছে। এইটুকু রাস্তার মধ্যেই একপাশে কলার ঝুড়ি নিয়ে কলাওয়ালা, সিগারেট-পানের বাক্স নিয়ে দোকানদার বসে আছে। সেখানেও ক্রেতার কোনো কমতি নাই। এই হট্টগোলের মধ্যেই ক্রেতারা নিজেদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে গল্পগুজব করতেছে। ব্যাটারিওয়ালা রিকশা চলে এইখানে। সাঁই-সাঁই করে রিকশা এসে একটা আরেকটার পিছনে জোরে ধাক্কা দেয়। প্রায় সময় রিকশার যাত্রী রিকশা থেকে পড়ে যায়। তারপর বেধে যায় তুমুল হট্টগোল। অশ্লীল গালির তুবড়ি ছোটায় রিকশাওয়ালা, যাত্রী, পথচারী—সবাই। তবে ঝগড়া-মারামারি সবাই করে না। কেউ কেউ রিকশা থেকে হুড়মুড় করে পড়ে গিয়ে জামা ঝাড়তে ঝাড়তে চারপাশে তাকায়ে বোকার মতো হাসে। আবার রিকশায় চড়ে বসে।

এইসব দেখতে দেখতে সময় গড়াচ্ছে। আমি মনে মনে ভাবলাম, পুরান ঢাকার এই জ্যামের কারণেই গার্লফ্রেন্ড হয়তো এখনো এসে পৌঁছায় নাই। জন্মদিনের পার্টি। সাজতে-গুজতে সময় লাগবে। ঢাকার মেয়ে হলে হয়তো পার্লারেও যাবে। নিশ্চয়ই একটু দেরি করেই আসবে।

পার্লার ফেরত গার্লফ্রেন্ডের অপেক্ষা কেউ করল না। গার্লফ্রেন্ড নিয়ে কেউ কোনো কথাও তুলল না। খাওয়াদাওয়া শুরু হয়ে গেল। যার যা খুশি তাই-ই অর্ডার করল। কাবাব, রোস্ট, নানরুটি, তেল ছাড়া পরোটা, তেল দেওয়া পরোটা, কাচ্চি বিরিয়ানি, খাসির বিরিয়ানি, তেহারি—মনে হয় না দোকানের আর কোনো আইটেম ছিল যেইটা অর্ডার দেওয়া হয় নাই। সবাই পেট পুরে খেল। কেউ কেউ বিরিয়ানি খেল, সেটা শেষ করে কাবাব-রুটিও খেল। আমি হাঁ করে তাদের খাওয়া দেখলাম। তখনো সাদমানের বন্ধুর গার্লফ্রেন্ড আসবার আশায় দুই-একবার জানালা দিয়ে উঁকি মেরে নিচের গ্যাঞ্জাইম্যা রাস্তাঘাট দেখলাম।

মোট বারো জনের খানাপিনা। যে হোস্ট তাকে আমি তখনো চিনি না। কিন্তু অন্যদের সাথে পরিচয় হয়ে গেল। কথায় কথায় জানা গেল, আজকের এই মহতী ভোজন অনুষ্ঠানের পয়সা যে দিবে তার নাম বুড়া। বুড়া সাদমানের বন্ধু।

‘বুড়া’ কখনো কারো নাম হতে পারে না সত্যি। কিন্তু আমার বন্ধুবান্ধবদের নামগুলা এ রকমই। এগুলা অবশ্য বাপ-মায়ের দেওয়া নাম না। কোনো কারণে বন্ধুদের মধ্যে কেউ কাউকে কোনো অদ্ভুত নামে ডাকা শুরু করলে ওই নাম এমনভাবে প্রচলিত হয়ে যাইত যে, বাপ-মায়ের দেওয়া আকিকা করা নাম কারো আর মনেই থাকত না। বন্ধুদের মধ্যে সবার এ রকম নাম আছে। আমার নাম সাইকো। সাদমানের নাম জাকালা। বঙ্কুর নাম গাভী। বঙ্কু একটু মোটা টাইপের তাই ওর নাম গাভী। সাদমান নাকি স্কুলে একবার ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’তে আলিফ-লায়লার জিন সাজছিল। তাই ওর নাম জাকালা। আমি সাইকোলজি পড়ি, তাই আমার নাম সাইকো।

বিল দেওয়ার সময় হলে বুঝলাম, এদের মধ্যে ফর্সা, লম্বা, হাড়জিরজিরে ছেলেটার নামই বুড়া। সত্যিই ও দেখতে কেমন বুড়াদের মতন। ওর শরীর এতটাই হাড়জিরজিরে আর উচ্চতায় এতটাই লম্বা যে, আমাদের তুলনায় কেমন একটু বয়স্ক বয়স্ক দেখায়। দোকানদারকে টাকা কম দেওয়ার জন্য খুব জোরাজুরি করতেছে তখন বুড়া। ওর ময়লা জিন্স, রঙ ওঠা টি-শার্ট, ময়লা চাদর দেখতে দেখতে হঠাৎ খেয়াল করলাম ওর ঠোঁট খুব সুন্দর গোলাপি রঙের। ছেলেরা হয়তো বলত কমলার কোয়া, কিংবা গোলাপের পাপড়ি কিংবা আরও কোনো একটা অবাস্তব বিশ্রী উপমা, কিন্তু আমি দুনিয়াতে এমন কিছুই খুঁজে পাইলাম না যেইটা ও-রকম হালকা গোলাপি রঙ কিংবা ওই রকম পাতলা। ওর ওপরের ঠোঁটের বাঁপাশে একটা কালো তিল। ওইখানে আমার চোখ আটকায়ে গেল।

ঠিক এমন সময় সাদমান আমাকে ওর সাথে পরিচয় করায়ে দিল। বিল নিয়ে দরকষাকষি তখন শেষ।

সাদমান বলল, বুড়া, ও আফসানা। সাইকোলজিতে পড়ে।

বুড়া আমার দিকে ভালো করে না তাকায়েই হাত নাড়ল। আমার চোখ তখনো ওর ঠোঁটের তিলের ওপর।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, এই তোমার আসল নাম কী?

ও ঝটপট বলল, বুড়া।

আমি বললাম, ধুর, নিজেই নিজের নাম ভুলে গেছো নাকি!

হঠাৎ যেন মনে পড়ে গেছে এমন একটা ভঙ্গি করে বুড়া বলল, ও আচ্ছা! নাম? উত্তম, আমার নাম উত্তম।

সাদমান পাশ থেকে আমার মাথায় টোকা মেরে উত্তমকে বলল, ওর নাম সাইকো।

খেয়াল করলাম কথা বলার সময় একটু তোতলায় উত্তম। আর ওর মানিব্যাগটা শতচ্ছিন্ন। ওটা পকেটে রাখার সময় পকেট থেকে ওর মোবাইল পড়ে গেল। তখন আমার চোখ গেল ওর মোবাইলে। ওইটাও হলুদ রবারব্যান্ড দিয়ে বাঁধা একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত মোবাইল। যেইটার বয়স একটা প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণার বিষয় হতে পারে। এবং সেইটার কিপ্যাডে ০ নাই। জায়গাটা ফাঁকা।

কিপ্যাডে জিরো না থাকলে ওই মোবাইল কীভাবে ব্যবহার করা যায় এটা ভাবতে ভাবতে আমার মনে একটা গবেষণামূলক নীরব ঝড় হয়ে গেল। জিরো না থাকলে কাউকে ফোন করা যায় কীভাবে? সব সেভ করা নাম্বারে ফোন করতে হয়? কিন্তু জিরো না থাকলে নাম্বার কীভাবে সেভ করবে ছেলেটা? যদি এখন আমার নাম্বার দিতে চাই কীভাবে সেভ করবে ও!

ইউরেকা! ইউরেকা! ও নিশ্চয়ই আমাকে ওর নাম্বার বলবে আর আমি ওকে আমার নাম্বার থেকে মিসকল দিব! ও নাম-নাম্বার সেভ করে নিবে!

তা না হয় হলো। জিরো না থাকলে এসএমএস করবে কেমনে? স্পেস তো দেওয়া যায় না জিরো ছাড়া!

আমার যেন একটু মায়াই হলো। ছেলেটার টাকা পয়সা নাই। এই রকম একটা গরীব ছেলের টাকায় এতজন মিলে এত কিছু খাওয়াটা একদম ঠিক হয় নাই। তখনই আমার মনে হলো, যার বার্থডে সে কোথায়? এখনো পৌঁছতে পারল না! খাওয়াই শেষ! এই ছেলের গার্লফ্রেন্ড কি ওর মতনই গরীব নাকি পার্লারে সাজগোজ করা বড়লোকের মেয়ে সেইটা ভাবতে ভাবতে আমি ওদের সাথে হোটেল থেকে বের হয়ে গেলাম।

তারপর আমরা হোটেলের নিচে দাঁড়ায়ে পান খেলাম। শীতকাল। রাত নয়টা বাজলেও মনে হয় যেন অনেক রাত। এবার ঠাণ্ডা বেশ। সন্ধ্যা হতে না হতেই কুয়াশা পড়তে শুরু করে।

অতিথিদের মধ্যে চারজন বিদায় নিল। বাকিদের মধ্যে একজন বলল, ওর ব্যাগে বোতল আছে। কোনো চিপায় গিয়ে সেটা আমরা সবাই মিলে খাব।

চিপার খোঁজে সবাই মিলে বুয়েটের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। আর আমার মাথায় তখন নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হলো।

বোতল আছে মানে এরা সবাই মিলে মদ খাবে এখন। কোনো গার্লফ্রেন্ড-টার্লফ্রেন্ডের অপেক্ষায় এরা আছে বলে তো মনে হয় না। তা হলে ঘটনাটা আসলে কী? মদ খাওয়া নিশ্চয়ই কোনো রহস্যের ব্যাপার না! তাহলে রহস্য কি গার্লফ্রেন্ডে?
এখানকার কোনো ছেলেই কি আসলে উত্তমের ‘গার্লফ্রেন্ড’?

সাদমান উত্তমের পাশে পাশে হাঁটতেছে। কাঁধে হাত রেখে হাঁটতেছে দুইজনে। সাদমানের মুখ খুব হাসি হাসি। কী যেন অনাবিল আনন্দে সব দাঁত বের করে উত্তমের সাথে অনবরত কথা বলে যাচ্ছে। সাদমানই উত্তমের গার্লফ্রেন্ড না তো!
এই রকম ভাবার যথেষ্ট কারণ ছিল। আমার বন্ধুবান্ধবদের কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই। তাদের বন্ধুবান্ধবেরও যে কোনো ঠিক-ঠিকানা নাই সেটা বুঝতে সময় লাগে না। সাদমানকে আমি কলেজ লাইফ থেকে চিনি। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতেই পড়ে ও। অ্যাপ্লায়েড ফিজিক্সে। কলেজে খুব একটা ঘনিষ্ঠতা ছিল না। তখন কলেজের ছেলেমেয়েরা নিজেদের মধ্যে খুব একটা আলাপ করত না। ভার্সিটিতে ভর্তি হবার দিন টিএসসির জনতা ব্যাংকে সাদমানের সঙ্গে আমার দেখা। ও সেদিন নিজে এসে আমার সাথে কথা বলল। ধীরে ধীরে ওর আর আমার বেশ খাতির হয়ে গেল। ও প্রায়ই আসে হাকিম চত্বরে আড্ডা দিতে। তবে আমি সাদমানের ব্যাপারে জানি খুব অল্পই। ক্যাম্পাসে ওকে আমি কোনো ছেলের কাঁধে হাত রেখে হাঁটতে দেখি নাই। হাঁটতে হাঁটতে সাদমানের কোমরে হাত রাখল উত্তম। এদিকে আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। তবু আমি ওদের সাথে গেলাম। মনে হচ্ছিল সত্যিই আজকে এমন কিছু দেখব যেইটা আমি কল্পনাও করি নাই।

আমরা একটা ভালো জায়গা খুঁজে পাইলাম। সবাই যে যার মতো ছড়ায়ে-ছিটায়ে বসে আছি। সবার হাতেই সিগারেট আর মুখে পান। উত্তম এসে বসল আমার পাশে। আমার দিকে সিগারেট আগায়ে দিল।

উত্তম এমন স্বাভাবিকভাবে আমার দিকে সিগারেট বাড়ায়ে দিল যেন আমি ওর কতদিনের পুরানো বন্ধু। সাদমান কিংবা অন্যদের সাথে ওর যেমন সিগারেট ভাগাভাগির সম্পর্ক, আমার সাথেও যেন তাই। সাদমান বা আমার অন্য ছেলেবন্ধুরা কখনো এমন স্বাভাবিক ব্যবহার করে না। ছেলেবন্ধু আর মেয়েবন্ধুর একটা ফারাক ওদের আচার-আচরণে থাকেই। উত্তমের এই আচরণে আমি এতই মুগ্ধ হয়ে গেলাম যে আমি সিগারেট খাই না এমন কিছু বলার সাহসই পেলাম না।
সিগারেটের দিকে তাকায়ে থাকলাম। মনে হলো ওর সুন্দর ঠোঁট এইমাত্র সিগারেটটা চেপে ধরছিল।

ভাবতেই ঝটকা মেরে উঠলাম। আড়চোখে চারপাশে তাকায়ে দেখলাম কেউ আমার মনের কথা বুঝে ফেলল কিনা। কেউ যেন কিছু না বোঝে সেজন্য সিগারেটে দুইটা আলগা টান দিয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, কীরে বুড়া, কার জন্মদিনের দাওয়াত খাইলাম রে? তোর প্রেমিকাটা কোথায়?

সবাই হো হো করে হেসে উঠল। সবচেয়ে বেশি সময় ধরে হাসল সাদমান। যেন এইটা খুব আজব একটা প্রশ্ন! আমি উত্তরের আশায় খুব মনোযোগ নিয়ে ওদের দিকে তাকায়ে থাকলাম। এইবার নিশ্চয়ই জানা যাবে উত্তমের গার্লফ্রেন্ডের গোপন রহস্য!

উত্তম আকাশের দিকে তাকায়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল, অ মানসী! অরে পাবো কই? অয় তো চট্টগ্রামে!

আমি অবাক হয়ে গেলাম! একটু মন খারাপও হলো যেন। উত্তম-সাদমানের রহস্য এখানেই শেষ। ‘গার্ল’ফ্রেন্ড আছে তাহলে একজন!

বললাম, মানে কী? ওকে ছাড়াই ওর জন্মদিনের পার্টি!

উত্তম একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল, মাথা নাড়ল, তারপর অনেকক্ষণ নিচের দিকে তাকায়ে থাকল।

যেন দীর্ঘ সময় পরে বলল, প্রতিবছরই এই দিন ওর জন্মদিনে আমি পার্টি করি। ও নাই তাতে কী! সে…সে…সেলিব্রেট করতে হবে না?

আবার চুপ করে গেল ও। ওর চেহারা দেখে মনে হলো মানসী নিশ্চয়ই মারা গেছে। মৃত মেয়ের জন্মদিনের দাওয়াত খাইলাম—এটাই হয়তো সাদমানের সেই রহস্য! সাদমানের সব দাঁত এখনো বের হয়ে আছে। ওর চেহারা দেখে মনে হচ্ছে মরা মানুষের বার্থডে করা খুবই আনন্দের ব্যাপার। কিন্তু সাদমান কি এতই খারাপ যে একটা মরা মানুষ নিয়ে হাসাহাসি করবে?

তখনই উত্তম বলল, ওর বাসায় খুব রেস্ট্রিকশন রে। মানসীর বাপ একটা চুতিয়া আর মা একটা দ…দ…দজ্জাল। একবার ফোনেও কথা বলতে পারি নাই আজকে।

তোতলাতে তোতলাতে কথাগুলো বলে আবারও কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল ছেলেটা। সিগারেট নিয়ে নিল আমার হাত থেকে।

ওর দুঃখভরা চেহারাটা দেখে নাকি ওর তোতলা স্বভাবের কারণে—জানি না কেন আমার খুব মায়া হলো ওর জন্য। ‘মানসী’—নামটা একটু পুরানা ধাঁচের। এই রকম নাম আমি শুনছি, কিন্তু কখনো কাউকে দেখি নাই। সেই প্রথম এ নামের কারো সাথে আমার পরিচয়। না দেখা এই মেয়েটা আমাকে যেন অদ্ভুতভাবে আকর্ষণ করল। মনে হলো, উত্তম যেমন অন্যরকম একটা ছেলে, মানসীও নিশ্চয়ই তাই-ই হবে। জীবনে একবার হলেও আমি এই মেয়েকে নিজের চোখে দেখবোই।

ততক্ষণে আরেকটা ঘটনা ঘটে গেছে।

বাইশ-তেইশ বছর বয়সী পোলাপান সব। প্রতিদিন তো আর এভাবে মদ খেতে পায় না! দুইটা মাম পানির বোতলে হুইস্কি মেশানো ছিল। উত্তমের উদাস উদাস সময়ে প্রায় সবটুকুই অন্যরা খেয়ে ফেলছে। খেয়াল করে নাই যে বোতলে আর কিছুই নাই।

তাই হঠাৎ করেই উত্তম যখন বলে বসল, আ..আমার জন্যও রাখিস, সব মেরে দিস না… তখন সবাই জিভ কাটল। একটু আগেই ওর পয়সায় বিশাল খাওয়াদাওয়া করে আসল সবাই, আর ওর জন্য কিনা এক ফোঁটাও রাখে নাই, এইটা কে কীভাবে ওকে বলবে বুঝে উঠতে পারল না ওরা।

আমার মাথায় তখন একটাই চিন্তা। উত্তমকে আর কষ্ট দেওয়া যাবে না। যেভাবেই হোক ওকে খুশি রাখতে হবে। আমি আমার ব্যাগ থেকে মাম পানির বোতলটা বের করে ওর হাতে দিলাম। আমার কেমন যেন মনে হচ্ছিল, ওর যা চরিত্র, এইটা মদ না পানি, ও কিচ্ছু টের পাবে না।

বাকিদের মধ্যে একটা নীরব হাসির আলোড়ন বয়ে গেল। সবার দাঁত দেখা গেল, কিন্তু কেউ কোনো শব্দ করল না।

উত্তম বোতলটা হাতে নিয়েই ঢক ঢক করে পানি গিলতে শুরু করল। আর মাতালের মতো বলল, মানসী, মানসী। বলতে বলতেই সেখানে শুয়ে পড়ল ও।

আমি বললাম, কীরে তুই তোতলালি না কেন? তুই তো সব কিছুতে তোতলাস, ওর নাম বলার সময় তোতলাস না কেন?

সবাই খুব জোরে হেসে উঠল।

সাদমান বলল, এবার সাইকিয়াট্রিস্টের প্রশ্নের উত্তর দে, বুড়া।

আমার মন খুশিতে ভরে গেল। এই প্রথম কেউ আমাকে সাইকিয়াট্রিস্ট ডাকল। আমার মনের আনন্দ গোপন রেখে আগের মতন স্বাভাবিক চেহারা নিয়ে বসে থাকার চেষ্টা করলাম আমি। কারণ আমার প্রশ্ন শুনে না, সামান্য পানি খেয়ে উত্তমের মাতলামি দেখে সবাই খুব মজা পাচ্ছে। ওকে নানা রকম টিজ করতে শুরু করল সবাই।

সাদমান বলল, বুড়া, এই যে তুই প্রতিবছর মানসীর জন্মদিনে খাওয়াস, কোনোদিন তো তারেই দেখলাম না! যার জন্য প্রতি শীতকালে এ রকম একটা খাস খাওয়াদাওয়া হয়, সে কই? তারে দেখবো কখন!

উত্তম তখন মাতাল। কারণ ওর পুরো বোতল (পানি) খাওয়া শেষ। মাতালের প্রলাপের মতোই বলল, ওরে তোরা দেখবি কেমনে! আমিই দেখি না পাঁচ বছর! তোরা দেখবি কই থেকা!

আমরা সবাই ততক্ষণে শীত ভুলে গেছি। গায়ের চাদর খুলে রাখতেছি। সাদমান সিগারেট ধরাচ্ছে। শব্দ না করে দুলে দুলে হাসতেছে সবাই।

দেখ কাণ্ড! ছাগলটা কিনা পানি খেয়েই মাতাল!

আমি বললাম, বলে কী! পাঁচ বছর দেখা হয় না! প্রতিবছর বার্থডে করিস! তুই তো দেবদাস রে বুড়া! দেবদাস!

উত্তমের কথা তখন আরও জড়ায়ে গেল।

বলল, যখন এইটে পড়ি মানসীর সাথে দেখা। হে…হেমশের লেইনে মানসীর বাসা। ওইখানে আমি পড়তে যাইতাম, কে…কেন যে যাইতাম রে! একদিন ফোনের দোকানে গেছি, একটা ফোন করব। অনেকক্ষণ দাঁড়ায়ে থাকলাম একটা মাইয়ার পিছে। মাইয়ার কথা বলা শেষ হয় না। মাইয়ার চুলগুলা এত বড়—এত ব…ব…বড়—কোমরের সমান। বিশ মিনিট দাঁড়ায় আছি রে, আর পারি না, জরুরি ফোন। মাইয়াটারে বললাম, ইয়ে মানে আমার একটা ইয়ে মানে ফোন…।
মাইয়াটা ঘুরে তাকায়ে আমারে একটা মুখ ঝামটা দিল। বলল, ‘তোমার ফোন, তোমার ফোনই সব। আমার ফোন কিছু না!’ ঝটকা মেরে চলে গেল রে মেয়েটা। সেই দেখা, প্রথম দেখা। আমি তো আর নাই রে।

উত্তম ফোঁপাতে শুরু করল। ও সহজ-সরল ছেলে। এমনিতেই আজকে অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। ও যে পানি খেয়ে টাল হয়ে গেল সে কথা সমগ্র বাংলাদেশ হতে শুধু আজকের রাতটুকু সময় লাগবে। কালকে সকালের মধ্যেই এখানকার সব বন্ধু দেশে-বিদেশে সব জায়গার বন্ধুদের কাছে বলে দিবে উত্তমের আজকের কাণ্ড। তার ওপর মানসীর জন্য এই কান্নাকাটি, এই প্রথম দেখার গল্প প্রতিদিন প্রতি মুহূর্ত ওকে অভিনয় করে দেখাবে বন্ধুরা।

সাদমান তো বলেই ফেলল, সারাজীবন এই এক কথা শুনলাম। মানসীর চুল অনেক লম্বা। মানসী অনেক ঝগড়াটে। মানসীকে দেখবো কবে এইটা তো বললি না? মানসীকে সাথে নিয়ে মানসীর একটা বার্থডে হবে না এই জীবনে?

উত্তম হু হু করে কাঁদতে শুরু করল। চাদরটাকে এমনভাবে জড়ায়ে ধরল যেন সেইখানেই মানসী আছে। কিন্তু সে চাদর থেকে বের হয়ে বার্থডেতে আসতে পারতেছে না।

সাদমানের উপর খুব চটলাম আমি। চোখ মটকায়ে তাকালাম ওর দিকে। ইশারায় বললাম উত্তমকে যেন আর কিছু না বলে ওরা।

তারপর উত্তমকে বললাম, ওই বুড়া, যা বাসায় যা। আমার হল বন্ধ হয়ে যাবে।

রিকশায় চড়ে হলে ফিরতে ফিরতে আমার মনে কোথায় যেন একটা চাপা কষ্ট হতে শুরু করল। সাদমানের বন্ধু উত্তম—এই কথা ভেবে না। উত্তমকে আমার ভালো লাগছে এইজন্যও না। আমার শুধু আমার ছোট ছোট চুলগুলার কথা মনে হলো। উত্তম কেন, এদেশে কেউই ছোট চুলের মেয়েদের ভালোবাসে না। ভালোবাসার প্রথম শর্তই যেন লম্বা কালো চুল। জীবনানন্দ কবিতা লিখছে—চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা। আরে চুল নিয়ে এত মাতামাতি করার কী আছে! অড্রে হেপবার্নের কেমন ছোট ছোট চুল, ওর চেয়ে সুন্দর মেয়ে কি পৃথিবীতে আছে? কিন্তু বাংলাদেশের ছেলেরা সেটা বুঝবে না। পা পর্যন্ত চুলওয়ালা মেয়ে তাদের লাগবেই। ছোট চুল দেখেই বোধহয় উত্তম আমাকে সিগারেট সাধল। একবার জানতেও চাইল না আমি সিগারেট খাই কিনা! মেয়েটার লম্বা চুল নাই, তাই ও তো আমাদের মতোই, একটা প্রায় ছেলে! কলেজে কত ছেলের সাথে কত মেয়েকে জড়ায়ে ফিসফাস কথা হতো! চিঠি আদান-প্রদান চলত। আমাকে চিঠি লিখে নাই কেউ। আমাকে নিয়ে ফিসফাসও হয় নাই কখনো। কেউ আমাকে ভালোবাসে নাই, অবশ্য ঘাড়ের নিচে চুল থাকলে বাসতো বলেও মনে হয় না। তা ছাড়া লম্বা চুল জিনিসটা আমি নিজেই খুব একটা পছন্দ করি না। ঘাড়ের নিচে চুল থাকলে সুড়সুড়ি লাগে, অসুবিধা হয়। চুল শুকাতেও অনেক সময় লাগে। আঁচড়াতে, জট খুলতে খুলতে হাত ব্যথা করে। এখন আমার চুল লম্বা করতে ইচ্ছা করলেও জানি দুইদিন পরেই আমি অতিষ্ঠ হয়ে যাব চুলের যন্ত্রণায়। ছেলেরা যাদের ভালোবাসে ওই মেয়েরা অন্যরকম। আমি ওই রকম না।
#

উত্তম ও মানসীর রহস্যময় প্রেম / পারমিতা হিম / ফেব্রুয়ারি ২০১৯ / প্রকাশক. কথাপ্রকাশ / প্রচ্ছদ. মোস্তাফিজ কারিগর / দাম ৩০০ টাকা

Write A Comment