ঘটিকাহিনী (২৭)

(আগের পর্ব)

রূপনারাণের কূলে জেগে উঠিলাম

সায়েন্স কলেজে দু বছর ধরে খুব পরিশ্রম করার পরেও এম এস সিতে ফার্স্ট ক্লাস পেলাম না।

প্রথম কারণ, সেই প্রথম সিমেস্টারে এত খারাপ রেজাল্ট হয়েছিল-যে তা আর মেকআপ করা গেল না। আর দ্বিতীয় কারণ, যা অনেকে বলবে লেম এক্সকিউজ, তা হলো আমরা যারা প্রেসিডেন্সি কলেজের ব্যাচে এম এস সি পড়তাম, তাদের কেউই কখনো প্রায় ফার্স্ট ক্লাস পেত না, কারণ তারা তো ব্যাক বেঞ্চার। তাদের পাওয়ার কথা না ফার্স্ট ক্লাস। আমিও পেলাম না, যদিও আমি দারুণ ভালো পরীক্ষা দিয়েছিলাম বাকি সব কটা সিমেস্টারে। মার মৃত্যুর পরে পড়াশোনাটাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। মুক্তির সঙ্গে পড়তাম, খুব বেশি পড়তাম, অন্য কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবীর সঙ্গেও পড়তাম মাঝে মাঝে, আর কয়েকজন অধ্যাপক-অধ্যাপিকা যাঁরা আমাদের খুব ভালবাসতেন, তাঁদের কাছেও গিয়ে পড়া বুঝে নিতাম। যেমন, প্ল্যান্ট প্যাথলজির রবীন পুরকায়স্থ, মাইকলজি বা ফাংগাসের নির্মলেন্দু সমাজপতি। এই দুজন শিক্ষকের স্নেহ ও সান্নিধ্য আমরা কখনো ভুলব না।

parthab logo

কিন্তু তাও, শেষ পর্যন্ত ফার্স্ট ক্লাস আমার হলনা। তার মানে, চিরকালই আমি ভারতে সেকেন্ড ক্লাস ছাত্র হয়েই থেকে গেলাম। হায়ার সেকেন্ডারিতে, বি এস সি অনার্সে, আর এম এস সিতে—সব কটা পরীক্ষাতেই মা সরস্বতী আমাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর সাধারণ ছাত্রতালিকাতেই অন্তর্ভুক্ত করে রাখলেন। ভারতমাতার এত আরাধনা করলাম আর এস এসে সেই ছ বছর বয়েস থেকে, এত দেশপ্রেমের গান গাইলাম, কিন্তু তিনিও মুখ তুলে চাইলেন না।

আমাদের দেশে এ কোনো গোপন কথা না। সবাই জানে। আমি নিজে আমার কয়েকজন খুব কাছের প্রফেসারের কাছে শুনেছি, প্রেসিডেন্সি বা লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের অনার্সের স্টুডেন্টদের খাতা দেখা হয় বিশেষ যত্ন নিয়ে, আর অন্যদের হেলাফেলা করে। আমি বলব না বিখ্যাত কলেজের স্টুডেন্টদের কোনো বিশেষ সুবিধে দেওয়া হয়, কিন্তু তাদের ইভ্যালুয়েশন করা হয় ঠিক যেমন করে করা উচিৎ, তেমন করে। অন্যদের হয় না। সুতরাং, ওখানে হয় তোমাকে নামকরা কলেজের স্টুডেন্ট হতে হবে, নয়তো সেসব কলেজের নামকরা কোনো প্রফেসারের পেয়ারের হতে হবে। যত্ন নিয়ে তাদের খাতা দেখা হয়, তাদের ভাইভা ভোসিতে যথোচিত সম্মান দেওয়া হয়, যেমনটা সবাইকেই দেওয়া উচিৎ। আর, আমাদের প্রেসিডেন্সি ব্যাচের দেবযানীকে এক প্রফেসার ভাইভাতে আদর করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হ্যাঁ গো দেবযানী, তোমার কচ কোথায়?” সম্পূর্ণ অনৈতিক, ব্যক্তিগত প্রশ্ন। বিপন্ন করার প্রশ্ন। দমিয়ে দেওয়ার নানা রকম কৌশল এসব প্রফেসারদের আয়ত্ত ছিল।

দেবযানী আমাকে বলেছিল, এ প্রশ্ন প্রথমেই শুনে ওর চোখে জল এসে গিয়েছিল। কেন এমন আপত্তিকর প্রশ্ন প্রফেসার করবেন ছাত্রীকে, যে প্রশ্নের সঙ্গে পড়াশোনার কোনো সম্পর্কই নেই? এখানে এই আমেরিকায় হলে দেবযানী মানহানির মামলা ঠুকে দিতে পারত।

স্কুলেও তাই। আমাদের সময়ে হিন্দু স্কুল, বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ভালো রেজাল্ট করত, স্ট্যান্ড করত হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায়, কারণ খাতা দেখত ভালো ভালো, বাছা বাছা একজামিনাররা। গ্রামের স্কুলের, বা কলকাতার আজেবাজে স্কুলের খাতা পড়ত গিয়ে আজেবাজে জায়গায়। যেখানে তাদের খাতা কেবলমাত্র একটা সংখ্যা। কেউ জানবে না কে তাদের খাতা দেখেছে, কেমন করে দেখেছে, বা কেনই বা তারা ভালো পরীক্ষা দেওয়া সত্বেও এত কম নম্বর পেল। তাদের জানার কোনো উপায়ও নেই, অধিকারও নেই।

আমি যখন এম এস সিতে সেকেন্ড ক্লাস পেলাম, তখন একবার সেই দীপকবাবুর বাড়িতে এক বাৎসরিক সরস্বতী পুজোতে গিয়েছিলাম। দীপকবাবুর সঙ্গে যোগাযোগটা বরাবরই ছিল। উনি আমাদের খুব স্নেহ করতেন। সেখানে আমাদের সব পুরনো বন্ধু আর বান্ধবীরা অনেকেই আসত। আমাদের ব্যাচের প্রতাপ, দীপিকা, ছোট তপতী, এরা। আমাদের আগের ব্যাচের লক্ষ্মী, শ্রী। আমাদের থেকে দুবছরের জুনিয়র বন্ধু উদয়ন সেনগুপ্ত, কৃষ্ণ, ত্রিদিব চ্যাটার্জী। তারপর সেই পাঞ্জাবী মেয়েটা প্রমীলা না কী যেন, যে অল্প বয়েসেই সুইসাইড করলো হঠাৎ। ত্রিদিব এখন বই মেলার হর্তাকর্তা বিধাতা। ওদের বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা পত্রভারতী।

এইরকম এক সরস্বতী পুজোতে আমি আমার বাবাকে আর বোনকে নিয়ে গেছিলাম। ঠিক মনে নেই, বুবু বোধহয় রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিল ওখানে। কথায় কথায় দীপকবাবু আমার বাবাকে বললেন, “পার্থ যদি আমাকে একটু আগে বলত, তাহলে আমি ওদের সেকেন্ড একজামিনারকে বলে দিতাম।” ব্যাপারটা হলো এই। ফিফথ বা ফাইনাল টার্মে, যা ছিল আমাদের স্পেশাল পেপার টার্ম, সেখানে আমি মাইকোলজিতে দারুণ পরীক্ষা দিয়েছিলাম, এবং দারুণ নম্বর পেয়েছিলাম। আশি না পঁচাশি পার্সেন্ট। ওই নম্বর পেলে আমার ফার্স্ট ক্লাস পাওয়া কেউ আটকাতে পারত না। কিন্তু, ওদের নিয়ম ছিল, খুব হাই নম্বর পেলে একজন সেকেন্ড একজামিনারকে দিয়ে খাতা দেখানো হবে। এবং সেই সেকেন্ড একজামিনার যেহেতু আমাকে চিনতেন না, শুধু দেখলেন-যে আমি প্রেসিডেন্সি ব্যাচের ব্যাকবেঞ্চার এম এস সি স্টুডেন্ট, সুতরাং তিনি স্থির করলেন, আমি এত বেশি নম্বর পেতেই পারি না। এবং, আমাকে এত কম নম্বর দিলেন-যে ফার্স্ট ক্লাস মাত্র কয়েক নম্বরের জন্যে ফসকে গেল। এই দ্বিতীয় পরীক্ষককে দীপকবাবু খুব ভালো করেই চিনতেন, এবং এখন বলছেন আগে জানলে উনি তাঁকে আমার কথা বলে দিতেন।

নিশ্চয়ই বলে দিতেন, কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু বলতে হবে কেন? সুপারিশ করতে হবে কেন?

এই হলো আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, এবং ছাত্রছাত্রীদের মূল্যায়ন করার ব্যবস্থা। এখন কেমন হয়েছে জানি না। কিন্তু, খবরের কাগজে নানারকম দুঃস্বপ্নের খবর পড়ে মনে হয়, খুব একটা কিছু বদলায় নি। ওপর ওপর কিছুটা ঘষামাজা হয়েছে, এই যা। ভেতরে সেই ছাতাপড়া পুরনো আধলাই রয়ে গেছে। হাতে গোনা কয়েকটা ব্যতিক্রমী জায়গা ছাড়া।

অনেকদিন পরে যখন আমি পশ্চিম বাংলার একটা প্রত্যন্ত গ্রামের কলেজে পড়াতাম, আর গরমের ছুটিতে কলকাতায় বায়োলজির একজামিনার হিসেবে কাজ করতাম, এমন-কি স্ক্রুটিনি করতাম অন্য একজামিনারদের কাজ, তখন আমি নিজের চোখে দেখেছি কী অপরিসীম উদাসীনতা আর অবহেলায় ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার খাতা দেখা হয়। বেশির ভাগ একজামিনার খাতা দেখেন কতগুলো খাতা দেখলে কত টাকা রোজগার হবে, সেই কথা ভেবে। কত তাড়াতাড়ি এক একটা খাতা দেখলে দিনের শেষে কতগুলো খাতা দেখা হবে, সেই কথা ভেবে। এই এক একটা খাতা-যে এক একটা ছেলে বা মেয়ের ভবিষ্যৎ, সে কথা কেউ মনে রাখেন না।

'প্রতিদ্বন্দ্বী'

আমার সব চেয়ে ভালো লাগার একটা ছবি ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ এবং আমার সব চেয়ে প্রিয় একজন অভিনেতা ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়। – লেখক

সত্যজিৎ রায় তাঁর জন-অরণ্য সিনেমায় এর কথা একটু বলেছেন, কিন্তু কিছুই প্রায় বলা হয় নি। এ এক নিদারুণ মানবাধিকার লঙ্ঘনের জগৎ। প্রতিদ্বন্দ্বী ছবিতে আমার প্রিয় নায়ক ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন, আমাদের সিস্টেম একটা ব্রাইট যুবক ছেলেকে কীভাবে হতাশাগ্রস্ত করে তুলতে পারে। আমরা সেই সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। আমরা আরো কত কী জানি, যা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা সত্যজিৎ জানেনই না।

অন্যান্য উদাসীনতার ভূরি ভূরি উদাহরণ তো আছেই। মুক্তি প্রেসিডেন্সি কলেজের ভালো ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও বি এস সিতে ওর পাস কোর্সের সাবসিডিয়ারি সাবজেক্ট জুলজিতে শূন্য বসিয়ে দিল। মার্ক শিট হাতে পাবার পরে দেখে অ্যাবসেন্ট বসানো আছে। তার মানে, ও এখন আর এম এস সিতে ভর্তি হতে পারবে না। আবার পরীক্ষা দিতে হবে। সেই নিয়ে কী দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ! শেষকালে, চেনাশোনা এক হেড একজামিনারকে খুঁজে বের করে খাতা আনিয়ে দেখা গেল, দিব্বি ভালো রেজাল্ট করেছে। মুক্তি যদি কলকাতার এবং প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্রী না হত, আর জানাশোনা না থাকত, ওকে হতাশায় ডুবে যেতে হত। নেহাৎই ভাগ্য ভালো, আর ও-ও হাল ছাড়বার পাত্রী ছিল না।

এভাবেই আমরা বড় হয়েছি। এভাবেই আমাদের দেশ, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, আমাদের শাসকরা সারা জীবন আমাদের ঠকিয়েছে। পরিশ্রমের দাম, বুদ্ধির দাম, যোগ্যতার দাম, প্রতিভার দাম দেয় নি।

এম এস সি পাশ করার পর মাথায় চেপে বসলো আর এক নতুন আশঙ্কা আর উদ্বেগ। বাবার চাকরি আর খুব বেশি হলে দু বছর। বাবার কোনো পেনশন নেই, আর প্রভিডেন্ট ফান্ড যা আছে, তার বেশির ভাগই বোধহয় চলে গেছে মায়ের ক্যানসারের চিকিৎসায়। আর যে ব্যাঙের আধুলি পড়ে আছে সামান্য কয়েক হাজার টাকা, তা বাবা বাঁচিয়ে রেখে দেওয়ার চেষ্টা করছে বুবুর বিয়ে-টিয়ের কথা ভেবে। মোটামুটি নিঃস্ব বলা যেতে পারে। এই তো আমাদের অবস্থা। আমাদের কোনো সম্পত্তি নেই, গয়না নেই, কিচ্ছু নেই। আমাকে যত তাড়াতাড়ি হোক, একটা কিছু ব্যবস্থা করতেই হবে। এখন আমাকে কে চাকরি দেবে? কেউ দেবে না।

বাবা এখন আমাকে আর ব্যাঙ্কের চাকরি করার জন্যে তাগাদা দেয় না। বাবা বুঝে গেছে, ব্যাঙ্কের চাকরি আমি করব না। আমি অনেক কষ্ট করে এম এস সি পাশ করেছি, এবং আমি এই জগতেই থাকতে চাই। বাবা এখন একা একা থাকে, সেই সকালবেলা আগের মতই ঊষা কারখানায় চলে যায়, আর সন্ধেবেলা ফিরে আসে। এসেই বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ক্লান্ত হয়ে। আমাদের বাড়ি এখন একটা নতুন বাচ্চা ছেলে কাজ করতে ঢুকেছে, তার নাম কানাই। ছেলেটার বয়েস হবে বছর চোদ্দ কি পনের। কানাই আমাদের বাড়িই থাকে, আর রান্না করে। বাড়ির আরো দু একটা কাজ করে দেয়। আমাকে ও খুব পছন্দ করে।

মুক্তি এখন আমাদের বাড়ি আসে মাঝে মাঝেই, আর বাবা, বোন এরা সবাই আমাদের সম্পর্কের কথা জানে, আর মেনেও নিয়েছে। বাবা জানে ছেলে একটা রাস্তা খুঁজে পেয়েছে। মনের একটা আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। বুবুও এখন অনেক পরিণত হয়ে গেছে দ্রুত। ওর মধ্যেও একটা পরিবর্তন এসেছে।

***

আমিও মুক্তিদের বাড়ি যাই বৌবাজারে। মুক্তির মা রেণুকা অত্যন্ত ভালো মানুষ। বাবা খগেন্দ্রকুমার উদার মনের, হৃদয়বান মানুষ। স্নেহপরায়ণ। ওদের বাড়ি সব ঢাকার বাঙাল। সাতচল্লিশের পার্টিশন হবার সময়ে ভয়ঙ্কর হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় মুক্তির দাদুকে ওদের বিক্রমপুরের বাড়িতে খুন করে রেখে গিয়েছিল গুণ্ডারা। উনি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারেন নি শেষ পর্যন্ত পার্টিশন হবে, এবং পিতা-পিতামহের ভিটেমাটি ছেড়ে তাঁদের অন্য কোথাও চলে যেতে হবে চিরকালের জন্যে। উনি বাড়ি ছেড়ে নড়তে রাজি হন নি। বাড়ির মধ্যেই ওঁকে কুপিয়ে মেরেছিল। সেই অবস্থায় মুক্তির মা ও তাঁর পরিবার বিরাট বাড়ি ছেড়ে দিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনে আশ্রয় নিয়েছিলেন, এবং পরে বিধানচন্দ্র রায়ের আনুকূল্যে ছোট একটা এক্সচেঞ্জ বাড়ি পেয়েছিলেন হাওড়ার এঁদো গলি জয়নারায়ণ সাঁতরা লেনে।

মুক্তির মা রেণুকা ভট্টাচার্য। এমন দয়াবতী ও স্নেহ-মমতাময়ী মানুষ আমি জীবনে বেশি দেখি নি। - লেখক

মুক্তির মা রেণুকা ভট্টাচার্য। এমন দয়াবতী ও স্নেহ-মমতাময়ী মানুষ আমি জীবনে বেশি দেখি নি। – লেখক

অনেকগুলি ভাই বোন, বিধবা মা এঁরা সবাই মিলে বেশ কিছুকাল অনশন অর্ধাশনে কাটানোর পর দৈবক্রমে রেণুকা ভারতীয় পোস্ট অফিসে চাকরি পেলেন। সেই থেকে অনেক কাল পর্যন্ত তাঁর একার সামান্য রোজগারে এত বড় সংসারটা চলত।

তিনিই ছিলেন ওদের বাড়ির যাকে বলে হেড অফ দা ফ্যামিলি। বলতেন, “আমি তো ছিলাম গিয়া একটা ব্যাটাছেলে। আমার যে আবার কহনো বিয়া অইব, সংসার অইব, তা আমি বাবি নাই।”

অবশ্য, এসব কথা আমি নিজে শুনি নি। মুক্তির কাছে শুনেছি। তাছাড়া, উনি আমার সামনে এরকম বাঙাল ভাষায় কথা বলতেন না। খুব চেষ্টা করতেন আমাদের মত কলকাতার ঘটি ভাষায় কথা বলতে। মাঝে মাঝেই দুটো একসঙ্গে মিশে যেত, আর আমরা হাসতাম।

যেমন, আমরা সামনে বসে আছি সন্ধেবেলা। হয়ত উনি বলতে শুরু করলেন, “আজকে বিকেলে অফিস থেকে ওদের [এক সহকর্মীর] বাড়ি গেছিলাম।”

মুক্তি জিজ্ঞেস করলো, “ওখানে কী করলে এতক্ষণ?”

উনি বললেন, “কী আর? খাওয়াইল। খাইলাম, দাইলাম, তারপর [হঠাৎ আমার উপস্থিতির কথা মনে পড়াতে] বাড়ি ফিরে এলাম।”

বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের সেই রিইউনিয়নে খগেন্দ্রকুমারকে দেখা যাচ্ছে, পিছনে বাঁদিকের চেয়ারে বসে আমাদের বান্ধবী সুপ্রীতির সঙ্গে কথা বলতে। মুক্তির বন্ধু ও বান্ধবীরা তাঁর সন্তানের মত ছিল। সবার প্রতিই সেই একই রকম স্নেহশীল।  - লেখক

বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের সেই রিইউনিয়নে খগেন্দ্রকুমারকে দেখা যাচ্ছে, পিছনে বাঁদিকের চেয়ারে বসে আমাদের বান্ধবী সুপ্রীতির সঙ্গে কথা বলতে। মুক্তির বন্ধু ও বান্ধবীরা তাঁর সন্তানের মত ছিল। সবার প্রতিই সেই একই রকম স্নেহশীল। – লেখক

খগেন্দ্রকুমার এবং তাঁর ভাইবোনেরা ওঁদের মত এতটা যন্ত্রণা বোধহয় পান নি। তাও বহুকাল অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল। এক ভাই ও তাঁর সংসারকে পূর্ব পাকিস্তানে ফেলে এসে বাকিদের ওই বৌবাজারের তিনতলার এক অংশে দুটো ঘরের ফ্ল্যাটে অনেকে মিলে ভাগাভাগি করে থাকতে হয়েছিল। তিন বোনের বিয়ে হয়ে যাবার পরে বাকি চার পাঁচ ভাই, বড় ভাইয়ের সংসার, এছাড়া আরো বেশি দারিদ্র্যপীড়িত কিছু আত্মীয়স্বজন সবাই মিলে সেই ছোট্ট দুটো শোবার ঘর আর একচিলতে বসার ঘরকে প্রতি রাতে শোবার ঘরে রূপান্তরিত করে অনেক বছর কাটিয়েছেন। একটা চৌকির ওপরে, আবার মাটিতে বিছানা করে রাতে শোওয়া। সব মিলে বোধহয় পনের জন একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে আছে। সকালবেলা উঠে যে যার কাজে চলে যাচ্ছে। আবার রাতে ফিরে আসছে। কিন্তু কখনো কারুকে তাই নিয়ে অভিযোগ অনুযোগ করতে দেখি নি। এঁদের পরিবারে “যদি হই সুজন, তেঁতুল পাতায় নজন” এই আপ্তবাক্যের যে নিদর্শন দেখেছি, তা কখনো ভুলতে পারব না।

একজন উড়িয়া বামুন সনাতনদা ভেতরের বারান্দায় বসে রাজ্যের রুটি বেলছে সন্ধেবেলায় কাজ থেকে ফিরে, আর গজ গজ করছে। আবার সেই সনাতনদার দিনের বেলা কাজের জায়গা একটা কাপড়ের দোকানে গিয়ে এঁরা বলে আসছেন, অসুস্থতার জন্যে সে কাজে যেতে না পারলে।

এঁরা সকলেই ছিলেন বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী। মুক্তির নকাকু সমরেন্দ্র ছিলেন সিপিএম পার্টির হোল টাইমার। মাঝে মাঝে ভাবলে হাসি পেত। আমার বাড়িতে বাবা হার্ডকোর দক্ষিণপন্থী, আর এদের বাড়ি বাবা-কাকারা সব একেবারে হার্ডকোর বামপন্থী। কিছুদিনের মধ্যেই সবাই ঠিক করে নিলেন, নিজেদের মধ্যে আর যাই হোক, রাজনীতি নিয়ে কথাবার্তা, আলোচনা কখনো করবেন না।

সমরেন্দ্র চলে গিয়েছিলেন হাওড়ার শিল্প এলাকা বেলগাছিয়াতে একটা কারখানার কাছে বাড়িভাড়া নিয়ে। আমি যখন তাঁকে প্রথম দেখি, তখন তিনি আরও দুই ভাই ও তাঁদের সংসারকে নিয়ে ওখানে উঠে গেছেন। কারখানার চিমনি থেকে কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছে গল গল করে ছাদের পাশেই। বাড়ির পিছনের আম গাছটার পাতা সেই ধোঁয়ার ধূসর ছাইতে ঢাকা বিবর্ণ। তার মধ্যেই প্রতি দু বছর অন্তর সে গাছে আমও আসে, আর পাড়ার ছেলেরা দাপাদাপি করে সে আম কাঁচা থাকতেই সাফ করে দিয়ে যায়। বাড়ির পাশের গলির এক ধারে কাঁচা ড্রেন, সেই বালির রাস্তার মতই অনেকটা। নয়তো জয়নারায়ণ সাঁতরার গলির মত। মশারাও ওই ভয়ঙ্কর দূষণে ভয় পেয়ে অন্য কোথায় চলে গেছে। সরু রাস্তার ওপর দিয়ে সাইকেল রিকশা যায় প্রায় পুরো রাস্তাটা জুড়ে। ওপরে মিউনিসিপ্যালিটির ইলেকট্রিকের তার বিপজ্জনকভাবে ঝুলে আছে একটা লাইট পোস্ট থেকে আর একটা পর্যন্ত। গলি থেকে বেরিয়ে গেলেই সামনে পশ্চিমবঙ্গের মফস্বল শহরের রাস্তা। মনসাতলা রোড। সেখান দিয়ে প্রাইভেট বাস আর লরি যায় পাইপ দিয়ে কালো ধোঁয়া ছড়াতে ছড়াতে। তীব্র হর্নের কান ফাটানো শব্দ, আর তার সঙ্গে রিকশার প্যাঁক প্যাঁক প্যাঁক যুগলবন্দি।

সমরেন্দ্র ছিলেন মুক্তির নকাকু। ব্যাচেলর। কিন্তু, ওদের ওই বাড়ির সর্বময় কর্তা, আর খুব দাপট। এমনিতে স্নেহপ্রবণ, আর গা-ছমছম-করা ভুল ইংরিজিতে কথা বলার খুব ঝোঁক, কিন্তু আবার একটুতেই রেগে অগ্নিশর্মা, আর ছোটদের মারধোর। যা আমি কখনো মুক্তির বাবাকে করতে দেখি নি। এক দাদা, মুক্তির রসকাকু সুখেন্দ্র, যিনি পূর্ব পাকিস্তানে থেকে গিয়েছিলেন, তিনিও এখন সেখানকার সরকারী চাকরি ছেড়ে এদের আশ্রয়ে এসে উঠেছেন বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে। কপর্দকশূন্য। আর হতাশাগ্রস্ত। ফেলে আসা জীবন, শান্তির সংসার আর ভিটেমাটির কথা ভুলতে পারেন নি। বিমর্ষ হয়ে থাকেন। আর এই বয়েসে কোথাও আর কাজকর্ম পাওয়াও সম্ভব নয়। পার্টিশনের মার খাওয়া মানুষ যে কাকে বলে, এই অত্যন্ত শান্ত, নিরীহ, স্নেহশীল মানুষটাকে দেখে আমি বুঝেছি। তাঁর অবসর ছিল প্রচুর। তিনি রান্না করতেন। রান্নার শিল্পী ছিলেন। আর এক রন্ধনশিল্পী ছিলেন মুক্তির বড়পিসিমা রাধু, যিনি তাঁর সংসার নিয়ে বর্ধমান শহরেরই এক প্রান্তে ছোটনীলপুর নাম একটা রাস্তায় থাকতেন। এখনো থাকেন।

অন্য ভাই, মুক্তির ফুলকাকু রমেন্দ্র। পাকিস্তানের সঙ্গে জমি বিনিময়ের ফলশ্রুতি বর্ধমানের রাজুর নামে এক পাণ্ডববর্জিত গ্রামে ধানের সামান্য দু এক বিঘায় অনেকদিন চাষবাস করার পর সব বেচে দিয়ে এই বেলগাছিয়ায় এসে উঠেছেন বউ ও দুটো বাচ্চা ছেলেমেয়ের হাত ধরে। মুক্তির ঠাকুমাও কিছুদিন ছিলেন তাঁর কাছে। এখন তিনিও গত হয়েছেন।

মুক্তির আর এক পিসিমা, মেজপিসীমা মাধুর বিয়ে হয়েছিল উচ্চবিত্ত ঘরে। তিনিও অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন, এবং কলকাতায় যখনই গেছি আমেরিকা থেকে, আমাকে ডেকে পাঠাতেন কথা বলার জন্যে। বা, টেলিফোনে কথা বলতেন অনেক। এঁদের পরিবারের সবাই খুব খোলা মনের। কোনো সংকীর্ণতা কারুর মধ্যেই প্রায় দেখিনি, দু একজন ছাড়া।

আমরা যারা কলকাতায় বড় হয়েছি, দেশভাগের প্রত্যক্ষ শিকার হই নি, আমাদের পক্ষে এদের সংসারের টানাপোড়েন আর নিরন্তর বেঁচে থাকার সংগ্রাম কল্পনা করাই সম্ভব নয়। কোথায় কোন আত্মীয় খেতে পাচ্ছে না, মুক্তির মা ছুটে গেলেন রান্না করে নিয়ে গিয়ে। আর, চলে আসার সময়ে কিছু টাকাও জোর করে হাতে গুঁজে দিয়ে এলেন। কোথায় কোন পিসতুতো বোনকে বাড়িতে খাটিয়ে মারছে, মুক্তির বাবা ব্যবস্থা করে তার বিয়ে দিয়ে দিলেন ভালো একটা ছেলে দেখে। এই দুটো মানুষকে আমি কাছ থেকে দেখে এত প্রেরণা পেয়েছি। আমাদের পরিবারে এরকম ভালবাসা, একে অপরের জন্যে বুক দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া আমি কোনোদিনও দেখি নি।

পার্টিশন। দেশভাগ। রিফিউজি। উদ্বাস্তু। এসব শব্দগুলো কিছুদিন পরেই ডিকশনারি থেকে মুছে ফেলা হবে। এই মানুষগুলোর কথা আর কেউ মনেও রাখবে না।  - লেখক

পার্টিশন। দেশভাগ। রিফিউজি। উদ্বাস্তু। এসব শব্দগুলো কিছুদিন পরেই ডিকশনারি থেকে মুছে ফেলা হবে। এই মানুষগুলোর কথা আর কেউ মনেও রাখবে না। – লেখক

মুক্তির খুব প্রিয় ছিল ওর ছোটকাকু দেবদাস। ছোটকাকু ও কাকিমা থাকতেন টালিগঞ্জে একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে। দুজনের বয়েসই মুক্তির বাবা ও অন্য কাকুদের তুলনায় অনেক কম, আর দুজনেই স্থায়ী চাকরি করেন। খগেন্দ্র ও রেণুকাকে বাদ দিলে ওদের সংসারে এঁরাই মোটামুটি ভালো দাঁড়িয়ে গেছিলেন। মুক্তির সঙ্গে আমার বিশেষ বন্ধুত্বের কথা এঁরা দুজন জানতেন, আর আমরা ওঁদের বাড়ি যেতাম মাঝে মাঝে। কাকিমা অসাধারণ রান্না করতেন। আর, ছোটকাকু, গল্প। অত্যন্ত স্নেহশীল আর বন্ধুর মত ছিলেন। এখন ওঁদের অনেক বয়েস হয়েছে। থাকেন বাঁশদ্রোণী এলাকায় একটা বাড়ি কিনে। ছোটকাকু পার্কিনসন্স স্নায়ুরোগে আক্রান্ত।

বৌবাজার স্ট্রীটে এরকমই কোনো এক জায়গায় ছিল মুক্তিদের বাড়ি। তিনতলায় একটা ফ্ল্যাট। দুটো শোবার ঘর। একচিলতে বসার ঘর, যা রাতে হয়ে যেত আর একটা শোবার ঘর। কত লোক যে সেখানে থাকত। প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাথরুম শেয়ার। পূর্ব বাংলা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এসে এখানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন খগেন্দ্রকুমার ও তাঁর পরিবার পরিজন। দূরে ডালহৌসির অফিসপাড়া দেখা যাচ্ছে। - লেখক

বৌবাজার স্ট্রিটে এরকমই কোনো এক জায়গায় ছিল মুক্তিদের বাড়ি। তিনতলায় একটা ফ্ল্যাট। দুটো শোবার ঘর। একচিলতে বসার ঘর, যা রাতে হয়ে যেত আর একটা শোবার ঘর। কত লোক যে সেখানে থাকত। প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাথরুম শেয়ার। পূর্ব বাংলা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এসে এখানেই আশ্রয় নিয়েছিলেন খগেন্দ্রকুমার ও তাঁর পরিবার পরিজন। দূরে ডালহৌসির অফিসপাড়া দেখা যাচ্ছে। – লেখক

এদের পরিবারের গল্প বলতেই হবে এই স্মৃতিকথায়। একদিকে বিক্রমপুরের বর্ধিষ্ণু ঘর থেকে আসা একটা রিফিউজি ফ্যামিলি, আর অন্যদিকে ঢাকার কাছে বারদী এলাকা থেকে সেই উদ্বাস্তু হয়ে আসা আর একটা বড় পরিবার, এদের কাছে আমি বাংলাদেশের জীবনবোধ, মূল্যবোধ শিখেছি। আমার মামার বাড়ির কাছেও শিখেছি, আদর ভালবাসা কাকে বলে জেনেছি, নিজে না খেয়ে অন্যকে কী করে খাওয়াতে পারা যায়, তা দেখেছি। আর এদের এই দুটো পরিবারের কাছে যৌথ পরিবার কাকে বলে, স্বার্থত্যাগ কাকে বলে, আর উদারনৈতিক জীবনদর্শন কাকে বলে, তা জেনেছি। ওদিকে ওদের বৌবাজারের বাড়ির লোকগুলো, আর এদিকে হাওড়ার জয়নারায়ণ সাঁতরা লেনের মানুষগুলো। এদের সকলের সংস্পর্শে এসে আমি বাঙালিত্ব অনেক বেশি করে অনুভব করেছি, উপলব্ধি করেছি। বাংলার মাটির রস টেনে নিয়েছি এদের দূর থেকে লক্ষ্য করে।

***

এদিকে আমার জীবনটা অন্যরকম হয়ে যাচ্ছিল। এম এস সি পড়া শেষ করার পর আমাকে আর মুক্তিকে দুজনকেই আমাদের খুব কাছের মানুষ প্রফেসার নির্মলেন্দু সমাজপতি পি এইচ ডি প্রোগ্রামে কাজ করার সুযোগ দিলেন। মুক্তি কাজ করবে ওঁর ল্যাব থেকে সরাসরি। আর আমি কাজ করব যৌথভাবে জিওগ্রাফি ডিপার্টমেন্টের এক সিনিয়র অধ্যাপক বীরেশ্বর ব্যানার্জী ও ডক্টর সমাজপতির কাছে একটা প্রজেক্টে। মাসে মাসে চারশ টাকা করে পাওয়া যাবে। তখনকার দিনে সে বেশ ভালই টাকা। বাবা তো শুনে খুব খুশি। যাক, এতদিনে ছেলে রোজগার করতে আরম্ভ করেছে।

আমার কাজ ছিল জিওগ্রাফি বিভাগের হয়ে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে একটা ফ্লোরিসটিক স্টাডি করা—অর্থাৎ বিভিন্ন ভৌগোলিক এলাকায় কী কী গাছপালা পাওয়া যায়, তার মধ্যে মেডিসিনাল প্ল্যান্টস কী কী পাওয়া যায়, তার গুণাগুণ এসব পর্যবেক্ষণ। আর সে কাজের জন্যেই টাকা। সঙ্গে, বাইরে যাওয়ার যাতায়াতের খরচ ও থাকার খরচ। আর, কলকাতায় থাকার সময়ে পি এইচ ডির কাজ—মূলতঃ এডিবল মাশরুম অর্থাৎ যেসব ব্যাঙের ছাতা সুস্বাদু ও পুষ্টিকর, সেসব মাশরুম কীভাবে সহজভাবে চাষ করে বাংলায় জনপ্রিয় করা যেতে পারে সাধারণ মানুষের জন্যে, তার ওপর পরীক্ষানিরীক্ষা।

আমার সঙ্গে পার্টনার হিসেবে কাজ করত আমার থেকে এক বছরের সিনিয়র বন্ধু দীপক চক্রবর্তী। খোলামনের ছেলে, হো হো করে উঁচু গলায় হাসে, ক্লাসিক্যাল গানের দারুণ ভক্ত, নিজেও ম্যানডোলিন বাজায়। নাটক করে, ক্রিকেট খেলে। আমরা পর পর বেশ কয়েক বছর সায়েন্স কলেজে একসঙ্গে নাটক করেছি, গান গেয়েছি, দীপক ম্যানডোলিন বাজিয়েছে, আর আমি ওর সঙ্গে তবলা বাজিয়েছি। আমরা আমাদের বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজের এক্সপেরিমেন্ট করার বাগানে মাশরুম চাষ করি। আর, বাকি সময়ে আমাদের অপরের ন’তলায় কমন রুমে ক্যারম, টেবিল টেনিস খেলি, আর তুমুল আড্ডা দিই। আড্ডা টাড্ডা শেষ হয়ে গেলে আমি আর মুক্তি বেরিয়ে যাই, কোথাও খাই, আর তারপর বাসে করে বাড়ি যাই। বেশির ভাগ দিন আমরা সেই বালিগঞ্জ ট্রেন স্টেশন পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে দু নম্বর দোতলা বাস ধরি, আর এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত একসঙ্গে যাই। ও ওখানে নেমে যায় হাওড়ার বাস ধরবার জন্যে, আর আমি সোজা চলে যাই আমাদের হেদুয়ার স্টপ পর্যন্ত। তারপর পাঁচ মিনিট হেঁটেই বাড়ি। মুক্তিরা এখন ওদের বৌবাজারের বাড়ি ছেড়ে দিয়ে হাওড়াতে চলে গেছে। ওখানে ওর মা আর মাসি মিলে একটা দোতলা ছোট বাড়ি করেছেন।

হাওড়া ব্রীজ, আর তার আশেপাশেই চরম অবহেলা, দারিদ্র্য আর বৈষম্যের প্রতিদিনের গল্প। পূর্ব বাংলা থেকে চলে আসার পর এখানেই জীবন শুরু হয়েছিল আমাদের কাহিনীর কিছু মানুষের। - লেখক

হাওড়া ব্রীজ, আর তার আশেপাশেই চরম অবহেলা, দারিদ্র্য আর বৈষম্যের প্রতিদিনের গল্প। পূর্ব বাংলা থেকে চলে আসার পর এখানেই জীবন শুরু হয়েছিল আমাদের কাহিনীর কিছু মানুষের। – লেখক

আমি আর দীপক চক্রবর্তী একবার এর মধ্যে একসঙ্গে একটা প্রজেক্টে দার্জিলিং ঘুরে এসেছি শীতকালে হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায়, আর সমাজপতির সূত্রে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য বিভাগের এক বড় অফিসার সান্যালের সঙ্গে দার্জিলিং, কার্সিয়ং এসব জায়গায় গ্রামে গ্রামে গিয়ে সেখানকার চাষীদের মাশরুম চাষ সম্পর্কে শিখিয়েছি। আমাদের সঙ্গে দোভাষী থাকে। আমরা বাংলায় বোঝাই, আর নেপালি ভাষায় ওখানকার দোভাষীরা অনুবাদ করে দেয়। খুব আনন্দ কিছু একটা ভালো কাজ করছি ভেবে।

জীবন একটা ছন্দে ফিরে এসেছে। মুক্তি আর আমি একটা পরিণতির দিকে দ্রুত এগিয়ে চলেছি। আমার শুধু একটা রেগুলার চাকরি পাওয়ার অপেক্ষা।

কলেজ সার্ভিস কমিশন বলে একটা নতুন সংগঠন তৈরি করেছে পশ্চিমবঙ্গ বামফ্রন্ট সরকার। আমরা দুজনেই সেখানে ইন্টারভিউ দিয়েছি প্রাইভেট কলেজে অধ্যাপনার চাকরি পাওয়ার জন্যে। দেখা যাক কী হয়। ইন্টারভিউ ভালো হয়েছে, এবং নির্বাচিতদের প্যানেলে আমাদের দুজনেরই নাম উঠেছে। কিন্তু নিচের দিকে, যেহেতু আমাদের দুজনেরই এম এস সির রেজাল্ট সেরকম ভালো নয়, আর আমাদের কোনো টিচিং এক্সপেরিয়েন্সও নেই।

***

জীবনে দুটো খুব বড় ঘটনা ঘটল।

এক, মার মৃত্যুর পর সেই-যে এক সপ্তাহের মধ্যে জেঠু চলে গেল, সেটা বোধহয় ছিল যমরাজার প্রথম চোখরাঙানি। যম বললেন, “প্রস্তুত থাক। আমি আবার আসছি। তোদের শান্তির দিন শেষ হয়েছে।”

তিনি এলেন আবার। মার বেলায় এসেছিলেন খুব দ্রুত, আর খুব চুপিসাড়ে। এবার এলেন ঢাকঢোল, ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে।

মা চলে যাবার ঠিক এক বছরের মাথায় বড়মামা স্ট্রোক হয়ে মারা গেল। বড়মামা বিশ্বনাথ, যে আর এস এসে গান গাইত। যার মাধ্যমে বাবার সঙ্গে মার প্রথম পরিচয় হয়েছিল। বড়মামার তখন কতই বা বয়েস? হয়ত সাতচল্লিশ কি আটচল্লিশ হবে। চারটে খুব ছোট ছোট ছেলেমেয়ে রেখে বড়মামা এক রাত্তিরের মধ্যে শেষ হয়ে গেল। নাকি, দুদিনের মধ্যে।

দিদি একদিন সকালে এসে বাবাকে ডাকতে লাগলো। “জিতেন, ও জিতেন, বিশ্বনাথের স্ট্রোক হয়েছে। বাবা, একবার এসো।”

খবর পেয়ে দৌড়ে দেখতে গেলাম মেডিকেল কলেজে। গিয়ে দেখি, এমার্জেন্সি ওয়ার্ডে বড়মামা অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছে, নাকে মুখে নানা রকম নল লাগানো। আর বড়মামার বুকটা ভীষণ হাপরের মত শব্দ করে, মুখটা হাঁ করে বাতাস নেওয়ার চেষ্টা করছে। মনে পড়ে গেল, কানুকে দেখতে গিয়েছিলাম সেই বাস্কেটবলের দেওয়াল চাপা পড়ে যাবার পর। কানু বেঁচে গিয়েছিল। বড়মামা কিন্তু বাঁচলো না।

মেজমামা মধুসূদন অনেক বেশি বয়েসে বিয়ে করেছিল। একটা ছেলেও হয়েছিল মাইমার। বড়মামা মারা যাওয়ার এক বছর পরে, বাচ্চাটা যখন ছ মাসের, মেজমাইমা একদিন সকালবেলা নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে মরে গেল। শুনলাম, দিদির বাড়ির পাশের সরু গলিটায় আগুন লাগা অবস্থায় পাগলের মত দৌড়দৌড়ি করেছে, আর চীৎকার করেছে পাগলের মত, আর তার ফলে কেউ কাছেও যেতে পারে নি, আর আগুন নেভাতেও পারে নি।

বড়মাইমা ও তাঁর চারটি পিতৃহীন সন্তান—বাপ্পা, দীপা, উমা ও অশোক। উমার ফেসবুক থেকে প্রাপ্ত ছবি।  - লেখক

বড়মাইমা তাঁর চারটি পিতৃহীন সন্তান—বাপ্পা, দীপা, উমা ও অশোক। উমার ফেসবুক থেকে প্রাপ্ত ছবি। – লেখক

মেজমাইমা সিজোফ্রেনিক ছিল। উন্মাদ রোগ ছিল। মাঝে মাঝে একটু একটু তা প্রকাশ পেত। ভয়ঙ্কর রেগে যেত। থালা বাটি গেলাস ছুঁড়তো। ভাঙত জিনিসপত্র।

আর একটা ঘটনা। আমি আর এস এস থেকে চিরকালের মত বেরিয়ে এলাম। আমি তখন পশ্চিমবঙ্গ বিদ্যার্থী পরিষদের রাজ্য সম্পাদক। সংঘের একটা রাজ্য কনফারেন্স চলছিল কলকাতায়। আমি সাইক্লোস্টাইল করে একটা লম্বা চিঠি বিলি করলাম সমস্ত প্রতিনিধিকে। একটা প্রশ্নমালা। আমি প্রশ্ন করলাম:

(১) আর এস এস এই যে জরুরি অবস্থার সময়ে হাজার সাধারণ কর্মীকে জেল ভরো নামক তথাকথিত সত্যাগ্রহ আন্দোলনে সামিল করলো, যাতে অনেকের নিজের ও পরিবারের বিরাট ক্ষতি হলো, এর রাজনৈতিক মূল্য কী?

(২) যারা ত্যাগস্বীকার করেছে, আন্ডারগ্রাউন্ড কাজ করেছে, পুলিশের মার খেয়েছে, এই স্বার্থত্যাগের মূল্য তারা কী পেল? কেন তাদের পুরস্কৃত না করে আর এস এস ও জনসংঘ অজানা, অচেনা লোকেদের ও এলিট ব্যক্তিদের নেতৃত্ব দেবার সুযোগ করে দিচ্ছে?

(৩) এ বি ভি পি অর্থাৎ বিদ্যার্থী পরিষদকে অরাজনৈতিক তকমা দিয়ে রাখা হচ্ছে কেন, যেখানে জনসংঘ এবং এখন জনতা পার্টি তাদের সব রাজনৈতিক কাজে ও ভোটের প্রচারে এ বি ভি পি’কে যত্রতত্র ব্যবহার করছে?

(৪) আমরা কেন মোরারজি দেশাইএর মত এক সামন্ততান্ত্রিক, অতি-রক্ষণশীল ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী পদে সমর্থন করেছি?

(৫) আমরা কেন শুধু হিন্দুদের কথা বলে যাচ্ছি এখনো?

এই সব। প্রশ্নগুলো আর এখন ভালো মনে নেই, কিন্তু আরো কিছু প্রশ্ন আমি রেখেছিলাম। বহু বছর ধরে আর এস এসের অতি-রক্ষণশীল মতাদর্শ খুব কাছ থেকে দেখে দেখে আমি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। বাংলাদেশের উদারনৈতিক সমাজ ও সভ্যতার সঙ্গে আর এস এস জনসংঘ বিদ্যার্থী পরিষদের দর্শন যে একেবারেই মেলে না, তা এখন আমি বুঝতে পেরেছি। এদের সঙ্গে আমি বহু বছর নষ্ট করেছি। আর নয়।

আমাদের সংঘের রাজ্যস্তরের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিত্ব অমল কুমার বসুর হাতে সে চিঠির কপি দিয়ে, তাঁকে পড়তে অনুরোধ করে, আমি সে কনফারেন্স থেকে বেরিয়ে এলাম।

জীবনের একটা বিরাট, বিশাল অধ্যায়ের সেখানেই পরিসমাপ্তি।

আর কখনো ফিরে যাই নি ওদের কাছে।

(কিস্তি ২৮)

About Author

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় তিরিশ বছর ধরে আমেরিকায় আছেন। কলকাতায় ছিলেন জীবনের অর্ধেক। এখন স্থায়ীভাবে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। মানবাধিকার, বিশেষত ইমিগ্র্যান্টদের অধিকার ও শ্রমিক ইউনিয়ন—এই দুই বিষয়ে পেশাদারিত্ব। ইলিনয় থেকে পি এইচ ডি করার পর বিজ্ঞান ছেড়ে সাংবাদিকতা ও হিউম্যানিটিস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। শৈশব থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আর এস এস ও বিজেপির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার পর রাজনৈতিক ও আদর্শগত কারণে বেরিয়ে আসেন। তাদের সম্পর্কে বই ও নানা রচনা লেখেন। রাজনীতি ছাড়া বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ। সাংস্কৃতিক সংকট ও বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক আগ্রাসন সম্পর্কে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Partha Banerjee) বিশ্লেষণ ইউটিউব ও ফেসবুকে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রসংগীতে ও বাংলা আধুনিক গানে বিশেষ উৎসাহ। ২০১২ সালে কলকাতা থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের সিডি "আরো একটু বসো" প্রকাশিত হয়। বাংলা ও ইংরাজিতে লেখেন। উইকিপিডিয়া লিংক: http://en.wikipedia.org/wiki/Partha_Banerjee