ঘটিকাহিনী ১১

আমি এখনো খুব আনন্দিত ভারত, বাংলা ও হিন্দুতার সঙ্গে নিজেকে আইডেনটিফাই করতে, কিন্তু জোর করে মগজে গজাল মেরে গুঁজে দেওয়াটা কোনকালেই আমার তেমন পছন্দ হয় নি।

(আগের পর্ব)

হেলাফেলা সারা বেলা

ইস্কুলে সিক্স সেভেন বা এইটে পড়ার সময়ে খুব যে একটা তীক্ষ্ণ বুদ্ধি-বিবেচনা আমার ছিল, তা নয়। সত্যি কথা বলতে, বরাবরই আমি ইমোশনের প্লাবনে ভেসে গেছি। সাধারণ বুদ্ধি কিছুটা আমার ছিল নিশ্চয়ই। নইলে, পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো রেজাল্ট করতাম কেমন করে? ফার্স্ট সেকেন্ড বেশি না হলেও, থার্ড ফোর্থ ফিফথ সিক্সথ এরকম প্রত্যেক বছরই হয়ে এসেছি। এবং তা হয়েছি আমাদের এ সেকশনে, এবং স্কটিশের মত সে-সময়কার প্রথম সারির ইস্কুলে।

কিন্তু, ওই বয়েসটায় পর্যবেক্ষণ খুব কম ছিল। তাই, প্রথম যখন সুব্রতর বাড়ি সন্দেশ পত্রিকায় সত্যজিৎ রায়ের গল্প পড়তে আরম্ভ করলাম, তখন অবাক হয়ে গেলাম। ফেলুদা তোপসেকে বলছে, “দেখা আর লক্ষ্য করা এক জিনিষ নয়। বলতো দেখি, তোর শার্টে কটা বোতাম, বেল্টে কটা ফুটো? বলতে পারলি নাতো?” ভাবলাম, সত্যি তো, এরকম করে কখনো তো ভাবি নি! সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা আমার সেই না-থাকা বড় দাদার অভাব একটু মিটিয়ে দিল। একটা যেন রোল মডেল খুঁজে পেলাম। ফলো করার জন্যে কাছাকাছি বয়েসের একটা জীবন্ত চরিত্র, যেটা ছোটমামা বুদ্ধদেবের মধ্যে পাবার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু পাচ্ছিলাম না ঠিকমত।

parthab logo

ব্রেন আমার ছিল। বাড়িতে পড়াশোনার পরিবেশ ছিল, মা বাবার স্নেহমমতা ছিল, আবার নজরও ছিল যাতে আমি বেশি খারাপ সঙ্গে না মিশি। কিন্তু অস্থিরতা, রাজনৈতিক ডামাডোল যখন শুরু হলো, আর আর্থিক সমস্যা কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গে যখন ক্রমশই তীব্র আকার ধারণ করলো, আর সে সমস্যা মেটানোর জন্যে বাবা অতিরিক্ত কাজ করতে বাধ্য হলো, তখন থেকেই আমার পড়াশোনার জগতে বুধ বা বৃহস্পতির থেকে রাহু, কেতু আর শনির প্রকোপ বাড়তে থাকলো। আর, আমিও ক্রমশই তলিয়ে যেতে আরম্ভ করলাম।

মাও যেন আস্তে আস্তে কেমন হতাশ হয়ে পড়তে আরম্ভ করলো। আমি সেভেন বা এইটে পড়ার সময় থেকেই মাকে আর বেশি গুরুত্ব দিই না। কলকাতার মধ্যবিত্ত সমাজের পুরুষতান্ত্রিকতা আমার মধ্যে তখন ঘাঁটি গেড়ে বসতে আরম্ভ করেছে। আমার মধ্যে একটা রুক্ষ, কর্কশ আর সবজান্তা ভাব। আমার জগৎ ছেলেদের জগৎ। বাড়ির বাইরের মেয়েরা আমার কাছে হয় অদৃশ্য, আর নয়তো সেকেন্ড-ক্লাস। আমার জীবনে তারা তখন ইম্পরট্যান্ট নয়। তারা আছে তাদের দ্বিতীয় স্তরের পৃথিবীতে। আমরা ছেলেরা আছি ওপরের স্তরে। মানে, এমন করে সচেতনভাবে ভাবি নি তখন, কিন্তু মনের অবস্থাটা এই রকমই ছিল।

 

আর এস এস প্রার্থনা—ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সংঘের শাখায়। এই পদ্ধতিতে প্রার্থনা এবং শিক্ষকদের অভিবাদন করা হয়। শোনা যায়, এটি একটি পুরনো মারাঠি পদ্ধতি।  আর এস এসের জন্ম হয়েছিল মহারাষ্ট্রের রক্ষণশীল হিন্দু সমাজে। অন্য ছবিটিতে প্রার্থনা করছেন বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোহন ভাগবত। - লেখক
আর এস এস প্রার্থনা—ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সংঘের শাখায়। এই পদ্ধতিতে প্রার্থনা এবং শিক্ষকদের অভিবাদন করা হয়। শোনা যায়, এটি একটি পুরনো মারাঠি পদ্ধতি। আর এস এসের জন্ম হয়েছিল মহারাষ্ট্রের রক্ষণশীল হিন্দু সমাজে। অন্য ছবিটিতে প্রার্থনা করছেন বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোহন ভাগবত। – লেখক

আমি বাড়ি আসি আর বাড়ি থাকি শুধু পড়তে, খেতে, আর শুতে। আর, বাড়ির কিছু কাজ করে দিতে। দোকান, বাজার, রেশন, কয়লা, কেরোসিন। ষাটের দশকে, সত্তরের দশকে যুদ্ধের বাজারে যখন কয়লা, কেরোসিনের আকাল, এমন কি পাউরুটি বিস্কুটেরও আকাল, তখন আমাকে প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাবার আগে এক ঘণ্টা কি দেড় ঘণ্টা ধরে দোকান বাজার করতে হয়, কারণ কোনো কিছুই একটা দুটো দোকানে পাওয়া যায় না। ঘুরতে হয়। মানিকতলা বাজার। না পাওয়া গেলে চল সেই হাতিবাগান বাজারে। হেঁটে হেঁটে। পাউরুটি কিনতে হয় লাইন দিয়ে রেশন কার্ডে। কয়লা কেরোসিনের দোকানের সামনে লম্বা লাইন। সেখানে আবার মাঝে মাঝে মারামারি হাতাহাতি। অশ্লীল গালাগালি। আর, পকেটে ঠিক তিন, চার বা পাঁচ টাকা। তার মধ্যেই সব কিছু নিয়ে আসতে হবে। আর, রোজ বাজারে যেতেও হবে, কারণ আমাদের গরিব সংসারে ফ্রিজ নেই যে মা সব রেখে দেবে। দুধ থেকে শুরু করে সব কিছুই অল্প অল্প করে কিনতে হবে, আর রোজই কিনতে হবে। তারপর, সময় থাকলে একটু পড়া। তারপর স্কুল। স্কুলেও তখন পড়াশোনা প্রায় কিছুই হয় না। সেভেন এইট থেকেই নকশালবাড়ির রাজনীতির সুযোগ নিয়ে কিছু বাজে বদমাশ ছেলে পরীক্ষা দেব না, বুর্জোয়া শিক্ষাব্যবস্থা, এই সব শ্লোগান তুলেছে। আমাদের নিচু ক্লাসেও তার হাওয়া তখনই এসে পৌঁছেছে একটু একটু। সব মিলিয়ে, অধোগতির ক্ষেত্র একেবারে প্রস্তুত, বিশেষ করে বাড়িতে যাদের দেখার তেমন কেউ নেই, তাদের। যেমন আমার।

আর এস এস শাখায় তাদের গৈরিক পতাকা তোলা হয় শাখার শুরুতে, এবং নামানো হয় শাখা শেষ হওয়ার ঠিক আগে প্রার্থনার পর। এই দায়িত্ব পাওয়া সম্মানের। ভবিষ্যত নেতা তৈরী হয় এইসব দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে।  - লেখক
আর এস এস শাখায় তাদের গৈরিক পতাকা তোলা হয় শাখার শুরুতে, এবং নামানো হয় শাখা শেষ হওয়ার ঠিক আগে প্রার্থনার পর। এই দায়িত্ব পাওয়া সম্মানের। ভবিষ্যত নেতা তৈরী হয় এইসব দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে। – লেখক
আর এস এসের বার্ষিক রুট মার্চ বা পথসঞ্চলন একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। একেবারে সামনে থাকে তাদের ব্যান্ড। তাতে থাকে সাইড ড্রাম, বিউগল, বাঁশি, বিগ ড্রাম এবং একজন ড্রাম মাস্টার যিনি সামনে ধ্বজ নিয়ে মিলিটারিদের মত ইঙ্গিত করেন তাঁর গ্রুপকে: কখন ড্রাম বাজবে, কখন বিউগল বাজবে, কখন থামবে, ইত্যাদি।  এর পরে লাঠিধারী ও ইউনিফর্ম পরিহিত শত শত সদস্য বা স্বয়মসেবক মিছিল করে যায় মাইলের পর মাইল, সুশৃঙ্খলভাবে। এই রুট মার্চ সংঘের জনসমক্ষে শক্তিপ্রদর্শনের একটি প্রধান উপায়। কলকাতায় আমরা এই রুট মার্চ করেছি অনেকবার। এর মাধ্যমে বহু অল্পবয়েসী ছেলে শাখায় যোগ দিতে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে।  আমার বাবাও এই ভাবেই আকৃষ্ট হয়েছিলেন কাশীতে। আমার লেখা "ইন দা বেলি অফ দা বীস্টে" সে বর্ণনা আছে। - লেখক
আর এস এসের বার্ষিক রুট মার্চ বা পথসঞ্চলন একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। একেবারে সামনে থাকে তাদের ব্যান্ড। তাতে থাকে সাইড ড্রাম, বিউগল, বাঁশি, বিগ ড্রাম এবং একজন ড্রাম মাস্টার যিনি সামনে ধ্বজ নিয়ে মিলিটারিদের মত ইঙ্গিত করেন তাঁর গ্রুপকে: কখন ড্রাম বাজবে, কখন বিউগল বাজবে, কখন থামবে, ইত্যাদি। এর পরে লাঠিধারী ও ইউনিফর্ম পরিহিত শত শত সদস্য বা স্বয়মসেবক মিছিল করে যায় মাইলের পর মাইল, সুশৃঙ্খলভাবে। এই রুট মার্চ সংঘের জনসমক্ষে শক্তিপ্রদর্শনের একটি প্রধান উপায়। কলকাতায় আমরা এই রুট মার্চ করেছি অনেকবার। এর মাধ্যমে বহু অল্পবয়েসী ছেলে শাখায় যোগ দিতে আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। আমার বাবাও এই ভাবেই আকৃষ্ট হয়েছিলেন কাশীতে। আমার লেখা “ইন দা বেলি অফ দা বীস্টে” সে বর্ণনা আছে। – লেখক

তার সঙ্গে সঙ্গে যুক্ত হলো বয়ঃসন্ধির দারুণ জটিলতা, যৌনতার নিষিদ্ধ হাতছানি, আর আমার আবেগপ্রবণতার নানারকম ম্যানিফেস্টেশন। সব মিলিয়ে, অতি দ্রুতগতিতে নিচের দিকে পিছলে যেতে থাকলাম। পর্যবেক্ষণ করার, বিশ্লেষণ করার, করতে শেখার যে সময়টা জীবনে সবচেয়ে দামি, সেই সময়টাই চলে গেল হেলাফেলা করে। উদাসী হাওয়ার পথে পথে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান কতগুলো বছর হারিয়ে গেল।

পড়াশোনায় ভালোই ছিলাম। সত্যি। তার থেকেও বড় কথা, খুব ভালো হবার ইচ্ছে ছিল। আমার পুরনো বন্ধুদের মধ্যে যাদের সঙ্গে আমার এখনো যোগাযোগ আছে, তারা হয়ত কেউ কেউ মনে রাখবে। অবশ্য, মনে না থাকলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই। এতকালের কথা সবার মনে থাকে না। এত খুঁটিনাটি, এত লোকের নাম, এত ছোটখাটো ঘটনার কথা কজনের মনে থাকে?

আমার কেন মনে আছে এতকিছু? তার প্রধান কারণ হলো আমার দেশ থেকে বিদেশে চলে আসা। আমি যদি ওখানেই সারা জীবন থাকতাম, তাহলে পুরনো স্মৃতিকে ঘিরে অসংখ্য নতুন স্মৃতি গড়ে উঠত, নতুন অনেক আনন্দ, বেদনা, সুখ, দুঃখ পুরনো সুখ-দুঃখকে ছাপিয়ে যেত। তখন বোধহয় ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ ভুলেই যেতাম। পুরনো সব স্মৃতি আর পাঁচজনের মতই ফিকে হয়ে যেত, ঝাপসা হয়ে যেত। কিন্তু, প্রবাসের জীবন এতই নিঃসঙ্গ, আর আপেক্ষিকভাবে এতই ঘটনাবিহীন যে পুরনো স্মৃতি আঁকড়ে ধরে অনেক সময়ে আমরা, বিশেষ করে আমার মত একজন আবেগপ্রবণ লোক বেঁচে থেকেছি, আর বার বার, বার বার, হাজার বার, লক্ষ বার সেসব কথা মনে করে, স্বপ্ন দেখে দিন কাটিয়েছি, রাত কাটিয়েছি। এও একধরনের হেডোনিজম। ইন্দ্রিয়সুখ।

বিশেষ করে, আমেরিকায় চলে আসবার পর প্রথম পাঁচ কি দশ বছর যে যন্ত্রণাদায়ক নিঃসঙ্গতার মধ্যে কেটেছে, যখন দেশে একবার বেড়াতে যাবারও সাধ্য বা সঙ্গতি ছিল না, আর দুচারজন খুব কাছের মানুষ ছাড়া কেউ আমাদের কথা মনেও রাখে নি, কেউ জানতেও চায় নি আমরা কেমন ভাবে বেঁচে আছি, বা আদৌ বেঁচে আছি কিনা, তখন আমার ছোট্ট ফ্যামিলির মধ্যে ছোটবেলার সব কথা, কলকাতা, বাংলাদেশ আর ভারতের কথা, অন্ধকার রাতের আকাশে অজস্র অগুন্তি তারার মত আমাদের ওপর আলোকবর্ষণ করেছে। শ্রাবণের ধারার মত যে-ঈশ্বরে ঠিক কখনো তেমন মনসংযোগ করতে পারি নি, সেই অজানা-অচেনা ঈশ্বরেরই আশীর্বাদের মত মাথার ওপর ঝরে ঝরে পড়েছে।

ফর্ম্যাটিভ ইয়ার্স যাকে বলে, যে সময়ে সত্যজিৎ রায়, লীলা মজুমদার, বা রবীন্দ্রনাথ, বা আবু সায়ীদ আইয়ুব, বা মহাশ্বেতা দেবী, বা আলী আকবর খান এসব বড় বড় লোক, ফেলুদা আর তার তোপসে, এমনকি আমার অনেক চেনাজানা বন্ধু, আত্মীয়, দাদা-দিদিরা যে বয়েসটাকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে, ব্লটিং পেপারের মত নানা ধরনের শিক্ষাকে শুষে নিয়ে জীবনের পথে অনেকদূর এগিয়ে গেছেন, সে সময়ে আমি সম্পূর্ণ হালভাঙা, মাঝিহীন এক নৌকোর অসহায় যাত্রীর মত নদীর চোরাস্রোতে পাক খাচ্ছি। তলিয়ে যাচ্ছি ঘূর্ণিতে। ডুবে যাচ্ছি চোরাবালিতে। বুঝতে পারছি, কিন্তু পারছি না। আবেগপ্রবণতা একদিকে, আর ওই আর এস এসের লিডারগিরি, স্কুলের ক্লাসরুমের কুয়োর ব্যাঙের লিডারগিরি, আর নীলাম হয়ে যাওয়া পুরনো জিনিসের দোকানের বাইরে ঝোলানো রংচঙে সাইনবোর্ডের মত আমি মনে করছি আমি আসলে দারুণ আছি, কোনো প্রবলেম নেই আমার। আমি যতই খারাপ, অশ্লীল কথা শিখি না কেন, যতই পড়াশোনার সঙ্গে সম্পর্কচ্যুত হয়ে পড়ি না কেন, আসলে আমি দারুণ আছি। এই তো সেদিনই গৌরিবাড়িতে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে তুমুল ফুটবল খেলে এলাম। এই তো দু মাস আগেই যুগীপাড়ায় আমাকে খেপ খেলতে নিয়ে গেছিল বন্ধুরা, আর সেখানে পাঁচটা গোল দেবার পর আমাকে পাড়ার এক দাদা নিয়ে গেল হোটেলে ভেজিটেবল চপ খাওয়াতে। খারাপ হয়ে তো যাই নি! ভালই তো আছি।

আসল কথা, ভালো আছি না খারাপ আছি, সে প্রশ্নটাই নিজেকে করি নি কখনো। মায়ের চোখের আস্তে আস্তে নিভে যাওয়া আশার আলো আমি দেখেও দেখি নি। বাবার অসহায়তা বুঝেও বুঝি নি। বাড়িতে মা আছে, দুবেলা ভাত তরকারি, এক পিস মাছ জুটে যাচ্ছে। বাড়িতে বাবা আছে, অফিসে কাজ করে, আর মাসের প্রথমে মাইনে পায়। সকাল সাতটা নাগাদ বেরিয়ে যায়, আর রাত আটটায় ফিরে আসে। এসে একটু বিশ্রাম করেই হয় একটা ট্রান্সলেশন বা লেখার কাজ নিয়ে বসে কিছু এক্সট্রা টাকা রোজগার করার জন্যে। মাঝে একবার হিন্দিভাষী ছেলেমেয়েদের জন্যে একটা কোচিং সেন্টার করবে বলে সাইনবোর্ড ঝোলালো জানলার বাইরে, কিন্তু একজনও এলো না ভর্তি হতে। কিংবা, দু চারদিন এসে আর এলো না। কোচিং ক্লাসের আইডিয়া ওখানেই শেষ। মাঝে মাঝে সংঘের লোকেরা আসে বাবার কাছে নানা পরামর্শ নিতে। ওটাতেই বাবার আসল উৎসাহ, টাকা রোজগারে নয়। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অরুণদা, বা ওদের হিন্দুস্তান সমাচার নিউজ এজেন্সির তুষার মজুমদার, বা বাস্তুহারা সহায়তা সমিতির অজিত বিশ্বাস আসে। আমার সঙ্গেও দুচারটে কথা বলে তারা, উৎসাহ দেয় আমার কাজের জন্যে। তাতেই আমি আহ্লাদে আটখানা। স্কুলের রেজাল্টের কথা কেউ জিজ্ঞেস করে না, বা জিজ্ঞেস করলেও জানতে চায় না আমার কোনো হেল্প লাগবে কিনা। আমার ভালো রেজাল্ট করার জন্যে কোনো প্ল্যান প্রোগ্রাম আছে কিনা। বাবাও মনে করে না আমি খুব একটা ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট করতে পারি।

ছোট বোন আছে, সে আমার থেকে আট-ন বছরের ছোট, তাকে নিয়ে তখনো কোনো দুশ্চিন্তা আমার নেই। সে মায়ের আদরে, দিদিমার আদরে বড় হচ্ছে। কাছেই দু পা গেলে হরতুকি বাগান, সেখানে দিদির বাড়ি, মানে দিদিমার বাড়ি রোজ একবার করে যাই সকালবেলা। গিয়ে একটু সময় কাটিয়ে আসি। ওখানে ছোটমামার সঙ্গে দেখা হয়, মাঝে-সাঝে একটু রাজনীতির কথা হয়, আর আমিও বিজ্ঞের মত দুচারটে কথা আনন্দবাজার পড়ে যা শিখেছি, তা সদর্পে ব্যক্ত করে আসি। যেহেতু আমি মামার বাড়ির খুব আদরের, তাই ওখানে হয়ত একগ্লাস জল ছাড়া আর কিছু খাওয়া হয় না, কিন্তু আমার কথা সবাই মন দিয়ে শোনে। আফটার অল, আমি হলাম গিয়ে ‘ভালো ছাত্র’, আর জিতেনদার ছেলে, জামাইবাবুর ছেলে। আমার মেকি অহঙ্কারে সুরসুড়ি দেওয়ার জন্যে আর কারুকে পাই না পাই, মামার বাড়ির লোকেরা আছে। বড়মামা, মেজমামা। ওদের অনশন অর্ধাশনে আমি একটা ফ্রেশ এয়ার। আমাকে দেখতে পেলে ওরা খুশি হয়। শুধু ওরা নয়, ওদের পাড়ায় সবাই আমাকে চেনে, আর সবাই আমাকে বুদ্ধর ভাগনে বলে খাতির করে। আমি মামার বাড়ি গিয়ে ছোটমামা বা মাসিকে খুঁজে না পেলে ওদের বন্ধুদের বাড়ি অবলীলাক্রমে চলে যাই। প্রায় প্রত্যেকটা বাড়িতেই আমার যাওয়া-আসা আছে। ছোটমামার ছায়াসঙ্গী রথীন মামা, খুব ভালো আর শান্ত মানুষ গৌর মামা, খসখসে গলার রোগা কেদার মামা, ছোটমামার প্রায় সর্বক্ষণের সঙ্গী মাথাবাবু মামা (কেন যে ওকে সবাই মাথাবাবু বলে কে জানে!), স্কটিশ কলেজের প্রিন্সিপ্যাল সবার ‘নদা’ অপরেশ ভট্টাচার্য্য যাঁর ওপরে ওই পাড়ায় আর কথা নেই, তাঁর বাড়ির ক্যারমের আসরে, আবার মাসির বান্ধবী চম্পা মাসি, অলিভা মাসি, তার দিদি ছায়া, আর তার বোন ময়না যে আমার বয়েসী এদের প্রত্যেকের বাড়িতেই আমার আনাগোনা। যখন তখন চলে যাই আর জিজ্ঞেস করি ছোটমামা বা মাসি ওখানে আছে কিনা। মাঝে মাঝে ওদের আড্ডায় বসে আড্ডা দিয়েও আসি একটু। মাসির বন্ধুরা সামনের বাড়ির একটা বাগান মত জায়গায় লুকোচুরি খেলে, আর আমি একপাশে বসে থাকি। ছোটমামার বন্ধুরা তাস খেলে, আমি বসে বসে দেখি।

বিকেলে সন্ধের দিকে পাঁচটা বাজলে আর এস এসের শাখায় যাই। সেখানে কাবাডি, খো খো, লেম ম্যান। ভস্মাসুর, কিংবা হাত ধরে ধরে জাল তৈরি করে সারা মাঠে দৌড়ে একজন একজন করে সবাইকে ধরে ফেলা। তারপর কিছুক্ষণ ঝকাং ঝকাং করে যোগচাব বাজিয়ে কুচকাওয়াজ। যোগচাব হলো একটা জবড়জং জিনিস, তাকে পারকাশন ইনস্ট্রুমেন্ট বলা যেতে পারে, আবার নাও বলা যেতে পারে। অনেকগুলো চাবির মত, লোহার গোছা দেওয়া জিনিস একটা কাঠের হাতলের সঙ্গে লাগানো। সেটা ধরে ঝকাং ঝকাং করে তালে তালে বাজানো যায়। এই যেমন, “এক দো তিন চার, ভারতমাতার জয় জয়।” এই সব বস্তাপচা, ঊনবিংশ শতাব্দীর রেলিক। অনেকটা ওই আর এস এসের মতই প্রাচীন। ভারতমাতার জয় জয় আবার কী রে বাবা! কী বোরিং! সত্যি, তখনই বোরিং, টিডিয়াস লাগত। ব্রতচারীদের কাছ থেকে ধার করা সব ব্যায়াম আর খেলা। বাংলার আধুনিকতার, প্রগতিশীলতার ধারার কোনো কিছুই তাদের স্পর্শ করে নি। কিন্তু, এমনিতে আমার খুব পছন্দ, কারণ ওখানে আমার একটা আলাদা প্রেস্টিজ আছে। লিডারগিরি আছে। সবাই জানে, আমি একটা রাইসিং স্টার। ক্লাস সিক্স সেভেন এইটে আমি শাখায় গঠনায়ক, মানে বালক বা কিশোর গ্রুপের লিডার। কে এলো না আজকে শাখায়, বাড়ি ফেরার পথে তার বাড়ি একটু ঢু মেরে যাওয়া। “কীরে সমর, কীরে কৃষ্ণেন্দু, দিব্যেন্দু, কিশোর, উৎপল (এ অন্য উৎপল—উৎপল ভাওয়াল), আজ শাখায় গেলি না কেন? সব ভালো তো?”

"যে যেখানে দাঁড়িয়ে," "এখনই," "পিকনিক," আর আরো সব আশ্চর্য উপন্যাসের লেখক রমাপদ চৌধুরীর সঙ্গে একটি একান্ত সাক্ষাৎকার তিন বছর আগে, টালিগঞ্জে লেখকের বাড়িতে। বান্ধবী শীলা সান্যালের সৌজন্যে। তখনি লেখকের বয়েস নব্বই।  - লেখক
‘যে যেখানে দাঁড়িয়ে’, ‘এখনই’, ‘পিকনিক’ আর আরো সব আশ্চর্য উপন্যাসের লেখক রমাপদ চৌধুরীর সঙ্গে একটি একান্ত সাক্ষাৎকার তিন বছর আগে, টালিগঞ্জে লেখকের বাড়িতে। বান্ধবী শীলা সান্যালের সৌজন্যে। তখনি লেখকের বয়েস নব্বই। – লেখক

এসব গ্রাসরুটস কাজ শুরু হয়ে গেছে তখন থেকেই।

মাঝে মাঝে আমাকে সংঘের সংস্কৃত প্রার্থনার দায়িত্বও দেয় মুখ্যশিক্ষক নারায়ণদা, বা সুখলালদা। আমি বুক ফুলিয়ে উচ্চারণ করি, “প্রভো শক্তিমন হিন্দুরাষ্ট্রাঙ্গভুতা, ইমে সাধারান্ত্বং নমামোবয়ম।” সে দায়িত্ব আমার সেই আবেগের বেলুনটা আরো ফুলিয়ে দিয়ে যায়। হাতটা কাত করে বুকের উপর একটা শেল্ফ বা তাকের মত উল্টে রেখে মারাঠি কায়দায় সংস্কৃত প্রার্থনা লীড করি। আমি এক লাইন, অন্যরা সবাই সেই লাইনটা রিপিট। এই ভাবে। শেষকালে, “ভারতমাতা কী, জয়! ধ্বজপ্রণাম এক, দো, তিন।”

নয়তো, শাখা শেষ হবার ঠিক আগে মাটিতে গোল করে সবাই বসা, আর আমি এক লাইন এক লাইন করে গান গাইছি, আর ওরা সব রিপিট করছে। “বিজয় পথের সংগ্রামী দল, অযুত কণ্ঠে বিজয় গান, প্রণাম তোমায় ভগোয়া নিশান, জয় জয় জয় হিন্দুস্তান।”

বিশ্লেষণহীন আবেগ, প্রশ্নহীন আনুগত্য, অন্ধ দেশপ্রেম। বাবাকেও তাই করতে দেখেছি, সুতরাং আমিও করছি। পাড়ার বন্ধুদেরও টেনে নিয়ে গেছি শাখায় মাঝে মাঝে। বেশির ভাগই টিঁকে থাকে নি দুচার দিনের বেশি। কেন থাকবে? পড়াশোনায় ভালো যারা, তাদের বাড়ি এভাবে সময় নষ্ট করতে দেবেই না! আর পড়াশোনায় তেমন ভালো না যারা, তাদের অনেকেই কলকাতার কমিউনিস্ট পার্টির বা কংগ্রেসের বাড়ি। ওরা যেই জানতে পারল তাদের ছেলে আর এস এসের সঙ্গে মিশছে, সঙ্গে সঙ্গে তাদের কান ধরে বাড়ি নিয়ে গেল। আমার বোধহয় একটা রেকর্ড আছে উত্তর কলকাতার একটা বাঙালি পাড়ার প্রায় সমস্ত ছেলেকে একবার না একবার শাখায় নিয়ে যাওয়ার। ওই রেকর্ডটার প্রাইজ আমাকে ওদের এখনো দেওয়া উচিত। সে আমি আর এস এস ছেড়েই দিই, বা যাই করি। এ রেকর্ড ইজ এ রেকর্ড।

নারায়ণ বোস, সুখলাল রায়। আমার ক্লাস ফাইভে সুখলালদাকে মুখ্যশিক্ষক করে নিয়ে আসা হলো আমাদের গোয়াবাগান সায়ম মানে সান্ধ্যকালীন শাখায়, সঙ্গে বডিবিল্ডারের মত চেহারার সহ-শিক্ষক সোহন সিং। কলকাতায় বড় হওয়া ফ্লুএন্ট বাংলা বলা হিন্দিভাষী। আর তিন চার বছর পরে এলো একেবারে বাঙালি নারায়ণদা। নারায়ণ বোস, সুখলাল রায় দুজনেই আমাদের আর এস এসের বাঁশবনে শেয়াল রাজা, কারণ দুজনেই কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে পলিটিক্যাল সায়েন্স পড়ে। আজে-বাজে অনেক কিছু বলে তাদের লম্বা বক্তৃতায়, তার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আমরা রাখি না, আর করার কোনো দরকার আছে বলেও মনে করি না। কারণ, ওদের কথা নিশ্চয়ই অভ্রান্ত। অনেকটা কমিউনিস্ট পার্টির মতই অন্ধ আনুগত্য। কোনো একটা বিশেষ অনুষ্ঠান হলে, যেমন আর এস এসের বছরের ছটা বিশেষ অনুষ্ঠান গুরুপূর্ণিমা, মকর সংক্রান্তি, রাখীপূর্ণিমা, বিজয়া দশমী—এসব অনুষ্ঠানে নারায়ণদা বা সুখলালদা ঝাড়া এক ঘণ্টা ধরে কত কী বলে! নয়তো বাইরের কোনো অতিথি বক্তা আসেন, যাঁদের বেশির ভাগই হিন্দি বলেন।

রাজনীতি, সমাজ, হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব, পৃথিবীর নানা কথা (যার সত্যতা যাচাই করা অসম্ভব), আর শেষকালে আমাদের পুণ্যভূমি ভারতবর্ষে জন্মে আমরা যে ধন্য, সেসব কথা। এমনিতে কোনো অসুবিধে নেই নিজেদের শ্রেষ্ঠ ভাবতে, এবং আমি এখনো খুব আনন্দিত ভারত, বাংলা ও হিন্দুতার সঙ্গে নিজেকে আইডেনটিফাই করতে, কিন্তু জোর করে মগজে গজাল মেরে গুঁজে দেওয়াটা কোনকালেই আমার তেমন পছন্দ হয় নি। কোথায় যেন একটা ভ্যাকুয়াম অনুভব করতাম।

যাই হোক, কী আর করা যাবে? আমরা মাটিতে থেবড়ে বসে শুনি। একে বলে বৌদ্ধিক।

"মামার বাড়ি ভারী মজা, কীল চড় নাই।" এই আমার দিদিমার বাড়ি, বা দিদির বাড়ি। এখানে আমি প্রায় প্রত্যেকদিন একবার করে যেতাম। এখন সব শূন্য। - লেখক
“মামার বাড়ি ভারী মজা, কীল চড় নাই।” এই আমার দিদিমার বাড়ি, বা দিদির বাড়ি। এখানে আমি প্রায় প্রত্যেকদিন একবার করে যেতাম। এখন সব শূন্য। – লেখক

বৌদ্ধিক, মানে ইন্টেলেকচুয়াল ডিসকোর্স। গরমকালে পার্কের খোলা হাওয়ার অনুষ্ঠানে মাটিতে বসে ইটের টুকরো দিয়ে ফুল আঁকি বা কারুর নাম লিখি, বা আঙুলের টোকা দিয়ে ক্যারম খেলি বক্তৃতা শুনতে শুনতে। বা, ঘাস ছিঁড়ি, আর গোড়া চিবোই। শীতকালে কোনো স্কুলের হল ভাড়া নিয়ে অনুষ্ঠান হলে হলঘরের মেঝেতে বসে দৃষ্টিহীনভাবে বক্তৃতা বা তার শব্দবাণ বোঝার চেষ্টা করি। ভাবি, এবার নিশ্চয়ই শেষ হবে, এইমাত্র বলল, “সবশেষে আমি বলতে চাই যে…” বা, “শেষ করার আগে ধন্যবাদ জানাতে চাই…” বা এই রকম কিছু। এবার নিশ্চয়ই শেষ হবে। প্রশ্ন করার কোনো রেওয়াজ নেই। প্রশ্ন করার মত খ্যামতাও আমাদের নেই। আমরা অবাক হয়ে ভাবি, বাবা দেখেছ, এক ঘণ্টা ধরে বক্তৃতা দিল সুখলালদা! কী যে বলল, তা আমরা কিছুই বুঝলাম না, আর অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাওয়ার আধঘণ্টা পরেই সম্পূর্ণ ভুলে গেলাম কী বিষয়ে বক্তৃতা হলো আজকে। অর্থাৎ, জ্ঞান অর্জন, বা বিশ্লেষণের কোনো রাস্তাই নেই। এমনকি, হাততালি দেওয়ারও রেওয়াজ নেই আর এস এসে। কেউ হাততালি দিল না। দু চারটে আজেবাজে প্রশ্ন করলাম হয়ত পরের দিন ওদের। অন্যদের সামনে দেখানোর জন্যে-যে আমিও বড় বড় প্রশ্ন করতে পারি এসব বিষয়ে। বাজে প্রশ্ন, আর তার উত্তর যে কী দিল তারা, তা আমি বুঝলামও না, সেসব নিয়ে কোনো পড়াশোনাও করলাম না, বা কেউ করতে উৎসাহও দিল না। এই ছিল আমার আর এস এসের ইন্টেলেকচুয়াল লাইফ। অন্তত, সে বয়েসে তাই ছিল।

আর এস এসে সে সময়ে আমার খুব বন্ধু ছিল যারা, তারা সবাই প্রায় অবাঙালি। তারাই সংঘের আসল সমর্থক ছিল, এবং তারাই আর এস এস, বিজেপিকে বাইরে থেকে পশ্চিমবঙ্গে নিয়ে আসতে সাহায্য করেছে। যদিও বহুকাল আগে কলকাতারই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে সেই গুরুজি গোলওয়ালকার ভারতীয় জনসংঘ গড়ে তোলবার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন ‘বাংলার বাঘ’ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ছেলে, এবং নিজেও বাঘের বাচ্চা। ফজলুল হক ও শ্যামাপ্রসাদ বাংলাদেশকে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির রাস্তায় কিছুটা নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছিলেন, একথা তপন রায়চৌধুরী তাঁর বাঙালনামাতেও বলে গেছেন নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে। কিন্তু কংগ্রেসীরা ও বাংলার বামপন্থীরা তা স্বীকার করে না। শ্যামাপ্রসাদ অসাধারণ বক্তৃতা করতে পারতেন, এবং স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশরা, এবং স্বাধীনতা ও পার্টিশন হবার পরে নেহেরুরা, তাঁর যুক্তিবাদী বাগ্মীতাকে রীতিমত ভয় পেতেন। বোধহয় নেহরুর রাজনীতিতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি জনসংঘ শুরু করলেন।

রিএকশনারী পলিটিক্স। যেমন সর্বত্র হয়ে এসেছে। এখনো হচ্ছে। ভারতে, বাংলাদেশে, আমেরিকায়, ইউরোপে।

তিনের আট গোরাচাঁদ বসু রোড। ছোট্ট জানলা ও তার ভাঙা খড়খড়ি, যা প্রায় রাস্তায়, গলিতে এসে ঠেকেছে, এটাই ছিল আমার পড়ার ঘর, ঘুমোনোর ঘর, অবসর বিনোদনের ঘর। বয়ঃসন্ধিতে দিবাস্বপ্ন দেখার ঘর।  - লেখক
তিনের আট গোরাচাঁদ বসু রোড। ছোট্ট জানলা ও তার ভাঙা খড়খড়ি, যা প্রায় রাস্তায়, গলিতে এসে ঠেকেছে, এটাই ছিল আমার পড়ার ঘর, ঘুমোনোর ঘর, অবসর বিনোদনের ঘর। বয়ঃসন্ধিতে দিবাস্বপ্ন দেখার ঘর। – লেখক

শ্যামাপ্রসাদের কাশ্মীরের জেলে অস্বাভাবিক মৃত্যুর পর কলকাতায় দেবপ্রসাদ ঘোষের মত পণ্ডিত এবং হরিপদ ভারতীর মত বাগ্মী জনসংঘের হাল ধরেছিলেন। কিন্তু সবসময়েই আর এস এস ও জনসংঘের আসল হার্ডকোর সমর্থক ও পদাতিক সৈন্য ছিল কলকাতা ও আসানসোল-দুর্গাপুর-রাণীগঞ্জ ইত্যাদি শিল্পশহরের অবাঙালি সমাজ, এবং নদীয়া, মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও মেদিনীপুরের রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ। আমার সংঘের বন্ধুদের মধ্যেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। হরিশ চোপরা, পাঞ্জাবি হিন্দু। তার ভাই ধরমপাল চোপরা। শ্যাম ফ্যামিলির চার গাট্টাগোট্টা ভাই—কৃষ্ণকান্ত, বিজয়কান্ত, উমাকান্ত, নটবরকান্ত। সিন্ধি ব্যবসায়ী পরিবারের চন্দুপ্রকাশ কাকরানিয়া। ত্রিভুবন ডালমিয়া। রোহিত গুপ্তা। ধনী পাঞ্জাবি ব্যবসায়ী পরিবারের বখে যাওয়া, সোনার চেন পরা ছেলে নরেন্দ্র শ্রফ। সোমানি পরিবারের সিন্ধি ছেলেরা। তারপর, রক্ষণশীল বাঙালি ব্যবসায়ী বাড়ির ছেলে রঞ্জন। শ্যামবাজারে তাদের বিরাট জামাকাপড় আর ওষুধের দোকান—রামকানাই যামিনীরঞ্জন পাল। জয়ন্ত আর সুব্রত সাহা—পূর্ববঙ্গ থেকে কলকাতায় আসা গোঁড়া হিন্দু ফ্যামিলি। ভীষণ বাঙাল উচ্চারণ। ভালো ছাত্র, কিন্তু বেশি আসে না শাখায়। লোহার ব্যবসাদার পরিবারের বিহারী ছেলে সুবোধ গুপ্তা। কাঠের ব্যবসায়ী সাহা পরিবারের অরবিন্দ সাহা, কল্যাণ সাহা, কমল সাহা, তপন, আর ছোটভাই জয়ন্ত। এরা প্রত্যেকেই পড়াশোনায় একেবারে বাঁধিয়ে রাখার মত। পরীক্ষায় পাশ করলে ওদের বাড়ি উৎসব। কিন্তু, খেলাধুলোয় দারুণ। কল্যাণ সাহার লাঠিখেলা আর তপনের লেম ম্যান দেখবার মত। এরা সব আমার বন্ধু, দাদা। এদের সঙ্গে আর যাই কথা বলি না কেন, পড়াশোনার কথা বলি না। হ্যাঁ, তবে তাদের সঙ্গে তুমুল কাবাডি খেলি, আর চেহারা খুব মজবুত হচ্ছে নিয়মিত এক্সারসাইজ করে, সে কথা বলতেই হবে। শীতের মাঝখানে আর এস এস এসের উইন্টার ক্যাম্পে যাই কোনো শহরতলীতে। প্রচণ্ড হি হি করে কাঁপা শীত। তাঁবুর মধ্যে খড়ের গাদায় বিছানা করে রাত কাটাই। ভোরের আলো ফোটার আগে উঠে অন্ধকারে মাঠে সম্মিলিত প্রাতঃকৃত্য সমাপনান্তে যোগব্যায়াম করি হরিশ রঞ্জন বিজয়ের সঙ্গে। গোয়াবাগান শাখার কাবাডি টিম কলকাতায় চ্যাম্পিয়ন।

স্কুলের পড়াশোনা করার ব্যাপারে এদের কাছে কোনো সাহায্যই পাই নি। তেমন কোনো ব্যবস্থাই ওখানে ছিল না। যা লেখাপড়া করেছি, নিজের চেষ্টাতেই করেছি। মাস্টারমশাই, বা প্রাইভেট কোচিংয়ে পড়ানোর ক্ষমতা আমার বাবার ছিল না। সে সময়ে সেভেন এইটে না হোক, নাইন টেনে ভালো ছাত্ররা অনেকেই বাড়িতে মাস্টার রেখে বা ভালো, নামকরা টিচারের কাছে প্রাইভেট কোচিংয়ে পড়ছে। বিশেষ করে, স্কুলে যখন নকশালবাড়ির তাণ্ডবে, আর সিপিএমের সঙ্গে তাদের এলাকা দখলের যুদ্ধে কলকাতার রাস্তা বারুদের আর বোমার গন্ধে যুদ্ধক্ষেত্রের মতই আগুন-গরম, তখন স্কুলের আশা ছেড়ে দিয়ে অনেক ছেলের বাবামা’ই তাদের পড়াশোনার অন্য ব্যবস্থা করছেন। কিন্তু আমার বাড়িতে সেসব কোনো ব্যবস্থা নেই। তার মধ্যেই আমি যা পারছি, তাই করছি। এবং, আস্তে আস্তে স্কটিশ স্কুলে ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড হওয়া ছেলে পার্থ ডুবে যাচ্ছে। দ্রুতগতিতে ডুবে যাচ্ছে।

বিশুদা। পুরনো পাড়ায় হঠাৎ দেখা হয়ে যায় এদের সঙ্গে। বয়েসের ভারে ন্যুব্জ। জীবনের ভারে ক্লান্ত। দেখা হলে তাও অনেক কথা বলে। জানতে চায় আমাদের আমেরিকার জীবনের কথা। অনেক কৌতূহল, অনেক প্রশ্ন, অনেক ঔৎসুক্য। এই বিশুদা, বল্টুদারা সেই ছেলেবেলায় আমাদের রবীন্দ্রনাথের "খ্যাতির বিড়ম্বনা" নাটক করতে শিখিয়েছিল। ভুলতে চাইলে ভুলে যেতেই পারতাম। কিন্তু, ভুলব কেন? ওরা কি আমাকে ভুলে গেছে? - লেখক
বিশুদা। পুরনো পাড়ায় হঠাৎ দেখা হয়ে যায় এদের সঙ্গে। বয়েসের ভারে ন্যুব্জ। জীবনের ভারে ক্লান্ত। দেখা হলে তাও অনেক কথা বলে। জানতে চায় আমাদের আমেরিকার জীবনের কথা। অনেক কৌতূহল, অনেক প্রশ্ন, অনেক ঔৎসুক্য। এই বিশুদা, বল্টুদারা সেই ছেলেবেলায় আমাদের রবীন্দ্রনাথের “খ্যাতির বিড়ম্বনা” নাটক করতে শিখিয়েছিল। ভুলতে চাইলে ভুলে যেতেই পারতাম। কিন্তু, ভুলব কেন? ওরা কি আমাকে ভুলে গেছে? – লেখক

কিন্তু, তখনো হয়ত আমি মাঝে মাঝে বাংলায়, ইংরিজিতে ক্লাসে হঠাৎ হায়েস্ট নম্বর পেয়ে গেলাম একবার। কিংবা, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন একটা রচনা লিখলাম বা এমন একটা আলোচনা করলাম মনসামঙ্গল কাব্যের ওপর, টিচার পর্যন্ত আশ্চর্য হয়ে গেলেন। কিংবা, আমার মনে আছে, ক্লাস এইটের পরে আমাদের যখন সায়েন্স, আর্টস না কমার্স কী নেব সেটা ঠিক করতে হলো, আর আমরা তথাকথিত ভালো ছেলেরা সব সায়েন্সে গেলাম, কারণ সায়েন্সে তো যেতেই হবে নইলে আমাদের ভালো ছেলেদের প্রেস্টিজ থাকবে না, আর আর্টস কমার্স আবার মানুষে পড়ে নাকি এরকম একটা ধারণা (আর তাছাড়া আর্টস কমার্সে গেলে হায়ার সেকেন্ডারিতে নম্বর উঠবে না এ তো সবাই জানে), তখন একটা বাধ্যতামূলক পরীক্ষায় আমি সোশ্যাল স্টাডিজে একশোর মধ্যে নিরানব্বই পেলাম। সত্যি, আমাদের দেশে তো নম্বর দিতেই চায় না। যেন বাপের সম্পত্তি! তাও পেলাম।

ক্লাস এইটে জীবনের শেষ ভূগোল পরীক্ষা। বাবা হঠাৎ আবিষ্কার করলো যে ভূগোলেতে আমি গোল। গোল্লা পেতে চলেছি আমি।

তার পরের দিনই পরীক্ষা। আমি উপায় না দেখে বাবার কাছে গেলাম।

বাবা বলল, “দেখি তোমার বইটা নিয়ে এস তো।”

তারপর দেখে টেখে বলল, “তুমি কখনো দেখেছ এই বইতে শেষের দিকে একটা গ্লসারী আছে?”

আমি বললাম, “গ্লসারী? গ্লসারী কী?”

বাবা বলল, “গ্লসারী মানে সারাংশ।”

বলে, সেদিন পরীক্ষার ঠিক আগের রাতে, আমাকে কয়েক ঘণ্টা ধরে সেই সারাংশ দারুণভাবে পড়িয়ে দিল। আর প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে করে উত্তর ঠিক করে দিল। বাবা বোধহয় সেই শেষবার আমাকে পড়িয়েছে। কারণ, সায়েন্স যখন নিলাম নাইনে উঠে, তখন বাবা আর পড়াতে পারল না। আমাদের কলকাতার সায়েন্সের সিলেবাসের সঙ্গে বাবার কোনো পরিচয় ছিল না।

সেই ভূগোল পরীক্ষায় আমি একশোর মধ্যে উননব্বই পেয়েছিলাম।

পড়াশোনার কথাগুলো বলার আজ খুব দরকার আছে। কারণ, অনেকেরই ধারণা আমার উচ্চশিক্ষার জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসাটা বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ার মত একটা ঘটনা। অর্থাৎ, “পার্থ আমেরিকায় গেছে পি এইচ ডি করতে? শালা, আজকাল দেখি সবাই আমেরিকায় যাচ্ছে!” এসব কথা আমি নিজেই শুনেছি। কিংবা, পাড়ার কেউ হয়ত বলল, “আরে, বাবুয়াকে চিনিস না? ওই যে গোরাচাঁদে একটা রোগা মত ছেলে ছিল না স্যাকরার দোকানের ওপরে থাকত? খুব ফুটবল ক্রিকেট খেলে বেড়াত পাজামা পরে? আরে, ওই যার বাবা আর এস এস।” তার উত্তরে আর একজন বলল, “ওই বাবুয়া? বাবুয়া আমেরিকায় গেছে? কী করে গেল বলত?”

আমার মামা ও মাসির বন্ধুরা।  এরা আমাকে দেখছে সেই শিশু বয়স থেকে। বাঁদিক থেকে: বাবুমামা, ছোটমামা বুদ্ধর ক্লোজ ফ্রেন্ড রথীন মামা, রথীন মামার বোন এবং আমার মাসি শোভার বান্ধবী চম্পা মাসি, এবং তার পাশে তার স্বামী গৌর মামা, যে আবার বুদ্ধ ও রথীনের ছোটবেলার বন্ধু। এরা আমাকে এই বয়েসেও খুব কাছের বলে মনে করে।  দেখা হলে খুব খুশি হয়।  অনেক পুরনো দিনের কথা হয়।  - লেখক
আমার মামা ও মাসির বন্ধুরা। এরা আমাকে দেখছে সেই শিশু বয়স থেকে। বাঁদিক থেকে: বাবুমামা, ছোটমামা বুদ্ধর ক্লোজ ফ্রেন্ড রথীন মামা, রথীন মামার বোন এবং আমার মাসি শোভার বান্ধবী চম্পা মাসি, এবং তার পাশে তার স্বামী গৌর মামা, যে আবার বুদ্ধ ও রথীনের ছোটবেলার বন্ধু। এরা আমাকে এই বয়েসেও খুব কাছের বলে মনে করে। দেখা হলে খুব খুশি হয়। অনেক পুরনো দিনের কথা হয়। – লেখক

আবার পাড়ার কয়েকজন পুরনো দাদা, তারা আবার খুব গর্বিত। দেখা হলেই অনেক কথা বলে, অনেক কথা জিজ্ঞেস করে। যেমন, আমাদের দাশগুপ্ত বাড়ির বিশুদা। এদের কথা আমাকে বলতেই হবে। এদের চোখে চিরকাল একটা স্নেহ দেখে এসেছি। আমি আমেরিকায় পড়াশোনা করেছি, রিসার্চ করেছি, পড়িয়েছি, এখন থাকি, কাজ করি, আর সর্বক্ষণ ইংরিজিতে কথা বলি, গাড়ি চালাই, আবার দেশে গেলে সবাইয়ের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করি, কারুকে ভুলে যাই নি, এতে এসব শুভানুধ্যায়ীদের আনন্দের শেষ নেই।

এরা আমাকে বড় হতে দেখেছে। আমার বাড়ির অবস্থা দেখেছে। আমার স্ট্রাগল দেখেছে। আমি-যে সবসময়ে একটু অন্যরকম ছিলাম, সেটাও দেখেছে। এই বিশুদা পাড়ার আর এক দাদার সঙ্গে যৌথভাবে একসময়ে আমাদের নাটকে অভিনয় করার উৎসাহ দিয়েছে। যাতে আমরা খারাপ পথে চলে না যাই সেই বয়েসে। অনেকটা, এই আমেরিকাতে গরিব কৃষ্ণাঙ্গ ছেলেদের যেভাবে আফটার-স্কুল প্রোগ্রামে ধরে রাখে, খেলাধুলো শেখায়। মেন্টরিং করে।

একবার সিক্স না সেভেনে পড়ার সময়ে এরা আমাদের ধরে রবীন্দ্রনাথের খ্যাতির বিড়ম্বনা নাটক রিহার্সাল দেওয়া শুরু করলো। আমাকে দিল প্রধান চরিত্র উকিল দুকড়ি দত্তের পার্ট।

“উকিল দুকড়ি দত্ত চেয়ারে আসীন। ভয়ে ভয়ে খাতা হস্তে কাঙালিচরণের প্রবেশ।

(কাঙালিচরণ হলো সুব্রত।)

দুকড়ি। কী চাই?

কাঙালি। আজ্ঞে, মশায় হচ্ছেন দেশহিতৈষী—

দুকড়ি। তা তো সকলেই জানে, কিন্তু আসল ব্যাপারটা কী?

কাঙালি। আপনি সাধারণের হিতের জন্য প্রাণপণ—

দুকড়ি। করে ওকালতি ব্যবসা চালাচ্ছি তাও কারও অবিদিত নেই—কিন্তু তোমার বক্তব্যটা কী?

কাঙালি। …আর্য্যাবর্তে ভরতমুনি হচ্ছেন গানের প্রথম…

দুকড়ি। ভরতমুনির নামে যদি কোনো মোকদ্দমা থাকে তো বল। নইলে বক্তৃতা বন্ধ কর।

কাঙালি। অনেক কথা বলবার ছিল—

দুকড়ি। কিন্তু অনেক কথা শোনবার সময় নেই।

কাঙালি। তবে সংক্ষেপে বলি। এই মহানগরীতে গানোন্নতিবিধায়িনী-নাম্নী এক সভা স্থাপন করা গেছে, তাতে মহাশয়কে—

দুকড়ি। বক্তৃতা দিতে হবে?

কাঙালি। আজ্ঞে না।

দুকড়ি। সভাপতি হতে হবে?

কাঙালি। আজ্ঞে না।

দুকড়ি। তবে কী করতে হবে বল। …

কাঙালি। আজ্ঞে, কিঞ্চিৎ চাঁদা…

দুকড়ি। চাঁদা? আ সর্বনাশ! তুমি তো সহজ লোক নও হে! ভালোমানুষটির মতো মুখ কাঁচুমাচু করে এসেছ—আমি বলি, বুঝি কী মোকদ্দমার ফেসাদে পড়েছ। তোমার চাঁদার খাতা নিয়ে বেরোও এখনি, নইলে ট্রেসপাসের দাবি দিয়ে পুলিস-কেস আনব।

কাঙালি। চাইলুম চাঁদা, পেলুম অর্ধচন্দ্র! (স্বগত) কিন্তু তোমাকে জব্দ করব।

কয়েক বছর আগে আগ্রাতে তাজমহলের সামনে আমি ও আমার স্ত্রী মুক্তি।  - লেখক
কয়েক বছর আগে আগ্রাতে তাজমহলের সামনে আমি ও আমার স্ত্রী মুক্তি। – লেখক

নাটকটা শেষ পর্যন্ত নামানো হয় নি। কিন্তু পার্ট এখনো মনে আছে কিছু কিছু। এই বিশুদা-বল্টুদারাই করিয়েছিল। শিখিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের নাটক। দারুণ মজা। হাসতে হাসতে আমরা বন্ধুরা খুন! পুরনো দিনের বাংলা কথা। তার উচ্চারণ। সামাজিক পটভূমিকা। স্বরক্ষেপণ। পোশাক। হাঁটাচলা। রবীন্দ্রনাথের ব্যঙ্গকৌতুকের সেরিব্রাল হাসি। এখনকার দিনের মত কাতুকুতু দিয়ে হাসানো নয়। অশ্লীলতা নয়। ভাঁড়ামি নয়।

যখন রিহার্সাল হচ্ছে, তখন রাজ্যের ছেলে ভিড় করে দেখছে আমাদের ছোট্ট ক্লাবের ঘরটাতে। ক্লাব মানে একটা ঘর, তাতে দু একটা বইয়ের আলমারি, আর একটা টেবিল চেয়ার। আর আমাদের হাতে লেখা স্ফুলিঙ্গ ম্যাগাজিন বাইরে একটা দেওয়াল বাক্সে জালের ফ্রেমবন্দি। হয় সেখানে রিহার্সাল হচ্ছে একজন দুজন করে, নয়তো কারুর বাড়িতে। যাদের বাড়ি জায়গা আছে একটু, আর পারমিশন আছে এসব করার। রিহার্সাল দিচ্ছি আমি দুকড়ি দত্ত, সুব্রত কাঙালি, শুভ হরশংকর, আরো সব কে কে যেন ছিল। আর বাইরে উৎসুক জনগণের ভিড়। আমরা যেন স্টার। আর যখন রিহার্সাল হচ্ছে না, তখন আমরা নিজেদের মধ্যে সেই নাটক নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা। নির্ভেজাল হাসি। কখন কে ভুল উচ্চারণ করলো, বা কে পার্ট ভুলে যা তা বলতে লাগলো।

ওঃ, কী মজা!

সেসব দিনকে ভোলা যায় নাকি? এসব মানুষকে ভোলা যায় নাকি আবার?

(কিস্তি ১২)

More from পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘটিকাহিনী (১৫)

আমি অনেক, অনেক রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনেছি। অনেক ভেবেছি রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে। বিশ্লেষণ শেখার...
Read More