গোল ও ক্লান্ত উদ্যানের ভিতর

১.
বহু বছর ধরে ভেসে ভেসে সন্ধ্যায় একটা পার্কে এসে ঠেকে যাই আমি।

গোল এবং ক্লান্ত উদ্যানের ভিতর অনেকে ঘুরে ঘুরে হাঁটে। অনেকে বসে থাকে টুলের উপর। গালিগালাজ ও খুনখারাবী সমৃদ্ধ তীব্র সব গল্প করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অন্যরা। প্রত্যেকের মুখের উপর বিশৃঙ্খল জীবন ও ধান্দার ছাপ। সে সব ফুটে ওঠে, মিলিয়ে যায়, স্পষ্ট আর অস্পষ্ট হয়ে পড়তে থাকে ঘুরে ঘুরে। সাদা লাইটে অন্ধকার ঘনীভূত। যেভাবে লাইফ সাপোর্টের নল ও কলকব্জা একজন মৃতপ্রায় লোককে আরও বেশি মৃতের মত করে তোলে, লাইটপোস্টগুলো সেই মত অন্ধকারকে আরও অন্ধকারাছন্ন করেছে মাত্র। পাতার উপর জমে ওঠা মৃত-ধৃত-ধুলা এই রাতেও দেখা যায়, তাই দেখা অসম্ভব নয়।

বহু বহু বছর ভেসে সন্ধ্যায় একটি পার্কে এসে পৌঁছল সে এইভাবে, আমি ভাবি, এবং উদ্যানের নানা অলিগলিতে ঘুরে ঘুরে একটি খালি বেঞ্চি খুঁজতে থাকি। কিন্তু প্রতিটি বেঞ্চিই দখল হয়ে আছে। আমার খোঁজা ধীরে ধীরে মরিয়া হয়ে উঠতে শুরু করে। খালি বেঞ্চির অভাবে নিজেকে কিছুটা বিভ্রান্ত লাগে, আমি যে অনেক সহজেই বিভ্রান্ত বোধ করি, তা আমার কাছে প্রকাশিত হয় পুনরায়। কত আগে, কতদিন আগে যে আমি এই পার্কে পৌঁছেছি তা মনে নেই। শূন্য বেঞ্চি খুঁজতে খুঁজতে টের পাই পিছনে ফিরে তাকানো আর সম্ভব নয়। স্মৃতি ও বিস্মৃতি কোনো স্থান নয় যে ওরা আশ্রয় দেবে গভীর রাতে ঘুমাবার একটা বেঞ্চির মতন।

খালি বেঞ্চি আমি খুঁজে পাবো না, এরকম একটা ভয় আমার ভিতরে তৈরি হতে শুরু করে। পরে, খালি বেঞ্চি খুঁজতে খুঁজতে, ক্রমে ক্রমে, আমি খালি বেঞ্চি খোঁজার মধ্যে ঢুকতে থাকি এবং খালি বেঞ্চি খুঁজে না পাবার ভয় কেটে যায়। আমি বুঝতে পারি রাত যত বাড়বে ততই খালি বেঞ্চের সম্ভাবনা বেশি ভাবে তৈরি হতে থাকবে। এখন আমার কাজ শুধু অপেক্ষার ভিতরে গাছের মত স্থির হয়ে থাকা, তা আমি হাঁটি ঘুরে ঘুরে, বা কোথাও দাঁড়িয়ে থাকি দৈবপ্রেরিতের মত।

অনেক দূরের আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়, কিন্তু এখানে বৃষ্টি হয় না। গাছসমূহ ঝাঁকি দিয়ে দিয়ে আকাশের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রতিনিয়ত চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। খুব ধীরে বাতাসে ঝরে পড়ে মৃত ধুলা, অদৃশ্য বিবর্তনের দৃশ্যমান মাকড়সার জাল প্রায় হয়ে। দূরের বিদ্যুৎ চমকানো, নিকটের বৃষ্টি না হওয়া, ঝাঁকি খাওয়া বাতাসের গুরুতর চলাচলের মধ্য দিয়ে রাত হাঁটে, এবং কখন যেন গভীর হয়। একটা খালি বেঞ্চি আমি পেয়ে যাই এসবের ভিতরে, এবং বেঞ্চিটার এক কোনায় বসি, ভাসমান ম্রিয়মাণ কুঠার। ব্যাগ থেকে চাদরটা বের করে গায়ে দেই, এবং মুহূর্তে অদৃশ্য হয়ে যাই।

হ্যাঁ, এই চাদরটার বৈশিষ্ট্য হল একে গায়ে দিলে কেউ আর আমাকে দেখতে পায় না। তবে এর ব্যতিক্রমও আছে। চাদরটা গায়ে দিলেও যাদের প্রতি আমি মানসিক ভাবে ভালনারেবল তারা আমাকে দেখতে পায়। তখন চাদর অকেজো। চাদরের নিজেরও একটা মর্জি আছে। আমার ভালনারিবিলিটি সে নিজে টের পায়, নিজের মর্জি মত আমাকে প্রকাশ করে দেয়, কখনো কখনো আমারই অজান্তে। এ চাদরের মর্জির উপর আমার নিয়ন্ত্রণ নাই।

রাত আরও বাড়ে এবং সে সময়ে ঘটনাক্রমে একজন অল্পবয়স্কা উদ্ভিন্ন মেয়ে ওই টুলের আরেক প্রান্তে এসে বসে। আমি তাকে দেখে বুঝতে পারি তার পেশা কী, বহু বছর ধরে তাকে আমি চিনি, এরকম ভাবে। কয়েক বছর আগে কোথাও, অন্য কোথাও, তাকে আমি দেখেছিলাম বলে মনে হয়, যদিও মনে নেই ঠিক কোথায়। কিম্বা চিনি না তাকে। তাকে চিনি মনে হওয়াটা গভীর এক ভ্রান্তি। মূলত এর আগে তাকে কোথাও কোনোদিন দেখি নি আমি। তাকে চেনাই মনে হয়। চাদরের ভিতর থেকে তাকে দেখে ভয়ানক চমকে উঠি—কেন তা বুঝি না।

লম্বায় মাঝারি মেয়েটি অদ্ভুত সুন্দর, একহারা, বাঁকসম্পন্ন, তবু কেমন সামান্যে ম্রিয়মাণ, দুঃখী। বেশ অনেক সময় কেটে যায়, অনেক বছরের মত। টুলের ওই প্রান্তে দৃশ্যমান সে, আর এই প্রান্তে অদৃশ্য আমি, বছরের পর বছর ধরে। মনে হয় পৃথিবী তার কক্ষপথে থেমে গেছে। যখন ভাবছি তার খদ্দের ধরবার পদ্ধতি কী, সে বেঞ্চি থেকে উঠে এদিক-ওদিক গিয়ে গ্রাহক সংগ্রহ করে আনবে, নাকি এইখানেই এইভাবে খদ্দেরের অপেক্ষায় বসে থাকবে—এসব ভেবেছিলাম কারণ তখনো তার খদ্দের ধরবার ক্ষমতা আমার জানা হয় নাই—ঠিক তখনই তার প্রথম খদ্দের চারদিকের আঁধার থেকে টপ করে উদিত হয়ে তার দিকে এগিয়ে আসে।

s haque 2

বোঝা যায় লোকটি তার আগের পরিচিত, প্রায় সমান বয়সের, পরস্পরের দিকে তাকিয়ে তারা হাসে, এবং মুহূর্তের মধ্যে নগ্ন হয়ে বেঞ্চির উপর এক কুইকিতে লিপ্ত হয়। লোকটির সাডারিং, চূড়ান্ত সময়ে শিহরিত হওয়া আমি চাদরের আড়াল থেকে লক্ষ করি। মনে হয় প্রতি সঙ্গমে এই শিহরন তৈরি করতে পারাটাই মেয়েটির বৈশিষ্ট্য। এইভাবেই সে কাস্টমার ধরে রাখে। এইসব সাডারিং-এর কথা লোকমুখে বহু বহু দূরে ছড়িয়ে গিয়ে থাকবে, ছড়িয়ে আছে বলে আমি টের পাই। তাকে একটি শুয়োরের বাচ্চা মনে হয় জীবনের মত। তার অন্তর্গত সর্বনাশা সৌন্দর্য ধীরে ধীরে আমার কাছে প্রকাশ হতে থাকে, এই এবং বহু শিহরনের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে আমার প্রথম ইনসটিঙ্কট হয় এখান থেকে বহু বহু দূরে মুহূর্তের মধ্যে পালিয়ে যাবার, আমার জীবনের শেষ দেখবার অনুভূতি হয় আমার। কিন্তু আমি কোথাও যাই না। বসে বসে তার অন্যের সাথে সঙ্গম করা, চাদরের পিছনে লুকিয়ে, অপলক ভাবে দেখতে থাকি।

লোকটা পয়সা মিটিয়েও যেতে চায় না। কিন্তু মেয়েটি হাসি মুখে গালিগালাজ করে তাকে বিদায় করে দেয়। মৈথুনের শিহরনের পর খদ্দেরের মনে যে আনন্দ তৈরি হয়েছিল, মুহূর্তের মধ্যে তা মিলিয়ে যায় ও সে চলে যাওয়ার সময় তার মুখে শিহরণ-জনিত পূর্বের সেই ছায়া আমি আর দেখতে পাই না, বরং ঝুলে পরা মুখে তাকে বিমর্ষই মনে হয়।

এরপর মেয়েটা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ ছয় জন খদ্দেরের সাথে মিলিত হয় ওই বেঞ্চির উপরে বসে বা শুয়ে বা বেঞ্চির সামনে দাঁড়িয়ে, একটা পা বেঞ্চির উপর তুলে বা না তুলে। সে শুকনা পাতলা বলে দুই পায়ের উপর দাঁড়িয়ে মিলন ঘটাতে তার ভাল সুবিধা হয়, তার ক্লায়েন্টরাও এই ভঙ্গি খুব পছন্দ করে বলে আমার মনে হল। কোনো কোনো সময় সঙ্গমরত অবস্থায় মোবাইল ফোন বের করে সে ফেসবুকিং করে, ভাইবারে কারো সাথে চ্যাট করতে করতে হাসে, খদ্দের এসবে আপত্তি করলেও সে পাত্তা দেয় না। আমি বুঝতে পারি না এইসব মৈথুন সে তত এনজয় করছে কি করছে না। কিন্তু খদ্দেরদের শিহরন অব্যাহত ভাবে চলতে থাকে এই সবকিছুর মধ্যেই। অবশ্য দু একটি সঙ্গমের সময় সে খুব মগ্ন হয়ে পড়ে। আমি তার মগ্ন মুখ, মগ্ন শরীর, লিপ্ত, মগ্ন ওঠানামা স্তম্ভিত হয়ে দেখি। তার উদোম মগ্নতা ড্যাগারের মত আমার ভিতরে প্রবেশ করে চিরস্থায়ী হয়ে ঘুরতে থাকে। নিজেকে কুকুরের মত মনে হয়। এইভাবে আমার ভালনারিবিলিটি শুরু হয়।

আমি দেখি যে মেয়েটি খুব দ্রুত কাপড় খোলায় ও পরে ফেলায় সিদ্ধহস্ত। বারবার তাকে নগ্ন ও সঙ্গমরত অবস্থায় দেখেতে দেখেতে আমার মাথা ঝিম ঝিম করে। আমি টের পাই মেয়েটির শরীর অনেক জীবন্ত জোনাকির সমষ্টি। বিশেষত তার স্তনদ্বয় নরম আগুনের জাম্বুরা ছাড়া আর কিছু নয়। চাদরের এপাশ থেকেও তা টের পেতে কারো অসুবিধা হয় না বলে সব টের পাওয়া যায় অসুবিধাহীন ভাবে। শেষ রাত্রের দিকে সে সম্পূর্ণ ভালনারেবল হয়, এবং তখন মেয়েটি আমাকে দেখেতে পায় প্রথম বারের মত।

আমাকে দেখে সে ভীষণ রকম ধাক্কা খায়, এবং এক সংঘাতে বেশ কয়েকবার কেঁপে ওঠে। তার রিয়েকশন হয় এগ্রেসিভ। সে হিস হিস করে বলে ওঠে, “এই, এই, এই… তুই কে রে হারামজাদা বুড়া ভাম, সারা রাত্র চাদরের ঐ পাশ থিকা আমারে দেখছস?” কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে, বুঝতে পারে না কী বলবে এরপর। আমি চাদর সরাই। চাদর সরানোই আমার প্রথম কথা বলা, তার সাথে।

কিছুটা সময় আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে সে আবার কথা বলতে শুরু করে, “দে, দে, টাকা দে আমারে। সারারাত্র চাদরের ওপাশ থেকে মজা দেখছস, টাকা আমারে দিতেই হবে তোর, কোনো কিছু ফ্রি না এই পৃথিবীতে। তুই যা করছস তা তো লাগানোর থেকেও অধম।”

কিন্তু আমি যখন তাকে সত্যি সত্যিই টাকা দিতে যাই তখন মেয়েটি অফেন্ডেড বোধ করে, টাকা নেয় না, বলে, “কেন, তোর কাছ থেকে টাকা নিমু ক্যান? তুই তো আমারে লাগাস নাই।”

চুপচাপ হয়ে যায় ক্ষণিকের জন্য, মুখটা গম্ভীর, খুব ঠাণ্ডা হয়ে বলে, “কে আপনি? আগে তো দেখি নাই এইখানে?” আমার চোখের দিকে তাকায় তখন সে, কথা বলার সময় চোখের দিকে তাকানোর অভ্যাস আছে তার, আমি দেখি, “আপনার ঘুমাবার যায়গা নাই, তাই না? তা আমার বেঞ্চিটা নিলেন কেন, আরও তো অনেক বেঞ্চি ছিল। আচ্ছা নিছেন ভাল করছেন।” বলে সে নিজের ওড়না ঠিক করে কিছুটা।

তখন দেয়াল ভেদ করা আভাসহ ভোর তৈরি হয়। সবি তৈরি হয় এই গ্রহে, বিন্দু বিন্দু করে বা হঠাৎ, তবু কোনো কিছু ‘হয়’ না; ‘তৈরি হয়’ কেবল। ইনসমনিয়াক ডালগুলি আড়মোড়া ভেঙে একটা নতুন দিনের দিকে তাদের এন্টেনা ঘুরিয়ে দিতে থাকে। একবার উদ্যানের সমস্ত পাতাকে একত্র করা বাতাস উঠলে সে আমাকে বলে, “চা খাইবেন আমার সাথে?” এবং তারা চা খেতে পার্ক ছেড়ে বের হয়। পার্কের গেটে দাঁড়ানো পুলিশটা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হাসে, মেয়েটিও তার প্রত্যুত্তর দিতে ছাড়ে না। পরস্পরের প্রতি হাসা শেষ করে পুলিশটা আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেও আপাতত কিছু বলে না। পার্ক ছেড়ে দুএক কদম এসে মেয়েটি বলে, “এই পুলিশটাকে আমি ভালবাসি। কারণ হইল সে দেখতে ফিল্ম স্টারের মত এবং লাগায় খুব ভাল, এবং সে আমার মত চিন্তা চেতনা করে!” চিন্তা চেতনা নতুন রৌদ্রের মত পথে শুয়ে পড়ে, এই কথা বলা হয়ে যাওয়ার ফলে।

অত ভোরে চায়ের দোকান ফাঁকা। চুলা জ্বলছে তবু, চুলাটাই এক জ্বলন্ত খদ্দের, নিজের খদ্দের, নিজেই নিজের খদ্দের, খদ্দেরের অভাবে। চুলার উপর চা ব্রু হচ্ছে, ফলে চা খাওয়ার তৃষ্ণা ঘণীভূত হয়ে আসে। দোকানদার মেয়েটিকে—তার কি কোনো নাম নেই?—তার একটি নাম প্রয়োজন—তার নাম নন্দিনী—দোকানদার নন্দিনীকে চেনে তা বোঝা গেল। চা খেতে খেতে নন্দিনী জানায় যে তার একটি স্বামী আছে, “হ্যাঁ সত্যিই আছে,” শব্দ-হাসি, “আছে তো”, সেই স্বামী তাকে একই সাথে ভালবাসে ও ঘৃণা করে, “কিন্তু আমি তাকে ভালবাসি, শুধুই ভালবাসি।” একটু অদ্ভুত ভাবে তার দিকে তাকিয়ে সে রহস্য করে, “কেন দুই-তিনজনকে, একাধিক জনকে একলগে মনে স্থান দেয়া যায় না বুঝি আপনাগো ভদ্র ওঠাবসায়? আমার যায়, আমি করি জীবন ওই ভাবেই।”

s haque 3

জীবনকে করা নতুন মনে হয়, অস্তিত্বের ভিতরে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে হতে হতে থাকে এই নতুনত্ব। তখন তার নিজের সম্বন্ধেও দুএকটা কথা বলতে ইচ্ছা করে নন্দিনীকে, এবং বলে, যা শুনে নন্দিনী বলে, “আপনি তো দেহি, বেশ্যা না হইয়াও বেশ্যার অধম।” বলে, কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে, মাঝে মাঝে স্তব্ধ হয়ে পড়া তার অভ্যাস, “কিছু মনে করলেন না তো? তাইলে মাপ কইরেন।” সে যে কখনো কখনো খুব সহজেই মাপ চাইতে পারে লোকটি তা বুঝল, কিছুটা হতভম্ব হয়ে। কিন্তু সব সময়ে সে যে এত সহজ নয় তাও বোঝা যায় এই সহজতার মধ্য দিয়েই। “আমি আমার খদ্দেরদের কাউকে কাউকেও ভালবাসি। আমি তাদের জন্যে অপেক্ষা করি।” প্রেমের দিকে তার এক মনোরম পক্ষপাতিত্ব আছে, এবং তা ফুটে ওঠে বিরক্তিকর ও মনোমুগ্ধকর আলোর মত অপরূপ মিশ্র হয়ে। আধো অন্ধকার রানওয়ের মত একটা দিন চারপাশে আরম্ভ হয়েছে। আমি ভাবি তবে কি সে শুধু অর্থনৈতিক কারণে বেশ্যা হয় নি? আমার মনে হয় নন্দিনীর সীমাহীন অন্তর্গত ও বাইরের সৌন্দর্যই তাকে ভালবাসার প্রতি এইভাবে পক্ষপাতী করে তুলেছে। সে তার মুখ, স্তন ও মন নির্ভর।

আমি লোকটাকে ও নন্দিনীকে দেখতে থাকি, যেন আমি আলাদা কেউ। লোকটি ধীরে ধীরে জালে আটকে যাচ্ছে দেখে কষ্ট হয়। অতীত অবসন্ন হয়ে যায়। লোকটির কোনো নাম নেই, কোনোদিন হবে না। তার পরিচয় নেই এইখানে বা কোনোখানে। কোনো চরিত্রই সে নয়, এমনকি সুনির্দিষ্ট পাশ-চরিত্রও নয় সে। তবু সে কেন এইভাবে জড়িয়ে পড়ছে এমন কারো সাথে যে তাকে একেবারে শেষ করে দিতে পারে? এই হল দুর্বলতা, এইভাবে মৃত্যুর সাথে প্রেম হওয়াই জীবনের আপামর ভালনারিবিলিটি, বেঁচে থাকবার যথার্থতা, আমি ফিসফিস করে লোকটাকে বলি। আমি তাকে আরও বলি, এই দুর্বলতাই তুমি, তুমি অটল নও, বলবান নও, শক্তি নেই তেমন তোমার। শক্তিহীনতাই তোমার বেঁচে থাকা।

নন্দিনী জিজ্ঞেস করে, “বিড়বিড় করে কার সাথে কথা কন আপনে? আপনে তো দেহি পাগলের হদ্দ!” চা শেষ হয়ে গেলে, আগের কথা ভুলে গিয়ে বলে, “যাই। ঘুমাইতে হইবে। স্বামীরে সঙ্গ আর দেহ দিতে হইবে। দেখা হইবে সন্ধ্যায় আপনার লগে। এই বেঞ্চিতে বইসেন না আইজ রাত্তিরে। হুম। নাহ। ঠিক আছে, বইসেন। চাদর মুড়ি দিয়া থাইকেন। তাইলে আপনারে আর কেউ দেখতে পাইবে না। আমি দেখলে আর ক্ষতি কী? আপনার লগে করুম না কোনদিন, তাইলেই তো হইল। কী কন মিয়া ভাই?”

ভয়ঙ্কর কষ্ট হয় আমার। তবু আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ি। মেয়েটি অনায়াসে, কথায় কথায় কষ্ট দেবে বুঝে আমি একটু ঝুঁকে যাই। আমি তার বন্ধু নই,কোনোদিন হব না, তা সে নিজেও জানে, তবু যেন সে আমার বন্ধুই হতে চায়। আমি মনে মনে ঠিক করি সেরকম কিছু হওয়ার চেষ্টা আমি করব, যদিও তাতে গভীর গভীর বেদনা হবে আমার। দেখি যে, নিজের যে কোনো ব্যাপারে সে খুব সংবেদনশীল আর আমার ব্যাপারে চূড়ান্ত বা অনেকটাই অনুভূতিহীন, তার বহু প্রেমিক আছে বলেই হয়ত সে আমার ব্যাপারে এইরকম।

এইটা আমাকে মনে রাখতে হবে, বারবার ব্যথা পাওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করবার জন্য, আমি ভাবি। কিন্তু জানি এরকম কোনো কিছু আমি মনে রাখতে পারব না, এবং বারবার ব্যথা পাব। এরপর সে চলে যায় এরকম হয়ে সেদিনের মত।

২.
কত দিন কেটে যায় মনে করতে পারি না। এক বেদনাহীন ব্যাখ্যাহীন অতীত অস্থিরতার মধ্যে আমি বর্তমানে ঢুকে পড়ি ভোর থেকে।

ব্যাখ্যাহীন নয় তা। অতীতও নয়। বেদনাহীন নয় মোটেই। যা বেদনাহীন তা ভয়াবহ বেদনার।

কোনো কিছুই ব্যাখ্যাহীন নয় তত।

আমার অবস্থানের ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া সম্ভব, সবকিছুর মতই।

কিন্তু আমি নিজের সাথে ভণ্ডামি করে যাব ঠিক করি, এবং ভাবি যে, ভোর থেকে এমন এক বেদনাহীন অস্থিরতার মধ্যে লোকটা ঢুকে পড়েছে যার কোনো ব্যাখ্যা নেই।

বহুদিন হয়ে গেল এই বেঞ্চিতে বসে আছি আমি। ভাবছি কেন এই পার্কে এসেছিলাম। অন্য কোনো পার্কেও তো ভেসে ভেসে যেতে পারতাম অনায়াসেই। আর এই পার্কে যদিও এলাম, কেন এই বেঞ্চিতে এসে বসলাম? বেঞ্চি তো নয়, আসলে এক ভয়াবহ নাশ, ফাঁদ, মহা জাগতিক অর্থহীন অস্থিরতা, এর উপরে বসেছি আমি, ভিতরে ঢুকে গেছি। এবং মৃত্যুর মত কিছু একটা আমাকে পেয়ে বসেছে, মৃত্যুর আগে। একদিন একদিন করে বহুদিন আমি কাটিয়েছি জীবনে, কিন্তু এখন এক মুহূর্ত এক মুহূর্ত করে পার করতে হচ্ছে সময়। ভাবছি কখন বিকাল হবে, কখন সন্ধ্যা হবে, কখন রাত গভীর হবে আর আমি নন্দিনীর দেখা পাব।

এ কোথায় এলাম আমি, কেন এলাম?

প্রতিবার নন্দিনীর সাথে দেখা হওয়ার পর যখন সে চলে যায়, আমার মনে হয়, তার সাথে আর কোনোদিন দেখা হবে না আমার, এবং দেখা না হওয়াই ভাল। কিন্তু পরক্ষণে মনে হয় দেখা হওয়া দরকার, খুব দরকার। এ এক ভয়াবহ বেদনা, ভয়ঙ্কর ভুল।

এই অপরিবর্তনীয় ভুল ভোর থেকে আমার মধ্যে প্রবেশ করে, গ্লানি তৈরি হয়।

দেখি যে আমার ক্ষুধা নেই তৃষ্ণা নেই, শুধু ভুল আছে।

মাঝে মাঝে মনে হতে থাকে যে আমি মানুষ নই, মানুষের চেয়ে বহু ছোট কিছু। মানুষের যে সব স্বাভাবিক অধিকার আছে আমার তা নেই। বেঞ্চির উপর বসে বসে আমার ঘুম আসে, মনে পড়ে বহুদিন ধরে রাতের পর রাত জেগে থাকছি আমি।

কীসের জন্য?

বেঞ্চির এক কোনায় বসে আরেক কোনায় সঙ্গমরত বেশ্যাকে দেখার জন্য?

কেন?

সে তো ভয়াবহভাবে আমার কেউ না। সে তো উদ্যানের এবং অন্যদের।

সে তো সারারাত পার্কে নিজের কাজে জেগে থেকে দিনের বেলা বাসায় গিয়ে ঘুমায় সারাদিন। আমি সারারাত জেগে থাকি পার্কে অন্তঃসারশূন্য ভাবে, আর দিনের বেলাতেও আমি পার্কেই জেগে থাকি, অন্তঃসারশূন্যভাবে।

এই পার্কের ভিতর দিয়ে অনেকগুলো ঘোট পাকানো জটিল নলের মত, সরীসৃপ অয়েল পাইপের মত সময় প্রবাহিত হতে থাকে।

গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে ফেরিওয়ালারা ছায়ার অন্তরালে চলে যায় সারাদিন। অনেকেই ঘোরলাগা ঘূর্ণমান কণ্ঠে ফেরি করে তাদের ঝালমুড়ি—চুড়ি—প্লাস্টিকের খেলনা— জিনসের প্যান্ট—সালোয়ার কামিজ—লাল নীল অন্তর্বাস।

মনে হয় তাদের ডাক দিয়ে তোলা ধ্বনির ভিতরেই রাখা আছে তাদের পসারসমূহ।

আর কেউ কেউ বসে থাকে একটি নির্দিষ্ট যায়গায় সেই ভোর থেকে। তাদের বিক্রির সামগ্রী রাখা আছে, হয়তো বা, তাদের স্থিরতার ভিতরে। ফেরিওয়ালা এই রকম, কেউ ঘোরে সারা পৃথিবী, আর কেউ একজায়গায়বসেথাকেসারাজীবন।

আমি ভাবি, লোকটা ভাবে, এটি একটি ছোটো পার্ক, তবু এত ফেরিওয়ালা কেন এখানে। পাশের ঘোরানো সব লোকালয়ের ছায়া এসে পড়েছে এই পার্কে। সেই ছায়ার আশ্রয় চায় কি সব ফেরিওয়ালা, ঘুরে ঘুরে, বসে বসে? কেন চায়? কীভাবে চায়?

আশে-পাশের বিল্ডিঙের জানালার মুখগুলি পরিবর্তিত হয় আর হয় না।

কোনো জানালায় সারাদিন ধরে একই মুখ শিকের সাথে লেগে চ্যাপটা কুকুরের মুখ হয়ে জেগে থাকে। সমস্ত পৃথিবী ঐ মুখের মধ্যে এসে থেমে আছে দেখা যায়।

কোনো কোনো জানালা থেকে থেকে শূন্য হয়ে পড়ে, কিন্তু শূন্য হয়ে পড়ে না। মুখ সরে যাওয়ার পরও মুখগুলি মুখের ভাব হয়ে জানালার শিকের সাথে লেগে থাকে স্পষ্টতই।

জানালার সব মুখই চ্যাপ্টা আর শিকে লেগে থাকা হয়ে যায়।

কোথাও অবিরাম মুখ বদল হতে থাকে, যদিও একটি দুটি মুখই প্রধানত ঘুরে ঘুরে দেখা দেয় সব বদলের ভিতর দিয়ে। পুনরায় ফিরে এলে সেই এক মুখ আর এক থাকে না, দ্বিবিধ হয়ে পড়ে, বহুবিধ হয়ে যায়।

মুখহীন জানালায়ও অদৃশ্য মুখ দেখা যায়, এ পার্কের আশে পাশে কিছুই মুখহীন নয় আর। জানালা আর মুখ যমজের মত সারাদিন বাজে। তার মনের মধ্যে চ্যাপ্টা হয়ে হামাগুড়ি দেয়।

দিন যত সামনে আগায়, ফেরিওয়ালাদের কণ্ঠস্বর তত ঝিমিয়ে পড়ে, এমনকি যে সমস্ত ফেরিওয়ালা এই মাত্র প্রবেশ করেছে পার্কে, গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে ছায়ার ভিতরে চলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে, তাদের ধ্বনিও শক্তিহীন, ম্রিয়মাণ হয়ে আসে।

যেন তাদের বিক্রি করবার পসার আর নেই তেমন, বিক্রি করবার চেয়ে ঝিমিয়ে পড়া অনেক জরুরি। পসারের ওজনে তাদের ক্লান্ত মাথা হেলে পড়ে গাছের ছায়ার মত।

অনেক দূরের কোনো গ্রাম থেকে এসেছে কেউ কেউ বহু আগে প্রেমহীন এক বোধ নিয়ে—ভেঙে পড়া, নদীতে তলিয়ে যেতে যেতেও তলিয়ে না যাওয়া স্বপ্নের হাত ধরে, বেঁচে, জেগে উঠবার জন্য। আজো তাদের ফেরি করা হয় নি তেমন, ইনকাম করা হয়ে ওঠে নি তাই, স্বপ্নের কাছে ফিরে যাওয়ার পথও আর তৈরি হয় নি।

কেউ কেউ জন্ম থেকেই এ শহরে মাছির মত নীল হয়ে আছে। ওই ভাবে উড়ছে, কোনো স্থায়িত্বে বসতে না পেরে, ডাল থেকে ডালে, ডাস্টবিন থেকে ডাস্টবিনে।

কোনো এক অমোঘ মুহূর্তের বিস্ময়ে ভুল টার্ন নেয় জীবন, চিরস্থায়ী ভাবে।

আমি দেখি, লোকটা দেখে, বেলা বাড়বার সাথে সাথে সকালের লম্বা ছায়াগুলো ধীরে ধীরে ছোটো হয়, তারপর আবার দীর্ঘ হতে শুরু করে স্লো মোশনে। পার্কে হাঁটতে আসা-বসতে আসা লোকদের শরীর, ফেরিওয়ালাদের শরীর ও ছায়া রৌদ্রে আর ছায়ার অন্তরালে ছোট বড় হয়, ভাসে ডোবে; হ্রস্বতায়, দীর্ঘতায় সময়ের প্রপেলারের মত, অয়েল পাইপের মত পেঁচিয়ে ঘুচিয়ে আবর্তিত হতে থাকে নিজেদের অজান্তে। সময়ের প্রপেলার আমার মাথার মধ্যে সাদা ঢেউ তুলে ঘুরতে থাকে স্টিমারের প্রপেলারের মত, মগজ ছিন্নভিন্ন করে। কত কচুরিপানা যে ধানকল-মূলক ভাবে বুকের ভিতরে গুম গুম, গুম গুম রব হয়ে বয়ে যেতে থাকে।

ফেরিওয়ালাদের মতনই এই পার্কে বিস্ময়কর বহু পাখি, ওরা বহু দূরের কোন হাওড়ের, নদীর বিন্দু। পাতার ফাঁকে, ছায়ার ফাঁকে, মানুষের স্মৃতির ফাঁকে ফাঁকে বসে তারা, ফাঁকে ফাঁকে ওড়ে। ক্ষুধা-তৃষ্ণাহীন মনে হয় তাদের। অনেক পাখি ডাকেও না তেমন। কারা এইসব পাখি? নিশ্চুপ কেন এরা এত? লোকটা চিন্তা করে, ওরা কি আদৌ পাখি, না বহু দূর দেশ থেকে উড়ে আসা জীবন ও মৃত্যুর ডানাওয়ালা, ডালে বসে জমিনকে লক্ষ করা আনডিফাইন্ড সমগ্র-প্রকৃতি?

সে আরও দেখে যে, যে কোনো পরিস্থিতিতে বেঞ্চির উপর শুয়ে উপরে গাছের পাতার ঠাস বুননি সংসারের দিকে তাকালে নিজের শান্ত রূপ দেখা যায় কারণ হয়তো আগে সে গাছ ছিল কিম্বা এখন আর নেই।

ওইখানে আরেক পৃথিবী জরায়ুর তরল আশ্রয়ের মত ধীরে ধীরে আলো ছায়ার ক্যানোপি তৈরি করছে আর ভেঙে ফেলছে এমন এক কসমিক সাহসে যা মানুষের হৃদয় থেকে হারিয়ে গেছে বহু আগে।

সব কিছু… এই ফেরিওয়ালা, পাখি, ভাসমান যুগলেরা, গাছ, ছায়া,আমি, নন্দিনীর অনুপস্থিতি সব কিছু, পেচানো নলের মত প্রবাহিত সময়। তবু কিছুই সময় নয়, সময় বলে কিছু নেই বলে, প্রতি মুহূর্তে সব স্থির হয়ে আছে অনন্তকালের অ-সময়ের ভিতর, গোল, ক্লান্ত উদ্যানে। বিকালের দিকে একটা ডালের মত হেলে পড়ে এরকমই মনে হয় আমার। একটা কাক অলস ভাবে উড়ে গেল, শূন্যস্থান তাকে গিলে খেয়ে নিলো দুই কি এক মুহূর্তে।

৩.
একদিন অনেক রাতে নন্দিনীকে বিমর্ষ মনে হয়। দু একজন কাস্টমার নেয়ার পর সে অনেকক্ষণ ধরে ফেসবুকিং করে এবং কাস্টমারদের সাথে আজেবাজে কৌশল করে, ধরা দিতে চায় না, যেন আজ তার সব কাস্টমার ‘আমি’ হয়ে গেছে। পরে তা সোজা শাপটা দাবড়ানিতে রূপান্তরিত হয়। কাস্টমারগণ আনাড়ির মত হেসে হেসে সরে যেতে থাকলে একসময় সে বলে, “চাদরের নিচ থেইকা বাইর হন, আর ভিজা বিড়ালের মত ধান্দাবাজি করতে হবে না চাদর মুড়ি দিয়া।”

আমি ধান্দাবাজি করি নি। সে বেঞ্চিতে বসেই বলেছিল, “চাদর মুড়ি দেন, আপনি আমার ব্যবসার বারোটা বাজাবেন দেখছি।” তাই আমি চাদর মুড়ি দিয়েছিলাম। আমার কষ্ট হলেও আমি কোনো কিছু মনে না করার ভান করে হাসলে সে বলে, “আর হাসতে হবে না।”

আমি কি তার কাছে ধীরে ধীরে মূল্যহীন হয়ে পড়ছি? মনে মনে ভাবি একটু মানসিক শক্তি সঞ্চয় করেই অন্য কোনো পার্কে চলে যাব যথা-শীঘ্র সম্ভব। নন্দিনী আবার বিমর্ষ হয়ে পড়ে ও আমাকে বলে, “আমি আর পারতাছি না। আমার জামাইটা পুলিশটারে আর সহ্য করতে পারতেছে না। আমিও পয়সা ছাড়া দুইজনের লগে করতে করতে ক্লান্ত। আমি প্যাথলজিকাল লায়ার হইয়া গেছি, তাও পারতাছি না দুইজনরে সামলাইতে। একজন আরেকজনরে একদম সহ্য করতে পারে না। খুন খারাপি হইয়া যাইতে পারে।” তারপর সে বেঞ্চির উপর পা তুলে আসন করে বসে আমাকে জিজ্ঞেস করে, “আপনার কাছে কোনো সাজেশন আছে?” সে আমাকে কখনো আপনি, কখনো তুমি আর কখনো তুই বলে এই জন্য যে আমার ব্যাপারে কনসিসট্যান্ট সর্বনাম ব্যবহার করার মত ভালবাসা বা ধৈর্য্য তার নেই, আমার সে রকম কোনো মূল্য তার কাছে তৈরি হয় নি। সে আবার জিজ্ঞেস করে, “কন কোনো সাজেশন আছে নাকি।” আমি তাকে বলি, “হাঁটতে যাবে আমার সাথে?” শুনে নন্দিনী বলে, “এহ আমারে আবার তুমি কয়। তুই ক, বুইড়া ভাম, আমি তোর মাইয়ার বয়সী না?” সে আমার মেয়ের বয়সী নয়, তবু এই বলে আমাকে অপমান করতে তার ভাল লাগে বলে আমি এইসব শুনেও চুপচাপ থাকি সব সময়, এখনও তাই থাকলাম। কোথাও দু তিনটা পাখি ঘুম ভেঙে কিছুক্ষণ ঝগড়া করে আবার ঘুমিয়ে যায় বলে মনে হয়। তখন সে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, “চলেন যাই হাঁটতে। পুলিশটা আপনারে খুন না করলে হয়!” আমি অবাক হই, আমাকে খুন করবার মত কোনো কারণ কারো কেন থাকবে বুঝতে পারি না। আমাকে এখান থেকে ভাগিয়ে দেয়া খুব সহজ না হলেও যে কেউ আমাকে একটা কঠিন চড় মারতে পারে যে কোনো সময়ে। আমার কোনো শক্তি নেই সঙ্ঘ নেই, আমি যে পৃথিবীর উপযুক্ত নই তা আমি নিজেই জানি। আমার কোনো অধিকার বোধও নেই। না, বোধ আছে, কিন্তু তা ফলানো নেই; আমার অধিকারবোধ ফলিত নয়। তবু নন্দিনী এই কথা কেন বলে আমি ঠিক বুঝি না, কিন্তু তাকে দাঁড়াতে দেখে আমিও দাঁড়িয়ে যাই।

৪.
কয়েকদিন পরে একদিন শেষ রাতের দিকে পুলিশটা যে গেটে পাহাড়ায় আছে সে গেট এড়িয়ে আরেকটা গেট দিয়ে আমরা পার্কের বাইরে বের হই।—লোকজন পার্কে আসে হাঁটতে—আর আমরা হাঁটতে পার্ক ছেড়ে রাস্তায় বের হলাম। আমরা দুজনেই হয়তো ভেবেছি যে পুলিশটা আমাদের দেখতে না পায় যেন। এইভাবে পুলিশকে এড়িয়ে বের হওয়ার মধ্য দিয়ে, লুকানোর মধ্য দিয়ে, সে আমাকে খানিকটা বিশেষত্ব দেয়, প্রায় ভিক্ষা দেয়ার মত।

দুপাশের দোকান ছাড়িয়ে আমরা এগিয়ে যেতে থাকি। দোকানগুলোও এগিয়ে যায়, স্লো মোশনে, পিছন দিকে। আমরা হাঁটি, দোকানরাও হাঁটে। আমরা এক দিকে। দোকানরা আরেক দিকে, উলটা দিকও তো একটা দিক। সেইদিকে তারা যেতে থাকে নদীর কচুরিপানার মত শ্লথ গতিতে ভেসে ভেসে, তবে এ শহরে দোকান শেষহীন বলে কোনো কিছুই পিছিয়ে যায় না, কনস্ট্যান্ট হয়ে থাকে। শেষে আমরা মূল রাস্তায় এসে ডান দিকে ঘুরি।

ফুটপাতে উঠে সে আমাকে বলে, “আমার হাত ধরেন।” আমি অবাক হলেও প্রবল শীতগ্রস্থ হাতে তার উষ্ণ হাত ধরি। বলি, —বুঝতে পারি না তাকে আপনি বলব না তুমি, ফলে তুমিই বলি—”তোমাকে অস্থির মনে হচ্ছে।” শত শত ট্রাক আর বাস মৃত্যু-বিমর্ষ গতিতে ছুটতে থাকে পাশ দিয়ে। সে বলে “আমি ভাবতাছি এই কাজটা ছাইড়া দিমু।” আমি ঝাঁকি খাই, যা আমার হাত হয়ে, তার শরীর হয়ে, মাথা হয়ে, তার মনে প্রবেশ করে। “হয়। জানি তুমি চমকাইবা। আমি গার্মেন্টসে চাকরি লমু।” রাস্তার পাশে বিশাল এক ফাইভ-স্টার হোটেল উঠছে, সেইখান থেকে ধাম ধাম আওয়াজ আসতে থাকে, ফাইভ-স্টার দালান উঠবার আওয়াজ সম্ভবত এই রকমেরই।

এ শহরে সব দালান খুব শব্দ করে উপরে ওঠে, যেন দালানের নির্মাণ কাজের মধ্যে, যে জমির উপর দালান উঠছে সেই জমির নিচে চাপা পড়া ও ধীরে ধীরে আরও নিচে চলে যেতে থাকা বহু বহু জ্যান্ত মানুষের চিৎকার লুকিয়ে থাকছে শোনা যাচ্ছে অবিরাম।

ক্রমে তারা হেঁটে হেঁটে কন্সট্রাকশনের এলাকা ছাড়িয়ে এগিয়ে যায়। “আমি জামাইটাকে ছাড়ুম। পুলিশটাকে আমার জীবন থেইকা বিদায় করুম। গার্মেন্টসে ঢুকুম। স্বাধীন হব।” অবলীলায় বলে, “আর কোনো কাস্টমার আমি নেব না।” ফুটপাতের পাশে একটা ফুলের বাগান পড়ে এইবার। স্ট্রিট লাইটে দেখা বাগান স্বল্প নয়। আচমকা সে জিজ্ঞেস করে—বাগান নয়—নন্দিনী, “তুমি আমাকে নিবা? বিয়া করতে হবে না। শুধু থাকবা আমার সাথে সারাজীবন। তুমি তো সারাজীবন থাকার মত মানুষ না। তবু আমি জানি তুমি থাকবা আমার সাথে সারাজীবন, আমার বয়স কম তো। আমারে ছাড়বা না তুমি। আমি তা টের পাই।” এই বলে আমার স্তম্ভিত মুখের উপর চোখ মেলে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে বিষণ্ণ হয়ে যেন সত্যিই আমার ক্ষমতা আছে তাকে না নেবার; তারপর আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ় মুখের উপর খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসে। এই বিমর্ষ হওয়া আর এই হাসি দেয়া অপার্থিব মনে হয়। ফুলগাছ কাঁপে তার মৃত্যু বিমর্ষ হাসিতে। আমি কী বলব, কোন কথাটার জবাব দেব প্রথমে, পরে কোন কথার, ভাবতে ভাবতে দেখি কোনে কথারই জবাব দেয়ার প্রয়োজন নেই, সে এমনিতেই আমার সকল উত্তর জানে, বা জানার প্রয়োজন বোধ করে না। বলে, “আমরা খুব ভাল থাকব একসাথে। তুমিও একটা কাজ লইতে পার। পারো না? সারা পৃথিবী আমাদের বিরুদ্ধে চইলা যাবে তো। কিছু টাকা পয়সা লাগবে আমাদের। আর এই শহর ছাইড়া দিতে হইলেও হইতে পারে।”

আমি জানি কাল সকালেই সে এই সব ভুলে যাবে, সব ভুলে যাবে এবং হয়তো অন্য কথা বলবে। তবু তার কথা আমার খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে।

এবং তারপর, খুব, খুব বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করলে যা হয়, আমি তার কথা বিশ্বাস করে নিতে শুরু করি। ধীরে ধীরে কাল্পনিক-ভাবে সব কিছু পরিষ্কার হয়ে আসে আমার কাছে, ভোর হওয়ার কিছু আগেই।

আমি অনুমানে নিমজ্জিত হতে চাই, মনে মনে দেখতে চাই দুজনকে একসাথে বসবাস রত অবস্থায়। তার পাশে নিঃশব্দে হাঁটতে হাঁটতে আমি সেই ছবি দেখে ভয়ঙ্কর আকুলতা অনুভব করি। বুঝতে পারি এই আকুলতা আমাকে অতিক্রম করতে হবে। আমার ইচ্ছা করে এক চুম্বন উদ্ভাবন করতে, তাকে চুমু খেতে। কিন্তু কেন জানি মনে হয় সে আমাকে চুমু খেতে দেবে না; এই কথা ভেবে আমি মুষড়ে পড়ি, কিন্তু মুষড়ে পড়ি না। স্ট্রিট লাইটের আভায় সেই উদ্ভাবিত চুম্বন বৃষ্টির মত ঝরে যায়, উদ্ভাবনের আগেই।

আমার অবশ বোধ কেটে যায়, যখন সে আমার হাত আরও দৃঢ় ভাবে ধরে, এবং চাপ দেয় এবং হাসে। আমি বুঝতে পারি যে আমার বিহ্বলতা সে বুঝতে পেরেছে। মনে মনে জিজ্ঞাসা করি, “কীভাবে বুঝতে পারলে? আমি তো কিছু বলি নাই তোমাকে।” সে বলে, শব্দহীন ভাবেই, “আমারে অত কিছু বলা লাগে না।” এভাবে শব্দহীন কথা বিনিময় শব্দকে অভারটেক করে ভোর হওয়ার কিছুক্ষণ আগে, অন্য এক অজানিত আজানের মত। তখন, কেবল এর পরে, অন্য সব শব্দ ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে ওঠে।

“এতক্ষণে নিশ্চয়ই পুলিশ বাবাজি অস্থির হয়ে গেছে আমাকে দেখতে না পাইয়া!” একই বাক্যে ক্রিয়াপদ দুইভাবে ব্যবহার করা লক্ষ করবার চেয়েও যা বেশি লক্ষ করি তা হল এই যে হঠাৎ আমার মন ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেছে পুলিশের উল্লেখে। আমি বুঝতে পারি যে এখনো আমি নন্দিনীকে বিশ্বাস করা শিখি নি, এবং তা সম্ভবত সে এরকম বলে। নিজেকে আমার থাপ্পড় মাড়তে ইচ্ছা করে। কিন্তু অন্য আরেক আমি আমাকে বলে অন্য রকম কথা। “চল আমরা আস্তে আস্তে ফিরি।” এই কথা কে বলে? আমি না নন্দিনী? কোথাও নিশ্চয়ই আকাশ ফর্সা হয়ে আসে, “কাল আমার অনেক কাজ। নিজেরে গুছাইতে হবে।” এই কথা তো সে-ই বলে, বলে না কি? কোথাও তবে পাখিরাও ডাকে নানা ভাবে। “বৃষ্টি নামবে মনে হয়। কী গো বুড়া ভাম, বৃষ্টি নামলে ভিজবা আমার সাথে?” সে আমাকে অপমান করে কি ভালবাসার ছলে? আমি ভাবি, না সে আমাকে ভালবাসে না। এখানে কেন আকাশ ফর্সা হয় না, পাখি ডাকে না? শেষরাত কি এরকম অন্ধকার হয় সাধারণত? হঠাৎ প্রবল বাতাস ওঠে পথঘাট দুমড়ে-মুচড়ে। কোটি কোটি ছেঁড়া পলিথিন আর কাগজের টুকরা সা সা করে আকাশে ওড়ে। মৃত্যু মগ্নতায় আহত কবুতরের মত ঘুরপাক খায়। এবং একটু পরেই ঝম ঝম করে বৃষ্টি নামে। রাস্তার উপর বৃষ্টির ফোটা পড়ে যে শব্দ হয়, তা হাজার হাজার টিনের চালের উপর বৃষ্টি নেমে আসার শব্দের অভাবের মতই। নন্দিনীকে অপরূপ ঝাপসা দেখায়। হঠাৎ সে আমাকে জড়িয়ে ধরে প্রবল ভাবে, যেন বৃষ্টি তার জন্য সেই আড়াল নির্মাণ করেছে, যার অপেক্ষা সে করছিল জীবনভর। আমি তার আলিঙ্গনের মধ্যে গভীর পুনর্জন্ম পাই। আমি আর কখনো তাকে অবিশ্বাস করব না, এই অসম্ভব কথা আমি ভাবি।

৫.
সকাল থেকে আমি ভাসি ডুবি। কারণ সম্পূর্ণ বোধ করি না এবং আমি অসম্পূর্ণ নই। কারণ আমি বসে বসে স্রেফ বসে থাকি, আর বসে থাকতে থাকতে বসার মধ্যে ঢুকে যাই, নিজের সাথে কথা বলতে বলতে আমি নিজের ভিতরে উঁকি মারি, বাইরে উঁকি মারি; কখনো আমি, কখনো তুমি, কখনো সে হয়ে যাই; উড়ি, চ্যুত হই, ঢলি। আমার জীবনের যে কোনো নিশ্চয়তা নেই তা আমি নিজেই বুঝি। আবার মনে হয় আছে। একই সাথে ও ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আমি দেখি যে আমার মধ্যে সামঞ্জস্য নেই, সমন্বয় নেই; আবার দেখি আমি সিমেট্রিকাল, উপযুক্ত, সঙ্গত। দেখি আমি প্রবাহিত সারাক্ষণ এবং / অথবা আমি স্ট্যাগন্যান্ট বাঁশঝাড়। রৌদ্র ওঠার পর থেকে কিম্বা তারও অনেক আগে বেঞ্চির উপর বসে আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি, আজ তুমি কী করবে?

দিনের ধারণা শুরু হওয়ার পূর্বেই আমার ধারণা হয় তার মনে নেই কতদিন আগে সেই শেষরাত হেঁটেছিলাম আমরা একসাথে। হ্যাঁ, আমরা শেষরাতই হেঁটেছিলাম, শেষরাতে নয়। হাঁটতে হাঁটতে আমরা দোকানের পর দোকান, ল্যাম্প পোস্টের পর ল্যাম্প পোস্ট পার হয়ে শেষরাত তৈরি করেছিলাম, নিজ হাতে বানানো রুটির মত। কিন্তু তার আর হয়তো সে সব মনে নেই। মনে না রাখা সময়কে মূল্যবান করে দেয়, এবং দেখি সময়কে এ জীবন দেয়া বা না দেয়া এক না হলেও এক। আনন্দ ও বেদনার মধ্যে পার্থক্য মুছে যায়, ওই দুইজন, এই দুই অনুভূতি দুই রকমের—তবু মনের গভীর স্তরে পৌঁছে এক হয়ে ওঠে দুইজনই, এক হয়ে যায়। হয়ে যেতে পারে। কত কী যে সে আমাকে বলে বা বলেছে, তা ভেবে শেষ করা যায় না। কিন্তু লোকটিকে বলা অনেক কথাই যে তার মনে থাকে না, তাও আমি জানি। তাহলে কী করবে তুমি এখন? সে যে তোমার কথা বা তোমাকে বলা অনেক বা কোনো কথাই মনে রাখে নি বা রাখে না এই কথাই কি ভাববে বসে বসে তিক্ত অসফল প্রেমে বিভক্ত শত বিভক্ত হতে হতে? নাকি ভেবে দেখবে তার জীবনের অসামান্য জটিলতার কথা যা তার মেমরির উপর হাল্কা ধুলার পর্দা নামিয়ে আনে সময়ে অসময়ে কিন্তু আসলে সে ভোলে না কিছুই কোনোদিন? বেশ অনেকদিন হয়ে গেল সে আর এই পার্কে আসছে না। তাহলে কি সে সত্যিই ছেড়ে দিয়েছে তার বৃত্তি? সে আমাকে সেদিন যা বলেছিল তার সবই কি সত্য? ‘সত্য কী’’ এইধরনের একটি শিশু সুলভ কথা মনে জাগে কিন্তু আমি তা পাত্তা দেই না। কথা মানুষের মত শরীর লাভ করে, তবু তাকে আমি পাত্তা দেই না। আমি শুধু একটা কথাই ভাবতে চেষ্টা করি আর তা হল, কী করে আমি তার দেখা পাব। আমি তার বাসা চিনি না, কোনোদিন যাই নি তার সাথে সেখানে, কোনোদিন সে আমাকে তার ঠিকানা দেয় নি। আমি চেয়েছিলাম কয়েকবার, তারপরও কী কারণে যেন সে আমাকে তার বাসার নাম্বার, রাস্তার নাম দেয় নি। সে কি জানে না যে কোনোদিন আমি হুট করে তার ওখানে চলে যাব না? উপস্থিত হয়ে যাওয়ায় আমার তেমন বিশ্বাস নেই। হা, আমাকে তার জানা হবে না। যদিও সে আমার সাথে জীবন কাটাতে চায়, কিন্তু আমাকে তত বিশ্বাস করে উঠতে পারবে না কোনোদিন। কিন্তু এ হয়তো অন্য কিছু। তবে বিশ্বাস কী? ব্যথা নিয়ন্ত্রণের, আটকানোর কৌশল মাত্র। সে বোধহয় চায় না ব্যথা আটকাতে। আমার হঠাৎ ভয় করে। যদি আর কোনোদিন তার সাথে দেখা না হয়? যদি আর কখনো সে এই পার্কে না আসে? তা হলেই তো আর কোনোদিন দেখা হবে না তার সাথে আমার। এই ভয়াবহ সম্ভাবনার কথা ভেবে আমার শরীর কাঁপতে থাকে। তারপর আমি মন ঘুরাই, অন্য কথা ভাবার চেষ্টা করি। ভাবি যে তাকে নিয়ে হয়তো এ শহর ছেড়ে চলে যেতে হবে কোথাও, অন্তত এই এলাকা যে ছেড়ে দিতে হবে তাতে আর সন্দেহ কী, এবং এইসব ভেবে নিজেকে সন্দেহের ওপাশে নেয়ার চেষ্টা করি। ইদানীং আমার চারপাশে নন্দিনীর প্রেমিক পুলিশের ঘোরাঘুরি আশঙ্কা জনক ভাবে বেড়ে গিয়েছে, মানুষ যেভাবে তার কেনা কোরবানির গরুর দিকে তাকায় ও চারপাশে ঘোরে সেইভাবে সে তাকায় আমার দিকে, আমার চারদিকে ঘোরে। তাকে দূর থেকে আমার দিকে আসতে দেখলে আমি দ্রুত চাদর মুড়ি দেই যাতে সে আমাকে দেখতে না পায়। তখন সে টুলটার চারদিকে ঘুর ঘুর করে, কী এক সন্দেহে হাতড়ায় টুলের উপর, যেন সেও জানে যে আমার অদৃশ্য হয়ে যাবার ক্ষমতা আছে। আমাকে সরে সরে যেতে হয় তার হাতের স্পর্শ এড়াবার জন্য। দিনে দিনে আমি চাদরের ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছি। দিনের বেলা পারতপক্ষে আমি চাদর জড়াই না। ব্যাগের ভিতরে ঢুকিয়ে রেখে দেই। আজো তাই করেছি। অগোছালো চাদর ব্যাগের ভিতরে রাখা আছে, ভাজ করার ধৈর্য্য ছিল না মনে। আজ আবার আমি রুটিন-হীনতা জনিত অস্থিরতার মুখামুখি। রুটিনের সংজ্ঞাময় দিন, ঘুরে ঘুরে নির্দিষ্ট কোথাও যাওয়ার, একই কাজ বার বার করবার, একই মানুষের সাথে বার বার প্রেডিক্ট্যাবলি দেখা হওয়ার জীবন আমার নয়। আমাকে প্রতি মুহূর্তে ভেবে দেখতে হয়, এর পরের মুহূর্তে কী করব। রুটিন হল জানা, করা। আমার হল না জানা, না করা; ভাবা, শুধু ভাবা। রুটিন স্থিরভাবে দাঁড়াবার পুনরাবৃত্ত-ভূমি। আমার জীবনও পুনরাবৃত্তিময়, কিন্তু এ এমন এক পুনরাবৃত্তি যা রুটিন-হীন, অস্থিতিশীল। সারাদিন একটা মানুষের জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হবে, এই বোধ, সারাদিন একটা মানুষের জন্য অপেক্ষা করবার চেয়েও খারাপ। পার্কের ভিতরে প্রবাহ ওঠে, প্রবাহ ঝরে যায়, ডানা খোলে ডানা বন্ধ হয়। ছায়ার জানালা খোলে, নিভে যায়। মানুষের হাঁটার শব্দে দরোজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজ পাওয়া যায়। কোথায় কী হচ্ছে ভাবতে গিয়ে দেখি কোথাও যা হচ্ছে তাতে খুব বেশি কিছু হয় না, যা যেমন থাকার তেমনই থাকে। কিছু একটা হবে মনে হয়, কিন্তু কী হবে তা জানার উপায় নেই। আমার চারপাশে পুলিশের ঘোরাঘুরি কোনো অর্থ বহন করে, কিন্তু অর্থ বহনকারীকে দেখি না কোথাও। কোথায় সে এখন, কার বাহু-লগ্না হয়ে শুয়ে আছে? কে তার ভিতরে প্রবেশ করছে এই মুহূর্তে? না না, তা কী করে সম্ভব? সে তো আমাকে বলেছে যে সে আমার সাথেই সারা জীবন থাকবে। যদি তাই হয় তাহলে আর কারো তার ভিতরে ঢুকবার বা থাকবার কথা তো নয়। কিন্তু সে কি তোমাকে বলেছে যে সে তোমাকে ভালবাসে? না…না সেরকম কিছু বলে নি তো। তাহলে? তাহলে তো তোমার প্রতি তার লয়াল থাকার কোনো কারণ নেই। কিন্তু সে তো বলেছে তার কাজ ছেড়ে দেবে আমার জন্য। তোমার জন্য? সে বলেছে কাজ ছেড়ে দেবে, তোমার জন্য ছেড়ে দেবে তা তো বলে নি। তবে কার জন্য ছাড়বে সে এইসব কাজ? কার জন্য? কার জন্য? আমার জন্য ও তার নিজের জন্য নয় কি? অন্য কার জন্য? এইসব ভাবতে ভাবতে আমি নিজের অজান্তে যেন চিৎকার করে উঠি, “আমি তাকে বিশ্বাস করি, হ্যাঁ করি, করি, করি” এবং দেখি যে বহুদিন চাদর মুড়ি দিয়ে থাকবার ফলে আমার চিৎকার শব্দহীন হয়ে গেছে। গাছের ভিতরে অনেকগুলো দরোজা খুলে যায় যেন। সেইসব দরজা দিয়ে ঢুকে অন্য পৃথিবীর আলো এসে পড়ে আমার শরীরে। নিজের সাথে তর্ক করতে করতে আমি ম্রিয়মাণ হয়ে যাই। ঘুম পায়। আমি যে ঘুমাতে ভুলে গেছি তা মনে পড়ে। তাকে যে শুয়োরের বাচ্চা বলে গালি দেই, তাও সঙ্ঘটিত হয় শব্দহীন ভাবে। তখন একটি অপরিচিত লোক আমার চারদিকে ঘুরপাক খায়। তার যুবক মুখ শক্ত, তাকে দেখে নন্দিনীর কথা মনে আসে কেন যেন। কে সে? কেন সে আমার চারদিকে ঘোরে এইভাবে? সে কি নন্দিনীর স্বামী? নন্দিনীর সাথে আমার সব কিছুর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, সে বোধহয় তা জানে। বাস্তবে যদিও নন্দিনী তার সাথে থাকে, কিন্তু বাস্তবতার চেয়ে সম্ভাবনা হয়তো অনেক ভয়ের কারো কারো জন্য। সারাদিন হয়তো নন্দিনীকে মিশিয়ে সে আমার কথা ভাবে, যদিও নন্দিনীর সাথে আমার বহুদিন দেখা নেই, নন্দিনীর সাথে আমার কোনো কিছুই হয় নি কোনোদিন, তবু হয়তো আমাদের কথা ভেবে তার মন কষ্টে ঘৃণায় নুয়ে আসে, হয়তো আমাকে হত্যা করতে ইচ্ছা করে তার। সহসা তার জন্য আমার কষ্ট হয়। নিজের জন্যও কেন যেন কষ্ট হয় আমার। আমার কি উচিত তাহলে নন্দিনীকে ছেড়ে চলে যাওয়া। আমি টের পাই সে শক্তি আমার নাই। আমার মন বলে নন্দিনীই একদিন আমাকে ছেড়ে দেবে। আমার লোকটার হাত ধরে বলতে ইচ্ছা করে, ‘ভাই আপনি ভাববেন না, নন্দিনী আপনাকে ভালবাসে, এ কথা সে নিজেই আমাকে বলেছে। সে আমাকে ভালবাসে না, কখনো বাসবে না। আপনি আমাকে নিয়ে শুধু কষ্ট পাইয়েন না।’

আমার মনে হয় সে নিশ্চিতই নন্দিনীর স্বামী, তবু সে নন্দিনীর স্বামী কিনা আমার তা জানা হয় না। এক অসময়ে আমার খুব কাছে এসে সে চোখ মুখ কঠোর করে আমার দিকে তাকায়, এবং কী যেন বলে বিড়বিড় করে, আমি তা বুঝি না, তবু বুঝি। তারপর সে ছায়ার ভিতরে তলিয়ে যায় ছায়া হয়ে যদিও সে কোনো ছায়া নয়। আরো কে একজন আমার কাছে এসে দাঁড়ায়, ঘুর ঘুর না করেই। দ্রুত কাছে এসে আমার গালে একটা ভয়াবহ রকমের থাপ্পর মাড়ে, থাপ্পড়ের শব্দে, দুএকটা গাছের ডাল নড়ে ওঠে, আমার গাল কেটে যায় ও চোখ দিয়ে পানি বের হয়। কিন্তু প্রত্যুত্তরে তাকে আঘাত করবার কোনো ইচ্ছা আমার ভিতরে জাগে না। নিজেকে অসহায় বা তার চেয়ে কম শক্তিমান এরকম কিছু মনে হয় না। শুধু তাকে প্রত্যাঘাত করবার ইচ্ছা আমার মধ্যে নেই, সেটা আমি টের পাই। আমার কোনো রকমের রিএকশন নাই দেখে লোকটার মধ্যে আশ্চর্যজনক ভাবে আমাকে আরো আঘাত করবার ইচ্ছা আর থাকে না। সে কেমন শান্ত আর ম্রিয়মাণ হয়ে আমার পাশে ধপ করে বসে পড়ে ও বলে, “আমি এই পাড়া চালাই। তুই এইখান দিয়া যা গিয়া। নন্দিনী তোর জন্য কাজ ছাইড়া দিতে চায়। তাতে আমার ইনকাম কমে। আজ নন্দিনী ছাইড়া দিলে কাল আরেকজন ছাড়বে। আমি তা হইতে দিতে পারি না। আমি তরে মারতে চাই না। তুই শুধু চইল্যা যা।” সে আমার থেকে ছোট হয়েও আমাকে তুই তোকারি করে বলে, থাপ্পড়ের চেয়েও যেন বেশি বেদনা পাই, তবু সব কিছু আমার কাছে পরিস্কার হয়। আমি খুব আস্তে আস্তে তাকে বলি, “আমি তা পারি না। আমি নন্দিনীকে কথা দিয়েছি। আমি যেতে পারি না। আমি যাব না। আপনের যা করতে হয় করেন।” সে উত্তেজিত হয়ে আমাকে শুয়োরের বাচ্ছা, কুত্তার বাচ্ছা হারামজাদা বলে গালিগালাজ করে। আমি জীবনে অনেক অপমানিত হয়েছি বলে অপমান গ্রহণে অভ্যস্ত। তাই চুপচাপ বসে থেকে তার অপমান গ্রহণ করি ও চুপচাপ বসে থাকি। মনে হয় সে হয়তো আমাকে আরো মারবে এখন। আমি মার খাওয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে নেই। হয়তো এবার সে আমার বাকি গালটাই ব্যবহার করবে, বা তা নাও করতে পারে। অনেকে শুধু একটি গালেই থাপ্পড় মারতে পছন্দ করে। আমি অপেক্ষা করি। কয়েকদিন পরে একদিন সন্ধ্যায়, নন্দিনীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে মৃতপ্রায় হয়ে, ভাগ্যিস নন্দিনী আমার এইসব মনোবৃত্তি জানে না, জানলে হয়তো অনর্থক তারও কষ্ট হত, পার্ক ছেড়ে আমি হাঁটতে বেরিয়ে পড়ি। আমার ছায়ার থেকেও ঘনিষ্ঠ হয়ে কারা কারা যেন আমাকে অনুসরণ করে, আমি দেখি তবু দেখতে পাই না। সেদিন রাতে যেসব পথ দিয়ে আমরা হেঁটেছিলাম, সেইসব পথ দিয়ে ঘুরে ঘুরে আমি হাঁটতে থাকি। আহ, যদি সে আমার সাথে থাকত এখন।

৬.
অনেকদিন পরে শেষরাতের দিকে নন্দিনী ছুটে এসে বলে, “এই তুমি এই পার্ক ছেড়ে এখনই চলে যাও, তোমাকে ওরা মেরে ফেলবে।” পরে আবার বলে, “না। যেও না। তুমি গেলে আমি থাকতে পারব না।” বুঝতে পারি আমার সাথে কোথাও চলে যাওয়ার প্ল্যানে সে আর নেই। আরও পরে শান্ত হয়, সম্ভবত তা আরও কয়েকদিন পরে, এবং বলে, “না ঠিক আছে আমি তোমাকে রক্ষা করব। ওরা তোমার কিছু করতে পারবে না।”

তারপর তারা মিলিত হয় অকস্মাৎ, অনেকগুলো লাইনের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া একটি অবয়বহীন বিষণ্ন বাক্যের মত। আমি একবার জিজ্ঞেস করি, “তুমি সত্যিই চাও এইসব আমার সাথে?” কিন্তু হয়তো করি না। হয়তো বা আমরা মিলিতও হই না। আমি শুধু স্বপ্ন দেখি মিলনের। কিম্বা তা সত্যি। হতে থাকে, হয়।

অনুপস্থিত ও উপস্থিত গাছপালায় ঝড় ওঠে, তারপর তা শান্ত ঝড় হয়ে যায়। তীব্র টান মিলে যায় বোধহয় তীব্র টানে। মাটিতে লোহিত স্বপ্নের দ্রুতগামী ট্রেন তৈরি হয়, এবং সেই ট্রেন ঘুরে ঘুরে চলতে থাকে, থাকে। পর পর আরও কয়েকবার হয় এইরকম। অথবা কিছুই হয় না, হয় নি, আমি কল্পনায় প্রবাহিত আছি শুধু।

সকাল হওয়ার কিছুক্ষণ আগে পুলিশ সহ কয়েকজন লোক এসে আমাদের ঘিরে ফেললে নন্দিনী ভয়াবহ ভাবে চিৎকার করে বলে ওঠে, “এই শুয়োরের বাচ্চারা, তোরা আজকে অরে মারবি না কইছিলি।”

“ও আইজ সকালেই চইলা যাইবে এইখান থেকে। আমিও আমার কাজে ফিরুম। এই শোন, আমি তোগো কমিশন আগের চেয়ে বাড়াইয়া দিমু, মারিস না অরে; কথা দিতাছি, কথা দিতাছি…” বলতে বলতে হিস্টিরিয়াগ্রস্ত মানুষের মত কাঁপতে কাঁপতে সে উঠে দাঁড়ায় বসে পড়ার মত এবং আমাকে জড়িয়ে ধরে শক্তভাবে যেন সে পারবে আমাকে তার শরীর দিয়ে পৃথিবীর কাছ থেকে আড়াল করতে কিন্তু শরীরের অত শক্তি নেই এবং তার কথায় কেউ কর্ণপাত করে না।

আমি কোনো কিছু বুঝে উঠবার আগেই, সেই অপরিচিত লোকটি, হয়তো যে নন্দিনীর স্বামী হবে অথবা এই পাড়ার মাস্তান যে আমাকে নিজের পরিচয় দিয়েছিল, এবং যে নন্দিনীর কাছ থেকে কমিশন খায়—কমিশন খাওয়ার কথাটা পুনরায় মনে আসল, মূলত আমার মৃত্যুর আগ মুহূর্তে—এক ভয়ানক হ্যাঁচকা টানে নন্দিনীকে আমার জামার কিছু অংশ ও পিঠের কিছুটা চামড়াসহ, কারণ নন্দিনী জীবন বাজি রেখে আমাকে খাঁমচে ধরেছিল, এক পাশে সরিয়ে নেয় এবং পুলিশটা তার রাইফেল আমার দিকে তাক করে আমার বুকে ও মাথায় গুলি করে। মুহূর্তের মধ্যে আমি মাটিতে পড়ে যাই এবং সেখানে একটু আগে তৈরি হওয়া স্বপ্নের ট্রেন কেন লোহিত ছিল তা বুঝতে পারি। এখন সঙ্গত রক্তের ট্রেন তৈরি হয় এবং ছট ফট করতে করতে স্বপ্নের ট্রেনের সাথে মিশে যায়, ও আমার মৃত্যু হয়।

নন্দিনী মাটিতে পড়ে কাটা মুরগির মত ছটফট করছে, ধনুকের ছিলার মত বাঁকা হয়ে যাচ্ছে, আবার ধনুকের মত সোজা হচ্ছে দেখে আমার খুব কষ্ট হয়। তার বেদনা আমার কাছে আমার মৃত্যুর চেয়েও বেশি বেদনাদায়ক মনে হয়। আমি ফিরে এসে তার কানের কাছে আমার মৃত মুখ নামিয়ে ফিস ফিস করে বলি, “এ ভাবে কেঁদো না। আমি মরতে পারব না তাহলে। যেতে পারব না। আর শোনো খুন হয়ে যাওয়ার জন্য আমিই দায়ী। এইটাই ভাল সবার জন্য। আমি ভালনারেবল হয়ে পড়েছিলাম তোমার প্রতি। সেটা আমার দোষ, হ্যাঁ দোষই, আমার মত লোকের দুর্বল হয়ে পড়া ভয়ানক দোষের, সেই দোষ আমার হয়েছিল বলে তুমি আমাকে দেখতে পেয়েছিলে, ফলে তোমার স্টেকহোল্ডাররা আজ আমাকে খুন করতে পারল, সকলের ভালর জন্য। কিন্তু তুমি আমাকে খুন করো নাই। তোমার স্টেকহোল্ডারাও না। জানি তুমি সে সবের জন্য কাঁদছ না। তবু বলি তোমার ফলে আমার বুকের মধ্যে একটা গর্ত তৈরি হয়েছিল। গর্তটা আমার মনো-ভূমিজাত। মূলত আমিই আমাকে খুন করলাম, যদিও তুমি বলেছিলে কিছুতেই আমাকে খুন হতে দেবে না। না, তাও নয়। মূলতঃ আমার মনই আমাকে খুন করল। আমি তোমাকে দায়ী করি না, আমি কাউকে দায়ী করি না। আমি বুঝতে পেরেছি যে তুমি জানতে ওরা আমাকে আজ খুন করবে। তাই তুমি আমার সাথে মিলিত হয়েছ। তুমি কথা ঘোরাও নাই। বেঁচে থাকতে হলে মানুষকে কথা ঘুরিয়ে নিতে হয়, তা আমি আগেও দেখেছি।” কিন্তু সে এইসব কথা শুনতে চায় না। এইসব কথা এখন তার কাছে অর্থহীন। কে এই খুনের জন্য দায়ী তা নিয়ে সে মোটেই ভাবছে না। সে কেবল খুন হয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে, আমাকে ভাবছে, এমনকি নিজের কথাও ভাবছে না। এখন সে পৃথিবী ধ্বংস করে ফেলতে চায় তার চিৎকারে, তার অসামান্য শরীর দিয়ে মাটিতে আঘাত করে করে। এই হাহাকার করা তাকে ছেড়ে আমার যেতে ইচ্ছা করে না। আমি তার কান্না সহ্য করতে অক্ষম। তবুও তারপর আমি বাতাসে মিলিয়ে যাই বলে মনে হল।

এর কয়েকদিন পরে সে আবার ওই টুলে ফেরত আসে এবং চন্দ্রালোকে বসে, যেন চন্দ্রালোকের বিনিময়ে, নানান লোকের সাথে প্রভূত সঙ্গম করে। বহু দূরের অন্ধকারে বসে আমি তার মিলনের ড্যাগার উজ্জ্বলতা দেখতে পাই। ওই মিলন আমার নয় আর। তার দিকে, যেখানে আমাকে খুন করা হয়েছে সেই বেঞ্চের দিকে একবার তাকিয়ে, আমি আরও দূরে ফিরে যেতে শুরু করি। দূরে ফিরে যাওয়ার জন্যই এখানে এসেছিলাম আমি।

মেয়েটি আবার ব্যবসায় ফিরে এসেছে, অল্প সময়ের বেদনা আর তার মনে নেই। অথবা আছে। জানা নাই সত্যিই সে আমার সাথে থাকতে চেয়েছিল কিনা জীবনভর। মৃত্যু হওয়ার পর জীবনের কথা বেশিদিন আর মনে থাকে না, আমার স্মৃতিও ঝাপসা হয়ে আসতে শুরু করেছে। তার পুরনো খদ্দেরগণ ফিরেছে, নতুন খদ্দেরও সে এখন গ্রহণ করছে। বরং এদের সাথেই সে জীবনভর থাকবে মনে হয়।

বেঞ্চের উপরে কোনায় একটি লোক চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে। তার কোনো দুর্বলতা নেই বলে তাকে কেউ দেখতে পায় না। এমনকি নন্দিনীও নয়। তবু হয়তো একদিন দেখতে পাবে।

আমি খুন হবার পর পর প্রবল বৃষ্টি নামে। এবং বৃষ্টির ফোঁটার অবিরাম সুনির্দিষ্ট আঘাতে আঘাতে আমার চোখ মুখ সব ধুয়ে উবে যায় শরীর থেকে, সেই সাথে ধুয়ে যায় আমার ভালনারেবিলিটি, যা আমাকে ট্রাক চাপা পড়া জন্তুর মত নিক্ষেপ করে দূরে ফেলে দিয়েছে। কেবল মৃত্যুই আমাকে মুক্তি দিতে পারে তবে?

অন্য কোনো পার্কের দিকে আমি ঘুরে যাই। বোঝা যায় আমি খুন হয়েছি কিন্তু হওয়ার মত খুন হই নি, আমাকে আরও একবার বা কয়েকবার খুন করা হবে ভবিষ্যতে নন্দিনীর জন্য, অন্য কিছু পার্কে। কয়েকদিন ধরে খুব প্রবল বৃষ্টি হয় পৃথিবীতে।

ঢাকা, এপ্রিল-জুন, ২০১৫

About Author

সিদ্ধার্থ হক
সিদ্ধার্থ হক

কবি ও ঔপন্যাসিক। প্রকাশিত উপন্যাস: ভাসমান। প্রকাশিত কবিতার শেষ বই: জলে ডোবা মাঠে, সারারাত