ঘটিকাহিনী (২৮)

(আগের পর্ব)

অনেক অরণ্য পার হয়ে

“কত কী যে আসে, কত কী যে যায়,
বাহিয়া চেতনাবাহিনী!
আঁধারে আড়ালে গোপনে নিয়ত
হেথা হোথা তারি পড়ে থাকে কত
ছিন্নসূত্র বাছি শত শত
তুমি গাঁথ বসে কাহিনী।
ওগো একমনা, ওগো অগোচরা
ওগো স্মৃতি-অবগাহিনী!”

একবার পিছন ফিরে দেখি চোখ বন্ধ করে। এতগুলো বছর!

parthab logo

সেই তিনের আট গোরাচাঁদ বসু রোডের দেড়তলা ফ্ল্যাটের জানলায় বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকা। বাক্সের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তিন চারটে রোগা রোগা ছেলেমেয়ে বায়োস্কোপ দেখছে রাস্তায়। পাঁচ পয়সা দিলে এক মিনিট দেখতে পাবে। বাক্সের ওপর বিবর্ণ, রংজ্বলা হিন্দি সিনেমার নায়ক নায়িকার ছবি। রাজেন্দ্র কুমার, দেব আনন্দ, আশা পারেখ, হেলেন, প্রাণ। গোল গোল টিফিন কৌটোর মত ঢাকা চেন দিয়ে বাঁধা। সিনেমাঅলা লোকটা পয়সা নিয়ে ঢাকা খুলে দিচ্ছে, আর ছেলেমেয়েগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ছে দেখার জন্যে। একটা হ্যান্ডেল ঘোরাচ্ছে আধময়লা কাপড়পরা লোকটা, আর মাঝে মাঝে অনধিকারের হাতগুলো ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। একটা রেকর্ড ঘুরছে, আর গান হচ্ছে, “লাল ছড়ি ময়দান খাড়ি…”

আবার ভাইবোন বা বন্ধুরা মিলে ভাগাভাগি করেও দেখছে সেই এক মিনিটের মধ্যে। সেই নিয়ে হাত ধরে টানাটানি।

“এই তুই দেখলি তো, এবার সর না।”

হাত সরিয়ে দিচ্ছে, যে দেখছে, সে।

“দাঁড়া না একটু। দিচ্ছি তো।”

“কই দিচ্ছিস?”

“দিচ্ছি তো। দাঁড়া না।”

মারামারি, হুড়োহুড়ি।

তারপর, সেই একটা লোক আসত রংচঙে ঘোড়া সেজে। ঘোড়ার মত একটা কাঠের স্ট্রাকচার, তার চারদিক ঝলমলে সিল্কের সস্তা কাপড় দিয়ে ঢাকা। আর মাঝখানটা ফাঁকা। সেখানে লোকটা ঢুকে ঘোড়ার মত করে লাফাচ্ছে। আর গান গাইছে। পায়ে বাঁধা ঘুঙুরের শব্দ হচ্ছে, “ঝম ঝম ঝম…।” বাচ্চারা হাততালি দিয়ে লাফাচ্ছে আনন্দে।

সাপের খেলা। সেই ঝাঁপি থেকে সাপ বেরিয়ে এলো হিল্‌হিল করে। সাপের মাথায় শ্রীরামচন্দ্রের পাদুকার ছাপ। সাপুড়ে বাঁশি বাজাচ্ছে।

ভাল্লুকের খেলা দেখাচ্ছে একটা লোক। ভাল্লুকটা নাচছে নাকে দড়ি পরে। তারপর, ভাল্লুকের জ্বর হলো। সে শুয়ে পড়ে রোগীর ভান করতে লাগলো।

বাঁদরখেলা দেখাচ্ছে আর একটা লোক। বাঁদরগুলো নানারকম অঙ্গভঙ্গি করে লোকেদের, বাচ্চাদের হাসাচ্ছে। টুলে গিয়ে বসে বই পড়ছে উল্টো করে বই ধরে।

দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে কেবল নোনা জল আর দারিদ্র্যের রাজত্ব। কলকাতার এত কাছেই এত ভয়াবহ দারিদ্র্য দেখব, ভাবতেও পারিনি। জলের কল নেই, বিদ্যুত নেই, ডাক্তার নেই, ডাকঘর নেই, পাকা রাস্তা নেই। যানবাহন বলতে নদী ও খালপথে লঞ্চ ও ভটভটি। - লেখক

দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে কেবল নোনা জল আর দারিদ্র্যের রাজত্ব। কলকাতার এত কাছেই এত ভয়াবহ দারিদ্র্য দেখব, ভাবতেও পারিনি। জলের কল নেই, বিদ্যুত নেই, ডাক্তার নেই, ডাকঘর নেই, পাকা রাস্তা নেই। যানবাহন বলতে নদী ও খালপথে লঞ্চ ও ভটভটি। – লেখক

জিমন্যাসটিক্স দেখাচ্ছে একটা রোগা মেয়ে আর তার দাদা। মা রাস্তায় বসে বসে ঢোল বাজাচ্ছে, আর মেয়েটা একটা উঁচু করে বাঁধা দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটছে।

হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে একটা লোক গান গাইছে রাস্তায়, “মধুকৈটভারে… গোপাল গোবিন্দ রাম রাঘব।” তার গান কী সুন্দর। ভৈরবীতে বাঁধা।

ভোরবেলা গয়ার বাবা তাদের বারান্দা থেকে পায়রাদের দানা খাওয়ায়। সেই আওয়াজ শুনলেই আমরা বুঝতে পারি, ভোর হলো। গয়ার বাবা চাল আর ডাল ছড়িয়ে দেয় টিনের চালের ওপরে, আর ডাকে, “আও আও আও আও… আআআআ… আও আও আও।” আর, পাখিগুলো সব দল বেঁধে উড়তে উড়তে আসে।

ঠিক সেই সময়ে রেডিওতে কলকাতা ক শুরু হয়ে সেই একটা আশ্চর্য বাঁশির সুরে, “কূঊউ কূঊউউ… কুউউ উ উউ ঊঊউউ।” আর, তারপরেই তানপুরার মিষ্টি ধরতাই। এর পরেই শুরু হবে, “বন্দে মাতরম, বন্দে মাতরম, সুজলাং সুফলাং, মলয়জ শীতলাং, শস্য শ্যামলাং মাতরম, বন্দে মাতরম। শুভ্র জ্যোৎস্নাং পুলকিত যামিনীম…”

সকাল গেল গড়িয়ে গড়িয়ে। দুপুর শেষ হয়ে গিয়ে বিকেল শুরু হলো। “জলি চ্যাপ” লেখা আইসক্রিমের গাড়ি এলো। একটা চেনা লোক হাফপ্যান্ট পরা। গাড়ি ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। গাড়ি মানে একটা বাক্স, তার নিচে চারটে চাকা। বাক্সের ডালা খুলে লোকটা আইসক্রিম বের করে করে বিক্রি করছে। আমাদের বাড়ির ভেতরে ওসব আসে না। কে যেন বলেছে, নর্দমার জল দিয়ে তৈরি হয় ওই আইসক্রিম। আমরা তাই খাই না।

সন্ধেবেলা এলো পকৌড়ি ভাজাঅলা। কড়ায় গরম তেলে ছ্যাঁক ছ্যাঁক করে ছোট্ট ছোট্ট বেসনের গুলি ফেলে দিচ্ছে, আর সেগুলো চড়বড় করে তেলে ভেসে উঠছে, আর ফুলে যাচ্ছে। সেই আগুন-গরম পকৌড়ি এক মুঠো শালপাতার ঠোঙায়। আর তার সঙ্গে ঝাল ঝাল লঙ্কার চাটনি।

নয়তো, হিন্দুস্থানী আলুকাবলিঅলা। আমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে হাঁক দিত, “ছট ফট … ছটর ফট … আরেএ এ এ…”

শীতকালের দুপুরবেলা ছুটির সময়ে হজমিঅলা আসে আমাদের জানলার ঠিক নিচে। আমি আর সুব্রত হাত গলিয়ে দিয়ে পাঁচ পয়সার কুল কিনি। নয়তো তেঁতুলের আচার। ঝালনুন দেওয়া। ছোট্ট ছোট্ট কুল। লাল টুকটুকে। মিষ্টি হজমি, টক হজমি।

আমাদের গলি দিয়ে সাহিত্য পরিষদের দিকে একটু গেলেই শ্রীদুর্গা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। সে দোকানের অন্ধকার পিছনটাতে বসে সন্দেশশিল্পীরা, কচুরিশিল্পীরা স্বর্গীয় জিনিস তৈরি করে। সামনের কাচের শো কেসে সাজিয়ে রাখা থাকে থরে থরে রসগোল্লা, লেডিকেনি, শোনপাপড়ি, রাজভোগ, গুঁজিয়া। পয়সা নেই। ওসব তাই কালেভদ্রে আসে বাড়িতে। হয়ত ওই ভাইফোঁটার সময়ে। যখন মা ভাইদের সব ডেকে আমাদের মাঝখানের ঘরটায় মেঝেতে আসন পেতে বসিয়ে চন্দনের ফোঁটা দেবে। আর সামনে তুলে ধরবে মিষ্টির থালা। প্রদীপ জ্বলবে। শাঁখ বাজবে। আমার বোনও আমাকে ফোঁটা দেবে। আর, বাবাকে ফোঁটা দেবে সেজপিসী। বাবা চলে যাবে ওদের বাড়ি সেই হাজরা পার্কে নন্দলাল জীউ রোডে।

শ্রীদুর্গা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের ঠিক উল্টোদিকে দুটো বাড়ির ফাঁকে দুতলার কার্ণিশে বসে থাকে একটা হুতোম প্যাঁচা। রাত আটটা নটার সময়ে ডাকে, “হুররর হুরররর হুট।” তার মাথাটা অদ্ভুতভাবে প্রায় পুরোটা ঘুরে যায়। আর, অন্ধকার রাতে তার চোখদুটো জ্বলে।

কাশীতে বসন্তকালে সন্ধের পর গেটের পাশে শিউলি গাছটা ফুল ঝরায়। সাদা সাদা ছোট্ট ছোট্ট ফুল, আর বোঁটাটা কমলা রঙের। কী সুন্দর গন্ধ। পুরো সন্ধেটা যেন জুড়ে আছে সে সুগন্ধ। মাতাল করা। অজস্র ফুল ঝরে পড়ে থাকে গাছের নিচে। আর ঘন সবুজ পাতার ওপরে আটকে থাকে কয়েকটা ফুল। ওই একটা এক্ষুনি ঝরে পড়ল, “টুপ।” ওই ওদিকে আর একটা।

অবিনাশ ঘোষ লেনে ইরাদিদের বাড়িতে দোতলায় সিঁড়ির ঠিক মুখের কাছে একটা টিয়াপাখি থাকে খাঁচায় ঝোলানো। লঙ্কা আর ছাতু খায়। আর মাঝে মাঝেই ডেকে ওঠে, “ঠাকুর, ও ঠাকুর। কী করচ?”

দুপুরবেলা কাশীতে মেজজেঠুর নতুন বাড়ির নিচু ছাদের ওপর বসে বসে চিঠি লিখছি কলকাতায়। আকাশে কে যেন একটা অলস ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। ঘয়লা ঘুড়ি। পেটকাটা। চাঁদিয়াল। একটা ময়ূর না কী একটা পালক দেওয়া বড়মত পাখি পাশের ঢেউখেলানো সবুজ ভুট্টাখেতের ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল। একটা খোলা কুয়ো। তাতে পুলি বাঁধা। ওদের বাড়ির একটা ঘোমটাপরা বউ বালতি করে জল তুলছে, আর পুলিতে দড়ির শব্দ হচ্ছে, “টরররর টরররর…”

গঙ্গার ঘাটে সন্ধের সোনালি আলোয় নৌকো পারাপার করছে। দূরে একদিকে দেখা যাচ্ছে রেল ঝমঝম কাশীর ব্রিজ। যেখান দিয়ে অপু, সর্বজয়া আর হরিহরের হাত ধরে কাশী এসেছিল। আর একদিকে দেখা যাচ্ছে রামনগরের বিরাট কেল্লা। আর সামনে বিরাট চর। সে চরে নাকি বাবা বন্ধুদের সঙ্গে গঙ্গা সাঁতার দিয়ে তরমুজ খেতে যেত দুপুরবেলা স্কুল পালিয়ে।

“শান্ত নদীটি, পটে আঁকা ছবিটি। একটু হাওয়া নাই, জল যে আয়না তাই। ঝিম ধরেছে ঝিম ধরেছে গাছের পাতায়…”

আমার বাংলাদেশ। আমার ভারতবর্ষ।

***

একটু একটু করে পদধ্বনি শুনছি কালের নিয়ামকের। তাঁর পায়ের শব্দ এগিয়ে আসছে একটু একটু করে। অনিবার্য, নিশ্চিত সে গতি।

ঊনিশশো একাশির পয়লা সেপ্টেম্বর কলেজ সার্ভিস কমিশন থেকে আমাকে চাকরি দেওয়া হলো অতি-প্রত্যন্ত সুন্দরবনের এক গ্রামের কলেজে। বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ল, কারণ এমনিতে আমার ওই প্যানেল থেকে চাকরি হবার কথাই নয়। রেজাল্ট ভালো নয়, শিক্ষকতার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তাও আবার একেবারে কলেজে। কিন্তু, জানা গেল, সে কলেজ এমন একটা জায়গায়, সেখানে কলকাতা থেকে প্রতিদিন যাওয়া আসাও করা যায় না, আর তাই কলকাতার বাবুরা ওখানে যেতেও চাইছেন না। দুজন বোটানির প্রফেসার নাকি ওখানে গিয়ে কাজ শুরু করে কয়েক মাসের মধ্যেই ইস্তফা দিয়েছেন। প্রথম সায়েন্স খোলা হয়েছে সেখানে, দু বছরের মাথায় বি এস সি পার্ট ওয়ান পরীক্ষা, তার দেড় বছর কেটে গেছে। আর মাত্র ছ মাস পরেই পরীক্ষা। পঞ্চাশ ষাট জন ছাত্রছাত্রীর মাথায় বাজ ভেঙে পড়েছে। কোনো টিচার নেই।

সুন্দরবনের তথাকথিত "বিধবা গ্রাম।"

সুন্দরবনের তথাকথিত ‘বিধবা গ্রাম’। এখানে বাঘ বা কুমীরের কবলে পড়ে এলাকার সমস্ত সক্ষম পুরুষ জীবন হারিয়েছে। পড়ে আছে শুধু স্ত্রীলোক আর শিশুরা। গ্রাম দেউলবাড়ি, জেলা দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা। এ-বিষয়ে আরো জানার জন্যে আমার একটা লেখা পড়তে পারেন এই লিংকে—onefinalblog.wordpress.com – লেখক

এই অবস্থায় সে কলেজের প্রিন্সিপাল আমাদের সায়েন্স কলেজের প্রফেসার অরুণ শর্মাকে এসে ধরেছেন, কিছু একটা ব্যবস্থা করে দিতেই হবে। অরুণ শর্মা বলেছেন ডক্টর সমাজপতিকে। আর সমাজপতির মনে পড়েছে আমার কথা। এবং, তাঁদের সুপারিশে এই অধ্যক্ষ আমাকে তাঁর সল্ট লেকের ঝাঁ চকচকে বাড়িতে ডেকে পাঠালেন এক সন্ধেবেলা।

প্রিন্সিপাল অরবিন্দ পাণ্ডার সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয়। সুন্দরবন কলেজের প্রিন্সিপাল, এদিকে এই পশ এলাকায় বাড়ি কলকাতায়?

“আপনি কি পারবেন আমাদের ওখানে গিয়ে থাকতে?” আমার বয়েস তখন চব্বিশ বছর, কয়েক মাস।

“পারব।” আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

আর ছমাস পরেই বাবার চাকরি শেষ। না খেয়ে থাকতে হবে। চারশ টাকা স্টাইপেন্ডে সংসার চলে না। সে দিন আর নেই। জিনিসপত্রের দাম হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে। বাড়িভাড়া। বুবুর পড়ার খরচ। তাছাড়া, অন্য সব ব্যাপার ঝুলে আছে। এক্ষুনি কিছু একটা না পেলেই নয়।

“আমাদের সায়েন্স খোলা হয়েছে। আমাদের কেমিস্টিতে আছেন সুলোপানি বাবু। জুলজিতে সুভাস বাবু। ফিজিকসে নিখিল বাবু স্যার। বোটানির স্যার নেই এখনো।” সে এক অদ্ভুত উচ্চারণ অধ্যক্ষের। আর ধুতি আর গেঞ্জি পরা। আর ক্রমাগত একটা রুদ্রাক্ষের মালা জপে যাচ্ছেন হাতে নিয়ে। বেশ লম্বা চওড়া চেহারা। বয়েসও বেশি না। হয়ত চল্লিশ কি পঁয়তাল্লিশ হবে। পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছেন, আর হাঁটু নাচাচ্ছেন ঠকাঠক করে। আর দাঁত কিড়মিড় করছেন মাঝে মাঝে। যেন, কী একটা চিবোচ্ছেন কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে।

হাসি চেপে বললাম, “আপনাদের কলেজের নামটা কী?”

“সেটা হলো সুন্দরবন হাজী দেসারাত কলেজ।”

জীবনে নাম শুনি নি।

“ঠিক কোথায়? কত দূরে?”

“বেসি দূরে নয়। আমি তো সপ্তায় সপ্তায় দুবার তিনবার যাই। ক্যানিং থেকে লঞ্চে করে বাসন্তি। আমাদের প্রফেসারদের থাকার কোয়াটার আছে। আপনাকে সামনের সপ্তায় আমি নিয়ে যাব। এক তারিখে জয়েন করিয়ে দেব।”

এই হলো আমার দেশে চাকরি পাওয়ার ইতিহাস। প্রথম এবং একমাত্র চাকরি।

পয়লা সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার। ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। সকাল সাতটা আটত্রিশের ক্যানিং লোকাল ছাড়ল শিয়ালদা সাউথ স্টেশন থেকে। সারা ট্রেনটা থেকে কীরকম একটা মাছের গন্ধ বেরোচ্ছে। আর ভ্যাপসা গরম। লোকে গাদাগাদি সেই সকালবেলাই। তারই মধ্যে অরবিন্দ পাণ্ডা জানলার ধারে একটা সিট দখল করে পা তুলে বসে পড়েছেন, আর কোলের ওপর খবরের কাগজ বিছিয়ে আখরোট, খেজুর আর কী সব খাচ্ছেন। আমার ট্রেনের টিকিটও কেটে দিয়েছেন আজ। গরজ বড় বালাই। অবশ্য টিকিটের দাম বেশি নয়। ক্যানিং পর্যন্ত একটাকা তিরানব্বই পয়সা।

ক্যানিং স্টেশন থেকে লঞ্চঘাটে যাবার রাস্তা। দুদিকে ভাতের হোটেল। অনেক সময়ে ভাটার জন্যে দেরী হয়ে গেলে এখানে খেয়ে তারপর কলেজ গেছি। কলকাতার বাড়ি থেকে যেতে লাগত প্রায় পাঁচ কি ছ ঘন্টা। গিয়েই ক্লাস। ছেলেমেয়েরা অপেক্ষা করে থাকত "চার" কখন আসবেন। - লেখক ছবি. suchitravi, প্যানারোমিয়া

ক্যানিং স্টেশন থেকে লঞ্চঘাটে যাবার রাস্তা। দুদিকে ভাতের হোটেল। অনেক সময়ে ভাটার জন্যে দেরী হয়ে গেলে এখানে খেয়ে তারপর কলেজ গেছি। কলকাতার বাড়ি থেকে যেতে লাগত প্রায় পাঁচ কি ছ ঘন্টা। গিয়েই ক্লাস। ছেলেমেয়েরা অপেক্ষা করে থাকত “চার” কখন আসবেন। – লেখক
ছবি. suchitravi, প্যানারোমিয়া

“আমরা ক্যানিংয়ে নেবে সেখান থেকে লঞ্চ ধরব বাসন্তির। আমার সব চেনা। সবাই চেনে আমায়। দেখবেন।”

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর, বাসন্তী থেকে কী করব?” আমি এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না কোথায় যাচ্ছি, কতদূরে যাচ্ছি। বাড়িতে বাবাকে বলে এসেছি দু তিন দিন পরে ফিরব। পাঠানখালি বলে একটা জায়গায় কলেজ। সেখানে বোটানির হেড অফ দা ডিপার্টমেন্টের কাজ দেওয়া হয়েছে আমাকে।

বাবা বলল, “হেড অফ দা ডিপার্টমেন্ট তুমি? প্রথমেই?”

আমি বললাম, “একজনই প্রফেসার। সেইই হেড। সেইই টেল।”

আমার প্রশ্নের উত্তরে অরবিন্দ পাণ্ডা কী একটা বর্ণনা দিলেন রাস্তার, সেটা আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। যা-থাকে-কপালে করে যাচ্ছি। প্রিন্সিপাল বলেছেন, প্রথমে দু এক মাস নাকি আমাকে পাঁচশ টাকা করে দেওয়া হবে। তারপর, তাঁর ভাষায়, “দু এক মাসের মধ্যেই সেটা বেবস্থা করে ফেলব। আপনি তখন অফিসিয়াল স্কেল পাবেন।” ভদ্রলোকের বর্ণমালায় দন্ত্য-স ছাড়া আর কোনো স নেই।

তাই সই। অফিসিয়াল চাকরি যখন, অফিসিয়াল স্যালারি নিশ্চয়ই দেবে। দিতে বাধ্য। নিস্চই দেবে।

ক্যানিং লোকাল ঘুটিয়ারি শরীফ বলে একটা স্টেশনে দাঁড়িয়ে গেল। ওখানে নাকি কী একটা মেলা বসেছে।

“এখানে সিনগেল লাইন। সিগনাল পায় নি। একটু পরেই ছাড়বে।” এই বলে, প্রিন্সিপাল নিশ্চিন্ত মনে তাঁর রুদ্রাক্ষের মালা জপ করতে লেগে গেলেন চোখ বন্ধ করে আর হাঁটু ঠকাঠক করে। পরম বৈস্ণব, বোঝাই যাচ্ছে। শুনলাম, মাছ মাংস ডিম এসব নাকি ছোঁন না তিনি। একেবারে যাকে বলে সাকাহারি।

একটু পরেই, মানে এক ঘণ্টা পরে, ট্রেন আবার ছাড়ল।

মাতলা নদী যে এত চওড়া, আমার কোনো ধারণাই ছিল না। এপার ওপার দেখা যায় না। অনেকগুলো বড় বড় মোটর লঞ্চ দাঁড়িয়ে আছে, তার গায়ে নানা রকম নাম লেখা। জয় মা বিশালাক্ষ্মী, জয় বাবা সত্যপীর, এই সব নাম। আর সেখান থেকে বেশ কিছুটা দূরে আর একদিকে রয়েছে ভটভটির ঘাট। ভটভটি নামটাও সেদিনই প্রথম শুনলাম।

আমার সঙ্গে আছে কাঁধে ঝোলানো একটা কাপড়ের ব্যাগ, আমার চিরকালের সঙ্গী। তার মধ্যে রাতে পরে শোবার একটা পাজামা ও গেঞ্জি, একটা খাতা ও পেন, এক প্যাকেট বিস্কুট, দু চারটে কলা, আর একটা উইলস ফিল্টারের প্যাকেট, তার মধ্যে চারটে সিগারেট। আর একটা ছাতা, সেটা আমার মাথায়। পায়ের চটি আর প্যান্টের নিচের দিকটা ভিজে গেছে এখনই গুটিয়ে নেওয়া সত্বেও। সেই নিয়েই লঞ্চের নিচে না গিয়ে মাথার ওপর একটা ক্যাবিনে বসলাম প্রিন্সিপালের সঙ্গে।

ক্যানিং স্টেশন থেকে একটু দূরেই ট্যাংরাখালি এলাকায় বঙ্কিম সর্দার কলেজ। আমরা ভাবতাম, ওই প্রফেসারগুলো বেশ আছে। আমাদের মত সারা সপ্তাহ এই পান্ডববর্জিত গ্রামে কাটাতে হয়না। কলকাতা থেকে ট্রেন ধরে আসে, আর সন্ধেয় ফিরে যায় প্রতিদিন। আমাদের কলেজের সামনেও গাছের ছায়ায় ঘেরা এমন একটা বিরাট পুকুর ছিল। একই ধরণের দৃশ্য। তবে, আমাদের কলেজের বাড়ি এত বড় ছিলনা। - লেখক

ক্যানিং স্টেশন থেকে একটু দূরেই ট্যাংরাখালি এলাকায় বঙ্কিম সর্দার কলেজ। আমরা ভাবতাম, ওই প্রফেসারগুলো বেশ আছে। আমাদের মত সারা সপ্তাহ এই পাণ্ডববর্জিত গ্রামে কাটাতে হয় না। কলকাতা থেকে ট্রেন ধরে আসে, আর সন্ধেয় ফিরে যায় প্রতিদিন। আমাদের কলেজের সামনেও গাছের ছায়ায় ঘেরা এমন একটা বিরাট পুকুর ছিল। একই ধরনের দৃশ্য। তবে, আমাদের কলেজের বাড়ি এত বড় ছিল না। – লেখক

“আমি এখানকার লঞ্চ এসোসিয়েসানের প্রেসিডেন্ট। আসলে, লঞ্চ আর রিকসা এসোসিয়েসান দুটোই আমার। সবাই চেনে আমায়। দেখবেন।”

দেখলাম। একজন কলেজের প্রিন্সিপাল কী করে যে আবার লঞ্চ আর রিকশা এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, তা মাথায় ঠিক ঢুকলো না। যাই হোক, চললাম।

কিন্তু সে লঞ্চ দেখি উল্টোদিকে নদী পারাপার করছে।

“আমরা ওদিকে গিয়ে বাস নেব। সোনাখালির বাস। সেখানে আমাদের কলেজের বোট আমাদের নিতে আসবে।”

আবার মনে মনে বললাম, তাই সই। আপনি যা বলেন। ততক্ষণে আমার একটা কেমন জানি আত্মসমর্পণের মনোভাব এসে গেছে। যেখানে নিয়ে যায়, যাক। যা হবার হয় হোক। বাড়ি থেকে বেরিয়েছি সকাল সাতটায়। এখনই এগারোটা। পেটে ছুঁচোয় ডন মারছে। আমাকেও তো দুটো চারটে আখরোট দিতে পারত।

প্রচণ্ড বৃষ্টি তখন। তার মধ্যে সোনাখালি নামক প্রায় জনশূন্য একটা জায়গায় বাস থেকে নেমে নদীর পাড়ে নামা হলো। সেখানে দেখি সত্যি একটা নৌকো অপেক্ষা করে আছে অনেক নিচে। কানাই নামে কলেজের এক কর্মচারী এসেছে আমাদের নিতে। কানাই আর তার বাবা রাখাল।

তরঙ্গায়িত একটা খালের মধ্যে দিয়ে আমাদের ভটভটি দুলতে দুলতে আর তীব্র তেলের গন্ধমাখা কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে পাড়ি দিল প্রিন্সিপাল-কথিত “কলেজ ঘাটের” দিকে। আমি তখন একহাতে ছাতা মাথায় দিয়ে, আর একটা হাতে ভটভটির ধারের উঁচু কাঠটা শক্ত করে চেপে ধরে আছি। ভয়ে পেচ্ছাপ হয়ে যাবার অবস্থা আমার। সাঁতার জানি না। জানলেও এই নদীতে পড়লে বাঁচার আর কোনো আশা নেই। কানাই মক্কেল দেখি হাসছে দাঁত বের করে।

মনে আছে, একটা না দেড়টার সময়ে কলেজ ঘাটে পৌঁছলাম। দেখি, সারে সারে লোকজন দাঁড়িয়ে আছে। পাণ্ডা মশাই বললেন, “আপনি আসবেন বলে সব এসে অপেক্ষা করছে।”

বলে কী রে?

ঘাট থেকে কারা যেন বলে উঠলো, “এসে গেছে, এসে গেছে। বোটানির চার এসে গেছে।” কলরোল, হই হই।

শুধু “পার্থ ব্যানার্জী কি জয়” বলে ধ্বনি দেয় নি, বা গাঁদাফুলের মালাটালা গলায় পরিয়ে দেয় নি। তাছাড়া, আয়োজনের কোনো ত্রুটি ছিল না। নেমেই খেলাম কাদায় এক আছাড়। কী ভীষণ পেছল রাস্তা। রাস্তা বলে কিছুই নেই। কাদা আর কাদা।

দুজন ষণ্ডামত লোক আমাকে দুদিক থেকে তুলে ধরল। আমি তাদের কাঁধে চেপে ঝুলতে ঝুলতে সে রাস্তা দিয়ে কলেজে পৌঁছলাম। বাকি শ-খানেক ছাত্রছাত্রী আর গ্রামবাসী মজা দেখতে দেখতে চলল আমার পিছন পিছন। গ্রামের মেয়েরাও আছে তাদের মধ্যে কয়েকজন। ছাত্রীরাও। তারা ‘চার’-এর অবস্থা দেখে মুখে কাপড় চাপা দিয়ে হাসছে।

***

একদিকে এইসব ঘটনা ঘটছে। আর একদিকে, অন্য ঘটনা। সেই একাশিতেই আমার বন্ধু নাগেশ আমেরিকায় পাড়ি দিল পি এইচ ডি করবার জন্যে। নাগেশ যে আমেরিকায় চলে যাবে, এ বিষয়ে কারুর কোনো সন্দেহ ছিল না। ও বাইরে চলে যাবারই মেটিরিয়াল। জুলাই মাসে আমাদের নতলার ক্যান্টিনে ওকে ফেয়ারওয়েল দিলাম। গানটান হলো। একটু খাওয়া-দাওয়াও। নাগেশ আবার একটা টেপ রেকর্ডার নিয়ে এসেছিল। তাতে সব গান টান টেপ করে নিল। ও নাকি সঙ্গে করে নিয়ে যাবে।

আমি গান গাইলাম, “বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান।” বাইরে তখন জোর বর্ষা। দীপক, স্বপন, অনাদি কুণ্ডু। স্ট্যাটিসটিকসের সুনীল আর শিলু, মানে শিলাদিত্য। মলয় আর আদিত্য। নির্মাল্য, সংগ্রাম, লক্ষ্মী। সব ছেলেরা। নির্মাল্যও রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিল। আর, দীপক, স্বপন, শিলু। ওরা সব গেয়েছিল কী একটা গ্রুপ নাটকের দলের গান—”ভেসে আসে কলকাতা কুয়াশাতুলিতে আঁকা শহরতলির ভোর মনে পড়ে, কাঠচাঁপা আর কৃষ্ণচূড়ায় শৈশব শুধু খেলা করে। স্মৃতির ভেতর ট্রামের ধ্বনি বিবাগী সুর গড়ে, এই প্রবাসে ক্যালেন্ডারের পাতাই শুধু ঝরে। ও কলকাতা, ও কলকাতা।”

নস্টালজিয়া গুমরে গুমরে কেঁদে গেল সেদিন আমাদের ফিশ ফ্রাইয়ের ডিশের চারধারে পিঁপড়ের মত। তখনকার দিনে এখনকার মত নিয়ম করে “মাল খাওয়ার” কালচার চালু হয় নি। আমরা খেলাম চা দু তিন কাপ।

নাগেশ কয়েকদিন পরেই চলে গেল ইউনিভার্সিটি অফ নটরডেমে। কোথায় ইন্ডিয়ানা না কী যেন জায়গায়। শিকাগোর কাছে। সেখানে নাকি ভয়ঙ্কর ঠাণ্ডা। বরফে ঢাকা থাকে।

এর আগে আমাদের সামনের বাড়ির তিনের এগারোর চন্দনদা আমেরিকায় চলে গেছে। ও কোথায় আছে ঠিক জানি না। মাসিমা আর মেসোমশাই খুব একা হয়ে গেছেন। একমাত্র ছেলে।

আরো কিছুদিন আগে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল আমাদের অলক মিত্রের পিসতুতো ভাই বাবু। আশীষ দত্ত। ও ছিল খড়গপুর আই আই টির উজ্জ্বল ছাত্র। এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে ওখানে ফার্স্ট হয়েছিল। আমাদের সঙ্গে মাঝে মাঝে আড্ডা দিত কলকাতায় এলে। আমাদের স্টাডি সার্কলেও এসেছে কয়েকবার। তখনই খুব “কুল” আর “হাইলি” আর কী সব যেন বলত কথায় কথায়। আমরা ভাবতাম, দেখেছ, কথা বলার কায়দাই আলাদা। হবে না? আই আই টিতে ফার্স্ট।

বাবু চলে গেল রাটগার্স ইউনিভার্সিটি। সে কোথায় যেন, নিউ জার্সি না কী একটা জায়গায়, বলল অলক। কয়েকদিন পরে ওর চিঠিও দেখালো আমাদের। সেই প্রথম বিদেশের চিঠি কেমন হয় দেখলাম। কী সুন্দর মসৃণ চকচকে কাগজ। আমাদের দেশের পোস্ট অফিসের খাম, ইনল্যান্ড লেটার সব কিছুই যেন কেমন খসখসে। কালি ধেবড়ে যায় লিখতে গেলে। আর, বাবু চিঠি দিয়েছে এয়ারোগ্রামে। যেখানে থাকে, তার নাম নিউ ব্রানসউইক। আমরা তো মুগ্ধ।

***

সেপ্টেম্বর মাসে কলেজে পড়াতে শুরু করলাম। লণ্ঠনের আলো। ইলেকট্রিসিটি নেই ওখানে। জনমানবশূন্য এলাকা। একটা দোতলা পাকা বাড়ি। সেটাই নতুন সায়েন্স বিল্ডিং। একতলায় একদিকে কেমিস্ট্রি আর একদিকে ফিজিক্স ডিপার্টমেন্ট। দুতলায় ফিজিক্সের ওপর বোটানি, আর কেমিস্ট্রির ওপর জুলজি। বোটানি ডিপার্টমেন্ট মানে একটা বিরাট ফাঁকা ঘর, আর একটা মাঝারি ফাঁকা ঘর। একটা জেনারেটার চালিয়ে সায়েন্সের ল্যাব চলে। তার জন্যে একটা লোক রাখা হয়েছে। তার নাম পঞ্চানন।

আমাকে অন্য কয়েকজন অধ্যাপক সমভিব্যহারে পাণ্ডামশাই নিয়ে গেলেন দোতলার একটা ঘরে। বললেন, “স্যাটাই আপনার ল্যাব।”

আমি বললাম, “কোথায়?” বলতে যাচ্ছিলাম, “ক্যাটাই?” রসনা সংযত করলাম।

রফিকুল ইসলাম ইংলিশ ডিপার্টমেন্টের। রফিক স্যার, প্রণব স্যার বাংলার, আর নতুন আসা শূলপাণি ভট্টাচার্যের জনপ্রিয়তার কথা আগেই শুনেছি।

রফিকদা বললেন, “আরে, হয়ে যাবে সব। আমরা আছি তো। গ্র্যান্ট মানি এসে গেছে গভর্নমেন্ট থেকে। তোমাকে একটু করে-টরে নিতে হবে। ল্যাব, লাইব্রেরি, সব কিছুর টাকা আছে। কোনো চিন্তা নেই।”

হাজী দেশারত আলী মোল্লা। মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন, সন্দেহ নেই। তাঁর দান করা কয়েক একর জমির ওপর এ কলেজ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সায়েন্স খোলার কোনো ইনফ্রাস্ট্রাকচার ওখানে ছিলনা। পশ্চিমবঙ্গ সরকার হুজুগে পড়ে কাজটি করেছিলেন। সায়েন্স পড়ে, বিশেষ করে তার ব্যবহারিক দিকটায় যদি জোর না দেওয়া হয়, ওখানকার পাশ করা ছেলেমেয়েরা কী করবে? এখন ওখানে সায়েন্স আর কেউ প্রায় পড়েই না শুনেছি। আমার হাতে গড়া বোটানি ডিপার্টমেন্ট প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে। - লেখক

হাজী দেশারত আলী মোল্লা। মহানুভব ব্যক্তি ছিলেন, সন্দেহ নেই। তাঁর দান করা কয়েক একর জমির ওপর এ কলেজ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সায়েন্স খোলার কোনো ইনফ্রাস্ট্রাকচার ওখানে ছিল না। পশ্চিমবঙ্গ সরকার হুজুগে পড়ে কাজটি করেছিলেন। সায়েন্স পড়ে, বিশেষ করে তার ব্যবহারিক দিকটায় যদি জোর না দেওয়া হয়, ওখানকার পাশ করা ছেলেমেয়েরা কী করবে? এখন ওখানে সায়েন্স আর কেউ প্রায় পড়েই না শুনেছি। আমার হাতে গড়া বোটানি ডিপার্টমেন্ট প্রায় বন্ধই হয়ে গেছে। – লেখক

পরের তিন মাস প্রায় না খেয়ে, না ঘুমিয়ে একটু একটু করে ল্যাব আর লাইব্রেরি তৈরি হলো। কলকাতায় সপ্তাহান্তে ফিরে আসি। বাড়িতে ল্যাবরেটরি ইকুইপমেন্ট সাপ্লায়ার আসে। টেন্ডার দিয়ে তাদের নির্বাচিত করা হয়েছে। আমি ক্যাটালগ দেখে মাইক্রোস্কোপ, রিএজেন্ট, স্পেসিমেন, হাজার জিনিস অর্ডার দিয়ে দিই। তারা লঞ্চে করে একটু একটু করে পৌঁছে দেয় কলেজে।

লাইব্রেরির বইও আসতে আরম্ভ করলো। এদিকে রফিকদার তত্ত্বাবধানে ওখানেই ল্যাবের ফার্নিচার তৈরি হচ্ছে। আমি বলে দিয়েছি কী কী দরকার। সিংক দেওয়া, ফসেট লাগানো ওয়ার্কিং বেঞ্চ থেকে, আলমারি, ডেস্ক, জলের পাইপ সবকিছু। নিজের হাতে তৈরি করলাম একটা বোটানি ডিপার্টমেন্ট।

দিনের ক্লাস করি। প্রাণপণ খাটি। আবার রাতের খাওয়া হয়ে গেলে হারিকেনের আলোতে স্পেশাল ক্লাস করি। সব ছাত্রছাত্রীরা ওখানেই হোস্টেলে থাকে, এই এক সুবিধে। হতদরিদ্র গ্রাম বাংলার ছেলেমেয়ে। সেই কোথায় গভীর জঙ্গলের মধ্যে মরিচঝাঁপি, কুমিরমারি, চামটা, বাগনা, ছোট মোল্লাখালি, সজনেখালি এসব জায়গা থেকে পড়তে এসেছে। নব্বই শতাংশই শিডিউল কাস্ট বা ট্রাইব। তাদের নাম গণেশ মণ্ডল, প্রদীপ দাস, বীণা দাস, শ্রাবণী মণ্ডল, অনিকেত মণ্ডল। নয়তো মুসলমান সমাজের কিছু ছেলে। মতিয়ুর রহমান বলে একটা ছেলে পড়াশোনায় খুব ভালো। অনেক কিছু জিজ্ঞেস করে পড়ার বাইরেও।

 

ছ মাস পরে পার্ট ওয়ান পরীক্ষা হলো। আমার প্রথম ব্যাচের সব ছাত্রছাত্রী পাশ করেছে। চারজন ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে।

কলেজের স্পোর্টসের ছবি। এই মাঠে আমরাও ক্রিকেট ফুটবল খেলেছি ছাত্রদের সাথে। স্পোর্টস অর্গানাইজ করেছি। সে অনেক দিনের কথা। কলেজের ফেসবুক পেজ থেকে প্রাপ্ত ছবি। - লেখক

কলেজের স্পোর্টসের ছবি। এই মাঠে আমরাও ক্রিকেট ফুটবল খেলেছি ছাত্রদের সাথে। স্পোর্টস অর্গানাইজ করেছি। সে অনেক দিনের কথা। কলেজের ফেসবুক পেজ থেকে প্রাপ্ত ছবি। – লেখক

ওখানে সব লোকের নাম অদ্ভুত, যা কলকাতায় কখনো শোনা যায় না। একটা চা বিস্কুটের দোকান আছে, সে দোকানের মালিকের নাম অবতীর্ণ মণ্ডল। আমাদের সিনিয়র লাইব্রেরিয়ানের নাম যদুপতি দাস। অ্যাসিস্ট্যান্ট লাইব্রেরিয়ান মিচকে ছোঁড়ামত বিশ্বজিৎ দাস। কবিতা লেখে, আর বামপন্থী আর এস পির বিদ্রোহী গ্রুপের রাজনীতি করে। সে যদুপতিকে আড়ালে য-বর্গের অন্য একটি অক্ষর দিয়ে সম্বোধন করে থাকে। আমাকে বলে, “পার্থবাবু, বুজলেন তো, এখানে মানে সব এই রকমই। কিসসু জানে না কেউ। সব, মানে, প্রিন্সিপালের…মানে বুজলেন তো কী বলচি কী?” বলে, গলাটা একটু নামিয়ে নিয়ে আসে। আর, চোখ টেপে।

এই “মানে বুজলেন তো কী বলচি কী” আমাদের টিচার্স কোয়ার্টারে একটা হাসির খোরাক হয়ে গেল। আমাদের শূলপাণি ভটচাজ হলো সেই রসের আড্ডার পাণ্ডা। আমার সঙ্গে খুব জমে গেল।

যদিও শূলপাণি, রফিক এরা সব আমার থেকে দশ বছরের বড়। আমার বয়েস পঁচিশ। ইকোনমিক্সের কমল মহাপাত্র দাঁতে গুড়াকু তামাক মাখতে মাখতে আমাকে বলে, “তা প্রফেসার ছোট্টুলাল, কেমন লাগছে আমাদের কলেজ? থাকবেন তো, না চলে যাবেন?”

শূলপাণি বলে, “না না, চলে কোথায় যাবে? বিয়ে টিয়ে করবে এখন। ওখানে একজন অপেক্ষা করে আছে। আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে।”

রফিক বলল, “তাই নাকি? আছে নাকি? বাঃ, সে তো খুব ভালো কথা। আগে বলো নি তো, পার্থ ‘চার’?”

জমে গেল খুব ওদের সঙ্গে। সবাই বামপন্থী। শূলপাণি সিপিএম। রফিক আর এস পি। ওখানেই বাড়ি বাসন্তীর কাছে রামচন্দ্রখালি। দেবেশবাবু সিনিয়র মানুষ। দর্শনশাস্ত্রে পণ্ডিত। ডি লিট্ উপাধি পেয়েছেন। তিনিও আর এস পি।

প্রিন্সিপাল পাণ্ডার বাবা ভূপাল পাণ্ডা মেদিনীপুরের সি পি আই এম এল এ। শোনা যায় সৎ, উন্নতশির মানুষ। কিন্তু তাঁর ছেলেটি বাপের মর্যাদা রাখতে পারে নি। শূলপাণি, রফিক, প্রণব বিশ্বাস, দেবেশবাবু এরা সকলেই দুর্নীতি ও আরো নানা প্রকার সামন্ততান্ত্রিক, ভোগবাদী কার্যকলাপে তার ওপর খড়্‌গহস্ত।

বিদ্যার্থী পরিষদ

কলেজের পুরনো, নোনাধরা, স্যাঁতস্যাঁতে বাড়িতেও ক্লাস নিতে হত উচ্চ মাধ্যমিকের স্টুডেন্টদের। তখন ওখানে বিদ্যার্থী পরিষদের নামও কেউ শোনে নি। কংগ্রেসের ছাত্র পরিষদ বেশির ভাগ সময়ে রাজত্ব করত। আর, নয়ত বামফ্রন্ট। মমতা ব্যানার্জী একবার বক্তৃতা দিতে গেছিলেন, মনে আছে। – লেখক

তারপর আর এক প্রফেসার মদন বাবু। মদন রায়। কথায় কথায় বলেন, “এই জায়গায়, সেই জায়গায়।” সেটা তো একেবারে আদিরসাত্মক পর্যায়ে চলে গেল আমাদের কলকাতার স্যারদের “মেচে।” দরকার হলেই আমরা উচ্চকণ্ঠে বলে উঠি, “সেই জায়গায়… এই জায়গায়।” আমাদের সঙ্গে থাকেন ইংরিজির আর এক প্রফেসার শ্যামল চক্রবর্তী, আর ফিজিক্সের নিখিল দত্ত এবং জুলজির ঠাণ্ডা মাথার মানুষ সুভাষ সাধুখাঁ। সবাই আমাদের কথা শুনে হাসে। শূলপাণি আর পার্থ খুব জমিয়ে রেখেছে মেসটাকে। প্রণব বিশ্বাস থাকেন তাঁর স্ত্রী শিবাণীকে নিয়ে একটা চাষের জমির ওধারে। শিবাণী ইকোনমিক্সের প্রফেসার। ওই কলেজের একমাত্র অধ্যাপিকা। ওঁদের পাশের বাড়িতে থাকেন বি কমের অধ্যাপক ধর্মদাস লাহিড়ি, তাঁর ফ্যামিলি নিয়ে। ওইদিকে আমরা যাই প্রতি সন্ধেবেলা চা খেতে, আর আড্ডা দিতে। তারপর রাত হয়ে গেলে টর্চ জ্বেলে ক্ষেতের আলের ওপর দিয়ে মেসে ফিরে আসি।

টর্চ একেবারে সর্বক্ষণের সঙ্গী। কালাচ সাপ সর্বত্র। মশারি বা জুতোর মধ্যেও ঢুকে পড়ে শোনা যায়।

আমাদের রান্না করে দিয়ে যায় গ্রামেরই এক মহিলা। তার নাম সন্ধ্যার মা। সে আমাকে বলে, “ছোটবাবু, আপনি ভাল করে মশারি ঝেড়ে শুবেন।”

পঁচিশ বছরের একটা ছেলে কলকাতা ছেড়ে এতদূরে এসে কয়েক মাসের মধ্যেই জনপ্রিয় প্রফেসার হয়ে গেছে। ছেলেমেয়েরা মাঝে মাঝেই দেখা করতে আসে। গল্প করতে আসে। ডিপার্টমেন্টে আমার কাছে কাজ করে তিনজন—ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট পতিতপাবন সরখেল, অ্যাটেন্ডেন্ট সনৎ মণ্ডল, আর কলেজের জমি যিনি দান করেছিলেন, সেই হাজী দেশারত আলি মোল্লার নাতি লিয়াকত আলি মোল্লা। সবাইয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ভালো। সন্ধেবেলা আমি মাঝে মাঝে প্রবীর বিশ্বাস নামে আর এক স্থানীয় প্রফেসারের বাড়ি ব্যাডমিন্টন খেলতে যাই।

SHD College

সুন্দরবন হাজী দেশারত কলেজ। এই রাস্তা দিয়ে কত হেঁটে গেছি ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে, সহকর্মীদের সঙ্গে। সে সময়ে এই ছিল কলেজ এলাকার একমাত্র বাঁধানো রাস্তা। দূরে দেখা যাচ্ছে কলেজের অফিস বাড়ি। – লেখক

প্রিন্সিপাল কিন্তু আমার ওপর সন্তুষ্ট না। তিনি আমাকে সেই পাঁচশ টাকাতেই আটকে রেখেছেন। কারণ, তাঁর সব কার্যকলাপ আমি ততদিনে জেনে গেছি, এবং শূলপাণি, রফিক, প্রণবদা ও দেবেশ রায়চৌধুরীর গ্রুপে আমি আছি। প্রিন্সিপাল রেগে আগুন। আমাকে তিনিই যোগাড় করে এনেছেন কলকাতা থেকে। আর সেই আমিই কিনা!

শেষকালে কলেজের গভার্নিং বডির বিশেষ মিটিং ডেকে আমার চাকরি পাকা হলো, এবং আমি মাসে নিয়মিত বারোশ টাকা করে বেতন পেতে আরম্ভ করলাম। শুধু তাই নয়, সে মিটিংয়ে আমাকে আমার কাজের জন্যে বিশেষ ভাবে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হলো।

সেপ্টেম্বর মাসের এক তারিখ চাকরিতে জয়েন করেছিলাম। আর, ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে বিয়ে করলাম মুক্তিকে।

(কিস্তি ২৯)

About Author

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায় তিরিশ বছর ধরে আমেরিকায় আছেন। কলকাতায় ছিলেন জীবনের অর্ধেক। এখন স্থায়ীভাবে নিউ ইয়র্কের বাসিন্দা। মানবাধিকার, বিশেষত ইমিগ্র্যান্টদের অধিকার ও শ্রমিক ইউনিয়ন—এই দুই বিষয়ে পেশাদারিত্ব। ইলিনয় থেকে পি এইচ ডি করার পর বিজ্ঞান ছেড়ে সাংবাদিকতা ও হিউম্যানিটিস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে। শৈশব থেকে রাজনৈতিক অঙ্গনের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আর এস এস ও বিজেপির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকার পর রাজনৈতিক ও আদর্শগত কারণে বেরিয়ে আসেন। তাদের সম্পর্কে বই ও নানা রচনা লেখেন। রাজনীতি ছাড়া বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীত, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, নাটক, শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে আগ্রহ। সাংস্কৃতিক সংকট ও বিশ্বায়িত অর্থনৈতিক আগ্রাসন সম্পর্কে পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Partha Banerjee) বিশ্লেষণ ইউটিউব ও ফেসবুকে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রসংগীতে ও বাংলা আধুনিক গানে বিশেষ উৎসাহ। ২০১২ সালে কলকাতা থেকে রবীন্দ্রনাথের গানের সিডি "আরো একটু বসো" প্রকাশিত হয়। বাংলা ও ইংরাজিতে লেখেন। উইকিপিডিয়া লিংক: http://en.wikipedia.org/wiki/Partha_Banerjee