ঘটিকাহিনী (৮)

পাশের বাড়ির কার্তিকের বোন রেবু আর বাণু বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে চীৎকার করে ডাকছে, "এই দাদা, চলে আয়, ম্যাসটার এয়েচে। বাবা ডাকচে।" তারপর বলছে, "কী রে একনো এলি না? বাবা দেবে এবার।

(আগের পর্ব)

কবেকার শহরের পথে

পশ্চিম বাংলা। কলকাতা। উত্তর কলকাতা। মানিকতলা। গোয়াবাগান। হাতিবাগান। শ্যামবাজার। ষাটের দশক। সত্তরের দশক।

কতজন মানুষকে আমি চিনি? কতজনকে আমি দেখেছি? কতজনকে মনে রেখেছি?

একশো? দুশো? পাঁচশো? এক হাজার? পাঁচ হাজার? দু হাজার? ভাবলে অবাক হতে হয়! গুণে দেখি নি কখনো। এক কবির ভাষায়, “অগন্তি মানুষের ক্লান্তিমিছিল।” আর এক কবির কথায়, “জনসমুদ্রের জোয়ার।”

parthab logo

কাতারে কাতারে মানুষ। মানুষের মহামিছিল। আমাদের মেজেনাইন ফ্ল্যাটের সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে। তিনের এর রাস্তা ছোঁওয়া একচিলতে বারান্দা। তিনের আটের প্রায় রাস্তায় ঠেকে যাওয়া জানলা। ছোটবেলায় জানলায় বসে বাইরে পা ঝুলিয়ে দিতাম। প্রচণ্ড গরমের সময়ে রাত্তিরবেলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোড শেডিং। আলো নেই। পাখা নেই। হাওয়া নেই। জানলা দিয়ে মুখ বের করে বাইরে থেকে টেনে টেনে নিঃশ্বাস নেওয়া।

ভরা বর্ষা। আকাশ ফুলে ফেঁপে আছে। মুখ গোমড়া করে আছে। যে কোনো মুহূর্তেই আবার কান্না ঢেলে দেবে। রাস্তায় থৈ থৈ জমা জল। হাঁটু পর্যন্ত কাপড় তুলে মানুষ হেঁটে যাচ্ছে কষ্টে। একদিকে পাড়ার ছেলেরা ম্যানহোল খুলে রেখেছে, আর একটা বাঁশের আগায় একটা লাল রুমাল ঝুলিয়ে রেখেছে, জমা জল চলে যাবে এই আশায়। কিন্তু জল যাচ্ছে না। কর্পোরেশন জাতীয় লোকেদের টিকির দেখা নেই। গরিব বাচ্চারা সেই জমা জলেই ঝাঁপাঝাঁপি করে খেলা করছে।

নোংরা জল। নর্দমার জল। বৃষ্টির জল। তাদের কোনো ভয় নেই। কেউ তাদের কিছু বলে না। বকে না। “মা তারে তো পরায় না সাফ জামা, / ধুয়ে দিতে চায় না ধুলোবালি।” রবীন্দ্রনাথ। আমরা, মানে আমি আর সুব্রত, নয়তো আমার মাসতুতো বোন বুরু, আর ওর ভাই পল্টু, ছুটির দিন দুপুরবেলা পুরনো খবরের কাগজ ভাঁজ করে নৌকো তৈরি করে সেই জলে ওপর থেকে ছেড়ে দিচ্ছি। “ছুটি হলে রোজ ভাসাই জলে / কাগজ-নৌকাখানি। / লিখে রাখি তাতে আপনার নাম / লিখি আমাদের বাড়ি কোন্‌ গ্রাম / বড়ো বড়ো করে মোটা অক্ষরে, / যতনে লাইন টানি।” রবীন্দ্রনাথ। আমরা অবশ্য নাম টাম কিছু লিখতাম না। এমনিই ছেড়ে দিতাম জলে। এমনি নৌকো তৈরি করতাম। আবার বড় কাগজ হলে আরো একটা বেশি ভাঁজ করে পকেটঅলা নৌকো তৈরি করতাম। দু পকেট। চার পকেট, আট পকেট।

ভরা বর্ষা। উত্তর কলকাতার রাস্তায় জমা জল। তার মধ্যেই বস্তির বাচ্চাদের লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি। অনেক সময়ে খুব বেশি জল জমলে সে জল বাড়িগুলোর একতলা ভাসিয়ে নিয়ে যেত। যারা শুধু একতলায় ভাড়াটে থাকত, তারা অনেক সময়ে খাটের ওপর উঠে সারাদিন বসে থাকত। আর কিচ্ছু করার নেই। রান্নাঘর, বাথরুম জলে ডোবা। এখনো প্রায় সেই একই অবস্থা আছে। এই তিরিশ চল্লিশ বছর পরেও। মধ্য কলকাতায় আরো বেশি। ঠনঠনে কালীবাড়ি, আমহার্স্ট স্ট্রিট এসব জায়গায় কোমর জল। - লেখক
ভরা বর্ষা। উত্তর কলকাতার রাস্তায় জমা জল। তার মধ্যেই বস্তির বাচ্চাদের লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি। অনেক সময়ে খুব বেশি জল জমলে সে জল বাড়িগুলোর একতলা ভাসিয়ে নিয়ে যেত। যারা শুধু একতলায় ভাড়াটে থাকত, তারা অনেক সময়ে খাটের ওপর উঠে সারাদিন বসে থাকত। আর কিচ্ছু করার নেই। রান্নাঘর, বাথরুম জলে ডোবা। এখনো প্রায় সেই একই অবস্থা আছে। এই তিরিশ চল্লিশ বছর পরেও। মধ্য কলকাতায় আরো বেশি। ঠনঠনে কালীবাড়ি, আমহার্স্ট স্ট্রিট এসব জায়গায় কোমর জল। – লেখক

বৃষ্টি পড়ছে ঝিরঝির করে। তার মধ্যে মানুষ কালো ছাতা নিয়ে কষ্টে হেঁটে চলেছে। আমার বাবা ছাতা আর ছোট এটাচি কেস নিয়ে হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে এইমাত্র বাড়ি ফিরল। এখন নিচে কলতলায় গিয়ে পা ধুচ্ছে। মা চা বসিয়ে দিয়েছে। চা, রুটি আর আলুপটলের তরকারি গরমকালে। প্রদীপের বাবা, গোপালের বাবা, চরণ-বাদলের বাবাও একটু আগে বাড়ি ফিরল। আমাদের বাড়ির সামনের লোহালক্কড়ের কারখানার ঝাঁপ বন্ধ করে ওদের হেড মিস্ত্রী একটু আগেই চলে গেছে। জলে আমাদের বাড়ির উল্টোদিকের টিউবওয়েল আদ্ধেক ডুবে গেছে। পাশের বাড়ির দুই ভাই কনক আর সোমনাথ আজ আর জল পাম্প করে বালতি ভরতে পারবে না। জল কমতে শুরু করলে হয়ত আসবে অনেক রাতে। জল পাম্প করবে ঘটাং ঘটাং ঘট। কেন যে ওদের এত বেশি জল লাগে, কে জানে!

সন্ধে হয়ে গেছে। আজ লোড শেডিং হয় নি। এক এক দিন সব চলে যায়। পাড়া নিশ্ছিদ্র অন্ধকার হয়ে যায়। আজ হয় নি। আলো যায় নি। এসি ডিসি দুটোই আছে। ওদের ব্রহ্মদের বড়লোক বাড়িতে এসি। আর সাউদের হিন্দুস্তানি বাড়িতে। যদিও সাউদের বাড়ি কেউ পড়াশুনো করে না। তাও ওদের এসি। এসি প্রায় যায় না বললেই চলে। আমাদের ডিসি, যাকে আমরা বলি ডিসি কারেন্ট, সব সময়েই চলে যায়। আমাদের পাড়ায় বেশির ভাগ লোকেরই ডিসি কারেন্ট। টিম টিম করে বাল্ব জ্বলে। হলুদ হলুদ, নিস্তেজ তার আলো। ‘কম্বল নিরুদ্দেশ’-এ নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় যেমন বলেছেন, “রামছাগলের ঘোলাটে চোখের মত।” টিউব লাইট জ্বলে না অনেক সময়ে। আমাদের দুটো ঘরে দুটো টিউব লাইট লাগানো হয়েছে। সেগুলো জ্বালাতে গেলে টেপা সুইচ টিপে ধরে থাকতে হয় অনেকক্ষণ ধরে। প্রথমে দুদিকে দুটো লালচে-কমলা রঙ ধরে, তারপর কপাল ভাল থাকলে মাঝখানের সাদা টিউবটা জ্বলে ওঠে। কপাল ভাল না থাকলে জ্বলে না। ভোল্টেজ কমে যায় অনেক সময়েই। পড়া হয় না ভালো করে। আমি তখন আমার একদিক-ভাঙা দুফুট বাই দুফুট পড়ার টেবিলে বসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। রাস্তার চলমান জনস্রোত দেখি।

কলকাতার অলিগলির চায়ের দোকান আর স্ট্রীট ফুড সবসময়েই আমাকে আকর্ষণ করত, আর এখনো করে। কয়েক বছর আগেই কলকাতায় অফিস পাড়ায় গিয়ে একটা কাজের ফাঁকে গলির একটা বেঞ্চিতে বসে পড়লাম। - লেখক
কলকাতার অলিগলির চায়ের দোকান আর স্ট্রীট ফুড সবসময়েই আমাকে আকর্ষণ করত, আর এখনো করে। কয়েক বছর আগেই কলকাতায় অফিস পাড়ায় গিয়ে একটা কাজের ফাঁকে গলির একটা বেঞ্চিতে বসে পড়লাম। – লেখক

সন্ধে হয়ে গেছে। সন্ধ্যার মা, রামের মা, সনকা, মেনকা, বেলা, মায়া, কমলাদের ঠিকে কাজে যেতেই হবে। কেউ বাসন মাজে। কেউ বা উনুন ধরিয়ে ওদিকে চণ্ডিবাড়ি স্ট্রিটের বড়বাবুদের বাড়ি রান্না বসায় সন্ধেবেলা। লিলিপুটের মা শোভা লোকের বাড়ি নার্সের কাজ করে। আমাদের বাড়িও একসময়ে করেছে। স্ট্যালিন, আবুলাইজের মা বোধহয় কারুর বাড়ি বাচ্চা দেখে। ওর নাম কেন স্ট্যালিন হলো? আর আবুলাইজ মানে কী, আর সে নাম দেওয়া হলো কেন, তা বোঝার সাধ্য আমার নেই। আবার হরতুকি বাগানে আর একটা ছেলে আছে, তার নাম বুলগানিন। সবাই ডাকে বুলগান। আর, টিটো নামে তো আমি দুজনকে চিনি। মানিকতলায়, যুগীপাড়ায়।

আমাদের বাড়ি কাজ করেছে বহু বছর ধরে মহামায়া মাসি। তিনের এ-তে থাকার সময়ে করেছে, আবার তিনের আটে উঠে আসবার পরেও কিছুদিন করেছে। মহামায়া মাসির স্বামী বোধহয় কাজকর্ম কিছু করতে পারত না কোনো দুর্বলতা বা রোগের কারণে। আমি তাকে দেখেছি বলেই মনে করতে পারি না। আমি দেখেছি মহামায়া মাসির বড় মেয়ে লক্ষ্মী, আর ছোট ছেলে বাবুকে। লক্ষ্মীর গল্প পরে বলব।

ওরা থাকত গোয়াবাগান বস্তিতে একটা খোলার ঘরে। ওদের গলিটা আমাদের বাড়িতে আমিই শুধু চিনতাম। গলির মুখেই “নর্থ ক্যালকাটা মিউজিক ক্লাব” বাংলা সাইনবোর্ড দেওয়া একটা অন্ধকারমত ঘর। তার সামনে সকালবেলা গেলে দেখি ওদের ক্লাব লিডার ফেলুদা দাঁতন করছে লুঙ্গি পরে। না, এই ফেলুদা সত্যজিৎ রায়ের ইন্টেলেকচুয়াল ছ ফুট উচ্চতার ইংরিজি বলা, ইতিহাস-বিজ্ঞান-ভূগোল পড়া প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর ফেলুদা নয়। এ ফেলুদা অন্য ফেলুদা। গরিব, কালো, ছোটখাটো, ক্ষয়াটে চেহারা। গরমকালে খালি গায়ে লুঙ্গি পরে থাকলে পাঁজরার হাড়গুলো সব গোনা যায়। মুখটা ছোট, তার ফলে তার বড় নাকটা খাঁড়ার মত দেখায়। এই ফেলুদাই আবার পাড়ার কালিপুজো কি সরস্বতী পুজোর ফাংশানে পিয়ানো একরডিয়ান বাজিয়ে ফাটিয়ে দেবে। তখন সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট, আর কালো টাই। সঙ্গে থাকবে তখন ইলেকট্রিক গিটার বাজানো অবিনাশ ঘোষ লেনের মিহিরদা, বংগো আর তবলা জাদুকর পা খোঁড়া ফেকুদা, আর সব সাঙ্গপাঙ্গ। হাততালিতে ফেটে পড়বে অডিয়েন্স। সিটি বাজবে ওদের বাজানো অর্কেস্ট্রায় ইভনিং ইন প্যারিস বা গাইড সিনেমার বাজানো গান শুনে। “আরে এইসা মৌকা ফির কাঁহা মিলেগা…।” তখন কে বলবে এই লোকটাই সকালবেলা লুঙ্গি পরে দাঁতন করে বস্তির গলিতে?

মহামায়া মাসির মাটির দেয়াল, টালির চাল। টালির চালে গরমকালে নারকোল ছোবড়া শুকোয়। সে ছোবড়া দিয়ে উনুন ধরায় ওরা। দেয়ালে ঘুঁটে দেয়। বিদ্যুতের আলো নেই। দশ বারো ঘর গরিব মানুষের জন্যে একটা টিউবওয়েল। সেখানে সকাল সন্ধে লোকের লাইন জল নেবার জন্যে। তাও নিজেদের ঘর। কর্পোরেশন থেকে দেওয়া। ভাড়া লাগে মাসে পাঁচ টাকা বা ওই রকম কিছু। তা, মহামায়া মাসি আমাদের বাড়ি থেকে মাসে পেত প্রথমে আট টাকা, তারপর চলে যাবার সময়ে প্রায় দশ বছর পরে সেটা গিয়ে দাঁড়ালো মাসে পনের টাকায়। এইরকম পাঁচ বাড়ি ঠিকে কাজ করে তার সংসার চলত। লক্ষ্মী মাকে সাহায্য করত একটু বড় হবার পরে। আর ওর মা ওকে চোখে চোখে রাখত পাড়ার ছেলেদের, আর বিশেষ করে বাবুদের বাড়ির লোভী ছেলেদের লোভের হাত থেকে বাঁচাতে। আমাদের বাড়ি বাসন মাজা বা বাটনা বাটার কাজ হয়ে গেলে মা ওদের একটু খেতে দিত। রুটি, ডাল, তরকারি। বিপদে আপদে দু চার টাকা বেশি দিয়ে সাহায্য করত। আমাদের বাড়ি যে সব মহিলা কাজ করে গেছে, তারা প্রত্যেকেই মাকে সারা জীবন মনে রেখেছে। সে গল্প পরে।

এইরকমই এক বস্তিতে মহামায়া মাসি তার ছেলেমেয়েকে নিয়ে থাকত।
বস্তি। এইরকমই এক বস্তিতে মহামায়া মাসি তার ছেলেমেয়েকে নিয়ে থাকত। এখনো কলকাতার মধ্যে এবং আসেপাশে অসখ্য বস্তি। গরীব মানুষ সারা জীবন ধরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের সেবা করে চলেছে। কত দল এলো—বামপন্থী, দক্ষিনপন্থী, মধ্যপন্থী। এরা যেখানে ছিল সেখানেই পড়ে আছে। – লেখক

আমি মহামায়া মাসির বাড়ির গলি খুঁজে বের করে ডাকতে যেতাম কালেভদ্রে ওরা কাজে না এলে। মা বলত দেখে আসতে কী ব্যাপার। গিয়ে হয়ত দেখলাম, ওদের টালির চাল দিয়ে জল পড়ছে, আর ওরা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। কারুর জ্বর, কারুর বা অন্য কিছু। আমি বলতাম বাইরে থেকে, “কী গো, আজ কাজে যাবে না? মা জিগ্যেস করছে।” অনেকক্ষণ ডাকার পরে একজন হয়ত বলল কূঁ কূঁ করে, “না গো আজ আর যেতে পারবুনি বাবা। গায়ে ব্যাতা। জ্বর।” কিংবা বলত, “ছেলেটার অসুক দাদাভাই। মাকে বোলো আমি কাল যাব নিচ্চই।” ওরা বাঙাল ছিল না। মানে, পূর্ববঙ্গের রিফিউজি ছিল না। ওরা কোথা থেকে এসেছিল সব খুইয়ে, কে জানে! জিজ্ঞেস করা হয় নি।

আমাদের গোরাচাঁদ বসু রোডের সরু রাস্তা দিয়ে মানুষ হেঁটে চলেছে। সকাল থেকে রাত্তির অব্দি। প্যারী রোর সরু গলি দিয়ে হেঁটে চলেছে। ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে চলেছে। প্রফুল্লচন্দ্র রোডের বড় রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে। মানিকতলা বাজার, হাতিবাগান বাজারের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বিধান সরণির ট্রামরাস্তা পার হয়ে যাচ্ছে। দোকানে ঢুকছে। বেরোচ্ছে।

কথা বলছে। হাসছে। চীৎকার করে কাকে যেন ডাকছে। “এই ই ই ই খোকা, এই ই ই বাবলু, ওওও স্বপনদা, ওওও পল্টুদা, এইইই বাসন্তী, ওও রামের মা…”

পাশের বাড়ির কার্তিকের বোন রেবু আর বাণু বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে চীৎকার করে ডাকছে, “এই দাদা, চলে আয়, ম্যাসটার এয়েচে। বাবা ডাকচে।” তারপর বলছে, “কী রে একনো এলি না? বাবা দেবে এবার।”

বিরামহীন, যতিহীন মানুষের মিছিল। রাস্তাঘাট, বাড়ি, রক, বারান্দা, দোকান। মুদির দোকান। জামাকাপড় ইস্ত্রি করার দোকান। চায়ের দোকান। সোনার গয়নার দোকান। বইয়ের দোকান। জুতোর দোকান। তেলেভাজার দোকান। গম ভেঙে আটা বানানোর দোকান। পাউরুটি বিস্কুটের দোকান। চানাচুরের দোকান। পান সিগারেটের দোকান। সেখানে একটা নারকোল দড়ি ঝুলছে, তার আগায় জ্বলন্ত আগুন। লোকেরা একটা সিগারেট কিনে, বিড়ি কিনে সেই আগুনে ধরিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছে। ছ পয়সায় একটা উইলস ফিল্টার। এক পয়সায় একটা বিড়ি। মুড়ি মুড়কি বাতাসার দোকান। লোহালক্কড়ের দোকান। কেরোসিন, কয়লার দোকান। মিষ্টির দোকানে অন্ধকার পিছন দিকটায় বসে দুটো মোটামতন লোক ছানা মাখছে। তাদের কালো পিঠ দিয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। তিনটে লোক জয়শ্রী আর্ট সেলুনে চুল কাটছে। কাঁচির একটানা শব্দ কুচ কুচ, কিচ কিচ। সেখানে বেঞ্চিতে আরো তিন চারজন লোক বসে খবরের কাগজ পড়ছে, আর সেলুনঅলাদের সঙ্গে বাজে গল্প করছে চুল দাড়ি কাটার আগে। যেমন, “লক্ষ্মীদা, তোমাদের মেদনিপুরে চাল তো খুব সস্তা।” এই সব ফালতু কথা। যেন, লক্ষ্মীদার মেদনিপুর থেকে সে এবার চাল অর্ডার দেবে।

ছেলেমেয়েরা ইস্কুলে যাচ্ছে। বড়রা অফিসে যাচ্ছে। বাড়ির মেয়েরা—অমুকদি, তমুকদিরা বারান্দায় আর ছাদে ভিজে চুলে শাড়ি মেলে দিয়ে একটু দাঁড়াচ্ছে, আর তারপরেই বাড়ির ভেতরে আবার অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। যুবক ছেলেরা—অমুকদা, তমুকদা—অনেকে রকে বসে আছে সারাদিন বেকার। চলে যাওয়া মেয়েদের আগাপাস্তলা দেখছে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। কেউ সিগারেট খাচ্ছে। কেউ বা ছোট্ট, অন্ধকার খুপরির মত একটা ঘরে বসে সারাদিন দুলে দুলে বিড়ি বাঁধছে। মদের গলিতে সন্ধেবেলা হ্যাজাকের আলোতে তেলেভাজা ভাজছে। সেখানে দেশী চোলাই মদের তীব্র গন্ধ। দু চারটে ছুঁড়ে দেওয়া খিস্তি খেউড়। নোংরা কথাবার্তা। মাতলামি। তার একটা গলি পাশেই ব্যাটারির গলি। সেখানে পুরনো গাড়ির ব্যাটারি অ্যাসিড দিয়ে ধুয়ে আর পুরনো বুরুশ দিয়ে পরিষ্কার করে বাচ্চা কয়েকটা ছেলে কী সব যেন বের করে সামনের চটের থলেটার ওপর সাজিয়ে সাজিয়ে রাখছে সারাদিন ধরে। সেখানে অ্যাসিড আর কী সবের ভীষণ ঝাঁঝালো গন্ধ। চোখ জ্বালা করে। তার ঠিক পাশেই শিবমন্দিরে সকাল সন্ধে হিন্দুস্তানি মেয়েরা ছেলে হবার মানত করে পুজো দিয়ে আসছে, আর একবার করে ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়ে আসছে।

মানুষের ঢল। জোয়ারের স্রোত। ধীরে চলা, নিম্নমুখী, ম্লান মানুষ আর মানুষীর সারি। আবার, হাসিমুখ, উজ্জ্বল নরনারী।

“ওই যে দাঁড়ায়ে নতশির, মূক সবে, ম্লানমুখে লেখা শুধু শত শতাব্দীর বেদনার করুণ কাহিনী।” এমন মানুষ দেখেছি কতশত। আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে তারা হেঁটে চলে যায়। তাদের আমি চিনি।

ভোরবেলা থেকে তাদের পথচলা শুরু হয়। অন্ধকার থাকতে থাকতে তারা বেরিয়ে পড়ে। তখনো ভোরের আলো ফোটে নি। আমি তাদের দেখেছি মাঝে মাঝে, ভোর পাঁচটায় উঠে গোয়াবাগান পার্কে ফুটবল খেলতে যাবার সময়ে।

গোয়াবাগান পার্ক
গোয়াবাগান পার্ক। বাল্য, কৈশোরের উপবন। “ঘাস নেই আছে ধূলো।” তার মধ্যেই ফুটবল ক্রিকেট। তার মধ্যেই আর এস এসের শাখা বিকেলে একদিকে। আর একটু বড় হয়ে সেই পার্কেই লোহার বেঞ্চির কাঠের আড়ায় বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, কবিতা, রাজনীতির আলোচনা, নারীঘটিত, হৃদয়ঘটিত সমস্যার জটিল সমাধান। এই পার্কেই দুর্গাপুজো। এই পার্কেই অনেক রাজনৈতিক মিটিং। এই পার্কেই সংঘের রুটমার্চ সারা কলকাতা ঘুরে এসে শেষ। এই পার্কেই সন্ধের অন্ধকার ঘনিয়ে এলে নৈতিক, অনৈতিক প্রেম। – লেখক। ছবি. evilmanoseth; panoramio.com

মরচেধরা লোহার রেলিং দেওয়া গোয়াবাগান মাঠের ভেতরটা ধুলিধুসরিত। “পাড়ার ছোট্ট পার্ক, ঘাস নেই আছে ধূলো, ঘাসের অভাব পরোয়া করে না সবুজ বাচ্চাগুলো।” আমাদের সেই সবুজ বয়েসে আমরাও পরোয়া করতাম না। গরমের ছুটির সময়ে ভোরবেলা চুপি চুপি বাড়ির কারুর ঘুম না ভাঙিয়ে ধার করা পাঁচ নম্বর ফুটবল বগলে, হাফপ্যান্ট আর হাওয়াই চটি পরে আস্তে করে সদর দরজা ভেজিয়ে দিয়ে প্রায়ান্ধকার রাস্তা দিয়ে একজন দুজন করে বন্ধুর বাড়ি। তারা এক এক জন দাঁড়িয়ে আছে নিজের নিজের বাড়ির সামনে, ছায়ামূর্তির মত, আমার অপেক্ষায়। নয়তো, আগের দিনের কথামত একেবারে পার্কে গিয়ে দেখা। যে আগে আসতে পারবে, সে মাঠ দখল করবে। মাঠ মানে মাঠের একটা অংশ।

গোয়াবাগান পার্কের ঠিক মাঝখানটায় একটা পাথরের টিলা। একসময়ে এর ওপরে গাছ লাগানোর কথা ছিল, ফোয়ারা লাগানোর কথা ছিল। হয় নি। কাউন্সিলার না তার ছেলেরা সব টাকা ঝেপে দিয়েছে। এখন সেটা একটা হতশ্রী, কুৎসিত কদাকার এবড়ো-খেবড়ো ভাঙা পাথরের স্তুপ। কেউ জানে না তার প্রয়োজন কী। কিন্তু তাকে নিয়ে কী করা হবে, তাও কারুর জানা নেই। সন্ধের অন্ধকার অনেকটা গাঢ় হয়ে গেলে সে টিলার ওপরে আর আশেপাশে গরীব ঘরের প্রেমিক-প্রেমিকারা রুমাল আর খবরের কাগজ বিছিয়ে বসে। ছোলাভাজা বাদাম আর চানাচুর খায়। আর চুমু খায়। সন্ধের আবছা ঘোলাটে অন্ধকারে প্রেমিকাদের জামার ভেতরে হাত ডুবিয়ে দেয় প্রেমিকরা। প্রেমিকারা অস্ফূট শব্দ করে। আবার অনেকে খিল খিল করে হাসে। চা আর বাদামভাজাঅলারা ঘুরে বেড়ায় ইতস্তত। পার্কে কোনো আলো নেই। ল্যাম্পপোস্টগুলো আর কাজ করে না।

সেই টিলার চারপাশে অন্তত চারটে কল্পিত সীমানার ফুটবল মাঠ। বিভিন্ন পাড়া থেকে অন্তত চারটে দল এসে আমাদের মত একটা অংশ দখল করবে ভোরবেলা। সেখানে কোনো গোলপোস্ট নেই। চটির স্তুপ দিয়ে হবে গোলপোস্ট। ক্রসবার ইমাজিনারি। রেফারি নেই। যারা খেলোয়াড়, তারাই রেফারি। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, অর্থাৎ গলাবাজি করে, গোল হলো কি হলো না, তার সিদ্ধান্ত হবে। সাড়ে পাঁচটা থেকে সাড়ে ছটা কি সাতটা পর্যন্ত খেলা। তারপর চটি পরে যে যার বাড়ি।

গোয়াবাগান স্ট্রিট
গোয়াবাগান স্ট্রিট। এই রাস্তা দিয়ে আর এক মিনিট ডানদিকে ঘুরে গেলেই গোরাচাঁদ বসু রোড। এই রাস্তায় আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে কত ক্রিকেট ফুটবল ম্যাচ খেলেছি। আবার এই রাস্তার আর একদিকে হয়েছে কালীপুজো, সরস্বতী পুজো, আর পুজো হয়ে গেলে ভালো ভালো সারারাত্তিরের ক্লাসিকাল গানের জলসা। ওস্তাদ বাহাদুর খানের সরোদ শুনেছি এখানে। পণ্ডিত শ্যামল বসুর তবলা। আরো কত কী! – লেখক

যে মানুষগুলো ওই পার্কের চারধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটা ইটের বা ব্যাটারির বাক্সের ঘরের মধ্যে থাকে, তাদের ঘুম আমাদেরও আগে ভেঙে যায়। তাদের মেয়েরা সে ঘরের মধ্যে থেকে আরো অনেক আগে বেরিয়ে আসে, কারণ ওই পার্কের কোণে কোণেই তাদের প্রাতকৃত্য। তারপর ওঠে তাদের পুরুষরা। তারা থাকে কেউ ঘরের ভেতরে, আর অনেকেই রাস্তায় ফুটপাথে। খুব ভোরবেলা গেলে দেখা যায়, ফুটপাথে সবাই ময়লা চাদর বা ফুটোফাটা কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে। কয়েকশো লোক। মহিলারা বেরিয়ে পড়ে আমাদের মত মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষদের বাড়ি বাসন মাজা বা রান্নার কাজ করার জন্যে। তাদের পুরুষরা কেউ বা রিকশা, ঠেলা চালায়, কেউ বা মুটে মজুরের কাজ করে। তাদের উনুন ধরানোর বিচ্ছিরি, চোখজ্বালা করা কাঠের নয়তো ঘুঁটের ধোঁয়া। নারকোল ছোবড়ার ধোঁয়া।আস্তে আস্তে পুরো পার্কটাই ধোঁয়ায় ভরে ওঠে। আমরা তার মধ্যেই খেলে যাই। গোল দিই। চীৎকার করি। “বল দে, এদিকে, এদিকে। ধুর শালা।”

আমরা দেখি খেলতে খেলতে তাদের। ওই গরিব, হতভাগ্য লোকগুলোকে। চোখের কোণ দিয়ে দেখে নিই কারুর বাচ্চা এখনো প্রাতকৃত্য সারছে কিনা পার্কের কোণে লোহার রেলিংগুলোর আশেপাশে। আসলে দেখি না। বিরক্ত হই তারা আমাদের খেলার মধ্যে দিয়ে সোজা পার হয়ে চলে গেলে। আমরা বলি, “কী গো একটু ওদিক দিয়ে যেতে পারো না? একেবারে সোজা মাঠের মাঝখান দিয়ে যেতে হবে?” তারা কোনো উত্তর দেয় না। হঠাৎ গায়ে বল লাগলে কেউ কিছু না বলে চলে যায়। কেউ বা একটা অস্ফূট গালাগালি দিয়ে দ্রুত হেঁটে পেরিয়ে যায় আমাদের মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল মাঠ। আমাদের হাবিব, আকবর, সুধীর কর্মকার, থঙ্গরাজ, শ্যাম থাপা, মোহন সিং, শান্ত মিত্রর নাম তারা শোনে নি।

আমার মাসি শোভা ভট্টাচার্য। দু চার বছর আগের ছবি, কলকাতায় তোলা। শোভার কথা লিখেছি ঘটিকাহিনী ৭'এ "এত সুর আর এত গান" এই শিরোনামে। - লেখক
আমার মাসি শোভা ভট্টাচার্য। দু চার বছর আগের ছবি, কলকাতায় তোলা। শোভার কথা লিখেছি ঘটিকাহিনী ৭‘এ “এত সুর আর এত গান” এই শিরোনামে। – লেখক

ওদিকে পার্কের অন্য কোণের একটা লোহার ভাঙা গেট দিয়ে কান্তিবাবু, মানে মেজর কান্তি বিশ্বাস ভেতরে ঢোকেন তাঁর দুটো বিরাট বিরাট কালোসাদা কুকুরের চেন ধরে। কান্তি বিশ্বাস সাদা কলারঅলা গেঞ্জি পরে আর হাফপ্যান্ট পরে কুকুর দুটোকে নিয়ে আমাদের খেলার মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলে যান। আমরা কান্তিবাবু ছাড়া কোনো বয়স্ক লোককে কখনো হাফপ্যান্ট পরতে দেখি নি। আমাদের আর এস এসের ঢলঢলে খাকি হাফপ্যান্ট ছাড়া। কান্তিবাবুর হাফপ্যান্ট সাদা আর ফিটিং। কান্তিবাবুর গলায় মোটা একটা চেন। আর হাতে দামি ঘড়ি। আমরা একটু অপেক্ষা করি কখন তিনি মাঠ পার হয়ে যাবেন। কুকুরের গায়ে বল যেন না লাগে। তারপর আবার খেলা।

খেলা শেষ করে ফেরবার পথে সাহিত্য পরিষদ স্ট্রিটে কচুরির দোকান থেকে গরম কচুরি সিঙ্গাড়া ভাজার তীব্র গন্ধ। জিলিপি সাজানো আছে রাশীকৃত। আর আছে আগের দিন তৈরি করা সন্দেশ, গুঁজিয়া, রসগোল্লা, লেডিকেনি, রাজভোগ। তিন কি পাঁচ পয়সায় একটা কচুরি, আর তার সঙ্গে আলুর তরকারি শালপাতার ঠোঙায়। সঙ্গে পয়সা থাকলে তো কিনব? পয়সা নেই। কালেভদ্রে যদি বাজারের পয়সা থেকে বাঁচিয়ে চারটে কি ছটা কচুরি কেনা যায়। তার থেকে আমি দুটো, আমার বোন দুটো, আর মা যদি একটা খায় তো ভালো, নইলে আমারই ভাগ্যে আরো দুটো।

বাবার ঊষা কারখানায় চাকরি নেবার পরে আমার ওপরেই পড়ল সমস্ত দোকান বাজার করার ভার। দৈনন্দিন বাজার খরচ তিন টাকা। সাতটার সময়ে দুটো চটের ব্যাগ হাতে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়লাম মানিকতলা বাজারের দিকে। একটা ব্যাগ আলু পটল ঝিঙে কপির। আর একটা ছোট ব্যাগ মাছ আর পিয়াঁজের। দশ মিনিটও লাগে না হেঁটে যেতে। এই তো, গোরাচাঁদ বসু রোড থেকে বাঁদিকে ঘুরলেই কারবালা ট্যাংক লেন, তারপর একটা খুব সরু রাস্তা যেখানে একটা ট্যাক্সি ঢুকলে সবাইকে রাস্তা ছেড়ে পাশের বাড়ির রকে উঠে পড়তে হয়, তারপর ওদিকে বড় কারবালা আর স্কটিশ কলেজের ছেলেদের ওয়ান হোস্টেল পেরিয়ে আশিসদের রেশনের দোকান ছাড়িয়েই বিডন স্ট্রিট। গম গম করছে। বাঁদিকে ঘুরে কয়েক পা গেলেই বিরাট বাজার।

কলকাতার লেক মার্কেট অঞ্চলে রাস্তার ওপর বসা শাকসবজির বাজার, শীতকালে। গ্রামের মেয়েরা তাদের পসরা বাসের মাথায় নিয়ে ভোরবেলা চলে আসে কলকাতার বাবু ক্লাসের সেবার জন্যে।  কেউ আসে ডায়মন্ড হারবার থেকে, কেউ ক্যানিং, লক্ষ্মীকান্তপুর, বজবজ, বারুইপুর থেকে।  - লেখক
কলকাতার লেক মার্কেট অঞ্চলে রাস্তার ওপর বসা শাকসবজির বাজার, শীতকালে। গ্রামের মেয়েরা তাদের পসরা বাসের মাথায় নিয়ে ভোরবেলা চলে আসে কলকাতার বাবু ক্লাসের সেবার জন্যে। কেউ আসে ডায়মন্ড হারবার থেকে, কেউ ক্যানিং, লক্ষ্মীকান্তপুর, বজবজ, বারুইপুর থেকে। – লেখক

বাজারে যাবার পথে কত চেনা মানুষের মুখ পেরিয়ে পেরিয়ে যাওয়া। সুব্রতর বাবাকে দেখতে পাব ফেরার সময়ে ওই সরু গলিটার মধ্যে। উনি তখন বাজারে যাচ্ছেন ধীরেসুস্থে। সুব্রত যাবে না। ও তখন পড়ছে। আমার কোনো উপায় নেই। যেতেই হবে। বাবা সাড়ে সাতটায় বেরিয়ে যায় অফিসে, সেই প্রিন্স আনোয়ার শা রোডে ঊষা কারখানায় ঠিক সাড়ে আটটায় পৌঁছতেই হবে। মানিকতলা থেকে বাস ধরে শিয়ালদা স্টেশন। সেখান থেকে যাদবপুর লোকাল। সেখান থেকে শেয়ারের রিকশায় আরো দশ মিনিট। সাড়ে আটটায় কারখানার সকালের সাইরেন।

নজরুলগীতির বিখ্যাত শিল্পী সুকুমার মিত্রকেও দেখতাম বাজারের থলি দোলাতে দোলাতে গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে যাচ্ছেন মানিকতলা বাজারে। উনি বোধহয় ভাড়া থাকতেন গৌতম ঘোষদের বিরাট বাড়িটায়। যে বাড়িটায় একেবারে উপর দিকে তিনতলায় সামনে লেখা আছে MCMXLIX—যার মানে কত সালে বাড়িটা তৈরি হয়েছিল। ১৯৪৯ সাল। আমরা অনেক বুদ্ধি খাটিয়ে বের করেছিলাম। সেই সকালেই সুকুমার মিত্র একটা সুন্দরমত পাঞ্জাবি পরা লুঙ্গির ওপর। খুব লম্বা চওড়া মানুষ। ফর্সা। মাথায় একটু ঢেউ খেলানো চুল। কোনো অহঙ্কার, কিচ্ছু নেই। সবার সঙ্গে কথা বলছেন দাঁড়িয়ে। হাসি ঠাট্টা করছেন এর ওর সঙ্গে। কে বলবে, এই লোকটা এত বড় শিল্পী। আজকেই হয়ত এঁর “যাক ইমান শরাব পানে” বাজবে দুপুরবেলা কলকাতা ক-এ।

তিনের এ-তে থাকার সময়েই প্রথম অসময়ের মৃত্যু দেখলাম। মৃত্যুদূতকে কেমন দেখতে, তা একবার জানান দিয়ে গেল সে। তার সংক্ষিপ্ত, ভীষণ হিমশীতল উপস্থিতি আমাকে ভেতর থেকে প্রথমবার কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। তখন আমার বয়েস বোধহয় আট কি নয়। হঠাৎ একদিন দুপুরবেলা স্কুল থেকে ফিরে এসে শুনলাম, আমাদের গলির পিছনদিকে একতলায় থাকত দুই ভাই রঞ্জিত আর রবীন ওদের মায়ের সঙ্গে। সেই রঞ্জিত সুইসাইড করেছে। সুইসাইড শব্দটা আমি জানতাম না। কে যেন বুঝিয়ে দিল ব্যাপারটা কী। শুনলাম, রঞ্জিত গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে। গলায় দড়ি দিয়ে মরার ব্যাপারটাও বুঝতাম না। কে যেন বুঝিয়ে দিল।

কেমন যেন ফ্রোজেন হয়ে গেলাম। এ কী বলছে সবাই? কেন? কেন এমন হলো? বড়রা সবাই চুপিসাড়ে কী সব যেন আলোচনা করছে। আমাকে বলবে না।

কেন রঞ্জিত গলায় দড়ি দিয়ে পনের-ষোলো বছর বয়েসে আত্মহত্যা করলো, তা কেউ বলল না। সবাই কেমন যেন চুপচাপ, নিস্তব্ধ। পুরো পাড়াটাই কেমন যেন মূহ্যমান। সবাই যেন কী লুকোতে চাইছে। সবাই যেন কী বলছে না আমাকে। রঞ্জিতের সুইসাইড যেন পুরো গোরাচাঁদ বোস রোডটাকেই লজ্জায় ডুবিয়ে দিয়ে গেছে।

দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ির সামনে গঙ্গার ঘাট
দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ির সামনে গঙ্গার ঘাট। বর্ষার শেষ, শরতের সূচনায় নদীর জল থৈ থৈ। দূরে বালি ব্রিজ দেখা যাচ্ছে, যার নাম এখন বিবেকানন্দ ব্রিজ। গঙ্গার উল্টোদিকে স্বামীজির প্রতিষ্ঠিত বেলুড় মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন। আমি দু একবার সবার সঙ্গে বেলুড় থেকে নৌকোয় গঙ্গা পার হয়ে দক্ষিণেশ্বর এসেছি। সে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। – লেখক

কয়েক ঘণ্টা পরে রঞ্জিতের মৃতদেহ খাটের ওপর তুলে মালা আর ফুল দিয়ে সাজিয়ে কয়েকজন বেরিয়ে গেল শ্মশানের দিকে। আমি বারান্দা থেকে দেখলাম, একটা মানুষকে চাদর ঢাকা দিয়ে শুইয়ে রাখা আছে। মাথার দিকে দুদিকে দুটো রজনীগন্ধার স্টিকের ঝাড়। আর ধূপ জ্বলছে। আর লোকগুলো মাটিতে খই ছড়াচ্ছে যেতে যেতে। “বলহরি, হরিবোল… বলহরি, হরিবোল।”

এর পরেও রবীন আর তার মা ওই পাড়ায় দু-চার বছর ছিল। রবীন বল করত আমাদের গলির ক্রিকেট খেলায়। প্রত্যেকবার বল করার সময়ে, হাত ঘোরাবার সময়ে, রবীন জোরে জোরে বলে উঠত, “বল উড়লে নট দায়ী।” তার মানে, ব্যাটসম্যান যদি মেরে ওর বল উড়িয়ে দেয়, আর সেই বল গিয়ে পড়ে এমন কোনো বাড়ির ছাদে বা উঠোনে, যেখান থেকে সে বল আর উদ্ধার হবে না, তাহলে যেন রবীনকে কেউ তার জন্যে দায়ী না করে। ওকে যেন কোনো ক্ষতিপূরণ দিতে না হয়।

একটা রবারের বলের দাম তিরিশ পয়সা। সুব্রত, বাবু, বুড়ো, আমি, আমরা সবাই এক এক জন ভাগ করে নিলে মাথাপিছু পাঁচ পয়সার বেশি নয়। সে পয়সা দেবার সাধ্যও রবীন আর তার গরীব মায়ের নেই।

রবীনকে শেষবার দেখি কয়েক বছর পরে। তখন ওরা আমাদের গলিতে আর থাকে না। কোথায় যেন চলে গেছে। সিনেমা দেখতে গিয়ে দেখি, রবীন শ্যামবাজারে টকি শো হাউসে অন্ধকারে টর্চ জ্বেলে লোকদের সিটে বসাচ্ছে। মানে, আশারের কাজ করছে। তখন আমাদের বয়েস হয়ত তেরো চোদ্দ।

আমি বললাম, “কী রে রবীন, চিনতে পারছিস?”

রবীন মুখ তুলে আমাকে একবার দেখল। ঘাড় নেড়ে বলল, “চিনতে পারব না কেন?”

তারপর, অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

(কিস্তি ৯)

More from পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘটিকাহিনী (১৮)

অনেকদিন পরে অঞ্জন দত্তর গান শুনেছিলাম একটা। সেই "সেখান থেকে একটু দূরে,...
Read More