ঘটিকাহিনী (২১)

"মসীত খাঁ ছিলেন আমার গুরু কেরামত সাহেবের বাবা, বুঝলে?" মাষ্টারমশাই একদিন বললেন। "তখনকার দিনে তবলা শেখা আর এখনকার তবলা শেখা, বুঝলে পার্থ, আকাশ আর পাতাল।"

(আগের পর্ব)

আরশিনগরের মাষ্টারমশাই

মাষ্টারমশাই থাকতেন একটা লন্ড্রির দোকানে। আমাদের বাড়ির কাছেই হাঁটাপথে হরি ঘোষ স্ট্রিট বলে একটা সরু রাস্তা ছিল। হেদুয়া পার্ক বা হেদোর পাশে বিডন স্ট্রিট দিয়ে গেলেই ট্রামের বড় রাস্তা বিধান সরণি, বা আগে যাকে বলত কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, পার হওয়া যায়। উল্টোদিকে বেথুন কলেজের বিরাট বাড়ি। তার একদিকে একটা পাউরুটি বিস্কুট আর চায়ের দোকান, আর পাশ দিয়ে চলে গেছে সরু গলি হরি ঘোষ স্ট্রিট। বিডন স্ট্রিট থেকে ডানদিকে ঢুকলেই একটা টিউবওয়েল, আর তার ঠিক উল্টোদিকের বাড়িটার একতলায় একটা পুরোনো সাইনবোর্ড ঝোলানো লন্ড্রির দোকান। প্যান্ট, শার্ট, শাড়ি এসব কাচা আর ইস্ত্রি করা হয়। ভেতরে টিম টিম করে একটা চল্লিশ পাওয়ারের বাল্ব জ্বলে, আর পুরু কাচের চশমা পরা একজন আধবুড়ো লোক একটা ধুলোয় ধূসরিত ডেস্কের ওপারে দাঁড়িয়ে লোকেদের অর্ডার নেয়। ক্যাশ মেমো কেটে দেয়।

parthab logo

সাইনবোর্ডে একসময়ে হয়ত লালের ওপর সাদা দিয়ে লন্ড্রির নাম আর ঠিকানা লেখা ছিল, কিন্তু এখন ভালো করে কিছু পড়া যায় না। পড়ার দরকারও নেই, কারণ ওই পাড়ায় নাম-টাম পড়ে কেউ শাড়ি কাচতে দিতে আসে না। এমনিই আসে। ওখানে যারা থাকে, তাদের ক্ষমতা নেই ব্যান্ড বক্স বা ওই রকম কোনো বড় দোকানে জামাকাপড় কাচতে দেবার। ওরা ওখানেই আসে। বেশির ভাগ লোক যারা ওসব পাড়ায় থাকে, তারা লন্ড্রিতে আসেও না। হয়ত ওখানকার একশো জনের মধ্যে পাঁচ কি দশজনের সে আর্থিক আনুকূল্য আছে। বাকিরা সব বাড়িতেই জামাকাপড় কেচে ছাদে বা বারান্দায় শুকোতে দেয়। অবশ্য, ছাদে বা বারান্দায় রোদে জামাকাপড় শুকোতে দেওয়াই সবচেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি। কিন্তু আমরা সেসব তখন জানতাম না। মনে হত, আমরা তো কখনো লন্ড্রিতে প্যান্ট জামা দিতে পারি না! অথচ, ভারত বা বাংলাদেশের মত জায়গায় কী অকৃপণ সূর্যালোক। আমেরিকায় থাকতে থাকতে সূর্যের আলোর অভাবে আমাদের যখন বিষণ্নতা গ্রাস করে, আর শরীর ভালো রাখার জন্যে আলাদা করে ভিটামিন ডি ট্যাবলেট খেতে হয়, তখন দেশের উজ্জ্বল রোদের কথা ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। গ্রামের মানুষ কখনো লন্ড্রি দেখেই নি। ওদের কখনো দরকারও হয় না। ওদের ভিটামিন ডি ট্যাবলেটও কখনো খেতে হয় নি।

চাঁদের হাট। বিখ্যাত উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিল্পীদের এক দুর্লভ ছবি ১৯৪৮-এর কোনো এক সঙ্গীত সম্মেলনে।  - লেখক
চাঁদের হাট। বিখ্যাত উচ্চাঙ্গসঙ্গীত শিল্পীদের এক দুর্লভ ছবি ১৯৪৮-এর কোনো এক সঙ্গীত সম্মেলনে। – লেখক

আমাদের দৌড় ছিল উত্তর প্রদেশ থেকে আসা, এবং ফলত বাবার প্রিয়, শংকর ধোপার দোকান। আমাদের গোরাচাঁদে তিনের এ বাড়ির ঠিক সামনে ছিল শংকর ধোপার ছোট্ট একচিলতে দোকান। রকের ওপর একটা উনুন সব সময়ে জ্বলত, আর তাতে লোহার ইস্ত্রি বসানো থাকত গনগনে লাল আঁচে। মাঝে মাঝেই দেখতাম শংকর আর শংকরের বুড়ো বাবা মোটা একটা কাপড়ে জড়িয়ে একটা গরম ইস্ত্রি ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে, আর পুরনো ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়াটা উনুনের ওপর বসিয়ে দিচ্ছে।

আমাদের বাড়িতে বাবা নিজে নিজে জামাপ্যান্ট ইস্ত্রি করত, আর আমাকেও শিখিয়ে দিয়েছিল। আমাদের আর এস এসে যারা একটু সিজন্ড ছেলে ছিল, যারা বিশেষ করে সংঘের সব ক্যাম্পে ট্যামপে গেছে, তারা সব কাচাকুচি ইস্তিরি নিজেরাই করতে পারত। আমি যখন একাত্তরে বর্ধমানে আর এস এসের নির্বাচিত কর্মী হিসেবে খুব প্রেস্টিজের ও টি সি বা অফিসার্স ট্রেনিং ক্যাম্পে যাই, তখন আমি নিজের হাতে সমস্ত কাজ করতে শিখেছিলাম। ভাতের মাড় দিয়ে কীভাবে ইস্তিরি করতে হয়, তাও। কারণ, লক্ষ্যটা হলো, তিন বছরের এই বিশেষ ট্রেনিং সাঙ্গ করে খুব বিশেষভাবে নির্বাচিত কিছু ছেলে প্রচারক বা হোল টাইমার হয়ে একা একা বেরিয়ে পড়বে ভারতের কোণে কোণে। যেমন, বাবা প্রচারক ছিল উত্তরপ্রদেশের বালিয়া, মির্জাপুর আর ভাদোহী বলে জায়গায়। সেখানে তোমাকে দেখাশোনা করার কেউ নেই। তাই স্বয়ংসেবকদের স্বয়ংনির্ভর হওয়াটা খুব জরুরি। আমার বাবাও তাই করেছে, রান্নাবান্না সব বাবা নিজেই করতে পারত, আর আমাকেও সেদিকেই পাঠানো হচ্ছিল। আর দুটো বছর টিঁকে থাকতে পারলেই আমি আজকের অরুণ জেটলি, নরেন্দ্র মোদী বা নীতিন গড়করির সার্থক উত্তরসূরী হতে পারতাম। যাই হোক, সে অন্য গল্প।

যুগাবতার সঙ্গীতগুরু, সঙ্গীতসাধক আলাউদ্দিন খাঁ। পুত্র আলী আকবর আর পুত্রপ্রতিম রবিশংকরের সঙ্গে। বাঙালি জাতি হিসেবে গর্ববোধ করার আর একটা কারণ এই দেবপ্রতিম সুরসাধক। বিদেশের সঙ্গীতপিপাসু মানুষ যদি এঁর জীবনের কথা জানত। - লেখক
যুগাবতার সঙ্গীতগুরু, সঙ্গীতসাধক আলাউদ্দিন খাঁ। পুত্র আলী আকবর আর পুত্রপ্রতিম রবিশংকরের সঙ্গে। বাঙালি জাতি হিসেবে গর্ববোধ করার আর একটা কারণ এই দেবপ্রতিম সুরসাধক। বিদেশের সঙ্গীতপিপাসু মানুষ যদি এঁর জীবনের কথা জানত। – লেখক

হরি ঘোষ স্ট্রিটের লন্ড্রিতে একপাশে দু তিনটে লোহার স্ট্যান্ডে হ্যাঙ্গার থেকে কাচা আর ইস্ত্রি করা জামাকাপড় ঝোলানো থাকে, আর কিছু থাকে পিছনের দিকে একটা পুরনো স্লাইডিং কাচের দরজার পেছনে একটা কাঠের ক্যাবিনেটে। এই ক্যাবিনেট আর সামনের ডেস্কের মাঝখানে দু তিন ফুট বাই ছ সাত ফুট অতি অপ্রশস্ত একটা মেঝে, যেখানে দোকানের মালিক দাঁড়িয়ে অর্ডার নেন। সকাল দশটার সময়ে তিনি বাড়ি থেকে আসেন, সারাদিন দোকানে থাকেন, এবং সন্ধেবেলা সাতটা কি আটটার সময়ে আবার বাড়ি চলে যান। দুপুরবেলা তিনি একবার দরজা বন্ধ করে দু ঘণ্টার জন্যে বাড়ি যান ভাত খেতে ও একটু বিশ্রাম করতে। সেই সময়টা দোকানের সামনের রকে পাড়ার বেকার লোকেরা লুঙ্গি পরে বসে থাকে ও গজল্লা করে। বিড়ি খায়। হিন্দি সিনেমার গান গায়।

বেস্পতিবার লক্ষ্মীবার। সেদিন লন্ড্রি বন্ধ।

আমার তবলার মাষ্টারমশাই চিত্তবাবু—চিত্ত রায়—এই লন্ড্রিতেই থাকতেন। রাত্তিরে ওই মেঝেতে একটা মাদুর ও চাদর বিছিয়ে তিনি ঘুমোতেন। রাতে একরকম পাহারার কাজও তাঁর উপস্থিতিতে হয়ে যেত বলে তাঁর থাকবার ভাড়া লাগত না। যদিও পুরোনো লন্ড্রিতে ভয়াবহ সশস্ত্র ডাকাতি হয়েছে, এমন কখনো শোনা যায় নি। আর ডাকাতি হলেও আমার মাষ্টারমশাইয়ের যে স্বাস্থ্য, তাতে তাঁর পক্ষে সে ডাকাতি রোধ করা মোটেই সম্ভব নয়। মাষ্টারমশাই ডাকাতদের সঙ্গে লড়ছেন, এমন চিন্তা খুব ভীষণ সদাবিমর্ষ লোককেও অট্টহাস্য হাসিয়ে ছাড়বে।

মাষ্টারমশাই ছিলেন চিরদুঃখী এক মানুষ। কিন্তু তাঁকে কখনো দুঃখিত থাকতে দেখি নি।

চিত্তবাবু আসলে তবলা বাজাতেন আমার বোন বুবু যাঁর কাছে গান শিখতে শুরু করেছিল, সেই বন্দনা সেনগুপ্তর সঙ্গে। বন্দনাদির কাছে পরে আমিও বেশ কিছুদিন গান শিখেছি। অসাধারণ ভরাট কণ্ঠ, আর রবীন্দ্রসঙ্গীতের বাণীর গভীরতা বন্দনাদির গলায়। মায়া সেনের ছাত্রী ছিলেন বলে ওঁর গলায় মায়াদির একটা ছাপ ছিল। যেমন আজকের বিখ্যাত শিল্পী স্বাগতালক্ষ্মী, মায়াদির আরেক ছাত্রী। কিন্তু বন্দনাদি তেমন করে বাইরে কখনো গান গাইলেন না। জানি না কেন। বোধহয় বাড়িতে একটু রক্ষণশীলতা বেশি ছিল। নয়তো উনি নিজেই হয়ত খুব একটা চান নি বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গান টান গাইতে।

ওই হরি ঘোষ স্ট্রিটের থেকে এক মাইলের মধ্যেই ব্ল্যাকার্স স্কোয়ার বলে একটা পাড়ায় বন্দনাদির বাবা ডাক্তার সেনগুপ্তর দোতলা বারান্দা দেওয়া বাড়ি ছিল। আমি আমার বোনকে সেখানে নিয়ে যেতাম, এক দেড় ঘণ্টা এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতাম, বা কোনো বন্ধুর বাড়ি কাছাকাছি চলে যেতাম আড্ডা দিতে, তারপর আবার সন্ধেবেলা বুবুকে গিয়ে নিয়ে আসতাম। এই ছিল আমার একটা কাজ। সকালবেলা ওকে হোলি চাইল্ড স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আমি বিদ্যাসাগর কলেজে চলে যেতাম ক্লাস করতে, তারপর মা ওকে নিয়ে আসত ছুটির সময়ে। এই ছিল আমার আর একটা কাজ।

যাই হোক, বন্দনাদির বাড়ি প্রতি সপ্তাহে একবার দুবার যেতে যেতে ওদের সবার সঙ্গে আমার বেশ একটা হৃদ্যতা হয়ে গেল। আমার মার সঙ্গে বন্দনাদির মার বেশ আলাপ হয়ে গেল। এবার মা বোধহয় ওদের বলেছিল আমার তবলা শেখার ইচ্ছের কথা। আর বড় স্কুলে দেওয়ার আর্থিক সমস্যার কথা। সুতরাং, বন্দনাদি আর মাসীমা ব্যবস্থা করে দিলেন। এখন থেকে চিত্তবাবু আমাদের বাড়ি এসে আমাকে সপ্তাহে একঘণ্টা তবলা শেখাবেন। ওঃ, সে কী উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত! আমাদের বাড়ি তবলা-ডুগি আসবে, সেগুলো আবার দস্তুরমত শেখাও হবে!

একদিন সত্যি সত্যি গোয়াবাগানের তবলা হারমোনিয়ামের দোকান থেকে একজোড়া তবলা এসে হাজির হলো আমাদের বাড়ি। অবশ্য নেহাৎই গরিব লোকের তবলা। বাঁয়াটা মাটির। তাও, তবলা। মাষ্টারমশাই প্রথম দু এক দিনেই শিখিয়ে দিলেন তবলা থেকে আর বাঁয়া থেকে শব্দ কী করে তুলতে হয়। আঙুল দিয়ে চাঁটি মারলেই তবলা বোল তোলে না। একটা বিশেষ ওজনে আঙুল দিয়ে আঘাত করলেই তবলা বাজে। তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠর মাঝখানে একটা নির্দিষ্ট কোণ তৈরি হয়। বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ তবলায় কোনো কাজ করে না। শুধু ব্যালেন্স করে হাতটাকে। আমার মাষ্টারমশাই বাঁহাতি ছিলেন। উনি তবলা বাজাতেন বাঁহাতে, আর বাঁয়া ডানহাতে। আমি ছিলাম বেশির ভাগ লোকের মত। বাঁয়া বাজত বাঁ হাতে।

আমার মনে আছে, মাষ্টারমশাই মাসে পনেরো টাকা মাইনে নিতেন আমাকে শেখানোর জন্যে। আর একঘণ্টার বদলে দেড়ঘণ্টা দুঘণ্টা ধরে শেখাতেন। তার আর একটা কারণও ছিল অবশ্য। আমাদের বাড়িতে এলেই মাষ্টারমশাইয়ের সন্ধেবেলায় পেটে কিছু পড়ত। মা মাষ্টারমশাইকে না খাইয়ে ছাড়ত না। পরটা, আলুভাজা, একটা তরকারি। আর সঙ্গে চা দু বার।

এই চা-জলখাবার খাওয়ার সময়ে মাষ্টারমশাই অনেক সময়ে বসে বসে একটু পুরনো দিনের গল্প করতেন। সে সব গল্পের প্রায় একশো ভাগই সঙ্গীতজগতের গল্প। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম।

“মসীত খাঁ ছিলেন আমার গুরু কেরামত সাহেবের বাবা, বুঝলে?” মাষ্টারমশাই একদিন বললেন। “তখনকার দিনে তবলা শেখা আর এখনকার তবলা শেখা, বুঝলে পার্থ, আকাশ আর পাতাল।” কেরামত সাহেব মানে তবলার জাদুকর ওস্তাদ কেরামতুল্লা খাঁ।

আমি বলতাম, “কেন, মাষ্টারমশাই?”

তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। চোদ্দ বছর বয়েস আমার। স্কুলে পরীক্ষা টরীক্ষা সব বন্ধ নকশালদের তাণ্ডবে। তবলা শেখার আদর্শ সময়। মা জানত কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত না থাকলে আমি খারাপ পথে চলে যাব ওই বয়েসে। এমনিতেই কিছু বাজে ছেলের সঙ্গে মিশে উচ্ছন্নে যেতে বসেছিলাম।

মাষ্টারমশাই ঘষা ঘষা, খুব মোটা কাচের চশমার মধ্যে দিয়ে চোখ নামিয়ে একটু হাসলেন। মাষ্টারমশাই একরকম দেখতেই পেতেন না। আমার খাতায় লেখা তবলার বোল বা অন্যকিছু পড়তে হলে চশমা খুলে চোখের খুব কাছে নিয়ে এসে কষ্ট করে পড়তেন।

“কীভাবে শেখাতেন ছেলেকে জানো?”

আমি তখন নাইনে পড়ি। লীডার লীডার ভাব। সবজান্তা। মাষ্টারমশাইকে খুশি করার জন্যে বললাম, “খুব স্ট্রিক্ট ছিলেন মনে হয়।”

সদাহাস্যময় চিত্তবাবু শুনে খুব খুশি। চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, “ওঃ, স্ট্রিক্ট মানে স্ট্রিক্ট। মসীত খাঁ সাহেব করতেন কী, একটা মোমবাতি জ্বেলে তাতে ছুরি দিয়ে দুটো তিনটে দাগ কেটে দিতেন। তারপর ছেলেকে বলতেন, “ইস ওয়াক্ত ইয়ে বোল বাজাতে রহো, যব তক ইস ঘাট মে নেহি পহুছেগী মোম বাত্তি কী রোশনী, তব তক বাজাতে রহনা।” বলে একটা বোল ছেলেকে শিখিয়ে দিয়ে চলে যেতেন।

“যতক্ষণ না ওই মোমবাতির দাগ পর্যন্ত আলো নেমে এসে পৌঁছবে, ততক্ষণ একটানা ওইটাই বাজিয়ে যেতে হবে। নইলেই মার।”

আমি তো শুনে অবাক! ওঃ, আমার দ্বারা ওসব হবে টবে না। আমি দিনে কোনমতে আধঘণ্টা রেওয়াজ করি। তাও অনেক সময়ে হয়ে ওঠে না। হাজার কাজ, স্কুল, আড্ডা, ফুটবল, শাখা। এত সময় কোথায়?

মাষ্টারমশাইও দু মাসেই বুঝে গেছিলেন আমার দ্বারা কতটা কী হবে। তাও, যত্ন করে শেখাতেন। আর আমার সে বয়েসের উৎসাহ দিয়ে আমিও খুব তাড়াতাড়ি অনেক কিছু শিখে ফেলেছিলাম। টুকরা, মুখড়া, রেলা, কায়দা, গৎ। নানা রকম ঘরাণার নানা রকম বোল, আর সঙ্গতের ধরনধারণ। মাঝে মাঝে এদিক সেদিক দু চারটে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জলসায়ও গেছি। রবীন্দ্রসঙ্গীত আর আধুনিক বাংলা গানের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছিল। রেডিওতে সময় পেলেই শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুষ্ঠান শুনতাম। আমার সব থেকে প্রিয় শিল্পী ছিলেন বিসমিল্লা খাঁ, ভি জি যোগ, আলী আকবর, বাহাদুর খাঁ, রবিশঙ্কর, তিমিরবরণ। আর ভোকালে আমীর খাঁ আর পণ্ডিত যশরাজ। রাগপ্রধান গান শুনতাম জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী, পালুস্কর, ভীষ্মদেব। একবার একটা সারারাতের জলসা শুনতে গিয়ে সুনন্দা পটনায়েকের গান শুনেছিলাম। খুব ভালো লেগেছিল। জয়া বিশ্বাসের আর কল্যাণী রায়ের বাজনা। ভীষণ ভালো লাগত। রেডিওতে ফিলার মিউজিক দিত ভি বালসারার ঐশ্বরিক অর্কেস্ট্রা। শিশিরকণা ধরচৌধুরীর বেহালা। জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ। বেগম আখতার ও তাঁর ‘জোছনা করেছে আড়ি’, বা ‘কোয়েলিয়া গান থামা এবার’।

কিছু একটা শুনলেই সারাদিন ধরে তার সুর আর কথা মনের মধ্যে অনুরণনিত হতে থাকত। সারাদিন ধরে গাইতাম। বন্ধুমহলে গাইতাম।

কেরামত সাহেবদের নিজেদের রামপুর ঘরাণা। তারপর আগ্রা, দিল্লি, গোয়ালিয়র, বেনারস ঘরাণা। পরে জেনেছি আমাদের বাংলাদেশের বিষ্ণুপুর ঘরাণার কথা, আর গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় আর কৃষ্ণধন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত অসামান্য প্রতিভাধর সঙ্গীতবিদদের কথা। বেনারস ঘরাণার বিখ্যাত শিল্পী শান্তাপ্রসাদ। বাবা খুব পছন্দ করত শান্তাপ্রসাদের তবলা, আর আগ্রার ফৈয়াজ খাঁর শিষ্যা বাঙালি গায়িকা দীপালি নাগের গান। আবার ওদিকে লাহোর বা পুণে ঘরাণা। এই সব কথা বলতে বলতে নানারকম রাগ রাগিণীর কথা, নানা যুগান্তকারী শিল্পীর কথা। ভৈরবী আর রামকেলি। পূরবী আর বেহাগ। কাফী, খাম্বাজ আর হংসধ্বনি। বড়ে গোলাম আলি আর আব্দুল করিম খাঁ। হাফিজ খাঁ আর বিলায়েত ইমরাত। নিখিল ব্যানার্জী আর মালবিকা কানন।

আলী আকবর খাঁ সাহেবের সঙ্গে কেরামত সাহেব ভারতের বিভিন্ন জায়গায় মিউজিক কনফারেন্স করে করে বেড়াচ্ছেন। আর, একবার তাতে সঙ্গী হয়েছিলেন আমার মাষ্টারমশাই। সে গল্প বলতে বলতে অখ্যাত তবলাবাদক, অজানা শিক্ষক চিত্ত রায়ের চোখদুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

“সারারাত, বুঝলেন মা।” আমার ছোট ঘরে মাদুরে বসে বসে ওদিকে রান্নাঘরে মার উদ্দেশে বলছেন মাষ্টারমশাই।

“আমি তো গেছি আমার গুরু কেরামত সাহেবের সঙ্গে ফ্রিতে। আমাকে নিয়ে গেছেন খাঁ সাহেব। আমি খাই দাই আর বাজনা শুনি। জিনিসপত্তর বয়ে নিয়ে যাই এ হোটেল থেকে সে হোটেল, এর বাড়ি থেকে তার বাড়ি। দু মাস তিন মাস এই ভাবে থাকা।” মাষ্টারমশাই একটু হাসলেন। আর এক কাপ চা এসেছিল।

“একদিন রাত্তিরবেলা আলী আকবর সাহেব বললেন আমার ওস্তাদকে, “আজ মুঝে মালকৌস মালকৌস লাগতা, খাঁ সাব। আপ কেয়া বাজায়েন্গে? বুঝলে, পার্থ?”

আমি তো বসেই আছি শোনবার জন্যে। মাও ওদিকে বসে বসে হাসিমুখে শুনছে। আর রুটি বেলছে।

“সারা রাত ধরে দুজনে বাজাচ্ছে, বুঝলে? ঘণ্টার পর ঘণ্টা। দুই ওস্তাদ। নিজের ঘরে বসে। অন্ধকারে। ভোরবেলা ছটা পর্যন্ত রেওয়াজ করলো দুজনে। আমি পাশের ঘরে শুয়ে শুয়ে শুনছি। ঘুম কোথায় চলে গেছে!”

আমি ক্লাস নাইনের পাকা ছেলে। বললাম, “কী অদ্ভুত অভিজ্ঞতা, মাষ্টারমশাই!”

মাষ্টারমশাই চুপ করে থাকলেন। আমার বাচালতার জবাব দেবার প্রয়োজন মনে করলেন না। মাও ওদিকে চুপ করে আছে সে গল্প শুনে।

দু আড়াই বছর তবলা শিখেছিলাম চিত্তবাবুর কাছে। ইম্প্রেস্ড হয়ে একবার ট্রামে করে মাষ্টারমশাই নিয়ে গেলেন কেরামত সাহেবের বাড়ি ওয়েলিংটন স্কোয়ার ছাড়িয়ে ওদিকে রফি আহমেদ কিদোয়াই রোডে। আগেই বলে রেখেছিলেন বোধহয় আমার কথা।

কেরামত সাহেবের বাড়ি। একতলায় সামনের দিকে অন্ধকার অন্ধকার একটা বড় ঘর। তার পাশে রান্নাঘর থেকে মুরগির মাংস রান্নার সুবাস ভেসে আসছে। বাড়ির মেয়েরা সব বসে আছে। আমি অল্পবয়েসী ছেলে, আমাকে দেখে দু একজন হাসলো। এর আগে আমি কখনো কোনো মুসলমানের বাড়ির ভেতরে আসি নি। বাবা কিছু বলে নি। জানি না জানত কিনা। বোধহয় জানত। কিন্তু কিছু বলে নি। আমার সঙ্গীতের প্রতি ছেলেবেলা থেকে যে-আকর্ষণ ছিল, তা বাবার নজর এড়ানোর কোনো সম্ভাবনাই ছিল না। মাও বাবাকে বলেই তবলা শেখানোর ব্যবস্থা করেছিল। নইলে মাসে মাসে পনের টাকাই-বা মা কোথা থেকে দেবে?

একটি দুষ্প্রাপ্য ছবি। এখানে দূরে বসে আছেন ওস্তাদ কেরামতউল্লা খাঁ, মাঝখানে বোধহয় তাঁর বাবা মসীত খাঁ, সামনে তবলা বাজাচ্ছে পরবর্তীকালের স্বনামধন্য শিল্পী শঙ্খ চট্টোপাধ্যায়। - লেখক
একটি দুষ্প্রাপ্য ছবি। এখানে দূরে বসে আছেন ওস্তাদ কেরামতউল্লা খাঁ, মাঝখানে বোধহয় তাঁর বাবা মসীত খাঁ, সামনে তবলা বাজাচ্ছে পরবর্তীকালের স্বনামধন্য শিল্পী শঙ্খ চট্টোপাধ্যায়। – লেখক

ভেতরে পিছনের দিকে একটা ঘরে একটা চাদর পাতা চৌকির ওপর বসে আছেন কেরামত সাহেব। একটা বাচ্চা ছেলে, আমার থেকেও ছোট, বাজাচ্ছে তাঁর সামনে বসে। কী হাত! দারুণ হাত। আরো সব দু চারজন বসে আছে এদিক ওদিক।

আমি খাঁ সাহেবের বাজনা শুনেছি আগে একটা দুটো অনুষ্ঠানে। মহাপুরুষ মিশ্র, কেরামতউল্লা খাঁ। আমাদের পাড়ার কালিপুজোর পরে হোল নাইট ক্লাসিকাল প্রোগ্রামে শ্যামল বোস। কিন্তু কেরামতউল্লা খাঁর তবলা শুনলে সেই যেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার মত মনের অবস্থা হয়। কেমন যেন একটা স্বপ্নের মত। এখনকার দিনে হলে বলতাম, ট্র্যান্স। তখন ওসব কথা জানতাম না।

মীরা বন্দ্যোপাধ্যায়
মীরা বন্দ্যোপাধ্যায়

অনেককাল পরে একটা পুরনো অনুষ্ঠান দেখেছিলাম ইউটিউবে। মীরা বন্দ্যোপাধ্যায় গান গাইছেন, আর কেরামত সাহেব বাজাচ্ছেন। মীরা বন্দ্যোপাধ্যায় ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলী খাঁর বিখ্যাত ছাত্রী। তপন সিংহের অতিথি সিনেমায় গান গেয়ে আরো বিখ্যাত হয়েছেন। “আন বান জিয়া মে লাগি।”একটু পরে মীরা বন্দ্যোপাধ্যায় গান না গেয়ে চুপ করে বসে বসে অবাক বিস্ময়ে হাসিমুখে তাকিয়ে আছেন কেরামত সাহেবের দিকে। ওস্তাদজি চোখ বন্ধ করে তবলা বাজাচ্ছেন। যেন একটা ঈশ্বরদর্শন। ট্র্যান্স।

সেই কেরামতউল্লা খাঁ। মাষ্টারমশাই গিয়েই কেরামত সাহেবকে একটা প্রণাম করলেন পা ছুয়ে। দেখাদেখি আমিও করলাম।

আজ আর মনে নেই কী বলেছিলেন আমাকে দু চারটে কথা। মাষ্টারমশাই আমাকে নিয়ে গেছিলেন অনেক আশা করে, আমার তবলা বাজানো শুনে যদি ওস্তাদজি আমাকে সাগরেদ করেন। শেখান। কিন্তু আমি খুব নার্ভাস হয়ে গেছিলাম। ভালো বাজাতে পারি নি। ওস্তাদজি বলেছিলেন, আরো সময় লাগবে। আমার হাত এখনো তৈরি নয়।

আবার ট্রামে করে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।

মীরা বন্দ্যোপাধ্যায় আরো বিখ্যাত হয়েছিলেন তপন সিংহর ছবি রবীন্দ্রনাথের 'অতিথি'তে গান গেয়ে। রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে এমন অবিস্মরণীয় ছবি বেশি হয়েছে বলে মনে হয় না। - লেখক
মীরা বন্দ্যোপাধ্যায় আরো বিখ্যাত হয়েছিলেন তপন সিংহর ছবি রবীন্দ্রনাথের ‘অতিথি’তে গান গেয়ে। রবীন্দ্রনাথের গল্প নিয়ে এমন অবিস্মরণীয় ছবি বেশি হয়েছে বলে মনে হয় না। – লেখক

আমাকে শেখানো হয়ে গেলে মাষ্টারমশাই বোধহয় আরো কারুকে শেখাতে যেতেন। আমি এক এক সময়ে ভাবি এখন। মাসে পনের টাকায় যদি আমাকে শেখান, আর আমার মত দশ জনকেও শেখান ঘুরে ঘুরে, তাহলে মাসে ওঁর আয় একশ পঞ্চাশ টাকা। আর বন্দনাদির গানের রেওয়াজের সঙ্গে সঙ্গত করার জন্যে হয়ত একটু বেশি পান। ধরা যাক পঞ্চাশ টাকা সে-সময়ে। তাহলে সব মিলিয়ে দুশ টাকা ওঁর উপার্জন। লন্ড্রিতে থাকেন, হয়ত ভাড়া লাগে না। তাও দুশ টাকায় একজনের-কি চলে? কী খান উনি? কোথায় খান? দুপুরবেলা কী খান? রাত্তিরে কী খান?

তখন মনে হত, মাষ্টারমশাইয়ের মত এত গুণী একজন শিল্পী। কেরামত খাঁর শিষ্য। তিনি এরকম করে জীবনটা কাটালেন? কিছু করতে পারলেন না? স্কুল? কিছু একটা? এত কষ্ট হত দেখে—আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে চিত্তবাবু একটা সিগারেট ধরাতেন, আর মধ্যমা আর অনামিকার মাঝখানে চেপে ধরে টান দিতেন। একটা পাও ওঁর একটু খোঁড়া ছিল, আসতে আসতে মাথাটা একদিকে ঝুঁকিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে যেতেন। সেই একটা মোটা সূতোর পাঞ্জাবি গায়ে, আর পাজামা। পায়ে একটা ছেঁড়ামত চটি। কোথায় যেতেন, কে জানে!

একদিন আমি কী একটা দরকারে মাষ্টারমশাইয়ের লন্ড্রিতে গিয়েছিলাম ভোরবেলা। আমি তখন আর ওঁর কাছে শিখি না। সময়ও নেই, আর তাছাড়া, আমি তখন তবলা থেকে গানে মন দিয়েছি, আর বন্দনাদির কাছে গিয়ে গান শিখি সঙ্গীত প্রভাকর পরীক্ষা দেব বলে। বুবুর গানের সঙ্গে উনি তখন বাজান বাড়ি এসে। আমাকে উনি একটা টিউশনি যোগাড় করে দিয়েছিলেন। সেই টিউশনি আমি করতে যেতাম কলেজে চাকরি পাবার বোধহয় ঠিক আগে আগে। নিমতলা স্ট্রিটে একটা বাচ্চা ছেলেকে অঙ্ক করাতাম, আর ছেলেটার মা আমাকে খুব ভালো ভালো রান্না করে খাওয়াতেন। একবার পটলের মধ্যে ক্ষীরের পুর দিয়ে একটা রান্না করেছিলেন। খুব ভালো ফ্যামিলি ছিল একটা। আমি চাকরি পাবার খবর পাবার পর যখন ওঁদের বললাম আমি আর পড়াতে পারব না, খুব দুঃখ পেয়েছিলেন ওঁরা। সেই ব্যাপারেই বোধহয় আমি মাষ্টারমশাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করতে গেছিলাম। জানতাম, একটু পরে লন্ড্রি খুলে যাবার আগেই উনি বেরিয়ে যাবেন। সারাদিন ওঁর আর থাকার জায়গা নেই। সুতরাং, সকাল সকাল গিয়েই ধরতে হবে।

সেবার আমি মাষ্টারমশাইয়ের অসহায় অবস্থাটা দেখলাম ভালো করে। আগে কখনো ভালো করে ভাবি নি কী করে উনি বেঁচে থাকেন।

মাষ্টারমশাইয়ের জ্বর। লন্ড্রির মালিক দয়া করে ওঁকে ওই অবস্থাতে মেঝেতে বিছানা করে একপাশে শুতে দিয়েছেন। আমি দেখলাম, মাষ্টারমশাই খুবই অসুস্থ। তাও আমাকে দেখে একটু হাসলেন। বললেন, “স্যার’কে  একটা খবর দিয়ে দেবে, পার্থ?”

স্যার মানে বন্দনাদি। ওঁকে ওই নামেই ডাকতেন চিত্তবাবু।  আমরা সবাই হাসাহাসি করতাম। বন্দনাদি সবচেয়ে বেশি হাসতেন। বুবুও হাসত।

বোধহয় সেই ওঁর সঙ্গে শেষ দেখা।

অনেক দিন পর, আমি তখন আমেরিকায়। বুবু খবর দিল, চিত্তবাবু মারা গেছেন। একজন পুরনো ছাত্র শেষ অবস্থায় কিছুদিন বাড়িতে রেখেছিল। তারপর আর উপায়ান্তর না দেখে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়েছিল। বুবু দেখতে গিয়েছিল। দেখল, বিছানার ওপর নোংরা চাদর ঢাকা দেওয়া। তার ওপর আরশোলা দৌড়দৌড়ি করছে। মাষ্টারমশাই ঘুমিয়ে আছেন। অজ্ঞান।

দু দিন পরেই উনি চলে গেলেন।

***

আমি কখনো খোঁজ নিই নি চিত্ত রায় ওঁর আসল নাম ছিল, নাকি ওই নামটা ওঁকে নিতে হয়েছিল প্রয়োজনের তাগিদে। কখনো ওঁকে ধর্ম সম্পর্কে কোনো কথাই বলতে শুনি নি, হিন্দু মুসলমান কোনো কথাই শুনি নি, ফলে বোঝার কোনো উপায় ছিল না উনি কী ধর্মের। আগেকার দিন হলে লোকে বাড়িতে কেউ এলেই জিজ্ঞেস করে নিত, কী ধর্ম, কী জাত। বা, অন্তত জলচল কিনা। অর্থাৎ, জল খেতে দেওয়া যাবে কিনা। আমরা যখন বড় হয়েছি, তখন ওসব ভাগ্যক্রমে উঠে গেছে। অন্তত আমাদের কলকাতার শহুরে, শিক্ষিত হিন্দু সমাজে উঠে গেছে। আমাদের বাড়িতে কেউ কখনো ভাবেই নি, মাষ্টারমশাই কী জাত। কী ধর্ম। কেউ জিজ্ঞেস করে নি, মাষ্টারমশাইয়ের মুখে পুরনো বসন্তের দাগ ভর্তি কেন। ওঁর চোখদুটো নষ্ট হয়ে গেল কীভাবে। আমার মা যে স্টিলের প্লেটে করে ওঁকে খাবার দিত, সেই প্লেটেই আমরাও খেতাম। কখনো ভাবি নি, ওঁকে আবার অন্য প্লেটে দেওয়া হবে। এসব চিন্তাই আমাদের বাড়িতে কখনো আসে নি। কলকাতার উদারনৈতিক হাওয়া বাবার মত একজন রক্ষণশীল লোককেও কিছুটা উদার মনের করে দিয়েছিল। আর আমি তো এসব নিয়ে জীবনে কখনো কোনো চিন্তাই করি নি।

এখন মাঝে মাঝে ভাবি, আচ্ছা, যদি এখন কোনো সূত্রে জানা যায় চিত্ত রায় আসলে ওঁর ছদ্মনাম ছিল, বা ঠিক যেমন বাংলাদেশ থেকে আসা গরিব মেয়েরা ভারতে হিন্দু বাড়িতে রাঁধুনি বা অন্য কাজ করার জন্যে নিজেদের নাম বদলে ফেলে আসমা থেকে কবিতা, ফরিদা থেকে ফুলমণি, বা সেলিমা থেকে লক্ষ্মী হয়ে যায়, নইলে হয়ত কাজ থাকবে না। সেরকম যদি কখনো জানা যায়, মাষ্টারমশাইয়ের আসল নাম ছিল সিরাজুল হক বা একরাম আলি? কোনো তফাৎ হবে কি?

মাষ্টারমশাই কী জাত ছিলেন, বা কী ধর্মের ছিলেন, তাই দিয়ে তাঁর পরিচয় লেখা হবে কি? যে স্নেহ, যে ভালবাসা, মমতায় মাষ্টারমশাই আমাকে তবলা শিখিয়েছিলেন, সঙ্গীতজগতের নাড়ি টিপে আসল আর নকলের পার্থক্য চিনতে সাহায্য করেছিলেন, আর আমাকে সেই ভীষণ ভয়ঙ্কর সত্তরের দশকের দিনগুলোতে কুসঙ্গ থেকে দূরে থাকতে প্রেরণা দিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গীতশিক্ষার মাধ্যমে, আর যেভাবে আমার মাকে মা বলে ডেকে আমাদের সকলেরই অতি প্রিয় মানুষ হয়ে গেছিলেন তিনি, সেটাই-কি তাঁর মানবধর্মের আসল পরিচয় নয়? আমার জানার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন নেই তাঁর জীবনে এত দারিদ্র্য কীভাবে এলো, কেনই বা তিনকুলে তাঁর কেউ ছিল না, কেন তিনি এত বড় একজন তবলাশিল্পী ও জিনিয়াস এক গুরুর কাছে নাড়া বেঁধেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারলেন না, কেন তাঁর একটা থাকার জায়গা ছিল না আর তাঁকে লন্ড্রিঘরের অন্ধকার মেঝেতে ঘুমোতে হত, আর সকালবেলা রাস্তার টিউবওয়েলে চান করে আর রাস্তার সস্তা দোকানে পাউরুটি আর চা খেয়ে রুজির প্রয়োজনে বেরিয়ে পড়তে হত।

আমার কাছে ওসব কোনো জ্ঞাতব্য তথ্য নয়।

আমি মনে রাখব মাষ্টারমশাইকে তাঁর ত্রিতাল, ধামার, চৌতাল, একতাল আর ঝাঁপতালের রূপবর্ণনার জন্যে। তেওরার সঙ্গে রূপক তালের ঐতিহাসিক পার্থক্য নির্দেশের জন্যে। মন্দলয়ের খেয়ালের সঙ্গে সঙ্গত করতে গেলে কীভাবে ত্রিতালকে মন্দলয়ে বাজাতে হয়, তা শিখিয়ে দেবার জন্যে। হাতের আঙুল আর তালুর বিভিন্ন রকম ব্যবহারে কীভাবে তবলা ও বাঁয়াতে বিভিন্ন বোল রূপে রসে ফুটে ওঠে ফুলের মত, তার গোপন রহস্য চেনাবার জন্যে। রবীন্দ্রনাথের গানের তবলাসঙ্গত আর উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের সঙ্গতের মধ্যে কী ফারাক, সেটা ধরিয়ে দেবার জন্যে।

সেখানে আমার মাষ্টারমশাই গরিব নন, ধনীও নন। তিনি হিন্দুও নন, মুসলমানও নন। তিনি উঁচু জাতও নন, নিচুও নন। তিনি একজন শিল্পী। আর তিনি একজন মানুষ। মানবধর্মই তাঁর মত মানুষের ধর্ম।

কুষ্টিয়ায় আঁকা লালন ফকিরের স্কেচ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা।  - লেখক
কুষ্টিয়ায় আঁকা লালন ফকিরের স্কেচ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা। – লেখক

আমি কলকাতার ছেলে। পূর্ববঙ্গের সংস্কৃতি আমি সত্যিই তেমন জানি না। ওই নির্মলেন্দু চৌধুরীর লোকগীতি আর পূর্ণদাস বাউলের দু চারটে জনপ্রিয় গান ছাড়া। কিন্তু বহুকাল পরে যখন লালনের গান শুনেছি, আর তাঁর আরশিনগর, হাওয়ামহল আর অচিন পাখির গান শুনেছি, মনের মানুষের কথা শুনেছি, তখন মনে হয়েছে, চিত্তবাবুর সেই উদাস ভাবেভোলা মনটা যেন তাঁর অচিন পাখির খোঁজই সারা জীবন ধরে করছিল। যেন তাঁর মনের মানুষকেই খুঁজে বেড়াচ্ছিল। সেখানে তাঁর দারিদ্র্য, তাঁর অনাহার, বঞ্চনা, রোগ শোক সবই বোধহয় তুচ্ছ ছিল। তাই তাঁকে শত অভাবের মধ্যেও কখনো এক মুহূর্তের জন্যে বিষাদগ্রস্ত দেখি নি। তাঁর সঙ্গীত তাঁর প্রাণে যে অফুরান রসের প্রবাহ সৃষ্টি করে তাঁকে সজীব করে রেখেছিল, তার খোঁজ পাবার সাধ্য আমাদের মত মাটির ধুলো ছুয়ে থাকা মানুষের নেই।

হাসপাতালের মলিন বিছানায় শুয়ে মাষ্টারমশাই যখন অজ্ঞান হয়ে শেষ সময়ের প্রতীক্ষা করছিলেন, তখন তিনি হয়ত সেই মনের মানুষের সাথে দেখা হবে, তার জন্যেই অধীর অপেক্ষা করেছিলেন। আমাদের জগতের আদিম, সাংসারিক, ব্যবসায়িক ধ্যানধারণা থেকে তিনি তখন অনেক ঊর্ধ্বে।

“বাড়ির পাশে আরশিনগর, সেথা একঘর পড়শী বসত করে, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে।”

এখন নিশ্চয়ই দেখা হয়েছে তাঁর সঙ্গে, মাষ্টারমশাই?

(কিস্তি ২২)

Tags from the story
More from পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘটিকাহিনী (৫)

এদিকে বাবা হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিল ছ বছর বয়েসেই...
Read More