ঘটিকাহিনী (১৬)

সেই সময়ে আমার এক বান্ধবী হয়ে গেল। বান্ধবী মানে গার্লফ্রেন্ড নয়, এমনি বান্ধবী।

(আগের পর্ব)

উড়ন তুবড়ি

নাঃ, ওটা আর শেষ পর্যন্ত শেখা হয় নি। সেই-যে, যে-তুবড়ি মাটি থেকে ছিটকে আকাশের দিকে নক্ষত্রবেগে উড়ে চলে যায়।

এমনি ভূঁই তুবড়ি তৈরি করা শিখেছিলাম। সত্যি, একেবারে হাতে কলমে। রাস্তায়, গলিতে নিজের হাতে করা মাটির খোলের তুবড়ি বসিয়ে, ফুলঝুরির পেছনের লোহার শিকটা দিয়ে ফুটোটা একটু বড় করে দিয়ে, তারপর সেই ফুলঝুরিরই আগুন মুখটাতে দিয়ে দিলেই একেবারে… হূঊউউউউস!

আশ্চর্য সুন্দর আগুনের ফুলকির তারাবাজি। আর ধোঁয়া, আর বাজি বাজি একটা গন্ধ, আর একটা মন ঝলমল করে দেওয়া শব্দ। সেই উঁচুতে তুবড়ির আগুন উঠে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্যে। সেই একেবারে দুতলা তিনতলা অব্দি।

parthab logo

একবার কালিপুজোয় আমাদের আর এস এসের কলকাতার শাখাগুলোর মধ্যে একটা কম্পিটিশন হলো। কে সবচেয়ে ভালো তুবড়ি তৈরি করতে পারে। মানিকতলা শাখা ছিল আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডে। ক্যাপিটল নার্সিং হোমের পাশেই একটা সরু গলি, সেটা দিয়ে গেলেই একটা খোলা মাঠ। সেখানে। আমরা মাঝে মাঝেই যেতাম কাবাডি কম্পিটিশন বা কোনো যুক্ত মিটিং থাকলে। খুব মজা হত। অনেক বন্ধুও ছিল ওখানে। তুষার, অমরনাথ, শোভন, গৌতম এরা সব। সেই মানিকতলা শাখার মাঠেই সন্ধের পর হলো তুবড়ি প্রতিযোগিতা। আমারটা ভালই উঠেছিল, কিন্তু শেষে বাস্ট করে গেল। তাই আমি কিছু প্রাইজ পেলাম না। ডিসকোয়ালিফায়েড হয়ে গেলাম।

মাঝে মাঝে এটা সেটা প্রতিযোগিতা হত। একবার হয়ত হলো আবৃত্তি প্রতিযোগিতা। একবার হয়ত হলো বিতর্ক প্রতিযোগিতা। আর একবার মনে আছে হয়েছিল রচনা লেখা প্রতিযোগিতা।

তুবড়ি। আলোর রোশনাই।
তুবড়ি। আলোর রোশনাই। – লেখক

আবৃত্তি প্রতিযোগিতা হয়েছিল আমি যখন বোধ হয় ক্লাস টেন বা ইলেভেনে পড়ি। আমি তখন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের এমনি একজন সদস্য, আর এস এসে থাকার সুবাদে। নেতা-টেতা তখনো হই নি। সেই সময়ে বিদ্যার্থী পরিষদ করলো এই আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, টিম টিম করে চলা সংগঠনকে একটু বাইরে ছড়িয়ে দেবার জন্যে। আর এস এসের সেই ছাত্র সংগঠন তখন কলকাতায় একেবারেই শক্তিহীন। ২৬ নম্বর বিধান সরণীতে আর এস এসের রাজ্য অফিস ছিল, আর তার উল্টোদিকেই একটা বাড়ির দোতলার একটা ঘরে ছিল বিদ্যার্থী পরিষদের অফিস। কেউ যেত না সেখানে। সঞ্জয়দা বলে একজন ছিল, সঞ্জয় লাহিড়ী, সে থাকার সময়ে একটু কাজ টাজ হত, তারপর হঠাৎ সঞ্জয়দা অল্প বয়েসে মারা গেল, তখন সেই অফিসে সঞ্জয় স্মৃতি পাঠাগার বলে একটা ছোট্ট লাইব্রেরি খোলা হলো। সে লাইব্রেরিতেও কেউ বই নিতে আসত না বেশি। আমাকে বেণু বলে একটা ছেলে নিয়ে যেত ওখানে মাঝে মাঝে। বেণু চক্রবর্তী। সে আবার মৃণাল চক্রবর্তীর ভাই বলত নিজেকে। গায়ক মৃণাল চক্রবর্তী। বেণুও গান গাইত আর এস এসের শাখায়। আমিও গাইতাম। সেই সূত্রে বন্ধুত্ব হয়েছিল ওর সঙ্গে।

হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা আর বেশি দূরে নেই। একটু নার্ভাস নার্ভাস লাগছে।

সেই সময়ে আমার এক বান্ধবী হয়ে গেল। বান্ধবী মানে গার্লফ্রেন্ড নয়, এমনি বান্ধবী। কলকাতায় আমাদের মত বাংলা-মিডিয়াম কেবলমাত্র-ছাত্রদের-জন্য টাইপের স্কুলের ছেলেদের কাছে এক দুর্লভ ব্যাপার। কিন্তু, সেই যে বাংলায় বলে না—খোদা যখন দেতা হ্যায়, একেবারে ছপ্পড় ফুঁড়কেই দেতা হ্যায়? তা, সেই সময়ে খোদা হঠাৎ ঠিক করলেন আমাকে ছপ্পড় ফুঁড়কে কয়েকটা বান্ধবী দেবেন, মেয়ে ব্যাপারটা আসলে কী, সেটা একটু পরখ করে দেখবার জন্যে। পরখ করে, মানে হলো গিয়ে দেখা। দেখা-অনলি। একটু মাঝে মাঝে কথা বলা, আড্ডা। হাসি। রোমাঞ্চের আভাস, কিন্তু ওই পর্যন্তই। তাদের বাড়ি যাবার অধিকার। বসে গল্প করবার অধিকার। এই পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। আর কী চাই?

আমাদের বাড়ির তিনতলায় সেই যে কৃষ্ণাদির কথা দিয়ে এই ঘটিকাহিনী শুরু করেছিলাম, সেই কৃষ্ণাদির বোন ছিল কাবেরী। যদিও কৃষ্ণাদির নাম ছিল কৃষ্ণাদি, কিন্তু কৃষ্ণাদি আসলে কৃষ্ণা ছিল না। শুভ্রা ছিল। আর, কাবেরী ছিল কৃষ্ণা। কিন্তু ওর ডাকনাম ছিল শুক্লা। আমরা তাই পাড়ার রকে বসে বসে ভাবতাম, কৃষ্ণাদির নাম কেন কৃষ্ণা হলো? শুভ্রা কেন হল না? আর, কেনই-বা কাবেরীর নাম শুক্লা হলো, কৃষ্ণা কেন হল না?

আমরা কত কী ভালো ভালো উঁচুদরের চিন্তা করতাম সেই সময়ে! এখন ভাবলে অবাক লাগে।

তা সে যাই হোক, আমার এক বুজুম ফ্রেন্ড ছিল স্কটিশের। সুজল। সুজলের ভালো নাম ছিল সুবীর। সুবীর গাঙ্গুলি। কিন্তু আমরা পাড়ায় ওকে সুজল বলেই ডাকতাম। ছোট কারবালায় থাকত। সুজল আর্টস পড়ত নাইন থেকে। হিউম্যানিটিস। লজিক পড়ত, কিন্তু লজিক মোটেই ছিল না ওর কথাবার্তায়। কবিতা লিখত, আর আমাকে ধরে ধরে পড়াত। টোটালি বে-লজিক। সে কবিতার অর্থ, ভাব ও দ্যোতনা বোঝার সাধ্য আমার মত গরিবের নেই।

আজকের আই পি এল আর ওয়ার্ল্ড কাপের জুয়া খেলা আর খেলোয়াড় কেনাবেচার জগতে আমাদের পুরনো ক্রিকেট হারিয়েই গেছে।  তাও, কলকাতার ময়দানে গিয়ে ফার্স্ট ডিভিশন বা সেকেন্ড ডিভিশন ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে এখনো কী ভালো লাগে।
আজকের আই পি এল আর ওয়ার্ল্ড কাপের জুয়া খেলা আর খেলোয়াড় কেনাবেচার জগতে আমাদের পুরনো ক্রিকেট হারিয়েই গেছে। তাও, কলকাতার ময়দানে গিয়ে ফার্স্ট ডিভিশন বা সেকেন্ড ডিভিশন ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে এখনো কী ভালো লাগে।  – লেখক

কিন্তু ও দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলত। সুজল আমাদের স্কুল টিমের যৌথ ক্যাপ্টেন তো ছিলই, তার সঙ্গে ও প্রথমে বেঙ্গল স্কুল টিমের হয়ে খেলেছে, তারপর ইস্ট জোনের টিমে। মানে, পুরো ভারতের পূর্বাঞ্চলের টিমে খেলছে। আজ জামসেদপুর যাচ্ছে, কাল কটক। উদায় ভানু ব্যানার্জী, প্রণব নন্দী, প্রবীর চেল, প্রণব রায়দের সঙ্গে খেলছে। দেশবন্ধু পার্কের পুলকদার ক্রিকেট ক্যাম্পে, আর তারপর কার্তিক বোসের স্কুলে যেত ও। যেমন ব্যাটিং, তেমনি বোলিং। আমাদের স্কুলের ভেতরে ক্লাস টুর্নামেন্ট হলে সুবীর গাঙ্গুলির টিমকে হারানো দুঃসাধ্য ব্যাপার। ও একাই আমাদের সব শেষ করে দেবে। সেই অনেকটা ছোটবেলার অসিত দাশের মত। আরো মারাত্মক। ডেকে ডেকে বোলারদের ছয় মারে।

সুজল তারপর কলকাতার ময়দানের লীগে খেলতে আরম্ভ করলো জোড়াবাগান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে। একবার কাগজে বেরোলো, “সুবীর গাঙ্গুলির ন’টি উইকেট।” এক ইনিংসেই নটা উইকেট! যখন খুব উঠছে, তখন কী হলো, খেলা টেলা সব ছেড়ে দিয়ে বসে পড়ল। কী হলো কে জানে! মনে হয়, ওর বাবা হঠাৎ যখন মারা গেলেন একদিন সকালে অফিসে যাবার সময়ে হার্ট অ্যাটাক হয়ে, তখনি ওর ঘাড়ে সব বোঝা এসে পড়ল। আর খেলা টেলাও শেষ হয়ে গেল। যদ্দূর মনে পড়ছে, এটাই কারণ।

এখন, লেখাপড়ার ব্যাপারে সুজলের একটু দরকার পড়ত আমাকে। ওদের সঙ্গে আমাদের বাংলা আর ইংরিজিটা তো একই ছিল। তাই মাঝে মাঝেই সুজল আমার ঘরের জানলার নিচে এসে হানা দিত রাত্তির আটটা বা নটার সময়ে। আর, পড়ার বদলে আড্ডাই দিত বেশি। সেই বয়েসে যা হয়ে থাকে আর কী। আর আমি তো এক নম্বরের আড্ডাবাজ। ব্যস, হয়ে গেল আমার পড়ার দফারফা। এই আড্ডা দিতে দিতে হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করা গেল যে সুজলের এক স্বপ্নের প্রণয়িণী আছে। মানে, সুজলের ধারণা সেই মেয়েটি ওকে গোপনে গোপনে ভালবাসে, কিন্তু বলতে পারছে না। এই নিয়ে আমাদের বাংলা ব্যাকরণ আর ইংরিজি সাহিত্য সম্পর্কিত আলোচনাটা একটা ইন্টারেস্টিং দিকে ঘুরে যেতে আরম্ভ করলো। অনুপ্রাস, সমাসোক্তি, কর্মধারয় আর তদ্ধিত প্রত্যয়ের প্রতি প্রত্যয় আমাদের দ্রুত হ্রাস পেতে থাকলো। তার জায়গা জুড়ে বসলো নবযৌবনের নবজাগ্রত প্রাণ, আর চিরযৌবনের জয়গান। প্রণয়কুসুম প্রস্ফূটিত হয়ে তার সৌরভ আমাদের গোরাচাঁদ বোস রোড আর কারবালা ট্যাঙ্ক লেনকে দিবারাত্র আমোদিত করে তুলল।

এখন কী করা যায় সেটা একটা জরুরী প্রশ্ন। সুজল ভাবছে সেই রাজকুমারী ওকে ভালবাসে, কিন্তু কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারছে না। আর, প্রমাণাভাবে বন্ধুদের কাছে প্রেস্টিজও পাংচার হতে বসেছে। একটা কিছু করা চাই। এই সময়ে কাবেরী এসে উপস্থিত হলো আমাদের কেবলমাত্র-ছাত্রদের-জন্য শুষ্ক, পরামর্শহীন জীবনে, সিক্ত স্নিগ্ধ পরামর্শদাত্রীর ভূমিকায়। কাবেরী বেথুন স্কুলে পড়ে। আমাদের থেকে এক বছরের জুনিয়র। ভালো ছাত্রী। ওর বাবা বি এল চক্রবর্তী লম্বা চওড়া, রাশভারী মানুষ। অনেক রাত্তিরবেলা বাড়ি ফিরে গম্ভীর গলায় ডাকেন, “কৃষ্ণা, শুক্লা।” তখন ওদের বাড়ি থেকে কে একজন নেমে এসে আমাদের ফ্ল্যাটবাড়ির সদর দরজাটা খুলে দেয়। মনে হয় উনি খুব রাগী আর কঠিন মানুষ। কিন্তু কাবেরীর কাছে শুনেছি, উনি আসলে খুব জ্ঞানী আর কাব্যরসিক। নাকি বিষ্ণু দের ভক্ত।

তবলার জাদুকর ওস্তাদ কেরামত উল্লাহ খান। আমার মাস্টারমশাই চিত্ত রায় ছিলেন কেরামত সাহেবের ছাত্র। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল রফি আহমেদ কিদোয়াই রোডে তাঁর বাড়ি গিয়ে সামনে বসে তবলা শুনে আসবার। আর প্রোগ্রাম যে কত দেখেছি তার ঠিক নেই।
তবলার জাদুকর ওস্তাদ কেরামত উল্লাহ খান। আমার মাস্টারমশাই চিত্ত রায় ছিলেন কেরামত সাহেবের ছাত্র। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল রফি আহমেদ কিদোয়াই রোডে তাঁর বাড়ি গিয়ে সামনে বসে তবলা শুনে আসবার। আর প্রোগ্রাম যে কত দেখেছি তার ঠিক নেই। – লেখক

কীভাবে কাবেরীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বটা শুরু হয়েছিল, আমার আর ঠিক মনে নেই। আমি তখন তবলা আর বাঁশি বাজাতাম। তবলা শিখতাম আমার মাস্টারমশাই চিত্ত রায়ের কাছে, আর বাঁশি শিখেছিলাম নিজে নিজে বাজাতে। কাবেরী, কৃষ্ণাদি আর ওদের ছোট বোন কী যেন তার নাম ছিল ভুলে গেছি, ওরা সবাই খুব গানবাজনা ভালবাসত। কাবেরী খুব ভালো নাচত। সেটা পরে জেনেছি। এখন, ঘটনা হলো, তিনতলা থেকে একতলায় সঙ্গীতের মূর্ছনা কখনো আসে না। দেবী সরস্বতী উপরের স্তরের শিল্পী ও শিল্পকলা নিচের দিকে নামিয়ে আনতে পছন্দ করেন না। কিন্তু, উল্টোদিকে তাঁর মায়াজাল অহরহই ধাবিত হয়। বোধ হয় আমার তবলার “ধেরেকেটে তাক, মেরেকেটে রাখ/যাঃ কেড়ে নিন না, ধ্যাৎ রেখে দিন না/আজ তবে থাক,” অঙ্গুলি-ঝটিকা আমাদের দেড় তলার মেজেনাইন ফ্ল্যাটের ছাত ফুঁড়ে দোতলার ফ্ল্যাটের জলের পাইপের মধ্যে দিয়ে ওদের তিনতলার বসার ঘরে হানা দিয়েছিল।

একদিন আমি যখন ধিনিকেষ্টর মত সদর দরজার কাছে দেওয়ালে হাত রেখে দাঁড়িয়ে সামনের বারান্দার এক সুন্দরী মেয়ের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছি, তখন বাড়ি থেকে বেরোবার সময়ে কাবেরী আমাকে বলল, “হাঁ করে ওরকম ভাবে তাকিয়ে না থেকে আমাদের বাড়ি এস একদিন। গল্প করা যাবে।” বলে একটু মুচকি হাসলো।

আমি তো অবাক। এত অবাক যে ভালো করে হাসি-ব্যাক করতেও পারলাম না। ভ্যাবলার মত তাকিয়ে রইলাম খানিকক্ষণ।

সেই আমার একটা বেশ ভালো বান্ধবী লাভ। কাবেরী একটা অদ্ভুত মেয়ে ছিল। আমাদের থেকে এক বছরের ছোট, কিন্তু অনেক বেশি পরিণত। আমাদের তথাকথিত বাঙালি সংজ্ঞায় ওকে হয়ত ঠিক সুন্দরী বলা যাবে না, কিন্তু কাবেরী ছিল দারুণ প্রাণবন্ত, প্রানোচ্ছ্বল একটা মেয়ে। ভয়হীন, আর মুক্তমনা। আর খুব বুদ্ধি। ঠিক জানে কতটা কথা বলতে হয়, আর কখন থামতে হয়। কোথায় থামলে কথাবার্তা মাত্রা ছাড়িয়ে অন্যদিকে চলে যাবে না।

প্রথম প্রথম আমি একাই যেতাম ওদের বাড়ি, গিয়ে বাইরের ঘরে বসে অনেকক্ষণ আড্ডা দিতাম। কবিতা, গান, সাহিত্য এই বেশি। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুনীল, শক্তি। বিমল কর, শীর্ষেন্দু, মতি নন্দী। সব দেশ পত্রিকার বাছা বাছা কবিতা, গল্প আর উপন্যাসের বিদগ্ধ আলোচনা। আর রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুলপ্রসাদ। মাঝে মাঝে একটু রাজনীতি। দেখা গেল কাবেরীও একটু একটু আমাদের দিকেই ঝোঁকা। এবার সুজলও এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিল। রাজনীতির আলোচনা বন্ধ হলো, কারণ সুজলের বাড়ি সব সিপিএম। তাছাড়া, সুজলের তখন রাজনীতিতে বেশি মনও নেই। রাজার থেকে রাজকুমারীর বিষয়েই তখন ও বিশেষ চিন্তিত। আর কাবেরী ওর প্রণয়ঘটিত সমস্যা সমাধানে ওকে অনেক দার্শনিক পরামর্শ দিতে লাগলো। ফল মিলল একেবারে হাতেনাতে।

আমি হলাম সাময়িকভাবে সুজল ও রাজকুমারীর মধ্যে সংযোগস্থাপনের লিয়াজোন বা গুপ্তবার্তাবাহক দূত। আর, কাবেরী দার্শনিক পরামর্শদাতা। কয়েক সপ্তাহ এইভাবে চলল, তারপর রাজকুমারীর বাবা, অর্থাৎ রাজামশাই, একদিন স্বয়ং আমাদের বাড়ি এসে আমার বাবাকে রাজোচিত গাম্ভীর্য-সহযোগে জানিয়ে গেলেন-যে আমার এখন পড়াশোনা ছেড়ে এই বার্তাবাহক দূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়াটা তাঁর নেহাৎই অনুমোদনবিরোধী কাজ, এমনকি এ-কাজ রাজদ্রোহের পর্যায়ে পড়তে চলেছে। পরের সপ্তাহ থেকে আমার কাজ কেড়ে নেওয়া হলো রাজবাড়ি এবং প্রজাদের যৌথ উদ্যোগে, এবং ক্রিকেটার সুজলের প্রথম প্রেম সেখানেই ধরাশায়ী হলো। খারাপ ব্যাটিং। পরিকল্পনাহীন বোলিং। ইনিংসের গোড়ার দিকেই খেলা শেষ। ভিভ রিচার্ডস আর কপিল দেবের উত্তরসূরীর কাছে যা কল্পনাও করা যায় না।

দার্শনিকা মাথা নেড়ে বললেন, “আমি আগেই বলেছিলাম!”

সে যাই হোক। জীবন যে রকম।

এই কাবেরী আমাদের আর এস এসের ওপেন আবৃত্তি কম্পিটিশনে নাম দিয়েছিল আমারই প্ররোচনায়। রবীন্দ্র জয়ন্তী উপলক্ষ্যে। পঁচিশে বৈশাখ। কিন্তু যেদিন প্রতিযোগিতা হলো, তার ঠিক আগের রাত্তিরে আমি মনে করলাম ওই আবৃত্তি করতে না গিয়ে বরং রবীন্দ্র সদনে ভোরবেলা গান শুনতে গেলে কাজ হবে বেশি। ভোররাত্তিরে উঠে চুপি চুপি হাঁটা দিলাম চারটের সময়ে। মনে হলো, কী হবে ওই সব বোকাদের সঙ্গে আবৃত্তি করতে গিয়ে? সত্যি, ঠিক এই রকমই মনে হয়েছিল। মানে, সে রচনা কম্পিটিশনই হোক, আর বিতর্কই হোক, বা আবৃত্তি—আর এস এসে আমি সবেতেই ছিলাম। আর একটু একটু বোরিংও লাগতে আরম্ভ করেছিল। ওই যে বলেছিলাম না, ইন্টেলেকচুয়াল দিকটায় মন ভরত না ঠিক ওদের সঙ্গে। ছিলাম, ছিলাম।

দেশ পত্রিকা বেরোলেই আমরা গিলে খেতাম। আর, সন্দেশ পত্রিকা। প্রিয় লেখকদের গল্প, উপন্যাস। সত্যজিৎ রায়ের "বাক্স রহস্য" গল্প বেরিয়েছিল। তার সঙ্গে তাঁর আঁকা অসাধারণ সব ছবি।
দেশ পত্রিকা বেরোলেই আমরা গিলে খেতাম। আর, সন্দেশ পত্রিকা। প্রিয় লেখকদের গল্প, উপন্যাস। সত্যজিৎ রায়ের “বাক্স রহস্য” গল্প বেরিয়েছিল। তার সঙ্গে তাঁর আঁকা অসাধারণ সব ছবি। – লেখক

আমি আর প্রতিযোগিতায় গেলাম না। অনেক কথা শুনতে হয়েছিল কাবেরীর কাছে। ও দারুণ আবৃত্তি করত। প্রাইজটা বোধহয় ওই পেয়েছিল সেবার।

কিন্তু, ছেলেদের জগতে আমাদের খেলাধূলো আর আনন্দের উপকরণ এত বেশি ছিল যে সত্যিকথা বলতে, মেয়েদের অভাবই তেমন করে বোধ করি নি কখনো। এবং, মেয়েদের অনুপস্থিতিতে ভেতরে ভেতরে যে শূন্যতা আর অন্ধকার একটা গুহার সৃষ্টি হচ্ছে, সেটার পূর্বাভাসও পাই নি মোটেই। এদেশে আমেরিকায় একেবারে ছোটবেলা থেকে কো-এড সিস্টেম দেখতে দেখতে মনে হয়েছে, সত্যি, আমরা কী বোকাই না ছিলাম! বা বলা যেতে পারে, কীভাবে আমাদের বোকা বানিয়ে রেখেছিল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। মেয়েদের সঙ্গে না মিশতে পারার জন্যে যত রকমের অজ্ঞানতা, মূর্খতা, আর বয়ঃসন্ধি হবার সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতরে যত রকমের জটিলতা, আর বিকৃতি। যাদের বাড়িতে ছেলেরা দিদিদের সঙ্গে একসঙ্গে মানুষ হয়, তারা তাও একরকম একটা স্বাভাবিক যৌনশিক্ষা পায় কেবলমাত্র বেড়ে ওঠা দিদিদের সঙ্গে থাকতে থাকতে। তাদের বেড়ে ওঠা দেখতে দেখতে। বিকৃতি তাদের অনেক কম স্পর্শ করে, স্কুলে কোনো যৌনশিক্ষা না থাকা সত্বেও। কিন্তু আমাদের মত ছেলেরা যারা দুটোর একটাও পায় নি, তাদের অবস্থা খুব খারাপ হতে থাকে। কাবেরীর মত মেয়ের সঙ্গে যদি আমার আরো অনেক আগে থেকে বন্ধুত্ব হত, আর আমরা একসঙ্গে বড় হয়ে উঠতাম, খোলাখুলি যৌনতার আলাপ আলোচনা করার অধিকার সমাজ যদি আমাদের দিত, তাহলে এত বেশি নিষিদ্ধ, অন্ধকার জগতের হাতছানি তার গর্তে টেনে নিয়ে যেতে পারত না আমাদের।

সেই ক্লাস এইটে না কি নাইনে পড়ার সময় থেকেই আমাদের স্কুলে কয়েকটা বাঁদর কোথা থেকে এসে জুটল অন্য স্কুল থেকে, আর প্রথমেই তারা আমাদের মত বোকাদের খুঁজে বের করে জ্ঞানের আলো দিতে বসে গেল। কী রকম? চটি, পর্নোগ্রাফির বই কোথা থেকে যে তারা পেত আমি জানি না। পড়াশোনা যখন স্কুলে আর ঠিকমত হচ্ছে না, নাইনে পরীক্ষাও বন্ধ, চারদিকে চারু মজুমদার আর কানু সান্যালের সঙ্গে মাও সে তুং-এর মিটিং হওয়ার খবর ভেসে বেড়াচ্ছে, আর দুপুরবেলা থেকেই হেন্সম্যান ব্লকের সামনের গলিটায় পেটোর বিকট শব্দ, গন্ধ আর ধোঁয়া, তখন সেই অবসরে ক্লাসের পেছনের দিকে বসে পুরনো, আমেরিকান সাদা কালো নগ্নিকাদের ছবি দেখে আমরা কয়েকজন মূর্খ বালক শিহরিত হতে শুরু করলাম। তার সঙ্গে আবার যুক্ত হলো আমাদের এক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে তার দাদাদের সযত্নে লুকিয়ে রাখা এক্স-রেটেড বাংলা গল্পের বই। যে “গল্পের” বইতে গ্রাম এবং শহরের কল্পিত, সম্ভাব্য ও অসম্ভব সমস্ত প্রকার যৌন সম্পর্কের উলঙ্গ বর্ণনা আছে।

অবশ্য, আমরা এখন আরো অনেক এগিয়ে গেছি। মানবসভ্যতা অনেকদূর গেছে। তখন যা ছিল শুধুমাত্র ওই অজস্র ভুল বানানে, শস্তার কাগজে ছাপানো লুকোনো চটি বই, তাই এখন ছেয়ে গেছে ইন্টারনেট নামক ইলেক্ট্রনিক, সাইবার মাধ্যমে। বিশ্বায়িত, সীমাহীন তার উপস্থিতি। সর্বগ্রাসী এক লোলুপ রাক্ষসের মত তার গ্রাস।

লেখাপড়া মাথায় উঠলো। বাড়ির বাইরের মেয়েদের অন্য চোখে দেখতে শুরু করলাম। সমবয়েসী মেয়েদের তো বটেই, এমনকী দিদি বলে ডাকতাম যাদের, তাদেরও। আমি নিজে সে চোখে না দেখতে চাইলেও রেহাই নেই, গোরাচাঁদ বসুর রাস্তায় গোটাকয়েক মনুষ্য নামধারী মর্কটের বাস। তারা আমাকে সে চশমা পরিয়েই ছাড়বে। তারা শেখাবেই দেহতত্ত্ব ১০১, ২০২, ৩০৩। মেয়েরা যেন শুধু ভোগের বস্তু, আর কিছু নয়। তাদের যেন হৃদয় বলে, বুদ্ধি বলে কিছু নেই। তাদের সম্মান দেবার কোনো প্রশ্নই নেই। কী অদ্ভুত, লোমশ, অন্ধকার, পিচ্ছিল ছিল সেই জগৎটা। রগরগে, উত্তেজক কামকলা সম্পর্কিত আলোচনা কোনো বাড়ির নিচের ঘরে, নয়তো কোনো বাড়ির সিঁড়ির তলায়। সঙ্গে সিগারেট। ভাগ্যিস তখন মদের ফ্যাশনটা, ড্রাগের ফ্যাশনটা আমাদের ওসব অঞ্চলে আসে নি।

এখন ভাবলে লজ্জা লাগে। যুবতী কাজের মেয়েদের সম্পর্কেও তাদের আদিম রিপু অতিজাগ্রত। আমি সেই পরিবেশের শিকার। একেই বয়েসটা অত্যন্ত খারাপ, তারপর কুসঙ্গ, তারপর আমার মাত্রাছাড়া কৌতূহল। এখন যদি পারতাম একবার গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসতাম সেই মেয়েদের কাছে। বলতাম তাদের, “প্লিজ, প্লিজ, আমাকে একটু ক্ষমা করে দেবে তোমরা?”

এতদিন যারা আমাকে স্নেহের চোখে দেখত, ভাইয়ের মত দেখত, তারাও আমাকে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করলো। আমি আর যেন সেই আগের বাবুয়া নই, বদলে গেছি, খারাপ হয়ে গেছি। খারাপ, অশ্লীল কথা বলতে আমার আর কোনো অসুবিধেই হয় না। পাড়ার কালীপুজোর ভাসানে তাসাপার্টির সঙ্গে নাচতে নাচতে যাই। গঙ্গা পর্যন্ত পুরো রাস্তাটা আগে আগে হেঁটে হেঁটে যাই, কারণ পূর্বসূরী পাড়ার দাদাদের সে রকমই করতে দেখেছি। ওরকম করা মানেই হিরো। মুখের মধ্যে দুটো আঙুল পুরে দিয়ে জিভটা তুলে সিটি মারি। কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, সে বিচার আস্তে আস্তে মন থেকে মুছে যাচ্ছে। পাড়ার অন্য ছেলেরাও আমাকে এখন একটা লিডার বলে মনে করে। গণ্ডগোল হলে আমাকে এগিয়ে দেয় সামনে। আমি যা বলি, সে কথা সবাই মন দিয়ে শোনে। এমনকি, একটা রাইভ্যাল গ্রুপের মতও আছে আমার এখন। মারামারি হাতাহাতিও হয়েছে মাঝে মাঝে। ছোটবেলার এক বন্ধু যে এখন বখে গিয়ে যা তা করে বেড়াচ্ছে, তাকে মেরে চোখের পাশে রক্ত বের করে দিয়েছি একদিন। সে আমার বাবার নাম করে অপমানজনক কথা বলেছিল। আমি এখন কারুকেই ছাড়ি না।

বাইরের অশুভ শক্তি মনের ভেতরকার শুভ শক্তিকে প্রতিনিয়ত যুদ্ধে হারিয়ে দিচ্ছে। আর আমি সেই যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছি। কিন্তু আমি ছাড়া আমার সেই ভীষণ রক্তাক্ত যুদ্ধের খবর কেউ জানে না। কেউ টের পায় না আমার মনের ভেতর কী চলছে। কারুকে বলার নেই। কারুর কাছে যাবার নেই এসব কথা বলার জন্যে। সমাজ চোখ রাঙিয়ে আছে। স্কুল নিষেধের বেড়া তুলে দিয়েই নিশ্চিন্ত হয়ে বসে আছে। যৌনতা, যৌনজীবন এত সত্যি, এত স্বাভাবিক, কিন্তু সে বিষয় নিয়ে কথা বলা, আলাপ আলোচনা করা আমাদের সমাজে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই হলো আমাদের স্বাধীন দেশের, আধুনিক সমাজের আসল চেহারা। তখনো তাই ছিল, এখনো মোটামুটি তাই আছে।

এই আমাদের কলকাতার রাস্তার ধূলোতে বড় হওয়া। ধূলোকাদা মেখে বড় হওয়া। কিছু-কি বদলেছে? বাইরেটা বদলেছে অনেক, কিন্তু ভেতরে ভেতরে? কেউ কি খোঁজ রাখে? সমাজের মাথায় যে সব মূর্খ অশিক্ষিতরা চড়ে বসেছে, তাদের কোনো ক্ষমতা আছে কি এসব জটিলতা বোঝার, কিশোর যুবকদের মনকে বোঝার? আধুনিকতার শিক্ষা দেবার, ছেলে ও মেয়েদের দেহ ও মনের সমানাধিকারের শিক্ষা দেবার? সম্মানের শিক্ষা দেবার? অন্ধকার গুহা থেকে তাদের আলোয় উত্তরণের পথ দেখাবার? তাদের নিজেদের মধ্যেই যখন নির্বাচিত নেতারা, সিনেমার নায়করা খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে বিরোধীদলের মেয়েদের টেনে বের করে রেপ করিয়ে দেবার হুমকি দেয়, আর দিয়েও নির্ভয়ে ঘুরে বেড়ায়, তখন সে-সমাজ আসলে যে কোথায় পৌঁছেছে, তার অন্ধকার গুহার বিস্তৃতি যে কতদূর, তা ভাবলে ভয়ে হাত পা ঠাণ্ডা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়।

বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এক গভীর, গভীর সংকটের সামনে দাঁড়িয়ে। মানুষের মন, মনের অন্ধকারই সে সংকটের প্রধান কারণ। বাইরের ঝাঁ-চকচকে মল আর সুপারমার্কেট আর হাতে হাতে সেলফোন আর ল্যাপটপ সে-অন্ধকার দূর করতে পারবে না।

অনেক পরে ভেবেছি, সেই যে বন্ধুরা যারা বাড়িতে লুকিয়ে সেই সব চটি পর্নোগ্রাফির বই পড়ত, আর আমাদের ডেকে ডেকে পড়াত, তাদেরও আমি ঠিক দোষ দিতে পারি না। তারাও একটা ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থার শিকার। যে শিক্ষায় যৌনশিক্ষার মত এত গুরুত্বপূর্ণ একটা শিক্ষা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। সেইরকম এক বন্ধুর শুধু দাদা ছিল কয়েকটা। কোনো দিদি ছিল না। থাকলে কি ওরা এমন করতে পারত? খুব সম্ভবত না। আমার দেখা যে কজন বন্ধুর বা আত্মীয়ের বাড়িতে দিদিদের দেখেছি, তাদের কারুকেই আমি এই বিকৃতির শিকার হতে দেখি নি। বা, যাদের বাড়ি খুব ওপেন। সব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা হচ্ছে সব সময়ে। হই হই হচ্ছে। এসব বন্ধুদের বাড়ি শয়তান তার বিশ্রী অনুচরদের, রাক্ষসদের, “বটল ইম্প”দের পাঠাতে ভয় পায়। শয়তান খুঁজে খুঁজে বের করে কে একা বসে আছে। একা একটা তেরো চোদ্দ বছরের ছেলে, যার কতগুলো বাজে বন্ধু জুটেছে, আর যার খুব সব কিছু জানার ইচ্ছে। একেবারে সম্পূর্ণ খোলা মন, ব্লটিং পেপারের মত। কিন্তু মনকে কন্ট্রোল করার উপায় যার জানা নেই। শেখা হয় নি। শেখানো হয় নি। সে একেবারে যাকে বলে শয়তানের প্রাইম টার্গেট।

আমি নিজেই আমার নিজের চোখের সামনে খারাপ হয়ে যাচ্ছি। তার একটা বড় কারণ হলো কুসঙ্গ। আর একটা কারণ বাড়িতে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। ভীষণ অনিশ্চয়তা। বাবার ঊষা সেলাই মেশিন কারখানায় স্ট্রাইক, তারপর লকআউট। ক্লাস নাইনে প্রথমবার বোধহয়। তারপর একবার ক্লাস টেনে। আর শেষবার যখন আমি হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দিচ্ছি, ঠিক তখন। বাবার প্রায় কোনো রোজগার নেই মাসের পর মাস। এখানে যাচ্ছে, সেখানে যাচ্ছে, এটা করছে, সেটা করছে, শুধু একটু রোজগারের চেষ্টায়। বাবার কারখানার কয়েকজন সহকর্মী অভাবের জ্বালায় আত্মঘাতী হয়েছে, সে খবর পেয়েছি বাবার কাছেই। মার দুশ্চিন্তায় রাতে ঘুম নেই। স্বামীর জন্য, ছেলের জন্য। আমার বোন বুবু তখন একটু একটু করে বড় হচ্ছে। তার ভবিষ্যতের চিন্তাও আছে। সব মিলিয়ে মায়ের ও বাবার একটা সংকটের সময়ে যাচ্ছে। আমি সেই সংকটে কোনো সাহায্য করা তো দূরের কথা, অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দিচ্ছি আমার উৎশৃঙ্খলতার মাধ্যমে। বাবা আর একেবারেই মনে করে না আমি ভালো রেজাল্ট করতে পারি পরীক্ষায়। মা আরো হতাশ হয়ে পড়েছে। মার শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

কাবেরীর সঙ্গে বন্ধুত্ব সেই সময়ে আমাকে একটু যে আত্মসংযমের শৃঙ্খল পরিয়েছিল, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তারপর এলো আরো কয়েকটা উজ্জ্বল, সুন্দর মেয়ে।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। আমাদের কাছে এক পুণ্য তীর্থস্থান।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি। আমাদের কাছে এক পুণ্য তীর্থস্থান। – লেখক

আমাদের সুভাষদার কোচিং ক্লাসে, যেখানে পড়াশোনা প্রায় কিছুই হত না, কিন্তু বাবার আর এস এস এসের এক হিন্দিভাষী বন্ধু গোপীচাঁদ রস্তোগী সেখানে ভর্তি করিয়ে দেবার জন্যে বাবাকে বলেছিল, সেখানে আমার আরো দুজন বান্ধবী হলো সে সময়ে। সুজাতা ঘোষ, ডাক নাম বেবী। সুন্দর মুখ। হাসিখুশি, খোলামেলা মন। এক একটা মেয়েকে দেখলেই মনে হয় না তাদের মনে কোনো অন্ধকার নেই, পাপ নেই? সুজাতা সেই রকমই একটা মেয়ে। বেশিদিন আমাদের সঙ্গে পড়ে নি। কিন্তু খুব বন্ধুত্ব হয়েছিল। ওদের বড় কারবালার বাড়িতেও গেছি আড্ডা দিতে। খুব হাসতে পারত সুজাতা। তারপর ওর দাদা অমিত হঠাৎ কী একটা এক্সিডেন্ট হয়ে মারা গেল, আর সুজাতাও পড়া ছেড়ে দিল।

আর বন্ধু হলো মৈত্রেয়ী, যার ডাক নাম ময়না। সেই হরতুকি বাগানে আমার মাসি শোভার বন্ধু ছিল অলিভা, তার বোন। বহুদিন পরে ময়নাকে সুভাষদার কোচিং ক্লাসে দেখে তো আমি অবাক! ময়নাও অবাক।

“তুমি এখানে?” আমি বললাম।

“তুমি এখানে?” ময়না হেসে উত্তর দিল। উজ্জ্বল, সপ্রতিভ চোখদুটো চশমার মধ্যে ঝিলিক দিয়ে উঠলো।

“তুমি এখনো আবৃত্তি কর?” এক লহমায় মনে পড়ে গেল ময়নার অনেক কাল আগে করা আবৃত্তি, রথীন মামাদের বাড়ির ছাদে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে। “গান্ধারীর আবেদন।” ময়না না দেখে একটানা আবৃত্তি করে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল সেই বাচ্চা বয়েসেই। তখন ও বোধহয় বারো। আর এখন আমরা দুজনেই ষোলো সতেরো।

আমাদের যৌনতা-নিষেধ জীবনে যে কোনো নগ্নতার ছবিই আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। হয়ত কেউ একটা বিদেশী আর্টের বই যোগাড় করলো। আমরা সব বন্ধুরা দল বেঁধে বসে দেখতে লেগে গেলাম। তারপর এলো সুন্দর নগ্নতাকে কালো মেঘে ঢেকে দিয়ে অসুন্দর অশ্লীলতা। তার বিশ্রী লোভের হাতছানি।
আমাদের যৌনতা-নিষেধ জীবনে যে কোনো নগ্নতার ছবিই আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত। হয়ত কেউ একটা বিদেশী আর্টের বই যোগাড় করলো। আমরা সব বন্ধুরা দল বেঁধে বসে দেখতে লেগে গেলাম। তারপর এলো সুন্দর নগ্নতাকে কালো মেঘে ঢেকে দিয়ে অসুন্দর অশ্লীলতা। তার বিশ্রী লোভের হাতছানি। – লেখক

কয়েক মাস একসঙ্গে সেই বাজে কোচিং ক্লাসটায় পড়েছিলাম আমরা। টাকা কম দিতে হবে বলে ভর্তি হয়েছিলাম নিজের ইচ্ছেয়। বাবার তখন যা অবস্থা, ভেবেছিলাম একটা বেসিক কোচিং পেলেই আমার চলবে। বাকিটা আমি নিজেই সামলে নেব। আমি হচ্ছি স্কটিশ চার্চ স্কুলের একটা নামকরা ছেলে। চিরকাল ভালো রেজাল্ট করে এসেছি। এখন একটু সময় খারাপ যাচ্ছে তাই। কিন্তু হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় আমি দেখিয়ে দেব। বাবা বাধা দিল না। দিতেই পারত। জোর করে আমাকে একটা ভালো টিচারের ক্লাসে ভর্তি করিয়ে দিতে পারত। দেয় নি। মা অসহায়। ঠিক বুঝত না ব্যাপারটা। আর আমি তখন অত্যন্ত রুক্ষ, কর্কশ। কারো কথা আমি শুনি না। নিজে যা ভালো ভাবি, তাই করি। মার কথা, বাবার কথা শোনার কোনো দরকার আছে বলে মনে করি না। আমি এখন সবজান্তা, সর্বজ্ঞ।

মূর্খের স্বর্গ। সে বছর আমাদের পরীক্ষায় দেবী সরস্বতী আমাকে শাস্তি দেবার জন্যে আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন। তিনি আমার পতন দেখছিলেন। পাপ দেখছিলেন।

তার ওপরে আবার ছিল ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন নামক এক সন্ত্রাসবাদী সংস্থা। তাদের নিরঙ্কুশ স্বৈরাচারী প্রশ্নপত্র তৈরি করার ভয়ঙ্কর কুটিল নিয়ামকরা। শোনা গেল, নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অপরাধে আমাদের ব্যাচটাকে টার্গেট করা হয়েছিল। অদ্ভুত কথা, কারণ আমি নকশাল আন্দোলনের সম্পূর্ণ বিরোধী ছিলাম। ওরা অতি বাম। আর আমি তো আমি, আমার পিতৃদেব পর্যন্ত অতি দক্ষিণ। কিন্তু নিয়ামকরা সে কথা শুনলেন না। মুড়ি মিছরি এক দর করে দিলেন।

হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার ইতিহাসে এত কঠিন প্রশ্ন কখনো সেট করা হয় নি। এত কুৎসিৎভাবে পরীক্ষার খাতাও কখনো দেখা হয় নি।

ময়না খুব ভালো স্টুডেন্ট ছিল। অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। গান গাইত কী ভালো! আবৃত্তি তো করতই। নাচেও পারদর্শী ছিল। অনেকটা সেই কাবেরীর মতই। আমিও ভালো ছাত্র ছিলাম। এত সব কঠিন সমস্যার মধ্যে দিয়ে যাবার পরেও আমি ফাইনাল পরীক্ষার আগে যে টেস্ট পরীক্ষা হয় স্কুলের শেষে, তাতে স্টার মার্ক পেয়েছিলাম। মানে, সাতশ পঞ্চাশ। আমার প্রিয় সাবজেক্টগুলোর মধ্যে বায়োলজিতে আমি পেয়েছিলাম নব্বই পার্সেন্ট। ইংরিজি বাংলাতে সত্তরের ওপর, যা খুব কম ছেলেমেয়ে পেত সে সময়ে। ফিজিক্সে লেটার। আমাদের কোনো মাল্টিপল চয়েস ছিল না। খুব বাজে, বোরিং সিস্টেম ছিল আমাদের।

কিন্তু উড়ন তুবড়ি ঠিক সময়ে উড়ল না। মুখ থুবড়ে পড়ল মাটিতে। আসল পরীক্ষার সময়ে।

ময়্নারও, আমারও।

আমার স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে কয়েকজন খবর পেয়ে আমাকে বাড়ি বয়ে এসে সান্ত্বনা দিয়ে গেল।

মনোতোষ, সে তখনো পাগল হয়ে যায় নি। কিন্তু পরীক্ষা দিতে পারে নি আমাদের সঙ্গে। সে বলল, “পার্থ, আমি তো ভাবতেই পারছি না।”

আমি বললাম, “আমিও না।”

আর একজন সঙ্গে ছিল। নাকি, পরে এসেছিল, আলাদা। আশীষ রায়। যুগীপাড়ার আশীষ। যে আমাকে খেপ খেলতে নিয়ে গেছিল একবার।

আশীষ বলল, “সত্যি, বিশ্বাস করতে পারছি না।”

আমি বললাম, “আমিও না।”

কাবেরী দেখা করতে আসে নি। ময়নাও না। ময়না আমার থেকেও কম নম্বর পেয়েছিল।

কাবেরী বোধহয় আমাকে লজ্জায় ফেলতে চায় নি।

সুজলের কথাটা বলতে ভুলে গেছি। ও সেই লজিকেই শেষ হয়ে গেল।

আবার পরীক্ষা দিতে হলো ওকে।

(কিস্তি ১৭)

More from পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘটিকাহিনী (২১)

"মসীত খাঁ ছিলেন আমার গুরু কেরামত সাহেবের বাবা, বুঝলে?" মাষ্টারমশাই একদিন বললেন।...
Read More