এক রাত্রির গল্প

১.
অদ্ভুত এক এস্টাব্লিশমেন্ট, নবাবপুর রোডের এই হোটেল জগৎ। এদিকে মগবাজার মোড় থেকে ওদিকে মালিবাগ কাকরাইল হয়ে ফকিরাপুল পর্যন্ত আবাসিক হোটেলগুলার বেল্ট।

সারাদিন ধরে কমবেশি চললেও বিকাল হলেই হোটেলগুলার তিন-চার পাঁচতলার করিডরগুলো উজ্জ্বল সাদা ধবধবে আলোর অফুরন্ত ঝলকানিতে মেতে ওঠে।  এক অন্যরকম ফেরিওয়ালাদের  চাঞ্চল্য, কলকাকলি, ঘন ঘন দম নেয়ার তালে তালে ওঠা-নামা করতে থাকা বুক, সম্মিলিত খিল খিল হাসি, ব্যথায় কাঁকিয়ে ওঠা কণ্ঠস্বর, গলা পর্যন্ত উঠে আসার পরও ঢোক গিলে সামলে নেয়া চাপা বোবা কান্না আর অর্ধস্ফূট প্রতিবাদে। যা তার জন্য নির্ধারিত সময়টুকু পার হলে অন্যান্য শব্দের ঐকতানে মিশে যায়। মূল শহরের অংশ বলেই হয়তো, ঢাকা শহরের প্রধান তিনটা আবাসিক হোটেল কেন্দ্রিক বেশ্যাবৃত্তির বেল্টের মধ্যে এই নবাবপুর রোডের বেল্টটা আপন স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। যে কোন পুরনো শহরের রাত্রির হট্টগোল, ফুর্তি ও ঘিঞ্জি দালান-কোঠার সংস্কৃতি আসল ঢাকাতেও আছে; আর এ সংস্কৃতি নবাবপুর রোডকে ত্যাজ্য করে নি, শুধু মূল শহরের এক প্রান্তে রেখেছে। স্মরণাতীত কাল থেকে বোধগম্য বলে পরিচিত কারণে।

২.
গত তিন দিন ধরে হোটেলে। বিশেষ একটা উদ্দেশ্যে এই হোটেলে এসে ওঠা। এই সন্ধ্যায় মানুষের অন্তর্দেশ অপারেশন টেবিলে তীব্র আলোর নিচে শোয়ানো রোগীর মত চিৎ, যেমন হোটেল অধুনার চোখ ঝলসানো টিউবলাইটের নিচের করিডোর। প্রায় ৫০ গজ সরু দীর্ঘ করিডোরের দু’পাশ জুড়ে ছোট অপ্রশস্ত সিঙ্গেল বা ডাবল বেডের ছোট খোপ খোপ রুম। ২ x ১৮ = মোট ৩৬ টা। কোন কোন রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে মেয়েরা, কোন কোন রুম ভেতর থেকে বন্ধ। দাঁড়ানো মেয়েদের সাজগোজ, লিপস্টিক, স্কিন টাইট জিন্স, গোলাপি, হলুদ ইত্যাদি রংয়ের টাইট টপস, মিনি স্কার্ট, সবচেয়ে ছোট জিন্সের হাফপ্যান্ট আর পাতলা ফিনফিনে জর্জেটের বিপরীতে আছে ঘুরতে থাকা খদ্দেরদের গেভার্ডিন, কর্ডুরয়,  সুতির প্যান্ট, গলায় চেন, হাতে ঘড়ি, সিগারেট এবং রাতের বেলায়ও কারো কারো চোখে সানগ্লাস। ছোট ৬ তলা বিল্ডিংয়ের হোটেলে কেবল ৫ তলার রুমগুলো আর করিডোরে মেয়েদের ব্যাপার -স্যাপার। অবশ্য অন্যান্য তলার রুমেও মেয়েদের নিয়ে যাওয়া যায়। হোটেলের অন্যান্য তলার করিডোরের চেয়ে এই ৫ তলার করিডোরের বাতাসটা গরম। কোন কোন রুমে ৫/৬ জন মেয়ে একত্রে বসে হাসিঠাট্টায় মশগুল। করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে কোন খদ্দের হঠাৎ হয়ত মেয়েভর্তি কোন রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে যায়। ৩/৪ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে ৫/৬ জন মেয়ের মধ্য থেকে যে কোন একজনকে বাছাই করা বা সবাইকে বাতিল করা; কঠিন সমস্যা বটে। রুমের ভেতরে, যদিও ৪/৫ সেকেন্ড, এই সময়টা নিদারুণ। অনেকগুলা কণ্ঠের কাকলি, একটা ক্যাসেট প্লেয়ারের মত দ্রুত স্টপ হয়ে যায়; তারপর দরজা থেকে খদ্দের লোকটা মানুষের ছায়াসহ সরে গেলে বাঁধভাঙা শব্দে আবার দিগন্তপ্লাবী উচ্ছ্বাস , হাহা হিহি, খিলখিল হাসি, সত্যি অদ্ভুত ও জান্তব।

৩.
একটা বিশেষ কার্যোপলক্ষ্যে ৩/৪ দিন থাকার জন্য আসা। আসলে রুম নেয়ার আগে আমি ভেতরের পরিবেশটা সম্পর্কে জানতামও না। হোটেলে থাকার প্রয়োজন হওয়ায় নবাবপুর রোডে আসা। তবে নিরাসক্ত না হলেও, আসক্তিরই উপর্যুপরি ছোবলে। বলার কথা এই যে, শরীরের অবস্থা সুবিধার না। অনেকটা চিকিৎসার মত। প্রচুর ঔষধ খাবার ব্যাপার। যাতে জিহ্বা ঘন সাদা থুতুতে ভরে যায়, হাত পা ভারি হয়ে আসে, আর বাইরে নবাবপুর রোডে গ্রীষ্মবাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের মত বিরতিহীন একটা সার্বক্ষণিক জ্বর পোড়াতে থাকে শরীর। ছিন্ন ভিন্ন এক হৃদয়; ক্লান্ত, কোণঠাসা, হয়রান এক আত্মা। যদি টান টান হয়ে এই বিছানায় আজীবন শুয়ে থাকা যেত উৎপাতহীন, তবে এই জীবন অনেক বেশি সহজবাহ হত এরকম মনে হয় তখন।

৪.
আমার ছয় তলার রুমের বিপরীতের রুমটার পাশের রুমের আধখোলা দরজার ফাঁকে মেয়েটাকে দেখা যাচ্ছিল। বসে বসে সিগারেট খাচ্ছে। করিডোরের শেষ মাথার কমন বাথরুমে যাবার জন্যই কি সত্যিই বেরিয়েছিলাম!  নাকি দ্বিতীয় চিন্তাও ছিল আমি জানি না। মেয়েটার রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ে দাঁড়িয়ে, হঠাৎ, আমি নিজেও জানি না কেন, আগুন চাওয়ার ভান করে রুমে ঢুকে পড়ি, অবশ্য অনুমতি নিয়ে। কিন্তু সেটা কথা নয়, কথা হচ্ছে কানের ভাঁজে সিগারেট এলো কোত্থেকে?

‘আগুনটা দেয়া যাবে?’ ভদ্রতামাখা স্বরে জিজ্ঞেস করি।

‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই,’ একটুও অবাক না হয়ে বলল।

বাঁ হাতে ছিল আগুন, আমাকে দিতে গিয়ে, থেমে ডান হাতে নিয়ে দিতে দিতে বলল, ’কিন্তু, এইটা একটু সাবধানে ধরতে হবে, নইলে…’

কথা শেষ করতে না দিয়ে, ততক্ষণে বাতাসে ভুরভুর গন্ধ পেয়ে গেছি তাই বললাম, ‌‌`কী ব্যাপার! তামুক নাকি?’

মেয়েটা হেসে মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে কেমন যেন আধাবোঁজা চোখে সম্মতি জানায়। আর আমার পরের প্রশ্নের জবাবেও ঠিক একই ভঙ্গিতে সম্মতি জানায়। ঠিক আগের বারের মত চোখ বুঁজতে বুঁজতে মাথা সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকিয়ে হাসে, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।’

স্টিকটা ওর হাত থেকে নিয়ে দাঁড়িয়ে কয়েকটা টান দেই। আরো একটা মেয়ে শুয়েছিল ওর পাশে, দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে। ঘুমন্ত কিনা বোঝা গেল না। আমার দিকে চেয়ে হাসছিল রাণী, নামটা বলার সময়ও অবশ্য কে জানে কেন, সেই বেপরোয়া বাঁধভাঙা হাসি। কী করা বা বলা যায়? কিছুই মাথায় আসছিল না বলে, কী বলব বুঝতে না পেওে, বোকা বোকা লাগছিল বলে, আবার ওর সঙ্গ ছেড়ে সরতে না পারার অক্ষমতায়, ওর হাসন্ত ওল্টানো ঝিনুকের মত চোখে চেয়ে মনে মনে যা চাচ্ছিলাম তা-ই বললাম, আমার রুমটা দেখিয়ে, ‘আমার রুমটা পাশেই, চলেন গল্প করা যাবে, তামুক আছে, খেতে খেতে কথা বলা যাবে।’

‘চলেন’, ও ঝটতি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে, ‘আমার কাছেও অবশ্য আছে।’

ওর সাথে কিছুক্ষণ থাকতে ইচ্ছা করছিল। যাতে বুঝতে না পারে সেজন্য যোগ করি, ‘আপনার কোন কাজ নেই তো?’

ঝিনুকের ঝিলিক ওর হাসিতে। বেশ আগ্রহের সাথেই তো উঠে দাঁড়াল বলে মনে হল। চোখ বুঁজে থাকা পাশের মেয়েটার বালিশের নিচ থেকে একটা চ্যাপ্টা পার্স হাতে নিতে নিতে মেয়েটাকে বলে, ‘তুই ঘুমা, আমি আইতাছি।’ তারপর আমার পিছু পিছু আমার রুমে চলে আসে। চিপা করিডোর দাঁড়িয়ে থাকা হোটেলের বেয়ারা ইকবাল আর সবুজও সাথে সাথে ঢোকে। সবুজ দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়। বিছানার কুচকানো চাদর টেনে সমান করে সবুজ আর ইকবালকে বসতে দেই। গত ২/৩ দিন ধরে থাকার ফলে হোটেল বয়দের মধ্যে ওদের দু’জনের সাথেই একটু খাতির হয়েছে। আমার সাথে ওরা ঠাট্টা করে, ‘টাকা না থাকলে কন, ব্যবস্থা কইরা দিমু।’

চেয়ারের ওপর জমে থাকা জামাকাপড় সরিয়ে  রাণীকে বলি, ‘বসেন।’ রাণি বসে। চেয়ারে হেলান দিয়ে দুই পা তুলে, হাঁটু ভেঙে, হাঁটুর উপর পর্যন্ত সালোয়ার তুলে আরাম করে বসে। পার্সের ভেতর থেকে গোল্ড স্টারের একটা প্যাকেট বের করে একটা স্টিক ধরায়। আমি বিছানায় উঠে সামনে পেপারের উপর তামাকের পোটলা নিয়ে বৈঠকি ভঙ্গিতে বসি। কমদামি সিগারেট,  কেচি সব নিয়ে। সবুজ ইকবালকে কী একটা কাজের কথা বলে ৫ তলায় পাঠিয়ে দেয়।

ইকবাল বেরিয়ে গেলে আবার দরজা লাগিয়ে দেয় সবুজ। এগিয়ে গিয়ে রাণির চেয়ারের পাশে বিছানায় বসে। ছোট্ট রুম ৮/৮ এর–তার মধ্যেই টেবিল, ছোট ড্রেসিং টেবিল, আলনা, সব। রাণির কানে কানে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে সবুজ; রাণি না নড়ে হাতের ধাক্কায় সরিয়ে দেয়। একবার হঠাৎ জাপটে ধরে সবুজ, এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় রাণি। সবুজ তখন রাণির একহাত জোর করে ধরে বসে থাকে। আর সবুজের সাথে ঝামেলা চলাকালীন পুরা সময়েই, মাঝে মাঝেই, সুযোগ পেলে গাঁজায় টান দিচ্ছিল রাণি। ওর মুখের দিকে চেয়ে দেখছিলাম। পোশাকের কারণে রাণির দিকে পুরোপুরি তাকাতে, অনভ্যস্ততার কারণে, স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। দুয়েকবার টেনিস বলের চেয়েও ছোট স্তনের দিকে চোখ চলে গেলেও মোটামুটি ওর চোখেই চেয়েছিলাম। সেখানে মুহূর্তের বিরক্তির এক ঝলক আসে, সবুজের আচরণে,  পলকেই মিলিয়ে যায়। আবার হাসিমুখে তাকায় আমার দিকে।

‘কিছু খাবেন, আপনি?’ ও চোখ ঘুরিয়ে রুমের কোথায় কী আছে দেখে নিচ্ছে তখন। ‘লিচু আছে, আম আছে আর কলা আছে,’ লিস্টি শেষ করি আমি। ‘লিচু!’ চকচক করে ওঠে ওর চোখ, ‘আমার প্রিয়।’ প্লাস্টিকের প্যাকেটে প্যাঁচানো ছিল ড্রেসিং টেবিলের উপরে। আমি উঠে গিট্টু খুলে ওর হাতে একছড়া দেই। চিকন, দীর্ঘ আঙুলের হাত বাড়িয়ে নেয় রাণি– সরু সরু ফর্সা আঙুলগুলা ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হয়–তারপর খেতে থাকে। একটা কালো শেমিজ আবার সিল্কের কালো পাজামা পরে আছে। বগলের হাত খানেক নিচে শেমিজের শুরু; ঢিলাঢালা, পাতলা, সুতির কাপড়ের। শেমিজের ভেতর থেকে ব্রার অর্ধেকটা,  ব্রার ভেতর থেকে স্তনের অনেকাংশ বেরনো। তবে বৃন্ত দেখা যায় না। রাণির সেদিকে মনোযোগ নাই, রাত ২টার শ্রান্তির ছাপ ওর চোখের নিচের চামড়ায়, চিবুকে, চেহারায়। কিন্তু, কী আশ্চর্য! ঢুলু ঢুলু চোখে কোন ক্লান্তি -শ্রান্তি নাই।  আনমনে, সময় নিয়ে অতি ধীরে ধীরে যত্নের সাথে ছিলে ছিলে লিচু খাচ্ছে সে।

মাঝে মাঝেই গায়ে হাত দিয়ে ঝামেলা করার চেষ্টা করছিল সবুজ। প্রত্যেকবারই ঝটকা মেরে সরিয়ে, তবু চেয়ার থেকে না উঠে, এমন কী বসার ভঙ্গি না বদলে, সামলাচ্ছিল রাণি। চেহারায় কোন চাপ পড়ছিল না তার। একদৃষ্টিতে দুহাতের দিকে চেয়ে, লিচু ছিলে খেতে খেতে, মাঝে মাঝে দুয়েকবার কেচিতে তামাক কাটারত আমাকে চোখের কোণে দিয়ে দেখতে দেখতে, পা দোলাতে থাকে রাণি। ঘাম শুকিয়ে গায়ে মিশে যাওয়া পরিশ্রান্ত, অসুন্দর,  মলিন তবু আকর্ষণীয় চেহারা।

হঠাৎ আমার দিকে ফিরে দুষ্টুমির হাসি হাসে। আমিও হাসি, বুঝি, কিছু বলবে।

‘আচ্ছা আমার তো একটা আমের ভাগ আছে। তাই না?’ বলে আবার হাসে।

হাসি থামিয়ে হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলে লজ্জারুন হয়ে ওঠে ওর গাল। লো কাট শেমিজ  আর হাঁটুর উপর টেনে তোলা সালোয়ার পরা শরীরের যতটা সম্ভব ফ্যানের বাতাসের নিচে মেলে দিয়ে বসে থাকে আড়ষ্টতাহীন, শরমে লাল, নত চোখ রাণি। অবশ্য অল্পক্ষণেই সামলে ওঠে, সারাক্ষণ হাসিভরা মুখটা আবার আগের পজিশনে চলে যায়।

ওর স্বত:স্ফূর্ততা আমার অনভ্যস্ততাজনিত জড়তাকে কাটিয়ে তুলছিল ধীরে ধীরে। স্বাভাবিক আর প্রাণবন্ত হয়ে উঠছিলাম নিজের অজান্তেই।

ঔষধ খাবার কারণে ভারি শরীর টেনে তুলে, ভারসাম্য ঠিক রাখতে চেষ্টা করতে হচ্ছিল, বিছানা থেকে নেমে ছোট্ট, পুরনো ড্রেসিং টেবিলে রাখা ৩টা আমের প্যাকেট নিয়ে রাণির দিকে ঘুরে ওর সামনে এগিয়ে ধরা পর্যন্ত, শ্রান্ত কিন্তু উৎফুল্লতা, যদিও গাজা খাওয়ার কারণে লাল ও আঁধবোজা ওর চোখ সারাক্ষণ, অনেকটা মোশনের মত, বেশ সময় লাগছিল আমার, আমাকে ফলো করে। টের পাই আমি। বেশ সময় নিয়ে বেছে, এক একটা আমের দিকে চেয়ে আবার আমার চোখে চেয়ে প্রতিক্রিয়া দেখে দেখে, শেষমেশ একটা আম হাতে তুলে নিতে নিতে আমার চোখে উদ্বিগ্ন চোখ রেখে বলে, ‘এইটা নেই?’

‘নেন, আরেকটা নেন না লাগলে, আমি হাসতে হাসতে বলি।

‘না, না, আর লাগব না’, মাথা নেড়ে নেড়ে কয়েকবার বলে। ‘ আমার খিদা অল্প, অল্পতেই প্যাট ভরে।’

আমি আরো কয়েকবার সাধি, কিন্তু ও নেয় না। আমের প্যাকেট আগের জায়গায় রেখে আবার বিছানায় উঠে পা ভাঁজ করে বসে পুরনো কাজে মন দেই। কিন্তু মন বসে না, রাণিও তা টের পায়। এটা-সেটা প্রশ্ন করে ওর দিকে তাকানোর উছিলায় বুঝি আমি, আমটা একপাশে বিছানার উপর রেখে তখনো লিচু খাচ্ছে ও। লিচুর গাঢ় খয়েরি চোকলায় সরু ফর্সা আঙুলের ছোট নখ ঢুকিয়ে চাড় দিয়ে ছিলছে। আমার দেখা লক্ষ করছিল ও। আমার একটু লোভ হয় দেখতে দেখতে।

‘একটা লিচু খেতাম আমিও’, পরের আবদারটা মনে মনে গুছাতে গুছাতে বলি।

আমাকে স্তব্ধ করে দিয়ে ও বলে, ‘এইটা তো আপনের জন্যই ছিলতেছি।’

চোখের দিকে চেয়ে ওকে বিশ্বাস করতে হয়। সত্যিই বলছে। আমার দেখা লক্ষ করল ও আড়চোখে। মনে মনে ঠিক করে রাখা পরের বাক্যটা আর বলা হয় না। তার বদলে বলি, ‘আমি জানতাম। পূর্বাপর কিছু না ভেবেই, হঠাৎ করে, চোখে চোখ রেখে কথাটা বলে ফেলেই ভাবতে থাকি ‘কেন বললাম’? ঠিক বললাম তো? নাকি মন যোগানো? আর ঠিক হলেই বা, কেন বললাম?’

আর ওদিকে চোখে চোখ রেখেই কথাটা শোনে রাণি। শুনে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে, কী যেন পড়ে ফেলে আমার চোখে। কী পড়ে? আমার মনের কথা? আমার বলা কথার সত্যাসত্য? আমাকে পড়ে ফেলার পর আধবোঁজা চোখের অদ্ভুত সুন্দর ওর সেই আসল হাসি হেসে কী যেন চিন্তা করে ও, মাথা নিচু করে কানের লতির রঙ বদলাতে বদলাতে, পরক্ষণেই মাথা তুলে ও যে বলে, ‘আপনে খুব বোকা, এতক্ষণ লাগে?’ একটু আগে যা ভাবছিল তার সাথে এ কথার কোন সংযোগ নেই, কেননা কথাটা বলতে বলতে, একই সঙ্গে, ছিলকা তোলা লিচুটা আমার মুখের সামনে তুলে ধরে সে। হাত বাড়ানোর চিন্তা করছিলাম মাত্র, তখনই সিদ্ধান্ত বদলে, ওর ভঙ্গিতে ওর ইচ্ছা  বুঝতে পেরে, মুখ সামনে ঝুঁকিয়ে মধ্যমা আর বুড়া আঙুলে ধরে থাকা লিচুটা ঠোঁটে তুলে নেই।

‘আরেকটা দেই?’ জিজ্ঞেস করে সে। আমাকে মাথা নেড়ে না করতে দেখে ‘দেন আমার কাছে দেন, দেখেন কত তাড়াতাড়ি বানাই’ বলে হাত বাড়িয়ে আমার সামনে থেকে উপরের মাল মশলাসহ পেপারটা নিজের দিকে টেনে নেয়। কাজ শুরু করে দ্রুত ৩টা স্টিক তৈরি করে ফেলে। কোন কথা বলে না কাজের মাঝে, শুধু একবার চোখ তুলে ওকে দেখতে থাকা আমাকে দ্যাখে। কোন প্রতিক্রিয়া বোঝা যায় না আড়ষ্টাতাহীন কাজ করতে থাকা মেয়েটার। কাজ শেষ করে চেয়ারে আবার থিতু হয়ে বসলে ওর চোখে চেয়ে আমি টের পাই সব। আমাকে নিয়ে ওর বর্তমান ভাবনা। এবার আমার মাথা নিচু করার পালা। করিও।

অবশ্য অল্প পরেই, স্বাভাবিক শিক্ষিত স্বরূপ ফেরত এলে, মাথা তুলে বলি, ‘আপনার কাজের কোন ক্ষতি হচ্ছে না তো?’

‘না না’, দ্রুত জবাব দেয় ও। ‘আর হইলে সেইটা আমি বুঝব।’ লাজুক হেসে ছোট ছোট দুই ঝুটির গোছা নেড়ে যোগ করে রাণি।

কোন সুবিধা হবে না বুঝতে পেরে, অনেকক্ষণ ধরেই সবুজ আমার ছোট পোর্টেবল সিডি প্লেয়ারে জেমসের গান ছেড়ে ভাজ করা হাঁটুতে হাতের তালু দিয়ে তাল দিচ্ছিল; রাণির পাশ থেকে উঠে এসে আমার পায়ের দিকটায় বিছানায় চিৎ হয়ে শোয়। তখন হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে রাণিকে বলে, ‘চলো, নিচে চলো, কাম করবা না আর? নাকি বইসা বইসা গল্প করলেই চলবো, মাগী!’ গালি দিয়ে না, স্বাভাবিকভাবেই বলে সবুজ। আসলে তামুক খায় না বলে অনর্থক সময় কাটাতে ওর হয়ত আর ভাল লাগছিল না। অথবা কে জানে রাতের মতই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা আমাদের আন্তরিকতা, অভিজ্ঞ বলেই হয়ত, তার কাছে ন্যাকামি মনে হচ্ছিল। তাছাড়া একসাথে থাকলেও দুজনের কেউই যে ওকে পাত্তা দিচ্ছি না এটা তো অন্ততঃ বুঝতে পারছিল। ‘আমার বসা’, সবুজকে একটা কঠিন হাসি দিয়ে বলে রাণি, ‘আমি বইসা আছি। তাতে তোমার অসুবিধা কী?’

আমার দিকে ফিরে বলে, ‘চব্বিশ ঘণ্টাই কাম করে নাকি মানুষ? আজকে অনেক করছি, আর না। আমি এখন রেস্ট নিতাছি। কী বলেন ভাইয়া?’

‘হ্যা’,আমি হেসে বলি, ‘ বিশ্রামেরও দরকার আছে।’

‘তোমার যাওয়ার দরকার থাকলে তুমি যাও। আমারে টানো ক্যান? আমি এখন ভাইয়ার সাথে গল্প করতেছি। পরে আসবো’, সবুজের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলে রাণি। তারপর সবুজের প্রতিক্রিয়ার ও প্রত্যুত্তরের অপেক্ষা না করে আমার দিকে মুখ ঘুরায়।

‘আচ্ছা আপনে হোটেলে উঠছেন ক্যান? তাও আবার এই হোটেলে, আর হোটেল পাইলেন না!’ সবুজ ততক্ষণে বেরিয়ে গেছে, ‘তাড়াতাড়ি আইসো, বেশি দেরি কইরো না,’ বলতে বলতে। সবুজের কথা এক কান দিয়ে ঢুকিয়ে আরেক কান দিয়ে বের করে আগের কথাটুকু শেষ করে রাণি, ‘অবশ্য ঢাকা শহরে ভাল হোটেলইবা কোনটা?’

উঠে দরজার সিটকানি লাগিয়ে আমার পাশে এসে বসে। আমার দিকে পিঠ দিয়ে ড্রেসিং টেবিলের আয়নার মুখোমুখি। টেবিল থেকে নিয়ে একটা স্টিক ধরায়। নিঃশব্দে টানতে থাকে। গভীর ভাবনায় আচ্ছন্ন মুখ আর ঠোঁট থেকে গল গল করে বেরনো ধোঁয়া দেখতে থাকি আমি। শরীরে ওষুধের জমাট ভারে আর আচ্ছন্নতায় আরো আগেই,  সবুজ রুমে থাকতেই,  শুয়ে পড়েছিলাম আমি। যদিও কোনমতে কথা বলতে পারছিলাম। কিন্তু জিহ্বা চোয়াল ভারি হয়ে আসছিল ধীরে ধীরে। মুখের ভিতরে থুতু জমে যাচ্ছিল কথা বলতে গেলে। আমি যা গিলে ফেলছিলাম বিকল্প না পেয়ে । অর্ধেকটা টেনে স্টিকটা আমার দিকে নিঃশব্দে বাড়িয়ে দেয়। আয়না নিজেকে দেখতে দেখতে। রাণির শরীরের বাঁ দিকটা, মুখের এক পাশ আর বাঁ স্তনের প্রায় পুরোটাই দেখা যাচ্ছিল আমার দৃষ্টিকোন থেকে। সামান্য জেগে থাকা ওর চিবুকের গঠন দেখতে দেখতে ভাবছিলাম কী জবাব দেয়া যায়, অল্প কথায়।

‘কেন হোটেলে এসে উঠেছি?’

কী বলব ওকে? চিকিৎসার উদ্দেশ্যে হোটেলে এসে ওঠা বললে কতটুকু বুঝবে ও! আর কী চিকিৎসা তা সবিস্তারের বলতে কোন আপত্তি না থাকলেও, উৎসাহ বা উদ্যম কোথায় তার? নাকি লামছাম একটা কিছু বলে দেব? তা-ও ইচ্ছে করে না। ভাবতে ভাবতে একটু বেশি সময় কেটে গেলে হঠাৎ যা মনে আসে তা-ই বলতে শুরু করি। এতে ওর প্রশ্নের জবাব এড়ানোর চেষ্টাটুকুই শুধু ছিল না,  ছিল প্রশ্ন শেষে করা ওর স্বগতোক্তির আড়ালে থাকা বিশ্বাসের প্রতি উপেক্ষাও, অসম্মানও। আমি খেয়ালও করি না। তবে জবাবের শুরুটা শোনার পরই ওর প্রতিক্রিয়া আমার হুঁশ ফেরায়।

কিছু গুছিয়ে উঠতে না পেরে,  আবার ওর কথায় অন্য ইঙ্গিত আছে বলে ভুলভাবে মনে হওয়ায়, কী বলছি বুঝে ওঠার আগেই,  হঠাৎ সভয়ে বলতে শুরু করি, ‘আমি কিন্তু আপনাকে কাজ করার জন্য …’; এবং বাক্য শেষ না করেই থেমে যাই,  আয়না থেকে চোখ সরিয়ে ওর হঠাৎ আমার দিকে ফিরে ওর একক্ষণের উৎফুল্ল স্বত:স্ফুর্ত আচরণের সম্পূর্ণ বিপরীত দৃষ্টিতে তাকায়। চোখের আহত দৃষ্টি দেখে বুঝি এটা মিন করে ও প্রশ্নটা করে নি। তাছাড়া ভঙ্গিতে বা আচরণে তেমন কোন উদ্যোগ আয়োজন, আড়ম্বর  ইশারা ওর ছিল না। ‘কেন যে, বলতে গেলাম কথাটা’, তা ভেবে এখন আর কোন লাভ নেই। জেনেও তা-ই ভাবি।

তবু সত্য প্রকাশের প্রয়োজনীয় সাহস বা স্বভাবজাত সাবলীলতার অভাব আমার চারিত্রিক। বলার ইচ্ছা যে হয় না,  ভেতরের কথা, তা তো না। তবু অবশ্যম্ভাবী অবসাদে ও সম্প্রতিলব্ধ পৃথিবীর মানুষীর প্রতি বিতৃষ্ণায় তা ভেতরেই থেকে যায়। এর যেমন কোন মানে নেই, তেমনি কিছু করার উদ্যমও নেই। হৃদয়ে স্থির আসল অবিশ্বাস জন্মালে তা থাকেও না। তবু আন্তরিকতার জবাবে উপেক্ষা দিতে কারই বা ভাল লাগে! একবার ইচ্ছা যে হয় না খুলি, হৃদয়কে, বইয়ের পাতার মত, তা না। তবু অপ্রাসঙ্গিক, বানানো একটা উসিলায়, যা চরিত্র, অদ্ভুত আর পাশবিক,  নিরাসক্তির ভানকেই যুৎসই মনে হয়। মনে হয় পরিবেশোপযোগী।

তাই আপাতত,  হীনম্মন্যতা চোখে নিয়ে, যদিও মূল প্রশ্ন এড়ানোজনিত অস্বস্তি, আমি দেখি রাণির চোখ এড়ায় না। মলম মাখি ওর আহত আত্মায়, ‘আমি ভাবছিলাম তামাক খেতে খেতে একটু গল্প করা যাবে। আসলে আমি তো ধরেন এরকম পরিবেশে…’ কথা শেষ করতে দেয় না আমাকে, হাসতে হাসতে চোখ বুঁজে যায় ওর, আমার মুখে হাত চাপা দিয়ে ফিস ফিস করে বলে, ‘জানি, জানি, সেইটা আমি প্রথমেই বুঝছি। তাতে কী? চব্বিশ ঘণ্টাই কাম করে নাকি মানুষ?’

সব বোঝার পরও এত আন্তরিকভাবে কীভাবে কথা বলে মানুষ! দ্রুত অপমান ভুলে অপরাধকে উপেক্ষার মাধ্যমে এখনও ক্ষমা করতে পারে মানুষ। স্বভাববশতঃ আমার কেমন যেন সন্দেহ হয়। রাণি তখন আবার মুখ ঘুরিয়ে ড্রেসিং টেবিলের মলিন আয়নায় নিজেকে দেখছে অপলক। বিছানায় দেয়ালের দিকে চেপে রাণিকে আরো জায়গা করে দিলাম। ডান হাঁটু ভাঁজ করে শুয়ে থাকা আমার হাঁটুতে হেলান দিয়ে শরীরের ভার পুরোটা ছেড়ে দিয়ে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে থাকে। দীর্ঘক্ষণ, বাইরের বাড়ন্ত রাত্রির সাথে পাল্লা দিয়েই যেন ক্রমশঃ পরিবর্তিত হচ্ছিল ওর মনোভাব। শব্দের খোলস খুলে ফেলে রাত্রি যেমন তার পরিণতি নৈঃশব্দের দিকে এগোয়; ওর শরীরের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এতক্ষণে সুযোগ সন্ধানী ওর আত্মা ৬/৭ হাত উপরের সিলিং থেকে যেন দেখছে ওকেই এখন, নিরাসক্তভাবে। আর রাণিও যেন চোখের পলককে আগে ফেলে খেলার মত চেয়ে থাকে সিলিংয়ে। চোখ না সরিয়েই হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে হাত বাড়িয়ে আর একটা স্টিক নেয়। নিজের আশপাশে বিছানায় হাতড়ে ম্যাচ খুঁজতে থাকে। তবু চোখ নামায় না। আমি ম্যাচটা নিয়ে ওর হাতে দিলে স্টিকটা ধরায় ও। গাঁজার কটু গন্ধে এতক্ষণে ভরে উঠেছে রুম,  ফ্যানের বাতাস আর কতটুকু পারে নিরাময় এনে দিতে। নিজের মধ্যে গভীর ভাবনায় ডুবে থাকায় না টানা স্টিকটা পুড়তে থাকে ওর তির তির করে কাঁপতে থাকা,  সামান্য দেখা যায় কি যায় না, দু’ আঙুলের ফাঁকে। অব্যক্ত বেদনার নিরাময় হয়ে যখন এক সময় হৃদয়ের গভীর অতল থেকে শরীরের ভেতর থেকে উঠে আসা অশ্রু চোখের কোণ বেয়ে কানের দিকে গড়িয়ে পড়ে, আমি হাত বাড়িয়ে চোখের পানি না মুছে, অনেক্ষণের জমে থাকা লম্বা ছাই ঠোঁকা দিয়ে ফেলে দেই। টের পেলেও কোন ভাবান্তর বা নড়চড় হয় না ওর। শেষে আঙুলে পুড়ে শেষ হয়ে স্টিকের ছ্যাঁকা খেয়ে ফিল্টারটা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। ফিল্টারের সাথে আরো কিছু আপাততঃ ছুঁড়ে ফেলে দেয়া গেছে বলে এতক্ষণে সম্বিত ফিরে ওর। আমার দিকে ফিরে,  চোখ মোছার কোন চেষ্টা না করে, একটা অদ্ভুত সুন্দর ফুলের হাসি উপহার দেয়। কোন কথা না, শুধু হাসি। ধ্বংসস্তূপের ফুল যেন ওর প্রায় বোঁজা চোখের এই হাসি। তারপর ধীরে, অতি ধীরে, হাত বাড়িয়ে টেবিল থেকে ওর বেছে রাখা আমটা হাতে নিয়ে গোড়ার দিকে একটা ফুটো করে টিপে টিপে চুষে চুষে খেতে থাকে;  আবার আগের পজিশনে আমার ভাঁজ করা হাঁটুতে হেলান দিয়ে হাঁটুর চাক্কিতে মাথা চিৎ করে শোয়। কপালের পাশে লেপ্টে থাকা ঝুঁটি থেকে বেরিয়ে আসা কয়েকটা শ্রান্ত চুল। তীক্ষ্ণ নাকের ডগা,  বুঁজে থাকা একপাশের চোখ আর নিঃশ্বাসের তালে তালে ওর ছোট্ট স্তনের ওঠা-নামা দেখতে দেখতে রাজ্যের ভাবনা আসে আমার মাথায়। কত বয়স ওর?

কালো শেমিজ আর নীল সিল্কের সালোয়ার কতবার খুলতে হয়েছে আজকে?

সুতির ফিনফিনে পাতলা শেমিজের নিচের শরীরের কাঠামো, বাল্ব আর আমার মাঝখানে বলে, প্রায় পুরোটাই স্পষ্ট। তবু সেদিকে খেয়াল করার কোন অবকাশ যেন নেই ওর।

কতবার করেছে আজকে? আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকা প্রশ্নটা যখন প্রায় করেই ফেলেছি, ভাগ্যিস তখনই হঠাৎ নড়ে ওঠে ও। আম খাওয়া শেষ। বিছানায় চাদরে দু’হাত ভালভাবে মুছে, ব্রার ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা দুমড়ানো – মোচড়ানো ছবি বের করে আনে। কোন গ্রুপ ছবি থেকে একজনকে কেটে নেয়া ছবিটার অবস্থা ছেড়াবেড়া, ব্রার ভেতরের ঘাম আর চাপের মধ্যে থেকে। লাজুক হেসে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরলে, হাতে না নিয়ে, দেখি, বছর ৩০-এর স্বাস্থ্যবান, শ্যামলা হাসন্ত চেহারার, জিন্স প্যান্ট, কেডস্, শার্ট পরা এক যুবকের ছবি।

‘কতদিন ধরে’, আমি প্রশ্ন করি, ‘ছবিটা ওখানে?’

‘আট মাস,’ চোখের মণি একবার ঘুরিয়ে আমার চোখে রাখে।

‘কী লাগে আপনের?’

‘আমার স্বামী।’

‘কই থাকে?’

‘থাকে না।’

‘থাকে না মানে? ডিভোর্স?’ ওর বিষণ্নতাকে খোঁচাতে না, স্বভাববশতই বলি। তবু, দেখি, স্পষ্টতই আহত হয় সে আমার প্রশ্নে। আরো বিষণ্ন হয়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকে। মাথা নিচু করে কী যেন ভাবে, শেষে মাথা ঝাঁকি দিয়ে তুলে আহত হায়েনার হাসি চোখে নিয়ে বলে, ‘না, থাকে না মানে তা না, সেপারেশনও না।’

আমি কিছু একটা বলতে গেলে ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বিরক্তি চাপার শেষ চেষ্টা না করে বলতে থাকে, ‘ও জেলে আছে, আর্মস কেস। বিশ্বাস করেন ওর কোন দোষ ছিলো না। চায়ের দোকানে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতাছিল। ওর পরণে জ্যাকেট ছিল দেইখা বন্ধুরা ওর কোমরে রাখতে দিছিলো। কোন শত্রুতাও না। ওদের মধ্যে একজন ছিলো আবার ওয়ারেন্টের আসামি। পুলিশের টেম্পু দেইখা সবাই দৌড়াইয়া পলাইছে। পারে নাই, জীবনেও কখনো দৌড়াইয়া পলায় নাই, পারে না, ও ধরা খাইয়া গেছে।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করে, ‘জানেন, আমার একটা সতীনও আছে। ঐটারে তো অ্যারেস্ট হওয়ার মাত্র তিন মাস আগে বিয়া করছে। আমার তো যাওয়ার জায়গা নাই,  তবু একবার ভাবছিলাম থাকুম না, আবার ভাবলাম, আমি যামু ক্যান? আমার দাবি তো আগে। গেলে ঐ মাইয়া যাইবো। গেছেও। বিপদ দেইখা লগে লগে ভাগছে। যেদিন ওরে আনছিলো তারপর ৪ দিন ভাত-পানি কিছু খাই নাই। খালি রাইন্দা দিছি। শেষে ও বললো তুমি না খাইলে আমিও খামু না তখন খাইলাম।’ কিছুক্ষণ চুপ করে ধীরে অতি ধীরে একটা ঠোঁটের কোণে ফোটাতে ফোটাতে কী যেন ভেবে মাথা নিচু করে। তারপর নতচোখেই ঘোষণা করে ‘আমাকে বেশি আদর করতো।’

আমার ঠোঁটের কোনে জেগে ওঠা বিদ্রূপের হাসিকে পাত্তা না দিয়ে যোগ করে, ‘আমি রাগ করলে আমারে লোকমা তুইয়া খাওয়াইতো।’ আড়াল করার কোন চেষ্টা না করে খুব নিভৃতে জমতে জমতে গড়িয়ে পড়ার মত শেমিজের প্রান্ত উঠিয়ে চোখ মোছে। তারপর আমার দিকে ফিরে হাসে কুয়াশার হাসি।

বোঝাই যাচ্ছিল পরের ঘটনা কী হতে পারে। প্রশ্ন করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছিলাম। তবু জান্তব উৎসাহে প্রশ্ন করি, ‘কয়মাস আগে অ্যারেস্ট হইছে?’

‘বললাম না, আট মাস?’ চোখে মুহূর্তের তিরস্কার হেনে বলে। তারপর আবার মনযোগ শুরু করে, ‘ও অ্যারেস্ট হইয়া গেল, আমি য্যান নদীতে পড়লাম। আমি এখন কই যাই? কার কাছে গেলে ওর ব্যাপারে সাহায্য পাব? আমি তো ওর জন্য বাড়ি ছাড়ছি। সেও আমার জন্য। কারো বাড়িতেই মানে নাই। আমি তখন বাড়ি গেলে আমি জানি আমারে জায়গা দিতো, কিন্তু ওরে ডিভোর্স দেওয়াইতো। আর আমি তো এমনিতেও বাড়িতে যামু না। আবার আামি বাড়ি গেলে ওর কী হবে? আমি চিন্তা করলাম, ও তো একদিনের জন্যও আমারে খাওয়াইছে। একদিনের জন্য হইলেও তো আমারে আদর করছে। আমি তো নিমকহারাম, বেঈমান না।’

এটুকু বলে একটু থেমে আবেগ দমিয়ে আবার শুরু করে, ‘টাকার জন্য তখন পাগলের মত মাইনষের কাছে গেছি। জামিন করতে চল্লিশ হাজার টাকা লাগব। ওর এক বন্ধুই, তার কাছে টাকা ধার করতে গেছিলাম। আমারে এই হোটেলে নিয়া আসে। আইনা বেইচা দেয়। প্রথমে একটা রুমে আটকাইয়া রাখছে। ভাত দেয়, আমি খাই না। পরে চিন্তা করলাম, না খাইলে তো বাঁচুম না। আমারে তো বাঁচতে হবে, ওর জন্য হইলেও। এক সপ্তাহ পর জোর কইয়া কাম করানো শুরু করলো। ২০ দিনের দিন এক কাস্টোমারের হাতে পায়ে ধইরা কানলাম, কইলাম, আমারে আপনে এইখান থিকা নিয়া যান। খুব ভালো ছিলো লোকটা।

যেন অন্য কারো গল্প বলছে রাণি। আমার হাঁটু থেকে শোয়ানো মাথাটা ততক্ষণে উঠিয়ে শুধু আমার ভাঁজ করা পায়ের রাণে শরীরের ভর ছেড়ে হেলান দিয়ে আবার আয়নার দিকে চেয়ে থেকে। বাইরে রাত্রি নির্জন থেকে নির্জনতর হয়ে উঠেছে। তবু নিচে ৫ তলার হৈ-চৈ হট্টগোলের কমতি নেই। রাত এখন আড়াইটার মত হবে। ‘মোখলেস, আরেকটা টুপি দে’ চিৎকার সিঁড়ির একেকটা ধাপ টপকে মানুষের মত টুক টুক করে চলে আসে ৬ তলার এই রুমে, রাণি সেদিকে খেয়ালও করে না। নিজের গভীরে ডুবে থাকে চুপচাপ। সময়, দিন, রাত ওর কাছে কেমন, ভাবতে চেষ্ঠা করে। সঙ্গমের পর একটা স্টিক, তারপর আরেকটা সঙ্গম, আরেকটা স্টিক… তারপর ঘুম। ঘুম থেকে উঠে আবার সঙ্গম আর স্টিকের ক্রমাবর্তন। কখনও কোটপাড়ায়, চকচকে চোখের উকিল মুহুরীরা, কখনও জেলগেট। মোটা গ্রিলের এপাশ থেকে ১০/১২ ফুট দূরের আরেকটা মোটা গ্রিলের ওপাশে স্বামীকে দেখা। আশপাশের আরো আরো গার্জেনদের যার যার বলা কথাগুলোর মিলিত চিৎকারে ওর কণ্ঠও যোগ হয়। ‘তুই চিন্তা করিস না, তোর রাণি এখন আগের মত নাই। রাণি এখন শহরে পয়সা কামাইয়া, চইলা খাইতে পারে। চিন্তা করিস না জামিন আমি করমুই। যত টাকা লাগে আমি যোগামু ইত্যাদি, ইত্যাদি।

‘তো সেই লোকের পা ধইরা কানলাম। সে আমারে ম্যানেজারের কাছে নিয়া বললো, আমি এরে নিতে চাই সাথে, কত দিতে হবে? আমি তখন হোটেলের সেরা মাল। অনেক দামে বেচলো ম্যানেজার। হোটেল থিকা বাইর হওয়ার সময় আমারে আলাদা নিয়া কইলো, কাম করার প্রয়োজন থাকলে আবার আসতে, কইলো, ইচ্ছামত যাইতে আইতে দিবো, কাস্টমার চয়েস করতে দিবো।’

‘ঐ লোক তখন কী করলো আপনেরে? ছাইড়া দিলো?’ খিল খিল করে বাঁধভাঙা হাসিতে ফেটে পড়ে রাণি, দুলে দুলে হাসে। অনেক চেষ্টার পর হাসি থামিয়ে বলে, ‘ঐ লোক আমারে নিয়া গেল কক্সবাজার। দামি হোটেলে উঠলো। অনেক জামা-কাপড় কিইনা দিলো। এক সপ্তা রাখলো। ইচ্ছামত কাম করলো।’

‘তাইলে আর ভালো লোক হইলো কেমনে?’ আমি কথায় হস্তক্ষেপ করি।

‘আরে শোনেন না আগে, ঐ লোক আমারে টাকা দিয়া কিনছে না? আর এক সপ্তা পর উনি তো আমারে বললো, কয়েকটা হোটেলের ঠিকানা দিয়া, যেখানে আমি চাইলে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবো, অথবা আমি চাইলে সে ঢাকায় একটা দুইরুমের বাড়ি ভাড়া কইরা আমারে রাখবে। একা থাকবো আমি, উনি মাঝে-মাঝে বন্ধুবান্ধব নিয়া আসবেন। আমি প্রথমটা বাইছা নিলাম।’

একটু চুপ থেকে হঠাৎ প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, ‘জানেন একদিন জেলগেটে আমারে কয়, তুই এত টাকা কই পাস? আমি কইলাম, সব। আমারে বললো, তোর টাকায় আমি মুতি। আমি কিছু বললাম না আর। মনে মনে ভাবলাম, ও না নিলে কী অইবো। উকিল তো নিবো! আমি ওরে বাইর করমুই। প্রথমে একজন ৪০ হাজার টাকা নিয়া মাইরা দিছে।’

একটু থেমে আমার দিকে আড়চোখে হেসে একটা স্টিক ধরিয়ে বুক ভরে ধোয়া নেয় রাণি। গল গল করে ছাড়ে। ‘তখনো আমি শহরের কিছুই বুঝি না। এইবার আসল লোক ধরছি। এখন অনেক জানি। ৩০ হাজার এ্যাডভান্স নিয়ে কাজ শেষ করবে, তারপর আরো ২০ হাজার দিতে হবে। এইবার কাজ হবে।’

দরজায় ঠক ঠক শব্দে দু’জনের মগ্নতা ভাঙে। বাইরে থেকে সবুজের কণ্ঠ শোনা যায়। আমি উঠে দরজা খুলে দেই। একটা মেয়েকে নিয়ে সবুজ। ঔষুধের কারণে শরীরে ভার হয়ে আছে বলে দ্রুত যেয়ে আবার বিছানায় শুয়ে পড়ি। সবুজ মেয়েটাকে নিয়ে রুমে ঢুকতে ঢুকতে বলে, ‘রাণি তোমারে ম্যানেজার ডাকে।’ রাণি সবুজকে পাত্তা না দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সবুজের সাথে ঢোকা মেয়েটার হাত ধরে আমার দিকে ফিরে বলে, ‘ভাইয়া, এইটা আমার একটা বোন। ওর নাম বেবী,’ বেবীর দিকে ফিরে বিছানার দিকে দেখিয়ে বলে, ‘তুই এইখানে বস, উনার সাথে একটু গল্প কর। আমি এখনি আসতেছি।’

রাণির কথা শেষ না হতেই বেবী বলে ওঠে, ‘জানো আপা, একটা কাস্টমার আসছে। স্বামী-স্ত্রীর মত করতে বলে। আমি তো পারি না। বাইর হইয়া আসছি শেষে। একটা ঘুষি মারছিলাম বেটারে। লাগে নাই। মাথা সরাইয়া নিছে। দেওয়ালে যাইয়া লাগছে। উহ, এহনো ব্যথা করতাছে আঙ্গুলটা।’

আমি মেয়েটাকে বসতে বলি। হোটেলের একজন বোর্ডার বলে পরিচয় দেই। বেবী চেয়ারে বসলে রাণি সবুজের সাথে বেরিয়ে যায়। আমি উঠে ওকে লিচু আর আম খেতে দেই। প্রথমে খেতে না চাইলেও, ‘তোমার বোন তো খেল’ বললে শেষে রাজি হয়। খেতে খেতে নিজে থেকেই কথা বলতে শুরু করে মেয়েটা। নিজের বদলে যাওয়ার কথা বলে। আগে কেমন ভীতু ছিল। এখন কেমন পারলে মানুষকে মারতেও দ্বিধা করে না। কাউকে কিছু না বলে আগে যে যা বলতো সব চুপ করে শুনতো, যেভাবে বলতো তারা সেও সেভাবেই রাজি হতো; এখন সারাক্ষণই সবাইকে গালিগালাজ করে। এই সব কথাবার্তা।

আমি হঠাৎ প্রশ্ন করি, ‘রাণি কি আপনের আপন বোন?’

‘না, এমনি বোন ডাকছে আমারে। খুব আদর করে। জানেন আপা যা ভালো। আপা কারো কষ্ট সহ্য করতে পারে না। রাস্তায় কেউ যদি আপার কাছে ১০০ টাকা চায়, সে দিয়া দিবো।’

‘অপরিচিত লোক হলেও?’

‘হ্যাঁ।’ অবাক চোখে বলে বেবী, ‘যে চাইবো হেরেই দিবো কী জন্য চায় তাও জিগাইবো না।’

এসময় সবুজ আবার রুমে ঢোকে, পিছু পিছু রাণিও। আগের ড্রেসেই। ভেতরে ঢুককেই বেবী প্রশ্ন করে, ‘আপা করছো?’

‘নাহ, কাম করি নাই। ম্যানেজাররে বললাম, ব্যাডারে দেইখা, রানি সবার লগে কাম করে না।’

একজন বয় এসে এ সময় রাণির কামিজ, ওড়না, বোরকা দিয়ে যায়। হাতে নিয়ে রাণি টেবিলের উপর ছুড়ে ফেলে। বিছানায় আমার পাশে আগের জায়গায় বসে যায়।

‘আপনাদের কাজের ক্ষতি হবে না তো?’ আমি একথা বলতে দুজনেই হেসে ওঠে। রাণি বেশ জোরে।

হাসি থামলে রাণি বলে, ‘অসুবিধা হইলে হবে, সেইটা আমি দেখবো।’

‘আপনার কোন অসুবিধা হবে না তো?’ একটু থেমে কী যেন ভেবে মুচকি হেসে যোগ করে।

আমি হাসি, ‘সকালে হয়তো ম্যানেজার কিছু বললেও বলতে পারে, নাও বলতে পারে। বললে বলবে, যাই হোক সেইটা আমি দেখবো।’ শেষেরটুকু রাণির ঢঙেই বলি। রাণি বোঝেও, বুঝে হেসে ওঠে। হাসির দমকে সারা চিকন শরীরর কাঁপিয়ে কোনমতে বলে, ‘আপনে হেভি পোংটা।’ আমিও হাসি কোন জবাব না দিয়ে। দুষ্টুমির নিজস্ব হাসি চোখে মুখে নিয়ে সে বলে, ‘আমার তো আরো একটা আমের ভাগ আছে, তাই না?’

‘আপনের ভাল লাগছে? নেন না, বেবীরে অন্যটা দেন।’

‘হ্যাঁ, লাগছে,’ বলে রাণি নিজে একটা নিয়ে বেবীকে একটা দেয়।

রাণি ম্যানেজারের ডাকে রুম থেকে বেরোবার পর থেকেই সবুজ বেবীর সাথে ঝামেলা করার চেষ্টা করছিল। বেবী ধমকে সরিয়ে দিচ্ছিল এতক্ষণ। কিন্তু রাণি আসার পর সবুজ আবার ঝামেলার চেষ্টা করলে বেবী রাণির কাছে নালিশ জানাচ্ছিল। আর রাণি কান টেনে ওকে সরিয়ে দিচ্ছিল।

বিছানায় বসে থেকেই টেবিলের ওপর রাখা পার্সটা দেখিয়ে পাশে চেয়ারে বসে থাকা বেবীকে বলল ‘এটা দে তো।’

পার্স খুলে একটা ছবি বের করে মুখের সামনে ধরে অনেকক্ষণ দেখতে থাকে। তারপর একসময় চোখ বুঁজে ছবিটায় চুমু খায়। ঘাড় ফিরিয়ে আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে লাজুক হেসে ছবিটা বাড়িয়ে ধরে। অবশ্য এবার আমি হাত বাড়িয়ে নিজের হাতে নিয়েই দেখি আগের ছবির লোকটাই, তবে ছবিটার অবস্থা আগেরটার চেয়ে অনেক ভাল। ১১ সাইজের একটা ছবি। সানগ্লাস, জিনস, কেটস পরা কোলে একটা ৩/৪ বছরের বাচ্চা নিয়ে আগের ছবির যুবক। পাশে রাণি হাসিমুখে শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে।

‘বাচ্চাটা কে?’ আমি প্রশ্ন করি।

‘ঐটা আমাদের বাড়িওলার বাচ্চা। ঐ যে আমাদের পিছনে পোস্টার লাগানো দরজা, ঐটা আমাদের বাসা। আমাদের বাসার সিঁড়িয়ে দাড়িয়ে তোলা।

ছবিটা ফেরত দিতে গিয়ে, কারণ আমি বলতে চাই না, আমার কেমন হাসি পায়। হেসেও ফেলি ‘হুহ’ করে উচ্চারণের ভঙ্গিতে বিদ্রূপ চাপা থাকে না। স্বতঃস্ফূর্ততা বরাবরই আমার অভ্যাস আর আরাধ্য বলে চাপার কোন চেষ্টাও থাকে না।

মানুষকে ও কতটুকু চেনে? ২০/২১ বছরের অলরেডি পোড় খাওয়া মেয়েটা–ভেবে খুব মায়া হয় আমার। তাও বলাবাহুল্য, অভ্যাসবশতই।

‘রাণি তুমি খুব ভাল আর খুব ছোট এখনো তুমি।’ একটু থেমে চিন্তা করি বাকিটা বলব কি না; হতবাক হয়ে আমার চোখের দিকে সরাসরি চেয়ে থাকা, এই প্রথমবারের মত স্বরূপে বা আসল সৌন্দর্য্যে প্রস্ফূটিত, গাঁজার প্রভাবে জবালাল, ওর ডাগর চোখের দিকে চেয়ে, ওর চেহারায় আমার কথা বুঝতে না পারার অস্বস্তি, চেষ্টা। একসময় সহজ কথাটার গভীর মর্মার্থ বুঝতে পেরে ও বিশ্বাস করে। অপেক্ষাকাতর চোখে তাকিয়ে থাকে আমার কথার বাকিটুকু শোনার আশায়, আমার ভঙ্গিতে ও টোনে আরো কিছু বলতে চাওয়ার (কথা পুরো শেষ না হওয়ার) চিহ্ন ছিল বলে।

‘এখন এত পূজা করতেছ,’ ওকে আর উৎকণ্ঠায় না রেখে বলতে শুরু, ‘জেল থিকা বাইরইলেই তো যেইটা বেইচা বাইর করতেছ সেইটাতেই লাত্থি মাইরা ঐ ফ্রেশ মালের লগে, তোমার সতীন, সুর সুর কইরা যায়া ঘর করবো। মানুষের বাচ্চাগো আমার চিনা আছে।’ তীব্র বিতৃষ্ণায় উত্তেজনা চাপা রাখতে পারি না বলে কণ্ঠস্বরও চড়ে যায় আমার।

আমার তরল আবেগে জল ঢেলে দিয়ে, আমাকে অবাক করে দিয়ে হেসে ওঠে সে। (আমার অশ্লীল অবশ্যম্ভাবী পণ্ডিতি সত্যের জবাবে একটা কথাও না বলে শুধু এই হাসি যে কত কিছু বলে। কত গভীর বেদনার উপলব্ধির স্মারক যে এই হাসি বুঝতে পেরে চমকে শিউরে উঠি আমি। ওর অদম্য আত্মার পোশাক এই হাসি দেখে আমি বুঝি, কোন না কোনভাবে ও এগুলা বোঝে। হয়তো পরিণতিও আগেই জানে। হয়তো কেন? নিশ্চয়ই জানে। মানুষের বাচ্চাদের রাণিও চেনে আমি টের পাই।

রাণি হেসে বলে, ‘করলে করবো। বিশ্বাস করেন ভাইয়া, আমি তা মেনে নেব। ভবিষ্যতে কী হবে সেইটা সত্যিই কোন ব্যাপার না। বোঝেন না কেন? আমি তো বেঈমান না। বললাম না? বললাম না একদিনের জন্য হইলেও তো আমারে আদর করছে? বোঝেন না কেন, (আপনে এত ভালো) আমি তা কেমনে ভুলি?’

আমি চুপ হয়ে যাই।

৫.

দীর্ঘক্ষণ কেউ কোন কথা বলে না, সবাই চুপচাপ যার যার ভাবনায় ডুবে থাকে। কোন লাভ নেই বুঝতে পেরে এতক্ষণ বিছানার একাকোণে কাৎ হয়ে শুয়ে ছিল। এখন আর থাকতে না পেরে সম্ভবতঃ আমাদের প্যানপ্যানানিতেই বিরক্ত হয়ে, বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আমি গেলাম। আমার ঘুমাইতে হইবো। কালকে সকালেই তো আবার ডিউটি। তোমরা থাকলে থাকো। ২৩ নম্বরে তোমাগো ঘুমাইতে কইছে ম্যানেজার।’

আমার দিকে ফিরে বলে, ‘রাইতে ঘুমানোর ইচ্ছা থাকলে এডিরে তাড়াতাড়ি বিদায় করেন। কান ঝালাপালা কইরা দিবো আপনের মাথায় চইড়া বইবো বেশি চান্স দিলে। এটুকু বলেই বেরিয়ে যায় সে। রুমের তিনজনই একসাথে হেসে উঠি আমরা।

৬.

‘জানেন ওর জন্য যদি আমার কিডনি দুইটাও দিতে হয়, আমি দিয়া দিবো,’ যেন মাঝখানে কোন ছেদ পড়েনি এমনই সাবলীলতায় বলতে থাকে রাণি। ‘যদি আমার চোখ দুইটা দিলে ও দেকতে পারবে এমন অবস্থা হয় বিশ্বাস করেন, আপনে তো কিছুই বিশ্বাস করেন না, আমি দিয়া দিবো। কেন দিবো না? আমি তো মনের চোখ দিয়া দেখবো। তবু তো আমার চোখ দিয়া কেউ পৃথিবীটারে দেখবে।’

‘যদি অন্য কারো জন্য দিতে হয়?’

‘মানে? বুঝলাম না,’ জিজ্ঞেস করে রাণি। হাতের ছবিটাতে ডুবে ছিলো বলে আমার কথার মর্মার্থ হঠাৎ বুঝতে না পেরে নাকি শহুরে কপট সরলতাকে সহ্য করতে না পেরে না বললেও আপনারা জানেন।

আমি বরং আমার প্রশ্ন পরিস্কার করে বলি, ‘ধরেন আপনারা আরামে একসাথে থাকতেছেন। ঐ সতীনও মনে করেন আর আসে নাই। শুধু আপনারা দুইজন একসাথে থাকেন। সংসার করতেছেন আর কি। এখন সময়ে তৃতীয় কোন ব্যক্তি যদি চায় আপনি আপনার চোখ দিবেন?’

অনেকক্ষণ কী চিন্তা করে চোখ বুঁজে, তারপর ধীরে আমার দিকে ফিরে আমার চোখের কুয়ায় বালতি বাঁধা দড়ি নামিয়ে মেপে দেখে নিয়ে বলে, ‘আমি তো বললাম আমি মনের চোখ দিয়া দেখব, কেন দেব না?’

মেয়েটার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজস্ব একটা কল্পিত ধারণা থেকে একটু মায়া হচ্ছিল মেয়েটার জন্য। ওর জীবনের গল্পে মানসিকভাবে জড়িয়ে পড়ছিলাম বলে, কোন না কোনভাবে রাণিও জানে যে, জেল থেকে বেরিয়ে লোকটা তাকে নেবে না, এটা বুঝতে পারছিলাম বলে ওকে আমি বললাম, ‘আপনে মানুষটা খারাপ না।’

‘আপনে বললেন, এক সময় সবাই বলতেন, ছোটবেলা থিকা এইটা আমি শুনতাম, আপনে অনেক দিন পর বললেন।’

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে রাণি। বেবী চুপচাপ চেয়ারে বসে আমাদের কথা শুনছিল। কতক্ষণ থাকে মানুষের হাসি!–আমি ভাবছিলাম, চিন্তার্ত গম্ভীর রাণির মুখ দেখতে দেখতে। পাকা পাতার মত কখন ঝরে গেছে ওর হলুদ হাসি!

হঠাৎ আমার চোখে সরাসরি চেয়ে প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা আপনে কি আমারে ঘৃণা করেন?’

‘ও কি আমাকে বিশ্বাস করলো না?’ এরকম ভাবনা মাথায় এলেও ওর পরবর্তী কথায় সে সংশয় কেটে যায়। আসলে উত্তরের আশায় ছিল না প্রশ্নটা।

‘শোন আমি তো…’

কথা শেষ করতে না দিয়ে হাতের ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিলে বলল, ‘শোনেন, কোন খারাপ মেয়েকে কখনো ঘৃণা করবেন না।’

ভাল-মন্দের বিতর্কে না গিয়ে বরং ওর দীর্ঘক্ষণ মেঝের দিকে চেয়ে থাকা দেখতে থাকি। ভোর রাত চলে এসেছে, বাইরের সব হট্টগোল এখন ঠাণ্ডা, খুব ধীরে ধীরে বিছানা থেকে ওঠে রাণি। টেবিল থেকে বোরকা, কামিজ, ওড়না, পার্স, স্টিকের প্যাকেট তুলে নেয়। যা বলতে চায়নি চেপে রাখতে না পেরে তা বলে ফেলার লজ্জার সাথে যা করতে চায় না তা ক্রমাগত করতে থাকার গ্লানি ওর মুখে কালো রঙ মেখে যায়। চোরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে আমার দিকে ফিরে একটু ঝুঁকে চুলগুলো নেড়ে দেয়। বেবীর দিকে ফিরে বলে, ‘শুইতে হইব, চল্।’

রচনাকাল ২০০১

Flag Counter

About Author

তারিক আল বান্না
তারিক আল বান্না

জন্ম. সৈয়দপুর ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭২, পেশা সাংবাদিকতা, গল্প লেখেন।