ঘটিকাহিনী (১৯)

আল্পনা বলে এক বিধবা মহিলাকে তার গুণ্ডা ভাড়াটেরা আমাদেরই পাড়ায় দিনে দুপুরে উলঙ্গ করে রাস্তায় তাড়া করলো, আর তারপর একটা বেঞ্চিতে ওই ভাবেই বসিয়ে রাখল ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

(আগের পর্ব)

গ্রাম আবু গরিব, জেলা কলকাতা

আবু গরিবের নৃশংসতার কথা শুনে আমাদের এখানে মার্কিন মুলুকে বহু সভ্য লোকজন আঁতকে উঠেছিল। সেই ইরাক যুদ্ধের সময়ে আমেরিকান সৈন্যরা বন্দিদের যেভাবে নির্যাতন করেছিল, তার কথা। সেই খুঁটির সঙ্গে বেঁধে চাবকানো। উলঙ্গ করে হাত পা বেঁধে শুইয়ে রেখে তার ওপর মিলিটারি কুকুর ছেড়ে দেওয়া। ইলেকট্রিক শক দেওয়া। এই সব।

কিন্তু এসব তো আর নতুন কোনো কথা নয়। সারা পৃথিবীতেই মার্কিনি ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দেশীয় এজেন্টরা চিরকাল এসব কুকীর্তি করে এসেছে। নতুন কোনো ঘটনা ঘটে নি-যে মার্কিনি জনতা হঠাৎ জাগ্রত হবে। আমাদের শহীদ প্রফুল্ল চাকীর গলা কেটে নেওয়া। জালিয়ানওয়ালাবাগ। পাংখাদারদের লাথি মেরে ভবলীলা সাঙ্গ করে দেওয়া। আন্দামান সেলুলার জেলে বীভৎস অত্যাচার। ব্রিটিশ প্রভুদের অসংখ্য কুকীর্তি।

parthab logo

ভিয়েতনামের নৃশংসতা এখনও বেশি পুরনো হয় নি। দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্বরতা। চিলি, ইন্দোনেশিয়া আর বাংলাদেশে মার্কিনি সেনা ও সরকারের মদতে নারকীয় অত্যাচার ও ধ্বংসলীলা। বেশিদিনের কথা তো নয়।

আমাদের দেশেও আবু গরিব আমরা ছেলেবেলা থেকেই দেখে এসেছি। ঘরে, বাইরে। তপন রায়চৌধুরী তাঁর বাঙালনামাতে তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৬ ও তার বীভৎসতার কথা বলেছেন। আমরা জন্মেছি তারও অনেক পরে। আমরা সে বীভৎসতা দেখি নি, কিন্তু তার বদলে আরো অনেক কিছু দেখেছি। তাতে হয়ত এমন সার্বিক ধ্বংসলীলা নেই, কিন্তু একটা একটা করে লক্ষ ছেলের জীবন শেষ হয়ে গেছে। মেয়েদেরও।

আবু গরিবের বন্দীশালা -- বিনা বিচারে ইরাকীদের আটক, তাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার। আজ ইতিহাস হয়ে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেউ আর মনে রাখেনি। কিন্তু যাদের ওপর অত্যাচার হয়েছিল, তারা ভুলে যায়নি এখনো। - লেখক
আবু গরিবের বন্দীশালা — বিনা বিচারে ইরাকীদের আটক, তাদের ওপর অকথ্য অত্যাচার। আজ ইতিহাস হয়ে আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কেউ আর মনে রাখেনি। কিন্তু যাদের ওপর অত্যাচার হয়েছিল, তারা ভুলে যায়নি এখনো। – লেখক

শুধু পুলিশী অত্যাচার, কানাগলির মধ্যে মেরে ফেলে রাখা, বা ময়দানে ভোররাত্তিরে ভ্যান থেকে ছেড়ে দিয়ে পিছন থেকে গুলি করে হত্যা নয়। লকআপে মেয়েদের ধর্ষণ শুধু নয়। একটা প্রজন্মকে চিরকালের মত পঙ্গু করে দিয়ে গেছে এই সিস্টেম। আমাদের প্রজন্মকে।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ল। আমি ছোটবেলায় অনেক রাতে ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, রান্নাঘরে আরশোলা উড়ছে পিড়িং পিড়িং শব্দ করে। অন্ধকারে ওরা উড়ত, আর আমি হঠাৎ আলো জ্বাললেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ত ভয়ে। আমি তখন একটা দুটো আরশোলা ধরে মনের সুখে তাদের পাখা দুটো ছিঁড়ে নিয়ে আবার ছেড়ে দিতাম।  ওখানেই আরশোলাগুলোর জীবনের আনন্দ শেষ।  তারা ঘষে ঘষে হেঁটে যেত ভয়ে, আতঙ্কে আর যন্ত্রণায়, পালাতে চেষ্টা করত, কিন্তু তখন তাদের মুমূর্ষু অবস্থা।  তখন আমি তাদের ওপর পায়ের বুড়ো আঙুলটা টিপে ধরতাম। প্যাট করে একটা মৃদু শব্দ হত, আর পেট থেকে ওদের নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে পড়ত।  তারপরও পালাবার চেষ্টা করত ওরা। আর শেষে নর্দমায় মুখ গুঁজে মরে পড়ে থাকত।  তখন আমি বালতির জল মগে করে নিয়ে ওদের ড্রেনের মধ্যে ফেলে দিয়ে, আর হাত ধুয়ে, আবার ঘুমোতে চলে যেতাম। কলে জল থাকত না রাত্তিরে। সব শুকনো খটখটে।

যে সময়ের কথা বলছি, তখন কলকাতায় আমাদের মত ঘরের ছেলেদের বেঁচে থাকাটাই একটা ভাগ্যের ব্যাপার।  যে কোনো ছেলে—যে কোনো ছেলে, যদি তার খুঁটির জোর না থাকে, তাহলে সে যখন-তখন মরে যেতে পারে। মরে যেতে পারে, খুন হয়ে যেতে পারে, বাসের তলায়, ট্রামের তলায় পড়তে পারে, জলে ডুবে যেতে পারে, সেক্সুয়ালি অত্যাচারিত হতে পারে, পাড়ার দাদাদের কাছে মার খেতে পারে বেধড়ক, মার খেয়ে হাত পা ভেঙে যেতে পারে, চড় খেয়ে গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসে যেতে পারে। বাড়িতে বাপের কাছে, দাদার কাছে, কাকার কাছে প্যাঁদানি খেয়ে প্যান্টে হাগু হয়ে যেতে পারে। ইস্কুলে মাস্টারদের হাতে ঠ্যাঙানি খেয়ে চোখে সর্ষেফুল দেখতে হতে পারে।

ভায়োলেন্স নিয়ে একটা এনসাইক্লোপিডিয়া লিখে ফেলা যায়।

আমি একবার সর্ষেফুল দেখেছিলাম আমাদের স্কটিশে। বড় বড়, গরম গরম, লাল লাল সর্ষেফুল। এখন বলতে কোনো বাধা নেই, কারণ বহুকাল হয়ে গেছে, আর সবাইকে ক্ষমাটমাও করে দিয়েছি। ক্ষমা চাইবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না, কারণ আমি কোনো দোষ করি নি। দোষ করেছিল স্কটিশ আর তার একটা মাস্টার। সে যে যাই বলুক না কেন। আর সব কলকাতার স্কুলের মতই আমাদের স্কুলেও কয়েকটা জল্লাদ চাকরি করত।  তাদেরকে অনেকে বলত মাস্টার, শিক্ষক। অমুক বাবু, বা তমুক স্যার। তাছাড়া, সেই সব ছদ্মনাম তো আছেই।

সাধে-কি আর ওসব নাম দেওয়া হয়েছিল? ওসব নাম দেওয়া একধরনের প্রতিশোধস্পৃহা।

মাঝে মাঝে আমার একটা কথা মনে হয়। এই যে আমি হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় এত ভয়ঙ্কর বাজে রেজাল্ট করলাম, তার পরেও তো জীবনে এত কিছু করতে পারলাম নিজের বুদ্ধি ও পরিশ্রমে। তাই না? যখন কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে আমেরিকান মিডিয়া এথিক্স বিষয়ে শ্রেষ্ঠ ছাত্রের পুরস্কার পেলাম ২০০০ সালে, বা যখন সাদার্ন ইলিনয় ইউনিভার্সিটিতে বেস্ট থিসিস অ্যাওয়ার্ড পেয়ে গেলাম একটা, বা ওয়াল স্ট্রিটে হাজার মার্কিন জনতার সামনে যখন স্টেজে দাঁড়িয়ে ইংরিজিতে যুদ্ধবিরোধী, নির্যাতনবিরোধী বক্তৃতা দিলাম, তখন মনে হচ্ছিল, আজ যদি আমাদের সেই সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ওয়েস্ট বেঙ্গল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশন আমাকে দেখত। ওরাই লজ্জা পেত নিজেদের ভুলের জন্যে, মধ্যযুগীয় বর্বর শিক্ষাপদ্ধতির জন্যে। আমি কেন লজ্জা পাব? আমাদের মত দু-চারজন জীবন দিয়ে প্রমাণ করে দিয়েছি-যে ওই শিক্ষাব্যবস্থাটা ভুল ছিল। প্রমাণ করে দিয়েছি ওরা আমাদের সঙ্গে চিটিংবাজি করেছে। আমাদের ঠকিয়েছে।

মনস্যানটো বীজ কর্পোরেশনের সর্বগ্রাসী নিষ্পেষণের জ্বালা জুড়াতে ভারতের লক্ষ লক্ষ চাষী যেমন আত্মহত্যা করে চলেছে, তেমনি অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয় আমাদের কলকাতায় লক্ষ লক্ষ ছেলে ও মেয়েকে বাধ্য করেছে নিজেদের জীবন শেষ করে দিতে। আমাদের চারপাশেই কতগুলো ঘটনা দেখলাম। নিজেদের বন্ধু, পরিজন, দাদা, দিদি।  - লেখক
মনস্যানটো বীজ কর্পোরেশনের সর্বগ্রাসী নিষ্পেষণের জ্বালা জুড়াতে ভারতের লক্ষ লক্ষ চাষী যেমন আত্মহত্যা করে চলেছে, তেমনি অর্থনৈতিক ও মানসিক বিপর্যয় আমাদের কলকাতায় লক্ষ লক্ষ ছেলে ও মেয়েকে বাধ্য করেছে নিজেদের জীবন শেষ করে দিতে। আমাদের চারপাশেই কতগুলো ঘটনা দেখলাম। নিজেদের বন্ধু, পরিজন, দাদা, দিদি। – লেখক

আমাদের সামনের বাড়ির কাকিমা ছিল। সেই কবে থেকে আমাকে আর আমার বোনকে দেখেছে। সেই যেদিন আমরা প্রথম চিন্ময়কাকুর বাড়ির থেকে উঠে এই বাড়িতে চলে এলাম, সেদিন থেকে। প্রতিবেশী, নেবার বললে আমাদের দেশে কিছুই বলা হয় না। একই সমাজ। একই শ্রেণী। একই সুখদুঃখ। একই স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন। একই সময়ে বাজারে যাওয়া মাছ কিনতে।  আমি যখনি কলকাতায় যেতাম আমেরিকা থেকে, কাকিমা পুরনো দিনের কথা বলত। বলত, “এই তো তুই সেবার সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করলি। ওদিকে কনকও বেরোলো সেকেন্ড ডিভিশনে তার পরের বার। আমার সব মনে থাকে।”

কী দারুণ মেমরি! আমি চমৎকৃত।

কী আর বলব? তখনি কাকিমার অস্টিও-আর্থরাইটিস জটিল চেহারা নিয়েছে। ওরা থাকত আমাদের বাড়ির পিছনের দিকে একতলায়। সারা জীবন একটা ফ্যামিলি—বাবা, মা আর একটা মেয়ে—একটা ফ্ল্যাটে আছে, কিন্তু সেখানে দিনের বেলাও আলো জ্বেলে থাকতে হয়, কারণ রোদ আসেই না। স্যাঁতস্যাঁতে, ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা, মোদো মোদো গন্ধ ওদের বাড়িতে। এইভাবে থাকতে থাকতে কাকিমার শক্ত গেঁটেবাত হলো পঞ্চাশ বছর বয়েস হতে না হতেই। তারপর, কয়েক বছরের মধ্যেই মরে গেল। বাবা গেল, তারপর মা। এখন ওদের ওই একমাত্র মেয়ে সোমা ওখানেই থাকে একা একা।  তারও অস্টিও-আর্থরাইটিস, চল্লিশ বছর বয়েসে। লাঠি নিয়ে হাঁটে। ওকে দেখেছি ওর জন্মের সময়ে থেকে। স্কার্ট পরে ইস্কুলে যেত।  আর আমাদের বাড়ি সকালবেলা এসে আমাদের খবরের কাগজ নিয়ে মুখ ঢাকা দিয়ে পড়ত মোড়ায় বসে বসে, আর সব হাঁড়ির খবর শুনত।  সেই সোমা।

ওই কংগ্রেস।  ওই সিপিএম। ওই সব ছাত্র পরিষদ, যুব কংগ্রেস, এস এফ আই। নকশাল। এখন আবার জুটেছে বিজেপি আর তৃণমূল। যেন স্বর্গ থেকে এসেছে দূত আর দূতীরা। ওই সব পুরনো-গন্ধ নেতা আর নেত্রীরা, যাদের মধ্যে কয়েকজন এখন আবার নতুন গদিতে বসেছে। তাদের আমলারা, পুলিশরা, চামচারা, গুণ্ডারা। তাদের বশংবদ প্রফেসার আর প্রফেসারনির দল। তাদের একজামিনার, হেড একজামিনার, আর স্ক্রুটিনিয়ার।  পাপের গন্ধ। অশিক্ষার কুঘ্রাণ। দু চারজন ভালো লোক থাকতে পারে। সে সব জায়গাতেই থাকে।  কিন্তু সামগ্রিকভাবে একটা পচে যাওয়া ক্ষতের মত সিস্টেম।  তার থেকে চুঁয়ে চুঁয়ে রক্ত আর পুঁজ পড়ছে।

সুব্রত। ১৯৯৪ সালে যখন আমরা প্রথম আমেরিকা থেকে কলকাতায় বেড়াতে যাই, তখন আমাদের তিনের আট গোরাচাঁদ বসু রোডের মেজেনাইন ফ্ল্যাটে তোলা। সুব্রতর পাশে আমার বাবা।  তার পাশে সুব্রতর বউ সুমিতা। সঙ্গে সুব্রতর দুই ছেলে। আমাদের বাড়ি সুব্রতর যাওয়া আসাটা বাড়ির আর একটা ছেলের মতই ছিল।  - লেখক
সুব্রত। ১৯৯৪ সালে যখন আমরা প্রথম আমেরিকা থেকে কলকাতায় বেড়াতে যাই, তখন আমাদের তিনের আট গোরাচাঁদ বসু রোডের মেজেনাইন ফ্ল্যাটে তোলা। সুব্রতর পাশে আমার বাবা। তার পাশে সুব্রতর বউ সুমিতা। সঙ্গে সুব্রতর দুই ছেলে। আমাদের বাড়ি সুব্রতর যাওয়া আসাটা বাড়ির আর একটা ছেলের মতই ছিল। – লেখক

আমাদের শরীরে মনে ক্যানসার ছড়িয়ে দিয়েছিল ওরা। বেশির ভাগই সে ক্যানসারে মারা পড়েছে। কেউ সিগারেট খেয়ে খেয়ে ফুসফুসে ক্ষত হয়ে। যেমন, কবি স্বপ্নাভ। কেউবা ডিপ্রেশন, অবসাদ রোগে আক্রান্ত হয়ে। যেমন, আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু সুব্রত। শৈশবের বন্ধু সুব্রত।  যার সঙ্গে আমি লুডো, দাবা, টেবিল টেনিস, ক্যারম, ফুটবল ক্রিকেট, ঝুলন, সাপবাজি, কাগজের নৌকো, বুক ক্রিকেট, সিগারেট, হজমি আর ঝালনুন, মেয়ে মেয়ে, নুনু নুনু, আর সব খেলা খেলেছি। যার আগের বছরের ইস্কুলের বই আমি পরের বছর নিয়ে পড়েছি। যার একসময়ের ব্যর্থ-বান্ধবী মহুয়ার কাছে ওর প্রেমপত্র পৌঁছে দিয়েছি। যার হেঁড়ে গলার “বাবুয়া, এই বাবুয়া” চিৎকারে আমার কলেজ লাইফের দিবানিদ্রা ভেঙেছে। যে আমার ঘুড়ির লাটাই ধরেছে আজীবন। আমার সাহিত্যচর্চা, সঙ্গীতচর্চার প্রথম অ্যাডমায়ারার ছিল যে।

আমি যখন কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে সাংবাদিকতা পড়তে ঢুকেছি চল্লিশ বছর বয়েসে, তখন সুব্রত কলকাতার উপকণ্ঠে একটা লোকাল ট্রেনের সামনে একদিন সকালবেলা এমনি এমনি দাঁড়িয়ে পড়ল। সুব্রত তখন ইটাহার না জামালপুর কোথায় যেন বিডিও থেকে প্রমোশন পেয়ে হয়েছে এসডিও। দক্ষ, এবং বোকার মত সৎ, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী। শুনেছি, ওর শরীরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আমি দেখতে যেতে পারি নি। অলক, প্রতাপ এরা সব গেছিল।

সিপিএম বা কংগ্রেসের দালালি করত না বলে ওকে কলকাতায় সারা জীবন ট্রান্সফার দিচ্ছিল না। কলকাতায় ওর বুড়ো বাবা মা। তা, ওর বাবা সরোজ ঘোষও মরলেন, আর অশৌচের কাছা গায়ে সুব্রত ঘোষও সে শক নিতে না পেরে মরলো পাঁচ না ছদিনের মাথায়। বিচ্ছিরি রকমের দুর্বল চরিত্র। কে বলবে, এই লোকটাই দুঁদে অফিসার। একসঙ্গে দুটো শ্রাদ্ধ ওদের বাড়িতে। বাবা আর ছেলের।

ওর আর আমার জমানো সেই মার্বেলগুলো, আর বাংলা শেক্সপিয়ারের কমেডি আর ট্র্যাজেডির বইগুলো কোথায় গেল, কে জানে!

এই রকমই এক লোকাল ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সুব্রত। গান্ধীর জন্মদিনে। দোসরা অক্টোবর, ১৯৯৯ সাল। আমি তখন কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে সবে পড়া শুরু করেছি।  টেলিফোনে খবর পেলাম কলকাতা থেকে। মাত্র কয়েক মাস আগেই দেখা হয়েছিল। আমার আর এস এসের ওপর লেখা বই ওকে একটা প্রেজেন্ট করেছিলাম। - লেখক
এই রকমই এক লোকাল ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সুব্রত। গান্ধীর জন্মদিনে। দোসরা অক্টোবর, ১৯৯৯ সাল। আমি তখন কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে সবে পড়া শুরু করেছি। টেলিফোনে খবর পেলাম কলকাতা থেকে। মাত্র কয়েক মাস আগেই দেখা হয়েছিল। আমার আর এস এসের ওপর লেখা বই ওকে একটা প্রেজেন্ট করেছিলাম। – লেখক

বড় প্রশান্ত আর ‘সোনিয়া’ সমীর ক্যানসারে মরে গেল তিরিশ পেরোনোর আগেই। বড় কারবালার স্মরজিত, আমরা কত ক্রিকেট খেলেছি একসঙ্গে, আমার থেকে দু চার বছরের ছোট, পড়াশোনায় ভালো আমাদের স্কটিশেই, সে কী একটা রোগ নিয়ে জন্মেছিল, হঠাৎ কুড়ি পেরোতে না পেরোতে দু চার বছরের মধ্যেই বুড়িয়ে গেল। আমি তখন বোধহয় কলেজে পড়াতে ঢুকেছি দেশে। দেখি বুড়ো মতন হয়ে গিয়ে লাঠি ধরে ধরে হাঁটছে। হাত পা কাঁপছে। চুল টুল সব উঠে গিয়ে টাক পড়ে গেছে। তারপর শুনলাম মরে গেছে। তরুণ বড়াল ভীষণ ভিড়ের বাস থেকে পড়ে গিয়ে ব্রেন হেমারেজ হয়ে মরে গেল হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবার ঠিক পরেই। আমি শ্মশানে গিয়ে গান গাইলাম রাত্তিরবেলা, “তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম।” তরুণের শরীরটা তখন গনগনে আগুনে পুড়ছে।

পাশের বাড়ির নিরীহ-ভালোমানুষ গণেশ যে দেখা হলেই আমাকে বলত, “বাবুয়া, তোর মত পড়াশোনায় হতে পারলাম না,” বা সেই “বল-উড়লে-নট-দায়ী” রবিনের দাদা রঞ্জিত। এখানে ওখানে সুইসাইড আমাদেরই পাড়ায়। শোভাদি বিষ খেলো। আল্পনা বলে এক বিধবা মহিলাকে তার গুণ্ডা ভাড়াটেরা আমাদেরই পাড়ায় দিনে দুপুরে উলঙ্গ করে রাস্তায় তাড়া করলো, আর তারপর একটা বেঞ্চিতে ওই ভাবেই বসিয়ে রাখল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বড়তলা থানা থেকে দুশো কি তিনশো গজ দূরে। সব বাড়ির জানলা দরজা তখন বন্ধ।  কিন্তু লোকেরা, মেয়েরা, পুরুষরা সবাই খড়খড়ি ফাঁক করে দেখছে।

ভাড়া নিয়ে বচসা। বোধ হয় আল্পনা দু চারটে গালাগালিও দিয়েছিল। পরিণাম এই। ওখানে কেউ আঁতকে ওঠে না এসব গল্প শুনে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিবাদলিপিও পাঠায় না।

লিপি বলতে মনে পড়ল এক লিপির কথা। আর আমাদের গোয়াবাগানের তালেবর দুই ভাইয়ের কথা।

বড় ভাই ছিল নামকরা ওম্যানাইজার। যুবতী, সুন্দরী মেয়ে দেখলেই সেক্স করার জন্যে তার ইয়ে চুলকোত। হ্যান্ডসাম ছেলে, আর খুব ঝকমকে পোশাক পরে দাড়িটাড়ি শেভ করে হাতে দামি ঘড়ি পরে দাঁড়িয়ে থাকত রাস্তার মোড়ে, আর সুবিধে পেলেই মেয়েদের হাত করার চেষ্টা করত। কত মেয়ে যে ওর প্রেমের অভিনয়ের শিকার হয়েছে, বলে শেষ করা যাবে না। সেই শরদিন্দুর গল্পের সত্যকামের মত। ওখানে মেয়েরা এখন বোধহয় অত সরল প্রকৃতির আর নেই। রুক্ষ, কঠোর বাস্তবের ঘা খেয়ে খেয়ে এখন তারাও কঠিন হয়ে গেছে, আর ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আরো রুখে দাঁড়াতে হবে। কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখন মেয়েরা আমাদের কলকাতা শহরে অনেক বেশি কোমলহৃদয় ছিল। টপ করে সুন্দর, ম্যানলি চেহারার ছেলেদের প্রেমে পড়ে যেত, আর তারপর ভীষণ আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত হত। আর কাঁদত।

 নিরীহ মেয়েদের ওপর অত্যাচার যে কোনো পুরুষশাসিত দেশের এক প্রায় সর্বজনগ্রাহ্য প্রথা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশে পাকিস্তান ও মার্কিন সেনার প্রত্যক্ষ সমর্থনে লক্ষ নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন হয়েছে। আমরা কলকাতায় তার কিছু কিছু উদাহরণ দেখেছি। - লেখক
নিরীহ মেয়েদের ওপর অত্যাচার যে কোনো পুরুষশাসিত দেশের এক প্রায় সর্বজনগ্রাহ্য প্রথা। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাংলাদেশে পাকিস্তান ও মার্কিন সেনার প্রত্যক্ষ সমর্থনে লক্ষ নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতন হয়েছে। আমরা কলকাতায় তার কিছু কিছু উদাহরণ দেখেছি। – লেখক

আজও কাঁদে, কিন্তু সংখ্যাটা মনে হয় একটু কমে এসেছে। কিন্তু জেন্ডার ইকুয়ালিটির অতি আদিম অবস্থা। কোনো স্বাভাবিক, সামাজিক সম্পর্কই নেই যেখানে, সেখানে আর কী হবে?

মেয়েরা ওখানে ভোগের বস্তু। তারা মন না, তারা শরীর। সেক্স এডুকেশন: জিরো। শূন্য। বর্বরতা, লালসা, লোভ। যৌন বিকৃতি। হিংসা। রেপ কালচার।

এখন, এই কনিষ্ঠ ভ্রাতাটি বোধহয় তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার একচেটিয়া যৌন আধিপত্য আর সহ্য করতে পারছিল না। সে ভাবলো, তাকেও কিছু একটা করে তাক লাগিয়ে দিতে হবে এই ফ্রন্টে। সে আবার ছিল সেই আর এস এসের একনিষ্ঠ সেবক। স্বয়ং সেবক। একদিন, শাখা শেষ হয়ে যাবার পর কনিষ্ঠ সেবকটি আমাকে বলল, “পার্থ, থাক আজকে আমার সঙ্গে একটু। তোকে একটা মেয়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব।”

আমি তো অবাক! মেয়ে? মানে, সত্যি মেয়ে? রক্ত মাংসের নারী? মানবী?

কনিষ্ঠ বলল, “ওকে বলেছি তোর কথা। দেখবি কী দেখতে! পাগলা করে দেবে।”

আমি বললাম, “যাঃ, বাতেলা ঝাড়িস না। আমি চললাম। অনেক পড়া আছে।” স্পষ্টতই আমি কনিষ্ঠকে বিশ্বাস করি নি। আমার কথা কেনই বা কোনো মেয়েকে বলতে যাবে, আর তাতে আমার ভূমিকাটাই বা কী?

কনিষ্ঠ বলল, “দাঁড়া না একটু। একটু পরেই আসবে।”

তখন বোধহয় একটু একটু ঠাণ্ডা পড়েছে। পূজোর পর। বোধহয় নভেম্বর মাস। অ্যানুয়াল পরীক্ষার আর বেশি দেরি নেই। আমি যদ্দূর মনে পড়ছে, তখন ক্লাস টেনে পড়ি। বীরপুঙ্গব আমার থেকে এক বছরের বড়।

গোয়াবাগান পার্ক তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে। উঁচু উঁচু বাতিগুলো কোনকালেই জ্বলে না ঠিকমত। জ্বললেও তাতে আলোর থেকে অন্ধকার ছড়ায় বেশি। মনে হয়, শীত পড়ে যাচ্ছে বলে পার্কের সেই গণ প্রেমিক প্রেমিকারাও আসে নি।

একটু পরে দেখি আরে একী রে, সত্যি সত্যি একটা মেয়ে লোহার ঘোরানো গেট দিয়ে ঢুকে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে আমাদের কাছে হেঁটে এলো।  তারপর, কনিষ্ঠের দিকে তাকিয়ে হাসলো। ওঃ, কী ভেরি বিউটিফুল মেয়েটা। আমি তো কখনো এত কাছ থেকে যুবতী মেয়ে দেখিই নি। আমি মুগ্ধ। এত মুগ্ধ-যে ভালো করে তাকাতেও পারছিলাম না ওর দিকে।

কিন্তু, কনিষ্ঠর কোনো লাজলজ্জা নেই। ঠোঁটকাটা স্পষ্টবাদী। আমাকে বলল, “এর নাম লিপি। তোকে কী বলেছিলাম? ভালো না?”

আমি বললাম, “কী ভালো?” আমি কখনো এসব কথা কোনো মেয়ের সামনে বলি নি।

কনিষ্ঠ বলল, “কী ভালো? বাল, বোঝো না কিছু?”

এবার লিপি আর হাসলো না। আমিও না।

লিপি বলল, “আমি যাচ্ছি।” ওর মুখ শুকিয়ে গেছে।

আমি বললাম, “কনিষ্ঠ, কী হচ্ছে কী?” ধমক দিলাম ওকে একটা। ভাবলাম, আর এস এসের ছেলে। আমি পাণ্ডা। ও আমার কথা একটু শুনবে। হায়, আমি জীবন সম্বন্ধে, আসল জীবন সম্বন্ধে, কিছুই জানতাম না তখন।

কনিষ্ঠ লিপিকে হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে এলো। লিপি হাত ছাড়াবার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলো। ওর দ্রুত নিঃশ্বাস পড়ছে। ভয় পাচ্ছে ও।

আমি বললাম, “তুই কী করছিসটা কী? তুই তো একেবারে, মানে, বাজে হয়ে গেছিস। ছিঃ! আমি চললাম।”

কনিষ্ঠ এবার লিপিকে নিজের গায়ের সঙ্গে চেপে ধরে আমাকে বলল, “করতে ইচ্ছে করে না? কী জিনিস দেখেছিস? এই দেখ।”

এই বলে কনিষ্ঠ লিপির জামার ভেতর হাত ঢুকিয়ে ওর স্তন জোর করে চেপে দিল। আর মুখে মুখ দিয়ে চুমু খেল জোর করে। আমি ভয়ে ফ্রোজেন হয়ে গেলাম প্রায়। এসব আমি জীবনে কখনো দেখি নি। কল্পনাও করি নি।  এত দ্রুত সব কিছু ঘটে যাচ্ছে। আমার মুখ গরম হয়ে যাচ্ছে। আমার পা একটু একটু কাঁপছে।

লিপি এবারে কাঁদতে লাগলো। “আমাকে ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও। আমার সঙ্গে আর কখনো কথা বলতে আসবে না। কোনদিন না।” লিপি কনিষ্ঠর হাত শেষ চেষ্টা করে ছাড়িয়ে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে পালিয়ে গেল। আমি দেখলাম, সেই ঘোরানো গেটটা দিয়ে মেয়েটা মুখ নিচু করে চলে যাচ্ছে।

কনিষ্ঠর বীরত্ব দেখানো শেষ হয়ে গেছিল। ও আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো।

“সব ঠিক আছে। কাল আবার আসবে দেখবি। মনে মনে সব চায়। মুখে ওসব বলে শুধু।”

কিন্তু আমি উত্তর দিই নি। লজ্জায়, রাগে, দুঃখে আমার মনটা একেবারে ভীষণ আক্রান্ত হয়ে গিয়েছিল। লিপির কষ্ট যেন আমারি কষ্ট।  লিপি যেন আমারি বোন।  আমারি বন্ধু। ওর কান্না যেন আমারি কান্না। অথচ আমি তার আগে কখনো কোনো মেয়েকে এভাবে আক্রান্ত হতে দেখি নি। কাঁদতে দেখি নি লজ্জায়, অপমানে।

আমার আর একটা-দুটো খেলার মেয়ে বান্ধবী ছিল দু এক বছর আগে। বান্ধবী নয়, খেলার সাথী ছোটবেলায়। শিউলি, কুহু এরা সব। আমি ওদের সঙ্গে আর কুহুর দাদা প্রদীপ ব্রহ্মর সঙ্গে সিক্স সেভেনে পড়ার সময়ে লুকোচুরি খেলতাম। আমাদেরই পাড়ায়। শিউলিকে আমার খুব ভালো লাগতো। আর সুব্রতর ভালো লাগত কুহুকে। কিন্তু ওর সাহস ছিল না কুহুর সঙ্গে কথা বলবার। আমি কিন্তু ওদের সঙ্গে কথাও বলতাম, আর শিউলিকে মনে মনে ভালবাসতাম। যাকে বলে, এঁচড়ে পাকা ছিলাম। ওখানে যেমন হয় আর কি। লুকোচুরি খেলতে গিয়ে  শিউলির হাতে হাত ঠেকেছে কতবার, আর কী অদ্ভুত রোমাঞ্চ হয়েছে।

কিন্তু কই, আমি তো কখনো ওদের নিয়ে কোনো খারাপ কথা চিন্তা করি নি। ছিঃ, আমি তো কখনো করি নি!

লিপি। নয়তো অন্য কোনো মেয়ে। আমাকে ক্ষমা করে দিও।  - লেখক
লিপি। নয়তো অন্য কোনো মেয়ে। আমাকে ক্ষমা করে দিও। – লেখক

লিপির দুঃখে, লিপির চোখের ভাষায় আমি তীব্র তিরস্কার দেখতে পেয়েছিলাম। ও আমার দিকে একবার তাকিয়েছিল জলভরা চোখে। সে দৃষ্টিতে অবিশ্বাস দেখেছিলাম। লিপি যেন বলছিল, “এই তুমি পার্থ? এই তোমার কথা আমি এত শুনেছিলাম এই বাজে ছেলেটার কাছে? আসলে তুমি এই?”

বাড়ি ফিরে এসে সেদিন কী করেছিলাম, মনে নেই। আমাদের বাড়িতে ঠিক সেই খোলামেলা ব্যাপারটা কখনো ছিল না—যে মাকে এসব কথা বলব। অথচ, বললে কত ভালো হত। দাদাও ছিল না, দিদিও না। সবসময়ে ভাবতাম, বাবা জানতে পারলে কী করবে? পিটিয়ে তক্তা করে দেবে নিশ্চয়ই। একবার বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে গেছিল দু এক বছর আগে। সেদিন রাত্তিরে আমি বাবার এক বড়লোক দিদি আলোপিসির সঙ্গে একা একা কাশী যাব। ওরা আমার জন্যে এসে বসে আছে বাড়িতে, আর আমি ভুলেই গেছি। ফুটবল খেলতে খেলতে অনেক দেরি হয়ে গেছিল। বড়লোক বোনের কাছে প্রেস্টিজ পাংচার। বাবা রাগ সামলাতে না পেরে দরজায় খিল দিয়ে আমাকে ছাতার লাঠি দিয়ে নির্মম প্রহার করেছিল। সেই একবারই যদিও। কিন্তু সেই থেকে বাবার সম্পর্কে একটা ভয় মনের মধ্যে ঢুকে গেছে। এসব কথা জানতে পারলে বাবা রাগে দিশেহারা হয়ে যাবে নিশ্চয়ই। রাগী, রুক্ষ মানুষ।

তাই কারুকে কিছুই বলি নি।  একা একা কেঁদেছি লিপির কথা ভেবে, ওর অসহায়, লাঞ্ছিত মুখটার কথা ভেবে। ওর জলভরা চোখদুটোর কথা ভেবে।

লিপির সঙ্গে আমার আর কখনো দেখা হয় নি।  হলেও সামনাসামনি ক্ষমা চাইবার সাহস বোধহয় হত না আমার। কী বলতাম? বলার কোনো ভাষা আমার ছিল না।

***

স্কটিশের এক জল্লাদ আমাকে ধরে একবার পিটিয়ে বাপের নাম ভুলিয়ে দিয়েছিল। কোনো তেমন কারণই ছিল না।  একটা লোক ছিল, কিছুই পড়াত না। ড্রিল মাস্টার ছিল। ক্লাসে বসে বসে নিজের পরীক্ষার খাতা দেখত দিনের পর দিন। আর মাঝে মাঝে ঘোলাটে চশমার ভেতর থেকে চোখ তুলে বলত, “সাইলেন্স, সাইলেন্স।” আমরা সব কাটাকুটি, বুক ক্রিকেট এইসব খেলতাম বসে বসে। আমাদের স্কুলের অন্ধকার দিকটা। এখানে শ্যামাদাস মুখার্জী, বিজয় চন্দ, স্বর্ণেন্দু দেউড়ি, বিজন গোস্বামী বা সমর কবিরাজের প্রবেশাধিকার নেই।

বিরক্ত লাগত। একী রে, দিনের পর দিন কিছুই পড়ায় না, কথাও বলে না একটাও। ক্লাস শেষের ঘণ্টা বাজলে উঠে চলে যায় খাতাপত্র নিয়ে!

তা, একদিন এক বন্ধু বলে উঠলো জোরে জোরে, “কীসের খাতা?” আমি থাকতে না পেরে বলে ফেললাম, “ড্রিলের খাতা।” ব্যাস, এই। মায়ের নাম নিয়ে শপথ, আমি আর কিচ্ছু বলি নি।

বেধড়ক প্যাঁদানি খেলাম সেদিন সেই “অপরাধের” জন্যে।  তারপর, বাকি পিরিয়ডটা নীল ডাউন করে রেখে দিল ক্লাসের বাইরে। আমার পিঠ সোজা করতে পারছিলাম না যন্ত্রণায়।  কিন্তু আমি কাঁদি নি, বা হাতে পায়েও ধরি নি। মার খেয়েছি নিঃশব্দে।

স্কটিশ চার্চ স্কুলের ক্লাসরুম ও ভেতরের বারান্দা। এই বারান্দাতেই এক কোণে নীল ডাউন করে রেখেছিল সেই জল্লাদ। আমি ভুলি নি। কিন্তু ক্ষমা করে দিয়েছি ওদের সবাইকে।  - লেখক
স্কটিশ চার্চ স্কুলের ক্লাসরুম ও ভেতরের বারান্দা। এই বারান্দাতেই এক কোণে নীল ডাউন করে রেখেছিল সেই জল্লাদ। আমি ভুলি নি। কিন্তু ক্ষমা করে দিয়েছি ওদের সবাইকে। – লেখক

আমাদের ওখানে এসব হয়। মরে যাই নি, বা অজ্ঞান হয়ে যাই নি, এই ঢের।  আমাদের সুন্দরবন কলেজের গ্রামে একটা স্কুলের মাস্টার, ইয়াকুব না কী যেন নাম ছিল তার, সে একবার একটা ছেলেকে এমন পিটিয়েছিল-যে ছেলেটা মুখে রক্ত তুলে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল।  প্রায় যায় যায় অবস্থা।  সেই নিয়ে কী হইচই গ্রামে!

আমাকে নিয়ে কোনো হইচই হয় নি।  আমার সমস্ত বন্ধুরা, যাদের সঙ্গে ক্লাস ওয়ান থেকে বড় হয়েছি, তারা সব বসে বসে দেখল আমার ওপর আবু গরিবের নৃশংস নির্যাতন। কেউ একটা কথাও বলল না।  এই হলো আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা। ছেলেদের সৎসাহস নেই, ঋজু মেরুদণ্ড নেই। অন্যায়ের প্রতিবাদের শিক্ষা নেই। আমি একেবারে শিওর, আমি না হয়ে অন্য কোনো ছেলেকে যদি সে জল্লাদ এই অত্যাচার করত, আমি তার প্রতিবাদ করতাম। করতাম। হয়ত আমার আর এস এস বাবা সে-শিক্ষা আমাকে দিয়েছিল।

বাড়ি ফিরে এলাম সারা গায়ে অসহ্য ব্যথা নিয়ে ছুটির পর। খানিকক্ষণ লুকিয়ে থাকলাম।  তারপর মার কাছে ধরা পড়ে গেলাম।  সেদিন আবার আমাদের বাড়িতে একটা অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠান। আমার এক কাকার ছেলের অন্নপ্রাশন। লোকজন এসেছে। তার মধ্যে আমার কী দুর্গতি! সবাই দেখে শিউরে উঠলো।

বাবাকে মা ইস্কুলে যেতে দেয় নি।  বাবা ফেটে পড়ত রাগে। একটা কাণ্ড হত।  তাই মা নিজে পরের দিন আমার হাত ধরে হেডমাস্টার এ আর রায়ের কাছে নিয়ে গেল। যা কখনো ঘটে নি। বিরলতম ঘটনা।

এ আর রায় আমাকে ভালো ছাত্র হিসেবে চিনতেন।  তাঁর ভাই এ বি রায় আমাকে স্কলারশিপের টাকা দিতেন ছোটবাড়িতে।

কোনো ব্যবস্থা উনি নিয়েছিলেন কিনা, আমার জানা নেই। জানা হয় নি।  আমাকে কেউ বলে নি কখনো। কিন্তু ওই যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্যে গিয়েছিলাম মায়ের হাত ধরে, তাতেই আমার মরাল ভিকট্রি হয়েছিল। নৈতিক বিজয়। তার ফলে, গায়ের ব্যথা সারতে সময় লেগেছিল, কিন্তু মনের ব্যথা সেরে গেছিল তাড়াতাড়ি। আমি বন্ধুদের বলেছিলাম আমার মা আমাকে নিয়ে হেডস্যারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল।

এ-ঘটনার পর আমি একরকম হিরোই হয়ে গেলাম।  ওই যে বললাম, কাঁদি নি, বা ক্ষমা চাই নি।

কেন কাঁদব? কেন ক্ষমা চাইব? ক্ষমা চাইবে ওরা—ওই জল্লাদেরা।

এই আমাদের কলকাতার আবু গরিবের গল্প।

যে গল্প কখনো ইতিহাস বইতে লেখা হবে না।

(কিস্তি ২০)

Tags from the story
More from পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘটিকাহিনী (১৪)

বাজার করাটা তাদের কাছে ছিল যেন একটা পরম আনন্দের বিষয়। একটা যেন...
Read More