ঘটিকাহিনী (১৫)

আমি অনেক, অনেক রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনেছি। অনেক ভেবেছি রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে। বিশ্লেষণ শেখার পর ভাবতে চেষ্টা করেছি কেন এত ভালো লাগে তাঁর গান।

(আগের পর্ব)

আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান

ছোটবেলা থেকে ঘুরে ঘুরে, ঘুরে ঘুরে রবীন্দ্রনাথের গান শুনে বেড়িয়েছি। কবিতা, গান, নৃত্যনাট্য।

বাংলা গান, বাংলা কবিতা, বাংলা সিনেমা, বাংলা নাটকের মধ্যে দিয়েই বাংলা ভাষাটাকে ভালোবেসেছি। নিজের আইডেন্টিটি, সত্তা, সচেতনতা তৈরি হয়েছে একটু একটু করে। বোধ, উপলব্ধি তৈরি হয়েছে। পরিণত হয়েছে।

আর, রবীন্দ্রনাথের গানের ভাষা, কবিতার ভাষা দিয়েছে সে আইডেন্টিটিকে একটা অহংকার। নিচু একতলার, গরিব ঘরের মানুষও আমি জেনেছি যে ওই একেবারে ওপরের তলাটাও আমাদেরই বংশের একজনের। হয়ত সেখানে আমি এখন যেতে পারি না, যাবার অধিকার নেই, অর্জন করা হয় নি, কিন্তু একদিন সেখানে যেতেও পারি। সে অধিকার অর্জন করার অধিকার আমার আছে। যদি খুব চাই, যদি খুব চেষ্টা করি, সেখানে একদিন পৌঁছতেও পারি। বাধা নেই কোনো।

parthab logo

যেদিন রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রথম শুনি, যেদিন কবিগুরুর কবিতা প্রথম পড়ি, সেদিনই এই বোধটা হয়েছিল মনের অনেক গভীরে। বুঝি নি তখন। কিন্তু হয়েছিল।

আমাদের সেই তিনের এ’র বাড়িতে বাড়িঅলা চিন্ময়কাকুর এক দাদা ছিল। তাকে আমি ডাকতাম জ্যোতির্ময় কাকু। আর এক বোন ছিল। তাকে আমি ডাকতাম সন্ধ্যা পিসি। এরা সব আমাদের ফ্যামিলির মতই হয়ে গেছিল। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন ওরা বাড়িঅলা আর আমরা ভাড়াটে—এসব শ্রেণিসচেতনতা আমার ছিল না। যখন-তখন ওদের ওপরে চলে যেতাম। ছাদের ওপর একটা খালি চৌবাচ্চা ছিল, তার ভেতর উঠে ঘুড়ি ওড়াতাম। গরমের ছুটিতে প্রচণ্ড গরমে হঠাৎ দুপুরবেলা হয়ত চলে গেলাম জ্যোতির্ময় কাকুর ঘরে। একদিন দেখি টেবিলের ওপর খুব মোটা আর কালো কাচের একটা চশমা রাখা আছে।

আমি বললাম, “এটা কী, জ্যোতির্ময় কাকু?”

জ্যোতির্ময় কাকু বলল, “পরবি? পরে দেখ না। ওটা একটা রোদের চশমা। ওকে বলে গগলস।”

আমি বললাম, “গগলস কী?”

জ্যোতির্ময় কাকু হেসে বলল, “পর না। পরে দেখ কী জিনিস।”

আমি সাবধানে, আস্তে আস্তে তুলে নিয়ে চোখে পরলাম। অনেকটা বড়। আলগা আলগা। কিন্তু, পরার সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা অদ্ভুত ঠাণ্ডা হয়ে গেল চারদিক। কী ঠাণ্ডা! আর দুপুরবেলার ঝাঁ ঝাঁ রোদ হয়ে গেল কেমন একটা অন্ধকার অন্ধকার সবুজ সবুজ। কী ভালো লাগতে শুরু করলো! সেই তিনতলার জানলা থেকে আমাদের ওই পাড়াটা, বাড়ির ছাদগুলো, রাস্তা, দূরের বাড়িগুলো—সব কেমন ঠাণ্ডা, সবুজ দেখাতে লাগলো। ভীষণ রোদ যেন হয়ে গেল নরম মেঘ।

আমি অনেকক্ষণ সেই গগলস পরে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে থাকলাম।

ওরা সব এই রকম ছিল। বাড়ির লোকের মত। কী স্নেহ। মার সঙ্গে চিন্ময়কাকুর মার খুব ভাব ছিল। আমার বোন বুবু যখন সবে হয়েছে, সেই ছোট্ট বুবুকে সর্ষের তেল মাখিয়ে মা তিনতলার ছাতে নিয়ে গিয়ে একটা মাদুরের ওপর শুইয়ে রেখে দিত রোদের ভিটামিন গায়ে মাখানোর জন্যে। এর চেয়ে ভালো ভিটামিন আর কিছুতে নেই। বুবু শুয়ে শুয়ে হাত পা ছুঁড়তো, মুখ দিয়ে বু, বু করে অর্থহীন শব্দ করত আর হাসত, আর আমি ওদিকে চৌবাচ্চার মধ্যে ঢুকে গিয়ে লাটাই হাতে ঘুড়ি ওড়াতাম, আর মা আর সেই দিদা বসে বসে গল্প করত।

চিন্ময়কাকুর দুই ভাই, বাবা মা, আর বোন সন্ধ্যা সবাই থাকত দুর্গাপুরে। মাঝে মাঝে আসত কলকাতায়। তারপর খুব বুড়ো হয়ে যাবার পর দাদু আর দিদা এসে ছেলের কাছে কলকাতায়ই থাকত। তখন চিন্ময়কাকুর বিয়ে হয়ে গেছে। আমরা সব সেই বিয়েতে খেতে গেলাম বৌবাজারে। এখনো মনে আছে।

একবার দুর্গাপুর থেকে সন্ধ্যাপিসি এলো আমার জন্মদিনের সময়ে এপ্রিল মাসে। আর আমাকে দিল উপহার রবীন্দ্রনাথের শিশু। আবার লিখে দিল, “বাবুয়াকে জন্মদিনে ভালবাসা—সন্ধ্যাপিসি।”

সেই আমার প্রথম মন দিয়ে ভালো কবিতা পড়া।

সহজ পাঠ।—অবিস্মরণীয়।  যারা পড়ে নি, তারা হতভাগ্য। তারা কী পায় নি, তারা জানে না। রবীন্দ্রনাথের লেখা, আর শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর আঁকা অলৌকিক সব ছবি।  - লেখক
সহজ পাঠ।—অবিস্মরণীয়। যারা পড়ে নি, তারা হতভাগ্য। তারা কী পায় নি, তারা জানে না। রবীন্দ্রনাথের লেখা, আর শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর আঁকা অলৌকিক সব ছবি। – লেখক

এর আগে ইস্কুলে সেই “আমারে করেছ চপল চটুল” ওই সব পড়েছি। তারপর, শিশু নিকেতনে সহজ পাঠ। “কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি গাড়ি চালায় বংশীবদন” এসব পড়া হয়ে গেছে। তারপর সহজ পাঠের আমার প্রিয় কবিতা “সূর্য গেল অস্তাচলে আঁধার ঘনালো/হেথা হোথা কেরোসিন লন্ঠনের আলো” এসবও পড়েছি। অবশ্য, আমি তখন সে কবিতার চতুর্দশপদী ছন্দ আর ভাব বুঝতাম না। ভুল জায়গায় থামতাম। আর ভুল মানে বুঝতাম। যেমন, “শূন্য হয়ে গেল তীর আকাশের কোণে” এরকম ভাবে পড়তাম। ভাবতাম, “পঞ্চমীর চাঁদ ওঠে দূরে বাঁশবনে”—এটা কী রকম একটা লাগছে যেন! তার পরের লাইন, “শেয়াল উঠিল ডেকে মুদির দোকানে।” এ তো আশ্চর্য কথা! শেয়াল কেন মুদির দোকানে ডেকে উঠবে? এই ভাবে পড়তাম।

ভীষণ ভালো লাগত সে কবিতার চিত্রময়তা। বাংলার গ্রামের সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ পরিচয় হয় নি, কিন্তু এই রবীন্দ্রনাথই প্রথম পরিচয় করিয়ে দিলেন। অবাক হয়ে গেলাম।

আমি শিশুর অনেকগুলো কবিতা মুখস্থ করে ফেললাম। তার মধ্যে একটা কবিতা ‘বিচিত্র সাধ’ আমি তারপর এখানে-সেখানে আবৃত্তি করে বেড়াতাম। হয়ত কারুর বাড়ি বেড়াতে গেলাম, সেখানে বাবা বলল, একটা আবৃত্তি করে শুনিয়ে দাও তো। আমি অমনি ‘বিচিত্র সাধ’ বলতে লেগে গেলাম।

“আমি যখন পাঠশালাতে যাই
আমাদের এই বাড়ির গলি দিয়ে
দশটা বেলায় রোজ দেখতে পাই
ফিরিওলা যাচ্ছে ফিরি নিয়ে।
চুড়ি চাই চুড়ি চাই সে হাঁকে
চিনের পুতুল ঝুড়িতে তার থাকে
গায়ে মাথায় লাগছে কত ধূলো…”

এই রকম।

তারপর সেই আর একটা কবিতা খুব বলতাম,

“সন্ধ্যেবেলা সবার খাওয়া হলে
বসবে তুমি পিঠেতে চুল ফেলে
গাছের ছায়া ঘরের জানালাতে
পড়বে এসে তোমার পিঠে কোলে।
[…]

আবার আমি তোমার খোকা হবো
গল্প বল, তোমায় গিয়ে কবো।
তুমি বলবে, দুষ্টু, ছিলি কোথা?
আমি বলব, বলব না সে কথা। ”

নয়তো, খুব প্রিয় কবিতা ‘বীরপুরুষ’,

“মনে কর যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে
তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে
রাস্তা থেকে ঘোড়ার খুরে খুরে
রাঙা ধূলোর মেঘ উড়িয়ে আসে।”

এই সব। দশ বারো পনেরোটা কবিতা জলের মত মুখস্থ করে ফেললাম কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই। বাবা বলল, “সন্ধ্যাপিসিকে গিয়ে শুনিয়ে দাও।”

গেলাম তিনতলায়। শুনিয়ে দিয়ে এলাম। সবাই তো খুব খুশি।” বীরপুরুষ বোধহয় আবৃত্তি করে কোথায় একটা দ্বিতীয় পুরস্কার না কী পেয়েছিলাম।

'বীরপুরুষ'।—এখনকার বাঙালিদের দেখলে ঠিক বীরপুরুষ বলা যায় না হয়ত, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বীরপুরুষ কবিতা বাঙালি কিশোরদের এখনো উদ্দীপ্ত করে। আমাদের সময়ে হিমাংশু বিশ্বাস সুর করে গেছেন। অনেক পরে কিংবদন্তী শিল্পী ভি বালসারা'র রেকর্ড হয়েছে। - লেখক
‘বীরপুরুষ’।—এখনকার বাঙালিদের দেখলে ঠিক বীরপুরুষ বলা যায় না হয়ত, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বীরপুরুষ কবিতা বাঙালি কিশোরদের এখনো উদ্দীপ্ত করে। আমাদের সময়ে হিমাংশু বিশ্বাস সুর করে গেছেন। অনেক পরে কিংবদন্তী শিল্পী ভি বালসারা’র রেকর্ড হয়েছে। – লেখক

তারপর অনেক বছর পরে যখন আমি পাড়ায় সরস্বতী পুজোর পাণ্ডা, ক্লাস টেনে না ইলেভেনে পড়ি, তখন একবার আবৃত্তি কম্পিটিশন অর্গানাইজ করলাম। সেখানে ওই ‘বীরপুরুষ’ ঠিক করা হলো। পাঁচ-দশটা পাড়ার ছেলে আমাদেরই ঠিক করা বিচারকদের সামনে আবৃত্তি করলো। আমার বাবাকে সেখানে নিয়ে গেলাম একজন বিচারক করে। তারপর আমাদের এক বন্ধুর বাবা পাড়ায় নতুন আসা এক উকিল। কালুদা। এই সব।

বাবার উৎসাহ ছিল খুব কবিতা পড়ায়। খুব ভালো আবৃত্তি করত। তবে, হিন্দি কবিতার প্রতি ঝোঁক বেশি ছিল। অটলবিহারী বাজপেয়ীর লেখা ‘আজ সিন্ধু মে জোয়ার উঠা হ্যায়’ এসব কবিতা খুব বলত। আর আর এস এসের দেশাত্মবোধক গান, ‘দেবী জননী ধাত্রী ভারত মা,’ এইসব। হয়ত আমরা কাশীতে বেড়াতে গেছি, সেখানে আমার এক পিসি ছায়াপিসী, বাবার মাসির মেয়ে সেও আবার ওই আর এস এস জনসংঘ-পন্থী, সে এসে ধরল বাবাকে গান গাইবার জন্যে সন্ধেবেলা। আর বাবা তখন উদাত্ত গলায় সেই ‘দেবী জননী’ গাইতে শুরু করলো। শ্রোতা হচ্ছে ছায়াপিসি, আর আমার নিজের পিসি জয়ন্তী, এরা সব। আমার ঠাকুমা।

এক এক সময়ে ভাবি, বাবা যদি কাশীতে বড় না হয়ে কলকাতায় বড় হত, তাহলে কত অন্যরকমই না হত বাবার জীবনটা। আর সেই সঙ্গে আমার জীবনটাও। কবিতা পড়তে এত ভালবাসত বাবা, আর আমাকেও এত উৎসাহ দিত, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বাইরে বাবা বাংলা কবিতা সম্পর্কে কিছুই জানতে পারে নি। কোনো ধারণাই ছিল না বাংলা কবিতার গভীর সমুদ্র আর তার নিঃসীম রত্নরাজি সম্পর্কে। বাংলা সাহিত্যের আশ্চর্য সম্পদ সম্পর্কে। আর, তা না থাকার জন্যে বাংলা সংস্কৃতি আর প্রগতিশীল চেতনা সম্পর্কেও ঠিক ধারণাটা গড়ে উঠতে পারে নি। বাবার জীবন জুড়ে ছিল সঙ্ঘ, আর এস এস, আর তাদের ডকট্রিন। যেখানে প্রগতিশীল সমাজ, সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত সম্পর্কে অজ্ঞতা, উদাসীনতা, এমনকি বিতৃষ্ণা আছে। এদের জগতের লোকেদের কোনো ধারণাই নেই বাংলা সাহিত্য কোন শীর্ষে গিয়ে পৌঁছেছে, কতদূর এগিয়ে গেছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, বুদ্ধদেব বসু এঁদের কথা তো ছেড়েই দিলাম, এমনকি বিভূতিভূষণ, শরৎচন্দ্র, তারাশংকর এঁদের লেখাও পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণপন্থীরা পড়ে দেখেন নি। কী দুর্ভাগ্য, আমি মাঝে মাঝে ভাবি!

"তিনটে শালিক ঝগড়া করে রান্নাঘরের চালে। ছুটির দিনে দুই প্রহরে দূরে কাদের ছাদের পরে ছোট্ট মেয়ে রোদ্দুরে দেয় বেগনি রঙের শাড়ি।" চিত্রময়তা কাকে বলে, সেই সহজ পাঠের সোনালী দিনগুলোতেই গুরুদেব বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। কবিতা আর ছবির সৌন্দর্য মনের একেবারে ভেতরে গেঁথে গেছে। - লেখক
“তিনটে শালিক ঝগড়া করে রান্নাঘরের চালে। ছুটির দিনে দুই প্রহরে দূরে কাদের ছাদের পরে ছোট্ট মেয়ে রোদ্দুরে দেয় বেগনি রঙের শাড়ি।” চিত্রময়তা কাকে বলে, সেই সহজ পাঠের সোনালী দিনগুলোতেই গুরুদেব বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। কবিতা আর ছবির সৌন্দর্য মনের একেবারে ভেতরে গেঁথে গেছে। – লেখক

আমার বাবা কলকাতায় পাকাপাকিভাবে চলে আসবার পর রবীন্দ্রনাথ ভালো করে পড়তে শুরু করেছিল। তার আগে একবার নাকি কাশীতে রবীন্দ্রনাথ গিয়েছিলেন, সেখানে বাবারা সব তাঁকে দেখতে যাবার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যায় নি। কারণ, তখন গোঁড়া সংঘীরা রবীন্দ্রনাথকে বয়কট করত। বাবা এই নিয়ে চিরকাল আমার কাছে দুঃখ করেছে। “এত বড় সুযোগ পেয়েও রবীন্দ্রনাথকে দেখতে গেলাম না!” বারবার বলত। ভুল বুঝতে পেরেছে। আক্ষেপ থেকে গেছে সারাজীবন।

এই সব ব্যাপার। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একা এবং কয়েকজন তখন দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক বেরোচ্ছে, আর আমরা গিলছি। বাবা হঠাৎ একটা চিঠি লিখে বসল দেশে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নামক লেখকের “অনৈতিকতার” বিরুদ্ধে। সে চিঠি আবার প্রকাশিতও হলো। আমি দেখেছি। কিছুই না বুঝেও আমার কী গর্ব—আমার বাবার চিঠি দেশ পত্রিকায় বেরিয়েছে! সত্যজিৎ রায় কেন তাঁর রবীন্দ্রনাথ তথ্যচিত্রে নেতাজি সুভাষ বসুকে “উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে” বাদ দিয়ে দিলেন, সেই নিয়ে সত্যজিৎকেও চিঠি লিখে বসলো বাবা। আবার সত্যজিৎবাবু তার জবাবও দিলেন চিঠি লিখে। সেই চিঠি এখনও বাবার কাছে আছে। আমি দেখেছি।

এই যে আর এস এস থেকে আমি আস্তে আস্তে একদিন বেরিয়ে এলাম, এটা একদিনে তো হয় নি। অনেকদিন ধরে একটু একটু করে তার মানসিক প্রস্তুতি আমাকে নিতে হয়েছে। ওদের সেই নির্বুদ্ধির বৌদ্ধিক। ইন্টেলেকচুয়াল পরিবেশের অভাব। বাংলাদেশে সংগঠন করছে, কিন্তু বাংলাদেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছুই জানে না। নয়তো, একটা অবজ্ঞার ভাব। আমি যখন একটু একটু করে সমরেশ বসু, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পড়ছি, বিষ্ণু দে বুদ্ধদেব বসু পড়ছি, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শঙ্খ ঘোষ, মহাশ্বেতা দেবী পড়ছি, সুনীল গাঙ্গুলি শক্তি চট্টোপাধ্যায় তারাপদ রায় পড়ছি, তখন সেই একই সময়ে সেই ছাব্বিশ নম্বর বিধান সরণীর তিনতলায় আর এস এসের পশ্চিমবঙ্গ কার্যালয়ে এমন সব আলোচনা হচ্ছে, যার সঙ্গে বাংলার শিল্প সাহিত্য চালচিত্রের কোনো সম্পর্কই নেই। একদিকে লোকগুলোকে ভালো লাগে তাদের আন্তরিকতার জন্যে, তাদের দেখি খুব কষ্ট করে সংগঠন চালাচ্ছে, প্রচারক বা হোল টাইমার যারা আছে, সেই অমলদা, বা মারাঠি সব প্রচারক এরা—বসন্তরাও ভট্ট, বা হরিয়ানার বংশীলাল সোনি আরো সব অনেকে, তারা ভালো করে খেতেও পায় না, সে সময়ে ওদের অবস্থা ওই রকমই ছিল। এখনকার মত নয়। সেই মুড়ি আর আলুর তরকারি খেয়েই দিনের পর দিন পড়ে আছে। সেসব দেখে তাদের আদর্শের নিষ্ঠা দেখে খুব আকৃষ্ট হচ্ছি তাদের প্রতি, কিন্তু তারপরই দেখি হঠাৎ একটা ভীষণ জঙ্গী মুসলমানবিরোধী, খ্রীষ্টানবিরোধী কথা বলছে। বাংলার বামপন্থীদের প্রতি তাদের ঘৃণার শেষ নেই। সেখানে কোনো সাহিত্য, শিল্প, চলচ্চিত্র নিয়ে একটা কথাও হয় না।

রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কেও তাদের খুব একটা যে আগ্রহ আছে, তা নয়। আর, নজরুল ইসলাম তো মুসলমান। হয়ত একদিন কে একটা বলল, জানিস নজরুল ইসলাম শ্যামাসঙ্গীত রচনা করেছিলেন? এই দেখ। বলে সেই ‘মাগো চিন্ময়ী রূপ ধরে আয়’ গাইতে লাগলো। আমি ভাবলাম, অহো কী ইন্টেলেকচুয়ালিজম! (এখন হলে বলতাম, “অহো কী অদ্ভুত কৌতুক!”) রবীন্দ্রনাথ ওই বাঙালি দাদা লালুদা আর কালুদার সৌজন্যে কয়েকটা গান শাখার শেষে। ‘ওই আসনতলে মাটির পরে লুটিয়ে রব,’ বা ‘সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরই অপমান’। আমাকে গাইতে বলত, ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’, বা ‘অয়ি ভুবনমনোমোহিনী’। এই হলো যাকে বলে লিমিট। কেউ জানেই না রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবীশ্যামা, শাপমোচন। রবীন্দ্রনাথের নটীর পূজা বা চণ্ডালিকা আমি ওদের সঙ্গে থাকতে কখনো শুনি নি। ‘এবার ফিরাও মোরে’ একটানা, বই না দেখে আবৃত্তি করতে শুনেছি আমার লিবারেল মামার বাড়ির লিবারেল-কংগ্রেসী ছোটমামাকে। আর, সুকান্তর ‘শোনরে মালিক শোনরে মজুতদার’ শুনে তো মালিক আর মজুতদারেরা দৌড়ে আমার কাছেই ছুটে এলো হা রে রে রে করে!

সেই যে আমাদের কবিরাজবাবু ‘ছাড়পত্র’ পড়ালেন, তার আগে সুকান্তের নামও শুনি নি। নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ পড়লাম স্কুলের একেবারে উঁচু ক্লাসে গিয়ে। জীবনানন্দের নাম শুনলাম প্রথম উৎপল ভটচাজের কাছে, হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবার তিন মাস আগে। সমর সেন, বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বোস, সুধীন দত্ত, এদের নামই শুনি নি কখনো নাইন কি টেনে ওঠার আগে। বাংলাদেশের কবিদের নাম তো কিছুই জানতাম না। একাত্তর সালে যখন মুক্তিযুদ্ধের হাওয়া এসে পৌঁছল আমাদের কলকাতার রাস্তায়, তখনই প্রথম শুনলাম ওপার বাংলায় সব দুর্ধর্ষ কবি আছেন, তাঁদের একজনের নাম শামসুর রহমান। তারপর আরো সব আছেন, দাউদ হায়দার, তারপর নির্মলেন্দু গুণ, তারপর একজন আছেন রুদ্র বলে—এইসব। শুনে তো আমি একেবারে আবেগবিহ্বল। কবিতা পড়ার চাইতে ওই নামগুলো মুখস্থ করে বন্ধুদের কাছে আউড়ে দিয়েই বেশি বুক বাজানো। সেটাই আমার বেশি। আমি ওই রকমই ছিলাম।

***

একবার আমাদের গোয়াবাগান পার্কের পাশে কারা যেন একটা রবীন্দ্র জয়ন্তী করলো।

সেই অনেকদিন আগেই, সেই শিশুনিকেতনে পড়বার সময়ে থেকেই রবীন্দ্র জয়ন্তী ব্যাপারটা সম্পর্কে একটা ধারণা হয়ে গেছে। প্রত্যেক বছর পঁচিশে বৈশাখ কোথাও না কোথাও একটা অনুষ্ঠানে যাই। বেশির ভাগ সময়ে যাই দর্শক হয়ে, আর মাঝে মাঝে যাই আবৃত্তিকার হয়ে। ছোটবেলায় যেমন আবৃত্তি করতাম “সন্ধে হলো সূর্য নামে পাটে, এলেম যেন জোড়াদীঘির মাঠে,” গলা কাঁপিয়ে দিতাম একটু ভয় ভয় শিরশিরানির মূর্ছনা নিয়ে আসার জন্যে, তেমনি ক্লাস সেভেন এইটে পড়ার সময়ে ঠিক করলাম, “আজি এ প্রভাতে রবির কর, কেমনে পশিল প্রাণের পর” করলে বেশি জমবে। সেই শেষের দিকে যেখানে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ হচ্ছে: “ভাঙ ভাঙ ভাঙ কারা, আঘাতে আঘাত কর,” সেখানে গলা কাঁপিয়ে একেবারে শ্রোতাদের হাততালিতে ঘর ফেটে পড়বে, তবে আমি ছাড়ব। ওই সেই আবেগই বেশি চলছে। বিশ্লেষণ জিরো। নেই। এমন কি, স্কুলের একেবারে উঁচু ক্লাসেও সেই মোটামুটি একই ব্যাপার। এবারে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’র জায়গা নিল ‘আফ্রিকা’।

“সমুদ্রপারে সেই মুহূর্তেই
তাদের পাড়ায় পাড়ায়
মন্দিরে বাজছিল পূজার ঘণ্টা
সকালে সন্ধ্যায় দয়াময় দেবতার নামে
শিশুরা খেলছিল মায়ের কোলে
কবির সঙ্গীতে বেজে উঠছিল
সুন্দরের মূর্ছনা।”

আর তারপরেই, সেই গলা কাঁপিয়ে,

“আজ যখন পশ্চিম দিগন্তে প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাবাতাসে রুদ্ধশ্বাস
যখন গুপ্ত গহ্বর থেকে পশুরা বেরিয়ে এলো…”

ইত্যাদি ইত্যাদি।

বলা বাহুল্য, এমন-কি এই গলা কাঁপানো রুদ্ধশ্বাস রবীন্দ্র-কাব্যও আমার নিজে নিজেই শেখা, একটু হয়ত ছোটমামা দেখিয়ে দিল, বা অন্য কোনো পাড়ার দাদা। বা, স্কুলের কোনো টিচার। কিন্তু, আবেগতাড়িত। ভেতরে কিচ্ছু নেই। ফাঁকা।

কিন্তু, একটা ইচ্ছে, ভালো কিছু, সুন্দর কিছু, উঁচু স্ট্যান্ডার্ডের কিছু একটা করবার জন্যে মন আকুলি-বিকুলি করত সব সময়ে। একবার আমাদের হরতুকি বাগানে সেই যে অধ্যাপক অপরেশ ভট্টাচার্য্য ছিলেন, যাঁকে সবাই বলত নদা, তাঁর বাড়ির ছাদেই নাকি রথীন মামাদের বাড়ির ছাদে একটা রবীন্দ্র জয়ন্তী হলো। একটা চেয়ারের ওপর চাদর পেতে রবীন্দ্রনাথের একটা ফ্রেমে বাঁধানো ছবি, তাতে নদা এসে রজনীগন্ধার একটা মালা পরিয়ে দিলেন, আর দু চারটে কথা বলে অনুষ্ঠান শুরু করে দিলেন। আমি বোধহয় কী একটা আবৃত্তি করেছিলাম, আর লাস্টে যথারীতি ছোটমামার হাততালিতে হাত ফাটানো আবৃত্তি। আর মাঝখানে দু চারটে রবীন্দ্রসঙ্গীত, পাড়ার মেয়েদের গাওয়া। একটা দুটো বাচ্চাদের নাচ গলায় ফুলের মালা পরে।

আর, মাঝখানে তাক লাগিয়ে দিয়ে গেল অলিভা মাসির বোন ময়না ‘গান্ধারীর আবেদন’ থেকে অনেকটা বই-টই কিচ্ছু না দেখে আবৃত্তি করে। তখন ওর আর আমার বয়েস কত? খুব বেশি হলে এগারো কি বারো। কী স্মৃতিশক্তি—আমি ভাবলাম। মেয়েটা দারুণ তো!

এরকম রবীন্দ্র জয়ন্তী যে কত হয়েছে, কত দেখেছি, তার ঠিক নেই। আমাদের কলকাতায় দুর্গাপুজো, কালিপুজো, সরস্বতী পুজোর পরেই বোধহয় সবচেয়ে বড় পুজো ছিল এই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরপুজো। অন্য পুজোগুলোর মতই ধার্মিক ধার্মিক ভাব। শ্রদ্ধা, বিনয় আর প্রার্থনায় বোঝাই। কিন্তু অ্যানালিসিস বলে, যুক্তি তর্ক বলে প্রায় কিচ্ছু নেই। আমাদের এই রকমই শেখানো হয়েছিল আমাদের সমাজব্যবস্থায়। আর এস এসে গোঁড়ামি আর রক্ষণশীলতার মিলিটারি প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। আর, আমাদের মধ্যবিত্ত, উদারনৈতিক বাঙালি সমাজে এই বিশ্লেষণহীন রবীন্দ্র জয়ন্তী। মানুষ, বাঙালি ছেলে আর মেয়েরা এইভাবে আস্তে আস্তে বিতর্ক করার, প্রশ্ন করার ইচ্ছে ও ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। আজকের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক ধ্বংস এই বহু যুগের মিলিটেন্সির চূড়ান্ত ফসল।

কিন্তু, হাই-স্ট্যান্ডার্ড কালচার, সঙ্গীত, শিল্পকলা, চলচ্চিত্র, কাব্যের উচ্চ মান যে কাকে বলে, আমরা চোখের সামনে দেখেছি। হয়ত, তখন বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা ছিল না, বা কেউ আমাদের তা করতে শেখায় নি। কিন্তু, দেখতে দেখতে, শুনতে শুনতে, ভালো ও মন্দের একটা ধারণা মনের মধ্যে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এটা হলো একটা খুব দরকারি ফাউন্ডেশন। ভিত্তি। আজ ধরা যাক একটা বাড়ি তৈরি হচ্ছে। বাড়িটা দেখতে ভালো হচ্ছে না বাইরে থেকে। কারণ, যারা তৈরি করছে তাদের কোনো শিল্পজ্ঞান নেই। তারা একটা তিনতলা বাড়ি তৈরি করছে, তার একতলায় বাইরেটা লাল রং করেছে। তারপর দোতলাটা করার সময়ে তার ছেলের বিয়ে হলো, সে বলল আমি আমার দোতলার বাইরেটা নীল রং করব। তাই করা হলো। এবার তিনতলা যখন তৈরি হচ্ছে, তখন বাড়িঅলার ছোটছেলে বড় হয়ে গেছে। সে বলল, আমি বাইরেটা গোলাপী রং করব। এবার বাড়িটা একটা ভয়ঙ্কর, বিচ্ছিরি রঙের বাড়ি হলো। কিন্তু বাড়িঅলা খুব সাবধানে, সব চাইতে ভালো সিমেন্ট আর কংক্রিট দিয়ে দারুণ মজবুত বাড়ি তৈরি করেছিল। যখন তাদের বাড়িটা অনেককাল পরে বিক্রি হয়ে গেল, তখন যারা কিনলো, তারা একটা দারুণ হাই-স্ট্যান্ডার্ড কনস্ট্রাকশনের বাড়ি পেল, আর রং টং ফিরিয়ে একেবারে আর্টিস্টিক করে দিল বাড়িটাকে।

আমরা সে রকম। ফাউন্ডেশনটা অসাধারণ পেয়েছি। পরে সেই জবড়জং, আবেগতাড়িত মনে শিক্ষিত রং লাগিয়ে সংস্কৃতির চেহারাটা কিছুটা আধুনিক, শিল্পসম্মত করে ফেলতে পেরেছি।

গোয়াবাগান পার্কের পাশে তখন একটা বিরাট সর্ষের তেল তৈরি করবার ফ্যাক্টরি ছিল। ভগৎ অয়েল মিল। আজকের মত সেখানে তখন হাইরাইজ ফ্ল্যাটবাড়ি ওঠে নি। আর উল্টোদিকে ছিল একটা বিরাট খোলা জমি, যেখানে পরে বেশ কয়েকটা বাড়ি, একটা ব্যাঙ্ক, আর একটা ছাত্রীদের থাকার হোস্টেল তৈরি হয়েছে। এই অয়েল মিলের সামনে একটা বিরাট স্টেজ তৈরি হলো। স্টেজের ওপর রবীন্দ্রনাথের এক বিশাল আবক্ষ ছবি। তাতে লম্বা লম্বা রজনীগন্ধার মালা পরানো। আমি রবীন্দ্রনাথের অত বড় ছবি আগে কখনো দেখি নি। উল্টোদিকে শয়ে শয়ে কাঠের চেয়ার। ফ্রি অনুষ্ঠান। কারা করেছিল, জানি না।

মাত্র তিনজন শিল্পী। তখন নতুন নতুন রেকর্ড বেরিয়েছে দেবব্রত বিশ্বাসের এইচ এম ভি’তে। সেই আটাত্তর আর পি এমের কালো কালো সেলুলয়েড রেকর্ড। দুটো গান, একদিকে ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা’, আর অন্যদিকে ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে’। ও মা, দেখি সত্যি সত্যি দেবব্রত বিশ্বাস এসে হাজির। আগে কখনো দেখি নি। ওঃ, সে কী উত্তেজনা আমাদের গরিব পাড়ায়—দেবব্রত বিশ্বাস স্বয়ং গান গাইতে এসেছেন। কোনো ধারণাই ছিল না, তিনি কে, তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস, তাঁর গণনাট্য সঙ্ঘ—কিচ্ছু জানতাম না। আর, আমার বাবা তো ওসব কোনো কিছুর খোঁজই রাখত না। আমিও কিছুই জানতাম না।

ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের অগ্রণী শিল্পী, মার্কসবাদী ভাবধারায় অনুপ্রাণিত দেবব্রত বিশ্বাস। তাঁর অতি সাধারণ জীবনযাত্রা। আর তাঁর অতি অসাধারণ রবীন্দ্রসঙ্গীত শৈলী। - লেখক
ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের অগ্রণী শিল্পী, মার্কসবাদী ভাবধারায় অনুপ্রাণিত দেবব্রত বিশ্বাস। তাঁর অতি সাধারণ জীবনযাত্রা। আর তাঁর অতি অসাধারণ রবীন্দ্রসঙ্গীত শৈলী। – লেখক

কিন্তু, সে কী উত্তেজনা! দেবব্রত বিশ্বাস আর তাঁর জলদমন্দ্র কণ্ঠস্বর। আর সেই অদ্ভুতভাবে “আমি পেয়েছি মোর স্থান, বিস্ময়ে তাই জাগে” সেই জায়গাটায় গলাটাকে কী রকম একটা অন্যরকম করে দিয়ে গাওয়া। এরকম কখনো আর কারো গলায় শুনি নি। রেডিওতে শুনতাম। আজ সামনে শুনলাম। ওঃ!

তারপর হলো আমাদের সেই প্রিয় কবিতা বীরপুরুষ, হিমাংশু বিশ্বাসের অর্কেস্ট্রাতে। চার পাঁচজন লোক। হিমাংশু বিশ্বাস বাঁশি বাজাচ্ছেন, আর অন্যরা সব অন্য যন্ত্র। কী ভালো লেগেছিল। কোনদিন জানতামই না কবিতা আবার অর্কেস্ট্রাতে বাজানো যায়।

বিরতি। পাঁচ মিনিট। দশ মিনিট।

এবার গাইবেন আমাদের সেই সব চেয়ে মন ভালো করে দেওয়া শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সেই প্রথম সেই ঋষিতুল্য শিল্পীর গান সামনাসামনি শুনি। পরেও অনেক শুনেছি। পাড়ায় পাড়ায় নানা প্রোগ্রামে। রবীন্দ্র সদন। রবীন্দ্র কানন। মহাজাতি সদন। হরতুকি বাগানে একবার একটা রবীন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইলেন চল্লিশটা রবীন্দ্রনাথের গান। আমি সব খাতায় লিখে নিলাম। কী কী গান। পরে মাসির সঙ্গে, মার সঙ্গে, বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে না!

ghoti 15 e
মহাজাতি সদনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কবি ভাষণ পাঠ করছেন। পাশে সদনের প্রধান রূপকার নেতাজি সুভাষ বোস। সত্যজিৎ রায়কে লেখা চিঠিতে আমার বাবা অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর তথ্যচিত্র ‘রবীন্দ্রনাথ’-এ নেতাজিকে দেখানো হয় নি এই অংশটিতে। – লেখক

আমি অনেক, অনেক রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনেছি। অনেক ভেবেছি রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে। বিশ্লেষণ শেখার পর ভাবতে চেষ্টা করেছি কেন এত ভালো লাগে তাঁর গান। কোথায় কোথায় ভালো লাগার এলিমেন্ট আছে। শব্দচয়ন। অনুপ্রাস। ভাষার বিন্যাস। আধুনিকতা। সুর আর সুরের প্রয়োগ তো আছেই তার সঙ্গে। আর কথা ও সুরের মিলন। যাকে অম্লান দত্ত বলেছিলেন, বিবাহ। পীযূষকান্তি সরকার বলেছিলেন, পরিণয়। এই সব কিছু মিলিয়েই রবীন্দ্রনাথের গান।

আমার মনে হয় না, পৃথিবীতে শিল্পের ইতিহাসে এত উঁচু মানের, এত সার্থক শিল্প খুব বেশি রচনা করা হয়েছে। আমাদের হতভাগ্য পোড়া বাংলাদেশ নিজেরাই তার তেমন কদর বুঝলো না, বাইরের পৃথিবীর কী দায় পড়েছে যেচে তাকে বোঝার?

আমি সুচিত্রা মিত্রর গান খুব মন দিয়ে শুনেছি। খুব মনকে স্পর্শ করেছে। তাঁর গাওয়া সোনার গানে আমার ভেলা বোঝাই করেছি। দেবব্রত বিশ্বাস। অনেক, অনেক পরে বাংলাদেশের কিছু শিল্পী। লাইসা আহমেদ লিসার গাওয়া ‘গানের ঝর্নাতলায়’। অদিতি মহসিন। আমাদের কলকাতার সুমিত্রা সেনের ‘ওগো সাঁওতালি ছেলে’, ‘আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে’, আরও কত কত কত গান। যেন একটা আশ্চর্য রসের সমুদ্র, যেন একটা শ্রেষ্ঠ সম্পদ আহরণ।

কিন্তু, ভালো লাগার সেই বাড়িটার ফাউন্ডেশন আমার মনের ভেতরে করে দিয়ে গেছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। মাঝে মাঝে ভাবি, সারা জীবনে একটা এমন গান যদি গাইতে পারতাম। আর তারপর ভাবি, আচ্ছা, একটা, মাত্র একটা এমন গান যদি লিখতে পারতাম। আর, সুর করতে পারতাম!

অনেক গান গেয়েছিলেন সেই সুন্দর স্বর্ণালী সন্ধ্যায় আমাদের মন ভালো করে দেওয়া শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। ‘দোলাও দোলাও আমার হৃদয়’। ‘এই কথাটি মনে রেখো তোমাদের এই হাসিখেলায় জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়’। ‘আজি মর্মরধ্বনি কেন জাগিল রে’। আরো কত কী।

প্রবাদপ্রতিম হেমন্ত মুখোপাধ্যায় একটি জলসায় গান গাইছেন। এই ছবিটি অবশ্য একটি সিনেমা থেকে নেওয়া হয়েছে।  কিন্তু এরকম জলসা যে কত ঘুরে ঘুরে দেখে বেড়িয়েছি পাড়ায় পাড়ায়, কলকাতার অলিতে গলিতে। সেই চিরপরিচিত দৃশ্য—শিল্পী গান গাইছেন, আর সঙ্গে তাঁর দুই ছায়াসঙ্গী যন্ত্রশিল্পী।  - লেখক
প্রবাদপ্রতিম হেমন্ত মুখোপাধ্যায় একটি জলসায় গান গাইছেন। এই ছবিটি অবশ্য একটি সিনেমা থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরকম জলসা যে কত ঘুরে ঘুরে দেখে বেড়িয়েছি পাড়ায় পাড়ায়, কলকাতার অলিতে গলিতে। সেই চিরপরিচিত দৃশ্য—শিল্পী গান গাইছেন, আর সঙ্গে তাঁর দুই ছায়াসঙ্গী যন্ত্রশিল্পী। – লেখক

বাড়ি ফিরে এসে আমি জানলার ধারে, আমাদের সেই মেজেনাইন ফ্ল্যাটের জানলা ধরে অনেক রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি তখন বাচ্চা ছেলে। বোধ হয় ক্লাস সিক্স না সেভেনে পড়ি। প্রেমে পড়ার বয়েস তখন ঠিক হয় নি। ঈশ্বরকে বুঝতে চেষ্টা করার বয়সও তখন অনেক, অনেক দূরে। আমি উত্তর কলকাতার গরিব ঘরের একটা ছেলে। আমার জীবনে অলৌকিক কোনো কিছু ঘটে নি এর আগে।

আমি গাইছিলাম,

“আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান
তার বদলে আমি চাইনি কোনো দান।”

আমি গাইছিলাম,

“সেই কথাটি কবি পড়বে তোমার মনে
বর্ষামুখর রাতে ফাগুন সমীরণে।”

কার উদ্দেশে গাইছিলাম, কে জানে। মনে আছে, চোখ দিয়ে জল বেরোচ্ছিল। আর, আমি মুছি নি।

সেই আমার প্রথম ঈশ্বরের সঙ্গে একটু যেন যোগাযোগ।

সত্যি, কিন্তু একটু যেন অলৌকিক।

(কিস্তি ১৬)

More from পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘটিকাহিনী (৩০)

ছোটমামা এইমাত্র মারা গেছে।... মাথায় গুলি ঢুকে গিয়েছিল, আর "মেশিন"টা পাওয়া গিয়েছিল...
Read More