ঘটিকাহিনী (২৪)

(আগের পর্ব)

জগৎ পারাবারের তীরে

কী হতে কী হয়ে গেল!

যেভাবে একদিনের নোটিশে দিল্লি গিয়েছিলাম, হয়ত সেটাই মনের ভেতরে একটা ভয়ের সৃষ্টি করেছিল। কী যেন হচ্ছিল মনের অনেক গভীরে, ঠিক বলে বোঝানো যাবে না। কেন এভাবে গেলাম? না গেলে কী এমন ক্ষতি হত? সেই আর এস এসের হেডকোয়ার্টার্স থেকে জরুরি তলব এলো কেশব দীক্ষিতের, বললেন আমাকে নির্বাচিত করা হয়েছে দিল্লি যাবার জন্যে। সব খরচ, ট্রেনভাড়া, থাকা খাওয়া সব ওঁরাই দেবেন। পয়সা লাগবে না, আর আমি দিল্লি যাব? ওঃ, সে তো বিশাল ব্যাপার! এমন তো কখনো শুনি নি জীবনেও!

parthab logo

আহ্লাদে আটখানা হয়ে পরের দিনই রওনা হবার জন্যে তৈরি হয়ে গেলাম। বাক্স বিছানা রেডি। সেই আমাদের পুরনো সবুজ রঙের হোল্ডল, যেটা আমাদের সঙ্গে বারবার কাশী গেছে। বেল্ট দেওয়া ওপরে, বাবা তার ওপর বসে পড়ে একটা হাস্যকর ভাবে সেই বকলেসগুলো বাঁধত। আমরা হাসতাম দেখে। ভেতরে একটা বালিশ, সতরঞ্চি, তোশক, চাদর। একটা গামছা।

মার কথা একবারও ভাবলাম না। নিজের ভবিষ্যতের কথা একবারও ভাবলাম না। ভাবলাম, আমি এখন এক রাইজিং স্টার। আমাকে দিল্লি পাঠাচ্ছে, তার মানে আমি একজন অতি সম্মানিত ব্যক্তি। সেলিব্রিটি। কই, সবাইকে তো পাঠাচ্ছে না। আমাকে পাঠাচ্ছে। আমি যাব না কেন? বড় বড় লোকেদের সঙ্গে দেখা হবে, বড় বড় পলিটিক্সের কথা হবে, তাদের সঙ্গে থাকব, বেড়াব, মিটিংয়ে যাব। এই ইগো, অহংমন্যতা আমার এত বেশি ছিল সেই সময়ে। মার কথা আমি তেমন গ্রাহ্যই করতাম না। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। বাবাকে যেমন দেখেছি, তেমনি শিখেছি। তাছাড়া ভাবতাম, ছোটমামা যদি কংগ্রেসের রাইজিং স্টার হতে পারে, তাহলে আমি জনসংঘ, বিদ্যার্থী পরিষদ, জনতা পার্টির নতুন তারকা হতে পারব না কেন?

যেহেতু আর এস এসে আমার মত মূর্খকেও ইন্টেলেকচুয়াল ভাবা হত, সুতরাং আমি কখনো ভালো করে বুঝিই নি আমি কত বড় মূর্খ! কোনো পড়াশোনা নেই, কোনো বিশ্লেষণ নেই, কোনো মেন্টরিং নেই। কিন্তু আমি ভাবছি আমি পণ্ডিত। আমি ভাবছি আমি এক উদীয়মান নেতা। আর এস এসের বাংলা সাপ্তাহিক স্বস্তিকাতে লেখা ছাপায় আমার। সেসব লেখা আজ পড়লে নিজেরই লজ্জা করে। লুকিয়ে-পড়তে ইচ্ছে করে।

আর এস এস থেকে জনসংঘ

আর এস এস থেকে জনসংঘ, আর তারপর জনসংঘ থেকে জনতা পার্টি, এবং সবশেষে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি।—হিন্দু মৌলবাদের উত্থানের একটা ছবি। কে ভেবেছিল একেবারে একটা প্রান্তিক রাজনৈতিক শক্তি পঞ্চাশ বছরের মধ্যে ভারতের শাসক শক্তিতে পরিণত হবে? থার্ড রাইখের উত্থানের সঙ্গে কী আশ্চর্য মিল! – লেখক

আমি ভাবলাম, এই যে গত দু বছর ধরে এত আন্ডারগ্রাউন্ড কাজ করলাম, এটা তো তারই স্বীকৃতি। এই যে আমি রাত জেগে পোস্টার লাগাতাম। এই যে আমি জেলের গেটে গিয়ে তপন ঘোষ, সমর দাস, উৎপল ভাওয়াল, গৌতম দত্তর বাড়ির লোকের সঙ্গে দেখা করতাম, এই যে আমি গণেশদার সঙ্গে এমন একটা বিপজ্জনক কাজ করতাম, রাতের অন্ধকার প্রেসে গিয়ে প্যাম্ফলেট ছাপাতাম আর বিলি করতাম, এই যে আমি কলকাতা চষে বেড়াতাম গোপন মিটিং করবার জন্যে, একটু ফ্রি টাইম পেলে আবার শ্যামপুকুরে সুশীল রায়ের বাড়ি গিয়ে সত্যাগ্রহীদের জন্যে বাংলা আর হিন্দি ব্যাজ আঁকতাম, এসব কাজ কতজন করেছে? দু চারজন ছাড়া কারুকে তো দেখি নি এগিয়ে আসতে? আজকে জরুরি অবস্থা উঠে যাবার পর অনেক লোককে দেখা যাচ্ছে—এই ধ্যানেশ নারায়ণ চক্রবর্তী এখন আমাদের বিদ্যার্থী পরিষদের প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন হঠাৎ, কিন্তু এঁদের তো আগে কখনো দেখি নি। এই দু বছর তো কারুকে দেখি নি। আর এখন এই কালিদাস বসু অ্যাডভোকেট, আর ডাক্তার সুজিত ধরকে অনেক বড় বড় কথা বলতে শোনা যাচ্ছে, কিন্তু ওই দু বছর আমি এঁদের দেখতেই পাই নি। এঁরা বাবাকেও তেমন সম্মান কখনই দেন নি, কারণ বাবা গরিব ছিল, আর এঁরা বড়লোক। বাবা সারা জীবন শুধু স্বার্থত্যাগই করে গেল, আর গরিব হয়ে থাকলাম আমরা। সোজা বাংলা হিসেব আমার কাছে।

এখন জনতা পার্টি তৈরি হচ্ছে, আর এখন শ্যামাদা জনসংঘের, এই সব দিবাকর কুণ্ডু-টুন্ডু আর সব অচেনা, অল্পচেনা মুখ বিধানসভা, লোকসভা নির্বাচনের টিকিট পাবার জন্যে ছোটাছুটি করছে, এই সুনীল সরকার কমলা সরকারের মত লোকজন—এই দুবছর আমরা যখন মাথার ওপর বিপদ নিয়ে কাজ করছিলাম, আর আমাদের এতগুলো ছেলে জেলে পচছিল আর না খেতে পেয়ে রোগা হয়ে যাচ্ছিল, রক্ত আমাশায় ভুগছিল, তখন এরা কোথায় ছিল? কারোর টিকিটি তো দেখতে পাই নি?

তা, এরা যদি আজ দিল্লি যেতে পারে, আমি কেন পারব না?

আবার সঙ্গে সঙ্গে মনের ভেতরে, অবচেতন মনে একটা কী যেন আশঙ্কা, উদ্বেগ কাজ করছিল। মার শরীরটা ক্রমশই কেমন যেন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। আমি জানি, মা খায় না ভালো করে। কেউ দেখেও না মাকে। মাছ এলে আমাদের জন্যে রান্না করে। আর নিজে শুধু ভাত খায় হয়ত মাছের ঝোল দিয়ে। শাকসব্জি, ফলমূল কিছু খায় না। আমিও সেসব নিয়ে মাথা ঘামাই না। ভাবিই না রান্না কে করছে, আর সে খাচ্ছে কিনা। আমি এখন জগৎবিখ্যাত নেতা। এসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ভাববার সময় নেই আমার। বাবা খেটে খেটেও আর পেরে উঠছে না। বোনটা ছোট, একটু একটু করে বড় হচ্ছে, কিন্তু ওকে আমি সঙ্গ দিই না কখনো। সুব্রত ওর বোনের সঙ্গে কত বেড়াতে যায়, আমি তো কখনো যাই না। আমি কেমন যেন রুক্ষ, কর্কশ হয়ে গেছি, বাড়ির সবার থেকে দূরে সরে গেছি। মা চেষ্টা করছে ভালো থাকার তারই মধ্যে। কোথায় একটা গিটার শেখার ক্লাসে ভর্তি হয়েছে। অনেকে মিলে একসঙ্গে শেখে। টুং টুং করে বাড়িতে গান প্র্যাকটিস করে।

কুশপুত্তলিকা

ওবামা ও আমেরিকার বিদেশনীতির বিরুদ্ধে এই সেদিনও বিজেপি ও বিদ্যার্থী পরিষদ জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিয়েছে। কুশপুত্তলিকা পুড়িয়েছে। গুজরাটের দাঙ্গার পরে আমেরিকা নরেন্দ্র মোদীর ভিসা নাকচ করে দিয়েছিল। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সব বহুজাতিক কর্পোরেশন ভারতের দিকে তাকিয়ে আছে মুনাফা করবার জন্য। মোদী সরকার ও একসময়ের বিদ্যার্থী পরিষদের নেতা অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি এখন তাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু। পাশার দান উল্টে গেছে। – লেখক

আমার বোনও গান শেখে। বন্দনাদির কাছে আমি নিয়ে যাই। আর বাড়িতে চিত্তবাবু আসেন ওর সঙ্গে তবলা বাজাতে। স্কুলের সামনে ছেড়ে দিই। ব্যাস, বোনের প্রতি আমার কর্তব্য ওখানেই শেষ। আমি ঘুরে বেড়াই উদ্দেশ্যহীন ভাবে। তার মধ্যেই এটা সেটা করি। কিন্তু অস্থিরতা মনের মধ্যে। একটা যন্ত্রণা কিছু তেমন করতে না পারার। আমি রেজাল্ট ভালো করতে পারছি না। আমাকে বাবা জোর করছে ব্যাঙ্কে পরীক্ষা দিয়ে কেরানির চাকরি নেবার জন্যে। বাবা ভাবছে আমার এর থেকে বেশি আর কিছু হবার নেই এখন। আর, মা সেটা একেবারেই মেনে নিতে পারছে না।

সেই ছোটবেলা থেকে আমি মাকে বড়াই করে বলে এসেছি, “দেখো, আমি কী অসাধারণ কিছু একটা করব। তুমি দেখো।”

আর, মা মাঝে মাঝেই আমাকে ডাকত, “এই যে অসাধারণ, এবার ওঠো। চান করে ভাত খেয়ে ইস্কুলে যাও।” বলে, হাসত। মাও হাসত, মাসি সামনে থাকলে মাসিও হাসত। ছোটমামা, দিদিও। কিন্তু ওরা সবাই আমাকে আর আমার অসাধারণ হবার ইচ্ছেকে খুব বিশ্বাস করত। ওরা সবাই জানত, বা বিশ্বাস করতে চাইত, আমি অসাধারণ হতে পারি। সেই আমি ব্যাঙ্কের কেরানির চাকরিতে ঢুকব? দু একটা পরীক্ষাও দিয়েছি। টাইপ শিখেছি। ইন্টারভিউও দিয়েছি দু একটা। আমার বন্ধু ও বিদ্যার্থী পরিষদের সহকর্মী উত্তরবঙ্গের পবিত্র ঝা এরা সব নতুন-খোলা বিজয়া ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়ে গেল আর এস এসের লোকেদের সুপারিশে। আমিও পেতে পারতাম। আমাদের ফ্যামিলিতে অনেকেই স্টেট ব্যাংকে কাজ করে, ধরাধরি করলে কিছু একটা হয়েই যাবে আমার। কিন্তু, আমি তো স্টেট ব্যাংকে কেরানি হতে চাই না। আমি তো এম এস সি পড়তে চাই। আরো পড়তে চাই। কিন্তু এদিকে আবার আমার এই সব কাজ করার নেশা। আর রুক্ষতা। কী দারুণ সংঘাত মনের মধ্যে!

কেমন যেন একটা ঝড় আসছে, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না কোন দিক থেকে আসছে, বা কখন সে ঝড় আমাদের এই গরিব, নিরীহ সংসারটার ওপর এসে আছড়ে পড়বে।

কিন্তু যেতে আমাকে হবেই দিল্লি। আমি যাবই।

ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর সৈরতন্ত্র-বিরোধী আন্দোলেন

১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ এই ছিল ভারতে ইন্দিরা গান্ধী ও তাঁর সৈরতন্ত্র-বিরোধী আন্দোলেনের চেহারা। আমিও তাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। – লেখক

আমি অন্ধের মত সবার সঙ্গে ট্রেনে করে দিল্লি গেলাম। যাবার পথে আর এস এসের একটা লোক, অমুক-দা, আমার বিছানা লুকিয়ে ফেলল, না-কি বাইরে ফেলে দিল লুকিয়ে, আমি জানতেও পারলাম না। আমি এসব কিছুই বুঝতে পারি নি। সংঘের লোকেদের মধ্যে-যে আবার এসব ব্যাপার থাকতে পারে, আমি ভাবতেও পারি নি। এসব কথা আমি মা কিংবা বাবাকে কখনো বলি নি। ছোটমামাকেও বলি নি। যদি হাসে? ঠাট্টা করে ওর বন্ধুদের সামনে? হয়ত বলবে, “কী বাবুয়া, শেষ পর্যন্ত তোমাদের রাষ্ট্রীয় স্বয়মসেবকের এই অবস্থা?”

লোকটার উদ্দেশ্য ছিল আমার বেডিং ফেলে দিয়ে আমাকে ওর বিছানায় ডাকা। একটা বিরাট হলঘরে আমরা সবাই মিলে ডেলিগেটরা রাতে শুয়ে আছি। আলো নিভিয়ে দিল কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে। বোধ হয় রাত এগারোটা। আমাকে অমুক-দা বলেছে ওর বিছানা শেয়ার করতে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। অনেক রাতে, ঘুমের মধ্যে, হঠাৎ আমার গায়ে হাত বুলোতে লাগলো। আর কেমন যেন জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলছে আমার ওপরে। আমি তো প্রথমে বুঝতেই পারি নি কী ব্যাপার! যখন বুঝতে পারলাম, তখন প্রবল মনের জোরে ছিটকে সরে এলাম এক মুহূর্তে। কিন্তু, প্রচণ্ড অবাক হয়েছিলাম। হতবাক হয়েছিলাম। শক পেয়েছিলাম। লোকটাকে আমি বহুদিন ধরে দেখেছি। বহু বছর ধরে। কিন্তু কখনো বুঝতেও পারি নি এসব ব্যাপার। খুব আলাভোলা, নাইভ ছিলাম একদিক দিয়ে। স্নেহশীল, নৈতিকতার প্রতীক লোকজনই দেখে এসেছি আর এস এসে। তারা অনেকে মাথামোটা হতে পারে, এমন-কি ধর্মান্ধ, মুসলমান-বিদ্বেষী হতে পারে, কমিউনিস্ট-বিদ্বেষী হতে পারে, কিন্তু দুশ্চরিত্র নয় তারা।

আর এস এস ও জনসংঘের নেতা নানাজি দেশমুখ

আর এস এস ও জনসংঘের নেতা নানাজি দেশমুখ ছিলেন এক স্বার্থত্যাগী, আদর্শবাদী মানুষ। ১৯৭৭-এ মোরারজি দেশাই সরকার গঠিত হবার পরে তাঁকে জাতীয় মন্ত্রীসভায় যোগদান করতে বলা হয়েছিল। তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। আমাকে নানাজি দেশমুখ ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনার ওপর আমার একটা লেখা তিনি হিন্দিতে অনুবাদ করে ছাপিয়েছিলেন। – লেখক

আমি কখনো বাড়ির লোকেদের সঙ্গে যৌনতা নিয়ে আলোচনা করতে পারি নি। কতজনই বা পারে আমাদের ওখানে? এখনো পারে না। যাদের বাড়ি সে পরিবেশ আছে, তারা অনেক বেশি ম্যাচিওর। মানসিক দিক থেকে তারা অনেক বেশি পরিণত। মানসিক শৃঙ্খলাবদ্ধ। আমি তা ছিলাম না। আমার এসব কথা বলার লোক বাড়িতে কেউ ছিলনা। বন্ধুরা ছিল। কিন্তু তাও, সে হাতে গোনা দু একজন।

আমাদের সঙ্গে যারা যাচ্ছিল দিল্লির সম্মেলনে, তাদের মধ্যে ছিলেন বিজেপির নেতা অধ্যাপক হরিপদ ভারতী, নেত্রী অধ্যাপিকা শান্তি রায়, আরও অনেকে। আর ছিল আর এস এসে একটা ব্যতিক্রমী উজ্জ্বল ছেলে গৌতম। ও ছিল অধ্যাপক নিবারণ চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে। দিল্লি যাবার পথে ট্রেনে দুদিন। মাঝে আবার আলিগড় না কোথায় সাত আট ঘণ্টা ট্রেনটা দাঁড়িয়ে থাকলো খারাপ হয়ে গিয়ে। তখন আমরা সেই গরমে, মে মাসে, ট্রেন থেকে নেমে রেল লাইনের ওপর তোড়ে কল খুলে দিয়ে মনের আনন্দে চান টান করলাম। গামছা শুকোতে দিলাম। আর ভাবলাম, আমরাও ভারতের আমজনতা। সেই সময়ে গৌতমের সঙ্গে খুব জমে গেল আমার। দুজনেই সমবয়েসী ছেলে, আর দুজনেই খুব হাসতে পারি। ব্রেন আছে দুজনেরই। বললাম না, ব্যতিক্রমী ছেলে।

ওকে আমি এই পারভার্টের কথা বলেছিলাম। ও তো শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো। কিন্তু দলের ক্ষতি হবে ভেবে আমরা কারুকে কিছু বলি নি। সে লোকটাও আমাদের তখন থেকে ভয় পেতে লাগলো, আর দূরে দূরে থাকতে লাগলো। পরে, ওখানকার বিরাট কনফারেন্সের সময়ে লোকটাকে আর দেখতেই পেলাম না।

কিন্তু আমার মনে হয়, এই সব কিছু ঘটনায় আমার মনের মধ্যে একটু একটু করে কালো মেঘ ঘনিয়ে আসছিল। শেষকালে, কানপুরে সেই ভীষণ দুর্ঘটনা, আর বরাতজোরে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যাওয়া। কলকাতায় ফিরে এসে মাকে আর বাবাকে আরো অনেক বেশি আতঙ্কের মধ্যে ঠেলে দিয়ে আমি দু মাস ধরে সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী।

***

দলে দলে লোকজন দেখা করতে আসছে। আমাদের আর এস এসের, বিদ্যার্থী পরিষদের, জনসংঘের সবাই খবর পেয়ে গেছে, পার্থ দিল্লির কনফারেন্স থেকে ফেরার পথে সাংঘাতিক চোট পেয়েছে কী একটা এক্সিডেন্টে, আর পিঠ ভেঙে বিছানায় শুয়ে আছে। প্রথম দু এক সপ্তাহ আমাকে দেখতে যত লোক এসেছিল, গান্ধীকে নাথুরাম গডসে গুলি করার পরেও বোধহয় অত লোক দেখতে আসে নি। মানে, আমার সেই রকমই মনে হয়েছিল। ওই আর একটা ইগো ট্রিপ আর-কি! অবশ্য, ইগো ট্রিপ কথাটা শুনিই নি কখনো। ভেবে আনন্দ পেয়েছিলাম আমি এত জনপ্রিয়, আর সবাই আমাকে এত ভালবাসে। আমি শুয়ে আছি রাজার মত। আর সবাই যেন আমার দর্শনপ্রার্থী। প্রজা। সকাল আটটা থেকে দশটা বাড়ি লোকে লোকারণ্য। আবার বিকেলে পাঁচটা ছটা নাগাদ। শাখার থেকে লোক আসছে। বড় বড় রাজ্যস্তরের নেতা, এমন কি জাতীয় স্তরের সর্বোচ্চ নেতারা কলকাতায় এলে খবর পেয়ে আমাকে একবার দেখে যাচ্ছেন একটু। এঁদের মধ্যে আমার বাবার পুরনো দিনের সহকর্মী ও প্রচারকরাও আছেন, দিল্লিতে আমার বাবার ঠিক পরের ভাই আর এক প্রচারক রমেন্দ্রনাথের সহকর্মী যাঁরা বাবাকেও বহুকাল ধরে চেনেন, তাঁরাও কলকাতায় এসে আমাকে দেখে যাচ্ছেন। যাদবরাও যোশী। সেই ভাউরাও দেওরাস, যিনি আর এস এসের সর্বাধিনায়ক বালাসাহেবের ছোট ভাই, আর নিজেও সংঘের সারা ভারতের দু নম্বর নেতা, তিনিও একবার দেখে গেলেন খবর পেয়ে।

অমলদা, গণেশদা, বংশীলাল সোনি, শ্যামমোহন দে। বসন্তরাও ভট্ট। বিদ্যার্থী পরিষদের পবিত্র, ধীরেন বর্মণ, স্বপন, দেবাশীষ বোস, শ্যামল চক্রবর্তী, আদর্শ পিলানিওয়ালা। লক্ষ্মীনারায়ণ ভালা, গোসাই দাস। বিকাশ ভট্টাচার্য্য। এমন কেউ ছিল না কলকাতায় যে আসে নি। গৌতম, তুষার, সবাই। আমাদের চিরপরিচিত, সংঘের স্কুল শিক্ষক অজিত বিশ্বাস।

কেশব দীক্ষিত এসে দেখে গেলেন। ইনিই আমাকে দিল্লি যাবার কথা বলেছিলেন প্রথম। সেই বর্ধমান ও টি সি থেকে এঁকে ভালো করে চিনেছি। খুব বড় মারাঠি নেতা। কলকাতাতেই সারা জীবন কাটিয়ে দিলেন। ইন্টেলেকচুয়াল নন। মাঠের নেতা। গুরুজি গোলওয়ালকারের ব্যক্তিগত দেহরক্ষী আর ড্রাইভার হিসেবেও কাজ করতেন। প্রচারক। অকৃতদার। আমাকে দেখে ঠাট্টা করলেন তাঁর হিন্দি-বাংলা মেশানো ভাষায়, “আরে বাবুয়া, ভেই, কী হয়ে গেলো তোমার? কেউ লাঠি মারলো, না কী হলো?”

বলে, চোখ কুঁচকে হাসলেন চশমার মধ্যে দিয়ে।

আমিও হাসলাম। আত্মপ্রসাদের হাসি।

জরুরি অবস্থার সময়ে চিন্ময়কাকুর বাড়িতে লুকিয়ে থাকা প্রচারক বিদ্যুৎ দত্ত। খুব মজা করতে পারতেন, আর খুব আস্তে আস্তে, প্রায় ফিস ফিস করে নিচু গলায় কথা বলতেন। মজার কথা বলবার সময়ে জিভটা ছোট্ট ছোট্ট করে বেরিয়ে আসত মৃদু হাসির সঙ্গে সঙ্গে। আর চোখ পিট পিট করত। আমাকে দেখতে এসেছিলেন বেশ কয়েকবার। বললেন, “আসলে ব্যাপারটা কী হয়েছিল বল তো? কারুর বাড়ির জানলা দিয়ে তাকাচ্ছিলি নাকি সুন্দরী মেয়েদের দিকে? ধরে পেঁদিয়েছে? কেন যে এসব করতে যাস, কতবার বারণ করেছি!”

বলে, হাসির মত একটা মুখ করলেন, মুখ চেপে। আমি হাসলাম হা হা করে। কী মজার লোক এই বিদ্যুৎ-দা!

হরিশ চোপড়া। মহেশ আর তার দাদা রামানন্দ রস্তোগী। সেই বিজয়কান্ত শ্যামদের ভাইয়েরা। রোহিত গুপ্তা। আমাদের বাঙালিদের মধ্যে রণজিত ঘোষ। তারপর, সেই অরবিন্দ সাহাদের সবাই। সেই বারান্দা দিয়ে উঠে আসা মিহির সাহা। চিন্ময়কাকু তো অনেকবার এসেছে দেখতে। তিনের এ থেকে তিনের আট। ওঁর সঙ্গে আমাদের বিদ্যার্থী পরিষদের অফিসের বাড়ির সামনের দিকেই চেম্বার শেয়ার করতেন ডাক্তার দীপক দাশগুপ্ত। তিনিও এসে দেখে গেছেন। বাবা আর মাকে জরুরি পরামর্শ দিয়ে গেছেন। ব্যাপারটা জটিল। ঠিক মত সব নিয়মকানুন না মেনে চললে বিপদ হতে পারে। প্রাণের আশঙ্কা না থাকলেও পঙ্গুত্বের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

বাম ও দক্ষিণ কাছাকাছি এসেছিল দু একবার মাত্র

বাম ও দক্ষিণ কাছাকাছি এসেছিল দু একবার মাত্র। এ ছবিতে সিপিএমের জ্যোতি বসুর সঙ্গে বিদ্রোহী কংগ্রেস নেতা বহুগুণা, সামন্ততান্ত্রিক নেতা চরণ সিং, অন্ধ্রের চিত্রতারকা নেতা এন টি রামা রাও, কাশ্মীরের ফারুক আবদুল্লা এবং বিজেপির বাজপেয়ীকে দেখা যাচ্ছে। – লেখক

মা দুপুরবেলা সেই গরমে মাথাটা বিছানা থেকে একটু বের করে জল ঢেলে মাথা ধুইয়ে দেয়। মুছিয়ে দেয়। দিদি, মাসি, ছোটমামা, মেজমামা, বড়মামা এরা সব আসে আমাকে দেখতে। বাড়ির পরিবেশ থমথমে। খবর পেয়ে আত্মীয়রা কেউ দেখা করতে এলে বেশির ভাগ পাশের ঘরেই বসে থাকে। একটু খোঁজ খবর নিয়ে, আর আমার ঘরের পর্দা সরিয়ে একটু উঁকি দিয়েই হয়ত চলে যায়। মার দিকের আত্মীয়রাই বেশি আসে। আমি ঘুমোই। বেঁচে থাকবই, এরকম একটা প্রতিজ্ঞা আমার মনে। মরব না। মরব না। মরব না কিছুতেই। অনেক কাজ আমার বাকি। মরব কেন?

প্রফেসর দীপক গুপ্তও দেখে গেলেন একদিন। প্রতাপ নিয়ে এলো সঙ্গে করে। ডিকেজি মাকে সাহস দিয়ে গেলেন, “সব ঠিক হয়ে যাবে। কিচ্ছু ভাববেন না। এম এস সি-তে ভর্তি হতে হবে তো।”

আমার ছোটবেলার বন্ধুরা। সুব্রত তখন খড়্গপুর আই আই টিতে পড়তে চলে গেছে, আর অবসাদে ভুগছে। ও কলকাতায় এলে আমাকে একবার দেখে যায়। প্রতাপ অনেকবার আসে। মাঝে মাঝেই আসে। দেবাশিস দত্ত আসে। দেবাশিস আর আমি কবিতা, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করি। ফিল্ম নিয়ে আলোচনা করি। দেবাশিস নিজের অজান্তেই আমার মনের ওপর একটা অন্যরকম প্রগতিশীলতার ছাপ ফেলছে। আমার মনের খিদে মেটাচ্ছে একটু একটু করে। অলক মিত্রও তাই। অলক আর আমি এই কিছুদিন আগেই গোয়াবাগান পার্কে দুপুরবেলা বসে বসে ‘হযবরল’ পড়েছিলাম, আর প্রচণ্ড হেসেছিলাম দুজনে। হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যায় আর-কি! ওঃ, সুকুমার রায়! যেন একটা যাদুকর। কী উইট! কী রসবোধ! কী তীক্ষ্ণ বুদ্ধি! উইট কথাটা প্রথম প্রথম শুনেছি তখন। আর সবসময়ে বলি।

দুপুরবেলা আমি ঘুমোই। ঘর অন্ধকার। আমি ভাবি আমার সেই স্ব-নির্বাচিত, বা বলা যায় স্বকপোলকল্পিত, প্রণয়িনীদের কথা। শান্তা, শিউলি, সঙ্ঘমিত্রা, সেই কবেকার মাধু। সুজাতা। কেউ তো একবারও খোঁজ করতেও আসে না আমার। অবশ্য, শান্তা আর ওর বোন ঠিক উল্টোদিকের বাড়িতেই থাকে। ওরা তো দেখতেই পাচ্ছে আমার অবস্থা। কিন্তু একবারও কেউ দেখতে এলো না আমাকে। কাবেরীও তিনতলা থেকে এলো না একবারও।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুমিয়ে পড়ি। পাশ ফেরা বারণ।

এক মাস পরে একটা ভুল এক্স-রে করে দেখা গেল, আমার অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। মার তো ভয়ে প্রাণ উড়ে যায় আর-কি! এত যত্ন, এত কিছু নিয়ম মেনে চলা, তাও এমন হলো কেন? ডাক্তার সিনহা দেখলেন সে এক্স-রে রিপোর্ট। বললেন, “না না, এটা ঠিক নয়। আবার করুন। আমি বেল ভিউতে বলে দিচ্ছি।” বেল ভিউ মানে বিখ্যাত বেল ভিউ নার্সিং হোম। সেই বড়লোক পাড়ায়, মিন্টো পার্কের পেছনে। যেখানে সিনেমার নায়ক নায়িকারা যায় হাঁচি বা কাশি হলে। সেখানে যাবার রেস্ত আমাদের কোথায়?

আর জি কর মেডিকেল কলেজ

আর জি কর মেডিকেল কলেজ শ্যামবাজারে। এখানেই মার অপারেশন হয়েছিল। এই হাসপাতালেই আমার বন্ধু নাগেশ রক্ত দিতে এসেছিল। এই গেটের সামনেই দাঁড়িয়েছিল সকালবেলা আটটার সময়ে। – লেখক

কিন্তু, ওখানেই আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। পাড়ার ছেলেরা সাবধানে ধরাধরি করে মোটা কম্বলের মধ্যে বয়ে নিয়ে গিয়ে আমাকে বাইরে এম্বুলেন্সে তুলে দিল। ঝকঝকে নার্সিং হোমের ভেতরে আমাকে নিয়ে গেল। ঠিক যেন আমেরিকার মত ভেতরটা। বা, লন্ডন, প্যারিস। বেল ভিউতে আবার এক্স রে করা হলো। দেখা গেল, আমি অনেকটা ভালো হয়ে গেছি। ভাঙা শিরদাঁড়া জোড়া লেগে গেছে।

মা, বাবা, বোনের মুখে হাসি ফুটল। এখনো এক মাস শুয়ে থাকতে হবে।

***

“লভিয়া আরাম আমি উঠিলাম;
তাহারে ধরিল জ্বরে—
নিল সে আমার কালব্যাধিভার
আপনার দেহ-‘পরে।”

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘পুরাতন ভৃত্য‘ কবিতায়। কথা ও কাহিনীর কবিতা। কতবার পড়েছি ছোটবেলা থেকে। একবার রামমোহন লাইব্রেরিতে একজন একটা শর্ট ফিল্ম দেখিয়েছিল পুরাতন ভৃত্যের গল্পের ওপর তুলে। সেই বিখ্যাত কবিতা।

আমার দিদি সেই নাটকীয় ভঙ্গিতে আবৃত্তি করত। আমাকে বলত, “পড় না। একবার পড়। আমি শুনি।”

আমি পড়তাম। জোরে জোরে। দিদি খুব খুশি হত। বলত, “বাঃ।”

ভূগোল পড়তাম ছোটবেলায়। “পৃথিবীর তিনভাগ জল, একভাগ স্থল।” চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়তাম ঘরের মধ্যে বসে। যাতে রান্নাঘরের সামনে টুলে বসা দিদি শুনতে পায়। ইতিহাস পড়তাম। “বাবরের ছেলে হুমায়ুন। তাঁর ছেলে আকবর। তাঁর ছেলে জাহাঙ্গীর। তাঁর ছেলে শাজাহান।”

দিদি বলত, “শাজাহান। শা—জাহান।” বলে আবার বলত একটু নাটকীয় ভাবে, “একথা জানিতে তুমি ভারত-ঈশ্বর শা-জাহান, কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধনমান।”

বলে আমাকে জিজ্ঞেস করত, “পড়েছ? রবীন্দ্রনাথের কবিতা?”

অবশ্য এসবই হত বাবা অফিস থেকে ফেরার আগে। বা, বাড়ি না থাকলে। মা বলত, “এবারে তুমি যাও। ওর আসার সময় হলো।”

দিদি একটা রুটি, গুড় বা তরকারী দিয়ে খেয়ে, আস্তে আস্তে উঠে চলে যেত।

আমি সেরে উঠলাম। এর মধ্যে আমাদের বি এস সি পার্ট টু অনার্সের রেজাল্ট বেরিয়ে গেল। দেখলাম, আমি, প্রতাপ আর সনৎ তিনজনেই পার্ট ওয়ানের বিভীষিকা থেকে বেরিয়ে এসে আবার পায়ের ওপর দাঁড়িয়েছি। আমরা এম এস সিতে ভর্তি হতে পারব। যদিও লিস্টের একেবারে শেষের দিকে আমাদের নাম থাকায় বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে আমরা প্র্যাকটিকাল ক্লাস করতে পারব না। আমাদের ওখানে লেকচারের ক্লাস করেই বাস ধরে প্রেসিডেন্সি কলেজে চলে আসতে হবে দুপুরবেলা, ল্যাব করবার জন্যে।

তাই সই। এম এস সি পড়ব। একটা স্বপ্ন ছিল। আজ তা পূর্ণ হতে চলেছে। মা, দিদির স্বপ্ন ছিল। আশা ছিল কত আমাকে নিয়ে। আমি সে আশা পূর্ণ করতে পেরেছি। মনে খুব আনন্দ। দু মাস বিছানায় শুয়ে থেকে শরীরটাও সেরেছে। আমাকে একটা ভেলভেট-মোড়া ধাতব খাঁচা দিয়েছে। সেটা বাইরে বেরোবার সময়ে কয়েক সপ্তাহ পরে থাকতে হবে। আর খুব সাবধানে চলাফেরা করতে হবে। আমি বাসে না উঠে ট্রামে করে আস্তে আস্তে সেই অনেক দূরে সায়েন্স কলেজে আসা যাওয়া শুরু করলাম। বাবা সঙ্গে গেল একদিন দুদিন। দুপুরবেলা আবার ট্রাম ধরে প্রেসিডেন্সি কলেজ। প্রতাপ আমার সঙ্গে থাকে। সন্ধেবেলা বাড়ি পৌঁছে দেয়। বাড়ি আসার পথে শুক্লাদের বাড়ি যাই মাঝে সাঝে। চা বিস্কুট খাই। ও আমাদের সঙ্গেই প্রেসিডেন্সি ব্যাচে পড়ে।

কানপুর

কানপুর উত্তর প্রদেশের এক বিরাট শহর। শিল্প শহর হিসেবে বিখ্যাত। কানপুর আই আই টি এক শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানেই স্টেট ব্যাঙ্কে ছোটকাকু দীপেন্দ্রনাথ কাজ করতেন। আমি এসেছিলাম বেড়াতে। তারপর, দুর্ঘটনা। – লেখক

কিন্তু, এর মধ্যে একদিন বাবা বলল, “তোমার মাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। একটা অপারেশন হবে।”

আমি বললাম, “কী অপারেশন?” আমি তো অবাক! কী হলো আবার মার এর মধ্যে? ওদিকে জেঠুর ক্যান্সার হয়েছে মুখে। মা’ই সেকথা আমাকে বলেছে। সবার মন খারাপ।

বাবা বলল, “ওই পেটে একটা টিউমারের মত হয়েছে।”

আমি বললাম, “তা, ডাক্তার কী বলছে? ডাক্তার সিনহা দেখেছেন?”

বাবা বলল, “হ্যাঁ।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কতদিন হাসপাতালে থাকতে হবে? কোন হাসপাতাল?”

বাবা বলল, “আর জি করে ভর্তি করা হবে দু চারদিনের মধ্যেই। বেড পেলেই নিয়ে যাব।”

তারপর বলল, “রক্ত লাগবে। তোমার মার রক্ত নেই শরীরে। ব্লাড ব্যাঙ্কে মার গ্রুপের রক্ত পাওয়া যাচ্ছে না এত তাড়াতাড়ি।”

আমি সায়েন্স কলেজে গিয়ে বন্ধুদের কয়েকজনকে বললাম কথাটা। এই দু এক মাসেই আমার অনেক নতুন বন্ধু হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে আসা নাগেশ, বিদিশা, সুমনা, আশালতা, শ্যামল, ব্রততী, তপতী, আর মুক্তি। লেডি ব্র্যবোর্ণ কলেজ থেকে পড়তে আসা ভাস্বতী, রমা, শকুন্তলা, পূর্ণিমা, জয়ন্তী, এরা সব। মেয়েদের সিটি কলেজ থেকে আসা মহুয়া, মধুশ্রী, শুক্লা। বিদ্যাসাগর কলেজের মর্নিং সেকশন—সেই যাদের দীপকবাবু বাড়িতে পড়াতেন—সেই নবনীতা, দীপিকা এরা সব। বেথুন কলেজ থেকে আসা সুপ্রীতি। শ্রীরামপুর কলেজের দেবযানী। সিটি কলেজের ছেলেদের সেকশন থেকে কুণাল, কাশীনাথ, কল্যাণ, রমজান আলী। আরো অনেকে। দেবাশিস জানা, আশীষ দাস মেদিনীপুর কলেজ থেকে। অনুপ মণ্ডল আমাদের বিদ্যাসাগরের। প্রণয় পড়া ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে।

নাগেশ বলল, ও রক্ত দেবে। ওর গ্রুপ আর আমার মার গ্রুপ এক।

কয়েকদিনের মধ্যেই ভোরবেলা নাগেশ আর জি কর হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আমি এসে দেখি ও আগেই এসে গেছে সেই অনেক দূরের সাদার্ন এভিনিউ থেকে। রক্ত দেওয়া হলো। মার অপারেশন হলো। দেখি আমাদের সেই ডাক্তার দীপক দাশগুপ্ত এসে বাবার সঙ্গে কী সব কথা বলছে চুপি চুপি, অনেকক্ষণ ধরে। তারপর বাবা আমার সঙ্গে কথা না বলে কোথায় যেন চলে গেল।

অপারেশন হয়ে গেল। কিন্তু, মাকে আর হাসপাতাল থেকে ছাড়েই না। আমি দেখতে যাই। সেই অন্ধকার অন্ধকার বিরাট বিরাট ওয়ার্ড। আয়া দিদিরা দেখাশোনা করে। নার্সরা ঘুরে বেড়ায়। দেখে যায়। আমি মার সঙ্গে একটু কথা বলি। এম এস সি কেমন চলছে, বুবু কেমন আছে, এই সব। কী খাই সারাদিন, এই সব। এক ঘণ্টা মত থাকি। তারপর, ট্রাম ধরে বাড়ি চলে আসি।

একদিন, বোধহয় তখন ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিক, আমি সায়েন্স কলেজ থেকে একটা পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরেছি সবে। সিঁড়ির নিচে দাঁড়িয়ে জুতো খুলছি। দেখি, একটা ট্যাক্সি করে বাবা মা’কে নিয়ে ফিরছে। আমাদের তো খুব আনন্দ। মা চলে এসেছে। আবার বাড়ির সব কিছু নরমাল হয়ে যাবে। এই কয়েক সপ্তাহ বাবার রান্না খেয়ে খেয়ে আর ভালো লাগছিল না।

আমার ও আমার স্ত্রী মুক্তির বন্ধু ও বান্ধবীরা

আমার ও আমার স্ত্রী মুক্তির বন্ধু ও বান্ধবীরা, এক অনুষ্ঠানে ২০১৫ সালে। কলকাতায় তোলা ছবি। বাঁ দিক থেকে—অলোক ভট্টাচার্য, শ্যামল চক্রবর্তী, নাগেশ বা নাগেশ্বর রাও, সুমনা মুখার্জী, ব্রততী দে (দত্ত), এবং আশালতা ডি রোজারিও। ছবি ফেসবুক থেকে প্রাপ্ত। – লেখক

মাও খুব খুশি বাড়ি ফিরে এসে। একদিন একটু বিশ্রাম করে নিয়েই রান্নাঘরে গিয়ে নিজের মত রান্না শুরু করে দিল। আবার দিদি এলো। মাসি এলো। ছোটমামা এলো।

দু এক সপ্তাহ ছিল ভালই। তারপর একদিন আমাকে বলল, “দেখো তো বাবুয়া, আমার পেটে লাল লাল কী যেন বেরিয়েছে গোটা গোটা।” আমি তো অবাক! মা কখনো আমাকে নিজের শরীরের কোনো সমস্যার কথা বলে নি, আর নিজের শরীরে কী দাগ বেরিয়েছে, তা আমাকে দেখাবে? আমার যেন কেমন অদ্ভুত লাগছিল।

মা বিছানায় বসে পেটের কাপড় সরিয়ে আমাকে দেখালো সন্ধেবেলা। লাল লাল ফোলা ফোলা দাগ অনেকগুলো। যেন পুড়ে গিয়ে ফোস্কা পড়েছে।

আমি বললাম, “এগুলো কী হয়েছে?”

মা বলল, “জানি না। একটু একটু ব্যথা করছে।”

***

আমার মনে পড়ে না ঠিক আর। কিন্তু, মনে হয়, মার সঙ্গে এই আমার শেষ কথা। দু একদিনের মধ্যেই মা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়ল। আর, বিছানায় শুয়ে পড়ল। সে এমন অবস্থা-যে পাড়ার এক মহিলা আয়ার কাজ করতেন, তাঁর নামও শোভা —শোভাদি—তাঁকে রাখা হলো। মা একেবারে প্রায় অচেতন হয়ে থাকে সারাদিন, সারারাত। আমি দুপুরবেলা ডাক্তার সিনহার চেম্বারে ছুটে গেলাম। তখন আর কেউ নেই সেখানে। বললাম, “আমার মার কী হয়েছে, ডাক্তারবাবু?”

ডাক্তারবাবু অবাক হলেন। দুঃখিত মুখে আস্তে আস্তে বললেন, “তুই জানিস না? তোকে বাবা কিছু বলে নি?”

আমি বললাম, “না তো! কী বলবে? কী হয়েছে মার?”

ডাক্তার সিনহা বললেন, “পার্থ, মেটাস্ট্যাসিস হয়ে গেছে। ফোর্থ স্টেজ।”

বলে, কী একটা মেডিক্যাল টার্ম বললেন। সারকোমা জাতীয়, খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, এমন একটা ক্যান্সার। জরায়ু থেকে এখন সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। অপারেশন করার সময়ে প্রথম ধরা পড়ে। তখন আর সত্যি কিছু করার নেই।

মার ফেলে যাওয়া রান্নাঘর।

মার ফেলে যাওয়া রান্নাঘর। আমাদের তিনের আট গোরাচাঁদ বসু রোডের সেই মেজেনাইন ফ্ল্যাট। – লেখক

কথাগুলো যেন কেমন একটা বহুদূর থেকে এসে আমাকে হিট করলো। আমি যেন তার মানে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। কেমন যেন একটা ধোঁয়া ধোঁয়া, কুয়াশা কুয়াশা মত লাগছিল। মনে হচ্ছিল, ডাক্তারবাবু যেন বহুদূরে বসে আছেন। বহু, বহু দূর থেকে ওঁর কথাগুলো ভেসে আসছে।

“মেটাস্ট্যাসিস… মেটাস্ট্যাসিস… ফোর্থ স্টেজ… ফোর্থ স্টেজ… আর কিছু করার নেই রে…”

অনেকক্ষণ পরে আমি বললাম, “তার মানে…”

উনি বললেন, “আর হয়ত দু তিন সপ্তাহ। বা, এক মাস।”

সেদিন সন্ধেবেলা আমি গোয়াবাগান পার্কের সেই ভাঙা বেঞ্চিটায়, আমার মনে আছে, অলক, প্রতাপ আর কে কে যেন ছিল। প্রণব, শুক্তি এরা সব ছিল মনে হয়। প্রতাপ বেঞ্চির সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আর সব বসেছিল, ওই যেমন আমরা বেঞ্চির পিঠটায় বসতাম, আর বসার জায়গাটায় পা রাখতাম। তেমনি।

আমি ওদের কাছে গিয়ে বললাম, “আমার মার ক্যান্সার হয়েছে। লাস্ট স্টেজ। মা আর বাঁচবে না।” সেটা মনে হয়, মার্চ মাসের মাঝামাঝি।

দোসরা এপ্রিল, রবিবার, সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় মা চলে গেল।

১৯৭৮ সাল। মার বয়েস তখন বেয়াল্লিশ।

(কিস্তি ২৫)

Tagged with:

About Author

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় তিরিশ বছর ধরে আমেরিকায় আছেন। কলকাতায় ছিলেন জীবনের অর্ধেক। এখন স্থায়ীভাবে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। মানবাধিকার, বিশেষত ইমিগ্র্যান্টদের অধিকার ও শ্রমিক ইউনিয়ন—এই দুই বিষয়ে পেশাদারিত্ব। ইলিনয় থেকে পি এইচ ডি করার পর বিজ্ঞান ছেড়ে সাংবাদিকতা ও হিউম্যানিটিস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। শৈশব থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আর এস এস ও বিজেপির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার পর রাজনৈতিক ও আদর্শগত কারণে বেরিয়ে আসেন। তাদের সম্পর্কে বই ও নানা রচনা লেখেন। রাজনীতি ছাড়া বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ। সাংস্কৃতিক সংকট ও বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক আগ্রাসন সম্পর্কে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Partha Banerjee) বিশ্লেষণ ইউটিউব ও ফেসবুকে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রসংগীতে ও বাংলা আধুনিক গানে বিশেষ উৎসাহ। ২০১২ সালে কলকাতা থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের সিডি "আরো একটু বসো" প্রকাশিত হয়। বাংলা ও ইংরাজিতে লেখেন। উইকিপিডিয়া লিংক: http://en.wikipedia.org/wiki/Partha_Banerjee