Pages Menu
TwitterRssFacebook
Categories Menu

Posted by on Aug 17, 2014 in উপন্যাস, খইট্টাল | Comments

খইট্টাল (৩)

খইট্টাল (৩)

শুরুর কিস্তি আগের কিস্তি

অধ্যায় ৩

১১.

গামায় চুলার ধারে ছালির মইদ্দে কুণ্ডুলি দিয়া হুইয়া রইছে। আমি চাইছি দেইকখা চউকখে ঘুম লইয়া কয়বার লেজ লাড়াইয়া আরো ছোড অইয়া হুইল। কুত্তাডারে এতক্কণ চোহ পড়ে নাই।

বিষ্টিত বিজ্জা আগুন পোহায়। অন্য দিন ভাত খাওন দেখলে দৌদ্দিয়া গরো আইয়া পড়ে। পাতো মোক দিতো চায়। মায় আতের দারে জোতা-জুতা যা পায় মাইররা খেদায়া দেয়। আইজ মনে অয় কোনোয়ানো কিচু খাইচে।

কুত্তাডা হারা দিন আমার লগে লগে গোরে। বল খেলানোস সুমও পিছে পিছে দৌদ্দেয়। আইজজা হারা দিনে এক বারো দেহি নাই।

আত দোওনের আগে ভাতের থালডা লইয়া পিড়ার উরপে ডাইল্লা দিলাম।

গামার পেডো ভোক নাই। ওডে না। গামারে খাইতে বোলাইলাম, ‘আয় গামা, আয়, আয়, খা, চ্চু-চ্চু-চ্চু।’

হেও ওডে না দেইকখা বাম আতে চুলার ধারের তন গেডির চামড়া ধইররা চেচাইয়া আইন্না ভাতো মোখ চাইপ্পা দরলাম। রুইত মাছের সালনের গেরান পাইয়া গামায় চাইট্টা চাইট্টা খাওন ধরে।

মায় আহনের আগে খাওয়াইয়া শেষ না করতো পারলে গাইল্লাইবো আমারে।

 

১২.

বিষ্টি পাইয়া উরচুঙ্গাগুলি পুরা পিড়া আর ঘরের মইদ্দে আল চইয়া রাকছে। নাহারে আর নাজমায় অহনো ভাত খায়।

পাগ গরের দুয়ার দিয়া বাইরাইয়া পুগুর গাডো আইয়া আত দুইলাম।

পানি পরায় পাড়ের হমান অইয়া গেচে। উডানের পানি আমাগো আর কবির ম্যাভাইগো গরের মইদ্দে লোল দিয়া পুগুরো পড়তাছে। লোলের পাশে চিকন রাস্তার উরপের লই গাছডার গোরার মাডি হইরর‌া গেছে অনেক। বাবায় দেখলে অহন খন্তা দিয়া অন্য জাগার তন মাডি আইন্না দিত। নাইলে বাশ কাইট্টা হিক দিয়া দিত। লই গাছডার চামড়া দেহা যায় না, এত ধরন ধরছে। অনেগ গুলি পাইক্কা হইলদা অইয়া রইছে।

বিষ্টি নাই অহন। আকাশো এক ফোডা যাগা নাই। কালা কুচ-কুইচ্চা মেগ। পুগুর গাডের তনই দেহা যায় উত্তুরের পাড়ের তন কাইল্লা কান্দি পযজন্ত বিলডা পানিতে ভইরর‌া গেছে। একটা আইলও দেহা যায় না।

সাগরের মতো লাগতাছে। আচুমকা কইলজার মইদ্দে একটা কামড় দিল। পুগুরের উত্তুর পাড়ের ডালো লতিপ চাচাগো হলিদ খেতের পুব মাতাত টুনটুনির বাসাডাও ডুইব্বা গেল নি!

ইছকুলের তন আওনের সময় জামা পেন বিজ্জা গেলেও কোনসুম জানি হুগাইয়া গেছে।

শীত শীত লাগতাছে। দুই বগলে আত ডুকাইয়া উত্তুর পাড়ের দিগে আডন শুরু করলাম।

চাইয়া দেহি গামায় পিছে পিছে আটতাছে। কবির ম্যাভাইগো গরের পিছের তন পুগুরের উত্তুর পাড় পযজন্ত বিরাট মান্দার বাগান। বাগান আর পুগুর পাড়ের মইদ্দে দিয়া চিকন আডইন্না পত। উত্তুরের বিলো আল চওনের লাইগ্গা গরু-লাঙ্গল এইয়ান দিয়াই নিতো অয়। দেইকখা না আডলে পায়ো কাডা হুডবো।

বাগানের তন পাতা পচা গন্দের লগে লগে পাকনা গৈয়মের গেরানও পাওয়া যাইতেছে। বাগানের পশ্চুম পাশের কয়ডা কুয়ার পরের তন বছুরুদ্দিগো বাড়ির সীমানা শুরু। কাইল রাইতের বাতাসে বছুরুদ্দিগো বাড়ির কেলাগাছগুলি লাইন দিয়া ভাইঙ্গা পইররা রইছে।

কাড বাদাম গাছটার নিচে বাদাম পইররা বিছাইয়া আছে। পোলাইনে আইজ এই দিগো আইয়ে নাই। নাইলে এতক্ষণ থাকতো না।

লাল রঙ্গের পাকনা বাদামই বেশি। কামড় মারলে উরপের ছোকলার কষ দিয়া মোখ ভইররা যায়। পোলাইনে চাক মাইররা বাদাম পাড়তো চাইলে বড় চাচি গাইল্লাইয়া দৌড়াইয়া দিত। অহন লইলে দেখব না। হেইতি তো কারো উইড্ডা পলাইয়া রইছে ডরে।

আলইম্মার লাডির গাড়িডাও দেহি বাদাম গাছের নিচো পইররা রইছে। আমারডা দাদার চইর তলো। পাকনা বাঁশের বেহা ডাইলের গাড়িডা কতক্ষণ মাডিত ঠোক্কর খাওয়াইয়া চালাইয়া কাডা বাগানের মইদ্দে ঘুরাইয়া মারলাম। আলইম্মায় আর টোগাইয়া পাইব না।

উত্তুরের বিলডাত এই মাতা ও মাতা বিরাট বিরাট ডেউ। পুব দিগে খালপারোর বলুইগাছগুলি পরায় পুরাডাই ডুইব্বা গেছে। পুগুরের দিগে চোউখ গেলে ডরে বুক কাইপ্পা ওডে। পুগুরের দিগের তন হাউ হাউ কইরর‌া বাতাস আইতাছে। দহিনের বাতাসের ঠেলায় পুগুরো পড়া হুকনা ডাইল-পালা সব ভাইশসা উত্তুর পারো কিনারো আটকাইয়া রইছে। চাইয়া দেহি এগুলির মইদ্দে বড় চাচারে গোছল করানের বাঁশটা ভাসতাছে।

কাইল্লা কান্দির পরে মুয়ারবান্দার দিগে ঝুমাইয়া বিষ্টি অইতাছে দেহা যায়। সাদা ফশসা পাহাড় খাড়াইয়া রইছে মেগের তন মাডি পযজন্ত। ঠাডাও পড়তাছে। মেগের ফাকো ফাকো খাড়া ঝিলকি দেহা যায়। এইহান তনও গুড়ুম গুড়ুম শব্দ পাওয়া যাইতাছে।

 

১৩.

চাইর দিগ সন্দার মতোন আন্দার অইয়া রইছে। মেগগুলি লাগে জন আডো যায়।

ভাইগ্গ বালা হলিদ খেতটা পুরাডা অহনো ডোবে নাই। বিলের দিগে অদ্দেক ডোবছে। আমাগো শব্দ হুইন্না হলিদ খেতের তন বড় একটা গুইল বাইরাইয়া পুগুর পারো উইড্ডা পুব দিগে দৌড় দিল।

গামায়ও খেউ খেউ কইররা পিছ লইল। বড় কড়ই গাছের গোড়াত গুইলডার গদ। গামায় ধরনের আগে লেজ দিয়া গামার থুতমাত একটা বাড়ি মাইররা গদো ডুইক্কা গেল।

কিছু করতো না পাইরর‌া রাগে গদোর পাশে খাড়াইয়া খাড়াইয়া গেউয়্যাইতে থাকলো গামায়।

হলিদ পাতাগুলি বিষ্টির পানিত ধুইয়া চকচইক্কা অইয়া রইছে। তয় মাডি বেগ-বেইগ্গা দিয়া গেছে। পাড়া দিলে পাও গাইররা যায়, হেই লগে গাছের গোড়ার তন হলিদ ছুইট্টা ভিতরে ডোহে। দুইডা হলিদ পাতা কুশ দিয়া সিলাই কইররা বাসা বানাইছে। টুনটুনির বাসাডার কতা কেউরে কই নাই। সাক্কুরে কইলে ভাইঙ্গা লাইতো।

ধারে যাইতেই টুনটুনিডা বাইরাইয়া পাশের গৈয়ম গাছের ধারে উড়াউড়ি করতে লাগলো। চুউপ্পে আইলে বাসার মোক বন্দ কইররা দরতারতাম। বাসার মইদ্দে উঁক মাইররা দেহি ছোড ছোড দুইডা ফুডি-ফুডি ডিম। আশে-পাশের কয়ডা হলিদ গাছ সোজা কইররা হরাইয়া দিলাম।

হলিদের গেরান আমার খুব বালা লাগে। একটা হলিদ ভাইঙ্গা গেরান হোকতে হোকতে ক্ষেতের পাশের তন অনেকগুলি হামুক টোগাইলাম। জামাডা খুইল্লা খইলতা বানাইয়া হেইডার মইদ্দে থুইলাম হামুকগুলি।

মায় আসের ছাওগুলিরে খাইতে দিব। কাম শেষ কইররা পুগুর পারো আইয়া গামারে কোনো হানো টোগাইয়া পাইলাম না।

‘গামারেএএ আয় আয় আয়, চ্চু-চ্চু-চ্চু!’—দুইবার ডাক মারতেই পুগুরের পুব পারের তন জঙ্গলের মইদ্দ দিয়া দৌদ্দিয়া আমার দিগে আইতে লাগলো। আমিও কুত্তাডার সামনে সামনে ঘরের দিগে দৌদ্দিলাম।

 

১৪.

বাতাস বাড়ছে অনেক। গাইত ধাক্কা লাগে। কাডা বাগানের গাছগুলিও জোরে জোরে লড়তাছে। বাদাম গাছের তলে আইতে না আইতে হুজুর ছারের আছরের আজানের গলা হোনলাম।

গরো আইয়া দেহি কেউ নাই। দাদায়ও নাই। উডানোও কেউ নাই। বড় চাচার লাশও নাই। বাড়ির মইদ্দেও কেউরে দেহা যায় না।

মনে অয় দরজার মাতাত লইয়া গেছে কবর দেওনের লাইগ্গা। হামুকগুলি পাহালো খাচার মইদ্দে ডাইল্লা থুইয়া পুগুর গাডো যাইয়া বালা কইরর‌া আত মোক বিজাইয়া উজু কইররা লইলাম।

আমার স্যান্ডেলগুলি কাচারি গরো টেবিলের নিচে। সন্দার সুম বাড়ির সব পোলাইনে জিগির ছারের ধারে পড়তে বই আমরা। মাগরিবের আজানের পরের তন রাইত নয়টা দশটা পযজন্ত। বেক চাচারা মিল্লা জিগির ছারেরে রাখছে। একেক দিন একেক গরের তন ছারের খাওন যায়।

চরফ্যাশন কলেজো পড়ে কলিমুল্লা ছারে। ছারে কলেজের তন আইছে নি কে জানে। আইজ ভাত দেওনের কতা পশ্চুম ঘরের।

হুকনা নীল জামাডা পইররা তাড়াহুড়া কইররা দৌড়ান দিলাম। উডানের পানি নাইম্মা গেছে। কাচারির দরজা চাপাইন্না। ফাক দিয়া চাইয়া দেহি কলিম ছারে চইর উরপে উপ্পুর কইরর‌া ছোড চাচার পোলা আলাউদ্দিন্নারে পোন মারতাছে। আলাউদ্দিন্নায় আমাগো ইছকুলো থ্রিতে পড়ে।

কোনো শব্দ না কইররা পাও টিইপ্পা টিইপ্পা পিছাইয়া আইলাম। কাচারির কোনাত আইয়া হরমুলের বেড়াডা পাছাইয়া একটা লাত্তি মাইরর‌া দিলাম খিচ্চা দৌড়! এক দৌড়ো দরজাত চইল্লা আইলাম। গামায়ও আমার পিছে পিছে আইয়া পড়লো। আওনের সময় পথো দেহি কেলার ডাউগ্গার বেড়ার এই পাশো মা-চাচিরা বেকে মিল্লা গোমডা দিয়া খাড়াইয়া রইছে।

বাবায় দেহি আইছে কোনসুম। দাদার বগলের তলো আত দিয়া লাইনো খাড়াইয়া রইছে। আরেক পাশো কবির ম্যাভাই।

ম্যাভাইর পাশে টুপি মাতাত দিয়া কামাইল্লায় খাড়ায়া রইছে। বারে বারে ডাইন আত দিয়া চোউক মোচতাছে। আর ডেউক্কাইয়া ডেউক্কাইয়া কান্দে।

চাচার লাশ খাডো রাহা। দেইকখা চিনলাম, এইডা কাজী বাড়ির মজজিদের। জানাজা পড়াইতাছেন হুজুর ছারে।

পচিশ-ত্রিশ জন মানুষ অইছে জানাজাত। পাশের বাড়িগুলির কয়জন। বাপেগো পাশে পাশে বাড়ির পোলাইনেও লাইনে খাড়াইছে।

আমিও এক পাশে খাড়াইয়া গেলাম।

জানাজার অদ্দেকের সময় দুইবার লন্চের সাইরেন বাইজ্জা ওটলো। পত্যেক দিনই এইসুম সাইরেন মারে। আর কতক্ষণ পর বেউত্তার তন চানপুরোর দিগে লন্চ ছাড়বো। আরদ্দারেরা মরিচ, মুগডাইল, নাইকেল-টাইকেল লইয়া যায় চানপুর বেচতো। বাপে মাঝে মইদ্দে যায়। বাপে যহন যায়, সাইরেন বাজলেই মায় কয়, তোর বাপের লন্চ ছাড়বো কতক্ষণ পর।

বাহে কইছে, মনপুরার তন ছাইড়া বেউত্তার পর লালমন, মীর্জাকালুর তনও মাল উডায় লন্চো। হেরপর চানপুর নামাইয়া লন্চ যাইবো ডাকায়। ফিরবো একদিন পর, পশশু।

(কিস্তি ৪)