ঘটিকাহিনী (৩১)

(আগের পর্ব)

ঈশ্বর, পৃথিবী, ভালবাসা

স্মৃতিকথা কতটুকু নথিভুক্ত হতে পারে? প্রকাশযোগ্য হতে পারে? কোনটা বাদ দেওয়া যেতে পারে? কোনটা বাদ দেওয়া অসম্ভব?

কিছু কিছু ঘটনা লিখতেই হবে। লিখতেই হলো। যেমন, মার মৃত্যু। ছোটমামার মৃত্যু। ছোটবেলায় মেজমাসির মৃত্যু। চোখ বুজে একটু ভাবলে প্রথমেই যে দুঃখের গল্পগুলো ভেসে ওঠেমনের মণিকোঠায়, এগুলো তার মধ্যে একেবারে সামনের সারিতে।

এগুলোর কথা বলা সহজ। কারণ, সব সময়ে মনের মধ্যে জমা হয়ে আছে, আর একটু সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়ার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে মার মৃত্যু নিয়ে আমি এত লিখেছি যে এখন আর আগের মত তীব্র বেদনা মনকে দগ্ধ করে না। বার বার বলতে বলতে, লিখতে লিখতে একটু একটু করে মনের ভেতরে একটা যেন থেরাপির কাজ করেছে, একটু শান্তি যেন পেয়েছি। আমি হিন্দুত্ববাদী ধর্মান্ধদের রাজনীতি থেকে অনেককাল আগে বেরিয়ে এসেছি, কিন্তু নিজের হিন্দু সত্তাকে কখনো বিসর্জন দিই নি। দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সেই চেতনা মনের মধ্যে সব সময়ে কাজ করেছে, আর বার বার আমাকে বলেছে, তুমি যদি কর্মফলে বিশ্বাস কর, তাহলে তোমার মা অনেক উঁচুস্তরের স্বর্গে পৌঁছেছেন। তিনি এখন তোমার ও তোমার পরিবারের আবেগ, সেন্টিমেন্টের অনেক উর্ধ্বে। তাঁকে যতই স্বপ্নে দেখার চেষ্টা কর না কেন, তিনি আসবেন না। মর্ত্যলোকের টানে নেমে আসার তাঁর কোনো প্রয়োজন আর নেই।

parthab logo

সত্যি, আমি আমার মাকে কখনো স্বপ্নে দেখি নি এই প্রায় চল্লিশ বছরে। মা কি আমার দেশ ছেড়ে চলে আসার কারণে আমার ওপর হতাশ? বাবাকে বুড়ো বয়েসে দেখাশোনা করার কর্তব্য করতে পারি নি বলে আমার ওপর বিরক্ত? বোনকে একটা টালমাটাল বয়েসে দেশে ফেলে চলে আসায় মা কি আমার ওপর রাগ করেছে? তাই কি আমাকে স্বপ্নে কখনো দেখা দেয় না? আমার থেকে দূরে সরে গেছে?

কী জানি!

কিন্তু মা আমাকে এত ভালবাসত, আমার ভালোমন্দকে ঘিরে মা নিজের জীবনের সবকিছু গড়ে তুলেছিল, আর আমার জীবনসংশয় যখন হয়েছিল, মা নিজের জীবন দিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে তুলেছিল। সেই মা আমার ওপর কখনো রাগ করতে পারে? বিরক্ত হতে পারে? আমার তো মনে হয়, বেঁচে থাকলে আমার আমেরিকাতে পড়তে আসাকে মা খোলামনে আশীর্বাদই করত। জীবনে উন্নতি করার জন্যে আমি যা যা করেছি দেশে থাকতে—ব্যাঙ্কে কেরাণির চাকরি করব না প্রতিজ্ঞা করে এম এস সি পড়ার ব্যবস্থা করেছি, খুব খারাপ হয়ে যাওয়া থেকে, ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে তুলেছি। ঘুরে দাঁড়িয়েছি। এসব দেখে মা যত খুশি হয়েছে, তেমন আর কেউ হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। মার জীবনের সবচাইতে বড় আনন্দ ছিলাম আমি।

ভিউয়ার্স গ্যালারি

ভিউয়ার্স গ্যালারি। ১৯৮৫ সালে যখন আমি দেশ ছাড়ি, তখন ওপরে উঠে সবাই সী অফ করতে পারত শেষ পর্যন্ত। এখন আর করা যায় না। সব বন্ধ হয়ে গেছে। – লেখক

দেশ ছেড়ে চলে আসার কারণে মা যতই দুঃখ পাক না কেন, আমার নিজের ইচ্ছের কথা ভেবে, আর অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা ভেবে মা কখনো আমাকে বাধা দিত না।

বাবাও খুব খুশি হয়েছিল যখন ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে আমার সেই বহুমূল্য আই-টোয়েন্টি নামক ইমিগ্রেশনের কাগজপত্র এসে পৌঁছল। এই কাগজ দেখালে কলকাতার ইউএস কনস্যুলেট আমাকে বিদেশি ছাত্রদের যে এফ-ওয়ান ভিসা দেয়, তা দিয়ে দেবে। বিশেষ করে ওদের যদি দেখানো যায় আমি একটা কলেজে পড়াই, আর কলেজ থেকে আমাকে কেবলমাত্র দু বছরের ছুটি দিয়েছে আপাতত একটা মাস্টার্স ডিগ্রী করার জন্যে, এবং আমি আমার স্ত্রীকে ফেলে ওদেশে যাচ্ছি, তখন ওরা নিশ্চিত হবে যে আমি পাকাপাকি ভাবে আমেরিকায় থেকে যাবার বাসনা নিয়ে যাচ্ছি না। সুতরাং, ভিসা না দেওয়ার কোনো কারণই থাকতে পারে না।

যেটা তখন বুঝি নি সেটা হলো, আমার মত একটা ছেলেকে ওরা কম পয়সায় খাটিয়ে নিতে পারবে। তিনশ আশি ডলারে মাস চলে নাকি আমেরিকায়? সে যতই পড়ার খরচ দিক না কেন। বাড়িভাড়া, বই খাতা কেনার খরচ, খাওয়ার খরচ— সবকিছু তিনশ আশি ডলারে কেমন করে হয়? ডিপার্টমেন্ট বা ইউনিভার্সিটির বাইরে কোনো কাজও নিতে পারবে না। নিলে তা আইনবিরুদ্ধ কাজ হবে। কিন্তু, আমরা জানিই না ওদেশের মূলস্রোত আমেরিকানদের ওরা কত দেয়, আর আমাদের মত বিদেশী ছাত্রদের কত দিচ্ছে। আমরা যারা একেবারে আনকোরা নতুন, তাদের ঠকানো তো আরো সহজ। আমেরিকায় পড়তে যেতে দিচ্ছে, তাতেই আমরা আহ্লাদে আটখানা। যেন, লটারির প্রাইজ জিতেছি। অহংকারের আর শেষ নেই।

ভিসা হয়ে গেল। সেই প্রথম ওসব সাহেব পাড়ায় আমেরিকান কনস্যুলেটের মত একটা জায়গায় যাওয়া। বাইরের গেটে দাঁড়িয়ে আছে সাত ফুট লম্বা এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবক দ্বারী। যা যা হচ্ছে, যেন একটা ঘোরের মধ্যে হচ্ছে। যেন আমি আমার বাস্তব জীবনে আর নেই।

ইউ এস দূতাবাস, কলকাতা

ইউ এস দূতাবাস। এ ছবিটি অবশ্য চেন্নাই কনসুলেটের। কিন্তু সেই একই চিত্র। আমেরিকায় যাওয়ার জন্যে হুড়োহুড়ি। লম্বা লাইন ভিসা পাবার জন্যে। – লেখক

দোসরা আগস্ট শুক্রবার সুন্দরবন হাজী দেশারত কলেজ থেকে আমি শেষবারের মত চলে আসি। সবকিছু জানানোর পরে কলেজে এক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া। মৌচাকে ঢিল মারার মত খবরটা ছড়িয়ে পড়ল। পার্থবাবু নাকি আমেরিকায় চলে যাচ্ছে। ওরকম একটা জায়গায় চার বছর পড়ানোর পর কেউ যে আবার আমেরিকায় চলে যেতে পারে, তা এক অভাবনীয় ব্যাপার। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহকর্মীদের মধ্যে শূলপাণি ভট্টাচার্য, রফিকুল ইসলাম, প্রণব বিশ্বাস, শিবাণী বিশ্বাস, কমল মহাপাত্র এরা তো প্রথমে স্তম্ভিত। শ্যামল চক্রবর্তী, দেবেশ রায়চৌধুরীর মত সিনিয়ররাও অবাক। কখন যে পার্থ এত কিছু করে ফেলল, আর কী ভাবেই বা করলো, সেই নিয়েই সবাই বিস্মিত।

তবে, শূলপাণি অত্যন্ত বুদ্ধিমান। কিছুদিন ধরে আন্দাজ করেছিল, ইংরিজিতে যাকে বলে, “আই ওয়াজ আপ টু সামথিং।” একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “পার্থ, এত শক্ত শক্ত ইংরিজি শব্দের মানে জিজ্ঞেস করছ, তুমি কি জি আর ই-টি আর ই দিচ্ছ নাকি?”

আমি যে এতদূর এগিয়ে গেছি সবার অগোচরে, প্রায় দু বছরের চেষ্টায় আমি একটা আমেরিকান ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ নিয়ে ভর্তি হয়ে গেছি, এবং দেশ ছেড়ে চলে যাবার সব প্রস্তুতি আমার শেষ, তা ওদের স্বপ্নেরও অগোচর ছিল।

 কলকাতার রিজার্ভ ব্যাঙ্ক

কলকাতার রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। কেবলমাত্র এসক্যালেটার চড়ার জন্যে লাইন। ভাবলেও কেমন যেন লাগে। – লেখক

কিন্তু ওরা খুব খুশি হয়েছিল আমার এই সাফল্যে। ওরা জানত আমার ছুটি ইত্যাদির ব্যাপারে প্রিন্সিপাল বাগড়া দেবে। কিন্তু আমার কপাল ভালো, সেই সময়ে আমাদের কলেজের গভার্নিং বডিতে শূলপাণি ও রফিক দুজনেই মেম্বার ছিল। ওরা ছুটি আদায় করে দিল আমার জন্যে দু বছরের। বেতনবিহীন ছুটি। স্টাডি লিভ। নইলে অরবিন্দ পাণ্ডা যে কী করত, কে জানে! ছুটি তো দিতই না, চাকরি নিয়ে জীবন দুর্বিষহ করে তুলত আমার।

এখন আমার বোটানি ডিপার্টমেন্টে একজন সহকর্মী এসেছেন, তাঁর নাম ডক্টর বিদ্যাভূষণ ঘোষ। সায়েন্সের অন্য ডিপার্টমেন্টগুলোতেও একজন করে দ্বিতীয় প্রফেসর এসেছেন। বিদ্যাভূষণ খোলা মনের, হাসিখুশি মানুষ। বন্ধু হয়ে গেছি আমরা। উনিও খুশিমনেই ব্যাপারটা মেনে নিলেন। নইলে আরো সমস্যা হত। এখন বেশ কিছুদিন আমার সব ক্লাসের বোঝা ওঁর ওপরেই পড়বে। খুশিমনে মেনে নেওয়া সহজ নয়।

চোদ্দই আগস্ট আমি দমদম এয়ারপোর্ট থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার একটা প্লেনে চাপলাম বিকেল সাড়ে পাঁচটার সময়ে। কলকাতা থেকে দিল্লি। দিল্লি থেকে রাত একটায় থাই এয়ারওয়েজের প্লেন ছাড়বে লন্ডনের উদ্দেশে। হিথরো বিমানবন্দরে পাঁচ ঘণ্টা বিরতি। সেখান থেকে আমেরিকান এয়ারলাইন কোম্পানি টি ডবলু এ’র বিমান আমাকে শিকাগো পৌঁছে দেবে।

সবকিছু যেন একটা স্বপ্নের মত ঘটে চলেছে। আমি যেন বাস্তব জগতে নেই।

সেই ইউ এস এডুকেশনাল ফাউন্ডেশনের অফিসেই একটা জমায়েত হলো যারা কলকাতা থেকে সে বছর আমেরিকার বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যাবে, তাদের। সেখানে আলাপ হলো সুনীতা বোসের সঙ্গে। সুনীতা ইকোনমিক্স পড়তে সেই ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটিতেই যাবে। আর আলাপ হলো সৌমিত্র ঘোষরায় বলে আমাদেরই বোটানির তিন বছরের জুনিয়র একটা ছেলের সঙ্গে। সেও যাবে ওই স্কুলে।

শেষ পর্যন্ত সৌমিত্রর যাওয়া কিছুদিনের জন্যে পিছিয়ে গেল। কিন্তু সুনীতা আর আমি একই প্লেনে কলকাতা ছাড়লাম। ভারত ছাড়লাম। ঘটনাচক্রে সুনীতার বাবা আমার বাবার পূর্বপরিচিত। ঊষা কারখানায় তিনি বড় অফিসার ছিলেন। আমাদের দুজনের জন্যেই কোন এক ট্র্যাভেল এজেন্সি থেকে টিকিট কেটে দিলেন তিনি। আমাদের কোনো ধারণাই ছিল না কীভাবে এসব করতে হয়। আমি জীবনে কখনো প্লেনেই চড়ি নি।

প্লেনে চড়া? ওঃ! ছোটবেলায় দমদম এয়ারপোর্টে দু একবার গেছি বিমান ওঠানামা করা দেখতে। এক টাকার টিকিট পাওয়া যেত, ওপরের বারান্দায় বসে বসে প্লেন আসছে, সেই রাডারের পাশ দিয়ে হুশ করে নেমে এলো, এই সব দেখতাম। আর রোমাঞ্চিত হতাম। প্লেনগুলো কী বিরাট! ওই দেখ লোকগুলো সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। একজন বলল, মাটি ছোঁয়াকে বলে টাচ ডাউন। ফিরে এসে পরের দিন সবাইকে বললাম, “কাল টাচ ডাউন দেখে এলাম।” সবাই তো শুনে অবাক!

আমার আর মুক্তির জমানো টাকা সব নিঃশেষ করে এগারো হাজার টাকা দিয়ে প্লেনের টিকিট কাটা হলো। ওয়ান-ওয়ে টিকিট। তখন এক মার্কিন ডলারের ভারতীয় অর্থমূল্য এগারো টাকা।

ঊষা সেলাই মেশিন কারখানা

ঊষা সেলাই মেশিন কারখানা ধ্বংস করে সেখানে শপিং মল ও বিশাল আকাশঝাড়ু প্রাসাদ তৈরি হয়েছে অর্থবানদের জন্যে। এই একটি মানুষ, কারখানার শ্রমিক শম্ভু সিং প্রতিরোধ করেছিল। তার বস্তি ছেড়ে দিতে রাজি হয় নি। কিছুদিন পরে শম্ভু সিং-এর সাইকেলকে এক গাড়ি এসে মারলো ধাক্কা। সাহসী ব্যক্তিটির প্রতিরোধ শেষ হয়ে গেল। রাণু ঘোষের ডকুমেন্টারি কোয়ার্টার নাম্বার ৪/১১ এই বিষয়ে আলোকপাত করেছে। – লেখক

লম্বা একগোছা চকচকে রঙিন কাগজ। সেটাই নাকি টিকিট। আমাদের ট্রেনে কাশী যাওয়ার টিকিট ছিল মোটা কাঠের মত শক্ত একটা ছোট্ট কাগজ, তার ওপরে কালো কালি দিয়ে কী সব লেখা, ভালো করে পড়াই যেত না। ট্রেনের কামরার বাইরে একটা টাইপ করা কাগজে, বা হাতে লেখা কাগজে রিজার্ভ করা সিটে কে কোথায় বসবে, শোবে, তার লিস্ট টাঙানো থাকত। সেই নিয়ে মাঝে মাঝেই ঝগড়াঝাঁটি। আর এখন, ওসব কোনো ব্যাপারই নেই। সেই আমাদের সবুজ হোল্ডঅলে বিছানা বেঁধেও নিয়ে যেতে হবে না। ফার্স্ট ক্লাস ট্রেনের যাত্রীদের মত আমাদের খাতির। আবার নাকি অনেক কিছু খেতেও দেবে, আর বারবার দেবে। লাঞ্চ, ডিনার, ব্রেকফাস্ট। আবার চাইলেই এয়ার হোস্টেসরা জল আর চা দিয়ে যাবে। কে যেন বলল। বোধহয় আমার বড়দা বাবলু। ও একবার একমাস না দুমাসের জন্যে ও এন জি সি থেকে হিউস্টন গেছিল। সেই নিয়েই আমাদের ফ্যামিলিতে কী গর্ব!

সেসব নানারকম গল্প আমেরিকার, ফিরে এসে। একবার নাকি একটা দোকান না কোথায় কাচের দেওয়াল এত স্বচ্ছ ছিল যে বুঝতে না পেরে সেই দেওয়ালের মধ্যে দিয়েই হাঁটতে গেছিল বড়দা, নাকি ওর কোন বন্ধু। সে নাকি আঘাত পেয়ে রক্তারক্তি ব্যাপার! আমাকে একটা অদ্ভুত লাইটার এনে দিল। সরু মত। চড়াং করে নীল আগুন লাফিয়ে বেরিয়ে আসে।

তারপর, আর একটা বিরাট উপকার করে দিল মুক্তির মাসতুতো দাদা বাবুদা। বাবুদা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বড় অফিসার। বিদেশী কারেন্সি সে সময়ে এখনকার মত এত সহজে পাওয়া যেত না। বাবুদার হস্তক্ষেপে খুব কম সময়ের মধ্যে আমি আরো একশ মার্কিন ডলার পেলাম। রিজার্ভ ব্যাঙ্কেও সেই আমার প্রথম যাওয়া। তখন ওখানে কলকাতার প্রথম এসক্যালেটার বসে গেছে। আমরা বলি, চলমান সিঁড়ি। আমাদের কলকাতার ছেলেদের কাছে তখন সেটা একটা অষ্টম আশ্চর্য। এখন, সেই বাড়িটায় বেশ কয়েকবার যাওয়া আসা করতে হলো।

সেই একশ ডলার পকেটে নিয়ে আমার আমেরিকা যাত্রা। শুনেছি, ওখানে একবার পৌঁছলেই নাকি ইউনিভার্সিটি থেকে কিছু অ্যাডভান্স টাকা পাওয়া যাবে। আমাদের বোটানি ডিপার্টমেন্টের আর এক জুনিয়র রঞ্জন গুপ্ত ওই ইউনিভার্সিটিতেই বায়োলজিতে পি এইচ ডি করতে গেছে এক বছর আগে। সে বলেছে, কোনো চিন্তা নেই, সে তার ঘরে আমার থাকার ব্যবস্থা করে দেবে, আর শিকাগো ও’হেয়ার এয়ারপোর্টেও উপস্থিত থাকবে। শিকাগো থেকে আই এস ইউ ক্যাম্পাসের দূরত্ব প্রায় একশ মাইল। সেই রাস্তাটা নাকি একটা বাসে করে যেতে হবে।

বিরাট একটা সমস্যা এলো মুক্তির মার দিক থেকে। সমস্যা মানে আর কিছুই নয়। এই প্রথম ওঁরা জানতে পারলেন আমি বিদেশে চলে যাচ্ছি পড়াশোনা করতে। আর, বিদেশ মানে দিল্লি বম্বে নয়, একেবারে সাত সাগর পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর উল্টোদিকে সেই আমেরিকা। আমার শ্বশুরমশাই দৃঢ়চিত্ত মানুষ ছিলেন। যদিও একমাত্র মেয়ের প্রতি তাঁর ভালবাসা ছিল অতি গভীর। মেয়েকে না দেখে তিনি থাকতেই পারতেন না। কিন্তু তিনি বুঝেছিলেন, কী অপরিসীম প্রচেষ্টায় আমি আজ এই সাফল্য লাভ করতে চলেছি। উনি আমার ইন্টেলেকচুয়াল ফ্রাস্ট্রেশনের কথা জানতেন। আর, সুন্দরবন কলেজ থেকে আমার কলকাতায় আসা যে এখনই সম্ভব হবে না, তাও উনি বেশ ভালই বুঝতে পারছিলেন। একসময়ে হয়ত হবে ধরাধরি করে, কিন্তু এখনই হবে না। এতকাল ধরে আমি ওখানে থাকতে চাইব না, উনি একথাও বেশ বুঝতে পারছিলেন। সুতরাং, শেষ পর্যন্ত যে আমি সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় আর অমানুষিক পরিশ্রম করে এই রাস্তা খুঁজে বের করতে পেরেছি, তা জেনে উনি আনন্দিতই হয়েছিলেন।

খগেন্দ্রকুমার খোলা মনের, প্রগতিশীল মানুষ ছিলেন। সৎ, নির্ভেজাল বামপন্থী মানুষ। আমার বন্ধুর মত ছিলেন। প্রায় প্রতি সপ্তাহে একবার করে আমাদের বেহালার বাড়িতে আসতেন সেই হাওড়া থেকে, তারপর রাত নটা নাগাদ আমি ওঁকে আমাদের ডগলাস চার্চের মাঠের স্টপ থেকে, কিংবা বেহালা চৌরাস্তার স্টপ থেকে আঠেরোর এ বাসে তুলে দিতাম। অনেক কথাবার্তা হত ওঁর সঙ্গে।

কিন্তু আমার শ্বশ্রুমাতা একেবারে ভেঙে পড়লেন এ খবর শুনে। তাঁকে দোষও দেওয়া যায় না। পূর্ববাংলা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে এলেন পশ্চিমবাংলায়। হিন্দু মুসলমান দাঙ্গায় তাঁর বাবা ঘাতকের হাতে প্রাণ দিলেন। কলকাতায় এসে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটিয়ে নিজের চেষ্টায় চাকরি যোগাড় করে একা হাতে ভাই বোন সবাইকে মানুষ করলেন, বড় করে তুললেন। তারপর মেয়ের বিয়ে দিলেন। এখন যখন একটু স্থিতাবস্থা এসেছে তাঁর জীবনে, যখন মেয়ে জামাই এবং নিজের ভাইবোনকে নিয়ে একটু সুখে শান্তিতে বাকি জীবনটা কাটানোর কথা ভাবছেন, তখন আবার এই বিনামেঘে বজ্রাঘাত। এই শকের জন্যে একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না তিনি।

আমাদের গোরাচাঁদ বসু রোডের ছেলেরা

আমাদের গোরাচাঁদ বসু রোডের ছেলেরা। হলুদ জামা পরা ছোট গোপাল, বা ডাক্তারবাবুর ছেলে গোপাল। লাল জামা গায়ে তাপস, শৈলদার এক ছেলে। এরা এখনো সেখানেই আছে। দেশে গেলে দেখা হয় মাঝে মাঝে। – লেখক

কয়েকমাস আগে আমাদের বাড়ি এলে যখন তাঁকে আমি আর মুক্তি এই কথা জানালাম, তিনি মুহ্যমান হয়ে পড়লেন, এবং তখনই আমাদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে বাস স্টপের দিকে হাঁটা দিলেন। আমি তাঁর পিছন পিছন গেলাম। তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম। কেন যে এতদিন তাঁদের কিছু জানাই নি, তাও বলার চেষ্টা করলাম। চলে যাবার নিশ্চয়তা ছিল না। ভেবেছিলাম, শেষ পর্যন্ত আমার ওখানে যাওয়া হবে না। কিন্তু কোনো লাভ হল না। তিনি আমার সঙ্গে কথা বললেন না, এবং বাসে উঠে হাওড়া ফিরে গেলেন।

খুব মুশকিল। খুব অসহায় লাগতে লাগলো। কেউ আমার কথা শুনছে না। কেউ আমার সঙ্গে কথা বলছে না। আমি আর মুক্তি দুজনে পরামর্শ করি। পরামর্শ করার সময়ও আর হাতে বেশি নেই। আর দশ বারো দিনের মধ্যে আমাকে দেশ ছাড়তে হবে। আগে ভাবি নি, সত্যি সত্যি এ সুযোগ জীবনে আসবে। কোনো মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। এত শেষ মুহূর্তে, এত অকস্মাৎ সব কিছু ঠিক হয়ে গেল! এখন আমার সঙ্গে কেউ নেই যে আমাকে ওদেশের পড়াশোনা, থাকা, খাওয়া, জীবনযাত্রা কোনো বিষয়েই কোনো পরামর্শ দিতে পারে। ইউনিভার্সিটি থেকে ওরা যেসব কাগজপত্র পাঠিয়েছে, সেগুলো তন্ন তন্ন করে দেখি আমরা দুজনে। অনেক কথা বুঝতেই পারি না। জিপিএ গ্রেডিং সিস্টেম। পরীক্ষায় এ, বি, সি, ডি গ্রেডিং পদ্ধতি। ষাট পার্সেন্ট নম্বর পাওয়া নাকি একেবারে ন্যূনতম এবং বাধ্যতামূলক। তার নিচে নম্বর পেলেই নাকি ফেল। আর আমাদের দেশে আমি তো জীবনে কখনো ফার্স্ট ক্লাস, ফার্স্ট ডিভিশন পাইই নি।

তারপর বলছে, আমাকে যে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ দেওয়া হলো, তার শর্ত হচ্ছে আমাকে আমার নিজের পরীক্ষাগুলোতে বি গ্রেড কমপক্ষে রাখতেই হবে। অর্থাৎ, আশি শতাংশ নম্বর পেতেই হবে। নইলেই অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ চলে যাবে। এসব দেখে খুব নার্ভাস লাগতে লাগলো।

নানা রকম ইংরিজি শব্দ সেসব কাগজপত্রের মধ্যে, যা আগে কখনো শুনি নি। রোডকে নাকি বলে পেভমেন্ট, আর আমরা যাকে বলি পেভমেন্ট বা ফুটপাথ, তাকে নাকি ওখানে বলে সাইডওয়াক। লিফটকে বলে এলিভেটার। আমরা যাকে বলি দোতলা বা ফার্স্ট ফ্লোর, তাকে ওরা বলে সেকেন্ড ফ্লোর। রাস্তার ডানদিক দিয়ে গাড়ি যায়, ফলে হাঁটাচলার নিয়মগুলো আমাদের দেশের ঠিক উল্টো। ছোটবেলায় সেই একবার পার্ক সার্কাস এলাকায় স্কুল থেকে নিয়ে গিয়েছিল ট্র্যাফিক ট্রেনিং স্কুলে, সেসব নিয়মকানুন একেবারে এখন উল্টে দিতে হবে। ডর্ম, ক্যাফেটেরিয়া, স্ন্যাকস। সকাল আটটা থেকেই নাকি ক্লাস। আর, অনেক সময়ে সন্ধে সাতটা কি আটটা পর্যন্ত ক্লাস থাকে। অবাক কাণ্ড! ক্রেডিট কার্ড বলে কী একটা জিনিস আছে আবার। মার্কিন ব্যাঙ্কের সব নিয়মকানুন।

সব মিলিয়ে ভীষণ জটিল, দুর্বোধ্য লাগতে শুরু করলো। জ্বর, জ্বর হয়ে গেল। গা কাঁপছে। শুধু একমাত্র সম্বল আত্মবিশ্বাস আর লড়াই করার সাহস। সবাই যখন করছে, আমি পারব না কেন? সুনীতার মত একটা বাচ্চা মেয়ে যদি করতে পারে, নাগেশ যদি পারে, চন্দনদা যদি পারে, আমি পারব না কেন?

একদিন টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসে গিয়ে ইন্টারন্যাশনাল কল বুক করে আই এস ইউ-এর বায়োলজি ডিপার্টমেন্টে ফোন করলাম। শুধু ওদের জানিয়ে দেওয়ার জন্যে, আমি আসছি। তখন ওভাবে ছাড়া অন্য দেশে ফোন করা যেত না।

কিছুই বুঝলাম না কী যে সেই ভদ্রলোক বললেন। টেলিফোন কানেকশন ভালো না। নানারকম ভৌতিক নয়েজ আসছে। তাছাড়া, আমি ওদের আমেরিকান উচ্চারণ, অ্যাকসেন্ট এসবের সঙ্গে একেবারেই পরিচিত নই। আমি এমনিতে ইংরিজিতে কথাই ভালো বলতে পারি না। আর এখন তো আরো নার্ভাস লাগছে। কথোপকথন যা মনে আছে এতকাল পর, তা হলো এইরকম।

আমি বললাম, “হ্যালো স্যার, দিস ইস পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়, স্যার। ফ্রম ক্যালকাটা, ইন্ডিয়া, স্যার।”

ওদিক থেকে অপার্থিব কিছু শব্দঝঞ্ঝা ভেসে এলো। তারপর একটা গলা, “হু?”

আমি আবার বললাম, “স্যার, দিস ইস পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়, স্যার। ফ্রম ক্যালকাটা, ইন্ডিয়া, স্যার। স্যার, পি এ আর টি এইচ এ, বি এ এন ডি ওয়াই ও পি এ ডি এইচ ওয়াই এ ওয়াই, স্যার।”

ওদিক—”ইয়েস?”

আমি বললাম, “স্যার, আই রিসিভড অ্যাডমিশন, স্যার। ইন দা বায়োলজি ডিপার্টমেন্ট, স্যার।”

ওদিক—”ওহ, দ্যাটস গ্রেট। আর ইউ কামিং?”

আমি—”ইয়েস স্যার, ইয়েস স্যার। স্যার, প্লিজ টেল ডক্টর ম্যাকক্র্যাকেন। আই শ্যাল রিচ অন দা ফিফটিনথ আগস্ট, স্যার।”

ফোন কেটে গেল। তারপর হাজার চেষ্টা করেও অপারেটর আর ফোনের কানেকশন করে দিতে পারল না। একশ ছেচল্লিশ টাকা আর কিছু পয়সা ফোন চার্জ লাগলো। আমার মাসিক বেতনের দশ ভাগের এক ভাগ। তারও বেশি।

সুতরাং, এখন আমাকে ধরে নিতে হবে এই ভদ্রলোক, তাঁর নামটাও ভালো বুঝতে পারি নি, তিনি জানিয়ে দেবেন আমি সত্যি আসছি ভারত থেকে আমেরিকা। তখন ইমেলও ছিল না, কিছুই ছিল না, ফলে এছাড়া আমার পক্ষে আর কিছু করা সম্ভব নয়। হ্যাঁ, তবে ভালোর মধ্যে, রঞ্জন জানে আমি আসছি। ওকে আমি কিছুদিন আগেই একটা চিঠি দিয়েছি।

সুনীতাকেও বললাম এই অনিশ্চয়তার কথা। ওর মাত্র একুশ বছর বয়েস, কিন্তু আমার থেকে অনেক বেশি জানে এসব ব্যাপার। আর একেবারেই নিরুত্তাপ। কে বলবে, ও দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দেখে কিছু বোঝারই উপায় নেই। এত কনফিডেন্ট। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া বর্ধিষ্ণু ঘরের মেয়ে।

সুনীতা বলল, “কোনো চিন্তা কোরো না। রঞ্জন আছে। আর তুমি তো ডিপার্টমেন্টে জানিয়েই দিয়েছ।”

ওখানে নাকি ভীষণ ঠাণ্ডা। বার বার করে ইন্সট্রাকশনে বলে দিয়েছে ওরা। তা, মুক্তির ফুলকাকু কাজ করতেন একটা জামাকাপড়ের দোকানে। আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে একটা মোটা গলাবন্ধ ফুল সোয়েটার কিনে দিলেন। আর গরম মোজা, আর একটা উলের টুপি।

***

চোদ্দই আগস্ট বিকেল তিনটের সময়ে দমদম এয়ারপোর্ট লোকারণ্য। আমার বাড়ি থেকে, মুক্তির বাড়ি থেকে, আমার কলেজ থেকে, আমার বন্ধু, আত্মীয়স্বজন সব মিলিয়ে সত্তর জন লোক এসেছে আমাকে সী-অফ করার জন্যে। আমি যেন এক ভি আই পি। শূলপাণি এসেছে কলেজ থেকে। সুব্রত আসে নি। ও কলকাতার বাইরে এখন পোস্টেড। মুক্তির আর্টিস্ট ভাই, মামাতো ভাই বাবু মানে সুশান্ত এসেছে। আবার এদিকে ওর মাসতুতো দাদা, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বাবুদা মানে মিহির চক্রবর্তীও এসেছে। আমার পিসতুতো দিদি দুজন যারা আমাদের খুব ক্লোজ, সেই দীপাদি আর টুনটুনিদি এসেছে। মুক্তির বাবা আর মা এসেছেন, আর মা ক্রমাগত চোখের জল মুছছেন। আমার বাবা, আমার বোন, মাসি এসেছে।

দমদম এয়ারপোর্ট

দমদম এয়ারপোর্ট—এয়ার ইন্ডিয়ার প্লেন ওঠানামা দেখতে যেতাম মামা বা কাকা কারুর সঙ্গে। সেটাই একটা বিরাট ব্যাপার ছিল একসময়ে। – লেখক

মাসি ট্যাক্সিতে বারবার বলেছে, “আজকে ছোটমামা বেঁচে থাকলে কত খুশি হত, বাবুয়া।”

আর মুক্তি এসেছে। ওর চোখে জল।

কিন্তু আমি এখন ওর সঙ্গে বেশি কথা বলতে পারছি না। এত লোক এসেছে, তারা সবাই আমাকে বিদায় জানাবার জন্যে এসে হাজির হয়েছে। আমি যদি তাদের সঙ্গে একটু কথা না বলি, তারা দুঃখ পাবে। সবার সঙ্গেই ঘুরে ঘুরে আমি কথা বলছি। তখন সিকিউরিটির আজকের মত এত কড়াকড়ি ছিল না। সবাই এয়ারপোর্ট লাউঞ্জে আসতে পেরেছিল। ওপরে সেই প্লেন ওঠানামা দেখার বারান্দায় যেতে পেরেছিল।

মুক্তির সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আমি ওকে ওখানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করব। আমার বন্ধুরা যারা ওদেশে থাকে, তারা আশ্বাস দিয়েছে, তা করা সম্ভব। সবাই নাকি তাই করে। তা, সবাই যখন করে, আমিও নিশ্চয়ই করতে পারব। এখন কিছুদিন একা থাকতে হবে ওকে। আমি ফোন করব ওখানে পৌঁছেই।

সী-অফ করতে আসে নি আমাদের ধনী আত্মীয়রা। কেনই-বা আসবে? আমাদের বিয়ের সময়ে আমরা ঠিক করেছিলাম, কোনো উপহার আমরা নেব না। আমাদের নিজেদের হাতে তৈরি করা নেমন্তন্নর কার্ডে আমরা লিখে দিয়েছিলাম, কোনো উপহার আনবেন না। সে কার্ড হাতে করে পৌঁছে দেওয়ার সময়ে আমরা মুখেও বলে দিয়েছিলাম সবাইকে, আমরা কিন্তু কোনো গিফট নিচ্ছি না। কোনো গিফট আনবেন না।

তবে হ্যাঁ, চাইলে ফুল আনতে পারেন। কিন্তু আর কিচ্ছু না।

সেই নিয়ে অশান্তি। বাবাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছিল। এত বড় দুঃসাহস আমাদের! কয়েকজন বিয়েতে, বৌভাতে আসেও নি।

শৈশবে, বাল্যকালে অবসর সময়ে কতবার পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপ এঁকেছি বসে বসে। রং পেনসিল দিয়ে রং করেছি। পূর্ব বাংলাকে জানতাম না। এই ছিল আমার বাংলাদেশ। - লেখক

শৈশবে, বাল্যকালে অবসর সময়ে কতবার পশ্চিমবঙ্গের ম্যাপ এঁকেছি বসে বসে। রং পেনসিল দিয়ে রং করেছি। পূর্ব বাংলাকে জানতাম না। এই ছিল আমার বাংলাদেশ। – লেখক

কিন্তু, আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত থেকে এক পাও নড়ব না। আমারই ঊর্বর মস্তিষ্কের আইডিয়া। আমার কথা ছিল, সারা জীবন আমাদের কোনো খোঁজও রাখে নি যারা, সব সময়ে আমাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে এসেছে, অবহেলা, অবজ্ঞা করে এসেছে, আর মাঝে মাঝে দাক্ষিণ্য দেখাতে চেষ্টা করেছে, এখন আমাদের বিয়ের সময়ে বড় বড়, দামি দামি উপহার নিয়ে আসবে তারা, আর আমাদের গরিব মামার বাড়ি বা যারা আমাদের পাশে থেকেছে সারা জীবন, তারা সঙ্কুচিত হয়ে একপাশে বসে থাকবে কারণ মহার্ঘ্য উপহার দেওয়ার সাধ্য তাদের নেই—তা আমরা কিছুতেই হতে দেব না।

মা যখন ক্যানসারের অসহ্য যন্ত্রণায় কাঁদত, আর ডাক্তার মাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল, তখন এরা সব কোথায় ছিল? আমি যখন পিঠ ভেঙে বিছানায় পড়েছিলাম, তখন এরা কোথায় ছিল? আমার বাবার কারখানায় যখন একটার পর একটা স্ট্রাইক আর লকআউট চলছে, আর আমাদের বাড়ি কাল কী খাওয়া হবে তার ঠিক নেই, তখন এরা কোথায় ছিল?

আমি এদের হাত থেকে কোনো উপহার নেব না। এরা একটু বুঝুক, আমাদেরও আত্মসম্মানবোধ আছে। আমাদেরও বুদ্ধি আছে ঘুরে দাঁড়ানোর, রুখে দাঁড়ানোর।

সেই বাবুয়া, রাস্তায় রাস্তায়, গলিতে গলিতে ক্রিকেট ফুটবল লাট্টু ড্যাংগুলি খেলা বাবুয়া, পাজামা আর চটি পরে বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে যাওয়া রোগা, মুখে ছুলি ওঠা বাবুয়া, হায়ার সেকেন্ডারিতে সেকেন্ড ডিভিশনে পাস করা বাবুয়া এখন নিজের চেষ্টায় স্কলারশিপ নিয়ে আমেরিকায় পড়তে যাচ্ছে।

তোমাদের এয়ারপোর্টে আসার কোনো দরকার নেই। একা সারা জীবন লড়েছি। একাই লড়ে যাব। আমার নিজের আসল লোকেরা আমার সঙ্গে আছে। থাকবে।

প্লেন ছেড়ে দিল।

বিদায় কলকাতা। বিদায় বাংলাদেশ।

বিদায় ভারতবর্ষ।

(কিস্তি ৩২)

Tagged with:

About Author

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় তিরিশ বছর ধরে আমেরিকায় আছেন। কলকাতায় ছিলেন জীবনের অর্ধেক। এখন স্থায়ীভাবে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। মানবাধিকার, বিশেষত ইমিগ্র্যান্টদের অধিকার ও শ্রমিক ইউনিয়ন—এই দুই বিষয়ে পেশাদারিত্ব। ইলিনয় থেকে পি এইচ ডি করার পর বিজ্ঞান ছেড়ে সাংবাদিকতা ও হিউম্যানিটিস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। শৈশব থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আর এস এস ও বিজেপির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার পর রাজনৈতিক ও আদর্শগত কারণে বেরিয়ে আসেন। তাদের সম্পর্কে বই ও নানা রচনা লেখেন। রাজনীতি ছাড়া বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ। সাংস্কৃতিক সংকট ও বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক আগ্রাসন সম্পর্কে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Partha Banerjee) বিশ্লেষণ ইউটিউব ও ফেসবুকে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রসংগীতে ও বাংলা আধুনিক গানে বিশেষ উৎসাহ। ২০১২ সালে কলকাতা থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের সিডি "আরো একটু বসো" প্রকাশিত হয়। বাংলা ও ইংরাজিতে লেখেন। উইকিপিডিয়া লিংক: http://en.wikipedia.org/wiki/Partha_Banerjee