ঘটিকাহিনী (২৯)

(আগের পর্ব)

স্বপ্নলোকের চাবি

একাশির সেপ্টেম্বরে কলেজে পড়াতে শুরু করেছিলাম। বিরাশির ফেব্রুয়ারিতে বিয়ে করলাম। তিরাশির সেপ্টেম্বরে আমাদের সেই চিরকালের পুরনো পাড়া ছেড়ে বেহালায় একটা বড় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে সবাই মিলে উঠে চলে এলাম। নতুন ঠিকানা ২৫/১৩, ডায়মন্ড হারবার রোড। সবাই মানে আমি আর মুক্তি, আর বাবা আর আমার বোন বুবু।

এই দু বছরের মধ্যেই অনেক ঘটনা ঘটে গেছে। ছোট আর বড়।

বড়মামা বিশ্বনাথের হঠাৎ মৃত্যু। অর্থকষ্ট আর চরম স্ট্রেসে ভালোমানুষ বড়মামা শেষ হয়ে গেল। কোথায় ইনভেস্ট করে সব নাকি ডুবে গিয়েছিল। যা হয় আর কি, গরীবের ঘোড়ারোগ। কয়েকমাস পরে মেজমাইমা ভয়ঙ্কর সিজোফ্রেনিয়াতে আক্রান্ত হয়ে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে একদিন সকালবেলা মরে গেল। মা আর জেঠু চলে যাবার পরে এবার ওদের বাড়ির পালা।

parthab logo

ছোটমামা বুদ্ধ কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত দ্রুত উঠছে ইন্দিরা কংগ্রেস পার্টির মই ধরে। ওদের শ্রমিক সংগঠন আই এন টি ইউ সি করে। আজ দিল্লি যায়, কাল শিলিগুড়ি, পরশু বর্ধমান। কংগ্রেসের বিরাট নেতা বরকত গণি খান চৌধুরীর প্রিয়পাত্র হয়ে গেছে। কী সব করে বেড়াচ্ছে। কোথায় গিয়ে যেন একবার ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গেও দেখা করে এসেছে কোন এক ডেলিগেশনে।

আমার সঙ্গে একটু দূরত্ব হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মনে হয়, নিজে বিয়েটিয়ে করে সংসারী হতে পারল না, আর ভাগ্নের বিয়ে হয়ে গেল, এতে বোধহয় ওর আত্মসম্মানে একটু লেগেছে। একটা পার্সোন্যালিটি ক্ল্যাশ জন্ম নিয়েছে। ওর বন্ধুরাও অনেকে বিয়েটিয়ে করে ফেলেছে। তাদের কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই। তারা এতেই খুশি। সবার সঙ্গে ও একটা দূরত্ব সৃষ্টি করে ফেলেছে। ওকে পরামর্শ দেবার, সুবুদ্ধি দেবার কেউ নেই। কংগ্রেস পার্টির মধ্যেই নানা রকম গোষ্ঠী। তারা একদল আর একদলকে শেষ করে দিতে চায়।

কুবুদ্ধি দেবার অনেক লোক ওর চারপাশে জড়ো হয়েছে। ওরা ওর নেতৃত্ব আর মানবিকতার সুযোগ নিতে চায়।

সায়েন্স কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে

সায়েন্স কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে শান্তিনিকেতনে বসন্তোৎসবে বেড়াতে গিয়েছিলাম। বোধহয় ১৯৭৯ বা ১৯৮০। এদের কয়েকজনের কথা লিখেছি আগে। খোলা লাল জামা গায়ে মলয়, যে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করে দেশে ফিরে গেছে। – লেখক

আমি কলকাতায় থাকি না, ফলে ওর কোনো খোঁজখবরও আমি তেমন রাখি না। কালেভদ্রে দেখা হয়। আমার জীবনও অনেক বদলে গেছে। আমি এখন বেশির ভাগ সময়ে গ্রামে থাকি। সেখানে আমি একটা অন্য মানুষ। কলকাতায় যখন আসি, তখন যেন আমি আর কলকাতার সেই শহুরে, অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানো পার্থ না। আমি যেন আমার শহরে একজন অতিথি।

গড়ের মাঠে মনুমেন্ট দেখে হাঁ করে তাকিয়ে থাকি গ্রামের মানুষদের মতন। বা, সেই একবার আমার কলেজের স্টুডেন্টদের নিয়ে কলকাতা হয়ে মুর্শিদাবাদ গিয়েছিলাম এক্সকারশনে। তাদের মত। ওরা বলেছিল, “স্যার, আপনি নিয়ে এলেন বলে জীবনে এই প্রথমবার কলকাতা শহর দেখলাম।”

মনে পড়ে গেল, মুক্তির ফুলকাকিমা বর্ধমানের অজ পাড়াগাঁ রাজুর থেকে কলকাতায় প্রথমবার এসে ট্যাক্সিতে চটি খুলে ঢুকেছিলেন। এরাও অনেকটা সেইরকমই।

আর, ছোটখাটো ঘটনা। পাঠানখালি কলেজে জয়েন করার এক বছরের মধ্যেই বর্ষাকালে এলো সুন্দরবনের কুখ্যাত সাইক্লোন, আর তার সঙ্গে বন্যা। একদিন রাতে ঘুমোচ্ছি আমাদের টিচার্স মেসে আমার সেই সরু কাঠের বিছানায়। অনেক রাত্তিরে দরজায় ধাক্কা। “ধুম ধুম ধুম।” জোরে জোরে কড়া নাড়ার শব্দ। ধড়মড় করে সব উঠে পড়লাম। ভেতরের দিকের ঘরে শূলপাণি, আমি আর অঙ্কের চিত্তেশ্বর দাস। যে খোলা ব্লেড হাতে ধরে দাড়ি কামায়। আর বাইরের ঘরে শ্যামলদা, দর্শনের সুরেশ হালদার, নিখিলবাবু, সুভাষদা—সবাই। অ্যানথ্রপলোজির জহর দত্ত দরজার ঠিক সামনের খাটে।

হারিকেনের সলতেটা মিট মিট করে জ্বলছিল, সেটা উসকে দেওয়া হলো। মশারি থেকে বেরিয়ে আসা হলো। টর্চ জ্বলে উঠলো দুটো চারটে।

“কী, কী হয়েছে? কে, কে?”

ghoti 29 b

বসন্তোৎসব অনুষ্ঠানের ছবি। আম্রকুঞ্জে সমবেত সঙ্গীত ও নৃত্য—”ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল লাগলো যে দোল।” মহাকবির দখিন হাতের উদার আশীর্বাদ ছড়িয়ে আছে চতুর্দিকে। – লেখক

ডাকাত পড়ল নাকি? এমনিতেই শুনেছি, ওখানে স্থানীয় কিছু লোক আমাদের মত কলকাতা থেকে আসা প্রফেসারদের ওপর খাপ্পা। তাদের কথা হলো, বাইরে থেকে এসে প্রফেসাররা আমাদের গ্রামের কলেজে কেন পড়াবে, এবং এত টাকা নিয়ে চলে যাবে? যেখানে আমাদের কাজকর্ম নেই। যেখানে এত দারিদ্র্য। আমাদের এখানে কি পড়াবার লোক নেই? ইস্কুলে তো পড়াচ্ছে। কলেজে পড়াতে পারবে না? খুব পারবে। একটু শিখিয়ে পড়িয়ে নিলেই হয়!

প্রিন্সিপাল পাণ্ডা তাদের কখনো বোঝান নি যে ইস্কুলে পড়াতে গেলে বিএ এবং তার সঙ্গে বি-এড ডিগ্রী থাকলেই হয়, কিন্তু কলেজে যেহেতু বিএ, বি এস সি, বি কম পড়ানো হয়, সেই অধ্যাপকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা একটু বেশি লাগে। তাছাড়া, কলেজ সার্ভিস কমিশন এসব নিয়মকানুন তো আছেই। প্রিন্সিপাল কেমন যেন একটা অনিশ্চয়তার আবহাওয়া জেনেশুনেই তৈরি করে রেখেছেন, আর গ্রামের সব লোককে চাকরি-টাকরি দেওয়া হবে একসময়ে, এই ধরনের আশ্বাসও দিয়ে রেখেছেন। দু চারজনকে দিয়েওছেন কলেজে চাকরি। বাছা বাছা লোককে। ফলে, তাঁর এক বশংবদ চাটুকার কাম দেহরক্ষীর দল আছে, এবং তারা আমাদের ওপর, মানে যারা প্রিন্সিপালের জারিজুরি নিয়ে সরব, তাদের ওপর কালাচ সাপের মত নিঃশ্বাস ফেলে। শোনা যায়, এই সব লোকেদের দু চারজন নাকি ডাকাতিও করে এসেছে এক সময়ে। দু চারটে লাশ নামিয়ে দেওয়া এদের কাছে নাকি কিছুই নয়।

তারপর, কাস্ট পলিটিক্সও আছে খুব বেশি। মোট কথা, আমার মত লোক ওখানে খুবই ভালনারেবল।

অবশ্য, এ সব কিছুই আমাদের স্বকপোলকল্পিত ধোঁয়াশা, ফ্যান্টাসি- ধুম্রজালও হতে পারে। গুজবও হতে পারে। কিন্তু গ্রামের কিছু লোক সর্বদাই ক্লাস পড়ানোর সময়ে উঁকিঝুঁকি দেয় দরজার কাছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শোনে আমি কেমন পড়াচ্ছি। যেন, প্যারেনকাইমার সাথে কোলেনকাইমার পার্থক্য তাদের ভালই জানা আছে। অথবা, ফটোসিন্থেসিস ও রেস্পিরেশনের ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম ও তার এ টি পির সংখ্যাগণনা তাদের কাছে জলভাত।

অবশ্য, সবাই যে এমন মনোভাব নিয়ে আসে তা নয়, সাধারণ গ্রামবাসীও কিছু আসে দেখতে তাদের গ্রামের কলেজে তাদের গ্রামের ছেলেমেয়েরা কেমন পড়ছে। যে শিক্ষা তারা নিজেরা কোনোদিন লাভ করার সুযোগ পায় নি। এদের আমি কখনো চলে যেতে বলি না। দেখছে, দেখুক না, কী হয়েছে?

কিন্তু একটা গ্রুপ আছে। আমি জানি, তারা আছে। তাদের চোখের ভাষা অন্য।

এদের একটা দল নাকি আমাদের ওপর আক্রমণ করতে পারে যে কোনো সময়েই। কেবল, স্থানীয় প্রভাবশালী কিছু রাজনৈতিক লোকজন আমাদের সঙ্গে আছে বলে কিছু করতে পারছে না। রফিকুল ইসলাম একজন প্রভাবশালী লোক। তারপর, অরবিন্দ পাণ্ডা প্রিন্সিপাল। যদিও কলকাতার লোক। দুর্জনে বলে, বামফ্রন্ট সরকার কলেজের বাড়ি, হোস্টেল এবং হাজার ছাত্রছাত্রীর থাকা-খাওয়ার জন্যে যে বিরাট অঙ্কের টাকা প্রতিমাসে দিচ্ছে, তার দশ পনের পার্সেন্ট তিনি ও তাঁর গ্রামতুতো সাঙ্গপাঙ্গরা হজম করে থাকেন। এই কথা দুর্জনে সব সময়েই বলাবলি করে। ঠিক বলে, না গুজব রটায়, আমি জানি না। আমি আদার ব্যাপারী। কিন্তু বয়েস কম, রক্ত গরম, আর আপোস জিনিষটা ছেলেবেলা থেকেই রক্তে নেই। উত্তেজিত হয়ে পড়ি এসব কথা শুনে। এই প্রিন্সিপাল আবার বামফ্রন্টের সিপিআই পার্টির সঙ্গে যুক্ত, এবং বহুকাল ওই এলাকায় থাকার জন্যে তাঁর হাতে শুধু গ্রামের মাফিয়া নয়, লঞ্চ ও রিকশা এসোসিয়েশনও আছে। প্রিন্সিপাল এক মহা ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। তিনি বামফ্রন্টের বড় বড় কিছু নেতাকে লঞ্চে করে মাঝে মাঝেই সুন্দরবন বেড়াতে নিয়ে যান, যার প্রতিদানে এই কলেজ আরো বেশি করে আর্থিক অনুদান সরকারের কাছ থেকে পেয়ে থাকে। এই মৌচাক এই মধুভাণ্ডের সঙ্গে সর্বদা লেগে আছে। যা ঝরে ঝরে পড়ছে, তা সঙ্গে সঙ্গে চেটেপুটে খাচ্ছে তারা।

তাদের সুনজরে থাকলে আমাদের গায়ে কেউ হাত দিতে পারবে না। কিন্তু মুশকিল হলো, আমরা তো তাদের সুনজরে নেই!

এভাবে কতদিন থাকব? বাড়ি ফিরে গিয়ে মুক্তির সঙ্গে আলোচনা করি। মুক্তির বাবা বামফ্রন্টের সমর্থক, এবং শিক্ষাবিভাগে কাজ করে অবসর নিয়েছেন। তিনি যোগাযোগ করে দিলেন সিপিএমের শিক্ষাজগতের বিরাট নেতা অধ্যাপক অনিল বসাকের সঙ্গে। আমি অনিলবাবুর বাড়ি যেতে আরম্ভ করলাম কসবায়। ওঁকে বুঝিয়ে বললাম, বামফ্রন্টকে কাজে লাগিয়ে এরা কীভাবে লুটেপুটে খাচ্ছে। অনিলবাবু এবং আমার শ্বশুরমশাই দুজনেই আমাকে আশ্বাস দিলেন, কিছুদিন লেগে থাকতে। তারপর কলকাতায় কোনো একটা কলেজে ট্রান্সফার করিয়ে নিয়ে আসা যাবে।

কিন্তু, আমার এখন মনে হচ্ছে, আমি এভাবে এখানে কতদিন থাকব, আর সিপিএম এদের ধরাধরি করে কেন ট্রান্সফারের চেষ্টা করব? আমি এখন ওদের অনেককে চিনি। আমরা মানিকতলা থেকে বেহালায় চলে আসার পরে সিপিএমের অনেক লোকের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়েছে, এবং অধ্যাপকদের সংগঠন ওয়েবকিউটার সঙ্গে আমি যুক্ত হয়ে পড়েছি। বেহালায় আমাদের নতুন ফ্ল্যাটের চারপাশে যদিও বেশ কিছু আজেবাজে লোকের ভিড়, কিন্তু ভালো লোকজন, শিক্ষিত লোকজনও আছে। তারা আমাদের সম্মান করে। মুক্তি এখন বেহালা বিবেকানন্দ কলেজে চাকরি পেয়েছে, এবং ওদের কলেজেরও অনেকে আমাদের চেনে। স্থানীয় সিপিএম কাউনসিলার সমর চক্রবর্তী আমাদের বাড়ি এসেছেন, এবং আমাদের দুজনকেই ওঁদের দলের সমর্থক হিসেবে ধরেই নিয়েছেন। আমরাও এখন বামফ্রন্টকেই সমর্থন করি। কিন্তু ওদের পার্টির মধ্যে ঢোকবার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই, কারণ ওদের যত কাছ থেকে দেখছি, ততই ওদের ভেতরকার আকাশচুম্বী অহঙ্কার আর পার্টিসর্বস্বতা বেশি করে চোখে পড়ছে। আমি আর এস এস ছেড়ে দিয়েছি আদর্শগত কারণে। কিন্তু, তার বদলে একটা টোটালিটারিয়ান দলে যোগ দেওয়ার বাসনা আমার নেই। আমি কারুর কৃপাপ্রার্থী হতে চাই না।

তাছাড়া, সিপিএমের কিছু লোক আমাকে আর এস এসের লোক বলে এখনই চিহ্নিত করে দিয়েছে। তাদের কথা, “ওয়ানস আ রোমান, অলওয়েস আ রোমান।”  বা, “ওয়ানস আ ফ্যাসিস্ট, অলওয়েস আ ফ্যাসিস্ট।” আমাকে বিশ্বাস করা যায় না।

মুক্তিও কলকাতায় খুব একটা আনন্দে নেই। নতুন বিবাহিত জীবনে এভাবে আলাদা আলাদা হয়ে থাকা ভালো লাগে নাকি? পরীক্ষা না কী কারণে এবার আমি আমাদের বিয়ের দিনও পাঠানখালি থেকে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম।

মাঝে মাঝেই ভাটায় নদী পারাপারের নৌকো আটকে যায়, আর আমরা মাঝনদীতে নেমে পড়ি প্যান্ট গুটিয়ে, আর ঝোলানো ব্যাগ মাথার ওপর তুলে, হাতে চটি নিয়ে একহাঁটু কাদার মধ্যে ছপ ছপ করতে করতে নদী পার হই, এপারে এসে ট্রেন ধরব বলে। এক একদিন লঞ্চ বন্ধ থাকে। তখন, পাঠানখালি থেকে বাসন্তী এই তিন মাইল আসাটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাসন্তী এলেই সোনাখালির বাস আছে, হয় ক্যানিংএর উল্টোদিক ভাঙনখালিতে, আর নয়তো এক্সপ্রেস বাস হয়েছে, তাতে তিন ঘণ্টা পথ সোজা মালঞ্চ, মীনাখাঁ, ঘটকপুকুর, ধাপার আবর্জনার পাহাড়ের পাশ দিয়ে বেলেঘাটা, এবং তারপর শিয়ালদা, কলকাতা। অনেকবার করেছি। এক একবার বাড়ি ফিরতে মাঝরাত হয়ে গেছে। শিয়ালদা পৌঁছে দেখি নিঃঝুম, নিঃশব্দ, ঘুমন্ত কলকাতা। তখন, ওই দশ মিনিট পথ পেরিয়ে মানিকতলায় পৌঁছনোই শক্ত। বাস বন্ধ। ট্যাক্সি নেই। রিকশা নেই। ফোন নেই যে বাড়িতে জানিয়ে দেব।

ghoti 29 c

বিয়ের ঠিক পরেই কাশী হয়ে রাজস্থান বেড়াতে গেছিলাম আমরা। কাশীর নতুন বাড়িতে মেজজেঠু সুরেন্দ্রনাথ, ছোটপিসি জয়ন্তী ও বোন বুবুকে দাঁড় করিয়ে ছবি তুলে দিয়েছিল আমার বাবা, আমার সেই প্রিয় আগফা ক্লিক থ্রি বক্স ক্যামেরাতে। – লেখক

যে আদর্শ ও উৎসাহ নিয়ে কলেজে পড়াতে আরম্ভ করেছিলাম, ডিপার্টমেন্ট তৈরি করেছিলাম, অমানুষিক পরিশ্রম করে সেই প্রথম ব্যাচের ছেলেমেয়েগুলোকে ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচিয়েছিলাম, তা দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যেতে বসেছে। মাঝে মাঝেই মনে হচ্ছে, আমি একটা ছাব্বিশ-সাতাশ বছর বয়েসের ছেলে। আমার বিয়ে হয়েছে। আমি থাকি সপ্তাহের চারদিন কি পাঁচদিন সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কহীন একটা জায়গায়, যেখানে আসা-যাওয়ার পথে জলে ডুবে মরে গেলেও কেউ জানতে পারবে না। কলেজে রাত্তির বেলা সাপে কামড়ালে কলকাতায় নিয়েই যাওয়া যাবে না। আমার বউ থাকে একা একা কলকাতায়। আমি যখন সপ্তাহান্তে কলকাতায় ফিরে যাই, তখন হাওড়াতে একদিন যেতে হয় শ্বশুরবাড়ি। নয়তো, আমার শ্বশুরমশাই বা শ্বাশুড়ি আসেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। নয়তো, আমরা একটা সিনেমা দেখতে যাই, বা কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যাই।

দুদিন ওখানে থেকেই আবার ভোরবেলা উঠে কলেজ। পুরনো অ্যালার্ম ঘড়িতে আদ্যিকালের বাদ্যি বাজে—”টকাটক টকাটক, ঘ্যাটো ঘ্যাটো ঘ্যাটো।” উঠে পড়ে এক কাপ চা খেয়েই যাদবপুর নয়তো ঢাকুরিয়া স্টেশন। ক্যানিং লোকাল। লঞ্চ। সন্ধ্যার মায়ের রান্না করা ভাত, ডাল আর আলুর তরকারি টেবিলে ঢাকা দেওয়া আছে। এখানে না পাওয়া যায় মাছ, না মাংস, না শাকসবজি। কোনো দোকান বাজার কিচ্ছু নেই। কী জায়গা রে বাবা!

রাত্তিরবেলা সব শুনশান, নিস্তব্ধ। দু একটা লণ্ঠনের আলো দুলতে দুলতে যায় আলের ওপর দিয়ে। ছেলেদের হোস্টেলের দিক থেকে মাঝে মাঝে হই হই ভেসে আসে। আজ শুধু আলুর ঝোলের বদলে মাছ বা ডিম রান্না হয়েছে নিশ্চয়ই। সদাশয় বামফ্রন্ট সরকার বাহাদুর যদি জানতেন তাঁদের দেওয়া টাকা কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে।

তারপর, আবার সব চুপ। যেন একটা ঘুমন্ত পুরী। রাত বারোটা বাজে। আমি সামনের বারান্দায় বসে বসে সিগারেট খাচ্ছি। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। জোছনার আলো মাঝে মাঝে আমাদের টিচার্স কোয়ার্টারের সামনের খেলার মাঠটা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মেঘের ছায়া খুব সন্তর্পণে কোনো কথা না বলে আস্তে আস্তে কেটে পড়ে। কেমন যেন একটা মায়াবী, রুপোলি আলো অনেকখানি জায়গা জুড়ে পড়ে আছে একটা হালকা মসলিনের আলোয়ানের মত। অবশ্য মসলিনের আলোয়ান আমি কখনো দেখি নি। কিন্তু ওই রকমই লাগে। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা, চাঁদ চাঁদ। মনে হয়, আমি এই সুদূরে বসে আছি, আর আমার বান্ধবী, আর এখন আমার বউ কলকাতায় একা একা বসে আছে। এই ভাবেই আমাদের জীবন কেমন যেন একটা তারছেঁড়া ভাবে বাজছে। আমি তো এই জীবন চাইনি।

ghoti 29 d

কাশীর গঙ্গার ঘাট। দূরে দেখা যাচ্ছে রেল কম ঝমাঝম ব্রিজ। – লেখক

দূর থেকে, অনেক দূর থেকে গ্রামের বউরা আমাদের কলেজ মাঠের গভীর নলকূপ থেকে জল নিতে আসে। দু মাইল, তিন মাইল হাঁটে তারা মাথায় ঘড়া কলসি নিয়ে। আর সামনে পেছনে থালা বাজাতে বাজাতে যায় অন্য দু একজন। দূর থেকে তাদের বাজনা ভেসে আসে, তারপর আস্তে আস্তে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

প্রথমে বুঝতে পারি নি। জিজ্ঞেস করলাম কমলবাবুকে, “আচ্ছা কমলবাবু, এই জল নিতে যাবার সময়ে থালা বাজানোর ব্যাপারটা কী?”

কমলবাবু গুড়াকু করতে করতে তাঁর স্বভাবসিদ্ধ স্মিত হাসি হাসলেন। বড্ড ভালোমানুষ। নির্বিবাদী। আঙুল সরিয়ে, মুখ বন্ধ করে কথা বললেন, “ও শুওপাই বাউ, কী বউছে ছোগ্গুলাল?”

শূলপাণিও তাঁর স্বভাবসিদ্ধ হাসি হাসলেন, “হ্যা হ্যা হ্যা, কেন ওরা থালা বাজায়? কেন বাজায় ওরা?” বলে, সুরেশবাবুর দিকে প্রশ্নটা রিলে করে দিলেন।

সুরেশবাবু বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষ। বাজে ইয়ার্কি করেন না আমাদের মত ফিচেলদের সঙ্গে। বললেন, “কে জিজ্ঞেস করছেন, পার্থবাবু?” উনি বাইরের ঘরে ওঁর বিছানায় বসে হ্যারিকেনের আলোয় খাতা দেখছেন। আমি ভেতরের ঘরে পরের দিনে পড়াবার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

আমি বললাম, “ওটা-কি কোনো রিচুয়াল জাতীয় কিছু?”

আবার শূলপাণি ও অন্যদের মিলিত হাসি। সুরেশবাবু ও শ্যামলদা উদ্ধার করলেন।

“ওটা হলো গিয়ে সাপ তাড়ানোর জন্যে। অন্ধকার রাতে এতখানি পথ। তাই থালা বাজায় সাপখোপ যাতে না আসে।”

বুঝলাম।

মায়ের মৃত্যুর পর বাবা একা একা হয়ে গেছে। আমার বোন এখন সতের আঠেরো বছর বয়েস, ওর পরীক্ষা হায়ার সেকেন্ডারিতে খুব খারাপ হয়ে গেল চিকেন পক্স হয়ে যাবার জন্যে। আমাদের সেই মধ্যযুগীয় শিক্ষাপদ্ধতি। পক্স হলে পেন্সিল দিয়ে পরীক্ষার খাতায় লিখতে হবে, আর বলতে গেলে কেউ ভালো করে খাতা ছোঁবেই না। যা তা একটা নম্বর বসিয়ে দেবে। বুবু ভালো স্টুডেন্ট। খুব পরিশ্রম করেছিল একজন খুব ভালো প্রাইভেট টিউটরের সাহায্যে। সব ভেস্তে গেল। ওও ভর্তি হয়েছে মুক্তির কলেজে। পড়াশোনা ভালো হচ্ছে না। বয়ঃসন্ধিতে ওকে দেখাশোনা করবার কেউ ছিল না। মুক্তি চেষ্টা করে যতটা পারে সঙ্গ দিতে। কিন্তু মায়ের অভাব কে পূর্ণ করবে? বাড়িতে আমার থাকা খুব দরকার। কিন্তু আমি থাকতে পারি না।

এখন, দরজায় এই প্রচণ্ড শব্দ। এবার গলা শোনা গেল বাইরে থেকে। প্রণবদা, কমল, মদনবাবু এরাও সব এসেছে।

“বেরোন, বেরোন। বাঁধ ভেঙে গেছে। জল ঢুকছে গ্রামে। এখুনি যেতে হবে।”

ghoti 29 e

সুন্দরবন হাজী দেশারত কলেজের ছাদ থেকে তোলা আমাদের সায়েন্সের অধ্যাপকদের ছবি। আমার পাশে বসে শূলপাণি ভট্টাচার্য। পিছনে দাঁড়িয়ে একেবারে বাঁদিকে এনথ্রপলোজির জহরবাবু। – লেখক

তার সঙ্গে প্রচণ্ড বৃষ্টির শব্দ, সাইক্লোনের ঝোড়ো গোঙানি। কলেজের বাড়িটার পাশে কলাগাছগুলো প্রবলভাবে আন্দোলিত হচ্ছে। আগে বুঝতেই পারি নি বাইরে কী তাণ্ডব চলছে ঝড়ের!

সেই মাঝরাতে শ্যামল চক্রবর্তী আর কে কে যেন তাঁদের এন সি সির সব ছেলে নিয়ে, কোদাল বেলচা হাতে বেরিয়ে পড়লেন। প্রিন্সিপাল যথারীতি ছিলেন না। তিনি সপ্তাহের অধিকাংশ সময়েই “কলকাতায় কাজে ব্যস্ত থাকেন।”

ভাইস প্রিন্সিপাল ধীরেন কীর্তনিয়া খুব একটা মজবুত মানুষ নন। অনেক বয়েসও হয়েছে।

আমরা জেগে বসে থাকলাম লণ্ঠন জ্বালিয়ে। যদি খবর আসে বাঁধ মেরামত করা যায় নি, তাহলে আমরা সব সায়েন্স বিল্ডিংয়ে গিয়ে উঠব। এর মধ্যেই গ্রামের অনেক লোক ভিড় করেছে। তারাও ওখানেই গিয়ে উঠবে।

ভোর পাঁচটার সময়ে ওদের দলটা ফিরল। বাঁধ ওরা মাটি ফেলে ফেলে সারিয়ে ফেলেছে। ঝড় থেমেছে। আপাতত কোনো বড় আশঙ্কা নেই।

পরের দিন আমরা বাড়ি ফেরার পথে ট্রেন পেলাম না। ট্রেন বন্ধ। বাসে হাজার ট্রেনের যাত্রী। ওঠা অসম্ভব। শেষ পর্যন্ত একটা ট্রাক ভাড়া করে আমরা কয়েকজন প্রফেসার আর গ্রামের কিছু লোক কলকাতার দিকে রওনা দিলাম। চার ঘণ্টা না পাঁচ ঘণ্টা পরে কর্দমাক্ত রাস্তা দিয়ে, রাস্তায় পড়ে থাকা ভাঙা গাছ সরিয়ে কলকাতা পৌঁছলাম। আমার ওপর দায়িত্ব পড়ল সবার কাছ থেকে কন্ডাকটরের মত পয়সা নেবার।

***

কলকাতায় গরমের ছুটিতে নাগেশ বেড়াতে এলো। নাগেশের সঙ্গে, বাবুর সঙ্গে, আর চন্দনদার সঙ্গে আমি চিঠিপত্র লেখা আরম্ভ করেছি বেশ কিছুদিন হলো। খোঁজ খবর নিচ্ছি কীভাবে পড়াশোনা করতে আমেরিকা যাওয়া যায়। ওরা অনেক পরামর্শ দিয়েছে। কীভাবে কী করতে হবে, অ্যাপ্লিকেশন প্রসেস, রিসার্চ প্রোপোজাল কেমন করে লিখতে হবে, পরীক্ষার নম্বর কীভাবে বাড়িয়ে দেখানো যায় কোনো মিথ্যের আশ্রয় না নিয়েও, এই সব। সব চাইতে বড় কথা, জি আর ই এবং টোয়েফল পরীক্ষা দিতে হবে। তার খরচও বিস্তর। এছাড়া, প্রতিটি ইউনিভার্সিটিতে অ্যাপ্লিকেশন করার আলাদা আলাদা ফী আছে। চন্দনদা বলে দিল, কিছু কিছু স্টেট ইউনিভার্সিটিতে একটা জায়গায় আবেদনপত্র পাঠালে ওই স্কুল সিস্টেমে অন্য ক্যাম্পাসগুলোতেও বিবেচিত হয়, এবং তার জন্যে আলাদা ফী পাঠাতে হয় না।

কারুকে কিচ্ছু বলে যাবে না। বাড়িতে শুধু আমি আর মুক্তি জানি। কলেজে একেবারেই বলা যাবে না। লুকিয়ে লুকিয়ে জি আর ই, টোয়েফল পরীক্ষার বই পড়তে আরম্ভ করলাম হারিকেনের আলোয়। কেউ জানতে পারলেই সব শেষ। সিপিএমের এরা বাধা দেবে নিশ্চয়ই। আমি যদি আমেরিকায় চলে যাই, তাহলে ওদের মুখে একটা ভালো রকম চড় পড়বে। চুনকালি। এত বড় বড় লেফটিস্ট কথা বলে পার্থ এখন চলল চরম ধনতান্ত্রিক আমেরিকায়। আর অরবিন্দ পাণ্ডা জানতে পারলে যে কী করবেন, তা বোঝা মুশকিল। মোট কথা, কারুকে কিছু না জানানোই ভালো।

মুক্তির বাবা মাকেও এখন কিছু বলা যাবে না। ওঁরা মেয়েকে এত ভালবাসেন। মুক্তি একমাত্র সন্তান, ওঁদের জীবনের একমাত্র আশ্রয়। এক সপ্তাহ না দেখলে অস্থির হয়ে ওঠেন। ওঁরা কিছুতেই আমার এ প্ল্যান মেনে নেবেন না।

নাগেশ কলকাতায় এসে আমাকে আরো কিছু পরামর্শ দিয়ে গেল। আমাদের বিয়ের পর নাগেশ এই প্রথম ভারতে এলো। আমরা তখনও আমাদের পুরনো বাড়ি ছেড়ে বেহালায় উঠে যাই নি। নাগেশ আমাদের দুজনেরই বন্ধু। মুক্তির অনেক দিনের বন্ধু, সেই প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে। ও নিয়ে এসেছিল কী সব উপহার।

ghoti 29 f

শূলপাণি পরে কলকাতায় বিদ্যাসাগর কলেজের প্রিন্সিপাল হয়েছিলেন। পাশে আমার পুরনো ছাত্র মতিয়ুর রহমান। – লেখক

নাগেশ চলে যাবার পর আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলাম আমেরিকাতে যাবার জোর চেষ্টা চালাব। এই জীবন আর ভালো লাগছে না। একটা কিছু আমূল পরিবর্তন একেবারে জরুরি হয়ে পড়েছে। এইভাবে সারাজীবন কাটানো যায় না। আমি সুন্দরবন কলেজে সারা জীবন পড়ে থাকলে পাগল হয়ে যাব।

কিন্তু, আমেরিকায় পড়তে যাব বললেই তো আর যাওয়া যায় না। আমার রেজাল্ট ভালো না। আমেরিকায় যারা পড়তে যায়, তারা সবাই দারুণ ভালো রেজাল্ট করা ছেলেমেয়ে। কেউ দেখবে না, আসলে আমি কেমন ছাত্র ছিলাম। সবাই শুধু রেজাল্টটাই দেখবে।

আমার একমাত্র সম্বল আমার টিচিং এক্সপেরিয়েন্স। আমি দু বছর কলেজে পড়িয়েছি। আমি একটা ডিপার্টমেন্ট নিজে হাতে গড়ে তুলেছি। আমি অপরিসীম চেষ্টায় আমার স্টুডেন্টদের ভরাডুবির হাত থেকে বাঁচিয়েছি। এগুলোই আমাকে কাজে লাগাতে হবে।

শুনলাম, জি আর ই বা টোয়েফলের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো রেকমেন্ডেশন লেটার। যদি একেবারে যাকে বলে স্টেলার রেকমেন্ডেশন পাওয়া যায়, তাহলে আবার একবার বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়তেও পারে।

সপ্তাহান্তে কলকাতায় আসি। আগে যাও বা সময়ে ছিল মুক্তির জন্যে, আর আমাদের বিবাহিত, দাম্পত্য জীবনের জন্যে, এখন সেটাও গেল। প্রতি শনিবার ইউ এস এডুকেশনাল ফাউন্ডেশন ইন ইন্ডিয়াবলে একটা জায়গায় যাই সেই পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলে। সেখানে গিয়ে পিটারসনস গাইড বলে একটা ডিকশনারির মত মোটা বই থেকে আমেরিকার সব ইউনিভার্সিটির তথ্য সংগ্রহ করি। কোথায় আমার স্পেশাল পেপার মাইকোলজি বা ফাঙ্গাসের ওপর রিসার্চ হয়, এবং সেই স্কুলে বিদেশী ছাত্রদের ফুল স্কলারশিপ দেয় কিনা, এসব তথ্য। কারণ, স্কলারশিপ ছাড়া একটা দিনও আমার পক্ষে আমেরিকায় পড়া সম্ভব নয়।

এদিকে পাসপোর্ট করাতে হবে। তখনকার দিনে পাসপোর্ট করানো এখনকার মত সহজ ছিল না। এক বছর লেগে গেল করাতে। নানা রকম ঝামেলা। সেই পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি সারা সকাল। অফ ডে’র একটা বেলা ওখানেই শেষ।

পাসপোর্ট করানোর জন্যে বাড়ি এসে পুলিশ অফিসার ঘুষ নিয়ে গেল। বলল, “আমেরিকায় চললেন, পান খাওয়ার জন্যে কিছু দিন।” থানায় গিয়ে দিলাম গোটা কুড়ি টাকা। আর মানিব্যাগে কিছু খুচরো পয়সা ছিল। সেটাও নিয়ে নিল।

আর একটা বেলা ইউ এস ই এফ আই’তে।

ইউ এস ই এফ আই’এর কাজ হলো যারা ইউ এস এ’তে পড়াশোনা করার জন্যে যেতে চায়, তাদের সাহায্য করা এবং উৎসাহ দেওয়া। আমি সেই আশায় একদিন একজন বাঙালি অফিসারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে গিয়ে দেখা করলাম।

তিনি আমার সব রেজাল্ট ইত্যাদি দেখে বললেন, “শুধু শুধু টাইম ওয়েস্ট করছ। তোমার হবে না।”

আমি বললাম, “কেন স্যার?”

উনি বললেন, “সবাই যদি আমেরিকায় যেতে পারত, তাহলে তো আর কোনো কথাই ছিল না।”

আমি তাঁর উৎসাহদানে অতি মুগ্ধ, চমৎকৃত হয়ে বাড়ি ফিরে এলাম। মুক্তিকে বললাম তাঁর উৎসাহদানের কথা। এর মধ্যে বেশ কয়েক হাজার টাকা অ্যাপ্লিকেশন করতে গিয়ে খরচ হয়ে গেছে।

ঊনিশশো পঁচাশির মে না জুন মাস। যখন সব হাল ছেড়ে দিতে বসেছি, তখন দুটো তিনটে চিঠি এলো। কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে চিঠি এলো, তারা আমার ব্যাপারে আগ্রহী। কিন্তু আমার টোয়েফল স্কোর যা, তাতে আমাকে স্টুডেন্ট হিসেবে ওরা নিলেও প্রথম থেকেই টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ দিতে পারবে না। আমাকে ওখানে গিয়ে আবার টোয়েফল দিতে হবে।

উত্তর দিলাম। কিন্তু দিয়েই বুঝলাম, কোনো লাভ নেই।

পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে লিখল, ওরাও আগ্রহী। কিন্তু প্রথম সিমেস্টারে আমাকে স্কলারশিপ বা কোনো আর্থিক সাপোর্ট দিতে পারবে না।

সেটাও গেল।

শেষ পর্যন্ত শিকে ছিঁড়লো। ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি বলে একটা স্কুল থেকে ডক্টর ডেরেক ম্যাকক্র্যাকেন বলে একজন চিঠি দিলেন, তাঁরা আমাকে মাস্টার্স স্টুডেন্ট হিসেবে গ্রহণ করলেন। আমাকে তাঁরা প্রথম থেকেই তিনশ আশি ডলার করে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ দেবেন মাসে মাসে। আমাকে আন্ডারগ্রাজুয়েট স্টুডেন্টদের ক্লাস নিতে হবে। আমার কোনো পড়ার খরচ লাগবে না। যদি আমি এই অফার নিতে চাই, তাঁদের যেন অবিলম্বে জানাই।

***

আমি অনেক সময়ে পরে ভেবেছি, আমার এই সুযোগটা শেষ পর্যন্ত হলো কীভাবে? কী দেখে ওরা আমার মত টানা সেকেন্ড ডিভিশন সেকেন্ড ক্লাস পাওয়া একটা ছেলেকে আমেরিকায় একটা মোটামুটি ভালো ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ দিয়ে উচ্চশিক্ষা লাভের সুযোগ দিল?

বোধ হয় আমার পরিশ্রম করার ক্ষমতা দেখে, হাল ছেড়ে না দেওয়ার স্বভাব দেখে, আর হয়ত পড়ানোর অভিজ্ঞতা দেখে। নইলে, যাকে বলে কনভেনশনাল উইসডম, তাতে আমার এই সুযোগ লাভ করার কথাই না।

আর জি আর ই, টোয়েফল পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হল না, তার কারণ এই।

ghoti 29 g

ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির এই ছবি-সম্বলিত ব্রশিওর ইত্যাদি আমাকে পাঠানো হয়েছিল। তখন কিছুই জানতাম না। ছবি দেখেই মুগ্ধ! এই বিশাল বাড়িটা নাকি একটা স্টুডেন্ট ডর্ম। মানে, ডরমিটোরি। এর নাম ওয়াটারসন টাওয়ার্স। এখানে ছাত্রছাত্রীরা থাকে। এ রকম আরো বাড়ি আছে অনেক। – লেখক

যেদিন আমার পরীক্ষা কলকাতায়, তার এক সপ্তাহ আগে আমি কলেজ থেকে ফিরে এসেছি। ডিসেম্বর মাসের তেইশ তারিখ। বড়দিনের ছুটি পড়ে গেল দশ বারো দিনের জন্যে।

রাত সাড়ে এগারোটার সময়ে ঘুমের মধ্যে শুনছি, আমাদের বেহালার বাড়ির সামনের খোলা জায়গাতে কারা যেন এসে আমাদের দোতলার বারান্দার দিকে মুখ তুলে ডাকছে, “বাবুয়া, বাবুয়া।”

পরিচিত কণ্ঠস্বর। কে বল তো? এত রাতে?

বাইরে বেরিয়ে দেখি রথীনমামা, আরো কয়েকজন আমাদের মামার বাড়ির পাড়া হরতুকি বাগান থেকে।

“আরে, কী ব্যাপার গো? তোমরা? কী হলো?”

আমি ভাবছি দিদির, মানে আমার দিদিমার কিছু হয়েছে বোধহয়।

রথীনমামা বলল, “বাবুয়া, বুদ্ধ সুইসাইড করেছে।”

(কিস্তি ৩০)

About Author

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় তিরিশ বছর ধরে আমেরিকায় আছেন। কলকাতায় ছিলেন জীবনের অর্ধেক। এখন স্থায়ীভাবে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। মানবাধিকার, বিশেষত ইমিগ্র্যান্টদের অধিকার ও শ্রমিক ইউনিয়ন—এই দুই বিষয়ে পেশাদারিত্ব। ইলিনয় থেকে পি এইচ ডি করার পর বিজ্ঞান ছেড়ে সাংবাদিকতা ও হিউম্যানিটিস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। শৈশব থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আর এস এস ও বিজেপির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার পর রাজনৈতিক ও আদর্শগত কারণে বেরিয়ে আসেন। তাদের সম্পর্কে বই ও নানা রচনা লেখেন। রাজনীতি ছাড়া বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ। সাংস্কৃতিক সংকট ও বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক আগ্রাসন সম্পর্কে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Partha Banerjee) বিশ্লেষণ ইউটিউব ও ফেসবুকে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রসংগীতে ও বাংলা আধুনিক গানে বিশেষ উৎসাহ। ২০১২ সালে কলকাতা থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের সিডি "আরো একটু বসো" প্রকাশিত হয়। বাংলা ও ইংরাজিতে লেখেন। উইকিপিডিয়া লিংক: http://en.wikipedia.org/wiki/Partha_Banerjee