ঘটিকাহিনী (২২)

ওঁর বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় ডেকেছিলাম, "ডাক্তারবাবু, ডাক্তারবাবু, একটু আসবেন আমাদের বাড়ি? বাবার খুব বুকে ব্যথা করছে। মা বলল আপনাকে ডেকে নিয়ে আসতে।"

(আগের পর্ব)

শান্ত বাতি, ভিজে গন্ধ, মৃদু কলরব

জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “স্মৃতির পটে জীবনের ছবি কে আঁকিয়া যায় জানি না। কিন্তু যেই আঁকুক সে ছবিই আঁকে। অর্থাৎ যাহাকিছু ঘটিতেছে, তাহার অবিকল নকল রাখিবার জন্য সে তুলি হাতে বসিয়া নাই। সে আপনার অভিরুচি-অনুসারে কত কী বাদ দেয়, কত কী রাখে। কত বড়োকে ছোটো করে, ছোটোকে বড়ো করিয়া তোলে। সে আগের জিনিসকে পাছে ও পাছের জিনিসকে আগে সাজাইতে কিছুমাত্র দ্বিধা করে না। বস্তুত তাহার কাজই ছবি আঁকা, ইতিহাস লেখা নয়। এইরূপে জীবনের বাইরের দিকে ঘটনার ধারা চলিয়াছে, আর ভিতরের দিকে সঙ্গে সঙ্গে ছবি আঁকা চলিতেছে। দুয়ের মধ্যে যোগ আছে অথচ দু’ই ঠিক এক নহে।”

parthab logo

আমি যখন প্রথম জীবনস্মৃতি পড়ি, তখন বোধহয় আমার বয়েস পনের কি ষোলো। ওই বয়েসে জীবনস্মৃতির শব্দচয়ন ও তার বিশ্লেষণ বোঝার সাধ্য আমার ছিল না। শুধু খুব ভালো লাগার একটা অনুভূতি হত, আর ভাবতাম অনেক কিছু বুঝে ফেলেছি। একটা ডেসপারেট চেষ্টাও ছিল বুঝে ফেলবার। কিন্তু কে বোঝাবে? ইস্কুলের মাষ্টারমশাইরা খুব ভালো, সেই বিজন গোস্বামী, অমিয় রায় এঁরা। কিন্তু আমি তো ইস্কুলের বাইরে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে পারি না। সুতরাং সিলেবাস-বহির্ভূত কিছু পড়ে ভালো লাগলে তা বুঝিয়ে দেবে কে? কেউ নেই তো।

কিন্তু তাও কেমন করে যেন এই প্রথম পঙ্‌ক্তিগুলো মনের মধ্যে দাগ কেটে বসে গিয়েছিল। এই-যে ছবি আঁকার কথা বলা। এই-যে ইতিহাস না-লেখার কথা বলা। এই-যে স্মৃতির পারম্পর্য নিজের মত করে বদলে সাজিয়ে নেওয়ার কথা। বাদ দেওয়ার কথা। বড়কে ছোট করা, আর ছোটকে বড় করে তোলবার কথা। কিছু না বুঝেই বুঝতে পেরেছিলাম-যে স্মৃতিকথা কখনো দিন সাল তারিখ বসিয়ে বসিয়ে ডায়েরি লেখা নয়। জীবনকাহিনী সাহিত্য, শিল্প। সে শিল্পের শর্তগুলো মেনে চলে। সে ভাঙে, সে গড়ে। কিন্তু যেহেতু সে বাস্তব জীবনেরই কথা, তাই সে কল্পনার আশ্রয় নেয় না। মিথ্যার আশ্রয় নেয় না। সে ডকুমেন্টারি, তথ্যচিত্র। ফিকশন নয়। কল্পকাহিনী নয়। এই যা তফাৎ। কিন্তু সেও শিল্প। সেও সাহিত্য। সে-কোনো বিরক্তি বা অবসাদ উদ্রেককারী রোজনামচা নয়।

ভেবেছিলাম, আমি যদি কখনো আমার জীবনস্মৃতি লিখি, তাহলে রবীন্দ্রনাথের মডেলই অনুসরণ করব।

অবশ্য, ঠিক এমন করে কখনো আগে ভাবি নি। হয়ত মনের অবচেতন স্তরে এমন একটা ভাবনার জন্ম নিয়েছিল। অনেক দিন ধরে, বহু বছর ধরে সে-ভাবনা একটু একটু করে যেন পুস্পলতার মত বেড়ে উঠেছে। যেন একটা বোগেনভেলিয়া বা মাধবীলতার গাছ। ছোট্ট ছিল সেই যেমন ওদের বাড়িওলা জ্যাঠাইমার বাড়ির পাঁচিলের সেই গোলাপি-সাদা ফুলের গাছটা। আর তার ঘন সবুজ, নরম নরম পাতাগুলো। যে গাছটাকে আমি আর সুব্রত চোখের সামনে একটু একটু করে বড় হতে দেখলাম। তারপর একদিন দেখলাম একতলা থেকে তিনতলার জানলার কার্নিশ বেয়ে চারতলার ছাত ছুঁই ছুঁই করছে সে। অবাক লেগেছিল। কবে এত বড় হয়ে গেল গাছটা? কবে এত পাতা গজালো এর? হাজার হাজার পাতা? কবে এর মধ্যে এত অসংখ্য মিষ্টি মিষ্টি ফুল ধরল গোছায় গোছায়? টের পাই নি তো!

অথচ, আমরা ওখানেই ছিলাম। ওই গাছটার পাশেই আমরাও ওর সঙ্গে সঙ্গেই বড় হচ্ছিলাম। ছোটোবাড়ি থেকে বড়বাড়ি গেলাম। সিক্স থেকে সেভেন এইট নাইন হয়ে টেনে উঠলাম। বয়ঃসন্ধি হলো। এবার ছেলে বন্ধুর থেকে মেয়ে বন্ধু করার প্রতি আকর্ষণ তীব্র হয়েছে। কৈশোর থেকে যৌবনের দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছি। নানারকম অতি-স্বাভাবিক কিন্তু আমাদের বদ্ধজলা-সমাজে নিষিদ্ধ জিনিস, আবেগ, কামনা বাসনার প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। যৌনতার প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। নিষ্পাপ যৌনতার তীব্র, মদির সুবাস। যেন এক এক সপ্তাহে এক একটা নতুন ফুলের গোছা। ঠিক ওই মাধবীলতা গাছটার মত। ওকে কেউ বাধা দেবার নেই। ওর ফুল কেউ ছিঁড়ছে না। আমাদের কিন্তু সে অবাধগতি বৃদ্ধি নেই। আমরা ভীত, সন্ত্রস্ত, সর্বদা আশঙ্কিত। লুকিয়ে লুকিয়ে বড় হচ্ছি আমরা। লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের ফুল ফুটছে, আর একটার পর একটা অকালে ঝরে যাচ্ছে।

কেউ লক্ষ্যও করছে না। কেউ কিছু বলছেও না আমাদের কষ্টের কথা।

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি—এমন একটা স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে দিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ যে তাঁর প্রভাব কোনো না কোনো ভাবে আমাদের লেখার ওপর পড়বেই।  সে আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন জোর করে দূরে সরে থাকতে। 'জীবনস্মৃতি' এই ঠাকুরবাড়িকে কেন্দ্র করে অনেকটাই লেখা হয়েছিল। - লেখক
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি—এমন একটা স্ট্যান্ডার্ড তৈরি করে দিয়ে গেছেন রবীন্দ্রনাথ যে তাঁর প্রভাব কোনো না কোনো ভাবে আমাদের লেখার ওপর পড়বেই। সে আমরা যতই চেষ্টা করি না কেন জোর করে দূরে সরে থাকতে। ‘জীবনস্মৃতি’ এই ঠাকুরবাড়িকে কেন্দ্র করে অনেকটাই লেখা হয়েছিল। – লেখক

এখন যখন সত্যি জীবনস্মৃতি লিখছি, তখন সাহিত্যের শর্ত অনুসারে, আর মহাকবির মডেল অনুসারে আমার কাজ হলো, সত্যলঙ্ঘন না করে নিজের মত করে ছোটকে বড় করে তোলা, আর তথ্যচিত্রের এডিটরের মত আমার মনের কাঁচি আর আঠাকে কাজে লাগিয়ে জোড়া দেওয়া আর বাদ দেওয়া। আবার জোড়া দেওয়া। আমার নিজের জীবনকে আমি যেমনভাবে দেখেছি, তেমনভাবেই পাঠক ও পাঠিকাদের কাছে তুলে ধরা। আমার নিজের পছন্দের জলছবির মতন, ক্যালিডোস্কোপের মতন। আজ যদি আমি বলি, শান্তা, শিউলি, সংঘমিত্রা, মাধু সবাইকেই আমার একই রকম ভালো লাগত, বা একই রকম প্রেম অনুভব করতাম, বা ওদেরও আমার প্রতি সমান আকর্ষণ ছিল, তাহলে আমি নিজের কাছেই মিথ্যাচার করব। সুতরাং তা বলা যাবে না। কিন্তু আমি যদি ওদের সত্যি সত্যি মনে রাখি আমার কৈশোর থেকে যৌবনে পা দেওয়ার একটা একটা উল্লেখযোগ্য স্টেপ হিসেবে, কিন্তু “পাছে লোকে কিছু বলে” এই ভেবে ঠিক সেই আগের মতই গোপন কামনায় আর তার পাপের প্রতিফলের কথা ভেবে অজানা আশঙ্কায় দিন কাটাই, আর সব কিছু আমার স্মৃতিকথা থেকে বাদ দিয়ে দিই, তাহলে তাও নিজের সঙ্গে, নিজের বিবেকের সঙ্গেই অসাধুতা করা হবে। তাও আমি করতে পারি না মোটেই।

নিজের মত করে বলতে আমাকে হবেই। এই ছবিতে এই রঙটাও ভীষণ ইম্পর্ট্যান্ট।

আমার প্রতি ওদের সমান আকর্ষণ ছিল না। তাছাড়া, এরা প্রত্যেকেই খুব ভালো মেয়ে ছিল। আমাদের ওই মদের গলির ক্লেদ এদের স্পর্শ করতে পারে নি। আমাদের সে-সময়ে এক বছরের বড় মেয়ে এক বছরের ছোট একটা কিশোর ছেলের চাইতে মনের দিক থেকে অনেক বড় ছিল। অনেক বেশি ম্যাচিওর ছিল। শান্তা আমাকে পছন্দ করত, অনেক প্রশ্রয়ও দিয়েছে মেলামেশা করার, অনেক হেসেছে, অনেক গল্প করেছে, কালিপুজোর রাতে ওদের বাড়ির ছাতে গিয়ে অন্ধকারে একসঙ্গে সিগারেটও খেয়েছে আমার সঙ্গে খুব বন্ধু ভেবে, ভাই ভেবে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। একটা অলিখিত সীমানা ছিল, যেটা আমি বুঝি নি। সে সীমানা লঙ্ঘন করতে চেষ্টা করে আমি ওর সে-বন্ধুত্বের, প্রীতি-ভালবাসার অসম্মান করেছি। জানতাম না, তাই করেছি। কেউ শিখিয়ে দেয়নি কীভাবে মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হয়, বন্ধুত্ব রাখতে হয়, তাই করেছি। আমাদের ওখানে এখনো-কি সে শিক্ষা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা হয়েছে? মনে হয় না। বরং, বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়ির মেয়েরা আরো বেশি গুটিয়ে গেছে। সামাজিক নিষেধাজ্ঞা আরো বেশি কঠোর হয়েছে। বাঙালি জাতি-হিসেবে আরো বেশি রক্ষণশীল হয়ে পড়েছে। সে মুসলমানই হোক, বা হিন্দু। শহরের হোক, বা গ্রামের। এখনো আমাদের দুর্গাপুজোর ভিড়ে দড়ি দিয়ে মেয়েদের আর ছেলেদের আলাদা যাবার ব্যবস্থা থাকে। বাসে ট্রামে ট্রেনে লেডিজ সিট থাকে। তার সামনেই ছেলেরা বেশি করে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করে। হয়ত করতে পারে না সমাজের ভয়ে, কিন্তু মনে মনে করে। অনেকে সত্যিই করে। আর মেয়েদের শরীরের দিকে তাকিয়ে থাকে নির্লজ্জ ভাবে, আদিম জন্তুর মত। এখনো ছেলেরা মেয়েদের শরীর দেখার জন্যে আর ছোয়াঁর জন্যে অশ্লীলতা করে।

মেয়েরা এখনো বেশির ভাগ ছেলেকে ভয় পায়।

এসব কথা তেমন রমণীয় নয়। রমণীরা এসব কথা শুনে অনীহায় মুখ ঘুরিয়ে নিতে পারেন। নেওয়াই স্বাভাবিক। ধুলোকাদার এসব কথা মহাকাব্যও নয় নিশ্চয়ই। সেই যে আগেই বলেছিলাম, ‘ঘটিকাহিনী’ নাম দিয়েছি, কারণ এ কাব্য নয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন, “এই স্মৃতির মধ্যে এমন কিছুই নাই যাহা চিরস্মরণীয় করিয়া রাখিবার যোগ্য। কিন্তু বিষয়ের মর্যাদার উপরেই যে সাহিত্যের নির্ভর তাহা নহে; যাহা ভালো করিয়া অনুভব করিয়াছি, তাহাকে অনুভবগম্য করিয়া তুলিতে পারিলেই মানুষের কাছে তাহার আদর আছে। নিজের স্মৃতির মধ্যে যাহা চিত্ররূপে ফুটিয়া উঠিয়াছে তাহাকে কথার মধ্যে ফুটাইতে পারিলেই, তাহা সাহিত্যে স্থান পাইবার যোগ্য।” গড, কী দারুণ সত্যি কথা!

মহাকবির স্মৃতিকথার সূত্র অনুসরণ করে অতি-সাধারণ এই লেখক আমি যদি কিছু ছবি ফুটিয়ে তুলতে পারি, যা ছবি হিসেবে আজকের এই বিশ্বায়িত বাঙালি ভূলোকে নিউ জার্সি, ক্যালিফর্নিয়া, লন্ডন, নিউ ইয়র্ক, কলকাতা, বর্ধমান, বেনারস, শিলিগুড়ি, সিলেট, চট্টগ্রাম বা ঢাকার কিছু মানুষ ও মানুষীকে আনন্দ দিতে পারে তার শিল্পগুণের জন্যে, তাহলেই আমার সে ছবি আঁকার প্রচেষ্টা সফল হবে। আমার অন্ধকার রাস্তার পঙ্কিল আবিলতা আবার আদর-ভালবাসার-ভালোলাগার আলোমাখা এই জীবনের গল্পগুলো পাঠক ও পাঠিকা ভালবাসেন যদি তার চিত্রময়তার জন্যে, তাহলেই আমার ঘটিকাহিনী সার্থক।

***

শান্ত বাতি, ভিজে গন্ধ, মৃদু কলরবের কথাও তো আমার জীবনেরই কথা। কোনো ভুল নেই তাতে। মন ভালো করে দেওয়ার কথা। মন ভালো রাখবার উপকরণ। আমেরিকার সুদীর্ঘ প্রবাসজীবনে একাকীত্ব, নির্জনতা, বিষণ্নতা নিত্যসঙ্গী। রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর গান থেরাপির কাজ করে। সত্যজিৎ রায়, তপন সিংহ, ঋত্বিক ঘটক থেরাপির কাজ করে। বিভূতিভূষণ, শরৎচন্দ্র, বঙ্কিম, শরদিন্দু, মুজতবা আলী, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, মহাশ্বেতা, পরশুরাম, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, শিব্রাম, হেমেন্দ্রকুমার এঁরাই আমাদের বন্ধু, সখা, আত্মীয়-পরিজন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস, মান্না দে, আরতি মুখোপাধ্যায়, সুবীর সেন, মৃণাল চক্রবর্তী। সাগর সেন, সুমিত্রা সেন। এখনকার বন্যা, অদিতি, জয়তী, লাইসা, শ্রাবণী। রবিশংকর, আলী আকবর, বিসমিল্লা, বিলায়েত। উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া চৌধুরী, অনিল চট্টোপাধ্যায়, বসন্ত চৌধুরী, তুলসী চক্রবর্তী, রবি ঘোষ, চিন্ময় রায়, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত। সবাই, সবাই। আরো অনেকে। কেউ কম, কেউ বা বেশি।

দীর্ঘ জীবনপথে, কত দুঃখতাপে এঁরাই আমাকে, আমাদেরকে, বেঁচে থাকতে সতত প্রেরণা দিয়ে এসেছেন।

আর, পুরনো সেই দিনের কথা—বিশেষ করে সুখের স্মৃতি, আনন্দময় বাল্য, কৈশোর, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সৌন্দর্যমণ্ডিত ঘটনা, গান, কবিতা, গল্প, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার টুকরো টুকরো মণিমুক্তো, লাট্টু, লেত্তি, গুলি ডাংগুলি, ফুটবল ক্রিকেট, তুমুল বর্ষায় ভিজতে ভিজতে, ভিজতে ভিজতে অর্থহীন ছাতা বন্ধ করে সম্পূর্ণ অর্থহীন ভাবে হাসতে হাসতে বাড়ি ফিরে এসে গেঞ্জি নিংড়ে একগাদা জল বের করে ঘরের ভেতরেই দড়িতে মেলে দেওয়া। আমাদের নিচের তলার ঠাণ্ডা চৌবাচ্চা থেকে মগে করে জল ঢেলে ঢেলে, এক পা দিয়ে আর এক পায়ের গোড়ালির কাদা ঘষে ঘষে পরিষ্কার।

সেই যেমন শঙ্খ ঘোষের লেখায় আছে,

“দিদি বলবেন পাদুটো কী কুচ্ছিৎ,
একগঙ্গা জল দিয়ে তাই ধুচ্ছি।”

আরো কত কী! ঘুড়ি, আম লজেন্স, লেবু লজেন্স, ঝালমুড়ি, আলুর চপ আর বেগুনি। রথের বর্ষায় খিচুড়ি আর পাঁপড়ভাজা। কালেভদ্রে একটা ইলিশ মাছ। ভালো লাগার জিনিসের-কি কোনো অভাব আছে?

যেমন সেই খুব ছোটবেলায় বাবু বুড়োদের বাড়ির কাঠের ক্যাবিনেটের ভেতরে রাখা কাচের বক গোলাপি রঙের, আর তার ভেতরে জল ভরা। কী ভালো লেগেছিল! হাতে নেওয়া বারণ, যদি পড়ে গিয়ে ভেঙে যায়? দূর থেকে দেখা। নয়তো, বাবু আমাদের রাস্তার স্পোর্টসে ছোটদের দৌড়ে ফার্স্ট হয়ে একটা কাঠের জাহাজ পেলো, সব পাল তোলা কতগুলো, কিন্তু তার বাইরেটা পাতলা হলদে ফিনফিনে আর চকচকে কাগজ দিয়ে মোড়া। ওই ভাবেই রেখে দিল ওরা বাড়িতে। খুলল না, যদি ধুলো লেগে নোংরা হয়ে যায়? দূর থেকে দেখার কী আনন্দ, আর ছুঁতে না পারার কী একটা মন খারাপ করা দুঃখ! আমাদের বাড়ি এসব নেই।

কিন্তু, আমাদের বাড়িও আছে অনেক কিছু। কাশী থেকে এলো সেই ছোট্ট টিনের নৌকো, যার ভেতরে একটা আগুন জ্বালাবার কৌটো আছে, আর গরম হয়ে গেলেই নৌকোটা জলের বালতিতে ফট ফট ফট ফট শব্দ করে ঘুরতে থাকে। আর নইলে সেই বিশ্বনাথের গলি থেকে কেনা উজ্জ্বল-চকচকে কাঠের পুতুলগুলো। তারপরে সেই যে একবার পুরী যাওয়া হলো সবাই মিলে, আর সেখানে বালির ওপর পড়ে থাকা অসংখ্য রংবেরঙের ঝিনুক কী আশ্চর্য সুন্দর তার ওপরে কাজ করা, যেন কোনো আর্টিস্ট বসে বসে যত্ন করে এঁকেছে, খোদাই করেছে সেই উদয়গিরি খণ্ডগিরির আর কোনারকের মন্দিরের সূক্ষ্ম কাজের মত। কোনটায় বেগুনি রঙের কাজ, কোনটায় সাদাকালো, কোনটায় বা নীল আর সবুজ। ঝিনুক, শাঁখ, নানা আকারের, নানা সাইজের। তারপর বালির ওপাশে রাস্তার দোকানে কতরকম ঝিনুকের আর শাঁখের মালা, খেলনা, শিঙের তরোয়াল। বালি-কিচকিচ রাস্তার পাশের হোটেলে বসে বালি-কিচকিচ পার্শে মাছের ঝাল ঝাল ঝোল আর ভাত। অন্ধকার রাত্তিরে আবার ফিরে এসে বাবার সঙ্গে বালির ওপর বসে বসে সমুদ্রের ঢেউয়ের ওপর ঝিকমিক-করা সবুজ ফসফরাসের মণিমুক্তো দেখা অনেক রাত পর্যন্ত।

পুরীর সমুদ্রসৈকত বাঙালি পর্যটকদের কাছে আজও সমান জনপ্রিয়। "সাগরবেলায় ঝিনুক খোঁটার ছলে", "আমি সাগরের বেলা তুমি দুরন্ত ঢেউ"—এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানও লেখা হয়েছে এই সমুদ্রতটকে নিয়ে। - লেখক
পুরীর সমুদ্রসৈকত বাঙালি পর্যটকদের কাছে আজও সমান জনপ্রিয়। “সাগরবেলায় ঝিনুক খোঁটার ছলে”, “আমি সাগরের বেলা তুমি দুরন্ত ঢেউ”—এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানও লেখা হয়েছে এই সমুদ্রতটকে নিয়ে। – লেখক

গন্ধ আর স্পর্শকে রেকর্ড করে রাখা যায় না। এমন একটা মেশিন যদি বেরোত, খুব ভালো হত। ছবি তুলে রাখি আমরা ক্যামেরা দিয়ে, আর আজকাল তো অনেক উঁচুমানের, সফিস্টিকেটেড ক্যামেরা আবিষ্কৃত হয়েছে, যা আমাদের সময়ে কল্পনাও করা যেত না। তাও, আমাদের কাছে সেই সাদাকালো ছবিগুলোই দুর্মূল্য ছিল, আর এখনো আছে। আমার পৈতে হয়েছিল আমি ক্লাস নাইনে পড়ার সময়ে। ব্রাহ্মণের ছেলে যখন, উপনয়ন হতেই হবে। এদিকে গরিব ঘরের ছেলে, কিন্তু বাবা মায়ের আদরের একমাত্র পুত্রসন্তান, তাকে ঘিরে তাদের অনেক আশা। পৈতে উপলক্ষ্যে অনেক আয়োজন করা হলো, বাবা পোস্ট কার্ডে চিঠি লিখে আমাদের কাশী, লখনৌ, বেরিলি এসব জায়গায় যারা থাকে, তাদের সব আসতে বলল কলকাতায়। আমার সব বন্ধু, মায়ের দিকের সব আত্মীয়স্বজন, সবাইকেই ডাকা হলো।

এমন ঝিনুকের আর শাঁখের পসরা সাজিয়ে বেলাতটে দোকান খুলে বসে স্থানীয় মানুষেরা, পর্যটকদের কাছ থেকে কিছু রোজগারের আশায়।  - লেখক
এমন ঝিনুকের আর শাঁখের পসরা সাজিয়ে বেলাতটে দোকান খুলে বসে স্থানীয় মানুষেরা, পর্যটকদের কাছ থেকে কিছু রোজগারের আশায়। – লেখক

তারপর পৈতের ঠিক এক সপ্তাহ আগে একদিন আমি সবার সঙ্গে কাবুলিওয়ালা দেখতে গেছিলাম আমাদের পাড়ার রূপবাণী হলে। সেই ছবি বিশ্বাসের রহমৎ আর তপন সিংহের মায়াবী চলচ্চিত্র। এত কান্না পেল সিনেমা দেখে যে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এসেই হল আমার জ্বর, আর সেই জ্বর টাইফয়েডের মত হয়ে গেল। ধূম জ্বর রাত্তিরবেলায়, একশ দুই একশ তিন। বাবা আর মার তো মাথায় হাত! ছেলে অজ্ঞানের মত। মাথায় একটানা জলপটি দিচ্ছে মা বসে বসে। দিদিমা—দিদি—বসে আছে পাশে।

তারপরে অনেক রাত্তিরবেলা আমাদের বাড়ি এলেন আমাদের বড় কারবালার বিখ্যাত ডাক্তার প্রভাত সিনহা। ডাক্তারবাবুর কাছে আমরা তো সেই ছোটবেলা থেকেই যাচ্ছি। ফ্রি চিকিৎসা, আর প্রায় ফ্রি ওষুধ ওঁর চেম্বারের পাশের ঘরেই ডিসপেন্সারিতে তৈরি করা হাতে হাতে। সেই ছোটবেলা থেকে দেখা কম্পাউন্ডার বীরেনবাবু, কেষ্টবাবু আর সত্যবাবু। সেই ছোটবেলা থেকে দেখা দাগকাটা মিক্সচারের চ্যাপটা শিশি আর ভীষণ বাজে খেতে কাগজের পুরিয়ায় মোড়া পাউডার। ডাক্তারবাবু-যে আমাদের বাড়ি আবার নিজে আসবেন কখনো, সে আমাদের স্বপ্নের অতীত ছিল। শুধু একবার আমি কাকভোরে, কেউ ঘুম থেকে ওঠার আগে ওঁর বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে চাপা গলায় ডেকেছিলাম, “ডাক্তারবাবু, ডাক্তারবাবু, একটু আসবেন আমাদের বাড়ি? বাবার খুব বুকে ব্যথা করছে। মা বলল আপনাকে ডেকে নিয়ে আসতে।” সেই একবারই এসেছিলেন বাড়িতে।

কোনারকের ঐতিহাসিক সূর্যমন্দির—পুরী থেকে একটু দূরেই।  যেন একটা রথ আর তার চাকার আদলে তৈরি হয়েছিল এই মন্দির। পাথরের মন্দির আর তার ওপর সেকালের শিল্পীদের অতি সূক্ষ্ম কাজ দেখলে স্তম্ভিত হতে হয়।  - লেখক
কোনারকের ঐতিহাসিক সূর্যমন্দির—পুরী থেকে একটু দূরেই। যেন একটা রথ আর তার চাকার আদলে তৈরি হয়েছিল এই মন্দির। পাথরের মন্দির আর তার ওপর সেকালের শিল্পীদের অতি সূক্ষ্ম কাজ দেখলে স্তম্ভিত হতে হয়। – লেখক

এবার আমার জন্যে। ধন্বন্তরী ডাক্তার ছিলেন উনি। কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, টেরিলিনের প্যান্ট শার্ট, হাসিমুখ। কমিউনিস্ট পার্টির অন্ধ সমর্থক। আমার বাবা আর এস এস জানতেন উনি। কিন্তু তার জন্যে কখনো তাঁর চিকিৎসার কোনো ত্রুটি দেখি নি। আমাকে খুব স্নেহ করতেন কেন জানি না। চেম্বারে গেলে বসতে বলতেন। অনেক সময়ে গল্পও করতেন আমার সঙ্গে হাতে পেশেন্ট না থাকলে।

ডাক্তারবাবু বললেন, “কিচ্ছু ক্যানসেল করার দরকার নেই। এখন সব যোগাড়যন্ত্র করে ফেলেছেন, এত লোক ডেকেছেন, ক্যানসেল করবেন কেন?”

মা বলল, “এত জ্বর ছেলের!”

ডাক্তার সিনহা বললেন, “আমি আছি তো। চিন্তা কীসের?”

উনি একটা ক্যাপসুল দিলেন। বললেন, “চার ঘণ্টা অন্তর ঘড়ি ধরে খাওয়াবেন। আর জলপটিটা দিয়ে যান। তিন দিনে ভালো হয়ে যাবে পার্থ।”

হয়েও গেলাম। পৈতের উৎসব বাড়িতে। হই হই। খাওয়া দাওয়া করানো হলো অভ্যাগত অতিথিদের বিডন স্ট্রিটে জ্যাঠাইমার বাড়ি। যদিও ওটা আসলে জেঠুর বাড়িই বলা উচিৎ, কারণ জেঠুই তো ভাড়া দিত, কিন্তু আমরা বলতাম জ্যাঠাইমার বাড়ি। সেখানে রাস্তার ফুটপাথের ওপর বাঁশের ম্যারাপ বেঁধে, আর নীল সাদা স্ট্রাইপ স্ট্রাইপ প্যান্ডেল খাটিয়ে লোকেদের বসার ব্যবস্থা হলো, আর দুতলায় ওদের বিরাট বড় একটা খাবার ঘর ছিল, সেখানে ডেকরেটরকে দিয়ে বেঞ্চি আর চেয়ার পেতে তার ওপর রোল করা কাগজ গড়িয়ে গড়িয়ে বিছিয়ে দিয়ে রাধাবল্লভী আর আলুর দম আর ছোলার ডাল আর মাছের কালিয়া আর গরমকালে কাঁচা আমের চাটনি আর রসগোল্লা। আর গোলাপজল দেওয়া ঠাণ্ডা জল। ঠিক যেমন সেই আমার বোন বুবুর অন্নপ্রাশনে হয়েছিল চিন্ময়কাকুর বাড়িতে। ওঃ সে কী আনন্দ! বন্ধুরা যথারীতি একটা করে গল্পের বই উপহার দিল, সেই দেব সাহিত্য কুটীরের একটাকা চার আনা দামের বইগুলো, আর অনেকে দিল কলম, উইং সাং চাইনিজ কলম, ওপরের ক্যাপটা সোনালি রঙের, আর ভেতরে টিপে টিপে কালি ভরা যায়। ফাউন্টেন পেন। সরু নিব। আর এস এসের লোকেরা দিল সেই মার্কামারা ডাক্তারজীর পুণ্য জীবনকাহিনী। কী বোরিং লোকগুলো-রে বাবা!

পুরনো কলকাতার ছবি। শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়। নেতাজীর স্ট্যাচু যেদিন প্রতিষ্ঠা হয়, আমরা স্কুল পালিয়ে দল বেঁধে গেছিলাম দেখতে। মনে হয়ে যেন এই সেদিনের কথা। সেই একাত্তরের রক্তাক্ত দিনগুলোতেই। তার কিছুদিনের মধ্যেই নকশালরা নেতাজীর দলের এক প্রধান পুরুষ হেমন্ত বসুকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে খুন করলো দিন দুপুরে। আমরা তাও দেখতে গেছিলাম স্কুল পালিয়ে দল বেঁধে। - লেখক
পুরনো কলকাতার ছবি। শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়। নেতাজীর স্ট্যাচু যেদিন প্রতিষ্ঠা হয়, আমরা স্কুল পালিয়ে দল বেঁধে গেছিলাম দেখতে। মনে হয়ে যেন এই সেদিনের কথা। সেই একাত্তরের রক্তাক্ত দিনগুলোতেই। তার কিছুদিনের মধ্যেই নকশালরা নেতাজীর দলের এক প্রধান পুরুষ হেমন্ত বসুকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে খুন করলো দিন দুপুরে। আমরা তাও দেখতে গেছিলাম স্কুল পালিয়ে দল বেঁধে। – লেখক

আত্মীয়রা কেউ কেউ দিল টেবিল ল্যাম্প কারণ সামনে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা আসছে, আর সবাই কী কী যেন দিল। উপহারে বাড়ি বোঝাই। তার মধ্যে আটটা না নটা টেবিল ল্যাম্প। সে এক ঝামেলা। তারপর সবাই—এ ও সে এসে নিয়ে গেল সেগুলো। কী হবে এতগুলো টেবিল ল্যাম্প দিয়ে?

আর, বাবার অফিসের কয়েকজন সহকর্মী নিয়ে এলো আমার জন্যে একটা আগফা ক্লিক থ্রি বক্স ক্যামেরা। সে ক্যামেরা আমার বিয়ের পর যখন আমরা রাজস্থানে বেড়াতে যাই, সে সময়েও অনেক ছবি তুলেছে। এত প্রিয় ছিল আমার।

কিন্তু, ক্যামেরায় ভিজে গন্ধের ছবি তোলা যায় না। শান্ত বাতির ছবিও না। মৃদু কলরব—হয়ত যায়। কিন্তু আসলে যায় না।

মৃদু স্পর্শ—তাও যায় না। আমার মা যখন আমাকে সেই ধূম জ্বর হবার সময়ে মাথায় জলপটি দিয়ে দিচ্ছিল, তার রেকর্ড করে রাখা যায় নি। অবশ্য আমাদের কোনো টেপ রেকর্ডারও কখনো ছিল না। মা আর দিদির গলার আওয়াজ টেপ করেও রাখা যায় নি। একবার ছোটবেলায় দিদিকে সাইকেল ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দিয়ে পালিয়ে গেছিল। দিদি আমাদের বাড়ির দিকেই আসছিল। তারপর আমি ইস্কুল থেকে এসে দেখি, দিদির মাথায় ব্যান্ডেজ, আর মা আর মাসি দিদিকে ওষুধ লাগিয়ে দিচ্ছে। আর দিদি সেই অবস্থাতেও কবিতা বলছে,

“ক্রিং ক্রিং ক্রিং
সবে সরে যাও
চলিতেছে সাইকেল
দেখিতে কি পাও না?
ঘাড়ে যদি পড়ে বাপু
প্রাণ হবে অন্ত
পথমাঝে পড়ে রবে
বের করে দন্ত।”

বলছে, আর হাসছে। ওরা সব ওই রকমই ছিল। বিশেষ করে আমার দিদি, দিদিমা।

রেকর্ড করে রাখা যায় নি সে দৃশ্য।

কিংবা, দিদি আমাকে ছোটবেলায় গল্প বলত। উমনো-ঝুমনো, ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী, “ফিংফিঙেটি বাবুই হাটি, যে বুড়ির কুলগাছে বসে তার নাকচুল কাটি,” এসব তো ছিলই। বা, “গড়গড়ের মা লো, তোর গড়গড়াটা কই, হালের গরু বাঘে খেয়েছে, পিঁপড়ে টানে মই।” তার সঙ্গে ছিল দিদির নিজে লেখা গল্প। লেখা মানে মুখে মুখে বানানো। লেখা হয় নি কখনো। দিদি ক্লাস থ্রি পর্যন্ত। এত লিখতে পারবে কী করে? কিন্তু, গল্প তৈরি করত মুখে মুখে। একটা গল্প আমার খুব প্রিয় ছিল, সেটা হলো বেড়াল ভূতের গল্প। তারপর, অনেক পরে, দিদি একবার একটা পদ্য কাগজে লিখে নিয়ে এসে আমাকে দেখালো।

“করি হে মিনতি রুদ্র বৈশাখ
ক্ষমা কর মোদের যত অপরাধ…
বৈকাল হলে মেঘ ঝড় হয়
আজ সে সকল হারালে কোথায়?
বাংলা মায়েরে ভুলিতেছ তুমি
হতেছ বিদেশ ভক্ত
তাই যত রাগ আমাদের প্রতি
পুড়িয়ে ফেলিবে আমাদের স্মৃতি…”

এইসব। আমি হাসতাম দেখে। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। নাকি, টেনে। রবীন্দ্রনাথ পড়ি। একটু একটু সুকান্ত, নজরুল। সুব্রতর বাড়ি থেকে অগ্নিবীণা নিয়ে এসে পড়ে মুখস্থ করে ফেলেছি “বিদ্রোহী।” পাড়ার কালীপুজোর ফাংশানে আবৃত্তি করে ফাটিয়ে দিয়েছি। সেই কবিতা, আর এই কবিতা?

দিদি বলত, “কী, ভালো লেখা হয় নি?” বলত না, কিন্তু চোখের চাহনিতে একটু কষ্টের ছাপ দেখতাম। আমি তখন বলতাম, “না দিদি, খুব ভালো হয়েছে। তুমি আরো লেখো।”

এসবও রেকর্ড করে রাখা হয়ে ওঠে নি কখনো। আজকের ভয়ঙ্কর গ্লোবাল ওয়ার্মিং আর আমাদের বাংলাদেশ প্রতি বছর গরমকালে উত্তাপের রেকর্ড সৃষ্টি করছে দেখে এখন মনে পড়ে দিদির সেই প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে লেখা সাবধানবাণী।

***

প্রত্যেকেরই শৈশব, বাল্য, কৈশোর, যৌবনের কতগুলো প্রিয় জিনিস থাকে। আমার ছিল। তার মধ্যে বেশির ভাগই নেহাৎই অকিঞ্চিৎকর। অন্যের কাছে সেসব জিনিসের কোনো মূল্যই নেই। কিন্তু যার জিনিস, তার কাছে তার মূল্য অপরিসীম। সেগুলো তার কাছ থেকে কেউ লক্ষ টাকা দিয়েও কিনে নিতে পারবে না।

একেবারে অভিভূত হয়ে গেছিলাম তপন সিংহর ছবি কাবুলিওয়ালা দেখে, আর ছবি বিশ্বাসের রহমতের অভিনয় দেখে। তারপরও আরো কতবার দেখেছি এদেশে আসার পর ভিডিওতে, ইউটিউবে। কিন্তু সেই প্রথম দেখার মত আশ্চর্য মনমাতাল করা অভিজ্ঞতা আর কখনো হয়নি। ভেবেছিলাম, এমন সিনেমাও হতে পারে? - লেখক
একেবারে অভিভূত হয়ে গেছিলাম তপন সিংহর ছবি কাবুলিওয়ালা দেখে, আর ছবি বিশ্বাসের রহমতের অভিনয় দেখে। তারপরও আরো কতবার দেখেছি এদেশে আসার পর ভিডিওতে, ইউটিউবে। কিন্তু সেই প্রথম দেখার মত আশ্চর্য মনমাতাল করা অভিজ্ঞতা আর কখনো হয়নি। ভেবেছিলাম, এমন সিনেমাও হতে পারে? – লেখক

আমার বোনের একটা ফুঁ দিয়ে ফোলানো পুতুল ছিল। ছোটবেলায় ও যখন মায়ের কোলে কোলে ঘুরত, তখন ওই পুতুলটা ছিল ওর নিত্যসঙ্গী। নিচের অংশটা একটা চ্যাপটা বালিশের মত, আর তার ওপরে একটা গোল মাথা, আর দুটো চোখ আর একটা হাসি হাসি মুখ। আমি সেই পুতুলটায় হাওয়া কমে গেলেই ফুঁ দিয়ে হাওয়া ভরে দিতাম, আর সঙ্গে সঙ্গে মুখের প্লাস্টিকের ছিপিটা লাগিয়ে দিতাম। সেই নিয়ে বুবুর কী হাসি! আর আমার নিজের ছিল একটা প্লাস্টিকের ব্যাট হলদেটে রঙের, আর তার সঙ্গে একটা লাল প্লাস্টিকের বল। সেই নিয়ে বাড়িতে আমিই সোবার্স, আমিই পাতৌদির নবাব। চার কি পাঁচ বছর বয়েস তখন আমার।

একটা নরম স্পর্শ ছিল সেই পুতুলটার। একটা অদ্ভুত মায়াময় স্পর্শ ছিল সেই ছোট্ট প্লাস্টিকের ব্যাট আর বলটার।

হাতের তেলোর ওপরে লাট্টু ঘোরানোর কথা আগেই বলেছি। কেমন একটা গা শিরশির করা অনুভূতি, ওই লাট্টুটার পেরেকটা হাতের নরম চামড়ার ওপর ফুর ফুর ফুর ফুর করে ঘুরছে। তারপর আস্তে আস্তে হাতটাকে কাৎ করে লাট্টুটা রাস্তার ওপর, বা বাড়ির মেঝের ওপর ঘুরন্ত অবস্থাতেই রেখে দিলাম। তখন ঘুরছে, ঘুরছে, ঘুরছে।

সেই MCMXLIX লেখা বাড়ি। গৌতম ঘোষদের বাড়ি।  একদিকে ভাড়া থাকতেন স্বনামধন্য নজরুলগীতির শিল্পী সুকুমার মিত্র।  আর একদিকে, একতলায় থাকত আমার বন্ধু তাপস দেব। - লেখক
সেই MCMXLIX লেখা বাড়ি। গৌতম ঘোষদের বাড়ি। একদিকে ভাড়া থাকতেন স্বনামধন্য নজরুলগীতির শিল্পী সুকুমার মিত্র। আর একদিকে, একতলায় থাকত আমার বন্ধু তাপস দেব। – লেখক

আমার ইস্কুলের বন্ধু তাপস দেব থাকত সেই এমসিএমএক্সএলআইএক্স বাড়িটার একতলায়। গৌতম ঘোষদের ভাড়াটে। তাপসের দিদিমা, কী অদ্ভুত, দিদিমাদের এসব করতে কখনো দেখি নি, সেই তাপসের দিদিমা আমাকে দেখিয়ে দিল লাট্টুর পেরেক বা শীষ শক্ত পাথরের মেঝেতে ঘষে ঘষে কীভাবে আরো অনেক বেশি ঘোরানো যায়। সায়েন্সটা তখন বুঝি নি। মনে হয়, শীষটা ঘষে ঘষে যদি তীক্ষ্ণভাবটা কমিয়ে গোলাকৃতি করে তোলা যায়, তাহলে মেঝেতে ঘর্ষণ বা ফ্রিকশন খুব কমিয়ে ফেলা যাবে, আর তার ফলে লাট্টু অনেক বেশিক্ষণ ধরে ঘুরবে। আর, যার লাট্টু যতক্ষণ বেশি ঘুরবে, বন্ধুদের কাছে তার তত বেশি প্রেস্টিজ—এ আর বলার কী আছে? এ তো সবাই জানে। তাপসের দিদিমার লাট্টু থামতেই চাইত না।

তারপর ছিল আমাদের চাকার মত হাতলাট্টু। যার ক্ষমতা আছে সব চাইতে লম্বা সূতো, বা আমরা যাকে বলতাম কার, সেই দিয়ে লাট্টু করর করর করে তিনবার চারবার কার ছেড়ে ছেড়ে তারপর একেবারে গুটিয়ে হাতে তুলে নিয়ে আসতে পারবে, সে চ্যাম্পিয়ন। এসব কাজে নেপাল ছিল খুব দক্ষ। আমাদের শিখিয়ে দিয়েছিল অনেক কিছু। এখনো যেন সেই হাতলাট্টু ঘোরানোর শব্দ শুনতে পাই, কররর কররর কররর কররর…

দুপুর বেলা ঝেঁপে বৃষ্টি এলো। আমাদের গোরাচাঁদের বাড়ির সামনে হিন্দুস্তানিদের বাড়ির টিনের বিরাট চালে তুমুল বৃষ্টির শব্দ হচ্ছে। ঝম ঝম, ঝম ঝম। সাদা ধোঁয়ার মত বৃষ্টির ছাঁট উড়ে উড়ে যাচ্ছে। কিচ্ছু দেখা যায় না। রাস্তায় জল জমছে একটু একটু করে। এ বৃষ্টি এখন থামবে না। আমাদের রবারের বল খেলার আজকে বারোটা বাজলো। বিকেল গড়িয়ে অন্ধকার হয়ে গেল। সূর্য পাটে নামল। সন্ধে হলো। উত্তর কলকাতার সরু রাস্তা। এখানে হেথা হোথা কেরোসিন লণ্ঠনের আলোর বদলে বাড়িতে বাড়িতে নরম নরম, হলদে হলদে ইলেকট্রিক বাল্বের আলো জ্বলে উঠলো একটা একটা করে।

শাঁখের সঙ্গে বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের যেন একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে।  আমাদের জগতে ছিল। যদিও আমাদের বাড়ি ধর্মের বেশি বাড়াবাড়ি কখনই ছিলনা, কিন্তু আমার পড়ার ঘরের এক কোণে তাকের ওপরে একটা মা কালীর বাঁধানো ছবি ছিল, আর তার পাশে এই রকমই একটা শাঁখ রাখা থাকত।  কালেভদ্রে মা সেটা বাজাত।  ওই হয়ত ভাইফোঁটা বা এমন কোনো বিশেষ দিনে। বা, আমার পৈতের দিনও বোধহয় বেজেছিল।  - লেখক
শাঁখের সঙ্গে বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের যেন একটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। আমাদের জগতে ছিল। যদিও আমাদের বাড়ি ধর্মের বেশি বাড়াবাড়ি কখনই ছিলনা, কিন্তু আমার পড়ার ঘরের এক কোণে তাকের ওপরে একটা মা কালীর বাঁধানো ছবি ছিল, আর তার পাশে এই রকমই একটা শাঁখ রাখা থাকত। কালেভদ্রে মা সেটা বাজাত। ওই হয়ত ভাইফোঁটা বা এমন কোনো বিশেষ দিনে। বা, আমার পৈতের দিনও বোধহয় বেজেছিল। – লেখক

ওদিকে শিবমন্দিরে ঘণ্টা বাজা শুরু হলো সন্ধে আরতির। চণ্ডীবাড়ির ঠাকুরমন্দিরে সেই বিরাট জালার মত ঢাকটা পেটানো শুরু হলো। ডুম ডুম ডুডুম… ডুম ডুম ডুডুম। আমাদের সামনের বাড়ির বাবলুদার জ্যাঠাইমা শাঁখ বাজাচ্ছে। ওদিকে বাজাচ্ছে টুকুনের মা। এই একবার বাজলো। দুবার, তিনবার। “ফুঁঊঊঊউ, ফুঁঊঊঊউ, ফুঁঊঊঊউঊঊঊ।”

এই জমা জলের মধ্যেই বেলফুল বিক্রি করতে এসেছে সেই লোকটা। “বেলিইই ফুল, বেলিইই ফুল, নেবেন নাকিইই বেলিইই ফুঊঊউল …”
রেডিওতে মজদুর মণ্ডলীর আসর শুরু হলো। সেই অদ্ভুত মিউজিকটা, “ঝিং ঝং ঝিং ঝং… ঝিং ঝং ঝিং ঝং… পোওওওওও…”
এবার রেডিও বন্ধ করে পড়তে বসতে হবে। বাবার কাজ থেকে ফেরার সময় হলো।
পৃথিবীর এইসব গল্প বেঁচে রবে চিরকাল;—এশিরিয়া ধুলো আজ—বেবিলন ছাই হয়ে আছে।

(কিস্তি ২৩)

Tags from the story
More from পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘটিকাহিনী (১৩)

আমাদের বাবা কাকা দাদু দিদাদের দেখলেই বাংলাদেশটা কেমন ছিল, সেটা একটু একটু...
Read More