Pages Menu
TwitterRssFacebook
Categories Menu

Posted by on Jul 11, 2018 in গল্প | Comments

কী আশা করা যায় আমাদের থেকে

কী আশা করা যায় আমাদের থেকে

চায়নিজ বংশোদ্ভূত আমেরিকান লেখক টেড চিয়াং (জন্ম : ১৯৬৫) কালেভদ্রে লেখালেখি করেন। ব্রাউন ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পাশ করার পর সায়েন্স ফিকশন ও ফ্যান্টাসি লেখকদের ওয়ার্কশপ “ক্ল্যারিয়ন” থেকে গ্র্যাজুয়েট করেছিলেন ১৯৮৯ সালে। এখনো পর্যন্ত যা লিখেছেন, তার সবই সায়েন্স ফিকশন আর ফ্যান্টাসি জনরার। একটি সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে টেকনিক্যাল রাইটার হিসাবে চাকরি করছেন। তার নভেলা ‘দ্য স্টোরি অফ ইওর লাইফ’ অবলম্বনে ২০১৬ সালে ‘অ্যারাইভাল’ নামে একটি সিনেমা বানানো হয়।

টেড চিয়াং

এই ছোটগল্পটি ব্রিটিশ সায়েন্স জার্নাল ‘নেচার’ এ প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৫ সালে।

হোয়াট ইজ এক্সপেক্টেড অফ আস

টেড চিয়াং

অনুবাদ : আয়মান আসিব স্বাধীন


সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন…

এটা একটা ওয়ার্নিং। সবাই প্লিজ মনোযোগ দিয়ে পড়বেন।

এতদিনে আপনারা ‘প্রেডিক্টর’ দেখেছেন নিশ্চয়ই। এ লেখাটা যখন পড়ছেন, ততদিনে কয়েক মিলিয়ন প্রেডিক্টর বিক্রি হয়ে যাওয়ার কথা। যারা এখনো দেখেন নাই, তাদের জন্য বলে রাখি—প্রেডিক্টর হল ছোট একটা ডিভাইস; আপনার গাড়ির দরজা খোলার জন্য যে রিমোট থাকে, ওইরকম সাইজের অনেকটা। ডিভাইসটাতে শুধু একটা বাটন আর একটা এলইডি লাইট আছে। বাটন চাপ দিলে লাইট জ্বলে। আরেকটু ভাল করে বললে, বাটন চাপ দেওয়ার ঠিক এক সেকেন্ড আগে ওই লাইট জ্বলে।

অনেকে বলে, প্রথম প্রথম প্রেডিক্টর ব্যবহার করলে মনে হয় অদ্ভুত কোনো গেম খেলছেন আপনি। যে গেমের মেইন টার্গেট হল লাইট জ্বলার পরে বাটনে চাপ দেওয়া। সোজা একটা গেম। কিন্তু একটু চেষ্টা করলেই বুঝতে পারবেন, এ খেলার নিয়ম ভঙ্গ করা সম্ভব না। লাইট দেখার আগেই বাটনে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেন—দেখবেন, সাথে সাথে লাইট জ্বলে উঠবে। আর যত তাড়াতাড়িই হাত চালান না কেন, লাইট জ্বলার পর এক সেকেন্ড পার হওয়ার আগে কোনোভাবেই ওই বাটনে চাপ দিতে পারবেন না। আপনি হয়ত লাইটের জন্য অপেক্ষা করে আছেন, লাইট জ্বললেও যাতে বাটনে চাপ দেওয়া না লাগে। কিন্তু লাভ নাই, ওভাবে কখনো লাইট জ্বলবে না। যাই করেন না কেন, বাটনে চাপ দেওয়ার আগেই লাইট জ্বলবে। প্রেডিক্টরকে বোকা বানানোর কোনো উপায় নাই।

প্রেডিক্টর এমন একটা সার্কিট দিয়ে কাজ করে যেখানে নেগেটিভ টাইম ডিলে দেওয়া আছে। এর মাধ্যমে অতীতে একটা সিগনাল পাঠানো হয়। নেগেটিভ ডিলে যদি এক সেকেন্ডের বেশি করা যায়, তাহলে এই প্রযুক্তি দিয়ে আর কী কী করা সম্ভব তা পরবর্তীতে আরো ভাল করে বোঝা যাবে। কিন্তু এই ওয়ার্নিংয়ের উদ্দেশ্য সেটা না। আপাতত যে সমস্যা দেখা যাচ্ছে তা হল, প্রেডিক্টর আমাদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে যে আমাদের ফ্রি উইল বলে কিছু নাই।

ফ্রি উইলের ধারণাটা সম্পূর্ণ আমাদের বিভ্রম কিনা সে বিষয়ে সবসময়ই বিতর্ক ছিল, পদার্থবিজ্ঞান কিংবা যুক্তিবিদ্যার উপর ভিত্তি করে সেই বিতর্ক চলেছে। ফ্রি উইল না থাকার যুক্তি যে অখণ্ডনীয়, সে ব্যাপারে বেশিরভাগ মানুষ একমত হলেও এর সিদ্ধান্তটা মানতে কেউ রাজি হয় না। কারণ আমাদের ফ্রি উইলের অনুভূতি এত শক্তিশালী যে, কোনো যুক্তি দিয়েই তা খারিজ করা সম্ভব হয় নি। সেক্ষেত্রে দরকার ছিল চাক্ষুষ প্রমাণের, আর প্রেডিক্টর ঠিক সেই কাজটাই করছে।

প্রেডিক্টর হাতে পাওয়ার পর একজন মানুষ প্রথমে বেশ কয়েকদিন অস্থিরভাবে ডিভাইসটা নিয়ে খেলে। বন্ধুদেরকে দেখায়, নানা ধরনের ফন্দি দিয়ে প্রেডিক্টরকে বোকা বানানোর চেষ্টা করে। একসময় হয়ত ডিভাইসটার উপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে সে, কিন্তু এর অর্থটা ভুলে থাকতে পারবে না। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এক অপরিবর্তনীয় ভবিষ্যতের আশঙ্কা তাকে আঁকড়ে ধরে। কয়েকজন তো ধরেই নেয়, তাদের স্বাধীন ইচ্ছার কোনো প্রভাব নাই। তাই তারা কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেয় না। হারমান মেলভিলের গল্প ‘বার্টলবি দ্য স্ক্রিভেনার’ এর মত বহু সংখ্যক মানুষ সব রকমের স্বতঃস্ফূর্ত কাজ থেকে বিরত রাখে নিজেদের। প্রেডিক্টর নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেছে এমন লোকদের তিন ভাগের এক ভাগকে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, কারণ তারা নিজে থেকে খাওয়াদাওয়া পুরা বাদ দিয়ে দেয়। এর সর্বশেষ পর্যায় হল অ্যাকাইনেটিক মিউটিজম—এক ধরনের কোমা। কোমায় চলে যাওয়া এসব মানুষ চোখ দিয়ে চারপাশের গতিবিধি লক্ষ রাখে, আর মাঝে মাঝে শুধু এপাশ-ওপাশ করে। এর বেশি কিছু না। নড়াচড়া করার ক্ষমতা থাকে, কিন্তু মোটিভেশন চলে যায় তাদের।

প্রেডিক্টর নিয়ে খেলা শুরুর আগে অ্যাকাইনেটিক মিউটিজম খুবই কম দেখা যেত। ব্রেইনের সামনের দিকের সিঙ্গুলেট অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাধারণত এ সমস্যা দেখা দেয়। কিন্তু ব্যাধিটা এখন পুরোদমে প্লেগের মতো ছড়িয়ে পড়ছে; যেন মস্তিষ্কের বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো প্লেগ । একসময় মানুষ ভাবত, এমন কোনো চিন্তা কি আছে যা চিন্তাকারীকে ধ্বংস করে দিতে পারে? লাভক্র‍্যাফটিয়ান কোনো হরর? বা গোডেলের কোনো উপপাদ্য যা মানুষের লজিক্যাল সিস্টেম ভেঙে ফেলে? শেষ পর্যন্ত দেখা গেল, যে আইডিয়া মানুষকে বিকল করে দিতে পারে, আমরা অনেক আগেই সেটার মুখোমুখি হয়েছিলাম: ফ্রি উইলের অস্তিত্ব না থাকার আইডিয়া। আপনি যতদিন বিশ্বাস আনেন নি, ততদিন এ চিন্তা আপনার কোনো ক্ষতিও করতে পারে নাই।

রোগীরা যতক্ষণ পর্যন্ত কথা বলে, ডাক্তাররা তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। তাদের যুক্তি হল, আমরা তো আগে সুখে-শান্তিতে সক্রিয় একটা জীবন কাটিয়েছি, অথচ তখনও তো আমাদের ফ্রি উইল ছিল না। তাহলে এখন আমাদের লাইফস্টাইল বদলানোর দরকার কী? একজন ডাক্তার হয়ত বললেন, “গত মাসে আপনি যে কাজ করেছেন, সেখানে যেমন আপনার ফ্রি উইল ছিল না, তেমনি আজকের কোনো কাজের উপরও আপনার কোনো ফ্রি উইল নাই।” প্রায় সব রোগীর তখন একটাই উত্তর, “কিন্তু তখন তো আমি এটা জানতাম না। এখন জানি।” কেউ কেউ তারপর আর কখনও কোনো কথা বলে না।

কয়েকজন হয়ত যুক্তি দেখাবে, প্রেডিক্টর আমাদের আচরণে যে এই পরিবর্তন আনে—তাতেই প্রমাণিত হয় আমাদের ফ্রি উইল আছে। কারণ কোনো রোবটকে নিরুৎসাহিত করা সম্ভব না। মুক্তভাবে চিন্তাশীল কোনো সত্ত্বাকেই কেবল নিরুৎসাহিত করা যায়। কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তি অ্যাকাইনেটিক মিউটিজমে আক্রান্ত হয়, সবাই হয় না। এর মাধ্যমে বরং আমাদের নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরো স্পষ্ট হয়েছে।

তবে দুঃখজনক ব্যাপার, এই যুক্তিতে খুঁত আছে। কারণ আমাদের যেকোনো ধরনের আচরণই ডিটারমিনিজম বা পরিণামবাদের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। একটা পরিবর্তনশীল সিস্টেম এমন একটা জায়গায় থাকতে পারে যেখানে অনেকগুলি আকর্ষণ-বিন্দু আছে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে একটা নির্দিষ্ট বিন্দুতে পৌঁছানোর পরে সিস্টেমটা হয়ত শেষ হয়ে যাবে। আবার এমনও হতে পারে, কোনো একটা সিস্টেম একই জায়গায় অনির্দিষ্ট সময় ধরে বিশৃংখল আচরণ প্রদর্শন করছে। এরা উভয়ই কিন্তু পুরোপুরিভাবে পরিণামবাদী।

আমি এই ওয়ার্নিংটা পাঠাচ্ছি ভবিষ্যৎ থেকে; আপনাদের হিসাবে এক বছরের একটু বেশি। যেসব সার্কিটে মেগাসেকেন্ড রেঞ্জের নেগেটিভ টাইম ডিলে আছে, সেগুলি দিয়ে কমিউনিকেশন ডিভাইস বানানোর পর এটাই হবে ভবিষ্যত থেকে অতীতে পাঠানো প্রথম বড় সাইজের কোনো মেসেজ। এরপরে আরো মেসেজ পাঠানো হবে, সেখানে অন্যান্য ইস্যু নিয়ে আলোচনা থাকবে।

এখনকার মতো আপনাদের জন্য আমার মেসেজ হল: আপনারা প্লিজ ফ্রি উইলের ভান করে থাকেন। এমন আচরণ করেন, যাতে মনে হয় আপনাদের সব সিদ্ধান্তের দাম আছে, যদিও আপনারা জানেন সেগুলি কোনো প্রভাব ফেলবে না। বাস্তবতার কোনো তাৎপর্য নাই, বরং আপনার বিশ্বাসের গুরুত্ব আছে। শুধুমাত্র সেই মিথ্যার প্রতি বিশ্বাস আনলেই কোমায় যাওয়া থেকে নিজেকে আটকে রাখতে পারবেন আপনি। সভ্যতা এখন আত্মপ্রবঞ্চনার উপর নির্ভরশীল। হয়ত সবসময় তাই ছিল।

যেহেতু ফ্রি উইল একটা বিভ্রম, কাজেই কে অ্যাকাইনেটিক মিউটিজমে আক্রান্ত হবে আর কে হবে না—তার সবই পূর্বনির্ধারিত। আমি জানি, কিছুই করার নাই আপনার। প্রেডিক্টর কার উপর কীরকম প্রভাব ফেলবে, সেই সিদ্ধান্ত আপনার হাতে নাই। আপনাদের মাঝে কেউ কেউ হয়ত আক্রান্ত হবেন, আবার অনেকে বেঁচে যাবেন। আমি এই ওয়ার্নিং পাঠালেও সেই অনুপাতে কোনো পরিবর্তন হবে না। তাহলে আমি কেন এই মেসেজ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলাম?

কারণ এই সিদ্ধান্ত আমার হাতে ছিল না।