কমলাপুর বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ড থেকে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির হোস্টেলের ৩০৪ নং রুমের অন্ধকার পর্যন্ত যাইতে যাইতে

‘তখন তোমার চিঠি এল/অনিশ্চিত ডাক পেলাম উপহার সেবার জন্মদিনে রিবনেবাঁধা রবীন্দ্রনাথ/
পড়ি নি এখনো সময় কোথায় বাবা/
যতদিন কালুবাবু জীবিত আছেন চিন্তা নেই বুঝে নেব রক্তকরবী’
– পুরী সিরিজ, উৎসর্গ, ১৯৬৪, উৎপলকুমার বসু

উৎপলকুমার বসু জাতীয় কবিতা পরিষদের দাওয়াতে ২০০৬ সালে বাংলাদেশে আসেন। একই সাথে একই বাসে আসছিলেন ইন্ডিয়ার আরও ৭/৮ জন কবি। ওনারাও গুরত্বপূর্ণ কবি ছিলেন হয়ত। উৎপল ছাড়া অন্য কবিদের কবিতা আমার পড়া ছিল না। উৎপল নিয়া যতটা উনাদের বিষয়ে ততটা আগ্রহ ও উদ্দীপনা কাজ করতেছিল না। বিষয়টা কেন জানি ভাববার। আমি তখন এইটা নিয়া ভাবি কিন্তু কোনো সিদ্ধান্তে আসি নাই।

আমার এক আত্মীয় তার নানা প্রয়োজনে প্রায়শই কলকাতায় যাইতেন। উনারে বলছিলাম উনি যেন উৎপলকুমার বসুর বাসায় যান। গড়িয়াহাটে উৎপলকুমার বসুর বাসা। কোন সোর্স থাকি আমি যেন জানতাম।

সাহিত্য-কবিতায় ওনার যথেষ্ট আগ্রহ থাকায় উনি উৎপলকুমারের সাথে দেখা করেন। যতদূর মনে পড়ে উৎপলকুমার বসুর সাথে উনার তখন বেশ একটা গভীর খাতির হইছিল। পরে অনেকবার তাঁর গড়িয়াহাটের বাসায় গেছেন। কলকাতা থাকি ফিরলেই আমারে উনি উৎপলের খবরাখবর জানাইতেন।

উৎপলকুমার বসু (জন্ম. ৩/৮/১৯৩৯)
উৎপলকুমার বসু (জন্ম. ৩/৮/১৯৩৯)

২০০৬ সালের জাতীয় কবিতা উৎসব শুরুর আগের দিন। উনিই আমারে জানাইলেন এবারের কবিতা উৎসবে আজ দুপুরে কলকাতা থাকি ঢাকায় আসবেন উৎপল। না যাইতে পারতাম দেখা করতে উৎপলের লগে। মনে আগ্রহের লেবেলটা স্বাভাবিকের থাকি বোধ হয় একটু উপরে ছিল। তাই কি উৎপলের সাক্ষাৎ পাইতে লোভাতুর ছুটে গেছিলাম?

ঢাকার বিক্রমপুর মালখানগরে কবি বুদ্ধদেব বসুর পৈতৃক বাড়ির সামনে উৎপলকুমার বসুর সঙ্গে লেখক, ২০০৬
ঢাকার বিক্রমপুর মালখানগরে কবি বুদ্ধদেব বসুর পৈতৃক বাড়ির সামনে উৎপলকুমার বসুর সঙ্গে লেখক, ২০০৬

নাকি, তার কবিতা পড়ে আমার যত অবধারণ—তার কবিতার প্রতি আমার তামাম মহব্বত পয়দা হইছিল দিনে দিনে—তা টেক্সটের নৈর্ব্যক্তিক সীমানা ডিঙ্গাইয়া লেখক-পাঠক মুখোমুখি হইয়া তার লিখিত কবিতার মধ্যে যেই ব্যক্তি উৎপল গরহাজির ছিল তারে হাজির পাইয়া কাছে টানিয়া ভাষার বিচ্ছিন্নতাকে গৌণ করি তোলার আয়োজন মুখ্য হয়ে উঠছিল হয়ত আমার ভেতর। মনে হয় ঘটনা এইরকমও হইতে পারে পঠিত টেক্সট-এর বিপরীতে গরহাজির লেখককে হাজির করার মাধ্যমে পাঠকের হারানো মানিক খুঁজি পাওয়ার জিন্দা আনন্দ পাইবার একটা উদ্যোগ।

এতে হয়ত পরে প্রি-অকুপেশনহেতু টেক্সটের নিরপেক্ষ পাঠের সম্ভবনার ব্যাঘাত ঘটে। পাঠের নানা ডাইমেনশনকে নস্যাৎ করে ছাড়ে। হয়ত তাই ঘটছিল আমার। পরবর্তীতে অভিজ্ঞতা তাই বলে। পাঠকের চোখের উপর থাকি রঙিন চশমাগুলো সরিয়া যায়। সরল হয়ে আসে পাঠকের চাহনি।

তাইলে বলিব কি প্রিয় লেখক/কবিদের সাথে পাঠকের সাক্ষাৎ না করাই ভাল?

কিন্তু সরল সিদ্ধান্ত কেমনে দিই? ব্যক্তি কি শুধুই লেখক? লেখালেখির বাইরে ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে বায়ো-যোগাযোগগুলা কারা আসি করি দিয়া যাবে?

পঠন আর লেখন এক না। শ্রুতি আর লিখন এক নয়। কেমনে লেখক নির্মাণ করেন লেখা। কেমনে নাজেল জিনিসটারে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতায় লালন-পালন করিতে হয় তা কবি-লেখকের সাক্ষাতে জানাও তো জরুরি।

প্রাসঙ্গিকভাবে উৎপলের উদ্ধৃত কাব্যাংশের কাছে ফিরে আমরা কী তথ্য পাই। বাঙালি মধ্যবিত্ত মেয়ে তার উচ্চতম ধর্ম-কালচার হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ। এই কিসিমের প্রেমিকার কাছ থাকি প্রত্ন রবীন্দ্রনাথের রিবনে বান্ধা রক্তকরবী জন্মদিনে উপহার পাইয়া ফেলাই রাখা ছাড়া রসিক কবির পড়ার সময় কোথায়?

‘যতদিন কালুবাবু জীবিত আছেন চিন্তা নেই বুঝে নেব রক্তকরবী।’ গরহাজির রবীন্দ্রনাথের বিপরীতে রক্তকরবী পাঠ দানের নিমিত্ত জীবিত কালুবাবুকে দাঁড় করান উৎপল। তার কাছ থেকে রক্তকরবী বুঝে নেওয়ার ঘটনা ঘটাবেন। লিখিত সংস্কৃতির উপর কি ওরাল সংস্কৃতিরে এইখানে উচ্চাসন দিলেন উৎপল? তাইলে কি লিখিত সংস্কৃতির প্রতি তার অনাস্থা বজায় রাখিতে চান? টেক্সটের থাকি টেক্সটপ্রণেতা কি গুরুতর? তোমার কীর্তির থেকে তুমি যে মহান?

নাকি এটটা উৎপলের ঐতিহ্যপ্রীতি?

নাকি কোনো সিদ্ধান্তই তিনি এইখানে দেন না। তিনি জাস্ট মস্করা করলেন এই দুই সংস্তৃতির লড়াই নিয়া।
মশকরা যেকোনো সিদ্ধান্ত/মতামত/সাধারণীকরণকে নাকচ করে।

এখন কথা হইল এই বিবৃতিও কি একটা মতামত নয়?

যাই হোক, এই রকম তর্ক পেটের ভেতর ঘুম পাড়ায়ে উৎপলের সাথে দেখা করতে কমলাপুরে বিআরটিসি বাসস্ট্যান্ডে যাই। বাস আসতেই আছে। বাস আসতেই আছে। পরে কলকাতার থাকি বাস আসিল তখন দুপুর গড়াইয়া অপরাহ্ণ। উৎপলসহ একে একে কলিকাতার কবিদল নামিলেন।

জাতীয় কবিতা পরিষদের প্রতিনিধিদের দুইজন আসছিলেন ইন্ডিয়ান বাংলা কবিদের রিসিভ করতে।

আমরা উৎপল সন্নিকটে আগাইয়া যাই।

অল্প বয়সের উৎপল
অল্প বয়সের উৎপল

তখন শীতের ভেতর একটু গরম লাগতেছিল আমাদের। দেখি উৎপলদা শীতেরে অধিক প্রাধান্য দিছেন। কমপক্ষে ৫/৬টা কাপড় পরিধান করিয়াছিলেন। একটু কাশতে ছিলেন। দূর পথ পাড়ি দিয়া আসছেন। বেশ টায়ার্ড।

জাতীয় কবিতা পরিষদের প্রতিনিধি আমাদের কইলেন, উনারে আপনারাই ঢাকা ক্লাবে নিয়ে আসেন।

খবরদার ফুকো দেরিদা উত্তরাধুনিকতা নিয়ে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করো না। উৎপলদা সাবধান করলেন।

আমি তো অবাক! কথা নাই বার্তা নাই বিসমিল্লাহ সাক্ষাতেই এইটা দিয়া কথা শুরু করলেন উৎপল। তখন উত্তরাধুনিকতার প্যাঁচাল চলতেছিল ঢাকা-কলকাতা মুলুকে। বিষয়টা নিয়া হয়ত বিরক্ত হয়ে গেছিলেন ততদিনে উনি।

ঢাকা ক্লাবে আসতে আসতে বলেন, এই যে লোকেরা করপোরেশনের জল মনে ক’রে জল অপচয় করছে। এটা ঠিক নয়। এই চিন্তাগুলো এখন উঠে আসছে আবার। উৎপল নিজের থেকে বলতেছিলেন।

বোধহয় পথে কোথায় বাংলাদেশে পানির বেদম নষ্ট হইতে দেখছেন কিনা কী জানি!

যখন ঢাকা ক্লাবে পৌঁছুলাম, দেখি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, হুমায়ূন আহমেদ, তাঁর স্ত্রী শাওন, আরও আবৃত কবিগণ তুমুল মুডে আড্ডা মারতেছেন।

সুনীলের সামনে সুরার বোতল প্রাধান্য পাইতেছিল। কলকাতার আরও আরও কবিগণ সেই সহবতে বোতল টানতেছিলেন কেউ কেউ।

মনে হয় সুনীল উড়াজাহাজে আসেন এই দেশে। তাই আগে-ভাগে আসছেন। বাংলাদেশে পা দিয়া ঢাকা ক্লাবে সুনীলে-উৎপলে তেমন কোনো বাত বিনিময় হইতে দেখি নাই।

আমরা উৎপলের সাথে নরম দূর এক কোণায় গিয়া অবস্থান নিছিলাম।

আমি এগুলো খাইনে, উৎপল কইলেন।

পরে বিকাল গড়াইয়া যাইতেছিল। উৎপলকে নিয়া পরিকল্পনা উন্নয়ন একাডেমির দিকে আসি। ইন্ডিয়ান কবিগণ ঐখানে হোস্টেলে উৎসব চলাকালে আতিথ্যে অবস্থান করিবেন। বাজমে কাদেরিয়ার নিকটে পৌঁছুলে উৎপল বললেন, বাড়িতে মানে বাসায় একটু ফোন করবেন। তাঁকে নিয়া গেলাম ফোনের দোকানে।

ফোনের এইপাশ থাকি উৎপল সজোরে বলতেছেন, এই কাটু, এই কাটু, বাবা বোইলচি…। আমি ঠিকভাবে পৌঁছে গেছি। আরও কী কী যেন কইলেন।

কাটু উৎপলকুমার বসুর একমাত্র পুত্র ফিরোজ বসুর ডাক নাম। পরে এক সময় জানাইয়াছিলেন, ফিরোজ নামটা উৎপল যখন বিদেশে ছিলেন এক প্যালেস্টাইন বন্ধুই নামটা রাখেন। আমি বলছিলাম এইটা মুসলিম নাম না?

উনি কইলেন, না এটা ফার্সি। এই যে ফিরোজ গান্ধী, বুজলে!

অনেক ক্লান্তি নিয়া পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির হোস্টেলের ৩০৪ নং রুমে উঠলেন। রুমের অন্ধকার উৎপলের আসার আগ পর্যন্ত নিরাপদেই ছিল। অন্ধকার বিতাড়নের ব্যবস্থা হইল। উৎপল জায়গা পাইলেন। আলো আসিল। উৎপলের মুখে সে আলো ততটা প্রভাব রাখতে সমর্থ হইতেছিল না। তিনি কাশতে আছিলেন। ঠাণ্ডা লাগিয়াছে ওনার।

ফ্রেশ হইলেন। আমাদের সামনে ওনার সুটকেস খোলা হইলে দেখি অনেকগুলা বেচারা পাজামা-পাঞ্জাবি উঁকি দিতেছিল।

আমি বললাম, এতগুলা?

আরে, প্রায় ১০০টা হবে। বাকিগুলো রেখে এসছি।

আমরা হা হা করিয়া হাসতেছিলাম। উৎপলও হাসতেছিলেন। উৎপল একটানা হাসাইতে পারেন। পরের আড্ডাগুলায় টের পাইছিলাম। আর উৎপলের লেখায় উইট? উৎপলপাঠক মাত্রই এ সন্দেশ জানেন।

আমরা উনার থাকি বিদায় নিলাম।

 

জার্মান কালচারাল সেন্টারের লাইব্রেরির বিকাল মিশ্রিত সন্ধ্যার আড্ডা

উৎপল ঢাকায় আসছে খবর হইয়া গেল। যাদের উৎপলকুমার বসুর কবিতা পছন্দ তাদের জন্য একটা বড় খবর। উৎপলের ঢাকায় দ্বিতীয় দিনে আমাদের সাথে জমজমাট একটা মুগ্ধ ঘোরলাগা সান্ধ্য-আড্ডা হয়। সেই আড্ডায় মাসুদ খান, ব্রাত্য রাইসু, মজনু শাহ, তারিক টুকু, …. উপস্থিত ছিলেন মনে পড়ে।

বাংলাদেশের কবিকুলের অনেকেই সেদিনের বিকাল মিশ্রিত সন্ধ্যার আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন। কেন জানি সবার নাম মনে আসতেছে না। নিচতলায় গ্যেটে ইনস্টিটিউটের লাইব্রেরির ভেতরে বড় একটা টেবিলের চারদিকে আমরা উৎসাহীগণ বসছিলাম। লাইব্রেরিয়ান ছিলেন কলকাতার মানুষ। তিনিও আমাদের সাথে উৎসাহিত ছিলেন। উৎপলই বলতেছিলেন বেশি।

আলাপ ও কথাবার্তা হয় নানা বিষয় নিয়া। প্রথমত আধুনিকতার হালকা পিণ্ডি চটকাইলেন। ফুকো-দেরিদার পথ খোলাশা কইরা উত্তর আধুনিকতাকে দুনিয়াতে দাওয়াত দিলেন সেই সংবাদ দিতেছিলেন।

সেইকালে ঢালাও আধুনিক বাংলা কবিতার বাইরেও অনাধুনিক কবিতা চর্চা হইছে। নজরুল-জসীমউদ্দীনের কথা আসছিল। দীনেশ (দীনেশচন্দ্র সেন) বাবুরা আধুনিক কবিতার চর্চারে উৎসাহিত করেন নাই। রেনেসাঁরে নেন নাই—এইসব।

উত্তরাধুনিকতার প্রশ্নে ভারতচন্দ্রের গুণগান করছেন। মাইকেলের গুনগান প্রবলভাবে করতেছিলেন উৎপল।

কলকাতার তরুণ কবিদের কার কার কবিতা ভাল লাগে রাইসু জিগাইছিলেন।

লন্ডনে ১৯৬০-এ উৎপল
লন্ডনে ১৯৬০-এ উৎপল

উনি ফাল্গুনী রায়ের কথা কইছিলেন। ফাল্গুনী রায়কে উনি শেষ আধুনিক কবি কইয়া ফেলছিলেন। আরও একজন তরুণ কবির কবিতার কথা উদ্ধৃতি টানি বলতেছিলেন। সেই উদ্ধৃতি শুনি আমাদের কারও কারও অস্তিত্ববাদী আত্মরতি ঘরানার কবির কবিতা বইলা মনে হইতেছিল। উৎপলের হেন কবির কবিতা আমাদের অধিকাংশেরই ভাল লাগে নাই। আমার সেরকমই মনে হইছিল।

আড্ডা শেষে বার হই রাইসু একটু বিরক্ত হইয়া আমার সাথে কইলেন, উনি নিজে ভাল লিখলেও ওনাদের কবিতা রুচি খারাপ!

এ দেশের কবি শামসুর রাহমানের কবিতা খুব একটা উৎপল পড়েন নাই। তবে আল মাহমুদের ব্যাপারে বেশ সাড়া পাওয়া গিছিল।

মাসুদ খানের কবিতা নিয়া জিজ্ঞেস করলে ওনার কাছ থেকে পছন্দের ব্যাপারে তেমন কোনো ইশারা পাওয়া গেল না। আমার মনে আছে। আমরা তখনও মাসুদ খান গুরুত্বের সাথেই পাঠ করিতাম।

বাংলাদেশ থেকে যারা বই পাঠাইছিল তাদের লেখা উনি পড়ছেন বুঝা গেল। কেউ কেউ আসি কইলেন তার তার পাঠানো বই পাইছেন কিনা।

কলকাতার লেখক/কবি/পাঠকরা আমাদের বইপত্র পড়ে না। যদিও তাদের বইয়ের বাজার বাংলাদেশ । তাদের বইয়ের ক্রেতা হিসেবে আমাদের মর্যাদা থাকলেও এ দেশের লেখকদের তেমন কোনো পাঠক ও দেশে নাই। তাদের বাজারে আমাদের বইয়ের কোনো চাহিদা নাই!

আমাদের বই তারা পড়ে না, তাদেরে পাঠানো লাগে।

এই নিয়া তাদের (কলকাতার) খারাপ অবস্থানের সমালোচনা হইল।

এই নিয়া উৎপল চুপচাপ নীরব রহিলেন।

যাই হোক সবশেষে জ্ঞান বিষয়ে উৎপল একখানা গল্প পাড়িলেন। ততক্ষণে আমাদের মৃদু ক্ষোভ ম্রিয়মাণ হয়ে আসতেছিল। আমরা শিশুবৎ চুপচাপ সান্ধ্যকালীন ঠাকুরদার রূপকথা শুনিয়া প্রায় ঘুমাইয়া পড়িতেছিলাম।

যতটুকু ভুলভাল মনে আছে তুলে ধরি:

‘এক মেক্সিকান যুবক ছহি জ্ঞানের অন্বেষণে গৃহত্যাগ করিল। সে সাচ্চা গুরুর খোঁজ করতেছিল। অবশেষে সেই দেশে বহু কষ্টে এক গুরুর সন্ধান মেলিল। গুরুর আস্তানায় যখন সেই যুবক পৌঁছিল তখন আর গুরুর হাতে সময় অবশিষ্ট রহিল না। গুরু আগামীকালই যাবেন মরুভূমি সফরে।

যুবক ফাপরে পড়ল।

যেইখানে গুরুর নিকট ছহি জ্ঞানের ছবক নিতে এতদূর আসিল সেইখানে তিনি চলিলেন কিনা মরুভূমিতে। যুবক দমিতে নারাজ। সেও মন স্থির করল গুরুসঙ্গ লাভে পিছুপাও হইবে না।

এইদিকে মরুভূমিতে যাইতে হইবে ভাবিয়া যুবক অস্থির হইয়া নানাবিধ সরঞ্জাম সঙ্গে লয়ে বসিল।

যুবক পিঠের উপর বিশাল ব্যাগ চাপাইল। তাহাতে পানির বোতল, কাপড়-চোপড়, রৌদ্র নিবারণের উপকরণ, খাদ্য-খাবার, অর্থকড়ি আর যা যা লাগে সবই নিল।

গুরু দেখিয়া কহিলেন, এগুলা নিতেছ কেন?

মরুভুমিতে পানি, রৌদ্র নিবারণের উপকরণ, খাদ্য-খাবার—এইগুলা অফুরান! শুনিয়া যুবক অবাক বনে যাইল।

গুরু পদব্রজে মরুভূমি যাত্রা করিলেন। যুবক নিরুপায় হইয়া তার পিছু পিছু চলিল।

রাত যায় দিন যায় মাস যায় বছর না ফুরায়। অবশেষে মরুভুমিতে তারা আসিয়া পড়িল। ততদিনে যুবকের আহৃত সকল পানাহার ফুরাইয়া গেছে। সে ভীষণ হতাশ। পারে তো পালায়। কীয়ের ছহি জ্ঞান!

গুরু এতদিন পর মুখ খুলিলেন। বলিলেন, আমরা মরুভূমির অনেক গভীরে চলিয়া যাইব। এখনও অনেক বাকি। দুর্গম সেই জায়গায় যাইতে হইবে। তুমি প্রস্তুত থাক তার জন্য।

এদিকে যুবকের অবস্থা ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি। মরুভূমির তপ্ত বালি, সূর্যের তাপ, গরম হাওয়া ঘামে গরমে অবস্থা পরমে না গিয়া চরমে উঠিল।

যুবক দমিবার পাত্র নয় একবার মনে হয়। আবার তার মনে হয় পালাই। কিন্তু পালাইয়া কোথায় যাইবে? অনেক মাঠ-ঘাট, পাহাড়, জঙ্গল, বালুয়াড়ি পিছনে অতিক্রম করিয়া আসিয়াছে সে।

আর ফিরিবার পথও তার অজানা।

উৎপলকুমার বসুর কবিতার বই 'কহবতীর নাচ'
উৎপলকুমার বসুর কবিতার বই ‘কহবতীর নাচ’

যাক মধ্যগগনের সূর্য ক্ষেপিয়া উঠিয়া সেইদিন কেন জানি অত্যধিক তাপ বর্ষণ করতেছিল। পানির তৃষ্ণায় যুবকের কণ্ঠ শুকাইয়া ফাটিয়া রক্ত পড়িবার উপক্রম হইল।

যুবক বলিল, গুরু পানি দ্যান, মইরে যাচ্ছি।

আমি পানি দেওয়ার কে? গুরু কইলেন।

ঐ যে একটা গাছ দেখতেছ ঐখানে চল।

ঐখানে কি মধ্যমরুভূমিতে কি জলাশয় আছে? তারা সেই গাছের তলায় গিয়া পৌঁছাইলে গুরু যুবককে কহিল, যাও ঐ গাছের নিকট গিয়া পানি চাও। যুবক প্রথমে ভাবিল এ কোন পাগলা গুরুর পাল্লায় পড়িলাম। গাছ আবার পানি দিব কেমনে!

যুবক বৃক্ষের উদ্দেশ্যে কিয়ৎ গর্জন করিয়া বলিল, গাছ পানি দে।

গাছ কোনো পানি দিল না। গুরুর এহেন মশকরার মাথামুণ্ডু কিছুই যেন বুঝতে পারতেছিল না যুবক। গুরু কহিলেন, তুমি গাছের নিকট হাতজোড় করিয়া মাফ চাও। তাহাকে কেন গর্জনযোগে আদেশ করিয়াছ?

যুবক গাছের নিকট মাফ প্রার্থনা করিল।

গাছ আরজ কবুল করিল।

যুবক বলিল, গাছের নিকট তো কোনো পানি দেখিতেছি না! সে কোথায় পানি পাইবে? আমরা মানুষরা পানি রাখিবার লাগি কত না বাহারি পাত্রাদি নির্মাণ করিয়া থাকি। বৃক্ষের পাত্রগুলিন অতি সূক্ষ্ম। তুমি দেখিতে পাইতেছ না। তোমার চক্ষুর শক্তি অতি ক্ষীণ। এই বলি গুরু যুবকের কানে কানে বলিল, চাহিয়া দেখ, ঐ পত্রসমূহই মূলত পাত্র। তাহাতে জল নিয়া বৃক্ষ তোমার জন্য অপেক্ষা করিতেছে কতকাল।
তুমি দেখিতেছ না কেন?
তুমি বুঝিতেছ না কেন?
যাও তাহার স্নেহে ধন্য হও।

যুবক বৃক্ষকে বলে, হে বৃক্ষ…. হে বৃক্ষ….

হইল না। হইল না। যে তোমার জন্য অপেক্ষমাণ তোমার তৃষ্ণার জল নিয়া তার প্রতি এ হেন অবজ্ঞাসমেত কৃতজ্ঞতা সে গ্রহণ করিবে কেন? গুরু কহিলেন।

যাও গাছের নিকট। অবনত হও অন্তর খরচ কর।

Like সাহিত্য ডটকম on Facebook

বল, আমার এ দুষ্ট তৃষ্ণা নিবারণ লাগি হে বৃক্ষ, তোমার সঞ্চয় থাকি আমাকে তোমার কিছু পত্র দান কর আজ। আর আমার মৃত্যুর পর আমার শরীর থাকি তোমার প্রয়োজনমতো পানি চুষে নিও।

যুবক হৃদয় নিঙড়াইয়া তাই করিল।

গাছ তাকে পুত্রস্নেহে পত্রদান করিল। তৃষ্ণা নিবারিত হইল।

একেই বলে তবে জ্ঞান!

যুবক অবাক হইয়া গুরুর পানে একযুগ চাহিয়া রহিল।

আমরা আড্ডায় সকলে নীরব হইয়া জ্ঞানের গল্প শুনিলাম। জ্ঞান লোকাল কিছু নয়। জ্ঞান জ্ঞানই, আর তা সর্বদা গ্লোবাল। সেই যুবকের মত আমরাও উৎপলের দিকে চাহিয়া রহিলাম সেই দিনের সেই ঘোরলাগা সান্ধ্য আড্ডায় যদিও তা মাত্র কিছুক্ষণ।

(কিস্তি ২)

ওয়েব লিংক

১. উইকিপিডিয়া

২. কবিতা প্রতিমাসে-র ‘উৎপল সন্ধ্যা’: একক কবিতাপাঠ ও উৎপলকুমার বসুর সঙ্গে আড্ডা  (ইউটিউব ভিডিও )