‘ক্যালকাটা-কলকাতা’ প্রদর্শনী নিয়ে আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে আলাপ

পয়লা নভেম্বর ২০১১-এ ঢাকা আর্ট সেন্টারে প্রদর্শিত হয়েছিল আনোয়ার হোসেনের একক আলোকচিত্র প্রদশর্নী, ‘ক্যালকাটা-কলকাতা’ (Calcutta-Kolkata)।

পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার খুঁটিনাটি দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেছেন বলেই হয়তো এই নামকরণ। ‘ক্যালকাটা-কলকাতা’ ফটো সিরিজের একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়েছিল তা এর ক্যাটাগরাইজেশন। ছবিগুলিকে ছয় ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছিল। নামগুল ছিল দেয়াল (The walls), আত্ম-অহং (Narcissisme), জনজীবন (Human Life), মানুষ (The Souls), পাশের জীবেরা (Animals Beside) ও উপাসনা (Devotion)।

১৩ দিনের এ প্রদর্শনীর চতুর্থ দিনে ছবি দেখতে গিয়ে চোখে পড়েছিল অনেক মানুষের আনাগোনা। শুক্রবার থাকায় ভিড় ছিল একটু বেশি। আনোয়ার হোসেন হলরুমের এক কর্নারে বেশ ক’জন ছাত্র ও শুভানুধ্যায়ীকে সঙ্গে করে বসে ছিলেন আর তার চারপাশে গোল হয়ে বিভিন্ন জন বিভিন্নরকম প্রশ্ন করছিলেন তাকে। অনেক দর্শককে দেখলাম ছবি দেখা শেষে তাঁর ছবি নিয়ে আলাপ করছেন।

টেবিলে সাজানো ছিল তাঁর অন্যান্য ফটো-এক্সিবিশনের ব্রশিয়ার এবং কিছু বই। সেগুলি নেড়েচেড়ে দেখছিলেন অনেকে। বই ও ছবি দেখতে দেখতে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে গেলাম। চারটি রুমজুড়ে সাজানো ছিল ছবিগুলি। পুরো এক্সিবিশনের সব ছবি যেন ধাপে ধাপে সাজানো এবং এর মাঝে কোথায় যেন একটা সামঞ্জস্য চোখে পড়ছিল। ছয়টি ক্যাটাগরির মধ্যে ‘জনজীবন’ বা ‘Human Life’-এ ছবির সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি এবং অন্য বিভাগের চেয়ে এর থিমটাও ছিল কিছুটা ভিন্নধর্মী। একটি ছবি নিয়ে দেখলাম দর্শকদের মধ্যে বেশ আলোচনা চলছে। গোলাপি রঙের জামা গায়ে পুকুরঘাটে মাথায় হাত রেখে বসে থাকা একটি মেয়ের ছবি।

আরেকটি ভিন্নধর্মী থিম ছিল পাশের জীবেরা (Animals Beside)। এই বিভাগের বেশিরভাগ ছবিই আমাদের চারপাশের পশুপাখিদের নিয়ে যারা সারাক্ষণ আমাদের আশেপাশেই থাকে কিন্তু আমরা তাদের ততটা খেয়াল করি না। কুকুর, বিড়াল, দোয়েল, শালিক এরকম আরও কিছু প্রাণী ছিল সিরিজের ছবিগুলিতে। যদিও পার্শ্বজীবী হিসেবে বিড়ালের উপস্থিতি যেন একটু বেশিই চোখে পড়ছিল।

এছাড়া তার আত্ম-অহং, দেয়াল এবং অন্যান্য ছবিগুলির মধ্যেও কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল বেশ লক্ষণীয়। যেমন, আত্ম-অহং (Narcissisme)-এর ছবিগুলিতে তার হাত ও ছায়ার ব্যবহার, এছাড়া অন্যান্য ছবিতেও তার বিভিন্ন বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও আঙুলের ব্যবহার বিশেষভাবে নজরে আসে।

ছবি দেখা শেষে দেখা করি আনোয়ার হোসেনের সাথে। তাঁর কাছে জানতে চাই তার ছবির কথা, ‘ক্যালকাটা-কলকাতা’র নেপথ্যের কথা।

 

প্রমা সঞ্চিতা অত্রি

আপনার এই ফটো সিরিজটির নাম ‘ক্যালকাটা-কলকাতা’ রাখলেন কেন?

আনোয়ার হোসেন

আচ্ছা, ব্যাপারটা অনেকটা এরকম যে, আমরা দুজন পাশাপাশি বসে আছি, কথা বলছি। তো আপনার ওড়না, চশমা বা জিন্স; আবার আমার চোখে যে চশমা, সেটার ফ্রেমটা বিদেশী; কিন্তু আমি যে পাঞ্জাবিটা পড়েছি, সেটা আবার যথেষ্ট ভারতবর্ষীয়। তো আমাদের সমাজে একইসাথে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য — এ দুটো সংস্কৃতির যে সহাবস্থান বা যে কো-হ্যাবিটেশন, এই ব্যাপারটা এখানে কাজ করেছে।

আমাদের এই ভূখণ্ডে তো সব দেশের মানুষই এসেছে। মুঘলরা এসেছে, ব্রিটিশরা এসেছে, অন্যান্য ইউরোপীয়রা এসেছে। ফলে এখানে একটা সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ ঘটেছে একাধিক সংস্কৃতির; তবে বিশেষ করে দুটো ধারার, অর্থাৎ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যর এখানে একটা সমন্বয় ঘটেছে। ক্যালকাটা (Calcutta) কলকাতা (Kolkata) হওয়ার আগেই কিন্তু কোনো এক রাষ্ট্রপতি Dacca-কে Dhaka করেছেন। একইভাবে বোম্বে হয়েছে মুম্বাই এবং অন্যান্য শহরও তার নিজ নিজ নামে ফিরে গেছে। তো এটা একটা ব্যাপার। আর আরেকটা ব্যাপার হলো ভারতের সাথে আমার দীর্ঘদিনের একটা মানসিক সংযোগ রয়েছে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শেখ মুজিবের আমন্ত্রণে আমি দু বার যাই কলকাতায়। একবার একটা কালচারাল ট্রিপ ছিল, আর দ্বিতীয় বার গিয়েছিলাম আর্কিটেক্টদের একটা গ্রুপের সাথে।

anwarh01

আনোয়ার হোসেন ও প্রমা সঞ্চিতা অত্রি; ছবি. স্নিগ্ধা জামান ২০১১

তারপর ১৯৭৪-’৭৭ আমার জীবনের একটা সুন্দর সময় কাটে সেখানে, যার ফলে পরবর্তীতে আমি বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু অবদান রাখতে পেরেছি। সেসময় আমি ছিলাম পুনা ফিল্ম ইন্সটিটিউটের স্কলার। অর্থাৎ ১৯৭৪ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত আমি পুনা ফিল্ম ইন্সটিটিউটে পড়াশোনা করেছি সিনেমাটোগ্রাফির উপরে। ফলে কলকাতায় আমার ঘন ঘন আসা-যাওয়া হয়। সত্যজিৎ, মৃণাল সেন তারপর ওইদিকে মিঠুন চক্রবর্তী — এরকম অনেক লোকের সাথেই আমার পরিচয় হয় এবং এঁদের অনেকের সাথে আমার সখ্য গড়ে ওঠে। তো তখন আমার হঠাৎ করেই একটা অনুভূতি হয় যে, ক্যালকাটা থেকে নামটা কলকাতা হলো কেন?

গত বছর আমি কলকাতা যাই বহুদিন পর। সেখানে গিয়ে আমার যে অনুভূতিটা হয়, আগে তো পরিবর্তন ছিলই এবং এখনো অনেক পরিবর্তন হচ্ছে। যেটা আমাদের বাংলাদেশেও এখন হচ্ছে যে বিভিন্ন সংস্কৃতির সহাবস্থানের যে ব্যাপারটা। রাস্তা দিয়ে গেলে হয়তো দেখা যাবে যে রিকশাওয়ালা হয়তো লুঙ্গি-গামছা পরছে, আবার হয়তো পাশ দিয়েই কেউ হেঁটে যাচ্ছে জিন্স বা প্যান্ট পরে; কেউ শাড়ি পরছে, কেউ সালোয়ার-কামিজ পরছে। এই যে দুটো সংস্কৃতির বিবর্তন, সেটা ঢাকার চেয়ে কলকাতায় আরও বেশি দেখা যায়। কারণ ঢাকার চেয়ে বেশি কসমোপলিটন হলো কলকাতা।

ছবি. স্নিগ্ধা জামান ২০১১

ছবি. স্নিগ্ধা জামান ২০১১

পশ্চিমবঙ্গ একটা বিরাট দেশ, সেখানে নানান জাতি ও ধর্মের মানুষ থাকে, নানান রকম তাদের সংস্কৃতি, ভাষা ও আচার-রীতি। ঢাকাকে নিয়ে তো আমি আগেও অনেক কাজ করেছি আর কলকাতাকে নিয়ে এখন অল্প কিছু কাজ শুরু করলাম। ওটা ওই ’৭১-’৭২-এর কাজটাকেই কনটিনিউ করার মানসিক তাড়না থেকে বলা যেতে পারে।

এবারের প্রদর্শনীতে আমি আসলে কনটেম্পোরারি কলকাতাকে নিয়ে কাজ করেছি। ২০১০-’১১ এই সময়ের কলকাতা। এ কারণে আমি এটার নাম দিয়েছি ‘ক্যালকাটা-কলকাতা’।

এটা ওদের পলিটিক্যাল টান্সফরমেশন এবং একইসাথে ওদের কালচারাল ট্রান্সফরমেশন। ভারতবর্ষের যে প্রভিন্সটি গত ৩৫ বছর ধরে তৃণমূল সোশ্যালিস্টদের আন্ডারে ছিল, এখন মমতা ব্যানার্জির হাত ধরে তার রূপান্তর ঘটছে। তো এটা তো একটা পলিটিক্যাল ট্রান্সফরমেশন, আবার অন্যান্য নানা কালচারাল ট্রান্সফরমেশন তো আছেই। তো সেই হিসেবেই আসলে নামটা দেয়া।

 

অত্রি

আপনার ‘পাশের জীবেরা’ ক্যাটাগরিতে আপনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন?

আনোয়ার

সেটা হচ্ছে আমরা অনেক সময় লক্ষ করি না যে, আমাদের আশেপাশে মানবজাতির পাশাপাশি আরও অনেক জীবজন্তু থাকে, যাদের আমরা সব সময় হয়তো অতটা লক্ষ করি না; কিন্তু আবার তাদেরকে আমরা অনেকেই খুব স্নেহ করি বা ভালোবাসি; যেমন, বিড়াল। আমি নিজে বিড়াল খুব ভালোবাসি। আমার সাতটা বিড়াল ছিল। শিশুরাও বিড়াল খুব পছন্দ করে। আবার যেমন ধরেন কুকুর। কুকুর তো খুবই প্রভুভক্ত হয়। বড়লোকদের অনেক বাসাতে পাহারা দেয়ার জন্য কুকুর রাখা হয়। সাম্প্রতিক কালে আমি যখন প্যারিসে যাই তখন আমি লক্ষ করি যে, সাংঘাতিকভাবে কুকুরপ্রিয় জাতি ওরা। আমি শুনেছি, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি কুকুর নাকি আছে প্যারিসে, পপুলেশন অনুযায়ী। ওদের দেশে বন্ধুত্বের একটা সহজ উপায় হলো, থ্রু এ ডগ। মানে কুকুরটাকে প্রসঙ্গ ধরে যদি এগুনো যায় তাহলে আলাপ যতটা জমে, সেটা অন্য কোনো প্রসঙ্গে আর হবে না! ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং যে, যদি কারও সাথে তার পুত্র বা কন্যা থাকে, তাহলে কিন্তু তারা সেই প্রসঙ্গ ধরে যতটা না সহজে আলাপ করতে পারবে, সাথে একটা কুকুর থাকলে তার চেয়ে অনেক সহজে তারা সেই আলাপচারিতা চালিয়ে যেতে পারবে।

ছবি. প্রমা সঞ্চিতা অত্রি

ছবি. প্রমা সঞ্চিতা অত্রি

আবার ভারতেও আমি প্রচুর কুকুর-বিড়াল দেখেছি, শহরজীবনে। শহরে তো গো-মাতা অতটা ঘুরে বেড়ায় না, কিন্তু কুকুর-বিড়াল সব জায়গাতেই আছে এবং লোকে সাংঘাতিকভাবে এদের সম্মান করে। এটা সম্ভবত ওদের ধর্মীয় অনুশাসন বা আচারের কারণে। আমি দেখেছি মাছের দোকানের সামনে দিয়ে অনেক বিড়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু কেউ তাদের তাড়িয়ে দিচ্ছে না, বা লাথি-গুঁতা দিয়ে তাড়া করছে না, একজনও না। এটা ওদের প্রাণ ও প্রাণের প্রতি ভক্তির একটা উদাহরণ।

তো এই বিষয়টা আমাকে ভাবিয়ে তুলল। আমি তো আসলে ছবি তুলি ভালো লাগা থেকে। আমার কাছে যেটাই ভালো লাগে বা মজার লাগে, আমি সেটাতেই ইন্টারেস্টেড হই। তো আমি খেয়াল করলাম যে, কুকুর ও বিড়াল এই দু’টাকে ধরে আমার বেশ কিছু ভালো ছবি হয়ে গেছে।

আমি যখন ছবি তুলি তখন কিন্তু কোনো থিম বা ক্যাটাগরিকে মাথায় রেখে সেটা তুলি না। ক্যাটাগোরাইজেশন যেটা পরে করা হয় সেটা আসলে সিম্পলিফিকেশনের জন্য।

কুকুর-বিড়াল বা অন্যান্য জীবদের যে ছবিগুলো আমি তুলেছি, পরবর্তীতে সে ছবিগুলোকে ক্যাটাগোরাইজ করতে গিয়ে আমার মাথায় হঠাৎ করেই এই নামটা চলে এল। পরবর্তীতে খুবই বিখ্যাত একজন শিল্পী, আমি তার নাম বলব না। তিনি আমাকে বললেন যে, আনোয়ার ভাই, আপনি এত সুন্দর একটা নাম দিয়েছেন ‘পাশের জীবেরা’। নামকরণটা করে আমি নিজেও আসলে বেশ আনন্দ পেয়েছি।

 অত্রি

আপনার ‘জনজীবন’ নামে আরেকটা ক্যাটাগরি ছিল।

 আনোয়ার

হ্যাঁ, ‘জনজীবন’ মানে ‘Human Life’ নামে একটা ক্যাটাগরি আমি করেছি। সেটা হচ্ছে, সে বিষয়ের উপর সবচেয়ে বেশি ছবি তোলা হয়েছে আর কি। সেটাই এখানে স্থান পেয়েছে।

আমাদের ফটোগ্রাফির ভাষায় এটার একটা কমন টার্ম আছে, ‌’স্ট্রিট ফটোগ্রাফি’ বলে এটাকে। স্ট্রিট ফটোগ্রাফি বা স্ট্রিট লাইফ। এই নামটা আমার ভালো লাগে না। ‘স্ট্রিট’ শব্দটা যেন একটু কেমন কেমন লাগে। সেজন্য আমি এটাকে ‘জনজীবন’ বলি। মানে, হিউম্যান লাইফ। মানুষের জীবনে তো কতকিছুই ঘটে, সবটা মিলেই তো লাইফ। আর এই প্রদর্শনীটা যেহেতু বৃহত্তর কলকাতার উপরে তাই এটার বিস্তৃতিটাও বেশি। কলকাতার এই কাজটা করতে গিয়ে আমি এমন অনেককে পেয়েছি যারা বাংলাদেশী, ইস্ট পাকিস্তান থেকে সেসময় চলে গিয়েছিল কলকাতায়। তাদের ভেতর একটা প্রচণ্ড বেদনা আছে, দেশ হারানোর বেদনা। এটা আমি অন্যান্য দেশেও দেখেছি, আমি যখনই দেশের বাইরে যাই সেখানকার প্রবাসী বাঙালিদের সাথে আমি কথা বলি, তাদের ছবি তুলি।

তো কলকাতাতে আমি এরকম একটা মেয়েকে দেখেছিলাম, যে সাত বছর বয়সে তার বাবার সাথে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে আসে এবং গত বিশ বছরে সে আর দেশে যায় নি। তো সেই মেয়েটির একটা ছবি আছে এই ‘জনজীবন’-এর মধ্যে। মেয়েটি একটা পুকুরপাড়ে বসে আছে। বড় পদ্মপুকুর। তাতে কালো রঙের পানি এবং মেয়েটা মাথায় একটা হাত রেখে পানির সামনে বসে আছে। তো এই ব্যাপারটা কিন্তু হঠাৎ করেই ঘটে গেছে। মেয়েটা কিন্তু জানতেই পারেনি যে আমি তার ছবি তুলেছি।

পরে আমি মেয়েটাকে বলি সে কথা। এই ছবিটা নিয়ে অনেকেই অনেক মন্তব্য করেছে যে ছবিটা কি আসল নাকি নকল, মাথার চুলগুলো কি সত্যি না আলগা চুল! এমনকি অনেকে নাকি এমন কথাও বলছে যে, মাথায় হাতটা রাখতে বলা হয়েছিল কিনা, ছবিটা আসলে সাজানো কিনা ইত্যাদি।

 অত্রি

এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?

 আনোয়ার

আমি অবাক এসব কথা শুনে। মানুষ বলে কি এগুলো? আমি আজ এত বছর ধরে ফটোগ্রাফি করছি, আর তাছাড়া কালো পদ্মপুকুর — এটা তো আমার খুবই প্রিয় একটা বিষয়। কালো পুকুরের ভেতর পোনা মাছ, শ্যাওলা ইত্যাদি কিছু ব্যাপার আছে, যেটা আমার সব সময়ই খুব প্রিয় একটা বিষয়, বিশেষ করে ছবি তোলার জন্য। মেয়েটা পশ্চিমবঙ্গের একটা মেয়ে, আর জায়গাটা অলমোস্ট এ পেরিফেরি অব কলকাতা। ওখানে আমার বন্ধুর একটা ফ্যাক্টরি আছে। ছোটখাটো একটা ফ্যাক্টরি। সেখানে ওই মেয়েটি কাজ করে। সেখানেই এই ছবিটা তোলা এবং এটা খুবই ন্যাচারাল একটা ছবি। কোনো রকম কারসাজি এখানে নেই। এখন তার পরও কেউ যদি বলে যে এটা সাজানো তো বলুক। আমার তো আর কিছু করার নেই।

আমার আরো একটা ছবি আছে যে, বেশকিছু গাঁদা ফুলের মালা পড়ে আছে এবং তার মধ্যে একটা দোয়েল পাখি বসা। এটা এই ফটো সিরিজেই আছে, ‘পাশের জীবেরা’ ক্যাটাগরিটার মধ্যে। ওটা দেখেও আমার এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, এই পাখিটাকে এখানে কীভাবে বসালা? ফটো এডিট করে না কী করে? আমি তাকে বললাম যে, ভাই, আমি আমার কোনো ছবি কখনো এডিট করি না। আমি কম্পিউটারে ফটোশপ ওপেনই করি না। আমি আমার মতো ছবি তুলছিলাম। একটা পাখি এসে ওখানে বসল। আমি সচেতন ছিলাম, হাতে ক্যামেরা ছিল, ব্যস, তুলে ফেললাম।

 অত্রি

‘আত্ম-অহং’ (Narcissism)-এর ছবিগুলোর মাঝে আপনি আপনার হাত, ছায়া, হাতের কিছু সিম্বলিক এক্সপ্রেশন এগুলো ব্যবহার করেছেন। এগুলো দিয়ে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?

আনোয়ার

আচ্ছা, আমার ‘নার্সিসিজম’ কথা এসেছে একটা গ্রিক পুরাকাহিনী থেকে। সেটা হচ্ছে নার্সিসাস নামে একজন অতি সুদর্শন পুরুষ ছিলেন যিনি পানিতে একবার নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিজেই নিজের প্রেমে পড়ে যান। সে প্রেম এতই গভীর আর কোনো কিছুর সাহায্যেই তার এই প্রেমটা আর রিপ্লেস হয় না। তো এখান থেকেই এই নার্সিসিজম শব্দটা এসেছে। আর আমি আমার ছবিতে যে হাতের ব্যবহারটা, তার পরে আমার ছায়া, আমার প্রতিবিম্বের ব্যবহার–এই কাজগুলো আমি প্রায়ই করে থাকি নিজেকেই ছবির মধ্যে রাখার জন্য, নিজের অস্তিত্বটাকে ছবির মধ্যে রাখার জন্য। যেহেতু এটা আত্ম-অহং বা আত্ম-প্রেমমূলক একটা ব্যপার, তাই এখানে আমার উপস্থিতিটা একটা বাড়তি ফ্লেভার দেয় ছবিগুলোতে।

 অত্রি

এবারের এক্সিবিশনটা কতদিন পর করলেন?

আনোয়ার

প্রায় বছরখানেক পর। আমার শেষ এক্সিবিশনটা এখানেই হয়েছিল। এই ‘ঢাকা আর্ট সেন্টারে’ই, গতবছর, ২০১০–এ। সেটার নাম ছিল ‘Because of You’ বাংলায় — ‘তোমার জন্য’। এটা ছিল চারটা দেশের উপরে। এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশে, ভারত, ফ্রান্স ও আমেরিকা — যে চারটা দেশে আমি ঘুরেছি গত বছর।

 অত্রি

সামনে নতুন কোনো প্রদশর্নীর কথা ভাবছেন?

 আনোয়ার

প্রদশর্নী আসলে খুব কষ্টকর এবং ক্লান্তিকর একটা ব্যাপার। একেকটা প্রর্দশনীতে যে পরিমাণ সময় ও শ্রম দেয়া লাগে, সেটা আসলে বলে বোঝানো যাবে না। তবুও এটা আসলে একটা অনুপ্রেরণার ব্যাপার। হঠাৎ করে একটা অনুপ্রেরণা পেলে দেখা যায়, একবারে অনেকগুলো কাজ করা হয়ে যায়। তবে একটা ব্যাপার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে বেশ ক’বছর ধরেই। অনেকেই আমাকে বলেছেন যে, মেয়ে নিয়ে বা ‘নারী’ এই বিষয়টার উপরে কাজ করা যায় কি না।

গত চল্লিশ বছর ধরে আমি মিডিয়ার সাথে যুক্ত। আমি বাংলাদেশের মডেলদের নিয়ে বেশকিছু কাজ করেছি। এখন তো বাংলাদেশে ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বাণিজ্যিকভাবে নারীর উপস্থাপনা — এই বিষয়টা নিয়ে এখন ভাবছি।

এছাড়াও বিভিন্ন ওয়েডিং ফটোগ্রাফিও আছে। তো এই ব্যাপারটা মাথায় আছে। এই মুহূর্তে এটা একটা অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই বিষয়ের উপর কিছু একটা করা দরকার। সামনে হয়তো সুযোগ পেলে আমি এই কাজটা করব এবং এটার নাম হতে পারে ‘ইন্ডিয়ান উইমেন’। ইন্ডিয়ান বলতে পুরো ভারতবর্ষ মানে এই সাবকন্টিনেন্টের কথা বলছি।

 অত্রি

‘ক্যালকাটা-কলকাতা’ এই এক্সিবিশনে আপনার সবচেয়ে পছন্দের ছবি কোনটি?

 আনোয়ার

পছন্দের একটি ছবির কথা বলা যাবে না, দুটি ছবির কথা বলতে হবে। যদি ট্র্যাডিশনাল অ্যাঙ্গেল থেকে দেখি, যে ছবিটা আমাদের অতীত রাজনৈতিক ইতিহাসের কথা বলে, আমাদের বঙ্গের কথা বলে, তাহলে বলব ওই যে কালো দীঘির পাড়ে বসে থাকা ওই মেয়েটির ছবি।

anwarh02

আনোয়ার হোসেন;ছবি. স্নিগ্ধা জামান ২০১১

আর যদি আধুনিকতার কথা বলি, কনটেম্পরারি অ্যাঙ্গেল থেকে যদি দেখি, ‘ক্যালকাটা–কলকাতা’ নামটা যে কারণে রাখা হয়েছে সেই দৃষ্টিকোণ থেকে যদি দেখি, তাহলে ওই যে আমার হাতে একটা ঘড়ি ধরা আছে, তাতে ইন্টারন্যাশনাল টাইমটা দেখাচ্ছে, খুবই দামি ঘড়ি, আমেরিকান ডিজাইনার’স ওয়াচ, পেছনে হাওড়া ব্রিজ আর তার সামনে কিছু মানুষ, নিম্নজীবী মানুষ বসে আছে। ইট’স আ ভেরি কনটেম্পরারি ওয়ার্ক।

৩.
আনোয়ার হোসেনের সাথে কথা বলতে বলতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসে। পাশে রবীন্দ্রসরোবরে মাদকবিরোধী কনসার্ট চলছিল। তাদের গান-বাজনার কারণে আর কোনো কথা শোনা যাচ্ছিল না। এরই মধ্যে আনোয়ার হোসেনের কিছু পুরোনো বন্ধু চলে আসলেন, আর তিনিও মেতে উঠলেন গল্পে।

এই ফাঁকে আমি চলে এলাম আর্ট সেন্টার ছেড়ে।

Flag Counter

About Author

প্রমা সঞ্চিতা অত্রি
প্রমা সঞ্চিতা অত্রি

জন্ম ১৩ই অক্টোবর ১৯৯০, ঢাকায়। দেশের বাড়ি ফরিদপুর। এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি যথাক্রমে হলিক্রস স্কুল এবং কলেজ থেকে ২০০৭ ও ২০০৯ সালে। বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মিডিয়া স্টাডিস এন্ড জার্নালিজম’ বিষয়ে অধ্যায়নরত। লেখালেখির শুরু ২০০৪ সাল থেকে। ২০০৯ সাল থেকে সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত।