ঘটিকাহিনী (২০)

স্বপ্নে কলকাতা, বাংলাদেশটা আর ভারতবর্ষ ফিরে ফিরে আসে। দিবাস্বপ্নে আসে। রাতের ঘুমের মধ্যে আসে। গোরাচাঁদ বোস রোড আসে। কারবালা ট্যাংক লেন আসে। প্যারী রো, গোয়াবাগান পার্ক আসে।

(আগের পর্ব)

একতারাতে আধখানা গান গাওয়া

“অনেক পাওয়ার মাঝে মাঝে
কবে কখন একটুখানি পাওয়া
সেইটুকুতে জাগায় দখিন হাওয়া”

‘আবু গরিব কলকাতা’র কথা লিখতে লিখতে মনে হচ্ছিল এত রক্ত, এত হিংসা, এত কষ্টের, যন্ত্রণার কথা লেখার কি কোনো দরকার ছিল? আমার জীবনের এত প্রিয় একটা জায়গা জুড়ে রয়েছে স্কটিশ চার্চ স্কুল, তার প্রত্যেকটা ঘর, বারান্দা, রোদ, হাওয়া, বৃষ্টি, তার অফিস ঘর, তার লাইব্রেরি ঘর, তার সিঁড়ি, তার ফিজিক্স কেমিস্ট্রি বায়োলজি ল্যাব, তার সায়েন্স এক্সিবিশন, তার সেই সকালবেলার অদ্ভুত বাংলায় খ্রীষ্টান প্রার্থনা, তার খেলার মাঠ, উঠোন, জলের কল এমন-কি পেচ্ছাপ করার জায়গা—এই সব কিছুই আমার জীবনের এমন একটা মন ভালো করে দেওয়া অংশ—তার সম্পর্কে কোনো কটু কথা লেখার আদৌ কি প্রয়োজন ছিল?

কী হত যদি সেই জল্লাদের মার খাওয়ার কথা না লিখতাম? সেই যন্ত্রণায় পিঠ বেঁকে নীল ডাউন হওয়ার কথাটা আমার স্মৃতি থেকে সম্পূর্ণ মুছে দিতাম? স্কটিশ চার্চ স্কুলের এগারোটা বছর আমাকে এত দিয়েছে, তার বিনিময়ে সেই অন্ধকার ঘরগুলোর আরশোলা, বিছে, ইঁদুর আর চামচিকের কথা নাই-বা লিখতাম।

parthab logo

ঠিক সেই রকম কলকাতার সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতাগুলোও তো স্মৃতিকথা থেকে বাদ দিয়ে দিতে পারতাম। কলকাতাকে আমি এত ভালোবেসেছি চিরকাল। আর কলকাতা শহরটা, তার বাড়ি ঘর ইট রাস্তা চুন সুরকি সিমেন্ট কংক্রিট বাস ট্রাম ট্রেন ট্যাক্সি দোকান বাজার ক্রিকেট ফুটবল, টিউকল, ঘুড়ির মাঞ্জা, বছরে একবার হরতাল আর খুব ভোরে খোল করতাল, আর অসংখ্য মানুষের মিছিল আমাকে এত ভালবাসা দিয়েছে, এত আনন্দ দিয়েছে, সুখ দিয়েছে, শান্তি দিয়েছে, তার বদলে তার বিশ্রী দিকটার কথা নাহয় নাই-বা লিখতাম। কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হত?

আমি তো কলকাতাকে সারা পৃথিবীর কাছে অপমানিত করতে চাই না। আমি তো আমাদের স্কটিশ স্কুলকে আমার বিদ্যাসাগর কলেজকে আমার ইউনিভার্সিটিকে আমার দেশকে সবার কাছে ছোট করতে চাই না। আমি তো আর একটা সিটি অফ জয় লিখতে চাই না। কলকাতাকে তো সবাই মিলে চিরকাল ছোটই করেছে, অপমান করেছে, অসম্মান করেছে। কেটেছে, ছিঁড়েছে, মেরেছে, বলাৎকার করেছে। বাইরের কিছু লোক এসেছে, আর দুদিন থেকেই কলকাতা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞের মতামত দিয়ে গেছে।

রথীন মামার বাড়ি আমার মামার বাড়ির পাড়ায়। হরতুকি বাগান লেন। এখানে কত দুপুর কাটিয়েছি। দুতলার ঘরে বসে বসে গল্পের বই পড়া।  একটু ঘুমোনো। রথীন মামা ছিল আমার ছোটমামা বুদ্ধর শৈশবের বন্ধু।
রথীন মামার বাড়ি আমার মামার বাড়ির পাড়ায়। হরতুকি বাগান লেন। এখানে কত দুপুর কাটিয়েছি। দুতলার ঘরে বসে বসে গল্পের বই পড়া। একটু ঘুমোনো। রথীন মামা ছিল আমার ছোটমামা বুদ্ধর শৈশবের বন্ধু। – লেখক

এই তো কয়েক বছর আগে ‘বর্ন ইনটু ব্রথেলস’ তথ্যচিত্র তৈরি করে আমারই দুই পরিচিত আমেরিকান হলিউডে অস্কার নিয়ে চলে গেল। সেই নিয়ে সারা পৃথিবীতে কী শোরগোল! অথচ, আমি ছিলাম সে-তথ্যচিত্রের পোস্ট-প্রোডাকশন অনুবাদক। একশোরও বেশি ভিডিও টেপ আমি ইংরিজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে দিয়েছিলাম দুই পরিচালক জানা ব্রিসকি আর রস কাউফম্যানের অনুরোধে। ওরা তো বাংলা জানেই না। তারপর দেখলাম সেই হাজার হাজার ফুট ফিল্মে সেই সোনাগাছির গরিব মানুষগুলোর অতিমানুষ হওয়ার যেসব গল্প ছিল, সেগুলো সব নষ্ট করে দিয়ে শুধু মনুষ্যেতর দিকগুলোর কথাই সে-তথ্যচিত্রে ফলাও করে, ঢাক পিটিয়ে বলা হয়েছে। দেখে রাগে গা রি রি করে উঠেছিল। আমি তো কলকাতার অপমান দেখলে, কলকাতার মানুষের অসম্মান দেখলে সবচেয়ে আগে আবেগতাড়িত হই। আমি কেন নিজে আমার জন্মভূমিকে হেয় করতে যাব?

সেই যেবার আমাদের পাড়ার একটা গুণ্ডা-মাস্তান এক গরিব হিন্দুস্তানি আটা-পেষাওলাকে স্টিলের আংটি দিয়ে ঘুষি মেরে মেরে তার একটা চোখ সকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল, আর আমি গিয়ে দেখি ভিড় করে লোকজন সব দেখছে লোকটার চোখের গহ্বর দিয়ে চুঁয়ে চুঁয়ে রক্ত গড়াচ্ছে আর মাঝবয়েসী লোকটা যন্ত্রণায় আর ভয়ে চিৎকার করে কাঁদছে। বা, এলিট সিনেমায় বন্ধুদের সঙ্গে পঁচাত্তর পয়সার সস্তা টিকিটের লাইন দিতে গিয়ে দেখি একটা ছেলেকে পুলিশ এমন মার মারলো লাঠি দিয়ে যে ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে গেল আর তার খোলা পিঠের ফালা ফালা হয়ে যাওয়া জায়গাটা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে লাগলো।

উত্তর কলকাতার বিখ্যাত দুর্গাপুজো সাহিত্য পরিষদ স্ট্রিট, বিডন স্ট্রিট, কুমোরটুলি, বাগবাজার। জনারণ্য। মেলা। নতুন জামাকাপড় পরে হই হই করে একটা মন্ডপ থেকে আর একটা মন্ডপে ঠাকুর দেখে দেখে বেড়ানো চার পাঁচটা দিন। আশ্চর্য সব শিল্পসম্মত মন্ডপ আর তার অলঙ্করণ।
উত্তর কলকাতার বিখ্যাত দুর্গাপুজো সাহিত্য পরিষদ স্ট্রিট, বিডন স্ট্রিট, কুমোরটুলি, বাগবাজার। জনারণ্য। মেলা। নতুন জামাকাপড় পরে হই হই করে একটা মন্ডপ থেকে আর একটা মন্ডপে ঠাকুর দেখে দেখে বেড়ানো চার পাঁচটা দিন। আশ্চর্য সব শিল্পসম্মত মন্ডপ আর তার অলঙ্করণ। – লেখক

বা আমাদের পাড়া ঘিরে ফেলে একাত্তরে ইন্দিরা গান্ধীর সি আর পির নির্বিচারে যুবক ছেলেদের বাড়ি থেকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা। স্কুল ঘিরে ফেলে চোখ জ্বলে যাওয়া টিয়ার গ্যাসের মধ্যে দিয়ে পুলিশের ভ্যানে যাকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া। এসব তো আমার নিজের চোখে দেখা। কিন্তু নাও বলতে পারতাম। চেপে যেতে পারতাম। বলে তো আর আমি সেসব ঘটনাকে টাইম মেশিনের মত ঘটার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব না। যারা মার খেয়েছিল, আর যন্ত্রণায় ছটফট করেছিল, চিৎকার করে কেঁদেছিল, তাদের কোনো সাহায্যও করতে পারব না। তখনো পারি নি, এখনো পারব না। তাহলে এসব কথা ঢাক পিটিয়ে বলার দরকারটা কী? মনের শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতগুলোকে আবার রক্তাক্ত করার কী দরকার?

অন্যদেরই বা কষ্ট দেওয়ার কী দরকার?

তারপরেই আবার মনে হয়, এই যে সত্যজিৎ রায় পথের পাঁচালি করেছিলেন, আর ঋত্বিক ঘটক মেঘে ঢাকা তারা করেছিলেন, আর মৃণাল সেন কলকাতা ৭১ করেছিলেন, আর গৌতম ঘোষ নাসিরুদ্দিন শা আর শাবানা আজমিকে দিয়ে সেই পার ছবি করেছিলেন, সেগুলো দেখেও-তো লোকে অনেকটা একই কথা বলেছিল। বলেছিল, এসব অন্ধকার জগতের ছবি, দারিদ্র্য, হতাশা, যন্ত্রণা, বঞ্চনা আর অবিচারের কথা বিক্রি করে তাঁরা নাকি পয়সা করছেন, পুরস্কার পাচ্ছেন। সেটাই নাকি তাঁদের আসল উদ্দেশ্য। নার্গিস দত্ত সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা দেখে নাক সিঁটকেছিলেন। আমি সত্যজিৎ মৃণাল ঋত্বিক নই। আমি গৌতম ঘোষ ঋতুপর্ণ সন্দীপ রায় নই। কিন্তু আমার এসব ভয়াবহ বর্ণনা শুনেও অনেকে হয়ত একই ধরনের সমালোচনা করবেন। হয়ত বলবেন, এসব আমার মনের বিকৃত, অন্ধকার, আসল রূপ।

স্কটিশ চার্চ স্কুলের হেন্সম্যান ব্লক।  এই বাড়িতে তিনটে তলায় তিনটে ল্যাবরেটরি -- একতলায় কেমিস্ট্রি, দুতলায় ফিজিক্স, তিনতলায় বায়োলজি। এবারে কলকাতায় গিয়ে আমাদের প্রিয় বায়োলজি ল্যাব দেখে এলাম আবার। সেই জারে ডোবানো স্পেসিমেনগুলো।
স্কটিশ চার্চ স্কুলের হেন্সম্যান ব্লক। এই বাড়িতে তিনটে তলায় তিনটে ল্যাবরেটরি — একতলায় কেমিস্ট্রি, দুতলায় ফিজিক্স, তিনতলায় বায়োলজি। এবারে কলকাতায় গিয়ে আমাদের প্রিয় বায়োলজি ল্যাব দেখে এলাম আবার। সেই জারে ডোবানো স্পেসিমেনগুলো। – লেখক

তা বলুন গে তাঁরা। আমার কিছু আসে যায় না। কারণ, এসব কথা না বললে নিজের কাছে সৎ থাকা যায় না। আমি যদি গোয়াবাগান বস্তির কাছে মদের গলি পেয়ারাবাগানের সামনে মেজেনাইন ফ্ল্যাটে বড় হই, কিন্তু লোকের কাছে বলি আমি বালিগঞ্জে বা নিউ আলিপুরে থাকতাম, তাহলে যেমন মিথ্যাচার হবে, তেমনি আমি যেসব বিভীষিকা নিজের জীবনে দেখেছি, সেসব কথা সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে আমার স্মৃতিকাহিনীকে একটা মিষ্টি মিষ্টি প্রেম প্রেম সুখ সুখ চেহারা দিয়ে মিষ্টি মিষ্টি সুখ সুখ প্রেম প্রেম পাঠক-পাঠিকার কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করি, বিক্রি হবে নিশ্চয়ই অনেক বেশি, কিন্তু তা হবে ওই ‘বর্ন ইনটু ব্রথেলস’-এর মতই চূড়ান্ত অসৎ। শুধু তফাৎ থাকবে, ওরা আলোকে ঢেকে দিয়ে শুধু অন্ধকার জগৎটাকে বিক্রি করেছে পৃথিবীর কাছে, আর আমি অন্ধকারটাকে নোংরাটাকে মাটির তলায় হাঁড়িচাপা দিয়ে শুধু সোনা সোনা আলোটাকে লোকের কাছে বিক্রি করব। দুটোই হবে সমান অসৎ। সমান মিথ্যাচার।

কিন্তু, আমার কলকাতার বড় হওয়ার জীবনে শুধু অন্ধকার ক্লেদাক্ত আবর্জনা নেই। অপূর্ব উজ্জ্বল আকাশ আছে। মায়াবী চাঁদের কিরণ আছে। সোনাঝরা সন্ধ্যা আছে। রূপসী বাংলা আছে। মানুষ মানুষের জন্য আছে। জীবন জীবনের জন্য আছে। সহানুভূতি আছে। ত্যাগ আছে। সোহাগ আছে। জড়িয়ে ধরা আছে। চুমু আছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া আছে। হাতে হাত রাখা আছে। চোখে চোখ রাখা আছে। হাসি আছে। খেলা আছে। বিনা কারণে খুব ভালো লাগা আছে। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে খোলা গলায় গান গাওয়া আছে। বর্ষায় এক হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে পড়া ট্রাম থেকে নেমে মনের আনন্দে অপরিচিত সহযাত্রীর সঙ্গে জল ঠেলে ঠেলে অনেক রাতে বাড়ি ফেরা আছে। লোকাল ট্রেন থেকে হঠাৎ নাম-না-জানা কোনো একটা গ্রামের স্টেশনে নেমে পড়ে বন্ধুদের সঙ্গে বনে জঙ্গলে ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার খোঁজা আছে। আমহার্স্ট স্ট্রিটের ক্রাউন বোর্ডিং নামক মেসবাড়িতে দুপুরবেলা চার বন্ধু বসে বসে সিগারেট খেতে খেতে আর হাসির গল্প করতে করতে আর ইচ্ছে করে ভুল সুরে হিন্দি গান গাইতে গাইতে এক পয়সায় এক পয়েন্ট তাসের ফিশ খেলা আছে। কী হয়েছে সেই চার বন্ধুর মধ্যে দুজন আজ যদি বেঁচে না থাকে? মনের মধ্যে তো তারা চিরকালই আছে। শালারা যাবে কোথায়?

কলকাতার বৃষ্টি। বাংলার বর্ষার সৌন্দর্য। যারা তার মধ্যে বড় হয়নি, তারা কী বুঝবে? আমেরিকায় বর্ষাকাল নেই। বেশির ভাগ জায়গাতেই নেই। এদের মানুষ তাই আমাদের বাংলাদেশের মানুষের কোমলতা, সজীবতা বোঝেনা। প্রকৃতি মানুষের মনকে গড়ে তোলে।  বাংলার বর্ষা আর বাংলাদেশের সবুজ বাংলার মানুষের সংবেদনশীল প্রকৃতি তৈরী করেছে।
কলকাতার বৃষ্টি। বাংলার বর্ষার সৌন্দর্য। যারা তার মধ্যে বড় হয়নি, তারা কী বুঝবে? আমেরিকায় বর্ষাকাল নেই। বেশির ভাগ জায়গাতেই নেই। এদের মানুষ তাই আমাদের বাংলাদেশের মানুষের কোমলতা, সজীবতা বোঝেনা। প্রকৃতি মানুষের মনকে গড়ে তোলে। বাংলার বর্ষা আর বাংলাদেশের সবুজ বাংলার মানুষের সংবেদনশীল প্রকৃতি তৈরী করেছে। – লেখক

ফ্রি টিকিট যোগাড় করে ইস্টবেঙ্গল মাঠে এরিয়ান ক্লাবের ফুটবল খেলা দেখা আছে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান সামনে কাঠের চেয়ারে বসে বসে শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে যাওয়া আছে। কলকাতার বাইরে থেকে কোনো আত্মীয় এলেই তাকে সঙ্গে করে বিড়লা প্ল্যানেটেরিয়ামে ঠাণ্ডা, অন্ধকার গোল ঘরটায় বসে বসে আরো অন্ধকার তৈরি-আকাশের তারা গোনা আছে। একটা ফ্রি টিকিট যোগাড় করে ইডেন গার্ডেনে সোবার্সের বোলিং আর বিশ্বনাথের ব্যাটিং দেখা আছে মাত্র একদিনের জন্যে। সুব্রত টিকিট দিল নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে টেবিল টেনিসের বিশ্বকাপের খেলা দেখবার। ও একটু দেখবে, তারপর বাইরে বেরিয়ে আসবে আর আমাকে ওর টিকিটের বাথরুম পাসটা দিয়ে দেবে। তখন আমি ঢুকব। আমি দু ঘণ্টা দেখব, তারপর আবার বাইরে বেরিয়ে এসে আমার পাসটা দিয়ে দেব ওকে। এইভাবে একদিন দু ঘণ্টা দেখেছিলাম। তারপরেই আমার চিকেন পক্স হয়ে গেল। আগে হলো আমার, তারপরে হলো আমার মার। মামার বাড়ি থেকে টিফিন বাক্সে করে ওরা ভাত আর বাঁধাকপির তরকারি আর ডাল পৌঁছে দিয়ে যেত। মা তখন রাঁধতে পারে না দু তিন সপ্তাহ।

কত স্মৃতি। কত গল্প। কত চেনা চেনা হাসিমুখ। বলে শেষ করা যায় না। আর কত মজার মজার কথা। শুকতারা সন্দেশ কিশোর ভারতী। হাঁদা ভোঁদা নন্টে ফন্টে। আশ্চর্য দ্বীপ আর বাক্স রহস্য আর বাদশাহী আংটি। ফেলুদার চারমিনার খাওয়ার নেশা দেখে আমরাও চারমিনার ধরলাম। সোনার কেল্লা দেখে মনে হলো জয়সলমীর না দেখলে জীবন বৃথা। চাঁদের পাহাড় পড়ে মাঝরাত্তিরে ঘুম থেকে উঠে পূর্ণিমার চাঁদের দিকে তাকিয়ে রইলাম শঙ্করের মত। সুব্রতকে মনে হতে লাগলো ডিয়েগো আলভারেজ। নয়তো ট্রেজার আইল্যান্ড পড়ে আমি হলাম জিম হকিন্স, আর সুব্রত হলো লং জন সিলভার। আর বাবু জমিদার ট্রেলনি, আর বুড়ো ডাক্তার লিভসী। গরমের ছুটিতে বাবু আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে যাচ্ছে খটাখট খটাখট… মানে, মুখে শব্দ করছে ওরকম করে, আর লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছে।

মৃণাল সেনের কলকাতা ৭১ সিনেমা দেখে অনেকদিন পর্যন্ত তার এফেক্ট মনের মধ্যে ছিল। ইন্টারভিউ, কলকাতা ৭১, পদাতিক -- এসব ছবি আমাদের জীবনটাকে চিনতে সাহায্য করেছে। বড় হতে শিখিয়েছে। বাস্তব জগৎটাকে বুঝতে শিখিয়েছে।
মৃণাল সেনের কলকাতা ৭১ সিনেমা দেখে অনেকদিন পর্যন্ত তার এফেক্ট মনের মধ্যে ছিল। ইন্টারভিউ, কলকাতা ৭১, পদাতিক — এসব ছবি আমাদের জীবনটাকে চিনতে সাহায্য করেছে। বড় হতে শিখিয়েছে। বাস্তব জগৎটাকে বুঝতে শিখিয়েছে। – লেখক

আহা কী আনন্দ আকাশে বাতাসে। গুপী গাইন বাঘা বাইন দেখতে গিয়েছিলাম ক্লাস সেভেনে না এইটে পড়ি তখন। বোনকে রেখে যাওয়া হলো মাসির কাছে। মাসি তখন আমার বদলে বোনের বেবি সিটার। আমি গেলাম বাবা আর মার সঙ্গে। আমাদের বাড়ি থেকে হাঁটা পথ। শ্রী সিনেমা, নাকি মিনার সিনেমা হলে এক বছরের ওপর ধরে হই হই করে চলছে গুপী গাইন। সে কী আশ্চর্য অভিজ্ঞতা! এর আগে ছোটদের বাংলা বা ইন্ডিয়ান ছবি যা দেখেছি, তা হলো সেই দেড়শো খোকার কাণ্ড, আর নয়তো হিন্দিতে সম্পূর্ণ রামায়ণ। সেই ভীষণ রাম রাবণের যুদ্ধ চলছে, আর হনুমান তার ল্যাজ দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সিংহাসন বানিয়ে তার ওপর লাফ দিয়ে চড়ে বসলো নিজেই রাবণ রাজার সভায়, আর তারপর রামচন্দ্রের সঙ্গে লব কুশের তীরধনুক নিয়ে যুদ্ধ চলেছে, আর তীরের মুখে মুখে লেখে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আর হা হা হা হা করে রাক্ষসরা হাসছে। সে এক ধরনের উল্লাস-আনন্দ। হল ফেটে পড়ছে হাততালিতে। আর, এই গুপী গাইনে কেমন একটা চমৎকার আশ্চর্য বুদ্ধির আনন্দ, মজার কথা বোঝার আনন্দ, আর উচ্চতম শিল্প দেখে মুগ্ধ হওয়ার আনন্দ। ভূতের নাচের মধ্যে দিয়ে বাংলার ইতিহাস দেখানো। জহর রায়ের মন্ত্রীমশাই, হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের জাদুকর বরফি আর তার অদ্ভুত গুমফুঁশ ভূঁশ, আর সন্তোষ দত্তর ক্রুরচরিত্র হাল্লারাজা আর একই সঙ্গে বালকের মত সরল শুণ্ডিরাজা, ভূতের রাজার তিন বর, আর তপেন চট্টোপাধ্যায় নামক এক সম্পূর্ণ অজানা লম্বা রোগাটে যুবক শিল্পীর অত্যাশ্চর্য চরিত্র গুপী গাইন। আর আরো এক সম্পূর্ণ অজানা তরুণ গায়ক অনুপ ঘোষালের গাওয়া আশ্চর্য মন ভালো করে দেওয়া সব গান। এমন জিনিস আগে কখনো দেখি নি। শুনিও নি এমন সিনেমা হতে পারে।

গুপী গাইন আর বাঘা বাইন যেন আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল কোথায়! আমাদের ছোটবেলায় সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখাটাই একটা প্রিভিলেজ ছিল। সেই কচ্চিৎ কদাচিৎ বাবার মাইনে পাওয়ার প্রথম সপ্তাহে হয়ত একটা দেখা হলো। তাও, ছোটদের জন্যে আমাদের দেশে কেই-বা ছবি করে? ওই কালেভদ্রে একটা দুটো। ব্যাস, ওই। একবারের বেশি দুবার কখনো কোনো সিনেমা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু গুপী গাইন এত বেশিদিন চলেছিল আর এত জনপ্রিয় হয়েছিল যে কেউ আমাদের বাড়ি বেড়াতে এলেই—সে কাশী লখনৌ থেকেই আসুক আর নয়তো এদিকে ভাটপাড়া বালি থেকেই আসুক—তাকে নিয়ে আমি একবার শ্রী সিনেমা হলে যাবই গুপী গাইন দেখাতে।

 সত্যজিৎ রায়ের নিজের হাতে আঁকা গল্পের অলঙ্করণ। শিল্পচেতনা, সৌন্দর্যচেতনা তৈরী করে দিয়েছিল মনের মধ্যে এসব সৃষ্টি। সস্তার সঙ্গে, মেকীর সঙ্গে আসল রত্নের পার্থক্য চিনতে শিখেছিলাম সেই কিশোর বয়েস থেকেই।
সত্যজিৎ রায়ের নিজের হাতে আঁকা গল্পের অলঙ্করণ। শিল্পচেতনা, সৌন্দর্যচেতনা তৈরী করে দিয়েছিল মনের মধ্যে এসব সৃষ্টি। সস্তার সঙ্গে, মেকীর সঙ্গে আসল রত্নের পার্থক্য চিনতে শিখেছিলাম সেই কিশোর বয়েস থেকেই। – লেখক

এই করে করে আমার চার পাঁচবার কলকাতায়ই “দেখো রে নয়ন মেলে”, আর “ভেগে পড়ি চুপি চুপি রে” দেখা হয়ে গেল। সমস্ত গান আমার মুখস্থ, কণ্ঠস্থ। পাড়ার কালীপুজোর প্যান্ডেলে দুপুরবেলা যখন কেউ নেই, তখন আমি আর আমাদের সামনের বাড়ির রাণাদা সেই যে যার সুন্দরী বোন শান্তাকে পাহারা দেওয়ার জন্যে যাকে বডিবিল্ডার হতে হয়েছিল, সেই রাণাদা আর আমি দুপুরবেলা মাইকটাকে দখল করে মনের আনন্দে গুপী গাইনের গান একটার পর একটা গাইতে লাগলাম। ভাবলাম, পাড়ার যত সুন্দরী যুবতী মেয়ে আছে, এই গান শুনেই সব আমার প্রেমে পড়ে যাবে। আর নয়তো কাকীমারা আর মাসিমারা তাদের বাড়িতে গান গাইবার জন্যে আমাকে কালকেই ডেকে পাঠাবে।

রেডিওতে ছায়াছবির গানে রবিবার রাত সাড়ে নটা থেকে দশটা একটা গুপী গাইনের গান দেবেই। “এক যে ছিল রাজা তার ভারী দুখ। যার ভাণ্ডারে রাশি রাশি সোনা দানা ঠাসা ঠাসি, তারও ভয় (ডাকাইতের ভয় তো, রেতে ঘুম নাই), জেনো সেও সুখী নয়।”

***

স্বপ্নে কলকাতা, বাংলাদেশটা আর ভারতবর্ষ ফিরে ফিরে আসে। দিবাস্বপ্নে আসে। রাতের ঘুমের মধ্যে আসে। গোরাচাঁদ বোস রোড আসে। কারবালা ট্যাংক লেন আসে। প্যারী রো, গোয়াবাগান পার্ক আসে। সাহিত্য পরিষদ স্ট্রিটের টিন দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে চারদিন ধরে দুর্গাপুজোর স্মৃতি ভেসে আসে। রাখাল পালের গড়া মূর্তি বেশি সুন্দর, না রমেশ পালের—এই নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে তর্ক।

“তুই কটা ঠাকুর দেকলি? বাগবাজার দেকেচিস? বিবেকানন্দ স্পোটিং? সংঘমিত্র, সংঘশ্রী?” “না, কালীঘাট যাই নি। মার অসুক।” “আমরা গেছি নৌমি দুকুর্বেলা।” “তুই মহমদ আলি দেকেচিস?” “তুই কলেজ স্কুয়ার গেচিস? দেকে আয়, আমি পন্চুমিতে গেয়লাম। রমেস পাল ফাটিয়ে দিয়েচে মাইরি।” “ঠাকুরের নামে মাইরি বললি?” “ইস, মাইরি ভুলে গেচি। এই জীব কাটলাম। তিনবার।” “ঠিক আচে যা। ঠাকুরের নামে মাইরি, দিব্যি এসব বলিস না।” “সরি। সত্যি সরি।”

গোয়াবাগান পার্কে পুরোনো, ছেঁড়া তাঁবু খাটিয়ে সার্কাস একবার উঁকি দিয়ে যায়। পার্কের একধারে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সৌম্য মূর্তি ভেসে আসে। তারপর কয়েক মাস ধরে সেখানে আমাদের কিশোর বিজ্ঞানীদের নানাপ্রকার কলকব্জা নিয়ে নাড়াচাড়ার কথা। কোনো কোনোটা স্বপ্ন। আর কোনো কোনোটা স্বপ্ন নয়। আবার কোনো কোনোটা স্বপ্ন আর স্বপ্ন নয়ের মাঝখানে একটা জায়গা। ঠিক যেমন সেই মনে পড়ে কান্তিবাবুর হাফপ্যান্ট পরে কাকভোরে দুটো কুকুর নিয়ে হাঁটতে বেরোনো। আর আমাদের ভূতের মত ফুটবল নিয়ে অপেক্ষা করা পার্কের কোণে। ঠিক যেমন মনে পড়ে গামছার মধ্যে সর্ষের তেলের ছোট্ট শিশি নিয়ে আর সুইমিং কস্টিউম নিয়ে হেদোতে সাঁতার শিখতে যাওয়া গরমের ছুটিতে। ঠিক যেমন মনে পড়ে সেই উত্তমকুমারের গরমের ছুটিতে ভর দুক্কুরবেলায় কালুদার বাড়ি কালো গাড়ি থেকে টুক করে ঢুকে যাওয়ার কথা।

আমাদের স্কটিশের সায়েন্স এক্সিবিশনে কেঁচোর পৌষ্টিকতন্ত্র মোমের ট্রেতে আলপিন দিয়ে গাঁথা। হৈ হৈ করে শয়ে শয়ে লোক আসছে আমাদের কেমিস্ট্রি ল্যাবে পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের বেগুনি রং আর সালফিউরিক অ্যাসিডের ধোঁয়া দেখতে। ফিজিক্স ল্যাবে দোতলায় প্রিজমের মধ্যে দিয়ে আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে। কী আনন্দ, কী নির্মল আনন্দ!

কালীপুজোর দুদিন আগে আমাদের বাড়ির ছাদে গিয়ে ভোম্বলদা আর তিনের এগারোর আর্টিস্ট কাকার সঙ্গে তুবড়ি তৈরি। সোরার নাম পটাসিয়াম নাইট্রেট, তার তিন ভাগ, আর গন্ধক বা সালফার পাউডার এক ভাগ, আর লোহাচুর এক ভাগ, আর ম্যাগনেসিয়াম ফ্লেক এক ভাগ, আর কী কী সব যেন—সব একটা একটা করে ওজন করে, মিশিয়ে তারপর তুবড়ির বাদামি মাটির খোলের মধ্যে ঠাসা হলো। পটাসিয়াম নাইট্রেট তার সিম্বলও আমি জানি। কে এন ও থ্রী। ক্লাস এইটে কজন জানে? আমি জানি। একশ দুশ তুবড়ির খোল। তারপর পিছন দিকটা মাটি দিয়ে আটকে রোদে দুদিন ধরে শুকোনো। ঘুড়ি ছিঁড়ে গেছে? ওদের কার্তিকদের বাড়ি দুপুর তিনটের সময়ে ভাত হয়। একটুখানি গলা ভাত নিয়ে এসে পাতলা ঘুড়ির কাগজ দিয়ে ছেঁড়া ঘুড়ি জুড়ে নাও। ঘুড়ি উড়ছে না? লম্বা কাগজ দিয়ে ল্যাজ লাগিয়ে নাও। ক্রিকেট খেলবে কিন্তু উইকেট নেই? ব্যাটারির গলি থেকে গাড়ির ব্যাটারির কালো কালো খোল নিয়ে এস চারটে। ওপর ওপর সাজিয়ে দাও। এই তো উইকেট।

আরো অনেকদিন আগে, সেই ছোট্টবেলায় আমার দিদিমার সঙ্গে—দিদির সঙ্গে—চালতাবাগানে ঝুলন দেখতে গেলাম। ওঃ কী ভীষণ ভিড়! এক একটা গ্রুপে লোক ছাড়ছে ওদের রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের লোকেরা। দড়ি দিয়ে আটকে আটকে রেখেছে গ্রুপে গ্রুপে। তারপর দড়ি তুলে দিচ্ছে, আর অমনি স্রোতের মত লোক ঢুকে যাচ্ছে মন্দিরের ভেতরে ঝুলন সাজানো দেখতে। সে কত রকমের পুতুল! কৃষ্ণের জীবনী ছোট ছোট খুপরির মত ঘর করে তার মধ্যে গ্রাম, বন জঙ্গল সব সাজানো। যশোদা আর নন্দকে মা দেবকী আর বাবা বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণকে দিয়ে দিয়েছিল তাঁর জন্মের রাতে, যাতে দেবকীর ভাই দুরাচার কংস কৃষ্ণকে বোধ করতে না পারে। সেই কৃষ্ণ বড় হলো গোকুলে। আর কংসর কাছে দৈববাণী হলো, “তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে, তোমাকে বধিবে যে গোকুলে বাড়িছে সে, হা হা হা হা হা হা।” এই সব মাটির পুতুল দিয়ে সেই ঝুলনের মন্দিরে সাজানো। আর লাল নীল সবুজ মায়াময় আলো।

স্বপ্ন, না-কি সত্যি? কে জানে?

ঘুমের মধ্যে দিদির বাড়ি। দিদি রান্নাঘরে বসে আছে। আজ ওদের বাড়ি রান্না বসেছে। ভাত, ডাল আর একটা তরকারি। ওরা আজ নিজের বাড়ি পেট ভরে খাবে। গত তিন চারদিন দিদি অতুল্য ঘোষের গিন্নি বিভাদির কাছ থেকে ভাত নিয়ে এসেছে। ওরা শুধু ভাত খেয়েছে—ছোটমামা, মাসি আর সবাই। ওরা কী গরিব! আমি এত গরিব কারুকে কখনো এত কাছ থেকে দেখি নি। তাও ওদের বাড়ি আমি রোজ একবার করে যাবই। ওদের বাড়ি গিয়ে একতলার রাস্তার দিকের ঘরটায় আমি জানলার পাশে বসে থাকব, আর দেখব রাস্তা দিয়ে সবাই যাচ্ছে। ছোটমামা আমাকে দিয়ে ওদের কংগ্রেসের স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের ইউনিয়ন কর্মীদের নববর্ষের কার্ড লিখিয়ে নেবে কারণ আমার হাতের লেখা ভালো আর ওর ভালো না, আর তারপর আমাকে নিয়ে যাবে ওদের পাশের বাড়ি অমরমামা সমরমামার বাড়ি। নয়তো আমি চলে যাব মাসির সঙ্গে দুটো বাড়ি পরে রথীন মামা চম্পা মাসির বাড়ি। ওখানে দুপুরবেলা আমি বসে বসে বাংলায় কাউন্ট অফ মন্টিক্রিস্টো পড়ব, আর পড়তে পড়তে ঘুম পেয়ে গেলে একটু ঘুমিয়ে নেবো। সবাই জানে বুদ্ধর ভাগ্নে বাবুয়া এখানে ঘুমোচ্ছে।

 গুপী গাইন আর বাঘা বাইন। তারপর দশ বছর পর এলো হীরক রাজার দেশে। গুপী গাইনে জহর রায়ের মন্ত্রীমশাই যদি কাঁপিয়ে দিয়ে গিয়ে থাকেন, তাহলে হীরক রাজায় উৎপল দত্ত আর তাঁর বিরল ব্যক্তিত্ব আর প্রতিভা। আমাদের যেন একেবারে আনন্দের স্বর্গে পৌঁছে দিয়েছিল। কী অভিনয়ক্ষমতা! আর জিনিয়াস পরিচালকের কী স্বর্গীয় সৃষ্টি!
গুপী গাইন আর বাঘা বাইন। তারপর দশ বছর পর এলো হীরক রাজার দেশে। গুপী গাইনে জহর রায়ের মন্ত্রীমশাই যদি কাঁপিয়ে দিয়ে গিয়ে থাকেন, তাহলে হীরক রাজায় উৎপল দত্ত আর তাঁর বিরল ব্যক্তিত্ব আর প্রতিভা। আমাদের যেন একেবারে আনন্দের স্বর্গে পৌঁছে দিয়েছিল। কী অভিনয়ক্ষমতা! আর জিনিয়াস পরিচালকের কী স্বর্গীয় সৃষ্টি! – লেখক

ঠিক যেমন আমি ঘুমিয়ে পড়তাম সবার মাঝে বালির বিয়েবাড়ির বাসর ঘরে। কী শান্তি, কী আনন্দ, কী স্নেহ, কী মায়া, কী মমতা!

হয়ত ধারাবাহিক হল না। হয়ত একটা ঘটনার সঙ্গে আর একটা ঘটনার ব্যবধান বেশ কয়েক বছরের। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। আমার স্বপ্ন আর আমার সত্যি আর আমার স্বপ্ন আর সত্যির মাঝখানের সেই জায়গাটা এমনিই। তারা প্ল্যান করে আসে না। তারা আমাদের সেই বিখ্যাত ব্যবসায়ী খেলার মত ভেবেচিন্তে, অর্গানাইজড হয়ে আসে না। তারা আসে যেন সেই ছড়িয়ে দেওয়া মার্বেলগুলির মত। কোন রংটা যে কোন রংটার পাশে থাকবে, কেউ জানে না। বা সেই আমাদের পাড়ায় বিক্রি করতে আসা সাড়ে ছে আনা হিন্দুস্তানি ফেরিওলার কাগজের ক্যালিডোস্কোপের নিরন্তর বদলে যাওয়া কাচের টুকরোগুলোর প্যাটার্নের মত। এই দেখলাম চক্রাকার। তার পরের মুহূর্তেই ত্রিকোণ। চতুষ্কোণ। পঞ্চভূজ। ষড়ভূজ। গোলাপির পাশে বেগুনি। তারপরেই একটু সামান্য নাড়া দিলেই সবুজের পাশে লাল, হলুদ আর নীল। এই ভাবেই আমার স্বপ্ন আর স্বপ্নের মত সত্যি ফিরে ফিরে আসছে। সর্বক্ষণ আসছে। চোখ বুজলে আসছে। চোখ খুললেও আসছে।

স্বপ্নের ফেরিওলা বসে আছে কোথায়, কে জানে! একটানা সাপ্লাই দিয়ে যাচ্ছে বসে বসে হাজার, লক্ষ স্বপ্নের। আর বাস্তবের সঙ্গে মাঝে মাঝে মিলিয়ে, মিশিয়ে দিচ্ছে সবকিছু। কী অবর্ণনীয় সুন্দর তার আর্ট!

আমি সেই আর্টিস্টের ক্যানভাসের সামনে সারা জীবন মুগ্ধ হয়ে বসে আছি। অপেক্ষা করে আছি আবার কখন তার নতুন শিল্পকর্ম দেখতে পাব।

দিনের পরে দিন চলে যায়
যেন তারা পথের স্রোতেই ভাসা
বাহির হতে তাদের যাওয়া আসা।
কখন আসে একটি সকাল
সে যেন মোর ঘরেই বাঁধে বাসা
সে যেন মোর চিরদিনের চাওয়া।

আমিও সেই চাওয়া নিয়েই বসে আছি তোমার পথ চেয়ে, জমল ধূলা বীণার তারে তারে।

তাও বসে আছি।

(কিস্ত ২১)

More from পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘটিকাহিনী (৩)

ক্লাস থ্রি পর্যন্ত খুব চুপচাপ, লাজুক আর ভালোমানুষ আমি, পার্থ, ক্লাস ফোরে...
Read More