কবি সালমান বুলবুল ও তার দুই স্তন বিশিষ্ট ডিগ্রি কলেজ

আট বছর আগে, ২০০৮ সালে একটা গল্প লিখছিলাম। গল্পটার নাম ছিল ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ। ওই গল্পে কবি সালমান বুলবুল নামে একটা চরিত্র ছিল। গল্পের শুরুতে ছিল ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ স্টেশনের ভৌগোলিক বর্ণনা। যথাযথভাবেই বলা হইছিল স্টেশনটা মূল জনপদ থেকে বেশ-খানিকটা উঁচুতে অবস্থিত। স্টেশনে ওঠা লাগে সিঁড়ি ভেঙে। ঘোড়াশালের মতো ছোট একটা মফস্বল শহরে যে ফ্ল্যাগ ও টান উপাধির মোট দুইটা স্টেশন, সে বিষয়ও উল্লেখ করা হইছিল তখন। কারণ আমি ভাবছিলাম, পাঠক তো এগুলা কিছুই জানে না, আমি যদি সব ভাইঙ্গা না বলি তাহলে তারা বুঝবে কেমনে!

তো, ভৌগোলিক বর্ণনার পর প্রথম দৃশ্যটা ছিল এরকম—“স্টেশনে একটা ট্রেন আইসা থামছে। ট্রেনের নাম চিটাগাং মেইল। সময় রাত বারোটা। তারিখ ২৮ ফেব্রুয়ারি। দুই গাট্টি বই নিয়া স্টেশনে অবতরণ করল কবি সালমান বুলবুল।”

গল্পটা এরকম ছিল যে, এই কবি—সে মূলত ফেনী জেলার বাসিন্দা। নিজের খরচে ঢাকার একটা প্রকাশনা সংস্থা থেইকা নিজের কবিতার বই বাইর করছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিন, মানে বইমেলারও শেষ দিন নিজের দুইশ’ নব্বই কপি (ছাপা হইছিল তিনশ’ কপি) অবিক্রিত বই নিয়া সে ফেনী রওনা করে। ঘোড়াশাল পর্যন্ত আইসা তার মনে হয় এখানে তার আরেক-কবি বন্ধুর বাড়ি, পাশাপাশি এও মনে পড়ে যে এখানে বেড়াইতে আসার জন্য বন্ধুর তরফে অনেক দাওয়াত ছিল তার প্রতি। গল্পে বর্ণিত সালমান বুলবুলের মন ছিল খারাপ। কেননা সারা মাসে মাত্র দশ কপি বই বিক্রি হইছে তার—কবি হিসেবে এটা মাইনা নেয়া তার পক্ষে যথেষ্টই কঠিন ছিল। মানসিকভাবে রুগ্ন এই দশাই তাকে ফেনী ফিরতে গিয়াও অনির্ধারিতভাবে ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ স্টেশনে নামাইয়া দেয়—এমন দাবিই উত্থাপিত হইছিল গল্পে।

tanim-galpo-21

“ট্রেন চইলা যাওয়ার পর দেখা যায় দুইপাশে দুই গাট্টি বইসহ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াইয়া কবি সালমান বুলবুল উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকাইয়া আছে।”

ট্রেন চইলা যাওয়ার পর দেখা যায় দুইপাশে দুই গাট্টি বইসহ প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াইয়া কবি সালমান বুলবুল উদ্বিগ্ন ভঙ্গিতে মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকাইয়া আছে। বন্ধুর নাম্বার বন্ধ। এমন সময় স্টেশন মাস্টার শিকদার মাবুর আবির্ভাব। সালমান বুলবুল তার কাছে জানতে চায় এরপর ফেনী যাওয়ার ট্রেন আর কোনটা আছে।

মাস্টার তারে জানায়, রাতে এই ধরনের কোনো ট্রেন আর নাই। পরের ট্রেন যেটা এখানে থামবে, এবং ফেনীও যাবে—সেটা সকাল দশটায়, কর্ণফুলি এক্সপ্রেস।

হার্ডডিস্ক ক্র্যাশ করার কারণে কোথাও প্রকাশিত হওয়ার আগেই গল্পটার সবধরনের কপি আমি পরের বছরই হারাইয়া ফেলি। এটা মূলত ওই গল্পটারই এক ধরনের পুনর্লিখন। স্টেশন মাস্টার শিকদার মাবুর কাছে কবি সালমান বুলবুল তখন তার পরিস্থিতি বর্ণনা করে, এবং জানতে চায় আশেপাশে কোথাও কোনো থাকার হোটেল আছে কিনা। শিকদার মাবু তারে জানায়, ছোট এই মফস্বলের কোথাও কোনো আবাসিক হোটেল নাই। সালমান বুলবুল তখন স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

কিন্তু শিকদার মাবু গত কয়েক মাসের পরিস্থিতি বিবেচনায় এই মর্মে সালমান বুলবুলকে সাবধান করে যে, রাতে একা একা স্টেশনে থাকাটা ঠিক হবে না। এটা বিপদজনক, চারিদিকে ডাকাতের উপদ্রব!

তাহলে উপায়? সকাল দশটা পর্যন্ত কোথাও না কোথাও তো তাকে থাকতে হবে!

তখন শিকদার মাবু তাকে তার রেলওয়ে কোয়ার্টারের বাসায় এক রাতের গেস্ট হইতে আমন্ত্রণ জানায়। বইয়ের গাট্টিসহ স্টেশন মাস্টারের সঙ্গে রওনা করে ঢাকায় অজনপ্রিয় ফেনী জেলানিবাসী কবি সালমান বুলবুল। স্টেশনের অদূরবর্তী কোয়ার্টারে যাওয়ার সময়, ওই গল্পে স্টেশন মাস্টার শিকদার মাবু সম্পর্কে কিছু বর্ণনা ছিল—যেগুলা এত বছর পর, আইজ আর মনে নাই। তবে একটা বিষয় এমন বলা ছিল যে, কোয়ার্টারে ফিরে রাতের বেলা হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করা নাকি তার দীর্ঘ বিশ বছরের অভ্যাস!

কোয়ার্টারে ফেরার পর, রাত করে এমন একজন অচেনা অজানা লোককে বাসায় ঢোকানোর জন্য স্ত্রী কর্তৃক মৌখিকভাবে লাঞ্ছিত হয় স্টেশন মাস্টার। তবে ওই স্ত্রী, গল্পের যিনি ইম্পর্ট্যান্ট এক চরিত্র—তার নামটা এ মুহূর্তে মনে পড়তেছে না। তখন দেখা যায় তাদের একমাত্র ও ইয়াংবয়সী মেয়ে, যার নামটাও কিনা খাইয়া বইসা আছি—সে, পরিস্থিতি ঠাণ্ডা করে এবং পানি গরম করা হইছে জানাইয়া তার বাপ শিকদার মাবুরে কুয়াতলায় যাইতে বলে। আর ঘাবড়ে যাওয়া অজনপ্রিয় কবি সালমান বুলবুলকে যা কিছু হইল তার জন্য ‘সরি’ বলে ভেতরে ঢুকে যায়।

গল্পে তখন বলা হইছিল যে, মূলত চুলায় বাড়তি ভাত বসাইয়া দিতেই সে ভেতরে যায়। নয়তো স্থানীয় ডিগ্রি কলেজের ছাত্রী হিসেবে নিজ বাসায় আগত একজন কবির সঙ্গে বইসা কিছু কথাবার্তা সে চালাইতেই পারত অনায়াসে।

এরপর যা ঘটে: কুয়াতলা থেইকা গোসল সাইরা শিকদার মাবু ও রান্নাঘর থেইকা ফেরত আসা তার মাইয়া—উভয়েই আবিষ্কার করে সোফার হাতলে মাথা এলায়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন অজনপ্রিয় সালমান বুলবুল। দুয়েকবার ডাক দিলেও সে ওঠে না। ফলে, সোফার কুশনটাই তার মাথার নিচে চালান দিয়া কোনোমতে সোফাতেই তারে শোওয়াইয়া দেওয়া হয়। সে ঘুমায়।

সকালে ঘুম ভাঙলে সালমান বুলবুল টের পায় তার মাথায় পানি ঢালা হইতেছে। এবং সে নড়তে পারতেছে না।

ঘটনা কী!

জানা গেল মারাত্মক রকমের জ্বর উঠছে তার, একশ’ নাকি চার ডিগ্রি! সেই দৃশ্যে দেখানো হয়—মাথায় পানি ঢালতে থাকা মানুষটা হচ্ছে শিকদার মাবুর স্ত্রী—যার নামটা এই মুহূর্তে আমার আর মনে নাই। মানে ব্যাপারটা দেখাইতে চাওয়া হইছিল—গতরাতের সবচেয়ে কর্কশ চরিত্রটাই আসলে সময় মত কতটা মানবিক হইয়া উঠতে পারে—সেটা। মানে অন্যদের মত সেও ভাল আর কি‍!

গল্প দীর্ঘ করার অভিপ্রায়ে আরও অনেক ধরনের ডিটেইল তখন ছিল সেখানে। কিন্তু যেগুলা জাস্ট মনে আছে এখন—সেগুলাই জাস্ট বলতেছি এখন।

তো নিজের এহেন শারীরিক কন্ডিশনে মহা বিব্রত কবি সালমান—কেননা এতে সম্পূর্ণ অচেনা অজানা একটা ফ্যামিলিকে ঝামেলায় ফেলা হইছে। অপরাধবোধ আর লজ্জামাখা চোখে সে ফ্যালফ্যাল কইরা তাকাইয়া থাকে। মৃদুকণ্ঠে জিগায়, কর্ণফুলি ট্রেন কি চইলা গেছে?

ডিগ্রির স্টুডেন্ট তারে বলে—হ, চইলা গেছে। আপনে জ্বরে পড়লেন, আপনারে আর ওঠানো হয় নাই। সুস্থ হইয়া নেন। পরে যাবেন।

বুলবুল দ্বিমত করল, সে চইলা যাইতে চায়।

তখন কর্কশ স্ত্রীও তারে আশ্বস্ত করে—জ্বর কমলে, সুস্থ হইলে পরেই যাও বাবা, অসুবিধা নাই।

অগত্যা সালমানকে শুয়ে পড়তে হয় আবার।

এদিকে রান্নাবান্না চাপানোর অজুহাতে কর্কশ বিদায় নেয়। রুমে রয়ে যায় শুধু সালমান আর ডিগ্রি কলেজ। জানা যায়, জ্বরহেতু সেদিন সে (ডিগ্রি কলেজ) কলেজে যায় নাই। এতে সালমান অভিভূত হয়, এবং লজ্জিতও। যে, “আমার জন্য আপনারা সবাই কত সমস্যায় পড়লেন!”

তখন ডিগ্রি কলেজ তারে বলে—“কবি সাহিত্যিক ধরনের কাউরে এই প্রথম আমি দেখলাম। আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না যে বই বের হয় এমন কারও সঙ্গে সত্যিই কোনোদিন আমার কথাবার্তা হইতে পারে!”

কিন্তু তাদের মধ্যে কথাবার্তা হচ্ছিল। এতে ডিগ্রি কলেজ ছিল আনন্দিত, কিন্তু সালমান বুলবুল অস্বস্তিত। সে তারে বোঝায়—“দেখেন আপনি ভুল বুঝতেছেন। আমি অত বিখ্যাত কোনো কবি-সাহিত্যিক নই। বইমেলায় আমার মাত্র দশ কপি বই বিক্রি হইছে। সম্ভবত এই শোকেই আমার জ্বর উঠছে।”

কিন্তু অবলা নারীর মন! সহসা এমন আত্মসমর্পণে আরও মুগ্ধ হয়—তার মনে হয়, “আহারে!”

ফলে কুয়াতলায় গোসল করতে করতে সালমান বুলবুলের প্রেমে পইড়া যায় ডিগ্রি কলেজ। তার মনে হয় এই প্রথম কোনো পুরুষের (বাপ ছাড়া) চোখ সে দেখল—যে চোখের চাহনি টোটালি পাপমুক্ত।

এটুকু লিইখা মনে হইছিল পুরুষদের চোখে পাপ থাকতে পারে—এমন একটা ঘটনা অতীতস্মৃতি হিসাবে খাড়া করা দরকার ডিগ্রি কলেজের জীবনে। নয়তো গল্পের মোচড়টা ঠিক স্ট্রং হয় না। দ্যান ডিগ্রি কলেজ স্মৃতিচারণায় দেখতে পায়: অনেক দিন আগের একটা ভোর। সে তখন ছোট। ক্লাস থ্রি কি ফোরে পড়ে। অন্যান্য দিনের মতোই রেহেলের ভাঁজে সিপারা নিয়া সে মক্তবে যায়।

কিন্তু সেদিন হুজুর অসুস্থ ছিল কিংবা কুয়াশা এত বেশি ছিল যে মক্তবের অন্যান্য স্টুডেন্টরা কেউ আসে নাই—ফলে, ঘটনাচক্রে ওই হুজুর কর্তৃক তার ধর্ষিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। যেভাবেই হোক উদ্ধার পাইয়া অক্ষত অবস্থাতেই সে ফিরা আসে যদিও, কিন্তু ওই স্মৃতিটা তার জন্য এতই ভয়ঙ্কর হইয়া ওঠে দিনে দিনে যে, পুরুষ জাতটারেই সে ধীরে ধীরে ঘৃণা করতে শুরু করে। এবং তার বাপ শিকদার মাবু ব্যতীত, অন্য যে কোনো পুরুষের চোখেই সে পাপের আকাঙ্ক্ষা দেখতে পায়। এই যখন অবস্থা—তখন একমাত্র ব্যতিক্রম অজনপ্রিয় এই কবির প্রেমে পড়া ছাড়া ডিগ্রি কলেজের আর কী-ই বা করার থাকে?

তখন আর কী যেন হয়… হ্যাঁ, প্রেমে পড়ে। প্রেমে পইড়া কী করা উচিৎ—ভাবে।

রুমে আইসা দেখে সালমান বুলবুল তখনও ঘুমাইতেছে। কিন্তু সে আসলে ঘুমাইতেছিল না, ঘুমের ভান ধইরা পইড়া ছিল এবং রুমে কেউ ঢুকছে টের পাইয়া সে উইঠা বসে। তাদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় কিছু কথাবার্তা হয়। তার ব্যাপারে ডিগ্রি কলেজের ব্যাপক আগ্রহ, একটু সাইরা উঠলেই ডিগ্রি কলেজ তারে নিয়া পার্শ্ববর্তী শীতলক্ষ্যা নদীতে নৌকা নিয়া ঘুরতে যাইতে চায় ইত্যাদি। কিন্তু সালমান বুলবুল মোটামুটি একই কথা পাইড়া যাইতে থাকে, সে এ ব্যাপারে খুবই লজ্জিত যে তাকে অসুস্থ হইয়া এইখানে এইভাবে পইড়া থাকতে হইতেছে।

তো যেটা হয়। ডিগ্রি কলেজ সালমান বুলবুলকে জানায় যে, সে তার একটা বই পাইতে চায়, পড়বে। কিন্তু কবিতা ও লেখালেখির প্রশ্নে কবি সালমান বুলবুল অব্যাহতভাবে সংকুচিত হইয়া থাকে। সে বলে, “আরে ধুর, ওইগুলা পড়ার কিছু নাই, ফালতু ফালতু…।”

ডিগ্রি কলেজ বুঝতে পারে মেলায় তেমন বিক্রি হয় নাই জন্য এ বই নিয়া কবি হীনমন্ম্যতায় ভুগতেছে। সে তখন বলে, ‘মেলায় বিক্রি হয় নাই তো কী হইছে, সারাবছর বিক্রি হইত! আপনে সব বই নিয়া আসলেন কেন?’ তখন সালমান বুলবুল এইমর্মে দীর্ঘশ্বাস ফেলায় যে, বইগুলা নিয়া আসতে তো প্রকাশকই তারে বাধ্য করছে। এ তথ্যটাও ডিগ্রি কলেজরে জানাইয়া দিবে কি দিবে না—ভাবতে ভাবতে সে আবারও ঘুমায় পড়ে (যেহেতু অনেক জ্বর, যে কোনো অবস্থায় তাকে ঘুম পাড়ায়ে দেওয়া যাচ্ছিল)।

সেই ঘুমই যখন তার ভাঙে আবার, সেটা বেশ নাটকীয়ভাবে। এতই যে চোখ খুইলাই আবার তাকে তা বন্ধ কইরা ফেলতে হয়। সে দেখে গতরাতের ওই কর্কশ মহিলা, সকালেই আবার যার মমতাময় অস্তিত্বের সাক্ষাৎ পাওয়া গেছিল, সে মহিলা তার আলনায় ঝুলাইয়া রাখা প্যান্টের পকেটে কী যেন খুঁজতেছে!

মিটিমিটি খোলা চোখে সে ঘটনাটা পর্যবেক্ষণ করে, দেখে ওই মহিলা তার পকেট থেকে কিছু টাকা নিয়া নিজের ব্লাউজের ভিতর ঢুকাইতেছে। এই দৃশ্য সে আর না দেখতে চাইয়া মুহূর্তেই চোখ বন্ধ করে আবারও ঘুমের ভান ধরে।

কর্কশ রুম থেকে বিদায় নেওয়ার পর চোখ খুইলা জানালার বাইরেও সে ওই মহিলারেই দেখে, দেখে ওই মহিলা দোকানদার গোছের এক লোকেরে পকেট থেইকা চুরি করা টাকাগুলি দিতেছে, আর বলতেছে বাকি টাকাগুলাও খুব শীঘ্রই দিয়া দিবে।

এ থেইকা সে বুইঝা নেয় দরিদ্রতা এই ফ্যামিলিটিকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ায়ে ধরছে, যার ফলে অতিথির পকেট থেইকাও টাকা চুরি করতে হইতেছে। এটারে সে আক্রান্তের জায়গা থেইকা না নিয়া বরং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেইকাই নেয়, ভাবে—“আহা, কতটা জরুরত হইলে এ কর্ম করতে হইতে পারে!” এবং তার মনে হয় এত একটা গরিব ফ্যামিলিতে সে কিনা গলার আটকানো কাঁটার মত দুইটা দিন পার কইরা দিতেছে!

নিজের প্রতি তার রাগ হয়। তথাপি ডিগ্রি কলেজ আইসা ঘরে ঢোকে, আর জানাইয়া দেয় যে, অভাবে তার মায়ের স্বভাব নষ্ট হইয়া গেছে। এও জানায়, এই মুহূর্তে তার মায়ের এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। কথা দেয় এখান থেকে যাওয়ার আগেই মায়ের সরানো টাকাটা সে আবার তার পকেটে ঢুকাইয়া দিবে। সালমান বলে, সেটার দরকার নাই। আমি আজকেই চলে যাব, রাতের ট্রেনে।

এমতাবস্থায় পড়িমরি কইরা ঘরে ঢোকে ডিগ্রি কলেজের বাপ স্টেশন মাস্টার শিকদার মাবু। আইসাই সে ঘরভর্তি বমি করে। এবং নিঃশ্বাস নিতে পারতেছে তো পারতেছে না ভঙ্গিতে ফ্যাশফ্যাশ কইরা জানায়, ডিগ্রি কলেজের বান্ধবী—ধরা যাক হীরামতি; সে নাকি ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ স্টেশনে মহানগর গোধূলি ট্রেনের নিচে আত্মহত্যা করছে। চোখের সামনেই ঘটনা ঘটে, ফলে কাটা ছেঁড়া লাশ দেইখা তার বমি হয়। এবং সে এইমর্মে অসুস্থ হইয়া পড়ে যে, “বমির সঙ্গে এগুলা কী বাইর হয়? বমির সঙ্গে এগুলা কী বাইর হয়?”

স্তম্ভিত ডিগ্রি কলেজ কী করবে বুঝতে না পাইরা কিছুই না কইরা দাঁড়াইয়া থাকে। ছুটে আসে কর্কশ, স্নেহশীল এবং চোর মহিলাটি। “হীরামতি আত্মহত্যা করল কেন! কী হইছিল তার?” ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া সালমান বুলবুলও খাটের একটি কোণা থেকে চোখ তুলে মিন মিন করে জানতে চায়, কী হইছিল তার?

তখন শিকদার মাবু বলে, সকালের ট্রেনে হীরামতিকে সে ঘোড়াশালে আইসা নামতে দেখে। খবরাখবর জিজ্ঞেস করতেই কান্নাকাটি। শ্বশুরবাড়িতে নাকি নানা অশান্তি তার। রাগ কইরা বাপের বাড়ির উদ্দেশ্যে চইলা আসছে। এরপর হীরামতি স্টেশন থেইকা বাইর হয়ে যায়। কিন্তু বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে আবার ফেরত আসে। ঘটনা কী? ঘটনা হইল, বাপের বাড়ি থেইকাও নাকি তারে বাইর কইরা দিছে। এ নিয়া আবারও কান্নাকাটি। শিকদার মাবু তো দয়ালু, এটা আমরা তার সালমান বুলবুলরে ঘরে নিয়া আসা দিয়াই বুঝতে পারব। ফলে হীরামতিকে সে কেক আর ফান্টা খাওয়ায়। এবং সান্ত্বনা দেয় যে, ভয় নাই। সমাজে দশজন লোক আছে, তারা নিশ্চয়ই এর একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান করবে।

কিন্তু এরমধ্যেই হুট করে ওইপার থেকে ব্রিজে ওঠে মহানগর গোধূলি ট্রেন। তখনই তার মনটা একবার কেন যেন মোচড় দিছিল, বুঝতে পারে নাই। ট্রেন স্টেশনে ঢোকামাত্রই দৌড়াইয়া গিয়া সেটার নিচে পড়তে হইল মেয়েটারে। বলতে বলতে শিকদার মাবু হাঁচি দিলেন দুইটা। তারপর কিছুক্ষণ চুপচাপ। আবার হাঁচি দিলেন, এবার টানা কয়েকটা, পাঁচটা তো বটেই।

গল্প তখন এমন একটা জায়গায় যে, এরপর কী ঘটবে আমি তো কিছুই জানি না। বিরাট টেনশনে পইড়া গেলাম। এদিকে ঘরভর্তি বমির মধ্যে শিকদার মাবুই বা আর কত হাঁচি দিবেন ভাবতেছি। কিন্তু মনে হইল যে, আরও কিছুক্ষণ ভাবা দরকার। ফলে শিকদার মাবু আরও কিছু হাঁচি দিলেন।

সবচে বড় ব্যাপার হলো যে, যখন আর কী করা যায় ভাবতেছি, তখন ডিগ্রি কলেজ আর কর্কশের চিল্লাহাল্লায় গল্পে ফিইরা দেখি, নিজের করা বমির মধ্যে অজ্ঞান হইয়া পইড়া আছে শিকদার মাবু। কর্কশ তখন কবি সালমান বুলবুলের দিকে করুণ চোখে চাইল, মানে সে বলতে চায়, সালমান বুলবুল যেন বাইরে গিয়া বেবি টেক্সি কিছু একটা ঠিক কইরা আনে—শিকদার মাবুরে তো হাসপাতালে নিতে হবে। ডিগ্রি কলেজও একই রকম আর্তি নিয়া তার দিকে তাকায়।

“আমি দেখি বেবি টেক্সি নিয়া আসি, হাসপাতালে নেওয়া দরকার,” বইলা উইঠা দরজার দিকে যাওয়ার মুহূর্তে বমিতে পিছলা খাইয়া সালমান বুলবুল গিয়া ডিগ্রি কলেজের বুকের মধ্যে পড়ে। কিন্তু তাতেও সে আরও আরও পইড়া যাইতে থাকায় ডিগ্রি কলেজের কামিজের গলার দিকের অংশটাকে আরও আরও আকড়াইয়া ধইরা রাখে। এতে করে যা হয় কবি সালমান বুলবুলের জন্য তা বিশেষভাবে যৌন উদ্দীপক। এবং সে ভাবে। যে, এতসব ঝামেলার কী দরকার। তারচেয়ে একটামাত্র ঝামেলা কইরাই যদি রক্ষা পাওয়া যায়? ফলে সে অন্যায়ভাবে ডিগ্রি কলেজের হঠাৎ খুলে যাওয়া স্তনের বোঁটায় দুইটা চুমা দিয়ে আস্তের-ওপর দরজার দিকে আগায়। সে ভাবে সে পালাইতেছে।

কিন্তু কর্কশ মহিলাটি শিকদার মাবুকে নিয়েই ব্যস্ত থাকায় এসব কিছুই লক্ষ্য করে না। আর ডিগ্রি কলেজ মক্তবেই ঘটতে পারত টাইপের ঘটনাটা সালমান বুলবুলই ঘটাইয়া দিছে সত্ত্বেও তাকে ডাক দেয়। বলে বেবি টেক্সি একটা কিছু নিয়ে যেন তাড়াতাড়ি ফিইরা আসে সে। এতে আরও ঘাবড়াইয়া বেবি টেক্সি নিয়া কবি সালমান বুলবুল সোজা ঘোড়াশাল ফ্ল্যাগ স্টেশনে চইলা যায়। এবং গিয়া সে জানতে পারে যে, শিকদার মাবু বর্ণিত কোনো ঘটনাই এখানে ঘটে নাই। নো আত্মহত্যা, নো ট্রেনে কাটা পড়া। সকলেই জীবিত। বরং শিকদার মাবু বইলাই কেউ নাই। একজন তো হাউমাউ করে উঠল! “আপনি হয়তো জানেন না, এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় এই স্টেশন জ্বালাইয়া দেওয়া হইছিল। তারপর থেকে এ স্টেশনে কোনো স্টেশন মাস্টার নাই।”

সেক্ষেত্রে এই এলাকায় কি কোনো ডিগ্রি কলেজও নাই? নাই ডিগ্রি কলেজের উপচানো উপচানো স্তন?—ইত্যাকার দ্বিধা ও বিহ্বলতা নিয়ে নিরুপায় সালমান বুলবুল তখন আমারে কল দেয়। বলে, আপনার নানার বাড়ি না ঘোড়াশালে?

হ্যাঁ আমার নানার বাড়ি ঘোড়াশালে।

আচ্ছা এখানে কি কোনো ডিগ্রি কলেজ আছে?

অর্থাৎ ঘোড়াশালে?

হ্যাঁ হ্যাঁ!

দুই স্তন বিশিষ্ট?

হ্যাঁ! আরে, আপনিই কি এ গল্পের লেখক তো নয়?

আমি মৃদু হেসে বললাম, “হ্যাঁ হ্যাঁ আমিই তো এ গল্পের লেখকই হই।”

“আমাকে বাঁচান প্লিজ। আমার বইগুলা সব ওই বাসায় রাইখা আসছি বস।”

“তা ঠিক আছে। কিন্তু ওইসব তো আট বছর আগের কথা।” আমি বলি।

“এটা আপনি কী বলেন ভাই… হ্যালো ভাই… কথা বলেন… শোনেন শোনেন…।”

এমনই একপ্রকারের শেষ করতে না পারা বাক্যের মধ্যে লাইন কাইটা কবি সালমান বুলবুলের নাম্বারটা আমি ব্লক কইরা দিই। তবে যেহেতু সে বিপদে পড়ছে, এবং আরও কিছু ফোন তারে করতে হইতে পারে। সে হেতু, আমি তারে কিছু টাকা ফ্লেক্সি কইরা দিই। এই হলো ব্যাপার।

গল্প

About Author

তানিম কবির
তানিম কবির

জন্ম ফেনী জেলার পরশুরাম-বিলোনীয়া এলাকায়। কবিতা ও গল্প লেখেন। প্রকাশিত কবিতার বই তিনটি, ‘ওই অর্থে’ (শুদ্ধস্বর ২০১৪), ‘সকলই সকল’ (শুদ্ধস্বর ২০১৫) ও 'মাই আমব্রেলা' (আদর্শ ২০১৬) এবং একটি গল্পের বই 'ইয়োলো ক্যাব' (ঐতিহ্য ২০১৬)। সম্পাদনা করেন দৈনিক ভোরের পাতার সাপ্তাহিক সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘চারুপাতা’। এর আগে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ ও প্রিয়.কমে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রকাশিতব্য বই, ‘ঘরপলায়নসমূহ’ (ফেব্রুয়ারি ২০১৭) ফেসবুক পেজ: ফেসবুক পেজ: Tanim Kabir (Writer)