ঘটিকাহিনী (২৩)

(আগের পর্ব)

জীবন, যৌবন, এবং জরুরি অবস্থা

জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ২৫শে জুন। আমি তখন কলেজে পড়ি।

হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট না হওয়ার জন্যে মন-টন খুব খারাপ ছিল। যাই হোক, তারপরেও নম্বর যা ছিল, তাতে প্রেসিডেন্সি কলেজেই ভর্তির পরীক্ষা দিতে পারতাম, এবং দিলে ভর্তি হয়েও যেতাম। বায়ো সায়েন্স পড়ার ইচ্ছে ছিল। ভাবছিলাম বোটানি বা জুলজি অনার্স পড়ব। ছোটমামা বুদ্ধি দিল, বিদ্যাসাগর কলেজে নাকি বায়ো সায়েন্স প্রেসিডেন্সির থেকেও ভালো। আমার মেন্টরিং ওই রকমই ছিল। কেউ কিছু বলে দেওয়ার নেই। পরামর্শ দেওয়ার নেই। বাবা তো কলকাতার এডুকেশন সিস্টেম কিছু বোঝেই না। ফলে, ছোটমামার বুদ্ধি নিয়েই বাবার সঙ্গে একদিন বিদ্যাসাগর কলেজে গিয়ে ভর্তি হয়ে গেলাম।

মনে আছে, সিঁড়ি দিয়ে উঠে গিয়ে সেই দোতলার অফিসে ফর্ম নেওয়ার ঠিক আগে বাবা আর একবার জিজ্ঞেস করলো, “কী পড়বে, ঠিক করেছ?” আমি বললাম, “বোটানি অনার্স পড়ব।” কারণ, শেষ মুহূর্তে মনে হলো, স্কটিশে তরুণবাবুর কাছে প্রাইভেটে বাড়িতে গিয়ে পড়তাম, আর উনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। বলতেন, তোর বোটানির ড্রয়িংগুলো খুব ভালো। উৎসাহ দিতেন খুব। আর জুলজির ছবিগুলো আঁকা শক্ত। ল্যাটিন নামগুলোও মনে রাখা একটু বেশি শক্ত। এই সব সাত পাঁচ ভেবে বোটানিতেই অনার্স নিয়ে নিলাম।

parthab logo

এই হলো আমার বায়োলজিস্ট হওয়ার প্রথম ইতিহাস। এখানে আমেরিকায় লোকে শুনলে হাসবে। কিন্তু আমার ওই রকমই মেন্টরিং ছিল।

বাবাকে অসহায় লাগছিল। বাবা ওখানকার শিক্ষাব্যবস্থা ভালো বোঝে না। চায়, আমি যেন সঠিক সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু নিজে আমাকে কোনো হেল্প করতে পারছে না। আর, আমার সিদ্ধান্তে বাধাও দিতে চায় না। আমার গায়ে সেদিন জ্বর। রীতিমত জ্বর। মনের ভেতরে এত টানাপোড়েন চলছে। কী করব, কী করব না। কী নেব, কোন কলেজে যাব, কিছুই ঠিকমত বুঝতে পারছি না। কিন্তু বুঝতে পারছি, এই ডিসিশনের ওপর আমার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। আমার বাড়ির, পরিবারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

অবশ্য, ছোটমামাকে বা বাবাকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। ব্লেম গেম খেলে কোনো লাভ নেই। ছোটমামাই প্রথম আমাকে বলেছিল, “বাবুয়া, তুমি সায়েন্স পোড়ো না। তুমি সায়েন্সের ছেলে না। তুমি ইংলিশ বা জার্নালিজম পড়ো।” তখন ছোটমামার কথা কে শোনে? সায়েন্স না পড়লে প্রেস্টিজ থাকবে? আমি হলাম গিয়ে একটা ব্রিলিয়ান্ট ছেলে, আর আমাকে বলে কিনা আর্টস পড়তে এখন? একবার রেজাল্ট খারাপ হয়ে গেছে বলে-কি আমি আসলে পড়াশোনায় খারাপ নাকি? এই ইগো আমার মাথায় চেপে বসেছিল।

ছোটমামা বলেছিল, “তুমি লিটারেচার নিয়ে পড়ো। তুমি লিটারেচারের ছেলে। স্কটিশে পড়ো। আমি নদাকে বলে দিচ্ছি।” নদা মানে স্কটিশ কলেজের কেমিস্ট্রির হেড অফ দা ডিপার্টমেন্ট অপরেশ ভট্টাচার্য। পরে ওখানে প্রিন্সিপাল হয়েছিলেন। সে সময়কার আদি কংগ্রেসের নেতা। সৎ, উন্নতশির মানুষ। ওদের ওই হরতুকি বাগানের সব ছেলের লোকাল গার্জেন একরকম। উনি বললেই আমার ওই কলেজে ইংলিশ বা জার্নালিজম অনার্সে ভর্তি হয়ে যেত। প্লাস, স্কটিশ চার্চ কলেজ কো-এড। ওখানে সব সুন্দর সুন্দর মেয়েরা পড়ে। তারা চশমা পরে কী সুন্দর করে হাসে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাস স্টপে! এগ রোল খায়।

কিন্তু আমি বোটানি অনার্স নিয়ে বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হলাম। এবং আরো অতলে তলিয়ে গেলাম।

অতলে তলিয়ে গেলাম, কারণ কলেজে গিয়ে দেখি পড়াশোনা কিছুই প্রায় হয় না। একদিকে কংগ্রেস পার্টি আর তার ছাত্র পরিষদ কলেজের ভেতর দিবারাত্র মাস্তানি করছে। নকশালদের মেরে শেষ করে দিয়ে সিদ্ধার্থশংকর রায় আর ইন্দিরা গান্ধী তখন পশ্চিমবঙ্গে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। সেই-যে সত্যজিৎ রায়ের জন অরণ্যে একটা ছবি আছে, মাও সে তুং-এর ছবি মুছে দিয়ে তার ওপরে ইন্দিরা গান্ধীর ছবি সর্বত্র আঁকা হচ্ছে দেওয়ালে, ঠিক সেই সময়টা। ইন্দিরা গান্ধীর বখাটে ছেলে সঞ্জীব, সঞ্জয় নাম ধারণ করে সারা ভারতে গুণ্ডাবাজী করে বেড়াচ্ছে। যা খুশি তাই করছে, আর মিডিয়া তাকে মাথায় তুলছে। “বন্দুকের নলই শক্তির উৎস,” বা “ডেবরা, গোপীবল্লভপুরে চারশো গ্রাম মুক্ত”—এসব শ্লোগান মুছে দিয়ে কলকাতার পাড়ায় পাড়ায় দেওয়ালে লেখা হচ্ছে, “এশিয়ার মুক্তিসূর্য ইন্দিরা গান্ধী লহ প্রণাম।” বা, “তোমার প্রিয় আমার প্রিয় প্রিয়-দা যুগ যুগ জীও।” কংগ্রেসের গুণ্ডারা কলকাতা, বর্ধমান, শিলিগুড়ি দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আনন্দবাজার, যুগান্তর, বসুমতী সব কাগজই তাদের স্তাবকতা করে যাচ্ছে। রেডিওতে দিবারাত্র ইন্দিরা গান্ধীর বক্তৃতা, আর নির্লজ্জ স্তাবকতা।

দেবকান্ত বড়ুয়া ইন্দিরা গান্ধী

সে সময়কার কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট আসামের দেবকান্ত বড়ুয়া ইন্দিরা গান্ধীকে “ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া” ঘোষণা করে বিখ্যাত হবার চেষ্টা করেছিলেন। স্তাবকতা এক নতুন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। – লেখক

কলেজে অনার্স ক্লাসে যাই সকালবেলা ভাত খেয়ে। বোনকে হোলি চাইল্ড স্কুলের সামনে ছেড়ে দিই। ও গেটের ভেতরে ঢুকে যায়। আমি সেখান থেকে দশ মিনিটের হাঁটা পথে বিদ্যাসাগর কলেজে চলে যাই শঙ্কর ঘোষ লেনে। একটা সরু গলির মধ্যে কলেজ। একতলায় সূর্যের আলো প্রবেশ করে না। অন্ধকার অন্ধকার পরিবেশ। ভোরবেলা মেয়েদের কলেজ। ওরা বেরিয়ে যায়, আর আমরা চাতক পাখির মত খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে তারপর ঢুকে পড়ি। আমাদের স্বপ্নাভ ম্যাথামেটিক্স অনার্স নিয়ে ওখানেই ভর্তি হয়েছে, আর মেয়েদের কলেজের কয়েকটা মেয়ের সঙ্গে এর মধ্যেই বেশ জমিয়ে ফেলেছে। অদ্ভুত ক্ষমতা। আমাকে একদিন আবার আলাপ করিয়ে দিল। তার মধ্যে একজন আজকের কংগ্রেস ও তৃণমূল নেত্রী মালা রায়। সেই ওপরের ঠোঁটের ওপর একটা আঁচিল। একদিন কফি হাউসে বসে খুব আড্ডা হলো ওদের সঙ্গে। আর একটা মিষ্টিমত মেয়ে ছিল, তার নামটা ভুলে গেছি।

ghoti 23 g

গলির মধ্যে বিদ্যাসাগর কলেজ। তিন তলায় বোটানি ডিপার্টমেন্ট। কলেজে পড়াশোনার পরিবেশ মোটেই ছিল না। ছাত্র পরিষদের তাণ্ডব একদিকে। আর একদিকে প্রেরণাহীন অধ্যাপক ও সতীর্থ সমাজ। ডুবে যেতে বসেছিলাম। – লেখক

স্বপ্নাভকে জিজ্ঞেস করে দেখা যেতে পারে। ও না, ভুলে গেছি। স্বপ্নাভ আর নেই।

যাই হোক, বয়েসটা কম, আর মনে উৎসাহ নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছি। কিন্তু আসলে আমি তো পড়াশোনায় খুব ভালো ছিলাম, অনেক বুদ্ধি ছিল, আর জানার ইচ্ছে ছিল তার থেকেও বেশি। আর এখানে যেসব ছেলেরা ভর্তি হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই চিরকাল ওই আমাদের স্কটিশের বি অথবা সি সেকশনের ছেলেদের মত। বেশির ভাগই প্রশ্ন করতে জানে না। চায় না। হাসতে জানে না। হই হই করতেও জানে না। এখানে ভর্তি হতে পেরেই তারা খুশি।

প্রফেসররাও মাঝারি মানের। ইংরিজিতে পড়ানো শুরু হয়েছে, কলেজ বলে কথা! কিন্তু সে ইংরিজি শুনলে হাসি পায়। একজন আমাদের অনার্সে ছিলেন, এম এম, অর্থাৎ মনোরঞ্জন মণ্ডল। ভদ্রলোক খুব খেটেখুটে পড়াতেন ফানজাই বা ছত্রাক, আর এল্জি বা শৈবাল। কিন্তু তাঁর সেই “দীশ ঈj নষটক, এন্ড দীশ ঈj এ এল্গী” শুনে আমাদের হাসি পেত প্রচণ্ড। আমরা মানে আমি, আর নতুন বন্ধু প্রতাপ মিত্র, সনৎ দে, আর প্রণয় ঘোষ। প্রতাপ আমাদের বাড়ির কাছেই হাতিবাগানে কার্তিক বোস লেনে থাকে, আর যথারীতি আমার খুব বন্ধু হয়ে গেছে, আর আমাদের বাড়ি এসেই ‘বাবুয়া’ ‘বাবুয়া’ বলে হাঁক পাড়ে অনেকটা সুব্রতর মতই, আর যথারীতি মা ওকে বাড়ির ছেলের মতই ভালোবেসে ফেলেছে। ওর ডাক নাম বুকাই। আমিও ওদের পাড়ায় যাই, আর ওর পাড়ার বন্ধু ভোঁদা, বাবলু, গোপাল, পঙ্কজ, বাবু, স্বপন এদের সঙ্গে আড্ডা দিই। ক্রিকেট ফুটবল, দাবা খেলি। সনৎ অনেক দূরে সেই খিদিরপুর থেকে আসে। আর প্রণয়ের কথা তো আগেই বলেছি, সেই বালেশ্বরের বিরাট ব্যবসায়ীর ছেলে, কলকাতায় আমহার্স্ট স্ট্রীটে ক্রাউন বোর্ডিংয়ে থেকে পড়াশুনো করে।

বোটানি ল্যাবরেটরি

অনেকটা এই রকমই ছিল আমাদের সেই বোটানি ল্যাবরেটরি। ছেলেরা সব ঘেঁষাঘেঁষি করে বসা। পুরনো মাইক্রোস্কোপ। ধূলিধূসরিত কাঠের ক্যাবিনেটের মধ্যে কিছু অব্যবহৃত ইনস্ট্রুমেন্ট। নিরাপত্তা অনুপস্থিত। একবার অ্যাসিড পড়ে গিয়ে আমার হাতে গভীর ক্ষত হয়ে গেল। – লেখক

সজল চক্রবর্তী একজন অধ্যাপক ছিলেন, তাঁর কথাবার্তা, পড়ানো সব কিছুই খুব স্মার্ট ছিল। তাঁর ভাই সমীর আবার আমাদের ক্লাসেই পড়ত, আর পড়াশোনায় একেবারে গোল্লা। তবলা বাজাত খুব ভালো, আর ওই সব গল্পই করত। আর ছিলেন আমাদের হেড অফ দা ডিপার্টমেন্ট ডিকেজি, বা দীপক গুপ্ত। তিনি ক্লাসে এসে বেশির ভাগ সময়তেই বোটানি ছাড়া অন্য সব আলোচনাতেই ব্যস্ত থাকতেন—ডিপার্টমেন্টে কোথায় পাখা সারানো হয় নি, কোথায় আজ ট্রাম বন্ধ, চালের কেজি কত করে যাচ্ছে—এইসব। আর আমরাও তাতে ইন্ধন যোগাতাম যাতে পড়াশোনাটা না হয়। সবচেয়ে বেশি ইন্ধন যোগাত ব্যাটা সনৎ। খুনসুটিতে ও একটা পাণ্ডার শিরোমণি। এই ছিল আমাদের বিদ্যাসাগর কলেজের প্রথম দুটো বছর। এর মধ্যে অনার্স কারা রাখতে পারবে, তার একটা কোয়ালিফাইং পরীক্ষা হয়ে গেল, এবং আমরা তাতে সসম্মানে পাশও করে গেলাম। করব না কেন? প্রতাপ এসেছিল লা মার্টিনিয়ার স্কুল থেকে। ভালো ছাত্র। আমি স্কটিশের সদ্য-নক্ষত্র-পতন। আমরা ইচ্ছে করলেই প্রেসিডেন্সি কলেজে যেতে পারতাম। এই বিদ্যাসাগরের ছাগলদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করতে হত না।

ছাগল? সত্যি, যদিও শুনলে মনে হবে উচ্চনাসা মন্তব্য, এলিটিস্ট, কিন্তু ভুল সিদ্ধান্তের শিকার মেধাবী ও জ্ঞান-অনুসন্ধিৎসু ছেলেমেয়েদের যদি আলোর আকাশ থেকে জামার কলার ধরে টেনে এনে গরাদ দেওয়া অন্ধকার ঘরের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলা হয়, তাহলে তাদের যে-অবস্থা হয়, আমারও তাই হয়েছিল। একদিকে পড়াশোনায় কোনো চ্যালেঞ্জ নেই। কী পড়ছি তাও জানি না। কেন পড়ছি তাও না। অন্ধকার অন্ধকার ঘরে অনেকগুলো ছেলে গাদাগাদি করে পাস কোর্সের ক্লাস করছে। সেই অনেকটা অপরাজিত সিনেমার সিটি কলেজের ক্লাসের মত। প্রক্সি দিয়ে কেটে পড়লেই হলো।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এই মহাপুরুষ যখন তাঁর কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান অনেক উঁচু ছিল। খোলামেলা পরিবেশও ছিল। এখনকার পরিবেশ ভেতরে ও বাইরে দুইই দ্রুত নিম্নগামী হয়েছে। – লেখক

অধ্যাপকরা কোনো ইন্সপিরেশন দিতে পারেন না। সহছাত্ররা আমারই মত দিশাহীন। হঠাৎ হয়ত অনার্স লাইব্রেরি থেকে একটা ভীষণ দুর্বোধ্য আর্নল্ডের প্যালিওবোটানির বই নিয়ে এলাম, তারপর দু সপ্তাহ রেখে দিয়ে আবার ফেরৎ দিয়ে দিলাম। কিছুই পড়া হল না। এর মধ্যে একদিন আমরা যখন ল্যাবরেটরিতে সেলাজিনেলার স্লাইড তৈরি করছি, আর গলানো মোম, জাইলল আর ক্যানাডা বাল্সামের গন্ধ শুঁকছি প্রাণভরে, তখন ছাত্র পরিষদের গুণ্ডারা মারধোর করে আমাদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে ওদের মিছিলে জুড়ে দিল, কারণ ময়দানে মুক্তিসূর্য বক্তৃতা দিতে আসবেন। আমরাও তেমনি, দশ মিনিট হেঁটে গিয়েই কায়দা করে কেটে পড়লাম, আর বাকি দুপুরটা একটা সিনেমা হলে পঁয়ষট্টি পয়সার টিকিট কেটে কী একটা ভয়ঙ্কর হিন্দি সিনেমা দেখে কাটিয়ে দিলাম। ভয়ঙ্কর সিনেমা, ভয়ঙ্কর চীৎকার করে গান আর নাচ, আর গুলিগোলা। শেষকালে ভিলেনের পতন ও মূর্ছা, এবং নায়ক ও নায়িকার মিলনদৃশ্য।

অত্যন্ত নিম্নমানের ছাত্ররা দেখি আমাদের কলেজে ছাত্র পরিষদের নেতা হয়ে বসে আছে। তার মধ্যে আমাদের স্কটিশের ব্যাকবেঞ্চারও দু একটা আছে। তারা এখন আমাদের বসের মত আচরণ করে।

এর মধ্যে আমি একটা দুঃসাহসিক কাজ করে বসলাম। বিদ্যাসাগর কলেজের ম্যাগাজিন বেরোবে, সেই উপলক্ষ্যে ছাত্রদের কাছ থেকে লেখা চাওয়া হলো। আমি একটা লেখা দিলাম, তাতে একটা হাসির মোড়ক দেওয়া কাহিনী ছিল স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে। এক হেডমাস্টার তাঁর অধস্তন শিক্ষকদের যা বলছেন, তারা তাই করছে। তিনি বলছেন, “কান ধরুন।” তারা কান ধরছে। তিনি বলছেন, “টেবিলের নিচে গুঁড়ি মেরে ঢুকে পড়ুন।” তারা ঢুকে পড়ছে। এই সব। তিনি বলছেন, “এবার লাফান, আর হাসুন জোরে জোরে।” এইসব। মনে আছে, গৌরকিশোর ঘোষের একটা রচনা পড়ে প্রেরণা পেয়েছিলাম লেখার। সে লেখা পড়ে ছাত্র পরিষদের সেই নেতারা এমনি চটে গেলেন-যে আমাকে ডেকে পাঠালেন “স্পেশাল মিটিং” করবেন বলে। শোনা গেল, ঠিক সেই স্কটিশের নকশাল নেতাদের মত এঁরাও আমাকে “খুঁজছেন।” অদ্ভুত কথা, দেখা গেল, এই ছাত্র পরিষদের নেতারা কেউ কেউ পূর্ব জীবনে নকশাল নেতা ছিলেন। এখন ভোল পাল্টে সাধু হয়েছেন। পূর্ব অভিজ্ঞতা স্মরণ করে আমি তাঁদের সে স্পেশাল মিটিং অ্যাটেন্ড না করার সিদ্ধান্ত নিলাম। লেখাটা আর দিনের আলো দেখল না।

চারু মজুমদারের অবহেলিত মূর্তি

নকশালবাড়ি এলাকায় সে আন্দোলনের এক প্রধান পুরুষ চারু মজুমদারের অবহেলিত মূর্তি। নকশালবাড়ি এখনো চরম দারিদ্র্য-কবলিত চা বাগান এলাকা। চারু মজুমদারকেও জেলে অত্যাচার করে মেরেছিল কংগ্রেসের পুলিশ ও মিলিটারি। – লেখক

পার্ট ওয়ান পরীক্ষায় এত বীভৎস খারাপ রেজাল্ট করলাম-যে অনার্স থাকে কিনা সন্দেহ। কোনো রকমে উৎরে গেলাম। গরমের ছুটি শুরু হলো। আর শুরু হলো জরুরি অবস্থা। একদিন যখন আমি সকালবেলা বাড়ির জানলায় বসে আছি, আমাদের বন্ধু অলক মিত্র কোথা থেকে ফিরতে ফিরতে আমাকে জানিয়ে গেল, ইন্দিরা গান্ধী এমারজেন্সি ঘোষণা করেছেন। তার মানে কী? জানা গেল, কিছুদিন আগে তাঁর নির্বাচন অবৈধ বলে এলাহাবাদ হাইকোর্ট যে-রায় দিয়েছিল, তা নাকচ করে দিয়ে তিনি নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হাতে নিয়েছেন দিল্লির মসনদে, এবং গণতন্ত্র এখন শিকেয় তোলা থাকবে। সব বিরোধী দলের নেতাদের তিনি জেলে পুরেছেন, এবং মিডিয়ার ওপর সেন্সরশিপ জারি করেছেন। অটলবিহারী বাজপেয়ী, মোরারজি দেশাই, আদভানি, জর্জ ফার্নান্ডেজ, মধু লিমায়ে, রাজ নারায়ণ, বম্বের দাপুটে সোসালিস্ট ইউনিয়ন নেত্রী মৃণাল গোরে এঁরা সব জেলে। ইন্দিরাবিরোধী কোনো কথা বললেই পুলিশ তাকে জেলে নিয়ে যাবে।

ইন্ডিয়ান হেরাল্ড কাগজে জরুরি অবস্থা জারির খবর পরের দিন। এর পরেই সেন্সরশিপের খপ্পরে পড়ে সব কাগজ। ইন্ডিয়ান হেরাল্ড ক্রমে বন্ধ হয়ে যায়। - লেখক

ইন্ডিয়ান হেরাল্ড কাগজে জরুরি অবস্থা জারির খবর পরের দিন। এর পরেই সেন্সরশিপের খপ্পরে পড়ে সব কাগজ। ইন্ডিয়ান হেরাল্ড ক্রমে বন্ধ হয়ে যায়। – লেখক

অলকও আমাদের বিদ্যাসাগরে পড়ত। আমরা মনের আনন্দে বেশ টেবিল টেনিস খেলে দিন কাটাচ্ছিলাম একতলার অন্ধকার কমন রুমে। এর মধ্যে ব্যাটা এই সব আজে বাজে কথা বলে আমার মাথাটা গরম করে দিয়ে চলে গেল হাসতে হাসতে, বাজারের থলে দোলাতে দোলাতে। এখন আমি কী করি?

খোঁজ খবর নিতে শুরু করলাম আমাদের আর এস এসের লোকেদের কাছ থেকে। জানা গেল, ব্যাপার আরও বেশ বাজে। পরিস্থিতি জটিল। আমাদের সংঘের ছাব্বিশ নম্বর, অর্থাৎ ২৬ বিধান সরণীর অফিস থেকে সুনীলদা, আর কাকে কাকে পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেছে, এবং মিসা নামক এক কালা আইনে তাদের জেল হয়েছে অনির্দিষ্ট কালের জন্যে। আমাদেরও ধরে নিয়ে যেতে পারে বাড়ি থেকে। সুতরাং, সাবধান। সিপিএম বা সিপিআই, আরএসপি ওদের ধরছে না, কিন্তু বাকি সবাইকে ধরছে।

জয়প্রকাশ নারায়ণ, যিনি বিহার ও গুজরাটে বিশাল বিশাল স্বৈরাচার-বিরোধী, ‘নবনির্মাণ’ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, এবং কলকাতায় এসেও বড় বড় মিছিল করে গেছেন, তাঁকে সবচেয়ে আগে জেলে নিয়ে গেছে। এই জয়প্রকাশ বা জেপির এক মিছিলে মমতা ব্যানার্জী তাঁর ছাত্র পরিষদের গুণ্ডাদের দিয়ে মিছিল আটকে দিয়েছিলেন, এবং জেপিকে সে রাতে বই পাড়ার ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে আসতেই দেওয়া হয় নি। বক্তৃতা দিতে দেওয়া হয় নি। এ আমার নিজের চোখে দেখা। সোসালিস্ট নেতা সন্দীপ দাসকে এমন পাথর ছুঁড়ে মারলো ওরা, তিনি রক্তাক্ত হয়ে হলের মধ্যে এসে আমাদের তা দেখালেন। আমার নিজের চোখে দেখা। দ্রুত গভীরে জড়িয়ে পড়ছিলাম।

প্রথমেই যেটা করা হলো আমাদের বাড়ি, সেটা হলো বাবার কাছে বহু বছর ধরে থাকা আর এস এসের নানা রকম বই, চিঠি, পুরনো রাজনৈতিক দলিল জাতীয় তথ্য—এসব আমরা দুজনে মিলে বাড়ির মধ্যেই আগুন জ্বেলে একটু একটু করে পুড়িয়ে ফেললাম। বিশেষ করে মা চাইছিল না আমরা দুজন জেলে গিয়ে বসে থাকি। মা জানত গান্ধিহত্যার পর বাবার জেলে যাওয়ার ইতিহাস। এক জীবনে একবারই যথেষ্ট। আর আমার জেলে যাবার যে বেশ ভালই সম্ভাবনা আছে, সেটাও মা আঁচ করেছিল।

জয়প্রকাশ নারায়ণ

সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের বিশাল সমাবেশ স্বৈরতন্ত্র, দুর্নীতি ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে।  – লেখক

জয়প্রকাশ নারায়ণ

আমি এই নেতাকে (জয়প্রকাশ নারায়ণ) খুব কাছ থেকে দেখেছি। ইন্দিরা গান্ধীর জেলে এঁকে স্লো পয়জনিং করে শেষ করে দেওয়া হয়েছিল, এমনই বলা হয়ে থাকে। জেল থেকে বেরিয়ে আসার পরে পরেই এঁর মৃত্যু হয়। – লেখক

কিন্তু আঁচ আমি ভালবাসি খুবই। সুতরাং, এবার আমি গোপনে আর এস এসের আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাওয়া নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম, এবং বললাম, আমি কাজ করতে চাই দেশের এই দুর্দিনে। ওঁরা আমার আবেগতাড়িত মস্তিষ্কের ও পরিশ্রমের কথা জানতেন। একাত্তর সালে বর্ধমান অফিসার্স ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে ফিরে এসে যখন দেখলাম গোয়াবাগান শাখা জনশূন্য, তখন আমি আক্ষরিক ভাবে একা একা শাখা শুরু করেছিলাম, এবং কয়েক মাসের প্রচেষ্টায় একটু একটু করে অনেক ছেলেকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলাম।

তাঁরা তো লুফে নিলেন আমার প্রস্তাব। আমার কাজ হলো, কলেজ স্ট্রিট বাটার ঠিক পেছনে একটা বাড়িতে লুকিয়ে গণেশ দেবশর্মা, কেশব দীক্ষিত, অমলকুমার বসু, বংশীলাল সোনি—এসব বড় বড় নেতা ও প্রচারকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা ও তাঁদের কথা শুনে কাজ করা। বিশেষ করে, আমার লেখালেখির দক্ষতা জেনে ওঁরা আমাকে গণেশদার সঙ্গে জুড়ে দিলেন। আমি বাংলায় জরুরি অবস্থা-বিরোধী প্যাম্ফলেট লিখে নিয়ে গিয়ে ছাপাতাম দু একটা লুকোনো প্রেসে, আর তারপর বান্ডিল বান্ডিল করে কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় লোকের কাছে পৌঁছে দিয়ে আসতাম। আমি নিজেও অনেক বিলি করতাম রাতের অন্ধকারে, পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে, লোকদের লেটার বক্সে ফেলে দিয়ে।

পবন বলে আর একটা ছেলে ছিল বড়বাজারের শাখার। সেও ওই কাজ করত, তবে হিন্দি লিটারেচার ছাপাত।

সে প্যাম্ফলেটের বেশির ভাগ খবরই ছিল অতিরঞ্জিত। যেমন, হাজার হাজার লোককে জেলে নিয়ে গেছে এই কলকাতা থেকে। তাদের নাকি টর্চার করছে ইন্দিরা গান্ধীর পুলিশ। তার ভয়ঙ্কর সব বর্ণনা। কলকাতায় জরুরি অবস্থার থাবা তেমন এসে পড়েই নি। কারণ, সিপিএম এরা সব জেলের বাইরেই ছিল। পুরো ব্যাপারটাই ছিল দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে, ন্যাশনালিস্টদের নেতৃত্ব গড়ে তোলার বিরুদ্ধে সোভিয়েট-পন্থীদের এক ধরনের পলিটিকাল ম্যানুভার। বামপন্থীদের খুব একটা স্পর্শই করা হয় নি, ওই জর্জ ফার্নান্ডেজ, মৃণাল গোরে জাতীয় দু চারজনকে ছাড়া। নবনির্মাণ আন্দোলন যদিও জেপির মত একজন সোশালিস্টই শুরু করেছিলেন নেতৃত্ব দিতে, কিন্তু তার পেছনে আসল শক্তিটা প্রথম থেকেই ছিল আর এস এস, এবং তার রাজনৈতিক ফ্রন্ট জনসংঘ ও ছাত্র ফ্রন্ট বিদ্যার্থী পরিষদ। বিহারে রাম বাহাদুর রাই ও দিল্লিতে অরুণ জেটলি, মদনদাস দেবী ও গোবিন্দ আচার্য্যের মত বিদ্যার্থী পরিষদের নেতারা। আমেরিকা এবং সি আই এ মোরারজি দেশাইয়ের মত কট্টর দক্ষিণপন্থী, মার্কিন-পন্থী নেতাকে পেছন থেকে মদত দিচ্ছিল, এবং শেষ পর্যন্ত তাকেই ইন্দিরার পরে ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী করলো। এসব কথা আজ ইতিহাস।

কিন্তু সেসব কথা তখন কে বিশ্লেষণ করে? আমাদের রক্ত গরম তখন। দরকারি সত্যি কথাও একটু থাকত। যেমন, রেজিস্টেন্স আন্দোলন শুরু হচ্ছে। সত্যি সত্যি শুরু হয়ে গেল। অফিসপাড়া ডালহৌসির স্টিফেন হাউস বলে একটা বাড়ির সামনে হঠাৎ একদিন রাস্তায় লাফিয়ে পড়ে পঁচিশ তিরিশজন আর এস এসের আর নবনির্মাণ আন্দোলনের ছেলে ইন্দিরা গান্ধী-বিরোধী শ্লোগান দিতে আরম্ভ করলো, আর একটা কালো পুলিশের ভ্যান তাদের সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিয়ে চলে গেল। এই শুরু হলো জরুরি অবস্থা-বিরোধী, এবং স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলন। সারা ভারতেই নাকি এবার এই আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে।

এখন আমার দায়িত্ব আরো বাড়লো। আমি কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে কারা কারা এবার জেল ভরো “সত্যাগ্রহ” আন্দোলনে যাবে, তাদের সঙ্গে কথা বলতে আরম্ভ করলাম। বাঙালিদের মধ্যে। এছাড়া, যারা জেলে গিয়ে বসে আছে, তাদের ফ্যামিলির সঙ্গে দেখা করা মাঝে মাঝে, আর জেলের গেটে গিয়ে ভিজিটিং আওয়ারে তাদের সঙ্গে কথা বলা। মনের জোর দেওয়া।

মোটামুটি ঠিক হয়ে গেল, যারা যারা জেলে যাবে, তারা আগামী কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন জায়গায় সত্যাগ্রহ করবে, অর্থাৎ ওই স্টিফেন হাউসের সামনে যেভাবে শুরু হয়েছিল প্রক্রিয়াটা, তা করে যাবে। তারপর, শেষের দিকে আমি নিজে ওদের সঙ্গে যুক্ত হব, এবং কারাবরণ করব। উত্তেজনায় রাতে ঘুম হয় না। তার ওপর ঘুম না হবার আর একটা কারণ, আমার এক চেলা সমর দাসকে নিয়ে রাত তিনটে কি সাড়ে তিনটের সময়ে পোস্টার লিখে বড় রাস্তায় আঠা দিয়ে আটকে দেওয়া। ধরা পড়লে পুলিশের লাঠি শরীরের বিশেষ কোমল স্থানে বলপূর্বক প্রবেশের খুবই সম্ভাবনা ছিল। মার তো বিপদের আশঙ্কায় পাগল হয়ে যাবার উপক্রম! কিন্তু শহীদের মা-দের ওরকম হয়েই থাকে। বিনয়-বাদল-দীনেশের মা-দেরও হয়েছিল। আমরা হলাম আজকের বিনয়-বাদল-দীনেশ। আমরা হলাম ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, সূর্য সেন। সূর্য সেন, বাঘা যতীনের মাও পাগল হয়ে গেছিলেন। মানে, হয়েছিলেন কিনা ঠিক জানা নেই, কিন্তু হবারই কথা ছিল আর কি।

সঞ্জয় গান্ধী

ইন্দিরা গান্ধীর বখাটে ছেলে সঞ্জীব, সঞ্জয় নাম ধারণ করে সারা ভারতে গুণ্ডাবাজী করে বেড়াচ্ছে। যা খুশি তাই করছে, আর মিডিয়া তাকে মাথায় তুলছে। – লেখক

একটা অদ্ভুত জিনিস ওই সময়ে দেখেছিলাম। আমাদের কম বয়েসে যারা আমাদের আর এস এসে নিয়ে আসবার জন্যে লেগে থাকত, আর অনেক বড় বড় জ্ঞান দিত, এই জরুরি অবস্থার সময়ে তারা দেখি নব্বই ভাগই অদৃশ্য হয়ে গেছে। সোজা বাংলায় যাকে বলে হাপিস। একদিন নির্মল চন্দ্র স্ট্রিটে একটা ব্যাঙ্কে খুঁজে খুঁজে গেলাম সেই নারায়ণ বোসকে একটা বাংলা প্যাম্ফলেট দিতে। ভদ্রলোক তো প্রায় চেয়ার থেকে উল্টে পড়ে যান আর কি! এই সেই নারায়ণদা, গুরুজী গোলওয়ালকার যখন আমাদের গোয়াবাগান শাখায় এসেছিলেন সেই সত্তরের রক্তাক্ত দিনগুলোতে, তখন আমাদের মুখ্যশিক্ষক ছিল, আর বিপুল সংখ্যক ছেলে শাখায় কুচকাওয়াজ আর ব্যান্ডের মাধ্যমে ওদের সেই ভারতবিখ্যাত তাত্ত্বিক নেতাকে সংবর্ধনা দিয়েছিল। নারায়ণদা রাতারাতি ফেমাস। সেই নারায়ণদা আমাকে এখন কাটিয়ে দিতে পারলে বাঁচে। তারপর, আমাদের পাড়ার গোপীচাঁদ রস্তোগী, একটা স্কুলের টিচার। হিন্দি প্যাম্ফলেট দিতে গেলাম, নেবে না কিছুতেই। এদিকে বাড়ি বয়ে এসে আমাদের বলে গেল সব লিটারেচার পুড়িয়ে ফেলতে। সেই গোপীচাঁদ, যিনি আমাকে সুভাষ রায়ের বাজে কোচিং ক্লাসে জুতে দিয়েছিলেন। এমন আরো কতজনকেই দেখলাম।

কিন্তু, শেষ পর্যন্ত আমি জেলে যাই নি। আমার মার শরীর ক্রমশই খারাপের দিকে যাচ্ছিল। মার চোখে জল আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে। আমার বিবেকদংশন হয়েছিল খুব। কিন্তু আমি আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মী হয়ে এত কাজ করেছিলাম সেই সময়ে-যে জেলে না গেলেও আমি চুপচাপ বসে থাকি নি। অনেক ঝুঁকি নিয়ে অনেক কাজ করেছি সেই সময়ে, এবং আর এস এসের বড় বড় লিডার আমাকে লক্ষ্য করছিলেন। ঊনিশশো সাতাত্তরের মাঝামাঝি যখন জরুরি অবস্থা উঠে গেল, আর জনতা পার্টি প্রতিষ্ঠা হলো সব নেতারা জেল থেকে বেরিয়ে আসার পর, তখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে আমাকে জনসংঘের ও বিদ্যার্থী পরিষদের প্রতিনিধি দলে পাঠানো হলো দিল্লিতে সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবার জন্যে। সেখানে জনসংঘ, আদি কংগ্রেস, ভারতীয় লোক দল  আর সোসালিস্ট পার্টির একটা শাখা একসঙ্গে মিশে গিয়ে জনতা ফ্রন্ট থেকে জনতা দল তৈরি করবে। সেই অনুষ্ঠানে হঠাৎ ইন্দিরা কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতা জগজীবন রাম জনতা দলে এসে যোগ দিলেন মিটিংয়ের মঞ্চেই। আমাদের একেবারে সামনে। সে কী হাততালি!

সেই সময়কার জনতা ফ্রন্টের নেতারা

সেই সময়কার জনতা ফ্রন্টের নেতারা। জয়প্রকাশ নারায়ণ, জে. বি. কৃপালনি, মোরারজি দেশাই ও অটলবিহারী বাজপেয়ী। শেষের দুজন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। – লেখক

আমার তখন পার্ট টু অনার্স পরীক্ষা দেওয়াও শেষ হয়ে গেছে, এবং দীপক গুপ্তর বাড়ির প্রাইভেট কোচিংয়ে পড়ে আমি এক বছরের মধ্যেই পিছিয়ে পড়া ছাত্র থেকে আবার সামনের সারির ছাত্র হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছি। পার্ট ওয়ানের ভয়ঙ্কর ঘাটতি মেকআপ করে এম এস সিতে চান্স পেয়ে যাবই, এখন এমন একটা আশাও জেগেছে। ডিকেজি’কে কখনো ভুলতে পারব না। জীবনটা, লেখাপড়াটা, নিজের প্রতি বিশ্বাসটা শেষ হয়ে যেতে বসেছিল। উনি আমাকে আর প্রতাপকে ফ্রিতে পড়াতেন। আমাদের আগে কখনো উনি কোনো ছাত্রকে প্রাইভেটে পড়ান নি। শুধু ছাত্রীদের পড়াতেন, আর তারা সবাই দারুণ রেজাল্ট করত। বোটানির যাদুকর শিক্ষক ছিলেন দীপকবাবু।

দিল্লি গিয়ে আমি পরিচিত হলাম বিদ্যার্থী পরিষদের রাজকুমার ভাটিয়া, মদনদাস দেবী, রামবাহাদুর রাই এসব বড় বড় নেতার সঙ্গে। আমাকে আর এস এস প্রচারক লক্ষ্মীনারায়ণ ভালা এর আগেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন পশ্চিম বাংলার বিদ্যার্থী পরিষদের অন্যতম রাজ্য সম্পাদকের। আমরা কলকাতায় একটা বড় কনফারেন্স করলাম, আর কলেজ স্ট্রিটে বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে বড় মিটিং করলাম। বক্তা—সুব্রামানিয়ান স্বামী, আর অধম এই আমি। আনন্দবাজারের প্রথম পাতায় ছবি বেরিয়েছিল।

তারকা মধ্যগগনে উঠছিল। এখানে সেখানে বক্তৃতা দিতে যেতাম—আজ কলেজ স্ট্রিট বই পাড়ায়, কাল হাওড়া বিজয়কৃষ্ণ গার্লস কলেজ, পরশু অন্য কোথাও। সভা সমিতি, মিছিল লেগেই আছে। আর এস এসের সবাই আমাকে চেনে। জিতেন ব্যানার্জীর ছেলে বলে নয়, আমার নিজের পরিচয়েই চেনে এখন। আমার বক্তৃতা, আমার লেখার প্রশংসা করে। অনেক নতুন নতুন ছেলে আসছে আমাদের ২৭/১বি বিধান সরণির নতুন অফিসে। মেয়েরাও আসছে।

কিন্তু তারকা মধ্যগগনে বেশিদিন টিঁকলো না। ধুমকেতুর মত যেমন উঠেছিল, তেমনি ধুমকেতুর মতই হঠাৎ লেজ তুলে দ্রুত অদৃশ্য হলো। দিল্লি থেকে ফেরবার পথে আমি কানপুরে আমার ছোটকাকু দীপেন্দ্রনাথের বাড়ি বেড়াতে গেছিলাম এক সপ্তাহের জন্যে। সাতাত্তরের ১০ই মে, কলকাতায় ফিরে যাবার একদিন আগে আমি সকালবেলা ছাত থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে জলে পা পিছলে আছাড় খেলাম, এবং পিঠে শিরদাঁড়া ফ্র্যাকচার হলো। ভয়ঙ্কর আঘাত। অজ্ঞান হয়ে থাকলাম এক ঘণ্টা। তারপর ডাক্তার। ছোটকাকু একদিনের ছুটি নিয়ে কলকাতায় বাড়ি পৌঁছে দিল, কারণ আমি কানপুরের হাসপাতালে মরতে চাই নি। ছোটকাকু আর কাকিমা মাকে খুব ভালবাসত। মার কাছে ছেলেকে ফিরিয়ে দিয়ে গেল।

আবার সেই ডাক্তার সিনহা। তারপর অর্থোপেডিক স্পেশালিস্ট। অ্যাম্বুলেন্স করে নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ। ডাক্তার বললেন, বেঁচে যাবে, তবে শক্ত গদিহীন বিছানায় কাঠের ওপর একটা চাদর পেতে বালিশ ছাড়া দু মাস কি তিনমাস একটানা শুয়ে থাকতে হবে। ভাঙা ভারটিব্রা নিজে নিজেই জোড়া লেগে যাবে। বয়েস কম যখন।

ওঠা একেবারে বারণ। বাথরুমে যাওয়া বারণ। বেডপ্যান, এবং বোতল। বাবা অফিসে যাবার আগে আমাকে পরিষ্কার করে দিয়ে যায়।

মা আর আমি বাড়িতে। আর আমার অনেক ছোট বোন। বাড়িতেই ভীষণ, ভীষণ জরুরি অবস্থা।

(কিস্তি ২৪)

About Author

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় তিরিশ বছর ধরে আমেরিকায় আছেন। কলকাতায় ছিলেন জীবনের অর্ধেক। এখন স্থায়ীভাবে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। মানবাধিকার, বিশেষত ইমিগ্র্যান্টদের অধিকার ও শ্রমিক ইউনিয়ন—এই দুই বিষয়ে পেশাদারিত্ব। ইলিনয় থেকে পি এইচ ডি করার পর বিজ্ঞান ছেড়ে সাংবাদিকতা ও হিউম্যানিটিস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। শৈশব থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আর এস এস ও বিজেপির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার পর রাজনৈতিক ও আদর্শগত কারণে বেরিয়ে আসেন। তাদের সম্পর্কে বই ও নানা রচনা লেখেন। রাজনীতি ছাড়া বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ। সাংস্কৃতিক সংকট ও বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক আগ্রাসন সম্পর্কে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Partha Banerjee) বিশ্লেষণ ইউটিউব ও ফেসবুকে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রসংগীতে ও বাংলা আধুনিক গানে বিশেষ উৎসাহ। ২০১২ সালে কলকাতা থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের সিডি "আরো একটু বসো" প্রকাশিত হয়। বাংলা ও ইংরাজিতে লেখেন। উইকিপিডিয়া লিংক: http://en.wikipedia.org/wiki/Partha_Banerjee