ঘটিকাহিনী (২৬)

(আগের পর্ব)

মরুতীর হতে সুধাশ্যামলিম পারে

একাইরেন্থেস এসপেরা। আর্জিমন মেক্সিকানা। আপাং আর শিয়ালকাঁটা। কেসিয়া টোরা। রাউলফিয়া সার্পেন্টিনা। কালকাসিন্দা আর সর্পগন্ধা।

প্রথম দুটো গাছ হলো শুকনো গাছ। গুল্ম। তৃণ। জংলি বুনো ঝোপ। যেখানে জল কম থাকে, সেরকম জায়গায় হয়। আর দ্বিতীয় গাছ দুটোও জংলি ঝোপ। যাকে বলে হার্ব বা শ্রাব। এদেশে আমেরিকায় বলে আর্ব। আমরা বলতাম হার্ব। সঠিক উচ্চারণ জানতাম না। কিন্তু এই শেষের দুটো গাছ সবুজ, ভিজে ভিজে, আর বাংলার নরম মাটির গাছ।

নামের উচ্চারণ শুনলেই অনেকটা বোঝা যায়। আপাং, শিয়ালকাঁটা। কাঁটানটে। কেমন যেন একটা বিশুষ্ক, রসহীন ভাব ওই অনুস্বার আর চন্দ্রবিন্দুতে। ওদের পাতায় কাঁটা। ওদের ফুলে নেই কোনো গন্ধ। আর, সর্পগন্ধা, কালকাসিন্দে, মাধুরীলতা, হাতিশুঁড়, বেলিফুল, হাসনুহানা। টগর, গন্ধরাজ। কী সুন্দর, মিষ্টি মিষ্টি নাম। ঠিক যেন বাংলাদেশের মেয়েদের মত। করবী, মল্লিকা, হেনা, চম্পা, সুরঙ্গমা, সুচরিতা, কেয়া, অদিতি। শ্যামলী, পূরবী, মণিমালিকা।

parthab logo

একদিকে ধূ ধূ নিষ্প্রাণ মরুভূমি, আর একদিকে মরুদ্যান, জলাশয়, সবুজ প্রাণের হাতছানি। আমার মনের অবস্থাটাও সে সময়টায় এই রকম ছিল । জীবনমুখী একদিকে, আর একদিকে জীবনবিমুখতা। দুইয়ের তীব্র টানাপোড়েন। টাগ অফ ওয়ার।

মা চলে গেল। বাড়ি ফাঁকা। কেমন যেন একটা অদ্ভুত মনের অবস্থা। প্রথম দিকে দশ বারো দিন তো কাছা পরে অশৌচ পালন করলাম। আর পাঁচটা হিন্দু বাঙালির মত হবিষ্যি খেলাম। মাটির হাঁড়িতে, কাঠের উনুনে সেদ্ধ করা ভাত আর ডাল, আর তার সঙ্গে আলু ভাতে, কাঁচকলা ভাতে। সূর্যাস্তের পর খাওয়া বারণ। তেল, মশলা এসব বারণ, আর বিশেষ করে মাছ, মাংস, ডিম, পেয়াঁজ রসুন এসব খাওয়া একেবারে বারণ। আমার কোনো অসুবিধে হয় নি। মার পারলৌকিক ক্রিয়াকর্মে যদি আমি এইটুকু করতে না পারি, তাহলে আর কী করলাম? যে মা আমাকে এত ভালবাসত। আমার জন্যেই জীবনপাত করেছে। তার জন্যে আমার যা যা কর্তব্য, তা তো আমাকে করতেই হবে। করব না কেন?

আপাং—Achyranthes aspera—কাঁটা ঝোপ।

আপাং—Achyranthes aspera—কাঁটা ঝোপ। – লেখক

তার মাঝে একদিন খবর পেয়ে হৈ হৈ করে সায়েন্স কলেজের বন্ধুরা দেখা করে গেল। সবাই এসেছে। এত ছেলেমেয়ে এসেছে-যে বাড়িতে বসতে দেবারই জায়গা নেই। যেন এক উৎসব। আমার অনুরোধে বিদিশা আবার হারমোনিয়াম নিয়ে গান গাইতে বসে গেল—”ছিল চাঁদ মেঘের পারে…”

আমি যেন একটা ঘোরের মধ্যে।

আমার জেঠাইমা প্রথম দু এক দিন আমাকে সাহায্য করেছিল ধর্মীয় নিয়মকানুন পালন করতে। আমাদের সংসারে জেঠাইমাই এসব ভালো জানত। বিয়ে, পৈতে বাড়িতে এসব হলে জেঠাইমাই সর্বেসর্বা। সেই থালার ওপর চালের গুঁড়ো দিয়ে একটা পিরামিডের মত করে তার ওপর লাল সবুজ রঙের লম্বা লম্বা লাইন। তারপর, সবাই মিলে বউকে নিয়ে ভোরবেলা নদীতে বা পুকুরে জল সইতে যাওয়া। কিংবা, আমার পৈতের পর গেরুয়া কাপড় পরিয়ে দিয়ে আর একটা ঝোলা কাঁধে সমাগত অতিথিদের কাছে ব্রাহ্মণের ভিক্ষে চাওয়া—”ভবতি ভিক্ষং দেহি… ওম স্বস্তি।” গায়ত্রী মন্ত্র জপ করতে শেখানো: “ওং ভুর্ভুবস্ব তৎসবিতুর্বরেণ্য ভর্গদেবস্ব ধিমহী ধীয়য়োনঃ প্রচোদয়াৎ ওং।” এসবই আমাদের বাড়ি খুব চলত বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান পালনের সময়ে। জেঠাইমা ছিল তার এক প্রধান কর্ত্রী। সব রকম নিয়ম কানুন, লোকাচার সব জেঠাইমার জানা আছে। অবশ্য, মন্ত্র কীভাবে উচ্চারণ করতে হবে, সেটা বাবাই বলে দিয়েছিল প্রথম।

আর জানত আমার সেই বালির ঠাকুমা, যাকে আমরা বলতাম ছোটদাদি। বাবার ছোটকাকিমা। মা যেদিন চলে গেল, তার দু একদিন পরেই ছোটদাদি এলো, আর আমার সঙ্গে দেখা হলো রাস্তায়। আমি তখন কোথা থেকে যেন শ্রাদ্ধের অনুষ্ঠানের কিছু ব্যবস্থা করে, না কী করে, ফিরছি। ছোটদাদি আমাকে দেখে রাস্তার মধ্যেই চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদতে লাগলো। আমার একটু আশ্চর্য লেগেছিল। এত কাঁদবার কী আছে?

 শিয়ালকাঁটা—Argemone mexicana—নামমাহাত্ম্য। নাম শুনলেই বোঝা যায় এর কাজ কী।

শিয়ালকাঁটা—Argemone mexicana—নামমাহাত্ম্য। নাম শুনলেই বোঝা যায় এর কাজ কী। – লেখক

আমি এই রকমই ছিলাম। সাধারণ ব্যাপার, যা হবারই কথা, না হলেই লোকে আশ্চর্য হবে, তা আমি সহজে বুঝতে পারতাম না। আর একটা কাঠিন্য এত বেশি ছিল-যে চোখের জল, প্রকাশ্যে দুঃখ শোকের প্রকাশ, এসব আমি পছন্দ করতাম না, ভালো মনে মেনে নিতে পারতাম না। ভাবতাম, এত বাড়াবাড়ি করছে কেন এরা? মনের ভেতরে ভীষণ একটা রুক্ষতা, নিষ্করুণতা ছিল। পৌরুষ আর পুরুষতান্ত্রিকতার অহঙ্কার ছিল বড্ড বেশি। ধরাকে সরা জ্ঞান করতাম।

ছোটদাদি এরা মাকে কত ভালবাসত। বালিতে আমরা কত গেছি। মা কত আনন্দ করেছে। আমার সব প্রায় সমবয়েসী পিসি—সেই চুন, শিখা, আর মাসির বয়েসী মুন্নি পিসি মা ওদের ওখানে গেলেই এরা কত খুশি হত। “নবৌদি, নবৌদি” করত। মাও বালিতে যেতে কত ভালবাসত। তারা মার মৃত্যুর খবর পেয়ে শোক পাবে না? কাঁদবে না?

জেঠাইমা আর দু তিন পর থেকে আসতে পারত না। কারণ, আমাদের বাড়ির খুব কাছেই বিডন স্ট্রিটে ওদের বাড়িতে তখন আর একটা জীবনমরণের দড়িটানাটানি চলছে। আমার জেঠুর তখন শেষ অবস্থা। মুখের ক্যানসার মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। মুখের একটা পাশ মারণ রোগের আক্রমণে ক্ষত হয়ে হাঁ হয়ে গেছে। তুলোর গজ দিয়ে ওষুধ ভিজিয়ে চাপা দেওয়া আছে। তার থেকে তীব্র একটা গন্ধ। সেই জেঠু, যে আমাদের বাড়ি থাকত, ছুটির দিনে বাঁশি বাজাত, আর সন্ধেবেলা আমাকে নিয়ে ট্রামে করে বেড়াতে যেত। যে জেঠু আমাকে সুকুমার সমাজপতির অটোগ্রাফ এনে দিয়েছিল।

যে রবিবার মা চলে গেল সন্ধেবেলায়, ঠিক তার পরের রবিবার। এপ্রিল মাসের ন তারিখ। সন্ধেবেলা। ছোটদাদির বড় ছেলে অন্টিকাকু শেষ পর্যন্ত সাহস সঞ্চয় করে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। বিশাল চেহারা। সেই-যে যার বিয়েতে কাকু আর কাকিমা দুজনে মিলে রসগোল্লা খাওয়ার প্রতিযোগিতা লাগিয়েছিল। সেই অন্টিকাকু। কিন্তু বিশাল পেটানো চেহারা হলে কী হবে, ভীষণ দুর্বল মনে মনে। নবৌদি আর নেই, এই শুনেই ওরা সব দুঃখে একেবারে ভেঙে পড়েছে। শুধু ছোটদাদি অনেক বেশি মজবুত মনের মানুষ। শেষ পর্যন্ত, এক সপ্তাহ পরে, অন্টিকাকু দেখা করতে এসেছে আজ এই রবিবার।

অন্টিকাকুকে দুর্বল দেখাচ্ছিল। বাবা আর আমি দুজনেই ওকে একটু সাহস দেবার চেষ্টা করলাম। কী অদ্ভুত, তখন ওরই আমাদের সাহস আর শক্তি জোগাবার কথা!

বাবা বলল, “এত ভেঙে পড়িস না, অন্টি। যা হবার হয়ে গেছে।”

 কেসিয়া টোরা—কালকাসিন্দার—সবুজ নরম পাতা আর ভিজে ভিজে নরম হলদে ফুল। দেখলেই হাতে তুলে নিতে ইচ্ছে করে। - লেখক

কেসিয়া টোরা—কালকাসিন্দার—সবুজ নরম পাতা আর ভিজে ভিজে নরম হলদে ফুল। দেখলেই হাতে তুলে নিতে ইচ্ছে করে। – লেখক

অন্টিকাকু বলল, “নদা, আমি ভাবতেই পারছি না নবৌদি আর নেই।” বলে, দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁটটা কামড়ে ধরল। ওর মুখটা কাঁপছে। চোখে জল। অন্টিকাকু বাড়ির বড় ছেলে। ওর ভাইগুলো সব্বাই ওকে ভয় পেত। বেবি, খোকন, আর ওদের বাড়ির বাবুয়া বড় দাদার হাতে ঠেঙানি খেয়েছে কত! সেই অন্টিকাকুর মনের জোর এত কম? আমার আশ্চর্য লাগছিল। অস্বস্তি লাগছিল। আমি কখনো বড় কোনো লোককে কাঁদতে দেখি নি। আমার বাবা তো একেবারে মজবুত মনের। এত বড় দুঃখ শুধু আমাদের কথা ভেবে দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে গেল। কোনোরকম আবেগের প্রকাশ দেখলাম না।

একটু সহজ হবার জন্যে আমি বললাম, “বালিতে সবাই ভালো আছে, অন্টিকাকু?” জেঠু ওদের বাড়িরও সবায়ের খুব প্রিয়। বালিতে গিয়ে কত থেকেছে। সেই মাঝখানের বড় ঘরটায় তক্তপোষের ওপর বসে থাকত, আর পানামা সিগারেট খেত। পান খেত। আর সবাইকে সিনেমা যাবার পয়সা দিত। ফুচকা, রসগোল্লা খাওয়াত। মজার মজার গল্প করত। ধাঁধা বলত। অবশ্য, বালির কেউ ধাঁধা পারত না। সেই, “হাফ সার্কল ফুল সার্কল হাফ সার্কল এ, হাফ সার্কল ফুল সার্কল রাইট এঙ্গেল এ।” এ-ধাঁধাটা আমি সুব্রতর বাবার কাছেও শুনেছি অনেকবার।

আর একটু বসে থেকে অন্টিকাকু জেঠুকে দেখতে চলে গেল বিডন স্ট্রিটের বাড়িতে। কাছেই, ভোলানাথ ধামের উল্টোদিকে চব্বিশ নম্বর বাড়ি। মনে হয়, আর একটা মৃত্যু এগিয়ে আসছে এত তাড়াতাড়ি, এই ভয়েতেই অন্টিকাকুকে আরো বেশি পেড়ে ফেলেছিল। একা একা যাবার সাহস ওর হচ্ছিল না। আমার বাবা ওকে নিয়ে গেল জেঠুকে একবার দেখাতে। তারপর, অনেকক্ষণ হয়ে গেল, অনেকক্ষণ হয়ে গেল, কেউ আর আসে না। ফেরে না। এক ঘণ্টা হয়ে গেল। বাবা কখনো এত বেশিক্ষণ জেঠুর বাড়ি থাকেই না।

একটু পরেই কারণটা বুঝতে পারলাম। বাবা ফিরে এসে আমাকে ধরা গলায় বলল, “দাদা আর নেই।” আমি আর বুবু, আর বোধহয় সঙ্গে ছোটদাদি বা অন্য কেউ ছিল, এখন আর ঠিক মনে পড়ছে না। আমরা গেলাম দেখতে। নাকি, আমি বোধহয় একাই গেছিলাম।

স্মৃতিগুলো কিছু কিছু জায়গায় কেমন যেন ঘষা ঘষা চশমার মত, ভাসা ভাসা হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও একেবারে স্বচ্ছ। আবার কোথাও কোথাও অস্পষ্ট, জড়ানো। কুয়াশা কুয়াশা।

আমার বৌদির তখন একেবারে অ্যাডভান্সড প্রেগনেন্সি। আর বোধহয় কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাচ্চা হবে। কিন্তু কী আশ্চর্য মনের জোর এই মহিলার! ওই অবস্থায়ও একটুও বিচলিত না হয়ে বৌদি একবার এ ঘরে গিয়ে জেঠাইমার কাছে গিয়ে বসছে, গায়ে একটু হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, আবার ওঘরে গিয়ে বাড়িতে যারা দেখা করতে আসছে, তাদের নিয়ে এসে বসাচ্ছে।

আমি দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। জেঠুর এই ভীষণ অবস্থায় আমরা তেমন খোঁজ নিতে পারি নি গত কয়েক মাস। শুধু মাঝে মাঝে গিয়ে একবার দেখে আসতাম। দেখতাম, বৌদি সব কিছু দেখাশোনা করছে। জেঠুকে খাইয়ে দিচ্ছে। ওষুধ খাওয়াচ্ছে। হাওয়া করছে হাতপাখা দিয়ে।

এই বৌদি আমার খুব প্রিয়। অনেকদিন আগে, পাঁচ সাত বছর আগে, যখন দাদার বিয়ের কথাবার্তা চলছে, তখন জেঠু একদিন আমাকে দাড়ি কামাতে কামাতে বলল, “দাঁড়াও, তোমাকে একটা ছবি দেখাই।” বলে, রেডিওর পাশে রাখা একটা বই না ডায়রির পাতার ফাঁক থেকে একটা বড় পোস্ট কার্ডের সাইজের সাদাকালো ছবি বের করে আমাকে দেখালো।

বলল, “এই মেয়েটির সঙ্গে বাবলুর বিয়ের কথা হচ্ছে। দেখো তো, তোমার পছন্দ হয় কিনা।”

হাতিশুঁড়—Heliotropium indicum—কী চমৎকার তার বাহার। আর ফোঁটা ফোঁটা বাংলার বৃষ্টি লেগে আছে গায়ে। - লেখক

হাতিশুঁড়—Heliotropium indicum—কী চমৎকার তার বাহার। আর ফোঁটা ফোঁটা বাংলার বৃষ্টি লেগে আছে গায়ে। – লেখক

আমি দেখলাম। আমি তখন ক্লাস ইলেভেনে পড়ি। বড় হয়ে গেছি। বড় বড় কথা বলি। সবাই ভাবে আমি একটা মাতব্বর গোছের। তবুও, জেঠু-যে আমার কাছে ছেলের পাত্রী নির্বাচনের ব্যাপারে পরামর্শ চাইবে, আমি ভাবতেও পারি নি। দাদা হলো গিয়ে আমার থেকে প্রায় দশ বছরের বড়। সে থাকে দেরাদুনে। ও এন জি সি’তে বড় চাকরি করে। আর আমি এখনো স্কুলের গণ্ডিই পার হই নি।

জেঠু বলল, “কেমন লাগলো তোমার? পছন্দ হয়?”

আমি ভারিক্কি চালে বললাম, “আমার তো খুব ভালো লাগছে, জেঠু। মুখটা খুব ইন্টেলিজেন্ট। খুব বুদ্ধি আছে।”

জেঠু গালে মাখা সাবানের ফেনা থেকে বুরুশটা সরিয়ে জানলার সামনের কাঠের কার্ণিশের উপর রাখল। আমাকে বলল, “তাই মনে হয় তোমার? ওদের বাড়ির সবাই ওখানেই থাকে। দেরাদুনে। মেয়েটির নাম প্রাচী। ওর বাবা ওখানে ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের বড় অফিসার।”

তাহলে আর কী? আমি মনে মনে বললাম। সব তার মানে আসলে ঠিক হয়েই গেছে। এখন শুধু নিয়ম রক্ষার ব্যাপার।

কিন্তু বৌদির কুমারী বয়েসের ছবি দেখে আমার সত্যিই খুব ভালো লেগেছিল। আর আমাকে-যে জেঠু এই বিষয়ে একজন নির্বাচক হিসেবে নিয়োগ করেছিল, তা আমাকে মনের দিক থেকে বড় হতে আরো সাহায্য করেছিল। বাড়ি ফিরে এসে মাকে বলেছিলাম। মা শুনে হেসেছিল।

বলেছিল, “তাই নাকি? দাদা ছেলের বউয়ের ছবি তোমাকে দেখালো? বাবা!” দাদা মানে জেঠু।

আমি বললাম, “দেখালো তো। জিজ্ঞেস করলো, আমার পছন্দ হয়েছে কিনা।”

সেই জেঠু বিছানায় শুয়ে আছে। চোখ বন্ধ। আর কোনো যন্ত্রণা নেই। সব কষ্টের শেষ হয়েছে এবার। এখন শান্তি। নীরবতা। বিশ্রাম।

আমি বাবাকে বললাম, “আস্তে আস্তে এবার সব ব্যবস্থা করলেই ভালো হয় তো। শরীরটা তো একেবারে… মানে, কেমন একটা… খুব গন্ধ বেরোচ্ছে।”

বিডন স্ট্রিট বা অভেদানন্দ রোডে ২৪ নম্বর বাড়ি। এখানে দোতলায় জেঠু জেঠাইমা, দাদা বৌদি থাকত। এখানেই জেঠুর মৃত্যু হয়েছিল। - লেখক

বিডন স্ট্রিট বা অভেদানন্দ রোডে ২৪ নম্বর বাড়ি। এখানে দোতলায় জেঠু জেঠাইমা, দাদা বৌদি থাকত। এখানেই জেঠুর মৃত্যু হয়েছিল। – লেখক

কথাটা ঠিক হলেও আমার হয়ত তখনই ওকথা অমন করে বলা ঠিক হয় নি। সবার মনের অবস্থা বিচার করে কথা বলা উচিৎ ছিল। কিন্তু, আমি কিছু ভেবে বলি নি, আর বাবাকে ছাড়া আর কারুকে বলিও নি। বাবা আমার দিকে একটু বিরক্ত হয়ে তাকালো। অন্য সময়ে, ছোটবেলার দিন হলে, হয়ত আমাকে একটা চড় কষিয়ে দিত আমার নির্বুদ্ধিতার জন্যে। কিন্তু এখন আমিও শোকের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। বাবা আমাকে কিছু বলল না। শুধু বলল, “তুমি বাড়ি চলে যাও। তোমাকে শ্মশানে যেতে হবে না।”

মায়ের অশৌচ নিয়ে শ্মশানে আবার ওই সময়ে যেতে নেই বোধহয়।

আমি আর একটু থেকে, দাদা বৌদি আর জেঠাইমার সঙ্গে কথা একটু বলে বাড়ি চলে এলাম। আর আমার ছোট ভাইপোটার সঙ্গে। জয়। ওর বয়স তখন বোধহয় পাঁচ।

এই হল মরুভূমির গল্প।

***

মনের মধ্যে কোথায় যেন একটু একটু করে একটা ওয়েসিসও তৈরি হচ্ছিল নিজের অগোচরে।

আমাদের এম এস সির সেকেন্ড সিমেস্টারের শুরুতেই মা চলে গেল। ফার্স্ট সিমেস্টারে এত ক্ষতি হয়েছে পড়াশোনার। এই ভেবে আমি এবার খুব মন দিয়ে ক্লাস করার চেষ্টা করতে লাগলাম। এই সিমেস্টারটা খুব কঠিন। ট্যাক্সোনমির সব দুর্বোধ্য টার্ম—হলোটাইপ, সিনটাইপ, এসব শুধু মুখস্থ করে পরীক্ষায় উগরে দিতে হবে, কোনো জীবন্ত উদাহরণ নেই-যে কেউ সেটা দেখিয়ে বুঝিয়ে দেবে পার্থক্যগুলো কোথায়। আমাদের সেই প্রাগৈতিহাসিক শিক্ষাপদ্ধতি। তার ওপর আবার অত্যন্ত রাশভারি আর কর্কশ স্বভাবের দু-চারজন অধ্যাপক, যাঁদের কাছে আলাদা করে গিয়ে প্রশ্ন করা, পড়া বুঝে নেওয়া অসম্ভব।

এর মধ্যেই আমি চেষ্টা করেছিলাম আমাদের বিখ্যাত বোটানিস্ট অধ্যাপক অরুণ কুমার শর্মা আর তাঁর স্ত্রী অধ্যাপিকা অর্চনা শর্মার কাছে গিয়ে দেখা করে আমার অবস্থাটা বোঝানোর। ওঁরা আমাকে স্নেহ করতেন। কেমন করে যেন ওঁদের কাছে খবর পৌঁছে গেছিল আমার বিষয়ে। ওঁরা দুজন ছিলেন আমাদের ডিপার্টমেন্টের শেষ কথা। আমি অনুরোধ করেছিলাম, আমার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে তাঁরা যেন আমাকে সরাসরি সায়েন্স কলেজের ক্লাসে ট্রান্সফার করিয়ে নেন, যাতে আমাকে এই অবস্থায় প্রতিদিন দুপুরে বালিগঞ্জ থেকে প্রেসিডেন্সি কলেজে বাস ধরে যাওয়া আসা না করতে হয়। কিন্তু তাঁরা আমার সে-অনুরোধ রাখলেন না।

যাই হোক, তাতে আমার বেশি ক্ষতি হয় নি। আমার কতগুলো দারুণ ভালো ভালো বন্ধু হলো, আর কয়েকজন অত্যন্ত স্নেহশীল শিক্ষক। এদের সান্নিধ্যে ও সাহায্যে আমার এম এস সির বাকি এক বছর কি দেড় বছর খুব আনন্দে কেটেছিল।

প্রথমেই খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেল সেই নাগেশ বা নাগেশ্বর রাওয়ের সঙ্গে। সেই নাগেশ, যে আমার মাকে রক্ত দিতে গেছিল আর জি কর হাসপাতালে। নাগেশ উচ্চবিত্ত বাড়ির ছেলে। সাউথ ইন্ডিয়ান অ্যাকসেন্ট বেশি নেই, কারণ কলকাতার বিখ্যাত সেন্ট লরেন্স স্কুলে ও লেখাপড়া করেছে। বাংলা বলে মোটামুটি বেশ ভালই, কিন্তু বাঙালি কালচার ও বোঝে না, আর বোঝবার কোনো ইচ্ছেও ওর নেই। পুরোদস্তুর লেখাপড়া আর ক্যারিয়ার —এই ওর জীবনের ব্রত। কেয়াতলা রোডে ওদের বিরাট ফ্ল্যাট। এমন জায়গায় থাকে, সেখানে আমি আগে কখনো যাইই নি। চুপচাপ, শান্ত, নির্জন পাড়া। অনেক খুঁজে খুঁজে ওদের বাড়ি যেতে হয়, আর আমি প্রায় প্রত্যেকবারই হারিয়ে যাই একটু। এই নাগেশের বাড়ি গিয়ে আমরা দুজন একসঙ্গে সেকেন্ড টার্মের পড়া শুরু করলাম। নাগেশ আমাকে দেখিয়ে দিল কীভাবে খুব কঠিন সাবজেক্ট পড়তে হয়।

ওর সেই সরু আর তীক্ষ্ণ গলায় নাগেশ বলল, “সী, প্রথমেই গো থ্রু করবি না। গো ওভার করবি। ডু ইউ নো দা ডিফারেন্স বিটুইন দেম?”

আমি বললাম, “ওই একটা হলো ডিটেলে পড়া, আর একটা ওপর ওপর পড়া। রাইট?” আমি আবার রাইট কথাটা জুড়ে দিলাম, কারণ একটু একটু ইংরিজি জানি সেটা ওকে বোঝানো দরকার আমার।

নাগেশ বলল, “ইয়া, রাইট।” ও খুব সিনসিয়ার স্টুডেন্ট ছিল। আমাদের মত পঞ্চাশটা জিনিস জানতও না, আর করতও না। ওদের সমাজে আমাদের বাঙালি আড্ডা ব্যাপারটাই নেই। ফলে, ওদের ফোকাস অনেক বেশি। আর, সময় নষ্ট করে না ওরা বাজে বকে না। এটা আমি তখন থেকেই লক্ষ্য করেছিলাম। নাগেশের সঙ্গে পড়ে আমার অনেক উন্নতি হলো। শক্ত শক্ত বিষয়—যেমন উদ্ভিদ জল থেকে স্থলে কীভাবে বিবর্তিত হলো, ইভোল্যুশন কীভাবে একটু একটু করে বিভিন্ন ধাপের মধ্যে দিয়ে এগোলো, সেসব বুঝতে শিখলাম। অবশ্য, পরে আমেরিকায় বিখ্যাত প্যালিওবোটানিস্ট ডক্টর ল্যারি ম্যাটেনের কাছে যা শিখেছি, বা অধ্যাপক রে স্টটলার আর তাঁর স্ত্রী বারবারা স্টটলারের কাছে, তার তুলনায় নাগেশের কাছে বসে সেদিনকার পড়াশোনাগুলো ছিল প্রায় প্রাথমিক স্তরের। কিন্তু আমি তো আর ঠিক বোটানিস্ট বা বিজ্ঞানী হবার মাল ছিলাম না, ফলে আমার কাঁচামাল দিয়ে দুধ থেকে পায়েস হবার ছিল না কিছুতেই। তাও, বেশ অনেক কিছু শিখে ফেললাম সেই অল্প বয়েসের উৎসাহে।

তারপর, তপতী। বি এস সিতে তপতী দত্ত অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়েছিল। আবার আমাদের দীপকবাবু, বিদ্যাসাগর কলেজের দীপক গুপ্ত ওকে ওর বাড়ি গিয়ে প্রাইভেটে পড়াতেন, আর আমাদের কাছে ওর সুখ্যাতি করতেন। আমরা ভাবতাম, ওরে বাবা, কী জানি কী ব্যাপার এই তপতী।

সেই তপতীর কী যে হলো, এমনিতে ও কারুর সঙ্গে মিশতও না, আর পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু বুঝতও না। অস্বাভাবিক সিরিয়াস মেয়ে ছিল তপতী। সে হঠাৎ আমাকে সুনজরে দেখতে আরম্ভ করলো। আমার মা মারা যাবার পর তপতী ওর মাকে নিয়ে আমাদের বাড়ি এলো একদিন। মার ছবিতে মালা দিল। ধূপ জ্বালিয়ে দিল। আর আমরা ঠিক করলাম, ওর বাড়ি গিয়ে আমরা একসঙ্গে পড়ব। অন্য বন্ধুরা—মুক্তি, শ্যামল, বিদিশা —এরা তো শুনে অবাক! কেউ কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারে নি তপতী কারুকে বাড়িতে ডেকে এনে একসঙ্গে পড়াশোনা করবে। ওর সব সিক্রেট নোহাউ আর একজনকে দিয়ে দেবে।

সেই তপতী। ওর বায়োলজি বক্সে খুব ছোট্ট ছোট্ট করে কাটা কতগুলো পেনসিলের টুকরো থাকত। মন দিয়ে পড়ার জন্যে, আর বাইরের হাজার শব্দ থেকে নিজেকে একেবারে কাট-অফ করে ফেলার জন্যে ও দু কানে দুটো পেন্সিলের পিছন দিকটা গুঁজে রাখত। এখনকার যুগের আই ফোনের মত অনেকটা আর কী!

আমি ব্যাপারটা একেবারেই ঠিক ধরতে পারি নি। তপতী আর আমি খুব মন দিয়ে এম এস সির পড়া করতাম। জটিল সব ছবি আঁকতাম। নাগেশের সঙ্গে হয়ত জিমনোস্পার্ম পড়ছি, আর তপতীর সঙ্গে আমার বাড়ির কাছেই মানিকতলায় সুকিয়া স্ট্রিটে ওর বাড়ি গিয়ে একতলার ঘরে বসে ল্যাবিয়েটি আর স্ক্রফিউলারিয়েসি এই দুই ফ্যামিলির মধ্যে ফুলের গঠনের পার্থক্য কী, তাই নিয়ে চুল ছিঁড়ছি। তপতী আমাকে কখনো কোনো দুর্বলতা প্রকাশ্যে দেখায় নি। আমি কিছু বুঝি নি।

পরের সিমেস্টারগুলোতে কীভাবে পড়লে আরো ভালো রেজাল্ট করা যাবে, তা নিয়ে গভীর আলোচনা করছি। মাসিমা মাঝে মাঝে এসে একটু চা, একটু খাবার দিয়ে গেছেন। আমি এখন ভীষণ সিরিয়াস এক বোটানি স্টুডেন্ট। আমি সত্যি অনেক বদলে গেছি ভেতর থেকে। আমার মধ্যে একটা প্রশান্তি এসেছে। কেমন যেন মনটা শান্ত, সংযত হয়ে গেছে। মা যাবার সময়ে নিশ্চয়ই আমাকে আশীর্বাদ করে গেছে। বলেছে, “বদলাও, বদলাও, অসাধারণ ছেলে, দেখিয়ে দাও তুমি কত কী করতে পারো।”

সায়েন্স কলেজে সবাই আমাকে এখন চেনে। টিচাররা, সিনিয়র দাদা দিদিরা। এক বছর দু বছরের সিনিয়র আর জুনিয়রদের সঙ্গে আমার খুব দোস্তি হয়ে গেছে। মধুব্রত, সুরজিৎ, অনাদি, স্বপন, দীপক, সন্দীপ, লক্ষ্মী, সংগ্রাম, পদ্মজা, বীণা। অন্য সব ডিপার্টমেন্টের মলয়, শ্যামল, সৌমিত্র। আর কয়েকজন স্নেহশীল শিক্ষক। নির্মল সমাজপতি, শুভেন্দু মুখার্জী, রবীন পুরকায়স্থ, নন্দ পারিয়া। প্রেসিডেন্সি কলেজের তরুণ অধ্যাপক কল্যাণ মান্ডি আমাকে খুব পছন্দ করেন, স্নেহ করেন। প্র্যাকটিকাল ক্লাসে আমি আর প্রতাপ অনেকক্ষণ থাকি। বেশি থাকি। আমরা অনেকের চেয়ে এগিয়ে গেছি পড়াশোনায়, আমরা বুঝতে পারি এখন। খুব ভালো লাগে। কল্যাণ মান্ডি আর এস কে বি নামে আর একজন অধ্যাপক একবার আমাদের নিয়ে শিলিগুড়ি, দার্জিলিং আর গ্যাংটক এলাকায় এক্সকারসন করতে নিয়ে গেলেন। খুব আনন্দ। দিনের বেলা ঘুরে ঘুরে পাহাড়ি গাছ সংগ্রহ করা, চেনা। নতুন নতুন, হাজার প্রজাতির অদ্ভুত গাছপালা। যা আমাদের সমতল বাংলাদেশে দেখাই যায় না। আর, সন্ধেবেলা বসে বসে আড্ডা, আমাদের প্রেসিডেন্সি কলেজের চতুর্ভুজদার রান্না মাংস ভাত, আর রবীন্দ্রসঙ্গীত। কল্যাণবাবু অসাধারণ গান গাইতেন। আর, আমার বন্ধুরা—প্রতাপ, শুক্লা, দেবযানী, মণিমালা এরা সব আমাকে ধরত পাল্টা জবাব দেবার জন্যে। কল্যাণবাবু চারটে গান গাইলেন, তো আমাকেও জবাবে চারটে রবীন্দ্রনাথের গান গাইতেই হবে। সে দারুণ মজা। খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেল সবার সঙ্গে।

আমার মন একটু একটু করে ভালো হয়ে যাচ্ছে। অনেক বড় একটা জগৎ চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে। আমার মনের ভেতরে প্রগতিশীলতা বাসা বাঁধছে। আমাকে একটু একটু করে চেনাচ্ছে। বলছে, “দেখো, এই আসলে তুমি। ওই সব আর এস এস—এসব ধর্মান্ধতা, গোঁড়ামি তোমার জন্যে নয়।”

তপতী ওরা আমাকে ঠিক বুঝতে পারে নি। আমার সাংস্কৃতিক চিন্তাভাবনা। আমার রাজনীতি। আমার জীবনদর্শন। ওরা আমার ব্যক্তিগত ভালো লাগা, ভালোবাসাও বুঝতে পারে নি ঠিক। জুনিয়র মেয়েদের মধ্যেও দু একজন ছিল, আমাকে খুব পছন্দ করত। আজ তাদের নাম করে তাদের অসুবিধেয় ফেলতে চাই না। আমাদের দেশে মেয়েদের সম্মান খুব সহজেই ধুলোয় টেনে আনা যায়। কিছু লোক আছে, তাদের কাজই এই। পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটা। আর পরনিন্দা পরচর্চা করা। বাঙালিদের মধ্যে খুব বেশি।

আসলে, আমার জীবনে তখন মুক্তি এসেছে। মুক্তি ভট্টাচার্য। প্রেসিডেন্সি কলেজের আর এক ভালো ছাত্রী। খুব মুক্তমনা, খুব হাসতে পারে। সবার প্রিয়। ভাস্বতী আমাকে বুঝতে পারে নি। ওর সামাজিক অর্থনৈতিক শ্রেণী আর তার নানা রকম ব্যবধান আমাদের রিলেশনশিপ হবার পথে দুর্লঙ্ঘ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমরা দূরে সরে গিয়েছিলাম আস্তে আস্তে। মার মৃত্যুর পর আমার খুব কাছে চলে এলো মুক্তি। আমি ওর বাড়িতে যেতে আরম্ভ করলাম বৌবাজারে। সেনকো জুয়েলার্স পাড়ায় ওদের বাড়ি, ট্রাম রাস্তার ওপরেই তিনতলায়। ওদের বাড়ি যৌথ পরিবার। বাবা-মার একমাত্র সন্তান মুক্তি। আর ওদের বাড়িতে থাকে ওর জেঠামশাই আর জেঠিমা, আর তাঁদের দুই ছেলে। দুজনেই মুক্তির থেকে বড়। আমি প্রেসিডেন্সি থেকে একটু হেঁটে কলেজ স্কোয়ারের পিছনের দিকে পুঁটিরামের দোকানের সামনে চলে যাই, আর ও আসে সায়েন্স কলেজ থেকে। আমরা একটু কিছু খাই। গোপাল নামে একটা বাচ্চা ছেলে ওখানে কাজ করে, আর আমাদের এই কদিনেই চিনে গেছে। আমাদের জিজ্ঞেস করে, “কচুরি আর আলুর দম?”

Mukti Partha 1978 reunion

সেই ১৯৭৮ সালের রি-ইউনিয়নের অনুষ্ঠানে আমি আর মুক্তি আবৃত্তি করছিলাম। বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ অডিটরিয়াম। – লেখক

ভাস্বতীর বাড়ি রিচি রোড। বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে দশ পনের মিনিটের হাঁটা পথ। আর মুক্তিদের বাড়ি রাখাল চন্দ্র ভট্টাচার্য জুয়েলার্স বাড়ির ওপরের তলায়। ভাস্বতী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে আসা। ইংরিজি বলে ফরর ফরর করে। মুক্তি বাংলা মিডিয়াম ব্রাহ্ম গার্লস স্কুল উত্তর কলকাতায়। আমিও বাংলা মিডিয়াম স্কটিশ থেকে আসা ছেলে। আমরা ইংরিজিতে কথা বলতে পারি না। ওই একটা কি দুটো সেন্টেন্স। তার পরেই, ব্যাস, হয়ে গেল। আর বেশি বলতে গেলেই জিভ জড়িয়ে যায়। কথা খুঁজে পাই না। আমি অবশ্য খুব তাড়াতাড়ি ওই সুমনা আর বিদিশার দেখাদেখি শুড হ্যাভ আর কুড হ্যাভ, আর ইউ নো আর আই নো এসব রপ্ত করে ফেলেছি। কিন্তু, তাও ইংরিজিতে কথা বলা বেশিক্ষণ ধরে একেবারেই অসম্ভব।

এক ক্লাস, এক ধরনের সামাজিক স্তর। এক ধরনের জীবনের গল্প অনেকটা। ভাবনা-চিন্তা, স্বপ্ন, সংগ্রাম অনেকটা একধরনের। খুব তাড়াতাড়ি বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

বন্ধুত্ব থেকে প্রেম।

পুঁটিরামের দোকান থেকে আমি মাঝে মাঝে মুক্তিকে বাড়ি পৌঁছে দিই বৌবাজারে। তারপর একটু হয়ত থাকি ওখানে। মাসীমা আর মেসোমশাই দুজনেই আমাকে স্নেহ করেন। আমরা একটু হয়ত পড়ি। অবশ্য, পড়াটা ক্রমেই সেকেন্ডারি হয়ে যাচ্ছে একটু একটু করে।

“আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে,

আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে॥

এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি

নূতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে॥”

আমার নিজেরই অবাক লাগতে আরম্ভ করেছে এখন। কত তাড়াতাড়ি জীবনটা পাল্টে গেল। বাড়িতে যদিও খুব সমস্যার মধ্যে চলছে, আজ এ রান্না করে দিয়ে যায় তো কাল সে, কোনো কিছুরই কোনো ঠিক নেই, সব কিছু বিশৃঙ্খল, কিন্তু আমার জীবনে মার মৃত্যু সবকিছু যেভাবে ভেতর থেকে ওলটপালট করে দিয়ে গেছিল একটা ভয়ঙ্কর সাইক্লোনের মত, তার পরেও এত কম সময়ের মধ্যে আমি-যে আবার সবকিছু জোড়া লাগাতে পারব, সবকিছু-যে জোড়া লেগে যাবে, তা ভাবতে পারি নি।

জীবন কত বদলে গেছে। মুক্তি ব্যানার্জী ও তার "মুক্তিস কিচেন" নিউ ইয়র্ক এলাকায় এখন এক পরিচিত নাম। ইন্ডিয়ান কুকিং শিখতে মুক্তির কাছে বহু মার্কিনি আসেন। নানা জাতি, নানা মত, নানা পরিধান। - লেখক

জীবন কত বদলে গেছে। মুক্তি ব্যানার্জী ও তার “মুক্তিস কিচেন” নিউ ইয়র্ক এলাকায় এখন এক পরিচিত নাম। ইন্ডিয়ান কুকিং শিখতে মুক্তির কাছে বহু মার্কিনি আসেন। নানা জাতি, নানা মত, নানা পরিধান। – লেখক

আমিও বদলে গেছি অনেক। সায়েন্স, বায়োলজি বহুকাল হলো ছেড়ে দিয়ে এখন আমি শ্রমিক শিক্ষক। আমেরিকান লেবর ইউনিয়নের সঙ্গে কাজ করি। আর, ইমিগ্র্যান্ট আন্দোলনের এক পদাতিক সৈন্য, সেই ৯/১১'র পর থেকে। - লেখক

আমিও বদলে গেছি অনেক। সায়েন্স, বায়োলজি বহুকাল হলো ছেড়ে দিয়ে এখন আমি শ্রমিক শিক্ষক। আমেরিকান লেবর ইউনিয়নের সঙ্গে কাজ করি। আর, ইমিগ্র্যান্ট আন্দোলনের এক পদাতিক সৈন্য, সেই ৯/১১’র পর থেকে। – লেখক

মুক্তির সঙ্গে প্রেম আমাকে আবার আমার নিজের পরিচিত পথে, পরিচিত ছন্দে ফিরে আসতে খুব সাহায্য করেছিল।

কয়েক মাসের মধ্যেই আমরা সায়েন্স কলেজে আমাদের বার্ষিক রি-ইউনিয়ন অনুষ্ঠান করলাম। বিরাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান, আবৃত্তি, নাটক। হাজার হাজার পুরনো ছাত্র-ছাত্রী ডিপার্টমেন্টের, তাদের ডেকে নিয়ে এসে খাওয়া-দাওয়া, উৎসব। নাগেশের সঙ্গে প্রধান দায়িত্বে ছিলাম আমি। আর আমার সঙ্গে ছিল প্রেসিডেন্সি গ্রুপের বন্ধুরা। সিটি কলেজ গ্রুপের বন্ধুরা। অনেক ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল। ব্রেবোর্ন কলেজের গ্রুপ অনুষ্ঠানে আসে নি। নাগেশও আসতে পারে নি ওর পরিবারে একটা বিরাট দুর্যোগের কারণে। ওর দিদি হঠাৎ সেই সময়ে তার স্বামীকে হারালো, আর নাগেশকে দক্ষিণ ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের এক কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধকারে ফিরে যেতে হলো দিদির খোঁজ করার জন্যে। যে জগৎ আমাদের মুক্তমনা বাঙালিদের কাছে একেবারেই অচেনা।

কিন্তু, আমরা দারুণ রি-ইউনিয়ন করলাম। ম্যাগাজিন, কালচারাল প্রোগ্রাম, হৈ হৈ, হাসি ঠাট্টা, হুল্লোড়।

পার্থ আর মুক্তিকে এখন সবাই এক ডাকে চেনে।

(কিস্তি ২৭)

Tagged with:

About Author

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় তিরিশ বছর ধরে আমেরিকায় আছেন। কলকাতায় ছিলেন জীবনের অর্ধেক। এখন স্থায়ীভাবে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। মানবাধিকার, বিশেষত ইমিগ্র্যান্টদের অধিকার ও শ্রমিক ইউনিয়ন—এই দুই বিষয়ে পেশাদারিত্ব। ইলিনয় থেকে পি এইচ ডি করার পর বিজ্ঞান ছেড়ে সাংবাদিকতা ও হিউম্যানিটিস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। শৈশব থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আর এস এস ও বিজেপির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার পর রাজনৈতিক ও আদর্শগত কারণে বেরিয়ে আসেন। তাদের সম্পর্কে বই ও নানা রচনা লেখেন। রাজনীতি ছাড়া বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ। সাংস্কৃতিক সংকট ও বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক আগ্রাসন সম্পর্কে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Partha Banerjee) বিশ্লেষণ ইউটিউব ও ফেসবুকে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রসংগীতে ও বাংলা আধুনিক গানে বিশেষ উৎসাহ। ২০১২ সালে কলকাতা থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের সিডি "আরো একটু বসো" প্রকাশিত হয়। বাংলা ও ইংরাজিতে লেখেন। উইকিপিডিয়া লিংক: http://en.wikipedia.org/wiki/Partha_Banerjee