শুরুর কিস্তি 

অধ্যায় ২

৬.

চাইয়া দেহি মাইজ্জা চাচার লগে হুজুর ছারও আইছে। কয়ছর হুজুর আমাগো ধর্মের ক্লাছ লয়। কাজী বাড়ির শহিদ্দার বাপসহ আরো চাইর-পাচজন বুইরড়া ঢোহে পিছে পিছে।

চাচার মুখ হমানে চলতাছে। কবির ম্যাভাইর মারে গাইল্লাইতাছে ধুমাইয়া। “এই হামুদ্দির জি যেই দিন বাইত আইছে,বংশ ধ্বংস করনের কাম হুরু করছে। ভাতাররে খাইয়া অহন অর হক্কুনের কইলজা পুরাইছে।”

মাইজ্জা চাচা উডানের মইদ্দে পযজন্ত আওনের পরে আডু হমান পানি ভাইঙ্গা দৌড় দিয়া গিয়া বড় চাচার লাশের উরপে আছড়াইয়া পইররা বিলাপ শুরু করেন, “ওরে আমার ভাই রে! ও ভাই! তুই কতা কছ না কা। ওরে আল্লারে… ও আল্লা…।”

বড় চাচারে যে মাইজ্জা চাচা এত বালা জানতেন আগে জানতাম না। হেরেও দেখছি কয় দিন কবির ম্যাভাইর লগে বড় চাচারে পুগুরো চুবাইত।

কানতে কানতে বড় চাচারে মাডির তন পলিথিনসহ কোলো লইয়া উসকাইয়া চইর উরপে হোয়াইয়া দিয়া লতিপ চাচায় আরো জোরে চিক্কুইর দিয়া কানতে থাহেন। হুজুর ছারে হেরে ধমক মাইররা কয়, “আমনে হরেন! মুদ্দার পাশে জোরে কান্দন আল্লায় অপছন্দ করে। আল্লায় প্রিয় বান্দাগোরে আগে হের ধারে লইয়া যান। আর পানিত ডুইব্বা কেউ ইন্তিকাল করলে হের বেস্ত নসিব অয়।”

কতা কইতে কইতে কালা রেকসিনের বেগের তন আগর বাত্তি বাইর কইররা চইর তক্তার মইদ্যে গাইত্তা জ্বালাইয়া দেন। মাইজ্জা চাচা লাশের ঠেঙ্গের দিগে খাড়াইয়া ডেউক্কাইয়া ডেউক্কাইয়া কানতাছিলেন। ভিজা লুঙ্গির তন চুয়াইয়া চুয়াইয়া পানি মাডিত পড়তাছে। ভিজা লাশ জরাইয়া ধরনে নীল টেট্টনের পাঞ্জাবিও ভিইজ্জা গেছে। প্যাক-কাদা লাইগ্যা রইছে এই হানে ওই হানে।

হুজুর ছারে কয়, “লতিপ মিয়া, এক পাইলা পানি গরম করতো কন। বড়ি পাতা আনান। আর দাফন কই করব সিদ্ধান্ত লন। আর চালার লাইগ্গা বাঁশ কাডান। লাশের অবস্তা বালা না।”

 

৭.

হুজুর ছারের কথা হুইন্না ভিড়ডা লইড়া উটল। এতক্কন মনে অয় কেউ বোজতারে নাই কী করন লাগব। লতিপ চাচা এইয়ারে উইয়ারে কাম বুজাইয়া দিলেন।

অনেক কমলেও ছিডা ছিডা বিষ্টি অইতাছে অহনও। এর মইদ্দেই ঝকঝইক্কা রইদ উইটঠা গেল। রইদ দেইকখা আমার অস্থির লাইগ্গা ওঠে। কেমন লাল রঙ্গের রইদ। রইদও আছে বিষ্টিও পড়তাছে।

আমার ডর লাইগ্গা ওডে। এত মানুষ বাড়ির মইদ্দে কেউ কারো লগে কতাও কয় না। বেক্কে বেক্কের মতো চুপ চাপ আটতাছে।

অল্প কতক্ষণ পরেই আবার রইদ চইল্লা গেল। আমি আসমানের দিগে চাইয়া দেহি অনেক কালা মেগ অনেক জোরে উইড়রা উত্তুর দিগে যাইতাছে। এক চাই মেগের পিছে আরেক চাই মেগ দৌড়াইতাছে।

 

৮.

অনেক মেগ, অনেক মেগ। অনেক জোরে উড়তাছে। কেউ খেয়াল করে নাই অহনও। উত্তুর পুবের আকাশো একবারে নিচের দিকে রক্তের মত লাল লম্বা একটা দাগ। আমার কইলজাত কামড় দিয়া উটল ডরে। কেউ অহন রেডিও খুললেই হুনব সাগরো সিগনাল চলতাছে।

বেক্কে জানে মেগ উরপে এমন জোরে উড়লেই রাইতের আন্ধার নামনের আগে আগে নিচে তুফান বয়। আর ঝড় বাদলার মইদ্দে পুব আকাশো হাসান-হোসেনের রক্ত ওটলে ক্ষতির শেষ থাহে না। বড় চাচার লাশ লইয়া ব্যস্ত বইল্লা কেউ খেয়াল করে নাই অহনও।

মারে পাইলে কইতারলে অইত। মায় বাপেরে গাইল্লাইয়া-গুইল্লাইয়া আড়ার বানগুলি আরো জোরে দেওয়াইতেন। ঘরের পালার গোড়ায় আরো মাডি দিয়া হিলাইয়া দেওয়াইতেন। আমাগো ঘরের দিগে চাইয়া তুফানের খবরডা বেকেরে তরস্তর জানান দরকার মনে অইল।

অনেক ডর লাগলেও হুজুর ছারেরে টোগাইতে আরম্ভ করলাম ঝড় আইব যে এইডা কওনের লাইগ্গা। হেরে বাড়ির মইদ্দে না পাইয়া দরজার দিগে রওনা দিলাম।

হুজুর ছারে খাড়াইয়া খাড়াইয়া কবর খোড়ন দেখতাছেন। মাতার হাফেজি ওড়নাডা দিয়া কোমরো পাঞ্জাবি বান্ধা। আতা বডা কইন্না নাগাদ। রত্তন ভাই আর জসিম ভাই মিল্লা কবর খোড়তাছেন। হাক্কায় ওডনের পঞ্চাশ আত আগে ডাইন পাশের ওচা জাগাডাত।

হুজুর ছারের ধারে যাইতে ডর লাগতাছে। হরুকা জহুরের নমাজের আগে আমারে চোপার মারছিলেন দুইডা। আজান দিতো ভুল করছিলাম বইল্লা। হুজুর ছারে নিয়ম কইররা দিছেন ফাইভ আর ফোরের তন তিন নম্বর পযজন্ত রোল দুই কেলাসের তিন জন কইর‌্যা ছয় জন একেক দিন আজান দিব। হরুকা আমার আমি ভুল কইর‌রা পুব দিগে ফিরর‌া আজান দিয়া দিছিলাম। আজান পরায় শেষ এমন সময় ওজু কইর‌রা ফিরনের পথে আমারে পুব দিগে মুখ দেইকখা আজানের মইদ্দেই দুইডা চোপার মাইর‌রা থামাইয়া নিজে আজান দিতে শুরু করেন।

খাল পাড়ের কড়ই গাছ-বলুই গাছগুলির পাতা বাতাসে দোলতে আছে। হকালের তন বাতাসের জোর আবার বাড়তে শুরু করছে। খালের পানিত অনেক স্রোত। পানি পরায় পাড় হমান অইয়া গেছে। আলাদার বাড়ির ধারে খাল পারো অনেক পোলাইন বড়ি হালাইতাছে। আইজ বাইন, পুডি, টেংড়া, কৈ, বোয়াল, আইড়, টাইকন্না মাছে কেচ্ছা পাইলেই খাইব।

নতুন পানিত মাছের মাতা ঠিক নাই আইজ। মাইজ্জা চাচাগো গরুর ঘরের পিছে গোবরের মইদ্দে সাদা কেচ্ছার অভাব নাই। কোদাল দিয়া এক কোপ দিলেই এক আউত্তা পাওয়া যাইব। বাপের লগে বেউত্তা মাছ ধরতো গেলে হেয়ান তন কেচ্ছা তুলুম।

“আসসালামালাইকুম ছার।”

“অলাইকুমছালাম।”

“ছার। আইজ কি তুফান অইব রাইতে?”

“তুই ইচকুলের তন আইয়া অহনো বিজা জামা বদলাছ নাই কা? অহনো বই লইয়া ঘোরতাছোচ কা! তোর বাপে কই দেখতাছি না অহনো?”

“বাজোরো মনে অয় বাবায়। আইয়া পড়বো ছার। আছছালামালাইকুম।”

ডরে আমার গলা হুগাইয়া গেছে। হুজুর ছারেরে মেগের কতাডা কইলে বালা অইতো। আইজ রাইতে তুফান অইলে বুজবেন আমার কতা কানে লইলে বালা অইতো।

 

৯.

মায় যে কই গেল। বাপেরেও দেহি না। বাবায় আডো যাইতারে। আমাগো রাহি মালের ব্যবসা। বাপে এই সময় বাজারো গদিদ থাহে। কাম না থাকলে দুরপে খাইতো আইয়ে। নাইলে এক লগে রাইতো আইয়ে।

মারে টোগাইদে যাইয়া দেহি পশ্চুম ঘরো মায়, মাইজ্জা চাচি, ছোড চাচি, কালার মা বুজি মিল্লা পাশাপাশি বইয়া ডুইল্লা ডুইল্লা কোরান শরিফ পড়তাছে। আর নুরনবী, ইকবাল, মোসলেম, সাক্কু, হিরইন্না, ময়না, কনু, জরিনা, রহমত, কামালসহ বাড়ির সব পোলাইন মাগোরে গিররা বইয়া রইছে।

হেললাইগ্গাই কেউরে দেহি নাই এতক্ষণ। বেক্কের মোখে ডর ডর ভাব। নাজমা আর নাহারেও মার পাশে বইয়া ডোলতাছে। আমি মার পিছে যাইয়া কাপড় ধইররা টানতে শুরু করলাম। কানের ধারে চুউপপে চুউপপে কইতে থাকলাম, “মা ঘরো লও, পেডো ভোখ লাখছে। মা লও।”

মা আমার কতা কানো না লইয়া ডুইল্লা ডুইল্লা কোরান শরিফ পড়তেই থাহে। আমি আরো জোরে কাপড়ের খুট ধইররা টানতে থাহি। মায় বিরক্ত অইয়া পিছে হিররা মোখ ঝামটাইয়া কয়, “ছাড় ছ্যামড়া!”

আমার মাতা ঘুইররা ওডে, কই, “মা, আমার ভোক লাগছে। ঘরে লন।”

মায় কালার মা বুজিরে কয়, “আমনেরা পড়েন। আমার উজু নষ্ট অইছে। আবার আমু।”

মায় একবার আমার দিগে চাইয়া কোরান শরিফ কাপড় দিয়া মোড়াইয়া রেলের মইদ্দে রাইকখা উইটঠা খাড়াইলেন। হেরপর ঘরের দিগে আডা দিলেন। পিছে পিছে নাজমায় আর নাহারেও আডা দিল। উডানের পানি অনেক টান দিছে। অনেক জাগাত নাই। আমি মার পিছে পিছে কুত কুত খেলনের মতো এক পায়ে লাফাইতে লাফাইতে যাইতে লাগলাম।

 

১০.

মায় ঘরো উইটঠা বড় ঘরো মাডিত মোছলা বিছাইয়া আমাগোরে বওয়াইলেন। থাল দিয়া বাত বাইরর‌্যা নিজের থালতও ভাত লইলেন। আইজ খালি রুইত মাছ রানছেন মায়। আর ডাইল। মায় খাওনের মইদ্দে এক থালাত ভাত তরকারি ডাইল মিলাইয়া দাদার লাইগ্গা লইয়া বারিন্দাত গেলেন। বারিন্দাত তন চিল্লাইয়া কইলেন, “এই নাজমি, পানি লইয়া আয়। বাডিও আনিছ একডা।”

মায় যাওনের পরে ছোড বইন নাহাররে জিগাইলাম, “বড় চাচায় কেমনে মরছে নাহারি?”

নাহারে কয়, “চাচারে বাঁশের মাতাত বাইন্দা গোছল করানোর হময় অনেকক্ষণ ধইরর‌া চাইপ্পা রাখছে কবির ম্যাভাই। চাচায় ওঠতো চাইলেও জোর কইরর‌া চাইপ্পা রাখছে। আর লড়ে চরে না দেইকখা যেই উরপে তোলছে দেহে মইরর‌া গেছে। হেইসুম চাচারে পানিত হালাইয়া থুইয়াই কবির ম্যাভাই গেছেইগ্গা।”

হুইন্না আমার পেট মোচর দিয়া ওঠলো। বমি লাগতে লাগলো। আমি ভাত থুইয়া উইটঠা গেলাম। নাহাররে আবার জিগাই, “কবির ম্যাভাই পলাইছে কোনসুম?”

“কুনডেও যায় নাই। চাচি, কামাইল্লায় আর ম্যাভাই কারো উইটঠা পলাইয়া রইছে।”

(কিস্তি ৩)