ঘটিকাহিনী (৫)

এদিকে বাবা হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিল ছ বছর বয়েসেই গোয়াবাগান পার্কে আর এস এসের শাখায়। বাবার মানসচক্ষে আমি হিন্দুরাষ্ট্রের নতুন এক কর্ণধার।

(আগের পর্ব)

পড়া, খেলা, গান, আর… হিন্দি হিন্দুস্তান!

অস্তিত্বের সংকট। সাংস্কৃতিক সংকট। স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার ক্রাইসিস।

একেবারে সেই ছোটবেলা থেকেই এই যে কালচারাল ক্রাইসিস মনের মধ্যে নিয়ে বড় হয়েছি, তার বর্ণনা আর বিশ্লেষণ করতে গেলে একটা থেরাপি নিজের সঙ্গে করতেই হবে। নিজের সঙ্গে মুখোমুখি হতেই হবে।

এইবারে আমার পুরনো বন্ধু, যাঁরা আমাকে অনেক দিন থেকে চেনেন, তাঁরা বলবেন, এই তো, পথে এস বাছাধন। তোমাকে আমরা চিনি না! তুমি সেই ক্লাস ওয়ান থেকেই যে আর এস এসে গিয়ে ঢুকেছিলে, সে খবর-কি আমরা রাখি না ভেবেছ?

আমার প্রথম রাজনৈতিক মিটিং। কলকাতায় সম্ভবত ১৯৬০ কিংবা ১৯৬১ সালে বিজেপি তৎকালীন ভারতীয় জনসংঘের কোনো এক সম্মেলন হয়।  সেখানে আমি যাই বাবার সঙ্গে। নেতৃস্থানীয় মানুষদের মধ্যে আমি বসে আছি ডোরাকাটা সোয়েটার আর হাফপ্যান্ট পরে। পিছনে কালো জহর কোট আর মোটা ফ্রেমের চশমা পরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন "ঝিঙেপোস্ত" খাওয়ার লোভে আমাদের বাড়িতে আসা আর এস এস প্রচারক রামপ্রসাদ দাস।
আমার প্রথম রাজনৈতিক মিটিং। কলকাতায় সম্ভবত ১৯৬০ কিংবা ১৯৬১ সালে বিজেপি তৎকালীন ভারতীয় জনসংঘের কোনো এক সম্মেলন হয়। সেখানে আমি যাই বাবার সঙ্গে। নেতৃস্থানীয় মানুষদের মধ্যে আমি বসে আছি ডোরাকাটা সোয়েটার আর হাফপ্যান্ট পরে। পিছনে কালো জহর কোট আর মোটা ফ্রেমের চশমা পরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন “ঝিঙেপোস্ত” খাওয়ার লোভে আমাদের বাড়িতে আসা আর এস এস প্রচারক রামপ্রসাদ দাস।

না, আমার লুকোনোর আর কিছু নেই। আমি এখন সম্পূর্ণ উলঙ্গ পৃথিবীর কাছে। আমার দেশের কাছে তো বটেই। আমি যে পরিবারে জন্মেছি, সেখানে এক দিকে মায়ের দিকের জিনে বাঙালি উদারনৈতিকতা। আর অন্য দিকে বাবার দিকের জিনে উগ্র হিন্দুবাদী রক্ষণশীলতা। এই দুয়ের টানাপোড়েন আমার সেই ছ বছর বয়েস থেকেই আমাকে ভেতরে ভেতরে ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। অবশ্য, সে টাগ অফ ওয়ারটা তখন প্রথম দিকে তেমন বুঝি নি। কেই বা বোঝে ওই বয়েসে। কিন্তু লড়াইটা মনের মধ্যে একটু একটু করে তৈরি হচ্ছিল। শুধু সময় অপেক্ষা করে ছিল সে লড়াইকে মনের গলি, চোরাপথ থেকে রাজপথে নিয়ে আসার। সে গল্প বলতেই হবে।

parthab logo

পড়াশোনা চলছিলই। বাড়িতে বাবা ও মা দুজনেই এই ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। বিশেষ করে মা। পরীক্ষার সময়ে আমাদের বাড়িতে কেউ এসে হাজির হতে পারবে না, এই ছিল মার অলিখিত নিয়ম। ছেলের পরীক্ষা সামনে। আর সব কাজকর্ম বন্ধ। পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু চলবে না। একটু বাইরে গিয়ে খেলে এসো, ব্যাস। তারপর আবার বইখাতা নিয়ে বসে পড়। বেড়ানো-টেড়ানো, গল্প, আড্ডা, সিনেমা—সব বন্ধ ওই পরীক্ষার আগের একটা মাস। যাকে বলে, “নো এডমিশন, ভেরি বিজি।”

আমাদের তিনের এ গোরাচাঁদ বসু রোডের মেজেনাইন ফ্ল্যাটের একটি মাত্র ঘরে অন্য সময়ে কিন্তু সর্বদা লোকজন আসা যাওয়া করত। মামার বাড়ি খুব কাছে। মামারা, মাসি, দিদিমা সব সময়ে আসত। বাবার আর এস এসের সহকর্মীরা তো আসতই মিটিং-টিটিং করতে। এদের মধ্যে অতি-উৎসাহী লোকজন ছিল বিস্তর। দোলের দিন বিকেলে বাবাকে আবির মাখানোর জন্যে একবার জনসংঘের হেরো ভোটপ্রার্থী মিহির সাহা রাস্তা থেকে জলের পাইপ বেয়ে বারান্দা দিয়ে উঠে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল, এবং বাবার প্রচণ্ড বকুনি খেয়ে দমে গিয়েছিল।

বাবা ছিল ওদের রোল মডেল। কারণ, বাবা হিন্দু হার্টল্যান্ড কাশী থেকে সঙ্ঘের প্রচারক হয়ে আসা নেতা। প্রচারক মানে কৌমার্যব্রতধারী হোল টাইমার, অর্থাৎ পুরো সময়ের কর্মী। সংগঠক। আর এস এসে খুব উঁচু স্থান।

বাবা জিতেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, বা বাঙালিদের কাছে জিতেনদা, আর হিন্দিভাষীদের কাছে জিতেন্দ্রজি, অটলবিহারী বাজপেয়ীর, লালকৃষ্ণ আদভানির বন্ধুস্থানীয়। এক বয়েস। এক সময়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়া সংঘ কার্যকর্তা। সঙ্ঘের শীর্ষ নেতা নানাজি দেশমুখ, একনাথ রানাডের স্নেহধন্য। বাবার সম্পর্কে অনেক সত্যিমিথ্যে মেশানো তথ্য, বাবার একরোখা মনোভাব, আর একেবারে মশালের মত জ্বলন্ত সততা ও নিষ্ঠা কলকাতার প্রতিনিয়ত পর্যুদস্ত হওয়া, মার খাওয়া আর এস এস, জনসংঘিদের কাছে বাবার প্রতি শ্রদ্ধাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল।

সবাই আসতো আমাদের বাড়ি বাবার সঙ্গে দেখা করতে, মিটিং করতে, এমনকি ব্যক্তিগত পরামর্শ নিতে। বাবাকে দেখেছি সম্পূর্ণ স্বার্থশূন্যভাবে অন্যকে সাহায্য করতে নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে। বাবার টাকাপয়সা ছিল না, কিন্তু নিজের লোকেদের জন্যে উদার হৃদয় ছিল। সে লোক পরিবারের লোক হোক, আর নয়তো আর এস এসের লোক। এইভাবে অনেকেই বাবাকে কাজে লাগিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে সঙ্ঘের কিছু এলিট কর্তাব্যক্তি। যারা কখনো স্বার্থত্যাগ করে নি। লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে দেশ উদ্ধারের কাজে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় নি। জেল খাটে নি। অর্থকষ্ট ভোগ করে নি। এরা বাবার আদর্শবাদকে, তীব্র দেশভক্তিকে আর পরিশ্রমকে ব্যবহার করেছে, কিন্তু কখনো বাবার প্রাপ্য রেকগনিশন দেয় নি। বাবাও রেকগনিশন চায় নি কখনো। এই প্রজাতির কর্মী একসময়ে বাম ও দক্ষিণ—দুই দিকেই ছিল। এখন কোনো দিকেই তেমন আর নেই। আমি নিজে যে আর এস এসকে দেখেছি, যেসব আত্মত্যাগী, নিরহঙ্কার কর্মী ও নেতা দেখেছি, তাদের সংখ্যা লুপ্তপ্রায়।

পাড়ার পার্কে আর এস এস শাখায় হাডুডু খেলা হচ্ছে।  এ ছবিটি যদিও ম্যাঙ্গালোরে তোলা, কিন্তু আমাদের কলকাতার গোয়াবাগান শাখা বা মানিকতলা শাখার সঙ্গে কোনো তফাৎ নেই। একেবারে ছোটবেলা থেকে যারা আসে, তাদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন কারণে টিঁকে থাকে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যারা থেকে যায়, তারা ভবিষ্যত নেতা হিসেবে তৈরি হয়।
পাড়ার পার্কে আর এস এস শাখায় হাডুডু খেলা হচ্ছে। এ ছবিটি যদিও ম্যাঙ্গালোরে তোলা, কিন্তু আমাদের কলকাতার গোয়াবাগান শাখা বা মানিকতলা শাখার সঙ্গে কোনো তফাৎ নেই। একেবারে ছোটবেলা থেকে যারা আসে, তাদের মধ্যে অনেকেই বিভিন্ন কারণে টিঁকে থাকে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যারা থেকে যায়, তারা ভবিষ্যত নেতা হিসেবে তৈরি হয়।

“অতি-উৎসাহী” কথাটা আসলে ইউফেমিসম। এর আসল মানে হল, বহরে বড়, মাথায় খাটো বাঙালি সন্তান। তার আসল মানে হল, মাথামোটা। এখন এই বহুকাল পরে বোধহয় বলতে কোনো বাধা নেই-যে আর এস এসে থাকার পনেরোটা বছরে আমি ওদের মধ্যে সত্যিকারের ব্রাইট লোকজন বেশি দেখি নি। মানে, সাধারণ কর্মীদের মধ্যে। নেতাদের মধ্যেও খুব বেশি নয়। লেখাপড়ায় প্রায় সবাই অতি সাধারণ। পড়াশোনা নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। কেউ কবিতা পড়ে না, একটা ভালো গল্পের বই পড়ে না, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প, সঙ্গীত কিছুই তেমন জানে না, বোঝে না। খুব কদাচিৎ এমন দু একজন চোখে পড়ে। তাদের নিয়ে আর এস এস শিয়ালের কুমিরছানা দেখানোর মত সকলকে দেখিয়ে থাকে। এমন একজন ছিলেন বালকৃষ্ণ নায়েক।

মারাঠি প্রচারক তখন খুব বেশি ছিল সংঘে। ইনিও তাঁদের মধ্যেই একজন। তিনি নাকি ক্যালিফর্নিয়াতে পড়াশোনা শেষ করে কেবলমাত্র সংঘের কাজ করার জন্যে ভারতে ফিরে এসেছিলেন। হতেও পারে। কে জানে কেন ফিরে এসেছিলেন। অনেক রক্ষণশীল পরিবার তখনকার দিনে বিদেশে ছেলেদের পাঠাত না, এবং পাঠালেও ফিরে আসতে বাধ্য করত। এখনকার মত মার্কিন ডলার তখন ষাট টাকায় এক ডলার ছিল না তো, অথবা ব্রিটিশ পাউন্ড একশো টাকা, আর লোভটাও অনেক কম ছিল। অনেকেই দেশে ফিরে যেত। ফিরে গিয়ে ভালো কাজকর্মও পেয়ে যেত। যাই হোক, আমি বালকৃষ্ণ নায়েককে বা তাঁর ত্যাগকে ছোট করতে চাই না। ভদ্রলোক খুবই নিরহঙ্কার, শান্ত মানুষ ছিলেন। কিছুদিন কলকাতায় কাজ করার পর কোথায় যেন চলে গেলেন।

ভাউরাও দেওরাস যখন আর এস এসের সারা ভারতের নাম্বার টু নেতা, তখন আমাদের বাড়ি এসেছেন বেশ কয়েকবার।  আমাকে খুব স্নেহ করতেন। অনেক আলোচনা করতেন বাবার সঙ্গে, আর আমার সঙ্গেও একটু একটু। আমি ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে কথা চালিয়ে যেতাম। শিক্ষিত, সজ্জন মানুষ। সম্পূর্ণ নিরহঙ্কার। ধরা যাক দক্ষিণপন্থীদের একজন হরেকৃষ্ণ কোঙার।
ভাউরাও দেওরাস যখন আর এস এসের সারা ভারতের নাম্বার টু নেতা, তখন আমাদের বাড়ি এসেছেন বেশ কয়েকবার। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। অনেক আলোচনা করতেন বাবার সঙ্গে, আর আমার সঙ্গেও একটু একটু। আমি ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে কথা চালিয়ে যেতাম। শিক্ষিত, সজ্জন মানুষ। সম্পূর্ণ নিরহঙ্কার। ধরা যাক দক্ষিণপন্থীদের একজন হরেকৃষ্ণ কোঙার।

আমি স্কটিশে পড়ি, ভালো ছাত্র। আবার একটু গান-টানও গাইতে পারি। খেলায় ভালো। সংগঠন করতে শিখছি ছোটবেলা থেকে। ফলে, আমি ছোটবেলা থেকেই একজন “রাইসিং স্টার।” তার ওপর আবার জিতেন ব্যানার্জীর ছেলে। নেতাদের নজর ছিল আমার ওপরে। আমাদের বাড়ি আর এস এসের সারা ভারতের সব চেয়ে বড় নেতা, যাকে ওরা সরসংঘচালক বলত, সেই বালাসাহেব দেওরাসের ভাই ভাউরাও দেওরাস, যিনি ছিলেন ইন্ডিয়াতে নাম্বার টু, তিনি বেশ কয়েকবার এসেছেন, এবং আমার সঙ্গে অনেক বিষয়ে কথা বলেছেন। তবে, তখন আমি হাই স্কুলে পড়ি। রবীন্দ্রনাথের অর্থনৈতিক চিন্তাভাবনার ওপর আমি একটা বাংলা প্রবন্ধ লিখেছিলাম, সে প্রবন্ধ আর এক বিশাল জাতীয় নেতা নানাজি দেশমুখ ইংরাজি ও হিন্দিতে ছাপিয়েছিলেন। গুরুজি গোলওয়ালকার, যিনি সম্ভবত আর এস এস ও পরবর্তীকালে বিজেপির উত্থানের জন্যে সবচাইতে বড় ড্রাইভিং ফোর্স, তিনি আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন জিতেন্দ্রজির ছেলে বলে।

এসব কথা বলার উদ্দেশ্য নিজের ঢাক পেটানো নয়। আমার মত ছাত্র, যে আবার আর এস এসের এক্টিভিস্ট শৈশব থেকে, যার বাবা ও কাকা দুজনে সংঘের প্রচারক ছিলেন, এমন ছেলে পশ্চিমবঙ্গে বোধহয় সেই সময়ে ওদের আর কেউ ছিল না। আমার দু একজন বন্ধু পুরনো বন্ধু, যারা সেই সময় থেকে আমাকে চেনে, তারা বলে, “কী করলি রে তুই! এখন ওদের সঙ্গে থাকলে এট লিস্ট একটা জুনিয়র মিনিস্টার হতিস দিল্লিতে।”

প্রকৃত অর্থেই ভারতবর্ষ কাঁপানো দক্ষিণপন্থী আর এস এস তাত্ত্বিক ও সুপ্রিম নেতা "গুরুজি" এম এস গোলওয়ালকার।  ধরা যাক নকশালপন্থীদের যেমন চারু মজুমদার। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন।  আমার সঙ্গে কথা বলেছেন কয়েকবার। সে সময়ে এঁর মত নেতার কাছে যেতে পারাটাই বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার ছিল। "জিতেন্দ্রজি কা লেড়কা" হবার সুবাদে আমার সেই সুযোগ হয়েছিল।
প্রকৃত অর্থেই ভারতবর্ষ কাঁপানো দক্ষিণপন্থী আর এস এস তাত্ত্বিক ও সুপ্রিম নেতা “গুরুজি” এম এস গোলওয়ালকার। ধরা যাক নকশালপন্থীদের যেমন চারু মজুমদার। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। আমার সঙ্গে কথা বলেছেন কয়েকবার। সে সময়ে এঁর মত নেতার কাছে যেতে পারাটাই বিরাট ভাগ্যের ব্যাপার ছিল। “জিতেন্দ্রজি কা লেড়কা” হবার সুবাদে আমার সেই সুযোগ হয়েছিল।

ওদের বাঁশবনে আমি ছিলাম সত্যিই এক শেয়ালরাজা। তবে, “সবাই অতি সাধারণ,” “মাথামোটা,” বাঙালিদের কাছে এটাও তাদের এলিটিজমের একটা অঙ্গ। সবাইকে বোকা ইত্যাদি বলে আত্মতৃপ্তি লাভ করা। আর তা ছাড়া, বিপদে আপদে এই মাথামোটাদের’ই আগে পাশে এসে দাঁড়াতে দেখেছি, ইন্টেলেকচুয়ালদের দেখেছি অদৃশ্য হয়ে যেতে। আজ-যে পশ্চিমবঙ্গে এবং পূর্ববঙ্গে সাম্প্রদায়িক ও “মগজবিহীন” আর এস এস-বিজেপি এবং জামাত ইসলামিদের এত রমরমা, তার একটা কারণ দুঃখে-বিপদে, প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে মানুষের পাশে থাকা। বামপন্থীরা এবং তাদের বিদগ্ধ ইন্টেলেকচুয়ালরা তাদের বহু আত্মত্যাগে তৈরি করা নিজেদের শক্ত ঘাঁটি বাংলা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। কারণ তাদের আকাশচুম্বী অহঙ্কার তাদের সাধারণ মানুষ ও তার সুখদুঃখ থেকে আলাদা করে দিয়েছে। মমতা ব্যানার্জী ও তাঁর অনুব্রত-তাপস পাল-আরাবুল বাহিনীর এই ধূমকেতুর মত উত্থান ও লাঙ্গুল আন্দোলনও বামপন্থীদের এলিটিজম ও সমাজবিচ্ছিন্নতার ফল। এবং, ভীষণ হিংসার রাজনীতি। যাক, সে আলোচনা পরে বিশদভাবে করা যাবে।

বাড়ির ভেতর ফিরে যাই আর একবার। অতিথি নারায়ণ। দূর সম্পর্কের মাসি, পিসি, কাকা, দাদু—এত লোক আসত আমাদের ছোট্ট ভাড়াকরা ফ্ল্যাটে যে মাঝে মাঝে পড়াশোনার বেশ অসুবিধে হত। কিন্তু, বাবা আর মা দুজনেই লোকজন পছন্দ করত, আর কেউ এলে কখনো মুখ ভার করতে দেখি নি। যদিও, পরীক্ষার সময়ে কেউ হঠাৎ এসে পড়লে মা তাকে তাড়াতাড়ি বিদায় করে দিত। আর, মার রান্নার খ্যাতি আত্মীয় ও বন্ধুমহলে এত বেশি ছড়িয়ে পড়েছিল যে সন্ধের পর, আর রবিবার, রুটি-পরোটা আর গরমকালে পটল আর শীতকালে কপির ডালনা খাওয়ার লোভে অনেকেই এসে হাজির হত। “বৌমা, তোমার রান্নার লোভে এসে পড়লাম, হে হে।” স্ট্র্যান্ড রোড স্টেট ব্যাঙ্কে কাজ করে হাওড়ার বালিতে বাড়ি ফিরে যাবার আগে আমার এক দাদু, মানে বাবার ছোটকাকা, রাস্তা ঘুরে আমাদের মানিকতলায় এসে হাজির। বৌমা তো খুব খুশি। “আসুন ছোটকাকা।” চা এলো, তারপর যথারীতি রুটি-পরোটা। বাবা খুব বেশি খুশি না হলেও অখুশি নয়। যদিও অনেক বাজে বকতে হবে এখন। দু একজন আত্মীয় ছিল, তাদের অবস্থা আমাদের থেকেও করুণ। তারা আসা মানেই ধার চাইবে। দুপুরবেলা মার কাছে এসে ধার চাইবে মার দুরসম্পর্কের কোনো বোন বা দিদি ন্যাকা ন্যাকা কথা বলে আর নাকে কান্না কেঁদে, আর সন্ধের পর এলে বাবার দিকের কেউ। আর, সে ধার শোধ হবে না জীবনেও। কিংবা, অন্যরকম দু একজন মানুষ। “বৌমা, আজ তোমার হাতের ঝিঙেপোস্ত না খেয়ে যাচ্ছি না।” জুন মাসের প্রচণ্ড গরমে রবিবার দুপুরবেলা এসে হাজির বাবার আর এস এসের সহকর্মী, প্রচারক রামদা, রামপ্রসাদ দাস। বাবা এবার আরো খুশি। “দাও রামদাকে ভালো করে খাইয়ে দাও। আবার বাঁকুড়া না বীরভুম কোথায় চলে যাবে। খেতে পাবে না ভালো করে কত দিন!”

সেই ঝিঙেপোস্তর গন্ধ এখনো যেন পাই মাঝে মাঝে, স্বপ্নের মধ্যে। রামপ্রসাদ দাস, রামজেঠু, খুব কম বয়েসে হঠাৎ মারা গেলেন সেই বাঁকুড়া না বর্ধমানেই, জনসংঘের হোলটাইমার থাকতে থাকতেই। বোধহয় সেই প্রথম আমার শ্মশানযাত্রী হওয়া।

আর এস এস শাখায় গৈরিক পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে মিলিটারি স্টাইলে কঠোর অনুশাসন, মার্চ, ইত্যাদি শেখা প্রতিদিন এক ঘণ্টা ধরে শেখা হত।  একটু খেলা, একটু কুচকাওয়াজ, একটু গান, একটু তত্ত্বের আলোচনা, আর সবশেষে সংস্কৃত প্রার্থনা। অনেকেরই কোনো ধারণা নেই আর এস এস বা জামাত আসলে কীভাবে তাদের শক্তি সংগ্রহ করে। বাইরে থেকে দেখলে এদের সাইকলজিকাল মেন্টরিং কেউ বুঝবে না।
আর এস এস শাখায় গৈরিক পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে মিলিটারি স্টাইলে কঠোর অনুশাসন, মার্চ, ইত্যাদি শেখা প্রতিদিন এক ঘণ্টা ধরে শেখা হত। একটু খেলা, একটু কুচকাওয়াজ, একটু গান, একটু তত্ত্বের আলোচনা, আর সবশেষে সংস্কৃত প্রার্থনা। অনেকেরই কোনো ধারণা নেই আর এস এস বা জামাত আসলে কীভাবে তাদের শক্তি সংগ্রহ করে। বাইরে থেকে দেখলে এদের সাইকলজিকাল মেন্টরিং কেউ বুঝবে না।

আমার বন্ধুরাও শিশু নারায়ণ। বালক নারায়ণ। বিচ্ছু নারায়ণ। তাদের মাসিমা সব সময়েই তাদের খাওয়ানোর জন্যে রেডি। বাবুয়ার বন্ধু বলে কথা! অথচ এদিকে আমরা নিজেরাই কোনদিন একবেলার বেশি মাছ খাই নি, তাও তখনকার দিনে জিনিসপত্র হাজারগুণে সস্তা ছিল। মাসে একদিনের বেশি মাংস কখনো আসে নি আমাদের বাড়ি (বাবার অফিসের মাইনে পাবার পর প্রথম রবিবার একদিন পাঁঠার মাংস হত)। আর ডিমের ডালনা হলে মাঝখান থেকে কেটে আদ্ধেকটা ভাগে পড়ত এক এক জনের। তাও, আমাদের বাড়িতে সর্বদাই অন্যদের খাওয়ানো চলছে। আসল ব্যাপার যেটা কখনো খোঁজ নিই নি সেটা হলো, মা নিজের খাবার থেকে ওদের দিয়ে দিত অনেককেই। নিজে প্রায় খেত না বললেই চলে। আমার এখনো মনে আছে, বাবার একটা খয়েরি রঙের ডায়রি ছিল, তাতে বাবা দরকারি কথা লিখে রাখত। একবার তাতে লেখা হলো, “মা আজিকে তিনটি লুচি খাইয়াছেন।” মানে, সেটা একটা রেকর্ড। অনেক দিন পর্যন্ত এই নিয়ে আমাদের হাসাহাসি হত বাড়িতে।

স্কটিশে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে বাড়িতে গান খুব গাওয়া হত। মানে, ইনফরমালি। গুরু বা মাস্টারমশাই রেখে, বা স্কুলে পাঠিয়ে গান শেখানোর মত অবস্থা আমাদের ছিল না তখন। বাবা আর এস এস করে গান্ধিহত্যার পর তিন বছর জেলে। জেল থেকে বেরিয়ে এসে নেহেরু সরকারের ব্ল্যাকলিস্টে। সরকারি চাকরির রাস্তা চিরকালের জন্যে বন্ধ। বেসরকারি জায়গাতেও একটু জানাজানি হয়ে গেলেই ব্যাস। কলকাতায় বাবাকে পাঠিয়ে দিল তৎকালীন আর এস এস নেতারা জনসংঘের নতুন অফিসে কাজ করার জন্যে। বাবা তখন আর এস এসের প্রচারক, মানে হোল টাইমার। ঊনিশশো একান্ন থেকে চুয়ান্ন পর্যন্ত বাবা বাংলায় প্রচারকের কাজ করার পর কৌমার্যব্রত ত্যাগ করে সংসারী হল। শুনেছি, মার সঙ্গে বাবার দেখা হয়েছিল বড়মামার মাধ্যমে। বড়মামা বিশ্বনাথও কীভাবে যেন সে সময়ে সংঘে গিয়ে জুটেছিল। বিশ্বনাথ ভটচাজ গান গাইত, আর আমার আর এক মামা সোমনাথ গান লিখত। পৃথার সঙ্গে জিতেন্দ্রনাথের দেখা, এবং বিবাহ। দু বছর পরে পার্থ ধরাধামে অবতীর্ণ হলেন। তখন চাকরি দরকার। কে দেবে বাবাকে চাকরি? ওই দলেরই একজন সমর্থক গিরিশ-জি, গিরিশ ভার্গব, তাঁর কোম্পানি ট্রেড সাপ্লাই এজেন্সিতে একটা কাজ দিলেন। মাসে আড়াইশো না তিনশো টাকা বেতন। ট্যাংরা নামক অতি-দরিদ্র পল্লীতে ঘরভাড়া করে যৌথ জীবন শুরু। এবং বাড়িওলার হিংস্র ব্যবহার। সে গল্প পরে শুনেছি।

আমাদের ফোন বা ফ্রিজ ছিল না কখনো। আমাদের কোনো দুঃখও ছিল না তার জন্যে। কলকাতায় টিভি আসার দশ বছর পর আমাদের বাড়ি আসে আমি কলেজে পড়ানো শুরু করার পর। বাবার একটা সাইকেল ছিল, সেটা কলকাতায় আসবার পর পরই রাস্তা থেকে চুরি হয়ে গেল। ওই শেষ। আমি সাইকেল শিখেছি পাড়ার কার্তিকদার দোকান থেকে আধ ঘণ্টায় তিরিশ পয়সা দিয়ে ভাড়া করে। মা’কে কখনো ফোন করতে দেখি নি। খুব দরকার হলে মা আমাকে বলত তিনতলায় আমাদের বাড়িওলা চিন্ময়কাকুদের ফ্ল্যাট থেকে বাবাকে অফিসে একটা ফোন করে দিতে। চিন্ময়কাকু বা চিন্ময় শীল ছিলেন সংঘের কর্মী, বা যাদের ওরা বলে স্বয়মসেবক। তিনি ও তাঁর বাবা গদাধর শীল, আমি যাঁকে দাদু বলে ডাকতাম ছোটবেলায়, বাবাকে মাসে চল্লিশ টাকা ভাড়ায় ওই বাড়িতে থাকতে দিয়েছিলেন। জল, ইলেকট্রিসিটি ফ্রি।

উষা সেলাই মেশিন কারখানায় বাবা কাজ নিল, বোধ হয় আমি ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়ে। কিছু টাকা মাইনে বাড়ল—চারশো টাকা থেকে আটশ টাকা মাসে। সে এক বিশাল ব্যাপার।  মনে হল যেন আমরা সব বড়লোক হয়ে গেছি রাতারাতি। তিনের এ গোরাচাঁদ বসু রোড থেকে তিনের আটে উঠে এলাম আমরা।  আগে ছিল একটা ঘর, এখন হল তিনটে। তার মধ্যে আমার নিজের একটা ছোট পড়ার ঘর।  যদিও আবার সেই মেজেনাইন ফ্ল্যাট। যেটা শেষ হয়ে গেল সেটা হল শান্তি। এখানে কর্পোরেট জগৎ বাবার জীবন থেকে নিশ্বাস নেবার বাতাসটা কেড়ে নিল। সপ্তাহান্তিক ছুটি কেড়ে নিল।  আমাকে দেখাশোনা করবার, পড়ানোর সময় বাবার আর থাকল না। তারপর শুরু হল পশ্চিমবঙ্গে রক্তাক্ত রাজনৈতিক সংঘাত।
উষা সেলাই মেশিন কারখানায় বাবা কাজ নিল, বোধ হয় আমি ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়ে। কিছু টাকা মাইনে বাড়ল—চারশো টাকা থেকে আটশ টাকা মাসে। সে এক বিশাল ব্যাপার। মনে হল যেন আমরা সব বড়লোক হয়ে গেছি রাতারাতি। তিনের এ গোরাচাঁদ বসু রোড থেকে তিনের আটে উঠে এলাম আমরা। আগে ছিল একটা ঘর, এখন হল তিনটে। তার মধ্যে আমার নিজের একটা ছোট পড়ার ঘর। যদিও আবার সেই মেজেনাইন ফ্ল্যাট। যেটা শেষ হয়ে গেল সেটা হল শান্তি। এখানে কর্পোরেট জগৎ বাবার জীবন থেকে নিশ্বাস নেবার বাতাসটা কেড়ে নিল। সপ্তাহান্তিক ছুটি কেড়ে নিল। আমাকে দেখাশোনা করবার, পড়ানোর সময় বাবার আর থাকল না। তারপর শুরু হল পশ্চিমবঙ্গে রক্তাক্ত রাজনৈতিক সংঘাত।

বাবা উষা সেলাই মেশিন ফ্যাক্টরিতে কাজ নেবার আগেই অবশ্য মাকে একটা সেলাইকল কিনে দিয়েছিল, আর এখনো মনে আছে, মাসে সাত টাকা নিতেন এক মহিলা, সপ্তাহে একবার এসে মাকে কিছু হাতে করা সেলাই শিখিয়ে দিয়ে যাবার জন্যে। ওটাই ছিল আমাদের, মানে মার, একমাত্র বিলাসিতা। দুপুরে খাওয়ার পর আমি যখন স্কুলে, তখন মা সেলাই করত। ছোটখাটো কাজ। তেমন বলার মত, দেখানোর মত কিছু নয়। আমার জ্বর হয়ে বাড়ি থাকলে আমি ঘুমের মধ্যে শুনতে পেতাম মার সেলাইকলের পা-দানির শব্দ হচ্ছে, আর তার সঙ্গে কুর কুর কুর কুর হাত্চাকা ঘুরিয়ে ছুঁচ ওঠাপড়ার শব্দ।

গান শেখানোর পয়সা কোথায়? তাছাড়া, ছেলেরা আবার গান শেখে নাকি? আমি ছিলাম আমার বাবার সামন্ততান্ত্রিক, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় বেড়ে ওঠা ছেলে। অর্থাৎ, ভালো করে মাছ মাংস খেতে পাই না, কিংবা ভালো জামা প্যান্ট পরি না, হাঁটুতে খড়ি ওঠে, পাজামা আর হাওয়াই চটি পরে ফ্যাট ফ্যাট করে গলি দিয়ে হেঁটে যাই, কিন্তু তাতে কী হয়েছে? উগ্র অহঙ্কার আমার সারা গায়ে মাখানো। আমি হলাম হিন্দু ব্রাহ্মণ বাড়ির বড় ছেলে, সে যতই গরিব হই না কেন। পড়াশোনায় ভালো। ফার্স্ট-সেকেন্ড-থার্ড হই স্কুলে। আমি হিন্দু সংগঠন করি। সবাই আমাকে চেনে জিতেনদার ছেলে পার্থ বলে। বলে, “বাঁচলে পরে এ-সংসারে একটা কিছু হবে।” গান শেখার কথা কখনো মনেই হয় নি। অথচ, হওয়া উচিত ছিল। নিজের আসল স্ট্রেংথগুলো বুঝি নি, আর কেউ বুঝিয়েও দেয় নি। গান, সাহিত্য, শিল্পকলা, চলচ্চিত্র, অভিনয়, সমাজবিজ্ঞান। যেখানে আসল সম্ভাবনা ছিল, সেখানটাই ফাঁকা থেকে গেল মেন্টরিংয়ের অভাবে। বিশেষ করে গান।

কিন্তু, গান শিখছিলাম সব সময়েই। নিজের অজান্তে। সেই সময়কার কলকাতা শহর। জ্যোতিষ্কের ছটা। রেডিও ছিল সেদিনের শিক্ষক। আকাশবাণী কলকাতার একের পর এক প্রোগ্রাম। ভোরবেলায় ঘুম থেকে উঠেই প্রথমে বন্দে মাতরম, সুজলাং সুফলাং। তার পরেই “শুরু হচ্ছে ভক্তিমূলক গানের অনুষ্ঠান সঙ্গীতাঞ্জলি।” কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, অমর পাল, প্রহ্লাদ ব্রহ্মচারী। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের “তব দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে।” তারপর, “এখন শুনবেন সুবদ্ধ সঙ্গীত, শাস্ত্রীয় সংগীতের অনুষ্ঠান।” সেখানে মীরা বন্দ্যোপাধ্যায়, মণিলাল নাগ, আহমেদজান থেরাকুয়া, বাহাদুর খান, নিখিল ব্যানার্জী, বিসমিল্লা, ভি জি যোগ। তারপর, “দেশবন্দনা।” মান্না দে, সবিতা চৌধুরীর গলায় “এদেশ এদেশ আমার এদেশ, এই মাটিতেই জন্মেছি মা…,” নয়তো সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের “ভারতকন্যা জাগো,” আর নইলে সবচেয়ে ভালো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া রবীন্দ্রনাথের গান “অয়ি ভুবনমনমোহিনী।” সাতটা চল্লিশ মিনিটে রবীন্দ্রসঙ্গীত। সুচিত্রা মিত্র, দেবব্রত বিশ্বাস, সাগর সেন, ঋতু গুহ, মায়া সেন। নটার সময়ে স্কুলে যাবার তাড়া। মার তাড়া চান করতে যাবার জন্যে। খেতে বসে গরম, ধূমায়িত ভাত, তার সঙ্গে একটা ডাল, আলুভাজা, পোস্ত বাটা সর্ষের তেল দিয়ে। আর কপালে থাকলে একটুকরো মাছ। ক্লাস সিক্স থেকে দোকান বাজার আমিই করেছি প্রায় সব সময়ে। সে গল্প বলব পরে। খেতে খেতে নজরুল ইসলাম, মানবেন্দ্র মুখার্জী—”কোন কূলে আজ ভিড়ল তরী সে কোন সোনার গাঁয়ে।” “বাগিচায় বুলবুলি” শুনতে শুনতে ইস্কুলের পিঠেব্যাগ গুছিয়ে আমাদের মার্কামারা আকাশি জামা, নেভি ব্লু প্যান্ট, আর জুতো পরে রাস্তায়। জুতো মানে যেমন তেমন একজোড়া জুতো। বা, স্ট্র্যাপ দেওয়া চটি। দশটায় ফার্স্ট পিরিয়ড। পৌনে দশটায় পৌঁছতেই হবে। নইলে প্রথম দিকের আড্ডাটা মিস হয়ে যাবে।

এদিকে বাবা হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করে দিল ছ বছর বয়েসেই গোয়াবাগান পার্কে আর এস এসের শাখায়। বাবার মানসচক্ষে আমি হিন্দুরাষ্ট্রের নতুন এক কর্ণধার। তা, প্রায় আমার কর্ণ ধারণ করেই বাবা নিয়ে গেল রাষ্ট্রীয় স্বয়মসেবক সংঘের স্বয়মসেবক বানাতে। মা আর কী বলবে? সোজাসুজি প্রতিবাদ করতে কখনো দেখি নি, খুব মারাত্মক ব্যাপার না হলে। তাছাড়া, পাড়ার বখাটে ছেলেদের সঙ্গে মেশার চাইতে সংঘের ছেলেদের সঙ্গে মেশা ভালো। রকে বসে আড্ডা দেওয়া শেখার চাইতে হাডুডু, গান শেখা অনেক ভালো।

সেই বয়েসে রাজনীতি বুঝতাম না। নতুন কিছু বন্ধু হল। আর নতুন কিছু খেলাধূলো। ফুটবল নয়, ক্রিকেট নয়, হকি নয়, ব্যাডমিন্টন নয়, ভলিবল নয়। কাবাডি, লেম ম্যান বা আমাদের ভাষায় লেবম্যান, হাত ধরে ধরে মানুষের জাল, ভস্মাসুর, মিলিটারিদের মত শৃঙ্খলা। এক ঘণ্টার জমায়েত রোজ। শেষ হয়ে যাবার আগে একটা দেশাত্মবোধক গান। নতুন চেনা, অচেনা কিছু শব্দ। “ভারতবর্ষ কাদের দেশ? হিন্দুদের।” “আমরা কী করি? হিন্দু সংগঠন।” এইসব। সবশেষে সংস্কৃত প্রার্থনা: “নমস্তে সদা বৎসলে মাতৃভূমে, ত্বয়া হিন্দুভুমে সুখম বর্ধিতহম।” শিশু গ্রুপে হাতেখড়ি হল প্রথম। ওরা বলত গঠ। শিশু গঠ। তারপর প্রমোশন হবে বালক গঠে। তারপর কিশোর। তারপর তরুণ। আমি সবগুলোই ধাপে ধাপে পেরিয়েছি। গ্রুপ লিডারদের বলত গঠনায়ক। তারপর প্রমোশন হবে শিক্ষক, আর তারপর শেষ প্রমোশন মুখ্যশিক্ষক। তাও হয়েছি। সেসব কথা পরে আসবে।

এইসব করতে করতে, আর শিখতে শিখতে আমি একদিকে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-অতুলপ্রসাদ-রজনীকান্ত-মৃণাল চক্রবর্তী সুবীর সেন অখিলবন্ধু ঘোষ তালাত মাহমুদ। একটু একটু নির্মলেন্দু চৌধুরী। মুসলমান শিল্পীদের নাম কখনো তেমন শুনি নি ক্লাসিকাল জগতের বাইরে। বাংলাদেশ, বা তখন যা পূর্ব পাকিস্তান, সেখান থেকে কোনো গান আমাদের দিকে ভেসে আসে নি একাত্তর পর্যন্ত। লালনের নাম শুনি নি কখনো। ভাষা আন্দোলনের কথা কেউ বলে নি। আমাদের কলকাতার আনন্দবাজার, যুগান্তর বা বসুমতী কাগজে এসব কথা কখনো পড়ি নি। জীবনানন্দের নাম শুনি নি আমাদের বাড়িতে কোনদিন।

এই ছিল আমার শৈশব, কৈশোর। ষাটের দশক।

আর অন্যদিকে মনের ভেতরে উগ্র জাতীয়তাবাদিতা। চেতনার রঙ বদলে যাচ্ছিল। নিজের অচেতনে। এনালিসিস না শিখে শিখছিলাম অনুশাসন। বাঙালির কোমলতা, নমনীয়তা, প্রেমের জায়গা দখল করে বসছিল কঠোরতা, ক্রুরতা, শত্রুর সন্ধান চতুর্দিকে।

কিন্তু বাইরে থেকে কারুর বোঝার উপায় নেই। আমিও বুঝি নি সেসব। বাইরে থেকে আমি সেই বোকা বোকা, নরম নরম, হাসিখুশি পার্থ। ডাক নাম বাবুয়া। পাড়ার বন্ধুরা জানে ছেলেটা লেখাপড়ায় ভালো। আবার ভালো ক্রিকেট ফুটবল খেলে। ভালো ক্যারম খেলে। আর এস এস শাখার বন্ধুরা জানে, জিতেনদার ছেলে বাবুয়া। পার্থ। নেতা নেতা। ভালো সংগঠক। গান গায় ভালো। সবাই জানে, উঠবে ছেলেটা অনেক দূর।

একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটল ক্লাস ফোরে। এক বর্ষার দিনে পেছনের কম্পাউন্ডে স্কুল শুরু হওয়ার ঠিক আগে, যখন বৃষ্টির জন্যে পিছন দিকটা ফাঁকা ফাঁকা, তখন আমার সঙ্গে এক সহপাঠীর একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়ে গেল। চঞ্চল আহমেদ। বাঙালি মুসলমান। বৃষ্টি পড়ছে ঝির ঝির করে, আর আমাদের দুজনের হাতেই ছাতা। তখনকার দিনের ছাতা, বাঁশের ছাতায় লোহার শিক। আমি হঠাৎ আমার খোলা শিক সহপাঠির ছাতায় ঢুকিয়ে দিলাম, এবং তাতে বিরাট ফুটো করে দিলাম। এমন আকস্মিকভাবে ঘটনাটা ঘটল-যে সে সম্পূর্ণ হতচকিত, ভয়ার্তভাবে তাকিয়ে রইল। তখনকার দিনে একটা ছাতা নষ্ট হয়ে গেলে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত বাড়ির পক্ষে একটা বড় রকমের আর্থিক ক্ষতি হয়ে যেত।

আমার কোনো দুঃখ হয় নি। ভয়ও পাই নি। আমার যুক্তি ছিল, ও আমাকে গালাগালি দিয়েছে, এবং আমি তার উপযুক্ত শাস্তিই দিয়েছি। যদি গালাগালি চঞ্চল দিয়েছিল কিনা, সেটা এখন আর মনে করতে পারছি না। এমনও হতে পারে, সেটাও আমার কল্পনাপ্রসূত।

মনে মনে জানতাম কেন আমি ওর এত বড় একটা ক্ষতি করে দিলাম বর্ষার দিনে। কারণ, ওর নাম চঞ্চল আহমেদ। মুসলমান। পড়াশোনায় অগা। ফেল করতে করতে পাশ। ও আবার একটা ছেলে? যদিও চঞ্চল রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে স্কুলের পুরস্কার পেয়েছিল সে বছর। কিন্তু তারপর বোধহয় পাশ করতে না পেরে কোথায় হারিয়ে গেল। বড়বাড়িতে যাবার পর ওকে আর কখনো দেখি নি।

“মার শালাকে।” মনে মনে বলেছিলাম ওকে, হয়তো। নয়, ওই রকম একটা কিছু খারাপ শব্দ। শালা শব্দটা আমাদের বাড়িতে একেবারে টোটালি নিষিদ্ধ ছিল। কোনদিন শুনি নি শালা-বানচোত। মানে, শুনেছি রাস্তায়, কিন্তু শুনি নি। মুখ দিয়ে বেরোত না কখনো।

চঞ্চল লেখাপড়ায় ভালো ছিল না। কিন্তু ওর মধ্যে হৃদয় ছিল। ও কারুকে বলে নি। জানি না কেন বলে নি। হয়ত ভেবেছিল, ওর কথা কেউ বিশ্বাস করবে না। হয়ত, আমাদের কাছে ও এরকম ব্যবহার পেয়ে পেয়ে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। ও পড়াশোনায় ভালো না। আমরা ভালো। নাকি, ভেবেছিল, ও মুসলমান, আমরা হিন্দু।

কোনোদিন জানতে পারব না আর।

আমিও কারুকে বলি নি কখনো। বাড়িতেও নয়। অন্য বন্ধুদেরও নয়। বলে থাকলেও দু একজন অতি কাছের বন্ধু, যেমন উৎপল, অসীম?

কে জানে! আজ আর মনে নেই। যদি কখনো দেখা হয় চঞ্চলের সঙ্গে, ক্ষমা চেয়ে নেব ঠিক করে রেখেছি। একটা ছাতার দামও দিয়ে দেব ভাবছি।

অপমানের দাম শোধ করার ক্ষমতা আমার নেই।

(কিস্তি ৬)

More from পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘটিকাহিনী (৩২)

বাংলাদেশের, কলকাতার প্রতিটা ইট-পাথর আমার কাছে পবিত্র।... তোমরা সবাই আমার নিজের লোক,...
Read More