ঘটিকাহিনী (৬)

মাধু ছিল আমাদের গলিতেই শেষের দিকে একটা ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকা আমার দুই বন্ধু বাবু আর বুড়োর ছোট বোন।

(আগের পর্ব)

প্রেম ও অপ্রেম

মাধু।

কে জানে সে এখন কোথায়! কার ঘর করছে, স্ত্রী, জননী হয়ে সুখে জীবন কাটাচ্ছে।

(একটু বেশি দেবদাস টাইপ হয়ে গেল কথাটা। জানি। তাও বললাম। আমি না বললে আর কে বলবে?)

আমারি মত মিড ফিফটিস সেও এখন। দু তিন বছরের ছোট।

শুনেছিলাম কার কাছে, মাধু এখন স্কটল্যান্ডে থাকে। গ্লাসগো। জানি না, এ-খবর সত্যি কিনা। কারণ, কলকাতায় এত উড়ো খবর আসে উড়ো সোর্স থেকে, যে সেসব ঠিক বিশ্বাস করা যায় না। যারা এ-খবর দিয়েছিল, তাদের জ্ঞান, সৎবুদ্ধি ও বিশ্বাসযোগ্যতা খুব একটা বেশি ছিল না। কিন্তু তাদের বদবুদ্ধি ছিল আমাকে এক হাটে কিনে আর এক হাটে বেচে দেবার। তারা জানত, এই ছেলেটা এত বেশি সেন্টিমেন্টাল ও গালিবল-যে একে বাংলায় যাকে বলে টুপি পরাতে সাড়ে তিন মিনিটের বেশি লাগবে না। একটু সুরসুড়ি দিয়ে দে একে, একেবারে শুয়ে পড়বে।

কিন্তু তারা আসল খবর রাখত। এবং জানত কোন খবরটা কীভাবে কোথায় দিতে হবে, কতটা দিতে হবে। কোন খবরটা চেপে যেতে হবে। এসব ছেলেরা ছিল বেশির ভাগই বিজনেস ফ্যামিলির। হয় নিজেদের কোনো পারিবারিক ব্যবসা ছিল, আর নয়তো অন্য কোনো লোকেদের ব্যবসায় কাজ করত তারা। হয়ত হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় ঝাড় খেয়ে একটা ইলেকট্রিকের ছোটখাটো কাজ করার ব্যবসা ফেঁদে বসল। পাড়ার কালিপুজো, বা বিয়েবাড়ি বা শ্রাদ্ধবাড়িতে “লাইটিং” করছে। বা, কেরোসিন তেলের দোকান খুলে বসল একটা, কোনভাবে একটা ডিলারশিপ লাইসেন্স যোগাড় করে।

আমি সব সময়েই দেখে এসেছি-যে বাস্তববুদ্ধি আর রাস্তায় কান পাতলে যেসব খবর পাওয়া যায়, সেসবে তাদের সঙ্গে আমরা কখনো পাল্লা দিতে পারব না। আমরা মানে লেখাপড়ায় ভাল, কেরানিকুলসম্ভূত অথবা অন্য কোনো চাকুরিজীবী পরিবারের ছেলেরা, বা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার ঘরের ছেলেরা।

আমরা মনে করতাম আমরা অনেক কিছু জানি, যেহেতু আমরা লেখাপড়ায় ভাল আর ওরা গাড্ডু। যেহেতু আমরা কয়েকটা বই পড়েছি আর ওরা পড়ে নি। যেহেতু আমরা দুচারটে অঙ্কের ফর্মুলা জানি, পিথাগোরাস থিওরেম জানি, ইংরিজি পরীক্ষাতে একশর মধ্যে সত্তর পঁচাত্তর পাই আর ওরা পাশ করতে পারে না, আমরা স্কটিশের বন্ধুদের সঙ্গে “ম্যাপ পয়েন্টিং” খেলি, আর পাতন শব্দের সঙ্গে পতনের সমোচ্চারিত ভিন্নার্থক বিশ্লেষণটা এক সেকেন্ডে বলে দিতে পারি। কিন্তু, বরাবরই দেখে এসেছি, বাস্তব জীবনের খুঁটিনাটি আর লড়াই করার জন্যে যে ধরনের প্র্যাকটিকাল নলেজ লাগে, তাতে ওরা আমাদের মত “ভাল ছেলেদের” থেকে অনেক, অনেক এগিয়ে। ওরা আমাদের নিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করত, আড়ালে। আমাদের দেশে পিএনপিসি বলে যে শব্দটা আছে, সেটা আমাদের পাড়ার অলিতে গলিতে, রকে বারান্দায় আমি ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি। আমাদের মত তথাকথিত ভাল ছেলেদের নিয়ে এই সব ছেলেরা চব্বিশ ঘণ্টা তামাশা করত। আর মেয়েদের নিয়ে তো কথাই নেই।

আবার, আমি যেহেতু সবার সঙ্গে মিশতাম, তাই আমার ওপর একটু সফট কর্নারও ছিল। থাকার জন্যে পরে খুন হয়ে যাই নি, কিডন্যাপড হয়ে যাই নি।

ছোটমামা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
ছোটমামা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। অসাধারণ প্রতিভা রাজনৈতিক সংগঠনে, বাগ্মীতায়, আবৃত্তিকার ও নাট্যশিল্পী হিসেবে। উত্তর কলকাতার এঁদো গলি হরিতকী বাগান লেন থেকে উঠে আসা উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। সে সময়ে ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসের সবার প্রিয় যুবক ও শ্রমিক নেতা। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়েসে কে বা কারা বুদ্ধদেবকে রাত নটা নাগাদ তার কলকাতার অফিস স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডে গুলি করে মেরে রেখে গেল। কোনো তেমন তদন্তও হল না। কেউ জানতেও পারল না ঠিক কী হয়েছিল। কংগ্রেসের গোষ্ঠিদ্বন্দের শিকার হল এক আশ্চর্য ছেলের, যে স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিল। – লেখক

বিশেষ করে আমি ছেলেবয়েসে খুব বেশি সরল ছিলাম। সরল না বলে গাড়ল বলাই বোধহয় ঠিক হবে। মেয়েদের মত সরু কণ্ঠস্বর, দুর্বল গড়ন। আমার কোনো দাদা ছিল না, কোনো রোল মডেল ছিল না, রাস্তার ধুলো কোন রাস্তায় কেমন খেতে, তা বুঝিয়ে দেবারও কেউ ছিল না। বাবা কলকাতায় বড় হয় নি, এবং এসেছে এ-শহরে ছাত্রজীবন কাটিয়ে। কলকাতার গলিঘুঁজির খবর, নালানর্দমার খবর বাবার জানা ছিল না। বাবার কোনো ধারণাই ছিল না কাশীর সঙ্গে কলকাতার কী আকাশপাতাল তফাৎ। তার ওপর, বিবাহিত জীবনেও বাবার ফার্স্ট প্রায়োরিটি ছিল আর এস এস ও জনসংঘ। যদিও মার প্রতি, আর আমার প্রতি, ভালবাসা, স্নেহমমতা ও কর্তব্যে বাবার কোনো ঘাটতি ছিল না। কিন্তু, তার পরেও উত্তর কলকাতার এঁদো গলিতে একটা অল্পবয়েসী ছেলে একা বড় হচ্ছে, তার-যে কত রকমের বিপদ হতে পারে, কত রকম ফাঁদে সে পড়তে পারে, এবং তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাবার সদা-সতর্ক দৃষ্টি থাকা-যে কতখানি দরকার, সেটা জিতেন্দ্রনাথ ঠিকমত বোঝেন নি।

বড় ফ্যামিলিতে বড় হওয়া, দিদি ও দাদাদের মধ্যে বেড়ে ওঠা ছোট শহরের একটা ছেলে আর নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে একা একা বড় হওয়া উত্তর কলকাতার নিম্নবিত্ত পাড়ার একটা দশ বারো বয়েসের ছেলের বয়ঃসন্ধির যে কী বিরাট পার্থক্য, সে ধারণা জিতেন্দ্রনাথের ছিল না। তিনি ভেবেছিলেন, কাশীর জঙ্গমবাড়ি শাখার মতই কলকাতার গোয়াবাগান শাখায় আর এস এসের তত্ত্বাবধানে ছেলেকে ছেড়ে দিলেই আর কোনো সমস্যা হবে না। সঙ্ঘের পরিবেশ আর অনুশাসনই ছেলেকে খারাপ রাস্তায় চলে যাওয়া থেকে বাঁচাবে। জিতেন্দ্রনাথ যদি জানতেন, এই আর এস এসের এক ধরনের ছেলে শাখার বাইরে কী সব কীর্তি করে বেড়াত! বলব সে গল্প পরে।

জিতেন্দ্রনাথ এখন যেমন।  ২০১৪ সালে জিতেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি নব্বই বছর পূর্ণ করলেন।  শরীর যদিও অশক্ত হয়ে পড়েছে, কিন্তু মন এখনো সেই ঠিক আগের মতই সজাগ।  কঠিন।  স্মৃতি এখনো মোটামুটি প্রখর। বই পড়া, সংবাদপত্র মন দিয়ে পড়া এখনো তাঁর প্রিয়। বিজেপি ও আর এস এসের সাম্প্রতিক ধুমকেতুর মত উত্থানে আনন্দিত। পুরোনো সহকর্মীরা মাঝে মাঝে দেখা করতে আসে। - লেখক
জিতেন্দ্রনাথ এখন যেমন। ২০১৪ সালে জিতেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি নব্বই বছর পূর্ণ করলেন। শরীর যদিও অশক্ত হয়ে পড়েছে, কিন্তু মন এখনো সেই ঠিক আগের মতই সজাগ। কঠিন। স্মৃতি এখনো মোটামুটি প্রখর। বই পড়া, সংবাদপত্র মন দিয়ে পড়া এখনো তাঁর প্রিয়। বিজেপি ও আর এস এসের সাম্প্রতিক ধুমকেতুর মত উত্থানে আনন্দিত। পুরোনো সহকর্মীরা মাঝে মাঝে দেখা করতে আসে। – লেখক

আমার খবর, আমার বেড়ে ওঠার ক্রাইসিসের খবর একটু একটু জানত আমার মামার বাড়ির লোকেরা। আমাকে হয়ত একটু মেন্টর করতে পারত আমার ছোটমামা বুদ্ধদেব, যে আমার থেকে আট-ন বছরের বড় ছিল। মানে, আমি যখন দশ বছরের, আর ক্লাস ফাইভে পড়ার জন্যে স্কটিশের ছোটবাড়ি থেকে বড়বাড়িতে এসেছি, তখন ছোটমামা ম্যাট্রিক পাশ করে প্রি-ইউনিভার্সিটি পড়ছে। কিন্তু, একে-তো ওরা ছিল ভীষণ গরীব, মানে এত গরীব-যে আক্ষরিক অর্থে তখন ওদের খাওয়া জোটে না দুবেলা। আর বাবার সঙ্গে ওদের একটা অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি হয়ে গেছিল। কারণ বাবা হল ওদের বাড়ির জামাই। দিদি-জামাইবাবুর বাড়িতে যখন-তখন আসা-যাওয়া ভালো দেখায় না। আর, আমার বাবা শ্বশুরবাড়ির লোকেদের কাছে টেনে নেওয়ার তেমন কোনো চেষ্টাও করে নি কখনো। বিপদে-আপদে ওদের সাহায্য করেছে সবসময়ে। কিন্তু দূর থেকে।

বাবার মধ্যে কোমলতা জিনিসটা কম ছিল। মানে, ভেতরে ছিল, কিন্তু বাইরে থেকে তার কোনো প্রকাশ দেখতে পাওয়া যেত না। একটা কাঠিন্য ছিল। এরোগ্যানস ছিল। হয়ত বাংলাদেশের বাইরে বড় হওয়ার জন্যে বাবা বাংলার মাটির রস, বাঙালির হৃদয়বৃত্তি এসব ব্যাপার ঠিকমত ধরতে পারে নি কখনো। এই কাঠিন্য এক ধরনের অতি-পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে, বা রক্ষণশীলতা থেকে আসে। বাবা-কাকাদের চিরকালই আমি এই রকম কঠিন আবরণে মোড়াই দেখে এসেছি। কারুকে বুকে টেনে নেওয়া, বা জড়িয়ে ধরা, মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া, হাতটা টেনে নিয়ে কাছে বসানো, বা গালে একটা স্নেহচুম্বন—এসব জিনিস আমি দেখেছি আমার মামার বাড়িতে। মায়ের দিকে। এবং অনেক পরে আমার বউয়ের বাড়ির দিকে। বাবার দিকে নয়। অবশ্য আমার বড় জেঠু বীরেন্দ্রনাথ ও মেজজেঠু সুরেন্দ্রনাথ একটু অন্য ধরনের ছিলেন। আমার ছোটকাকু দীপেন্দ্রনাথও অনেক বেশি হাসিখুশি ছিলেন। কিন্তু তাও, বাঙালিসুলভ কোমলতা ওদের মধ্যেও দেখি নি তেমন।

একমাত্র মেজজেঠু সুরেন্দ্রনাথ প্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থক ছিলেন, কাশীতে বসেই বন্ধুদের দিয়ে কলকাতা থেকে গল্প-উপন্যাসের বই আনাতেন, এবং প্রবাসী বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাঙালি ছিলেন। আমার সেজপিসি সন্ধ্যার স্বামী ছিলেন বিমল চক্রবর্তী। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক বাঙালি—হাসি মস্করা, ঠাট্টা তামাশা, মজার মজার কথা তাঁদের কালিঘাটের বাড়িতে সবসময়ে হত। এই পিসেমশাই আবার মেজজেঠুর বন্ধুস্থানীয় ছিলেন মনের মিল থাকার জন্যে। সেই মিলটা এসেছিল বাঙালি উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির জন্যে। এঁদের দুজনেরই কাছের মানুষ ছিলেন আমার আর এক পিসেমশাই ডাক্তার শিবপ্রসাদ ঘোষাল, কলকাতার বিখ্যাত চাইল্ড স্পেশালিস্ট। এঁরা সকলেই বামপন্থী রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন, এবং অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক ছিলেন।

কিন্তু বাবা আর ঠিক পরের ভাই আমার ভালকাকু রমেন্দ্রনাথ দুজনেই আর এস এসের হার্ডকোর কর্মী ও প্রচারক। এবং এই দুজনের মধ্যেই বাইরের খোলসটা খুব রাফ। এই আমার পর্যবেক্ষণ।

সত্যি কথা বলতে, আমার মামারা, মাসিরা, আর আমার দিদিমা—এরা সকলেই বাবাকে ভয় পেত আর যথাসম্ভব এড়িয়ে চলত। কে জানে, বাবা ফস করে কাকে কী বলে দেবে। কে আর সাধ করে বাজে কথা শুনতে চায়। এই সব কারণে একটা বয়েস পর্যন্ত, মানে যখন আমার সত্যি একজন দাদাস্থানীয় মেন্টর দরকার ছিল রাস্তার আবর্জনা থেকে নিজেকে বাঁচাবার জন্যে, তখন আমি কারুকে পাই নি।

বিডন স্ট্রিটের উপর ভবতারণ সরকার স্কুল।
বিডন স্ট্রিটের উপর ভবতারণ সরকার স্কুল। পড়াশোনায় তেমন নাম না থাকলেও এই স্কুলের কর্তৃপক্ষের সক্রিয় সমর্থনে ভেতরকার খোলা আঙিনায় বছরের পর বছর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সারারাত্রিব্যাপী আসর বসেছে। আমরাও গেছি সেই আসরে। ওস্তাদ বাহাদুর খাঁয়ের সরোদ। জয়া বিশ্বাসের সেতার। ভোলা যায় না। – লেখক

শৈশব, বাল্য ও কিশোর বয়েসে অনেকেই আমার সরলতার সুযোগ নিয়েছে। ছেলেরাই বেশি, কারণ মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগটাই খুব কম ছিল। যে পরিবেশে বড় হয়েছিলাম, সেখানে নাইনটি পার্সেন্ট ছেলেই ছিল পড়াশোনায় অগা। ক্লাস থ্রী কি ফোরেই একবার গাড্ডু খেলো, কিংবা আমাদের এ, বি, সি এমনকি ডি সেকশনেও প্রমোশন না পেয়ে গেল সেই বেত খেয়ে হাসা ছেলেদের ই সেকশনে। আর নয়ত, পড়ত সেন্ট্রাল স্কুল কি ভবতারণে। এরাও সব ছিল আমার বন্ধু। এদের প্রভাব আমার জীবনে খুব বেশি পড়েছে। খেলার বন্ধু কম বয়েসে। তারপর, একটু বড় হলে আড্ডার বন্ধু। রকের বন্ধু। পুজোর পাণ্ডাগিরি করার বন্ধু। তিন, চার কিংবা পাঁচ বছর বয়েসে বড়, এরকম বন্ধুও ছিল আমার অনেক।

এক পাড়ায় বড় হওয়ার জন্যে তাদের অনেককেই আমি নাম ধরেই চিরকাল ডেকে এসেছি। যেমন, লালু। পড়াশোনাতে গোলা, ভবতারণ সরকার স্কুলের ছেলে। কিন্তু ভাল ফুটবল খেলে, আর ঠাকুর গড়া শিখেছে নিজে নিজে। আমাদের সরস্বতী পুজোর ঠাকুর ওই তৈরি করে। আর, যত রকম কুসংস্কারে মগজ ঠাসা। গুজব ছড়ানোতে ওস্তাদ। কিংবা, শেঠদের বাড়ির দুই ছেলে চরণ ও বাদল। চরণ লালুর ক্লাসে পড়ে ভবতারণে। চক্রবর্তী বাড়ির বড় ছেলে দূর্গা, যার ডাক নাম মানা। কিংবা, ব্রহ্মদের বড়লোক বাড়ির ছেলে আশীষ। আমাদের স্কটিশের ছেলে, পড়াশোনায় ভাল, খুব ব্রাইট। নানারকম মজার কথা বলতে পারে। ডার্টি জোকসও। আমার একসময়ের খুব বন্ধু। অন্যদের কথা বলব পরে।

বিহার থেকে আসা হিন্দুস্তানি ছেলেদের একটা দল ছিল আমাদের পাড়ায়, তাদের মধ্যে একদল ছিল ভাল, যেমন নবীন আর সতীশ কানে পৈতেধারী দুই ভাই। ক্রিকেট খেলার সাথী রাজু বা রাজকুমার সাউ, বা জয়সওয়াল বাড়ির দুই ছেলে ওম পরকাশ আর রোহিত। কিন্তু তারা কোথায় পড়ত আমি জানতাম না, খোঁজ নিই নি কখনো। আর একদল ছিল বিশ্ব বখাটে। তারা পড়াশোনা আদৌ করত বলেই মনে হয় না। তাদের কাজ ছিল বাবা-কাকার লোহার ব্যবসা, ব্যাটারির ব্যবসা দেখা, আর দঙ্গল নিয়ে পাড়ার মেয়েদের বাড়ির সামনে বেলবটম প্যান্ট পরে মোটরবাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, ও নিজেদের সোনার চেন দেখানো, এরোগেন্স দেখানো। এরা কলকাতায় মধ্যবিত্ত, লেখাপড়া জানা, ভদ্র বাঙালিদের জীবন দুর্বিষহ করে দিতে শুরু করেছে সেই ষাটের দশক ও সত্তর দশকের গোড়া থেকেই। এরা ছিল কংগ্রেস পার্টির সে সময়কার উত্থানের পিছনে একটা বড় শক্তি। এদের টাকায় কংগ্রেস গুণ্ডা পুষত, পুলিশ পুষত। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে একজন কি দুজন হয়ত কংগ্রেসের হয়ে কাজ করা শুরু করল, এলাকার এম এল এ দাদার চামচাগিরি শুরু করল। এবং ক্রমে ক্রমে একটা ট্যাক্সির পার্মিট বের করে নিল, কিংবা একটা লোহার গুদামের।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, কে কোন স্কুলে পড়ল, না পরীক্ষায় কেমন রেজাল্ট করল, নাকি তার পি এইচ ডি আছে কিনা, সে কত টাকা রোজগার করে, এর ভিত্তিতে আমি কখনো কারো সঙ্গে মেলামেশা করি নি, এবং এখনো করি না। আমি এখানে বলছি একটা পার্টিকুলার টাইপের ছেলেদের কথা। তারা অনেকে বেশ অবস্থাপন্ন ঘর থেকে এসেছিল। এবং, কুসঙ্গ বলতে যা বোঝায়, তাই ছিল।

আমাদের স্কটিশে এ অথবা বি সেকশনে যে কজন পড়ত, আর আমাদের গোরাচাঁদ বসু রোড বা কারবালা ট্যাংক লেনে থাকত, তারা ছিল একটু ইন্টেলেকচুয়ালি সাউন্ড। তাদের বাড়িতে একটা শিক্ষার পরিবেশ ছিল। বাবা, মা, কিংবা দাদা-দিদির সতর্ক নজর ছিল। যেমন আমার প্রাণের বন্ধু সুব্রত। বা, ব্রহ্মবাড়ির এক খলিফা ছেলে। বা কিশোর মুখার্জী যার ডাক নাম টুকটুকি। ঘোষবাড়ির ছেলে গৌতম। সিনহা বাড়ির ছেলে স্মরজিত, যে কুড়ি বছর বয়েসে পৌঁছনোর পরেই এক দুরারোগ্য জিনঘটিত অসুখে ভুগতে আরম্ভ করল, আর তার কয়েক বছর পরেই মারা গেল। আবার পড়াশোনায় তেমন ভাল না হওয়া সত্ত্বেও সদাহাস্যময়, ভদ্রবাড়ির ভদ্র ছেলে তরুণ বড়াল। হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেবার পরই একদিন বাস থেকে পড়ে সেরিব্রাল হেমারেজ হয়ে মারা গেল। তরুণের বেলায় আমি দ্বিতীয়বার গেলাম শ্মশানে। সেই নিমতলা ঘাট শ্মশান, যেখানে রবীন্দ্রনাথকে দাহ করা হয়েছিল।

গাঙ্গুলিবাড়ির প্রবীর বা অমল। পড়াশোনায় তেমন সাংঘাতিক ভাল কিছু না, কিন্তু ডিসেন্ট ফ্যামিলি। কখনো একটা বাজে কথা বলতে শুনি নি। আমাদের সামনের বাড়ির চন্দনদা। ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। স্কটিশের স্বর্ণযুগের শেষ দিকে যারা মারাত্মক ভাল রেজাল্ট করেছিল, তাদের একজন। হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় অঙ্কে দুশোর মধ্যে একশ ছিয়ানব্বই। কিন্তু এসব ছেলের সংখ্যাও ছিল কম, আর তারা আমার মত সবায়ের সঙ্গে কাছা খুলে মেলামেশা, খেলাধুলোও করত না, আড্ডাও দিত না। ফলে, ক্লাস ফাইভেই প্রেমে পড়া, বা যৌনতা সম্পর্কে একটা নিষিদ্ধ, গা-শিরশির-করা উৎসাহ, আর বাস্তবতা, কঠোরতার মুখোমুখি হয়ে সেই নরম মনের বয়েসেই ভীষণ শক পাওয়ার অভিজ্ঞতাও তাদের ছিল না।

আবার, এই স্কটিশের “ভাল ছেলেদের” মধ্যে এমন কয়েকজন ছিল, যারা ছিল একেবারে ভিশাস। তারা সর্বপ্রকার খারাপ কাজ জানত একেবারে ছেলেবেলা থেকে, এবং জানত, আমাদের মত দুচারটে বোকা-গাড়লকে ফাঁসিয়ে দিয়ে কীভাবে সরে পড়তে হয়। এদের পাল্লায় পড়ে অন্যরা গোল্লায় গেছে, আর আমিও যেতে বসেছিলাম। যৌনতার বিষয়ে অশিক্ষা তার একটা কারণ।

অবশ্য, আমার কোনো সিরিয়াস যৌন অভিজ্ঞতা ঠিক ওই বয়েসেই হয় নি। কিন্তু, মেয়েদের সম্পর্কে একটু বেশি কৌতূহল, আর আমাদের সাধারণ, মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত শহুরে বাঙালি সমাজে নিষিদ্ধ মাদকের মত নিষিদ্ধ যৌনজীবন সম্পর্কে উৎসাহ অতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছিল এসব নানা ধরনের ছেলের সঙ্গে মিশে।

খোলাখুলি কথা বলার সময় এসেছে এখন। কেউ লেখে না মনে হয় ঠিক যেভাবে গরিব পাড়ায় বাঙালি বা ভারতীয় ছেলেদের যৌনচেতনা তৈরি হয়, এবং যৌনশিক্ষার সম্পূর্ণ ভ্যাকুয়ামে তার একটা ডিপ্রেভ, বিকৃত চেহারা নেয়। আমি দেখেছি। আমি তার শিকার হয়েছি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর সমরেশ বসু আমাদের সময়ে অনেক যৌনতার কথা লিখেছেন, এবং একটু সাহায্যও করেছেন যৌনতাকে বোঝার ব্যাপারে। কিন্তু, আমি খুব কাছ থেকে যেভাবে যৌন-বিকার দেখেছি আমার চারপাশে, যে-বিকার কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ আর ভারতে এখন একটা ভয়ঙ্কর, সর্বগ্রাসী রাক্ষসের চেহারা নিয়েছে, তার সৃষ্টি ও লালনপালনের অন্ধকার গুহার ঠিকানা সুনীলদা, সমরেশ বসু বা সমরেশ মজুমদার সঠিক খোঁজ পান নি। পান নি বুদ্ধদেব বসু বা প্রতিভা বসুও।

বেসিক্যালি, মেয়েরা সেখানে ভোগের বস্তু। বেশির ভাগ ছেলে যুবতী ও কিশোরী মেয়েদের সম্ভোগের সস্তা পণ্য বলে মনে করে। একটা মেয়ে যদি গরিব ঘরে বড় হয়, আর তাকে পাহারা দেওয়ার জন্যে যদি তার দু-তিনটে মাস্তান চেহারার দাদা বা কাকা না থাকে, তার বিপদের শেষ নেই। সে মেয়েটা বড় হচ্ছে বয়ঃসন্ধি হবার সঙ্গে সঙ্গে একটা ভয়ের মধ্যে। তাকে যে কোনো ছেলে, যে কোনো বয়েসের পুরুষ, যে কোনো জায়গায় সেক্সুয়ালি মলেস্ট করতে পারে। যদি শারীরিকভাবে তাকে কষ্ট নাও দেয়, তার সম্পর্কে নোংরা কথা, অসম্মানের কথা বলতে পারে যে-কোনো সময়ে। প্রকাশ্যে, বা গোপনে। কোনো মেয়ে যদি একটু বেশি সুন্দরী হয়, তার দেহসৌন্দর্য যদি চোখে পড়ার মত হয়, তাহলে সে অটোমেটিক্যালি সম্ভোগের, বা সম্ভোগের সম্ভাবনার বস্তু। মেয়ে যদি কালো হয়, সে উপহাসের বস্তু। যদি একটু বেশি ফর্সা হয়, সে সমালোচনার বস্তু। যদি একটু স্থূলাঙ্গী হয়, তাকে সুযোগ পেলেই ধরে তার শরীর স্পর্শ করার অধিকার পাড়ার বা বেপাড়ার ছেলেদের আছে। যদি সে একটু বেশি ক্ষীণাঙ্গী হয়, তাকে নিয়ে কুৎসিত কথা বলা চলতে পারে। যদি সে পীনাঙ্গী হয়, তাহলে-তো আর কথাই নেই।

কিন্তু সেই একই মেয়ে যদি খুব ধনী বা ক্ষমতাশালী ঘর থেকে আসে, তাহলে তাকে খারাপ, কটু কথা বলার আগে এই বীরপুঙ্গবেরা কয়েকবার ভাববে। তাদের নোংরা ল্যাজ তখন তাদের পিছনের দুই নোংরা পায়ের ফাঁকে ঢুকে যাবে।

এই হল বাস্তব। আর সব কথা অবাস্তব।

পাঠকদের প্রতি সৌজন্যের খাতিরে, বিশেষত পাঠিকাদের প্রতি সম্মানবশত তাদের কথোপকথনের নমুনা এখানে পেশ করলাম না। তবে, সংক্ষিপ্তসার হল, নারীদেহের বিভিন্ন অংশের বিকৃত রুচির বর্ণনা। এবং, নিজেদের অতৃপ্ত কামনা চরিতার্থ করার তাগিদে যে কোনো প্রকারে মেয়েদের শরীর দেখার ও ছোঁবার অদম্য লিপ্সা। সে বারো বছরের বালিকাই হোক, অথবা মায়ের বয়েসী কোনো মহিলা। যৌনশিক্ষার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি এক শ্রেণীর ছেলেদের যে কীভাবে পশুতে পরিণত করতে পারে, আমি তার সাক্ষী। এরা আমাকে অন্ধকারে টেনে নিয়ে যাবার অনেক চেষ্টা করেছে।

দোলের দিন বাঁদুরে রং মেখে আমাদের এমনই দেখাতো নিশ্চয়ই।
দোলের দিন বাঁদুরে রং মেখে আমাদের এমনই দেখাতো নিশ্চয়ই। কিন্তু কেউ আমাদের ছবি তুলে রাখেনি। এখন বোধহয় রংভরা বেলুন ছোঁড়া নিষিদ্ধ হয়ে গেছে কলকাতায়। – লেখক

সামাজিক এই ব্যাধির হাজার উদাহরণ দিতে পারি আমার নিজের জীবন থেকে। আমাদের পাড়াতেই, সেই অখ্যাত গোরাচাঁদ বসু রোডের গলিতেই সেই দশ বছর বয়েসে আমি শুনেছি, পাশের বাড়ির ছাদের পাঁচিল টপকে পাড়ার কুখ্যাত গুণ্ডা টাইপের, মাচো টাইপের ছেলেরা যুবতী মেয়েদের সঙ্গে দুপুরবেলা সেক্স করে যায়। যারা সে গল্প আমাদের শুনিয়েছে, তারা এমনভাবে বলেছে সে গল্প যেন সিনেমার গল্প, আর এসব মাস্তানরা হল সিনেমার নায়ক। সেই দশ-এগারো বছর বয়েসেই আমি শুনেছি, তার ফলে কয়েকজন মেয়ে, আমাদের পাড়ারই অমুক দি, তমুক দি, চোদ্দ পনেরো ষোলো বছর বয়েসে গর্ভবতী হয়ে পড়েছে, এবং লোকলজ্জার ভয়ে হয় বাড়ির লোকেরা তাদের অন্য কোথাও পাচার করে দিয়েছে, নয়তো দ্রুত গর্ভপাতের ব্যবস্থা করেছে। মাস্তানদের কেউ ছুঁতেও পারে নি। তাদের দেখেছি, রীতিমত কলার তুলে তারা পাড়া চষে বেড়াচ্ছে। কংগ্রেস বা সিপিএম পার্টির হয়ে গুণ্ডাবাজি করছে। চাকু, গুপ্তি, সোডার বোতল, পেটোবাজি করছে। জেল খেটেছে, আবার ফিরে এসে আবার গুণ্ডাবাজি করেছে। তাদের বাড়ির লোকেরা তাদের শেল্টার দিয়েছে।

মাধুর সঙ্গে আলাপ আমার এই জটিলতার অন্ধকারে প্রবেশ করার আগে। যখন জীবনটা অনেক বেশি সহজ সুন্দর ছিল, পবিত্র ছিল। মাধু ছিল আমাদের গলিতেই শেষের দিকে একটা ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকা আমার দুই বন্ধু বাবু আর বুড়োর ছোট বোন। আমি ওদের বাড়ি কত গেছি। ক্যারম খেলেছি। রেডিওতে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের খেলার রিলে শুনেছি। চাঁদু বোরদের ব্যাটিং আর চন্দ্রশেখরের বোলিং নিয়ে কত আলোচনা করেছি।

দোলের আগের দিন ওদের বাড়ি রাত্তিরবেলা গিয়ে পরের দিন সকালের জন্যে বালতি বালতি রং দিয়ে বেলুন ভরে তৈরি করে রেখেছি। মোমের ছাঁচের ভেতর বাঁদুরে রং দিয়ে রেডি করে রেখেছি। কাদের গায়ে ছুঁড়ে মারব সেগুলো, তার মোটামুটি লিস্টও করে রেখেছি। ছোট্ট, বারোয়ারি লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতীপুজো করেছি গলিতে প্যান্ডেল খাটিয়ে। অনিচ্ছুক, সমবয়েসী কাজের ছেলেটাকে দিয়ে লুচি, আলুরদম রান্নাও করে রেখেছি। ওদের কাকার বাঙাল উচ্চারণে, হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাওয়া “তুমি ক্যামন করে গান কর হে গুণী, আমি অবাক হয়ে শুনি, ক্যাবল শুনি” শুনে মনে মনে ভীষণ হেসেছি।

ছোটবেলার বন্ধুরা। আমার বোন বুবু হবার পরে উত্তর কলকাতার হেদুয়া পার্ক বা আজাদ হিন্দ বাগে গিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল।
ছোটবেলার বন্ধুরা। আমার বোন বুবু হবার পরে উত্তর কলকাতার হেদুয়া পার্ক বা আজাদ হিন্দ বাগে গিয়ে ছবি তোলা হয়েছিল। একেবারে বাঁদিকে সেই বুড়ো, তার পাশে আমি। একেবারে ডানদিকে বাবু, আর তার পাশে লম্বা সুব্রত। তিনের এ গোরাচাঁদ বসু রোডের ফ্ল্যাটে থাকার সময়ে এরা ছিল আমার প্রাণের বন্ধু। তারপর বুড়ো হঠাৎ একটু বেশি বড় হয়ে গেল। কলকাতার রাস্তার ধূলো আমাদের সবাইকেই নোংরা করে দিয়ে গেল। তারপর বাবু ও বুড়ো হারিয়ে গেল কোথায়। – লেখক

আবার, মাসিমার রান্না করা বাঙালদের ভুনি খিচুড়িও খেয়েছি সরস্বতী পুজোর সময়ে। আমার মার সঙ্গে মাসিমার বেশ একটা ভালো সম্পর্কও ছিল।

হঠাৎ সেই আমি পাড়ায় নতুন আসা এক উৎসাহী বন্ধুর অতিরিক্ত উৎসাহমূলক প্রশ্নের উত্তরে বলে ফেললাম, আমি মাধুকে ভালবাসি। আমি ওর সঙ্গে প্রেম করতে চাই। ভালবাসি বা প্রেম শব্দটা তখন এখনকার প্রকাশ্যে সেক্স, চুম্বন বা নগ্নতার মতই ট্যাবু ছিল। ব্যাস, আর যায় কোথায়! উৎসাহদাতা এর জন্যেই অপেক্ষা করছিল। রিপোর্ট চলে গেল বাবু, ও বিশেষ করে তার উঠতি-মাস্তান ভাই বুড়োর কাছে। এবং, পরের দিন সকালে বুড়ো এসে আমাদের বাড়ি কড়া নেড়ে অতি দুর্বিনীতভাবে বাবা ও মাকে জানিয়ে দিয়ে গেল যে আমি বলেছি আমি ওর বোনের সঙ্গে প্রেম করতে চাই। এত বড় দুঃসাহস আমার! সেই বুড়ো, যার চিকেনপক্স হয়েছে শুনে দেখতে গেছিলাম ছুটে। যাকে পাশে দাঁড় করিয়ে হেদুয়া পার্কে ছবি তুলেছিলাম।

বুড়ো একরকম শাসিয়ে গেল আমার বাবাকে, “মেসোমশাই, আপনার ছেলেকে কিছু করুন। বড্ড বেড়ে যাচ্ছে। আপনি না করলে আমরাই ব্যবস্থা করব।” বা, এই ধরনের শাসানি। একটা ক্লাস ফাইভ না সিক্সের ছেলে তড়পাচ্ছে বাবার বয়েসী একজনকে।

আমার বাবা অবশ্য ভয় পাবার লোক কোনোকালেই ছিল না। বরং, এই ধরনের প্ররোচনায় বা অপমানে বাবাকে রাগে জ্বলে উঠতেই দেখেছি, এবং মাকে দেখেছি বাবার উত্তেজনা প্রশমিত করতে। মনে আছে, বাবা মার সঙ্গে একটু পরামর্শ করে বুড়োর বাবার সঙ্গে দেখা করতে গেল। তাদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল, আমি জানি না। কিন্তু জানি, এই ঘটনার পর থেকে ওদের সঙ্গে আমার বন্ধুবিচ্ছেদ হয়ে গেল। আমি আর কখনো ওদের বাড়ি যাই নি। কিছুদিন পরে কী যেন এক রহস্যজনক কারণে ওরা সব পুরো ফ্যামিলি পাততাড়ি গুটিয়ে রাতারাতি কোথায় যেন চলে গেল। আমরা অনেক খুঁজেছি তারপর, কিন্তু ওদের দেখা আর জীবনে কখনো পাই নি। সেই উৎসাহী বন্ধুর সঙ্গেই কলকাতা চষে ফেললাম বাবু-বুড়োদের খোঁজে। খোঁজ পাওয়া গেল না।

মাধুর সঙ্গে রাস্তায় দেখা হলেই ও আমার সঙ্গে কথা বলত। ওদের বাড়ি গেলেও বলত। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, যদিও খুব ছোট ছিলাম, সবে ক্লাস ফাইভ না সিক্সে পড়তাম, এবং প্রেম বা কোর্টশিপের কনসেপ্টটাই হয়ত সে-বয়েসে একেবারে হাস্যকর ছিল, ও আমাকে খুব পছন্দ করত। এমনও-তো হতে পারত, একদিন মাধুর সঙ্গে সত্যিই আমার প্রেম হত। হলে তো ভালই হত। খুব স্বাভাবিকভাবে, স্বাস্থ্যকরভাবে একটা পবিত্র সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারত।

কিন্তু তা হল না। আমি ক্ষতবিক্ষত হলাম। অপমানে, যন্ত্রণায়, শঠতায়। যে-অন্যায় করি নি, যা অন্যায়ই নয়, সেই অন্যায়ের ভয় মনকে আক্রান্ত করে ফেলল। যেন, আমি ভালবাসি, আমি প্রেম করতে চাই, এসব কথা বলা আর কখনো যাবে না। এসব কথা বলা পাপ। অপরাধ।

ওদের সঙ্গে আর একবার দেখাও হল না। মনের মধ্যে একটা গোপন, অন্ধকার গুহা তৈরি হলো। সেখানে আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা, আশঙ্কা, হতাশা, গ্লানি আর বেদনা চিরকালের মত ঘাঁটি গেড়ে বসে রইল। সে একটা বিচ্ছিরি, বিষাক্ত, এলবিনো মাকড়সার মত। সৌন্দর্যকে, স্বাভাবিক সম্পর্ককে, যৌনচেতনাকে, প্রেমকে সে তার বিষাক্ত, লোমশ টেনট্যাকলস দিয়ে অপবিত্র করে দেবেই।

“মনের জানালা ধরে উঁকি দিয়ে গেছে
যার চোখ তাকে আর মনে পড়ে না।”

সত্যিই আর মনে পড়ে না তেমন করে। স্মৃতি আর বিস্মৃতির মাঝামাঝি কোনো একটা জায়গায় কয়েকটা মুখ। কয়েকটা প্রায় ভুলে যাওয়া মানুষের ছবি।

স্কটল্যান্ড, গ্লাসগো এসব জায়গায় বসে কেউ-কি আমার লেখা পড়ছে? কে জানে!

(কিস্তি ৭)

More from পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘটিকাহিনী (২৮)

কলেজে পড়াতে শুরু করলাম। লণ্ঠনের আলো। ইলেকট্রিসিটি নেই ওখানে। জনমানবশূন্য এলাকা। একটা...
Read More