কবি উৎপলকুমার বসুর ঢাকা সফর (৩)

উৎপলদা আমার কানের কাছে উনার মুখ এনে বললেন, আমি বাংলাদেশে ঢুকেই বিমোহিত। এদেশের বাতাসে অন্য রকম গন্ধ।

(আগের কিস্তি)

মালখা নগরে

‘কত গল্পে নেমে গেছি—কত না গাথায়—
ভাঙা ধ্বস্ত সিঁড়ি বেয়ে, দু-চার ধাপ টপকে গেছি,
পড়তে পড়তে বেঁচে যাই, ঐ ভাবে বোকার মতো বাঁচি—
মহাভারতের মাঠে, হোমারের উপকূলে, এজিদ-কান্তারে, দেখি
যুদ্ধ শুরু হল, শেষ হল, নায়ক নিহত, রাজ্য শ্মশান—
প্রতি গল্প বিশ্বরূপ, মাথামুণ্ডু না বুঝেই কাঁদি,
হায়, অবিদ্যায় ঢাকা থাকল ঋজু পাঠ—যেন তারা
হিমের কুটুম, ঐ অস্বচ্ছ মানুষজন, গাছপালা, রণক্ষেত্র—
কেন, এর বেশি, সবটা বুঝিনি?’

(উৎপলকুমার বসু, বক্সীগঞ্জে পদ্মাপারে, ভূমিকা, ২০০৪ )

আমি কখনও বিক্রমপুর যাই নাই। বিক্রমপুর নামটা ছোটকালে শুনছিলাম যখন আমরা স্কুলে পড়ি তখন। আমাদের গ্রামের হাটের সদানন্দ কাকার মিষ্টির দোকানে সন্দেশ জিলাপি খাইতাম, উনি ক্যাসেট প্লেয়ারে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কৌতুক চালাইতেন। মিষ্টিভোজী রসিকেরা যুগপৎ ভানুর কৌতুক আর রসগোল্লার মিষ্টির স্বাদ নিতে এই দোকানে আসিয়া বসিতেন। সকালে পরোটা ভাজি মিষ্টি আর সেই সাথে ভানুর গালগল্প শুনিতেন।

utpal 3 a
উৎপলকুমার বসু, কলকাতায়

ততদিনে কলকাতার বাংলা গান আমরা হিন্দু বাড়িতে বিয়েতে মাইকে বাজিত যখন তখন শুনিতাম। বন্ধুদের বাড়িতে যাদের ক্যাসেট প্লেয়ার ছিল তাদের বাড়িতে গিয়া আধুনিক বাংলা গান ও হিন্দি গান শুনিতাম। কলকাতা বেতারের নাটক শুনিতাম। কলকাতার বাংলা আমাদের কাছে বইয়ের ভাষার মত লাগিত। ভানুজি যে ভাষায় কৌতুক প্যাঁচাল পাড়িতেন সেই বাংলা আমাদের এইখানকার বাঙ্গাল ভাষায়। লোকটা (ভানু) কলকাতার, অথচ তার প্রাণটা বাঙ্গাল। এই কথা একদিন আমার বন্ধু সমর মোরে অবাক করণার্থে কইল, ভানুর বাড়ি তো বিক্রমপুর, ঢাকায়। তখন খুশি হইলাম ভানু আমাদের লোক ভাবিয়া। দূরের কোনো দেশে আমাদের কেউ কৃতিত্বের কিছু করিলে তাকে আমাদের ঘরের লোক ভাবতে মন বড় উঠিয়া-পড়িয়া লাগে চিরকাল। তার লগে কুটম্বিতার সুতার টান অনুভব করিতে থাকি। মনে পড়ে, ছোটকালে কেউ রসিকতাযোগে কথা পাড়িলে তারে আমরা ভানু কয়ে খেপাইতাম।

সেই প্রথম যাওন বিক্রমপুরে। ভানুর গ্রামদেশে।

hansh cholar poth
হাঁস চলার পথ – উৎপলকুমার বসু (২০১৫)

আমি, আমার স্ত্রীর পরম বড় ভাইজান আর উৎপলদা একযোগে বিক্রমপুর যাইবার মন স্থির করলাম। যেন একটা অভিযান মনে মনে। উৎপলদাকে সঙ্গ দিতে আমাদের আগ্রহের কমতি ছিল না। উৎপলদা যাইবেন আগামীকাল আমাদের সাথে তার পৈত্রিক ভিটে দেখতে। তার বড় ভায়ের স্মৃতিময় শৈশবের উঠানে, পৈত্রিক ভিটের সুবাস নিতে। বিক্রমপুরের মালখা নগরে।

জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির ৩০৪ নম্বর কক্ষে সকাল ছ’টার সময় গিয়া দেখি উৎপলদা রেডি হয়ে বসে আছেন। আমরা রিকশা ঠিক করি। বাবুবাজারের দিকে প্রথমত যাইতে থাকি।

আমি আর উৎপলদা এক রিকশায় চড়ি। অনেক বিষয় নিয়া কথা চলিতে থাকে। উৎপলদারে জিজ্ঞেস করি, দাদা, আপনি যখন জেগে থাকেন তখন আপনি কোন মুডে বেশি থাকেন? মানে বিষাদে নাকি হরষে? মানে আপনি কোন মুড আপনি যাপন করেন বেশি?
উনি কইলেন, নির্বিকারত্ব।

আমি কইলাম, আপনি তো কথা বা গল্প পাড়েন যখন তখন তা দেখি রসিকতায় গিয়া শেষ হয় বেশি।

উনি কইলেন, রসিকতা বলো আর হাস্যরস বলো তার তলায় একটা নির্বিকারত্ব থাকে।

আমার তখন মনে হইল, লোকটা প্রকৃতির মুড অর্জন করার সাধনা করে আসতেছেন।

আমি কথা চালাই এইভাবে, যুদ্ধাহত পরাজিত ক্লান্ত সৈনিকরা সাধারণত এ ধরনের নির্বিকারত্ব হতাশা ও আশারে নাকচ করে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন কাটায়।
আপনার একটা কবিতা আছে এই রকম নির্বিকার মুডের।

‘‘কত গল্পে নেমে গেছি —কত না গাথায় —
ভাঙা ধ্বস্ত সিঁড়ি বেয়ে, দু-চার ধাপ টপকে গেছি,
…………………………………………………
প্রতি গল্প বিশ্বরূপ, মাথামুণ্ডু না বুঝেই কাঁদি…’’

উৎপলদার বক্সীগঞ্জে পদ্মাপারে, ভূমিকাংশের এই কবিতার মনে করানো সাথে সাথে উনি যেন ব্যথা আর অধিক স্পর্শকাতর সাগরে চুবানি খাইলেন। আমার মনে হইল ইরাক যুদ্ধের ভয়াবহতা থাইকা এই কবিতাটা লিখা হইছিল। দেখি উৎপলদার পুরা কবিতাটা মুখস্থ। উনি প্রায় পুরা কবিতাখান স্মৃতি থেকে শুনাইলেন।

boksigangইরাকে ইতোমধ্যে সাদ্দাম পরিবার তার মন্ত্রিপরিষদের অনেকেই ধরা পড়ছেন। সাদ্দামকে ফাঁসিতে ঝুলানো হইছিল পহেলা রমজানের দিনে। সারা মুসলিম জাহানের অন্তর কারবালা যুদ্ধের বিষ আরেকবার উগরে উঠছিল। আমেরিকান বাহিনী তখনও যুদ্ধ বিধ্বস্ত ইরাকের মাটিতে মদমত্ত হত্যানৃত্য থামায় নাই। মার্কিন দেশ ও তাদের দোসরেরা মিডিয়াতে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস, অন্যায়, অবিচার, অধর্মের বিরুদ্ধে তাদের ন্যায় ধর্মযুদ্ধ জারি রাখছে ভবিষ্যতের শান্তিময় একটা পৃথিবী গড়বার প্রত্যয়ে—এই প্রচারণা চালায়। এর আড়ালে মার্কিনীদের যুদ্ধে লাভ লোকসান, রাষ্ট্রের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সুবিধা, অন্য দেশের সম্পদের উপর কড়া নজর, আধিপত্য কায়েম করার রাজনীতিক ও কূটনীতিক তৎপরতায় ব্যস্ত। দেশে দেশে মার্কিন সেনাবাহিনীর খাদ্যকে ঘিরে পিঁপড়ার মহড়া মতো। মার্কিন ঔদ্ধত্য, অহং, হিংসা, অসহিষ্ণুতার প্রতিক্রিয়ার বিপরীতে সামান্য জেহাদী ইসলামের প্রতিরোধ মুসলিম দেশগুলোকে আরও বিপদের মুখে নিয়া যাইতেছে। তবু ‘ইসলামী সন্ত্রাসবাদ’ বনাম মার্কিনী সর্বাধুনিক প্রকাশ্য মানববিধ্বংসী মারণাস্ত্র কতটা অসমযুদ্ধ কতটা অন্যায় বার বার নিপীড়িতদের বিবেককে নাড়া দিচ্ছে। ‘মুসলমান’ এই সাংস্কৃতিক/ধর্মীয় পরিচয়কে ছাপিয়ে ‘মুসলমান’ রাজনৈতিক পরিচয় হয়ে উঠতেছে। মুসলমানদের নিয়তি একদিন ইহুদির নিয়তির মত হবে। সেই সাধারণীকরণের দিকে আগাইতেছে।

উৎপলদা কবিতাটা পড়ার পর কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। আমার মাথার ভেতর কবিতার ইমেজগুলা খেলে গেল। তিনটা মহা রণক্ষেত্রের উল্লেখ আছে এই কবিতায়— মহাভারতের মাঠে, হোমারের উপকূলে, এজিদ-কান্তারে।

এই হলো পর পর সভ্যতা যুগের গল্প! গল্পেরও নায়ক থাকে। যুদ্ধেরও নায়ক থাকে। নায়কে নায়কে অদল বদল। যুদ্ধে নায়কেরা মরে। মরে তারা গল্পের নায়ক হয়। অনায়ক তথা ক্ষুদে নায়ক লোকজন মরে অগণন। বিবেক নিপাত যায়। বিদ্যা আর অবিদ্যার মধ্যে ভেদ দূরীভূত হয়। রাজ্যগুলা শ্মশান হয়। অর্থহীনতা হাজির হয়। রাজ্যের নিকৃষ্টরাই সেরা, ক্ষমতার লড়াই, রণক্ষেত্রই ভাগ্য নির্ধারিত করে দেয় সবাকার কোন দিকে যেতে হবে। কারা যাবে। তারা তো আর তারা না। কোনো অর্থ যখন আর থাকে না। অর্থহীনতার জগৎ যেন শয়তানের জগৎ। অপর জ্ঞানে দেহ ধ্বংসের মধ্যে ক্ষোভের প্রশমন। উধাও হওয়া যত দেহ, তার থেকে সঞ্চারিত পরাজয়ের স্মৃতি, ক্ষত। পঞ্চেন্দ্রিয়ানুভূতির অকার্যকরতা, তখন ঠুঁটো দেহই আত্মা। আত্মায় ক্ষতগুলা উচ্চারিত। অতএব নির্বিকার হয়ে থাকা। যারা শুধু বাঁচে যুদ্ধের শেষে অর্থহীনতাকে সঙ্গী হিসাবে পায়। ঢাকা পড়ে বোধ আর ভেঙে পড়ে আপনের সীমানা। বিশ্বজগতের সব যোগাযোগ স্থগিত হয়। বোকার মতো কাঁদা জীবনে তখন জোটে। মানবের অনুচ্চার স্বাভাবিকতার বাইরের যেন এক কৃত্রিম পরিস্থিতি। মানুষ তার সৃষ্টি বিনষ্ট করে হিংসার অগ্নিতে। তার কিছু আগুন গিয়ে পড়ে প্রকৃতিতে। পোড়ে কিছু গাছ, শিশু, রক্তাক্ত হয় নদী, ধোঁয়া গিয়ে লাগে আকাশে, পথ ভিজে রক্তে। তখন নির্বিকারত্বই চেতনা ও অবচেতনা।

এই ভাব চাগায়ে তোলে উৎপলের এই কবিতাখানি।

আমি কইলাম, এই কবিতায় ব্যক্তি লুণ্ঠিত। নির্বাপিত এক আমির বিবরণ মনে হয়।

উনি কইলেন, আমির অনুপস্থিতি আসে, আমিকে কবিতায় বিপদের ফেলার মধ্য দিয়ে।

আমিত্বের চরম বিকেশই জাতীয়তাবাদ। সাম্রাজ্যবাদ। বুঝলে সংবেদনশীল মানুষ সাম্রাজ্যবাদী হতে পারে না।

উৎপলদার এ-কথায় একটা ভাবগত দিক এসে পড়ে। একটা বিতর্কেরও সূত্রপাত করা যেতে পারে। একদিকে নির্বিকারত্ব আর এক দিকে সংবেদনশীলতা। নির্বিকারত্বের সাথে সংবেদনশীলতা একটা বিরোধাভাস যুক্ত হয়ে আছে। সংবেদনশীলতা ব্যক্তির স্বভাবের একটা দিক। সে সাড়া দিতে চায় ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে। তার স্বাধীন ইচ্ছাকে প্রকাশ করে। সে কর্মে লিপ্ত হতে চায়। সংবেদনশীলতা এখানে ইতিবাচক অর্থে মানবিক। সে অসহায়, অস্ত্রহীনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে না। সে শিশু হত্যা করবে না যুদ্ধের দোহাই দিয়ে। এই সংবেদনশীলতা দুস্থের সেবা করে। অন্নহীনের মুখে অন্ন এনে দেয়। এ সংবেদনশীলতা অন্যের বাসস্থানের জায়গা দখল করে নিতে গেলে বাধা দেয়। যুদ্ধে রত হতে বাধা দেয়। যুদ্ধ ও যুদ্ধে প্রাণহানির ভয়াবহতা এড়াতে চায়।

utpal 3 h
বাংলাদেশে উৎপলকুমার বসু, জাতীয় কবিতা উৎসবে, দর্শক সারিতে, ফেব্রুয়ারি ২০০৬

 

বাংলাদেশে উৎপলকুমার বসু, ফেব্রুয়ারি ২০০৬
বাংলাদেশে উৎপলকুমার বসু, খাবার টেবিলে, ফেব্রুয়ারি ২০০৬

কিন্তু আরেক সংবেদনশীলতা আছে সে অস্ত্র হাতে তুলে নিবে অন্যায়কে শাসানোর জন্য। শাসাতে গিয়ে সে হত্যাও করতে পারে কাউকে। সে হত্যা বৈধ। কেননা এই সংবেদনশীলতা অন্যায়ের বিপক্ষে লড়ছে। তখন এই সংবেদনশীলতা যুদ্ধে ব্যক্তিকে হত্যা করছে না, হত্যা করছে দেহ। যেই দেহ অবৈধ হয়ে উঠেছে তার নিজের মধ্যে অন্যায়বোধকে প্রশ্রয় দিয়ে।

তখন সে সংবেদনশীলতা যুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছে। কেননা সে নিপীড়িকের অবস্থানকে টলকে দিচ্ছে। এখানে সংবেদনশীলতা যেন ন্যায়ের পক্ষ নিতে গিয়ে নির্বিকারত্বকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। কারণ সে রক্তপাতে অংশগ্রহণ করছে।

কিন্তু আবার যেকোনো রক্তপাতকে সংবেদনশীলতা প্রশ্রয় দেয় না। সংবেদনশীলতা যতই দ্বিধায় বিশ্লিষ্ট হোক না কেন।

নিপীড়ন ও অন্যায়ের সাথে সহাবস্থান করতে গেলে সংবেদনশীলতার একটা বিপরীত ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। তখন নিয়তিবাদের পথ খোলাসা হয়। সংবেদনশীলতার একটা সীমা আছে। সে সীমা অতিক্রম করলে বিপরীত অবস্থানে অভিনয় করতে হয়। সংবেদনশীলতার সাথে সাহস ও প্রতীজ্ঞা আসি হাজির হয়।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যখন কৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধে স্বজনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে বলে অর্জুন তখন সংবেদনশীলতার প্রশ্রয়ে যুদ্ধে প্রথমত হত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কিন্তু কৃষ্ণ যখন বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড এমনকি স্বয়ং কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকে তার মুখের ভিতর প্রদর্শন করালেন তখন অর্জুন স্বজনের বিরুদ্ধে ন্যায়যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। সংবেদনশীলতা তখন পরিত্যাজ্য হলো। কারণ তখন ন্যায় প্রতিষ্ঠা না হইলে সংবেদনশীলতার ভবিষ্যৎ থাকে না। পাত্র না থাকলে পানি ধারণ করবে কে?

এইভাবে ভারতীয় নিয়তিবাদ সংবেদনশীল স্বাধীন ইচ্ছাকে সীমিত করে রাখে।

অন্ধ, অযৌক্তিক, বিবেচনাশূন্য, পূর্বনির্ধারিত, অমোঘ, বিধিলিপি, নসীব এই সব আসে নিয়তির সংশ্লিষ্টতা থেকে। নানাবিধ ক্ষমতার অধীনতা থেকে। সৃষ্টি হয় অমোচনীয় অসহায়ত্ব। কাল নিয়তির অধীনতা। মৃত্যু ও কালের বীজের মধ্যে নিহিত ব্যক্তির/গোষ্ঠীর নিয়তি। নির্বিকারত্বের জয় হয়। যা হোক নির্বিকারত্ব নিয়া এই কবিতার সাথে তার সংশ্লিষ্ট করি এই কথাগুলা ভাবনায় আইলো।

এরপর উৎপলদা বললেন, আমি যখন বাংলাদেশে আসি ওরা আমাকে রাজনৈতিক কোনো আলাপে যেতে মানা করে দিয়েছে। আমাকে গতকাল ঢাকার একটা প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে ডেকেছিল। আমি এ-কথায় বলেছি যে, না, আমার মানা আছে মুখ খোলার।

ওরা কারা? আমি বুঝে ফেলি।

তারপর উৎপলদা আমার কানের কাছে উনার মুখ এনে বললেন, আমি বাংলাদেশে ঢুকেই বিমোহিত। এদেশের বাতাসে অন্য রকম গন্ধ। যেই আলাদা গন্ধ শুঁকে বলা যায় এটা বাংলাদেশেরই। কাউকে বোলো না। শিশুর মতো করে বললেন।

উনি বুঝাতে চাইলেন এদেশ অন্য দেশের থেকে আলাদা। এ দেশের প্রকৃতি অনন্য। এ দেশ সম্ভাবনার। এ দেশ সত্যি ভিন্ন এক দেশ!

সতর্ক করলেন যেন এ খবর অপর কোনো লোভী দেশের কেউ জানতে পারলে দখল করে নিতে পারে!

ততক্ষণে আমরা বাবুবাজার পৌঁছে গেছি। রিকশা ছাড়ি বাসে চড়ি। আমি বেশ কিছুক্ষণ উৎপলদার পাশাপাশি বসি। তখন উনি আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী অবস্থানের সমালোচনা করিলেন। ইরাকে ফসফরাস বোমায় নিহত ঝলসানো শিশুদের জন্য কাতর স্বরে অনেক কথা কইতেছিলেন।

মাথায় তখন এলোমেলো প্রশ্ন আসতে থাকে কিছু কিছু। যেমন আমি কয়েছিলাম, দাদা, বিনয় মজুমদারের কবিতায় একটাই প্রজেক্ট থাকে। নানামুখী জিনিসপত্র নিয়া কবিতায় ডিল করেন না। মানে কবিতায় প্রধান প্রজেক্টের বাইরে অপ্রধান কোনো প্রজেক্ট থাকে না।

ওনার কামনাশ্রয়ী কবিতায় নারীরা প্যাসিভ। ফলে পুরুষের কামনার মধ্যে পুরুষের মনমতো কাল্পনিক এক নারীকে তার কবিতায় পাই। উনারে মূলত প্রেমের কবি হিসাবে পাঠক পড়েন। ওনার জীবনযাপন, সারাজীবন বিয়া না করা, বৈষয়িক ব্যাপারে তৎপর না হওয়া, একটা কর্ণার জীবন বেছে নেওয়া—এইগুলো পাঠকের কাছে কবিতার অংশ বলে মনে হতে থাকে। যেন গরিব লোকের ভাল কাজ একটু বেশি ভাল। ফলে উনার কবিতার প্রতি আমাদের একটু ভালোবাসার সাথে সাথে করুণাও মেশানো থাকে।

শান্তিনিকেতনে
শান্তিনিকেতনে

আপনার কবিতা প্রেমের চাইতে মায়াঘেঁষা বেশি। কাজেই আপনার কবিতায় দিব্যভাগের অংশ ছাড়াও মায়ার অধীনে একটা সমাজের অ্যানথ্রোপলজিটাও অপ্রধান/অনুষঙ্গ হয়ে চলে আসে। প্রেমের কবিতা চর্চা আপনার মূল কাজ না। ওটা আপনার চর্চায় দলছুট হিসেবে আসে। আমি এইসব বলাতে উনি যেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন।

বিনয়ের ব্যাপারে ওনার মুখ খুলাইতে চাইছিলাম। এই দ্বিতীয়বার। একবার মধুর ক্যান্টিনে বসি এই প্রশ্ন করি। উনি এড়ায়া গেছেন। এইবার চলন্ত বাসের ভেতর একান্তে প্রশ্নটা তুললাম। এবারও তিনি এড়াইলেন। শুধু আমি যা যা বললাম, মাথা ঝাঁকাইয়া সমর্থন দিলেন। আর মুখে শুধু কইলেন, হ্যাঁ।

প্রধান কবিরা প্রধান কবিদের বিষয়ে মুখ খুলেন না। নিজেরা নিজেদের ব্যাপারে বোবা হয়ে যান। তবে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ব্যাপারে নিশ্চুপ ছিলেন না। শক্তিকে উনি অনেক বড় কবি মনে করেন। শক্তির প্রসঙ্গ তুললে উনি শক্তির চতুর্দশপদী কবিতাগুচ্ছের প্রশংসা করলেন। বললেন, এগুলো অসাধারণ, শক্তি অন্য জিনিস। আমি কইলাম, শেষের দিকে উনার বেশিরভাগ কবিতা না হয়ে পদ্য হয়ে গেছে।

তখন তখন ভ্রমণের মনটা ঝিমায়ে গেল যবে আমরা আলাদা সিটে গিয়া বসি যাতে উনি একা একা একাকীত্বের সাথে এক্বা-দোক্কা খেলতে পারেন। উৎপলদা ড্রাইভারের দুই সিট পরে জানালার ধারে নিজেরে নির্বাসিত করলেন। উনি বোধ হয় বাসে চড়লে সামনে সিট নিতে পছন্দ করেন। মাঝামাঝি অবস্থানে সিট নিয়া বসতে বললে উনি রাজি হন নাই। আমি পিছনের দুই সিট আগে গিয়া বসি।

দেখি মাঝে মাঝে উৎপলদা কাপড়ের শার্ট পরানো একটা বোতল থেকে কী যেন মুখে লাগিয়ে একা একা খাচ্ছেন। আমি সন্দেহের চোখে তাকাইতেছিলাম। পরে নামার সময় কইলেন। আরে, জল খাচ্ছিলাম। আমি ভাবতেছিলাম মনে মনে আরে, ভ্রমণে কি দাদা হালকা ফোটা ফোটা সুরা পান করতেছিলেন নাকি!

বাস সাই সাই করি ছুটি চলিছে বিক্রমপুরের দিকে। আমরা চলছি সিরাজদিখান দিয়া ইছাপুরা। সারি সারি গাছ আলুর খেত। উঁচু রাস্তা প্রকৃতিরে কেটে কেটে দুইভাগ করে সাপের মতো রাস্তা, তার উপর দিয়া বাস আমাদেরকে দৃশ্যের অন্তরালে অন্য কোথাও নিয়া যাইতেছে মুখে করে। তাহা কোথায়? বাসের জানালা দিয়া মনে হয় আকাশকে জিগাই। কিন্তু কোনো সদুত্তর পাই না। মনে হইতেছিল আমরা কোথাও যাইতেছি না। দৃশ্যগুলার ঘূর্ণিপাক দেখিবার লাগি এইখানে আসিয়াছি।

চারদিকে পৃথিবীর সব গ্রাম। এইদিকে বেড়াইতে আসিয়াছে। সেইসব গ্রামের শরীর আকাশের চোখ বেগানা হ্যাংলা পুরুষের মতো চাইয়ে চাইয়ে দেখতে আছে সন্ধ্যা অবধি।

পৃথিবীর সব গ্রামই জমজ। তারা দেখতে যেন একই রকম।

আর সেই গ্রাম যারা দেখে তাহাদের মন আর চোখ যেন একই।

আমরা ইছাপুরা পার হয়ে মালখা নগর তালতলা বাজারে আইসে গেছি। এইখানে বাজারে যখন নামলাম আমাদের বেশ খিদা লাগি গেছে। তখন শীতের পিঠা বেচতে ছিল এক দোকানে। সেইখান থেকে ভাপা পিঠা আর চিতই পিঠা আনলাম। বসলাম আরেকটা দোকানে। যেখানে চা পাওয়া যায়। দুধের মালাইকারী পাওয়া যায়।

বিক্রমপুরের মালখানগর বাজারে রিকশার অপেক্ষায়। মালখানগর স্কুলে যাব আমরা - লেখক
বিক্রমপুরের মালখানগর বাজারে রিকশার অপেক্ষায়। মালখানগর স্কুলে যাব আমরা – লেখক

উৎপলদা বললেন, আমি এটা খাব না। বোধ হয় একটা চিতই কোনো রকমে চেখে দেখছিলেন উনি। বললেন, আমি মালাইকারী খাব। আমি আর আমার স্ত্রীর বড়ভাই চিতই পিঠা খাইছিলাম। উৎপলদা মালাইকারী (মূলত তাহা দুধের উপর বড়জোর জমা চড়া সর) খেলেন মন ভরে। আর শুকনা খাবার হিসেবে পিঠা এক প্লেটে নিয়া তিনজনে একসাথে খানা খাইতে চেষ্টা করছিলাম।

দাদা দেখি ইতস্তত করছিলেন। আমি কইলাম, আমাদের এখানে তাবলিগ জামাতের লোকেরা একসাথে এক প্লেটে খায়। মনে করা হয় মহব্বত তাতে বাড়ে। অহং-এর বিলোপ ঘটে কিছু মাত্রায়। কারণ বড়লোক গরিব লোক একসাথে তাবলিগ জামাতে এক মসজিদ থেকে আরেক মসজিদে তারা দ্বীনের দাওয়াত দিতে যান।

উৎপলদা হাসি নিয়া কইলেন, ইন্ডিয়াতে অনেক লোকের ভেতর এই খাবার এক সাথে এক প্লেটে খাওয়ার রেওয়াজ আছে। আমি এটা দেখেছি।

আমরা খাওয়া শেষে চা খাই। যেন চা খাওয়া, খাওয়া নয়। এমন মনে হতে থাকে।

আমরা দুইটা রিকশা নিই। রিকশায় যাইতে যাইতে কেন যেন কী কারণে সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা উঠল। কেউ দেখা করতে গেলে কী কী কাণ্ডকীর্তন করিতেন আলী সাব। কী রূপে মদ বিলাস করিতেন ইত্যাদি। উৎপলদা জানাইলেন।

আমরা মালখা নগর গ্রামের সবচেয়ে পুরাতন স্কুলটিতে গিয়া নামি। এই স্কুলে অনেক কীর্তিমানরা নাকি পড়ছেন। হিন্দু জমিদার ব্রাহ্মণদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত স্কুলটির টিচার আগায়ে আসছেন যেই শুনছেন কলকাতা থাইকে কোনো এক বিখ্যাত কবি নাড়ির টানে হেথা এইখানে আসছেন। এই গ্রামে এই স্কুল একবার নিজ নয়নে দেখিবার লাগি। পরে তারা হতাশ হইলেন যখন জানলেন যে, এই মান্য কবির বড় ভাই এ স্কুলে পড়িতেন ছোটকালে। তিনি নন।

ওনারা আমাদেরকে সসম্মানে মালখা নগর স্কুলের টিচার্স রুমে নিয়া বসতে দিলেন। হাতে তুলে দিলেন ঐ স্কুলের প্রকাশিত স্মরণিকা। উৎপলদা তাহা নিলেন কল্পনায় তার বড় ভাইয়ের পক্ষে ভক্তি ব্যয় করে। স্কুলের অনার বোর্ডে প্রধান শিক্ষকদের তালিকা দেখেছিলাম কিছুক্ষণ। গ্রামের নিসর্গে মাঠের ভিতর বিস্তৃত আকাশের নিচে নিরীহ স্কুলটিকে বেচারা বেচারা লাগছিল। আমাদের পর্যায়ক্রমে উৎপলদার সম্মানে টিচারগণ এক সারিতে দাঁড়ায়ে সাগ্রহে স্কুলের ব্যাকগ্রাউন্ডে ছবি তোলা হল। একজন স্বনামধন্য কবির সাথে ছবি তুলে ওনাদের ভাল লাগল। আমরা ক্যামেরা নিই নাই। উৎপলদার নিজের ক্যামেরাতেই ছবি তোলা হলো।

utpal 3 b
মালখানগর হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, বিক্রমপুরের সামনে, স্কুলের শিক্ষকদের সঙ্গে ২০০৬

আমরা বিদায় নিলাম। ওনারা বোধ হয় চা সেধেছিলেন। আমরা খাই নাই। শুধু বসে অতীতের প্রতি করুণা হইল। সে শুধু পিছনের দিকে মুখ করি ছুটিয়া চলিয়া যায়। তার কিছু কিছু বোকা সময় স্কুল, স্কুল মাঠে, স্কুলের বন্ধুদের টিচারদের কাছে আটকা পড়ে থাকে। আর সেইখানে হাজির না হলেও তারা আসি হানা দিতে থাকে আসি স্মৃতির ফিতাগুলাতে। তখন আমার নিজ গ্রামের বেচারা গরিব স্কুলের কথা মনে বারবার কেন আসিতেছিল।

মালখা নগর গ্রামে উৎপলকুমার বসুর বড় ভাই জন্মেছিলেন। তিনি পরে দেশভাগের আগেই পশ্চিমবঙ্গে বাপমায়ের সাথে হিযরত করি চলিয়া যান।

উৎপলদা স্কুলটিকে ভাল করে কয়েক নজরে দেখে নিলেন যাতে কলকাতা গিয়া বড় ভাইকে বর্ণনা করে বলতে পারেন। ছবি তুললেন ভাইকে ভাইয়ের শৈশবের স্কুল দেখাইবেন। ওনার বড় ভাই মালখা নগরের স্মৃতিতে ফের আকুল হইবেন!

আমরা এবার যাবো কবি উৎপলকুমার বসুর পৈত্রিক বাড়ি। একজন ভদ্রলোক বসু বাড়িতে আমাদেরকে পথ দেখাইয়া নিয়া যান। আমরা গিয়া পৌঁছাই সেই বাড়ির আঙিনায়। সেইখানে এখন মুসলিম ফ্যামিলির লোকজন বাস করে। কলাপসিবল গেট আটকানো। তারা কয়েকজন বের হয়ে আসি আমাদেরকে বসতে বলেন। আমরা বসি না। দাঁড়ায়ে থাকি। আমরা জানাইালাম, উৎপলদা বসু ফ্যামিলির লোক কলকাতা থেকে আসছেন।

ওনারা কী ভাবছেন বলা মুশকিল। প্রায়ই মালখা নগরে এরকম লোকজন আসে কলকাতা থেকে। তারা আসি বলে, এইখানে এটা আমাদের বাড়ি ছিল। ওটা আমাদের পুকুর ছিল। ওটা আমাদের মাঠ ছিল। দেশভাগের আগে আমরা এইটা বিক্রি করে, ফেলে চলে গেছি ইন্ডিয়াতে। যুদ্ধের সময় এইগুলা ছেড়ে চলে গিয়ে এই দেশে আর ফিরি নাই। এই রকম কথা শুনতে শুনতে এই গ্রামের লোকজনের এখন অভ্যেস হয়ে গেছে। স্মৃতিতে মালখা নগরের অনেক বড় বড় এইসব তালুকের মালিক ইন্ডিয়াতে মাইগ্রেট করা হিন্দুদের। এখন মুসলমানরা যারা এটা কিনে নিছে, কেউ কেউ দখল করি নিছে তাদের কিছু কিছু। জায়গা জমি আল্লার, কেউ এর উপর কিছুদিন ঘর বানায়, চাষ করে, গাছ লাগায়, মালিকানা হাত বদলায়, দখল করে, কিছুদিন এই জমি থাকে হিন্দুদের, কিছুদিন বৌদ্ধদের, কিছুদিন মানুষ জমি জায়গা নিয়া মারামারি করে, খুন করে। মালিকানার স্মৃতি, গৌরব তবু এই মাটিকে নিয়া মানুষের যেন কিছুতেই যায় না। সবকিছু যেন এই মাটি মুখ বুঁজে সহ্য করে। মাটির উপর মাটির পুতুল খামোখাই মাটি নিয়া তোড়জোড়ে ব্যস্ত থাকে, মোটেও আসমানের কথা ভাবে না।

utpal 3 m
মালখা নগরের বাড়িতে।

কিংবা হিন্দু জমিদারেরা তোমরা একসময় আমাদেরকে তোমাদের জমিতে খাটাইছো এখন আমরাই এ জমির মালিক। দেখ, জমি যাদের না থাকে, জমি হারানো ব্যথা, ভিটা হারানো কত কষ্টের!

মানুষ কিছু সময় বাঁচি থাকে বাস্তবের ভেতর, কিছু সময় স্মৃতির ভেতর, স্মৃতির কত শক্তি তোমাদেরে কলকাতা থাইকা এইখানে লইয়া আইছে!

ঘরের ভেতর থাকি একজন প্রায় আশি বছরের এক বৃদ্ধা আমাদের দিকে তাকায়ে তাকায়ে এইসব ভাবতেছেন হয়তো। নাও ভাবতে পারেন।

আমরা যেন ব্যথিত হয়ে ফিরলাম তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়া। উৎপলদার অনুভূতি জিগাই নাই। যেহেতু উনার এইখানকার স্মৃতি নাই। অতএব উনার স্মৃতির ক্ষত, দায়ভারও নাই। কাল্পনিক সমব্যথার দায়ভার হয়ত থাকতে পারে।

উৎপলদারা ছিলেন ব্রাহ্মণ। জমিদারি ছিল কিনা ওনাদের জিগাই নাই তখন। দেশভাগের আগে কেন ওনার আব্বা আম্মা এ দেশ ছেড়ে চলে গেছেন তাও কেন জানি জিজ্ঞেস করি নাই। উৎপলদার জন্ম এদেশে নয়। কলকাতায় ভবানীপুরে ১৯৩৭ সালে।

উৎপলদার পৈত্রিক ভিটা থেকে বার হয়ে আমরা ঢাকা ফেরার উদ্দেশ্যে তালতলা বাজারের দিকে যেতে থাকি। যেতে যেতে উৎপলদা কইলেন, জানো, কলকাতায়, মালখা নগর সমিতি আছে। ওরা বছরে একবার এক জায়গায় এসে সবাই মিলে গালগল্প করে, স্মৃতিচারণ করে, আমোদ-ফুর্তি করে।

সদাভ্রাম্যমাণ
সদাভ্রাম্যমাণ – উৎপলকুমার বসু (২০১৫)

আমার মনে হলো মানুষ যাকে হারায় যা হারায় তাকে পাবার জন্য তার ডামি কিছু বানায়, মূর্তিরূপে পাবার আয়োজন করে। তার হারানো বেদনা ধরে রাখতে ভালবাসে চিরকাল। এদেশের হিন্দুরা যারা মাইগ্রেট করে গেছে মানে বাংলাদেশ ছাড়ি গেছে বেদনার সাথে, চিরকালের লাগি টা টা বাই বাই দেয় নাই নাড়িপোতা গ্রামরে, এর শৈশবের-কৈশোরের প্রকৃতিরে! দেশভাগের চাপিয়ে দেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত মানে নাই তারা। ইন্ডিয়াতে শতভাগ সুখভোগের লাগি হয়ত যায় নাই। ঘটি ও বাঙ্গাল বিভাজনের লড়াই সেখানেও ভোগ করতে হবে। এই দেশে যেমন সংখ্যালঘু সে হিন্দু, ওই দেশে সে সংখ্যলঘু বাঙ্গাল। এখন ‘হিন্দু‘ না ‘বাঙ্গাল‘ হওয়ার দুর্ভাগ্য বেশি অসহনীয় সেটাই প্রশ্ন। তাই তারা দেশভাগের নস্টালজিয়া, শোক, ক্ষত মোচনের লাগি পশ্চিমবঙ্গে মালখানগর সমিতি, টাঙ্গাইল সমিতি, ফরিদপুর সমিতি, বিক্রমপুর সমিতি, বরিশাল সমিতি প্রভৃতি তৈরি করে গোত্রশক্তির মাজেজায় অতীতের সুখ-দুঃখের স্মৃতির উদ্বোধন, জাবর কাটবে এটাই স্বভাবিক।

বিষয়টা ব্যাপক। এমনকি এইখানে দেশের ভিতরও এক জেলা থেকে আরেক জেলায় কিংবা ঢাকাস্থ বিবিধ সমিতি দেখতে পাওয়া যায় যেমন, চাঁদপুর সমিতি, নোয়াখালী সমিতি, বরিশাল সমিতি, যশোর সমিতি ইত্যাদি।

সমিতিগুলা থাকায় বিবিধ সুবিধা আছে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ, নিজ জেলার লোকেদের জন্য ভাল কিছু করার নিয়্ত, বিভিন্ন চাকরি-বাকরিতে তদবির কিংবা বিবিধ বিপদ-আপদে সাহায্য পাওয়া, অন্য জেলার লোকদের থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার খতিয়ান তুলে ধরা, অন্য জেলার লোকেরা খারাপ এবং তাদের আচরণের সমালোচনা করা, যৌথস্মৃতির জাবর কাটা, একই ভাষায় কথা কয়ে স্বস্তি পাওয়া ইত্যাদি। এই রকম আদিম গোষ্ঠিচেতনায় উদ্বুদ্ধ হইয়া গোত্রে গোত্রে বসবাসের হারানো অভ্যেসকে মানুষ যত্ন করে তুলে রাখতে চায় জীবনচর্যায়। যা হোক দেশভাগের কিংবা নরমাল মাইগ্রেশন নিয়া নানা ভাবনা আছে এর ভুক্তভোগীরাই ভাল জানেন।

দেশভাগ নিয়া অনেক সিনেমা নাটক গল্প লেখা হইছে। অনেক বিভাজিত স্মৃতি আপসোস আহাজারি আকাশ-বাতাসকে প্রকম্পিত করছে। করতেছে আজও। ঋত্মিক ঘটকের কোমল গান্ধার, সুবর্ণরেখা, মেঘে ঢাকা তারার মধ্যে দেশভাগের বেদনার যে উৎগার এপার ওপারের উদ্বাস্তু মাইগ্রেন্ট বাঙালির কাছে তাহা চিরস্থায়ী সম্পত্তি হয়ে আছে। এরা মৃত্যুর পরও দুনিয়া ত্যাগের স্মৃতি নিয়া স্বর্গে আপত্তি তুলিবে। এরা স্মৃতির ভেতর বসবাসে ঢের, বাস্তবের এ জগৎ প্রভূত মায়াবি মিথ্যা ইহাদের কাছে। এদের ভেতর যাযাবরেরা মৃত, এরা স্থানের মাত্রাকে জীবনের স্তম্ভ আকারে দেখে। তবু তাদেরটা তারাই ভাবুক! সেই স্বাধীনতাটুকু তাহাদেরই থাক।

বিক্রমপুর মালখানগরে কবি বুদ্ধদেব বসুর পৈতৃক বাড়ির সামনে শ্মশানে লেখক, ২০০৬
বিক্রমপুর মালখানগরে কবি বুদ্ধদেব বসুর পৈতৃক বাড়ির সামনে শ্মশানে লেখক, ২০০৬

আমাদের সঙ্গের মালখা নগরের ভদ্দরলোক বললেন, তালতলা বাজার পার হয়ে একটু পুবে কবি বদ্ধুদেব বসুর পৈত্রিক বাড়ি। আমরা সেই বাড়িতে যাই। তার আগে আমাদের সাথে সুন্দর গরুর বাছুরের সাথে সাক্ষাৎ হলো পথের কিনারে। আমি বলি দাদা এই বাছুরটার সাথে আসেন ছবি তুলি। তুমি তোল গিয়ে। উৎপলদা কইলেন। উৎপলদা রাজি না হওয়ায় তা তুললাম না। সে বাছুর আমাদের তবু মনে ধরে গিয়েছিল।

Like সাহিত্য ডটকম on Facebook

বদ্ধুদেব বসুর বাড়ির সামনে উৎপলদার সাথে ছবি তোলা হলো। সে বাড়ির প্রায় সামনে এক পাশে একটা শশ্মান। সেইখানে দাঁড়াই। আমি একাই ছবি তুললাম। উৎপলদা শ্মশান ভয় পায়। উনি শ্মশানে দাঁড়ায়ে ছবি তুলতে রাজি হইলেন না। আমরা ঢাকায় চলে এলাম সে দিন বিকালে সন্ধ্যার আগেই।

উৎপলদার কলকাতা ফিরে যাবার আগের দিন

shourolota
সৌরলতা – উৎপলকুমার বসু (২০০৯)

মালখা নগর থেকে ফিরিয়া পরের দিন বিকালে আমি ও আমার আত্মীয় মিলা উনার একটা নাতিদীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিছিলাম। ভীষণ ব্যস্ততা উৎপলদার। বাংলাদেশের সব তরুণ কবিদের সাথে আরেকবার দেখা হোক উনি চাচ্ছিলেন। এদিকে বিকাল হয়ে সন্ধ্যা হইয়া যাচ্ছিল। বইমেলায় গেলে তরুণ কবিদের দেখা মিলবে। তারাও ওয়েট করতেছে কখন কবি উৎপলকুমার বসু আসবেন।

সাক্ষাৎকার নেওয়ার শেষে আমরা বেইলি রোডে পিঠাঘরে যাই। উৎপলদা পিঠা নিতে চান বাংলাদেশের। তারে পিঠা কিনে দেওয়া হইছিল। আমরা দাঁড়ায়ে খাইলামও কয়েক পদের পিঠা। তারপর উনি আমার থাকি বিদায় নিলেন।

পরে শুনছিলাম উনি নাকি বইমেলাতে সবার সাথে অল্প কিছুক্ষণ ছিলেন। একটা সাক্ষাৎকার নেওয়া হইছিল কবি ব্রাত্য রাইসুর উদ্যোগে। পরে শুনি যে, চার্জ না থাকায় সেই ভিডিও গ্রহণ করা হইছিল না! সেইখানে ব্রাত্য রাইসু, সুমন রহমান, মজনু শাহ, সাখাওয়াত টিপু, তারিক টুকু, সফেদ ফরাজীসহ আরো অনেক কবিরাই ছিলেন।

উৎপলদা কলকাতার অন্যসব কবিদের লগে পরেরদিন সকালে কলকাতা চলিয়া গেছেন, শুনিয়াছিলাম।

utpal 3 k
পারীতে উৎপলকে যেমন মনে পড়ে। শিল্পী. যোগেন চৌধুরী

কলকাতা ফিরে যাবার পর
তার এক দুই মাস পরে আমার নেওয়া উনার সাক্ষাৎকারের একটা সফট কপি উনারে পাঠাই। উনি সেইটা সপ্তর্ষি প্রকাশনীকে দেন। তারা একটা ক্ষুদে সাক্ষাৎকার পুস্তিকা বার করে। নাম কথাবার্তা। কভারে উৎপলদার ফটোগ্রাফ। পেছনের কভারে উনার হাতে লেখা একটা কবিতাও ছিল।

দেজ পাবলিশিং কর্তৃক উৎপলকুমার বসুর কবিতাসংগ্রহ বের হইল। সুখ-দুঃখের সাথী বইটা আনন্দ পুরস্কার পাইলো। উভয় পুস্তকের ফ্ল্যাপে লেখা হইলো— ‘কলকাতায়, ভবানীপুরে ১৯৩৭ সালে উৎপলকুমার বসুর জন্ম। পৈত্রিক ভিটা মালখানগর, বাংলাদেশ।’

বাংলাদেশ তার আত্মপরিচয়ের একটা অংশ হয়ে উঠল। এদেশ অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে উঠল ঢাকা সফরে আসি। কবি এইভাবে বাংলাদেশকে নিজের করে নিলেন আরেক ধাপ আগায়ে। ২০০৯ সালে বের হইলো তাঁর ‘সৌরলতা’ নামে কবিতার বইখানি। বইয়ের উৎসর্গপত্রে লিখলেন, ‘বাংলাদেশের কবিদের হাতে’ ।

(শেষ)

ওয়েব লিংক

১. Utpalkumar Basu interview part 1 (ইউটিউব ভিডিও )

২. utpalkumar basu interview part 2 (ইউটিউব ভিডিও )

More from জহির হাসান

কবি উৎপলকুমার বসুর ঢাকা সফর (২)

নজরুলের কবিতার ফর্ম ওনার ভাল লাগে নাই। উনি কইলেন, নজরুলের কবিতায় বেশি...
Read More