Pages Menu
TwitterRssFacebook
Categories Menu

Posted by on Dec 13, 2014 in বই | Comments

কেমন হইতে পারে বাংলার ইসলাম, একটি জসিম উদ্‌দীন প্রস্তাবনা

কেমন হইতে পারে বাংলার ইসলাম, একটি জসিম উদ্‌দীন প্রস্তাবনা

বছির বলিল, ‘‘বাই। একদিন আমাগো দিন আইব। গরীবের দিন, না খাওয়া ভুখাফুকা মানষির দিন আইব। তোমরা এখানে থাইকা ইসলামী শিক্ষা লও। আমি ইংরাজী শিহি। তারপর উপযুক্ত হয় আমরা এমন সমাজ গঠন করব সেহানে দুঃখিত লোক থাকপি না।—বোবা কাহিনী, জসীম উদদীন (১৯৬৪)

কেউ ‘ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং’ তুলে খাবে আর ‘হাজার হাজার লোক না খায়া মরবি’ এ সমাজ ব্যবস্থা বছির ভাঙতে চায়। বছির কে তা জানার আগে আমরা আজাহের সম্পর্কে জানি।

আজাহের বছিরের বাপ। হতদরিদ্র এক কৃষক, বলতে হবে মুসলমান কৃষক। ‘বাঙালি মুসলমান’ বললে আরও সুবিধা হয় বোঝার জন্য। যদিও নামাজ পড়ে না, কোরআনের কালামও সঠিকভাবে সে বোঝে না, পড়তে জানে না— জসীম উদদীনের বোবা কাহিনী নামের উপন্যাসে আজাহের এসব বিষয়ে পারঙ্গম না। জাতে মুসলমান এই আজাহের নিজের বাপ-মা সম্পর্কেও জানে না। নিজের যে কতক পরিচয়ের বিষয়ে সে সজাগ তার একটি মুসলমান, অন্যটি কৃষক। তার জীবনের অতীতে কেবল এক ‘অন্ধকার’। অন্ধকার মানে সেখানে কিছু নাই তা না। আছে, কী আছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে অনেক কিছু থাকতে পারে, আজাহের যে কেউ হতে পারে। আজাহেরকে চিনতে হলে, তার পূর্বপুরুষদের জানতে হলে এ অন্ধকারে খুঁজতে হবে। এ অন্ধকার গর্ভের মত মনে হয়। জসীম কিন্তু বলেন নাই এই অন্ধকার কী।

আলোর বিপরীতে আরেক অন্ধকার আজাহেরের জীবনে আছে। চারিদিকে সে প্রতারিত, বেরহম দশায় পতিত, তার বদ-নছিবে কেবল যন্ত্রণা। পরে যখন আজাহের গতরে খেটে কিছু পয়সা জমায়, অন্যের দয়ায় ভিটা গড়ে, বিয়া করে, বাচ্চা পয়দা করে, তখনও সেই অন্ধকার তাকে ছাড়ে না।

boba kahini1

উপন্যাস: বোবা কাহিনী; লেখক: জসীম উদদীন; প্রথম প্রকাশ: ১৯৬৪; দাম: ১৮০; পলাশ প্রকাশনী

আজাহেরের বাবা-মা অথবা বংশ পরিচয়ের দরকার হয় না। ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে সে নিজেকে জানতে পারে গতর-খাটা মানুষ হিসেবে। তার টনক বেশ খাড়া, ইনসাফের সমাজ চায় সে। এমন তো অনেকেই চায়। এতে আলাদা কিছু তো নাই। ফলে এ আজাহের আসলে যে কেউ। একের ভেতর অজস্র মুখ বোবা কাহিনী উপন্যাসের পিতা। এটা জসিমের প্রথম সিদ্ধান্ত যে সকল নিপীড়িত, কৃষক বা মুসলমান এক। কার্ল মার্ক্সও এটা আমাদের জানাইছেন, জসীমও জানাইলেন। ফলে উপন্যাসের বিচারে আজাহের অনুল্লেখযোগ্য হতে পারেন, পলিটিক্যালি তার এই কমন ফেস জরুরি।

বাংলা ভূখণ্ডের এই কমনদের জীবনে অন্ধকার কায়েম করে কারা? এদের একজন শরৎ সাহা। আরও অনেক ‘সাহাদের’ মত তিনি। এক সময় শান-শওকত ছিল, জমিদারি ছিল, এখন আর তা নাই। ‘পূর্বে সাহারা ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য দেশে-বিদেশে গমন করিত।’ মালামাল পরিবহনে সাহারা বেশ লাভ করত। সেই লাভের টাকা দেশেই আসত। ফলে দেশেরও উন্নতি হত। কিন্তু পরিস্থিতির বদল ঘটল। কেন? জসীম উদদীন সেই তাফসিরও রাখছেন। ‘কিন্তু কিসে কি হইয়া গেল!’ সাহারা আরাম প্রিয় হয়ে গেল। তাহাদের বাণিজ্য-ভার ‘বিদেশী মাড়োয়ারী’ এবং অন্যান্য ‘জাতির উপর পড়িল’। ‘বাংলার সাহা সমাজ কুসিদজীবীতে পরিণত হইল’। মানে পলিটিক্যালি এখানকার হিন্দুরা অন্যের উপর নির্ভর হয়ে পড়ল। তারা পরাস্ত হল নানাভাবে। রাজ্য হারালেও সামাজিক জবরদস্তি থেকে বিরত হল না শুরুতেই।

কিন্তু নিছক রাজনীতি সচেতনতার অভাবকে কারণ মানছেন না জসীম। ধর্মীয় ছুঁৎমার্গ এড়াতে না পারাকেও জানছেন সাহাদের পতনের কারণ হিসেবে। “সাহারা এই অঞ্চলে সবচাইতে অবস্থাসম্পন্ন জাতি, কিন্তু পানীয় জলের জন্য মুসলমানদের মত তাহারা বাড়িতে টিউবওয়েল বা পাতকুয়া বসায় না। তাহাদের মেয়েরা নদী হইতে জল লইয়া আসে। সেই জন্য গ্রামে কলেরা হইলে আগে সাহা পাড়ায় আরম্ভ হয়। নানা রকমের সংক্রামক রোগে তাই ধীরে ধীরে উহাদের বংশ লোপ পাইতে বসিয়াছে।” কিন্তু তারপরও টিকিয়া থাকা সাহাদের পাতা ফাঁদে জর জর জীবন আজাহেরদের। কারণ তারা এর চেয়েও দুর্বল সামাজিকভাবে। মুসলমানরা ক্ষমতায় আছে হয়ত, তবে তারা আজাহেরদের স্বার্থ দেখে না। সে আলাপ পরে আছে।

সাহারা সুদে টাকা খাটায়। মিথ্যা ছলনায় ‘অশিক্ষিত’ মুসলমানদের ঠকায়। বিয়ের জন্য আজাহের এই সাহার কাছ থেকে টাকা ধার করে। পরে গায়ে খেটে, পাট বেচা পয়সায় সেই সুদ মিটাতে গেলে সাহা তারে আরও এক খণ্ড জমি কেনার সুযোগ করে দেয়। মাত্র আশি টাকায় চার বিঘা জমিন মুখে মুখে বেচা হয়। টাকা তো দিল আজাহের কিন্তু “না লইল কোন রসিদ পত্র, না রহিল কোন সাক্ষী-সাবুদ!” পরে এই সাহা আজাহেরের চারবিঘা জমি কেড়ে খান্তি দেয় না, ভিটা-বাটি থেকেও তারে উচ্ছেদ করে। দারোগার সহযোগিতায়। এই দারোগা ইংরেজ দারোগা। সাম্রাজ্য হারা সাহারা ইংরেজদের সহযোগিতায় মুসলমানদের দমায়ে রাখল। ইতিহাস এভাবে লিখেছেন জসীম।

এই দুই তরফের শক্তির সঙ্গে পারে না আজাহের। পনের টাকার সুদ কতবার মিটাইল সে হিসাব রাখার যোগ্যতা আজাহেরের হইল না। লেখাজোখার হিসাব গরীবদের নাই। মানুষের উপর তাদের ঈমানটাই যথেষ্ট। এতে আপত্তি আছে জসীমের। তিনি চান ঈমান ও শিক্ষা, একেবারে ইংরেজি শিক্ষা।

এই এক জাতের প্রতিপক্ষ আজাহেরের জীবনে অন্ধকার নামাইছে। আরেক জাতের লোক এই গরীব কৃষকদের ঠকায়। এদের পরিচয় পাওয়া যায় উপন্যাসের অর্ধেক যাওয়ারও পরে। এরা মুসলমান, ‘মোল্লা শ্রেণীর’ লোক। সহি ইসলামের নামে তাদের ফতোয়াগিরি বিষয়ে পরে আলাপ করব।

Jasimuddin21w

লেখক হেনরি মিলারের সঙ্গে জসীম উদ্‌দীন, ১৯৬২ সালে, স্কটল্যান্ডের এডিনবরায়, আন্তর্জাতিক লেখক সম্মেলনে। ছবি. Alan Daiches

এখন শরৎ সাহাকে চিনবার আগে আজাহের পাট বেচতে গিয়ে যারে চেনে তার বিষয় কিছু বলা দরকার। এরা সবসময় থাকে, এদের বিষয়ে বিস্তর অভিজ্ঞতা আজাহের এমনকি আজাহেরের পরম বন্ধু রহিমদ্দী কারিকরেরও হয়েছে। সেই জালেমের নাম বাজার। আজাহের যখন ভিটা-বাটি উচ্ছেদ হয়ে তাম্বুলখানা গ্রামে যায়, সেই গ্রামে টিকে থাকতে গিয়ে ঢেকি শাক বেচে, মধু বেচে, বেচতে গিয়ে বুঝতে পারে বাজার মানে বজ্জাতির হাট। এখানে কেবল পণ্য বেচলে চলে না, বেচতে হয় নিজেরেও, বিশ্বাস পাল্টায়ে ফেলতে হয়, ধর্মরে পাশ কাটায়ে যাইতে হয়।

বাজারের ধর্ম আবার একেবারে আলাদা। যে কারণে প্রথমবার পাট বেচে ঠকে গিয়ে পরের বার আজাহের নিজেই নিজের পাট বেচে আসে। তাতে সে বাড়তি পয়সা পায় অনেক। কিন্তু রেহাই মিলে না। দুনিয়াবি ব্যবসায়ীরা এক জাতের। উপন্যাসে শেষ দিকে বছির যখন বড় হতে শুরু করে, বুঝতে শুরু করে তখন সে রহিমদ্দী কারিকরের বাড়িতে যায়। গিয়ে দেখে আসে তাদের কী হাল। “লোকের রুচিও এখন বদলাইয়া গিয়াছে। শহরের বড়লোকেরা এখন নক্সী শাড়ীর পরিবর্তে সাদা থানের উপর নানা রঙের ছাপ দেওয়া শাড়ী পরে।” ফলে কারিকরদের অবস্থা বেগতিক। তারা সরু সূতা বাদ দিয়া মোটা সূতায় কাজ করতে গেলেও পারে না। “চোরা-বাজারে কিনতি অয়”। এই চোরামিতে টিকতে পারে না বলে আজাহেররা ঠকে। বাজারের কাছে তারা হীনবল হয়ে থাকে। দ্বিতীয় প্রহরের অন্ধকার এভাবেই নেমে আসে। বাংলার মুসলমানরা এই বাজার ব্যবস্থাপনা বুঝতে পারল না। কৃষক আজও পারে নাই সেটা। এই ২০১৪ সালেও। মুসলমান থাকার কারণে তাদের এই না-পারার মানসিকতা তৈরি আছে, এমনটা জসীম ইঙ্গিতে বলতে চান। বাজার ব্যবস্থাপনায়ও আমরা এই না-ঠকার দাবি মার্ক্সে পাই, জসীমেও তো পাওয়া গেল দেখা যায়। তবে মার্ক্সে ধর্ম নাই, জসীমে আছে।

অন্যদিকে আজাহেরদের নিজেদের লোক তাদের ঠকায়। আখেরাতের লোভ দেখিয়ে দুনিয়াবি ঠকান ঠকায়। সেই শত্রুর নাম ‘মোল্লা’। আজাহেরের তখন রমরমা অবস্থা। নিজে বাজারে পাট বেচে বেশ কিছু পয়সা কামিয়েছে। শরৎ সাহার ধার শোধ তো তা দিয়া করবেই নিজের ভবিষ্যতের রোশনাইও চোখে-মুখে লেগে আছে তার। এমন সময়ে তার বাড়িতে তছরীফ আনলেন ‘পিরান পীর ছৈয়দে মক্কা-মদীনা শাহ্‌সুফি মোহাম্মদ তজুম্বর আলি খাকসার সাহেব জনাবে নিজামুদ্দীন আলায়হে ছালাম পীরপুরী’। আজাহের বোকা স্বভাবের লোক। কেউ তার বাড়িতে স্বেচ্ছায় দাওয়াত পালন করতে আসতেছে, তা জানিয়া “মন আনন্দে মশগুল”। এ খবরে গ্রামের আরও লোক ছুটে আসল। রাতভর তারা ওয়াজ শুনল, আখেরি জামানার হিসাব-নিকাশ তো তারা তেমন করে নাই, মরার পরের জগতের বিধান তাদের কানে এমন মধুর স্বরে আর কেউ তো বয়ান করতে আসে না। শরৎ সাহা আসে দারোগা নিয়ে, পাটের ব্যাপারি ঠকায়। তাদের তো কোনো আপন নাই আসলে।

এই যে তাদের দেখা জগতের বাইরে আরও জগত আছে, সেখানে কোর্মা-পোলাওয়ের সুবাস আছে, এসবের লোভ তাদের মনে যে গুঞ্জরিয়া ওঠে তা ‘মৌলানা’ কেমন করে জানি টের পায়। মৌলানাদের অবহেলা করলে শাস্তি আর খেদমত করলে ঐশ্বর্য্য নহরে ভেসে যাবে পরকাল। ইহকালেও হুকুম-আহকামে মৌলানাদের সঙ্গেই রিশতা থাকতে হবে। নইলে বিপদ। নিজেদের জীবনে বাড়তি বিপদ আর ডেকে আনতে চান না তারা। বউয়ের আপত্তির মুখে আজাহের জানায়, “পরলোকের কাম ত করছি। এক পয়সা খরচ করলে রোজহাশরের ময়দানের দিন সত্তর পয়সা পাব ত।” আজাহেরের বউ আরও গুরুতর প্রশ্ন করে, বলে, “পরলোকের জন্যে ত ছবাব কিনলাম কিন্তু এখন আমরা খাব কি?” এ প্রশ্ন জসীম উদদীনেরও। গরীবের টাকার বিনিময়ে যারা ওয়াজ করে, তারা গরীবদের জন্য কী করে? বা কেবল আখেরাতের কথা শুনলেই চলবে, দুনিয়ার হিসাব-নিকাশ কি তারা করবে না? ইসলাম কি এমন?

ইসলাম বিষয়ে জসীম এই উপন্যাসে আলাপ করেন নাই বলা যবে না। তিনি কিছু এক্সপেকটেশন হাজির করেছেন। যেমন এই একটা যে আখেরাতের দাওয়াতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ কেন থাকবে ইসলাম, বা বঙ্গের ইসলাম।

এই আলাপ আরো বিস্তারিত করেছেন তিনি। তবে সমাধানের রাস্তাটা তার সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’র মতো না। ওয়ালীউল্লাহ একতরফা ইসলাম ডিল করেছিলেন বলা যায়। জসীম সে দিকে আগান নাই। তিনি সকল ইসলামকে সঙ্গী করতে চেয়ছেন। সবার কমন শত্রু দেখাতে চেয়েছেন। যে যেই তরিকার ইসলাম করুক না কেন তারা বাজারে ঠকে, ইতিহাসে ঠকেছে, নিজেদের গোঁড়ামির কাছে ঠকেছে।

শুরুর উদ্ধৃতিতে সমাধানের পথ বাৎলে দেয়া আছে। যে কথাটা বছির বলেছিল তার বন্ধুদের। এই বন্ধুরা মসজিদে কোরআন শেখে, হাফেজ হতে চায়। বছির তখন স্কুলে পড়ে, মাঝখানে যে উকিলের বাসায় থেকে সে পড়াশোনা করত সেই উকিল বছিরকে খেদায়ে দেয়। কারণ বছির আরজান ফকিরের বাড়িতে এক রাত ছিল। এই আরজান ফকির গান করে, সারিন্দা বাজায়। তার সারিন্দা উকিল সাহেব মোল্লাসহযোগে ভেঙে ফেলেন। তবে এই উকিল কিন্তু শুরুতে এমন ছিলেন না। এমন হয়ে ওঠার কারণ ব্যাখ্যা বোবা কাহিনীকে লাল সালু থেকে আলাদা করে। আপাতত লাল সালু বিষয়ে এতটুকু জেনে রাখলেই যথেষ্ট।

এই উকিলের নাম রমিজদ্দীন। তিনি “ফরিদপুরের নতুন উকিল”। ফরিদপুর শহরে তিনি ছাড়া আর যে কয়জন মুসলমান আছেন তারা ‘কলা কচুর বেপারী’ আর অফিস আদালতের জনকতক ‘পিওন-চাপরাসী’। এদের নিয়ে তিনি আঞ্জুমান-এ-ইসলাম গঠন করেছিলেন। কিন্তু এদের নিয়া তো নিজের পসার বাড়ানো যায় না। “কারণ শহরে উকিল মোক্তার সবই হিন্দু।” সবাই এদের কাছে আসে। রমিজদ্দীনের কাছে কেউ আসে না। মক্কেল পাইতে গেলে ফন্দি করতে হবে। কী সেই ফন্দি?

“পাক ভারতে মুসলিম রাজত্ব শেষ হইবার পর একদল মাওলানা এদেশ হইতে ইংরেজ তাড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন। সহায়-সম্পদহীন যুদ্ধ-বিদ্যায় অনভিজ্ঞ সেই মুসলিম দল শুধুমাত্র ধর্মের জোরে সে যুগের ইংরেজ-রাজের অত্যাধুনিক অস্ত্র-সজ্জার সামনে টিকিয়া দাঁড়াইতে পারিল না।” না পারার পর তারা কী করলেন? তারা হয়ে গেলেন সেই ওয়াজকারী মোল্লা, নিজেদের মধ্যে থাকেন, দুনিয়াবি হিসাব থেকে নিজেদের বিরত রাখেন।

তাদের এসবে জসীমের আপত্তি আছে বিলকুল। সায় আছে অশিক্ষিত চাষী মুসলমানদের উন্নতির দিকে। জসীম এই জনগোষ্ঠির মুরুব্বি। হৃদয়ের সমস্ত তন্ত্রিতে তিনি তাদের বেদনা ধারণ করেন। কষ্টে নীল হয়ে ওঠেন। তাদের পরিত্রাণের জন্য তিনি রাস্তা ফেঁদেছেন এই উপন্যাসে। জসীম বলতেছেন, “সাহিত্য-কলা-শিল্পের ক্ষেত্রে মুসলিম শিক্ষিত সমাজের তেমন কোন দান নাই, অপরপক্ষে দেশের অশিক্ষিত চাষী মুসলমান সমাজে লোক-সাহিত্য ও লোক শিল্পের দান দিনে দিনে শতদলে ফুটিয়া উঠিতেছিল।” এই দুইয়ের মিলন একের অপরকে পরাস্ত করার মধ্য দিয়েই ঘটেছে ইতিহাসে। রাজনীতির মাধ্যমে ব্যবসার পসার ঘটানোর জন্য ভুল বোঝানো হয়েছে দরিদ্র, সরল মুসলমান কৃষকদের। অপর মুসলমানরাই সেটা করেছে। এমন ইসলাম চান না জসীম।

রমিজদ্দীন উকিল এমন এক রাজনীতিবিদ। তিনি তার দলে মাওলানাদের ভিড়াইলেন। ‘রাজনীতি’ করতে নামলেন, নিজের পসার আর প্রচার বাড়ানোর জন্য তিনি গ্রামে গ্রামে ছুটে যান, দ্বীনের পথে চাষী, মজুরদের আনতে তার আসমান-জমিন চেষ্টা চলে। মওলানাদের যা যা অপছন্দ, সমাজ থেকে তা তা তিরোহিত হতে থাকে। তাদের ফতোয়াবাজির কাছে আরজান ফকির নিঃস্ব হন। ঘটনাটা একটু খুলেই বলা যাক, সারিন্দা ভেঙে ফেলার কালে আরজান ফকিরের চুল এবং নখ বিষয়ে ফতোয়া দেন শামসুদ্দিন মাওলানা। রমিজদ্দীনের তিনি খয়ের খাঁ। আরজানকে তিনি যখন জিজ্ঞাস করলেন, সে নখ কাটে না কেন? আরজান উত্তর দেয়—”বাজান। একদিন মানুষ আতের পায়ের নখ দিয়াই কাইজা-ফেসাদ করত। তাই নখ রাখতো। তারপর মনের নখের কাইজা আরম্ভ ঐল। কলমের নখের কাইজা আরম্ভ ঐল। তহন আতের পায়ের নখের আর দরকার ঐল না। তাই মানষি নখ কাইট্যা ফালাইল। আমার যে বাজান বিদ্যা-বুদ্ধি নাই। তাই মনের নখ গজাইল না।”

তাইলে এই অস্ত্রবাজির যে শিক্ষা তা থেকে দূরে থাকতে চায় আরজান ফকির। সে বাদ্য-বাজনা নিয়ে থাকতে চায়, তার সঙ্গে ইসলামের নামে এমন আচরণে কষ্ট পান জসীম। উপন্যাসের বিশাল অংশ জুড়ে তিনি এমন নানা ঘটনার বিবরণ দিয়ে যান। লোভী রাজনীতিবিদ আর জবরদস্তির মওলানারা যেভাবে এখানকার কালচার ধংস করেছেন তার কিছু ঘটনা তিনি তুলে ধরেছেন। এ নিয়ে সমালোচনা হতে পারে। তবে জসীমের বক্তব্য নিয়েই আমাদের আলাপ। এর বাইরের না।

নখরযুক্ত, লোভের বশে যে ইসলাম এমন সারিন্দা ভেঙে ফেলে তার সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধে জড়ান তিনি। নিজে ‘শিক্ষিত’ বলে দেশ-বিদেশ ঘুরে দেখেছেন বলে, জীবনের নানা উজান আর ভাটিতে যে সকল অভিজ্ঞতা তিনি জমিয়েছেন, সেই জহুরি চোখে তিনি বুঝে ফেলেছেন এই পথে বাঙালি মুসলমানের মুক্তি আসবে না। তাদের জন্য মুক্তি আনবে বছির। আজাহেরের প্রথম সন্তান। পরে আরেকটি সন্তান জন্ম দেয় তার বউ। সেটি মেয়ে, নাম বড়ু। কলেরায় মারা যায়। তাকে ডাক্তার দেখাতে গিয়ে আরও এক অন্ধকার নেমে আসে তাদের জীবনে। জনৈক ‘মূর্খ’ ডাক্তার এ সময়ে পানি খাওয়াতে বারণ করলে আজাহের সে অনুযায়ী পানি খেতে দেয় না তার মেয়েকে। ফলে বড়ু মারা যায়। টাকার অভাবে সে ভাল ডাক্তার আনতে পারে না।

এই দারিদ্র এবং মূর্খতা নিজের ভেতরে আরেক জাতের শত্রু। অজ্ঞান দশা থেকে আজাহের তার মুক্তির ইশতেহার খুঁজে পায়। সেই ইশতেহার প্রতিপালন করবে বছির। যে বছিরও পদ্মার এপার-ওপার মানুষজীবন দেখছে। দেখেছে মুসলমানদের দুরবস্থার কারণগুলো কী। বোনের মৃত্যুর পর থেকেই সে নিয়ত করে তারে ডাক্তার হতে হবে। যেভাবেই হোক। তার বোনের মতো এভাবে আরও মুসলমান, আরও কোনো গরীব মারা যাবে তা সে মানতে পারে না। এই জাতির উন্নতির জন্য তাকে পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ পথ। ফলে শিক্ষা নিতে হবে।

উপন্যাসের শেষে বছির বিলাতে যায়। ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ পথ পাড়ি দিতে হয় তাকে এ সময়ে। মসজিদে থাকতে হয়েছে, খুঁজে খুঁজে খাবার জোগাড় করতে হয়েছে। মসজিদে তার সঙ্গী ছিল ঘটনাচক্রে সেই মজিদ। এমন এক মজিদের দেখা আমরা পাই লাল সালুতে। লাল সালু প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে। বোবা কাহিনী ১৯৬৪ সালে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর গ্রাম কল্পনার সমালোচনা হিসেবে বোবা কাহিনী লিখেছেন জসীম উদদীন—এ অনুমিতি স্বাভাবিক মনে হয়।

Jasimuddin21r

লন্ডনে জসীম উদদীন, ১৯৫১। Alan Lomax-এর আর্কাইভে রক্ষিত ছবি; Courtesy Jennifer A. Cutting। সাম্প্রতিক আবিষ্কারক Todd Harvey

মসজিদে কোরআনে হাফেজ হওয়া মজিদদের সমস্যা অস্তিত্ববাদী। তারা কীভাবে টিকে থাকবে সে লড়াইয়ে নিরন্তর ব্যস্ত। কোরআনও পাঠ করে মনোযোগের সাথে । আবার সেই কোরআন বেচে দিয়ে আসে, কোরআন কিনবে বলে টাকা নিয়ে আসে। গরীব কৃষকদের কাছ থেকে। বছির আপত্তি জানায়। কিন্তু মজিদের যুক্তি তাকে তো বাঁচতে হবে। বেঁচে বেঁচে বড় হলে সে তখন বড়লোকদের ঠকাবে। গরীবদের স্বার্থ দেখবে। মার্ক্সীয় লাইনের কোনো উপন্যাসে এমনটা ঘটতে দেখা যায়।

নিজের পুঁজি হিসেবে তারা কোরআন পাঠকে সম্বল করে। কোন সুরায়, কোন আয়াতে কীভাবে গলার স্বরে কাঁপন তুলতে হবে, কোথায় প্রলম্বিত করতে হবে টান তারা বেশ ভালোই রপ্ত করে। বছির সে পথে যায় না। সে ‘ইংরেজি’ শিক্ষায় নিজেকে শানিয়ে তোলে। এমন কি ফুলীর রূপে সে মোহিত হলেও তা সে উপেক্ষা করে।

এই ফুলির বোবা কান্না দিয়েই শেষ হয় উপন্যাস। নারীর প্রতি প্রেম পুরুষ বছিরকে ফিরিয়ে আনবে এ মাটিতেই। জসীম মনে মনে তাই চান। ফুলির প্রেম বছিরকে নিজের মানুষের কাছে টেনে নিয়ে আসবে। তবে এই বিলাত গমন এমানুয়েল কান্টের আলোকময়তা। কান্ট যে ‘ইমম্যাচিউরিটির’ কথা বলেছিলেন সেই দশা থেকে বছির রেহাই চায়। তারা রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য লড়াই করে। শিক্ষার অভাবকে স্বীকার করে। এই অভাব বাঙালি মুসলমানের আছে, আরজান ফকিরের আছে। এই শিক্ষা তাদের জারি-সারি, ফকিরি গানের রূপ ঝলমল আসর, রঙিন-রঙিন খেতের জমিনের অধিকারকে, এই বর্ণিল গ্রামীণ জীবনের স্বীকৃতিকে নিশ্চিত করবে।

আধুনিকতা বিষয়ে জসীমের আপত্তি নাই বলা চলে। যেহেতু ইংরেজি শিক্ষায় তার আপত্তি নাই।

মার্চ ২৩, ২০১৩