ঘটিকাহিনী (৩০)

ছোটমামা এইমাত্র মারা গেছে।... মাথায় গুলি ঢুকে গিয়েছিল, আর "মেশিন"টা পাওয়া গিয়েছিল কয়েক ফুট দূরে একটা খবরের কাগজের নিচে।

(আগের পর্ব)

শেষ পারাণির কড়ি

যাদুকর টগরকুমার একটা ছোট্ট মেশিনে আমার আঙুলটা ঢুকিয়ে বললেন, “মিথ্যে কথা বললেই কিন্তু আঙুল কাটা যাবে।”

একগাদা দর্শক আমার মতই বয়েস, আট কি দশ, কি বারো, তারা সব রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে আছে। তাদের ভলান্টিয়ার হবার সাহস নেই। আমার আছে। সরস্বতী পূজোর প্যান্ডেলে খেলা দেখাতে এসেছে টগরকুমার, প্লেয়ার্স ইউনিয়ন ক্লাবে।

যাদুকরের রংচঙে ঝলমলে পোশাক পরা। মাথায় মুকুট। হাতে অনেকগুলো আংটি। খুব ভালো ম্যাজিক দেখায়। ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া। টুপি থেকে লাল নীল কাগজের মালা আর ফুল বেরিয়ে আসছে তো আসছেই। তারপর শেষে ঝপ ঝপ, ফর ফর ফুড়ুৎ করে কতগুলো পায়রা, উড়তে লাগলো চারদিকে। একটা সাদা খরগোশ তার লাল লাল পুঁতির মত চোখ, টুপি থেকে বেরিয়ে পড়ল। সে কী হাততালি!

parthab logo

আমি বললাম, “আচ্ছা।” তারপর একরকম সবজান্তা সুর করে বললাম, “ঠিক আছে।” বলে, অন্যদের দিকে তাকিয়ে একটু হাসলাম।

যাদুকর টগরকুমার বললেন, “এ বছর খারাপ কাজ কী করেছ?”

আমি বললাম, “কিচ্ছু না।”

টগরকুমার মেশিনে একটু চাপ দিলেন। আমার আঙুলটা চিপে গেল। আমি ব্যথায় ককিয়ে উঠলাম।

ম্যাজিশিয়ান
সব ম্যাজিশিয়ানকেই বোধহয় একই রকম দেখতে। টগরকুমার, পি সি সরকার। আমি একবার নিউ এম্পায়ার থিয়েটারে আসল পি সি সরকারের ম্যাজিকও দেখেছি। তাঁর জনপ্রিয়তা এত বেশি ছিল যে ভারত সরকার তাঁর ওপর ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিল। – লেখক

সবাই হাসছে হে হে করে, দাঁত বের করে। শালারা! ওই কুলকুলি, গদা, ওদের বোন আনু, তাপস, গণেশ, কার্তিক, ছোটবাবু, ডাক্তারবাবুর ছেলে গোপাল—এরা সব। মাটির গলি লোকে ভর্তি। উজ্জ্বল আলো জ্বলছে প্যান্ডেলে।

আমি বললাম, “লাগছে, লাগছে।”

টগরকুমার বললেন, “তাহলে বল কী অন্যায় কাজ করেছ।”

আমি একটু থেমে বললাম, “গরমের ছুটিতে দুপুরবেলা রান্নাঘরে গিয়ে আমের আচার চুরি করে খেয়েছি।”

টগরকুমার হেসে বললেন, “ঠিক বলছ? আর কিছু করো নি?”

আমি বললাম, “না।”

যাদুকর মেশিনে খড়াঙ করে চাপ দিলেন। একটা কী শব্দ হলো, যেন একটা কী জিনিস মেশিন থেকে বেরিয়ে এসে গিলোটিনের মত আমার আঙুলটার ওপর দিয়ে চলে গেল। আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে তাকিয়ে থাকলাম।

সবাই হাততালি দিয়ে উঠলো। আমার আঙুল কাটা যায় নি।

সেই থেকে আমাকে অনেকে খুব সম্ভ্রমের চোখে দেখতে শুরু করলো পাড়ায়। আবার একদল বলল, “বাবুয়া আচার চোর।”

তাপস আর ওর ভাইগুলো বলল, “বাবুয়াদার কী সাহস!”

শুধু কুলকুলি বলল, “এ তো সবাই জানে। সত্যি সত্যি কি আর আঙুল কাটা যায় নাকি সত্যি সত্যি?”

গোপাল বলল, “তাহলে তুই করলি না কেন তালে? তুই তো যেতে পারতিস।”

হাজী দেশারত কলেজের কয়েকজন বিশেষ বন্ধু। বারুইপুরে প্রণব ও শিবাণী বিশ্বাসের বাড়ির ছাতে তোলা ছবি। আমার ডান পাশে লাল শাড়ি পরে শিবাণীদি, এবং একেবারে শেষে তাঁর স্বামী প্রণবদা। তাঁর পাশে রফিকুল ইসলাম। প্রণবদা কিছুদিন হলো লাং ক্যান্সারে মারা গেছেন মাত্র ৬৫-৬৬ বছর বয়েসে।  - লেখক
হাজী দেশারত কলেজের কয়েকজন বিশেষ বন্ধু। বারুইপুরে প্রণব ও শিবাণী বিশ্বাসের বাড়ির ছাতে তোলা ছবি। আমার ডান পাশে লাল শাড়ি পরে শিবাণীদি, এবং একেবারে শেষে তাঁর স্বামী প্রণবদা। তাঁর পাশে রফিকুল ইসলাম। প্রণবদা কিছুদিন হলো লাং ক্যান্সারে মারা গেছেন মাত্র ৬৫-৬৬ বছর বয়েসে। – লেখক

কুলকুলি কারুর নাম হয়, আমি কখনো শুনি নি। ওর দাদার নাম গদা। ওর দাদু নাকি গুণ্ডা ছিল কম বয়েসে। সত্যি মিথ্যে জানি না। কিন্তু বুড়ো বয়েসে ওর দাদু আমাদের তিনের এ’র বাড়ির নিচে কর্পোরেশনের কলে চান করত উলঙ্গ হয়ে রাস্তার মাঝখানে। বিশাল একটা লোক। পিঠ ভর্তি চুল। তখন অনেক বুড়ো। সত্তর আশি হবে। ঝড়াঙ করে গামছা খুলে ফেলত। পাশ দিয়ে লোকজন যাচ্ছে। দুপুর বেলা, বারোটা একটা হবে। রিকশা যাচ্ছে ঠুন ঠুন করে। ঠেলা যাচ্ছে। বাচ্চারা যাচ্ছে অবাক হয়ে দেখতে দেখতে। আমি আর সুব্রত বারান্দার চিকের আড়াল থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম ছুটির দিন, আর হাসতাম। আর রায়চৌধুরী বাড়ির সুনুদা আমাদের দেখতে পেলেই বলত, “এই তোরা কী দেক্‌চিস রে? যাঃ ভেতরে যা।”

আমরা ভেতরে চলে আসতাম, আর প্রচণ্ড হাসতাম। ল্যাংটো হয়ে রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে চান করে! কী লোক রে মাইরি!

একবার দেখলাম আমাদের মদের গলি থেকে কেশবদার ভাই লম্বা সমরদাকে পুলিশ কোমরে দড়ি বেঁধে আর হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর সে কী লোক চারদিকে! বেশির ভাগই বস্তির বাচ্চাকাচ্চা। শুনলাম সমরদা নাকি আসলে চোর। ওই গলির মধ্যেই লালার দোকান বলে আমাদের মুদির দোকান ছিল, সেখান থেকে নাকি অনেক টাকা চুরি করেছে ক্যাশবাক্স ভেঙে। আমাদের বুকের মধ্যে ধুকপুক করতে লাগলো। খালি গায়ে আর একটা আন্ডারওয়ার পরা সমরদাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল পুলিশের লোক।

সেদিন আমাদের খেলা হলো না। খালি ওই কথা।

আর একদিন খেলা হয় নি। সেদিন আমাদের পাড়া দিয়ে খোলা রিভলভার হাতে নিয়ে দৌড়ে গেল এমনি জামাপ্যান্ট পরা পুলিশের একটা লোক। আমাদের বাড়ির ঠিক সামনে রাণাদা শান্তাদের বাড়ির একতলায় যেখানে বেগুনি রঙের টিনের পাতের ওপর সাদা দিয়ে গোরাচাঁদ বসু রোড লেখা আছে, ঠিক তার নিচে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল লোকটা কিছুক্ষণ। তারপর কাকে যেন দেখতে পেয়েই দৌড়ে গেল খোলা রিভলভার উঁচু করে ধরে। আর, পাড়া ফাঁকা হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।

এই কোণটাতেই দাঁড়িয়েছিল পুলিশের চর, খোলা রিভলভার হাতে নিয়ে। অনেক কাল আগে। এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে চশমা পরা মহিলা মায়াকে। মায়া একসময়ে আমার মার কাছে কাজ করত। বাসন ধোওয়া, মসলা বাটা। মার মৃত্যুর খবর পেয়ে দেখা করতে এসেছিল।  - লেখক
এই কোণটাতেই দাঁড়িয়েছিল পুলিশের চর, খোলা রিভলভার হাতে নিয়ে। অনেক কাল আগে। এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে চশমা পরা মহিলা মায়াকে। মায়া একসময়ে আমার মার কাছে কাজ করত। বাসন ধোওয়া, মসলা বাটা। মার মৃত্যুর খবর পেয়ে দেখা করতে এসেছিল। – লেখক

তাপসের বাবা শৈলদা সিপিএমের ডাকসাইটে নেতা ছিল। যখন সিপিএম নকশাল কংগ্রেস বিরাট ঝামেলা চলছে, আর এপাড়া ওপাড়ায় মাঝে মাঝেই দু চারটে লাশ পড়ছে আর রোজ বোমাবাজি হচ্ছে আর আমরা অন্য পাড়ায় খেলতে গিয়ে বাড়ি ফিরতে পারছি না আর ফোন নেই বলে খবরও দিতে পারছি না বাড়িতে, তখন শৈলদাকে দেখতাম একটা কালো রঙের পোর্টফোলিও ব্যাগ নিয়ে সব সময়ে যেতে। সবাই বলত, ওর মধ্যে শৈলদা রিভলভার নিয়ে ঘোরে। আমাদের স্কুলে যেদিন বড়তলা থানা থেকে পুলিশ এসে রেড করলো আর যাকে তাকে ভ্যানে তুলে নিয়ে গেল মারতে মারতে, আমরা তিন চারজন বন্ধু তখন পাশেই ছবি বাঁধাইয়ের দোকানের বাড়ির তিনতলায় সিঁড়িতে লুকিয়ে আছি। আর, কাঁদানে গ্যাস খেয়ে চোখ ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের বাড়ির মধ্যে ঢুকতে দিল না। দরজা বন্ধ করে দিল লোকগুলো।

ফাটা, ঘষা কাঁচের জানলার মধ্যে দিয়ে দেখছি সব নিচে রাস্তায়। ওই একটা বোমা পড়ল, “গদাম।” ওই এবার মামাগুলো টিয়ার গ্যাস ছাড়ছে ভ্যান থেকে নেমেই। ধোঁয়ায় ধোঁয়া।

আর অনেকদিন পরে দেখেছিলাম, আমাদের বাড়ির ঠিক সামনে দুটো একেবারে অচেনা লোক অনেক রাতে টিউকলে জামা খুলে রক্ত ধুচ্ছে। লাল টকটকে রক্ত জামা থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে টিউকলের নিচের জায়গাটায়। তারপর রাস্তার নর্দমায়। তখন অনেক, অনেক রাত। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি পরীক্ষার পড়া পড়ছিলাম। তখন রাত দুটো তিনটে হবে।

লোকগুলো আমাদের বাড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। আমি অনেক ভেতর থেকে ওদের দেখছিলাম। ঘর অন্ধকার। কাচের চিমনির আলোটা নিভিয়ে দিয়েছি একটু আগেই।

***

আমাদের উত্তর কলকাতার শীতের শুরুতে সন্ধে ঘনিয়ে আসছে। বাতাসে কেমন যেন একটা চাপা চাপা গন্ধ। ধোঁয়া ধোঁয়া। রাস্তায় বের করা উনুনের ধোঁয়া তার সঙ্গে। আমাদের পাড়ার সাঁজো ধোপার কয়লার উনুন। আরো অন্যদের বাড়ি থেকে কাজের লোক বেরিয়ে এসে ধরানো উনুন রাস্তায় বসিয়ে দিয়ে চলে গেল। ধোঁয়া বেরোনো শেষ হয়ে গেলে তারপর একটা সাঁড়াশি দিয়ে হ্যান্ডেলটা ধরে বাড়ি নিয়ে যাবে। সাঁজো ধোপা মানে যারা সাঁঝের বেলায় কাপড় কাচে। আমাদের বাড়ি কাপড় নিতে আসত—অডিনারি, সেমি আর্জেন্ট, আর্জেন্ট।  আর মাঝে মাঝেই গুলিয়ে ফেলত সব কিছু। ওরা ছিল উড়িয়া।

কলকাতা শহর ছাত থেকে যেমন দেখায়। আমাদের শৈশবের স্বর্গ, যৌবনের উপবন। দূরে দেখা যাচ্ছে হাওড়া ব্রিজ।  - লেখক
কলকাতা শহর ছাত থেকে যেমন দেখায়। আমাদের শৈশবের স্বর্গ, যৌবনের উপবন। দূরে দেখা যাচ্ছে হাওড়া ব্রিজ। – লেখক

একবার আমাদের ছোটবেলায় পাড়াতে সব উড়িয়াদের লাইন করে উবু হয়ে বসিয়ে ওদের সবাইকে নেড়া করে দিল কয়েকজন লোক মিলে। উড়িয়া বামুন, উড়িয়া ধোপা, উড়িয়া নাপিত। সব্বাই নেড়া। উড়িষ্যাতে নাকি বাঙালিদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে। তাই এখানে এই প্রতিশোধ।

তারপর একবার আমরা পুরী গেছি অনেকদিন পর বেড়াতে। কোথায় যেন আমি আর বাবা বাসে চড়েছি। একদল লোক আমাদের দেখতে পেয়েই ডাকতে লাগলো, “বাঙালি কাঙালি, বাঙালি কাঙালি।” আর হাসতে লাগলো আমাদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে। বাবা তাড়াতাড়ি আমাকে নিয়ে বাস থেকে নেমে পড়ল। কয়েকটা লোক তাও বাস থেকেই আমাদের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো, “এ বাঙালি কাঙালি অছি। এ বাঙালি কাঙালি অছি।”

কালিপুজো ভাইফোঁটা শেষ। ওদিকে রাধানাথ স্পোর্টিং ক্লাবে জগদ্ধাত্রী পুজোও শেষ। কার্তিক পুজো হয়ে গেছে মানিকতলা বাজারে। ইস্কুল খুলে গেছে। এক মাস পরে পরীক্ষা। আমরা বন্ধুরা ক্রিকেট ব্যাটের নিচে চাপা দিয়ে রেখেছি ওয়ান, টু, থ্রি, ফোর, ফাইভ সব নম্বর ইটের টুকরো দিয়ে ফুটপাথে লিখে। আর, ব্যাটের ওপর দিয়ে বেরিয়ে আছে মাটিতে কাটা কয়েকটা লাইন। লটারি করে ব্যাট করবে। যে ওয়ান লেখা লাইনের এমাথা আঙুল দিয়ে ছোঁবে, সে প্রথমে ব্যাট করবে। যে ফাইভ পেল, সে আগে বল করবে। আন্ডারহ্যান্ড বল। দেওয়ালে কয়লা দিয়ে উইকেট কাটা।

ক্রিকেট খেলা শেষ হলে শেষের দিকে, ঠিক বাড়িমুখো হবার আগে, আমরা খেলব রবারের গোল গোল পিন্ড একটার ওপর একটা সাজিয়ে দূর থেকে সেগুলো বল মেরে ভেঙে দেওয়ার খেলা। একদল ভেঙে দেবে, আর একদল আবার তাড়াতাড়ি সেগুলো সাজিয়ে দেবে। অন্যদল তখন বলটা কুড়িয়ে নিয়ে এসে এদের গায়ে ছুঁড়ে মারবে। যদি মারার আগেই ওরা সাজিয়ে ফেলতে পারে রবারের গোলাগুলো, তাহলে ওরাই জিতে গেল। আর যদি এরা আগেই ওদের কারুকে বল মেরে মোর করে দিতে পারে, তাহলে ওরা জিতলো।

বৃষ্টির দিন জমা জলে রাস্তায় খেলা সম্ভব না হলে কারুর বাড়িতে লুডো বা দাবা। নয়তো, রকে বসে “রস কস সিঙ্গাড়া বুলবুলি মস্তক” খেলা। হারলে খাটান। হাত পেতে আর একজনের হাতের চড়ের অপেক্ষা। যদি ঠিক সময়ে হাত সরিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে আর খাটান দিতে হবে না। আর যদি না পারো, চড় খেয়ে হাত লাল হয়ে যাবে তোমার।

অবিনাশ ঘোষ লেন।
অবিনাশ ঘোষ লেন। এখানে আমাদের বাড়ির স্বল্পকালের রান্নার ঠাকুর অর্থাৎ উড়িয়া বামুন থাকত। ওদের মেস ছিল এখানে। ওদের বস্তির উল্টোদিকেই ছিল আমার মামাতো দাদা ও দিদি বুবুদা-ইরাদির বাড়ি। সত্তর একাত্তরের রক্তাক্ত দিনগুলোতে উত্তর কলকাতার এই সব গলিতে পুলিশ কতজনকে যে পিটিয়ে বা গুলি করে মেরেছে! – লেখক

আমাদের পাড়াতেই একটা রবারের ফ্যাক্টরি ছিল। সেখান থেকে সব সময়ে আগুনে পোড়ানো রবারের গন্ধ আর ধোঁয়া বেরোত। আমরা তার মধ্যেই খেলতাম। ওখানে একতলায় ছিল কারখানা, আর দোতলায় থাকত বড়বাবু আর ওর দাদা গবা। আর, স্বপনদা-দের বন্ধু ফেঁসাদা। তারপর কারখানাও উঠে গেল, আর ওরাও কোথায় যেন চলে গেল। ওখানে দুটো বড় বড় বাড়ি উঠলো। উকিলবাবুদের বাড়ি। ওদের বাড়ি রেফ্রিজারেটর। তাতে ঠাণ্ডা জলের বোতল। আমাদের দেখালো ওদের বাড়ির ছেলে প্রসূন ফ্রিজ খুলে। তাতেই আমাদের কী আনন্দ!

রাত্তিরবেলা খাবার সময়ে বাবাকে বললাম, “জানো তো, উকিলবাবুর ছেলে প্রসূনদের বাড়ি ফ্রিজের জল। আমাদের দেখালো আজ।”

সেই উকিলবাবুর সঙ্গে বাবাকে একবার পরে বসিয়ে দিলাম আমাদের সরস্বতী পুজোর আবৃত্তি কম্পিটিশনের জজ করে। আর, বাবা জানাবাবু বলে একজনের সঙ্গে দেখা করতে বলল রেডিওতে। মিস্টার জানা দিলেন যুদ্ধের অনেক আসল ফটোগ্রাফ। তাই দিয়ে আমাদের পাড়ায় একজিবিশন করলাম। তখন একাত্তর সাল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। আর, সেই নিয়ে ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধ।

রাত্তিরে রেডিওতে দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনায় যশোরের সীমান্ত, আর শরণার্থী শিবিরের করুণ কাহিনী। দুপুরবেলা কারবালার মাইকে ‘বিশ্বকবির সোনার বাংলা’ গান অংশুমান রায়ের গাওয়া, আর শেখ মুজিবের সেই বিখ্যাত ভাষণ, “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যার যা আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।”

গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। মনে হয়, আমিই মুজিব।

রবার কারখানা উঠে যাবার আগে ওখান থেকে আমরা চাকা নিয়ে আসতাম। ফেলে দেওয়া, বাতিল করে দেওয়া চাকার ভেতরের ধাতব ডিস্কটা। আমরা একটা লোহার আঁকশি যোগাড় করে চাকা চালাতাম। আর, চালাতে চালাতে দৌড়তাম।

তারপর, খেলা শেষ হলে, বাড়ি গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে রুটি বা পরটা খেয়ে পড়তে বসতাম। মা যদি বলত দোকান থেকে কিছু কিনে আনতে, আমার সেই ছাই ছাই সবুজ রঙের গরম চাদরটা গায়ে দিয়ে বেরোতাম একটু। তখন সন্ধেবেলা চারদিকে কুয়াশা। ধোঁয়াশা। চোখ জ্বালা করে। এই চোখ জ্বালা চলত সেই জানুয়ারি মাস পর্যন্ত। তখন পরীক্ষা শেষ হয়ে ইস্কুল খুলে গেছে। নতুন ক্লাস। খুব আনন্দ। সেই চাদর গায়ে দিয়েই বেরোতাম একটু রাত্তিরবেলা। প্লেয়ার্স ইউনিয়নের গলিতে তখন টগরকুমার নেই। তার বদলে ব্যাডমিন্টনের নেট খাটিয়ে তুমুল খেলা চলছে রাত দশটার সময়ে। পাশের বাড়ি থেকে লাইট টেনে আলো জ্বালানো হয়েছে। টং টং করে ব্যাডমিন্টনের শব্দ হচ্ছে। আর আকাশে উড়ছে সাদা রঙের শাটল কক।

ফেঁসাদা, রবিদা এরা সব দারুণ ফুটবল খেলত। আমাদের পাড়ায় জি সি ওয়াই এস, মানে গোরাচাঁদ যুব সংঘ ক্লাবের জার্সি পরে তুমুল ফুটবল ম্যাচ হত বড় রবারের বল দিয়ে। রাস্তা ঘিরে ফেলে বাঁশ পুঁতে আর নারকোল দড়ি বেঁধে গোলপোস্ট। আমাদের তপনদা রেফারি। অন্য পাড়া থেকে খেলতে এসেছে আমাদের পাড়ায়। সে কী উত্তেজনা!

সে সময়কার দুঁদে ইন্দিরা কংগ্রেস নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যুৎমন্ত্রী বরকত গণি খান চৌধুরী। বক্তৃতা দিচ্ছেন এখানে। তাঁর ঠিক পাশেই ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী। ছোটমামা বুদ্ধদেবকে খুব পছন্দ করতেন। ডাকতেন "লম্বু" বলে। কিন্তু, বুদ্ধর মৃত্যুর কোনো তদন্ত করলেন না। কেন?  - লেখক
সে সময়কার দুঁদে ইন্দিরা কংগ্রেস নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিদ্যুৎমন্ত্রী বরকত গণি খান চৌধুরী। বক্তৃতা দিচ্ছেন এখানে। তাঁর ঠিক পাশেই ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী। ছোটমামা বুদ্ধদেবকে খুব পছন্দ করতেন। ডাকতেন ‘লম্বু’ বলে। কিন্তু, বুদ্ধর মৃত্যুর কোনো তদন্ত করলেন না। কেন? – লেখক

তপন চ্যাটার্জী আমাদের পাড়ার এক হোমরা চোমরা লোক। সবাই খুব মানে তপনদাকে। পাঁচতলা নতুন বাড়ি করেছে উকিলবাবুদের বাড়ির ঠিক পাশেই। শুনেছি, তপনদা মোহনবাগান ক্লাব আর সি এ বির ক্রিকেট ক্লাবের লাইফ মেম্বার। সব বড় বড় খেলা, টেস্ট ম্যাচ সব কিছুর নাকি টিকিট পায়। খেলার দিন গাড়ি করে চলে গেল খেলা দেখতে ছেলের হাত ধরে, খাবারের বাক্স আর চায়ের ফ্লাস্ক নিয়ে। আবার, অনেক বড় বড় গানের আর্টিস্টদের সঙ্গে বন্ধু, জানাশোনা। আমাদের পাড়ায় গানের জলসা হলো। নির্মলেন্দু চৌধুরী, আরো সব বড় বড় শিল্পী ফাটিয়ে গান গেয়ে গেল। মিন্টু দাশগুপ্তের প্যারডি। “গুল সবই গুল।” হংসরাজ সিনেমার তিলক চক্রবর্তী গান গেয়ে গেল, “প্রেমের বাজারে চল যাই।” আমরা সামনে বসে পাড়ার ছেলেরা দেখলাম ফ্রিতে। তারপর সব আর্টিস্টরা তপনদার বাড়ির একতলায় একটা অফিস ঘরে গিয়ে বসলো। শুনলাম ওখানে নাকি সব মাল খাবে।

আমাদের খেলা দেখা মানে পাড়ার ক্লাবের খেলা দেখা। তাতেই আমাদের আনন্দ। ওদের খেলার সময়ে আমরা রকের ওপর উঠে দাঁড়িয়ে দেখতাম, আর চেঁচাতাম। আমি আবার আমাদের বাড়ির উল্টোদিকে কর্পোরেশনের ইলেকট্রিক কেবলের যে লোহার বাক্স ছিল, তার ওপর উঠে পড়তাম, আর ওপরে উঠে গোল মত যে জিনিসটা থাকত, তার ওপর বসে থাকতাম। অনেক দূর পর্যন্ত খেলা দেখা যেত।

রবিদা, বারীণদা, পল্টুদা এরা ছিল আমাদের খুব একটা রোল মডেল মত। কী লম্বা চওড়া চেহারা। ছফুট লম্বা। আমাদের পাড়ায় এরা, আর হরতুকি বাগানে আমার ছোটমামা বুদ্ধ, রথীন মামা, অপূর্ব মামা, গৌর মামা এরা সব। কী বিরাট চেহারা। বারীণদা আমাকে খুব লাইক করত। পরে সায়েন্স কলেজে পড়তে গিয়ে দেখি, বারীণদা আবার বোটানিক্যাল সার্ভেতে কাজ করে। তখন ওর বাড়ি গিয়ে আমি দু একবার ব্রায়োফাইট এসব পড়ে এসেছি।

আমাদের বোটানি ডিপার্টমেন্টের অনেক বড় দাদা দ্বিজেন গুহ বক্সি বারীণদাকে চেনে। রিইউনিয়নের সময়ে আমায় বলল, “তুমি কী করে চিনলে বারীণকে?”

আমি বললাম, “আমাদের পাড়ার ছেলে তো। আমরা কত নাটক করেছি একসঙ্গে। ক্যারাম খেলেছি।” বারীণদা দারুণ ভালো নাটক করত। আর করত আমার ছোটমামা বুদ্ধ।

তবে বারীণদা করত আঁতেল নাটক। একবার করলো “ক্লান্ত রূপকার।” ওঃ, স্টেজের ওপর আবার একটা স্টেজ। একটা নাটকের ভেতর আবার আর একটা নাটক হচ্ছে। আমরা তো দেখে হাঁ। আশ্চর্য, অভিভূত!

অজিতেশ, রুদ্রপ্রসাদ, অরুণ মুখোপাধ্যায়, বিভাস চক্রবর্তী কে খোঁজ রাখে? বারীণ ঘোষই আমাদের হিরো। আমি বারীণদাকে ক্যারামে হারিয়ে দিয়েছিলাম। পল্টুদার বাড়িতে। গড়গড়ি, গীতা, কুহু, এরা সব খেলা দেখছে জানলায় দাঁড়িয়ে। পল্টুদারা একটা কুকুর ছেড়ে দিয়েছে। বাড়ির কুকুর। সেটা আমার ঠিক পাশেই মাটিতে শুয়ে আছে আর হাঁপাচ্ছে। ওরা জানে আমার কুকুরে ভয় আছে। ওরা ভেবেছে এসব করলে আমি বারীণদাকে হারাতে পারব না। টুর্নামেন্ট চলছে। এই খেলায় যে জিতবে সেই মোটামুটি চ্যাম্পিয়ন।

বারীণদা লাং ক্যান্সার হয়ে মরে গেল তিরিশ না পঁয়ত্রিশ বছর বয়েসে। রিইউনিয়নে খবর পেলাম। দ্বিজেনদা বললেন, “দুঃখের বিষয় পার্থ, আমাদের বারীণ মারা গেছে।”

আর ছোটমামা করত “নকড়ির মালা।” “ফাঁস।” এই সব। হাসতে হাসতে খুন। প্রাইজ পেত। আমাদের বাড়ির কাচ দেওয়া কাঠের আলমারিতে ছোটমামার প্রাইজ পাওয়া কাপ কতদিন ধরে ছিল সাজানো।

আর, ক্যালকাটা একাডেমীতে পড়ার সময়ে পনের ষোলো বছরের না-খেয়ে-থাকা বুদ্ধদেব স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করছে “এবার ফিরাও মোরে।”

“স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ বৃহৎ জগৎ হতে
সে কখনো শেখেনি বাঁচিতে।
মহাবিশ্বজীবনের তরঙ্গেতে নাচিতে নাচিতে
নির্ভয়ে চলিতে হবে সত্যেরে করিয়া ধ্রুবতারা।”

প্রদীপ ব্রহ্মদের বাড়ি আর ওদের পাশে চরণ-বাদলদের বাড়ির ছাতে আকাশ প্রদীপ জ্বলে উঠেছে মিট মিট করে। একটা নীল। একটা সবুজ। লাঠির মাথায় লাগানো আলো। রীণাদি গড়গড়ি আর গীতাদের বাড়ি পড়িয়ে আমাদের বাড়ি এসেছে মার সঙ্গে একটু গল্প করার জন্যে। গড়গড়ির ভালো নাম শিউলি। শিউলি খুব ভালো মেয়ে। ও আমাকে খুব পছন্দ করে, আমি জানি। কিন্তু পল্টুদা শিউলির কাকা, আর ওরা বড়লোক, আর আমরা গরিব। ওদের নিজেদের শাড়ির আর কাপড়ের দোকান সরসী বস্ত্রালয় হাতিবাগান বাজারে। পল্টুদা আমাকে থ্রেট করেছে আমি যেন শিউলির সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা না করি। বলেছে, আমার আর সুব্রতর “পোঁদের বাঁধন খুলে দেবে।” সবাই থ্রেট করে যেন তাদের বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে লাগতে না যাই।

কিন্তু, রবিদা রীণাদির সঙ্গে প্রেম করে। পল্টুদা ওদের সামনের বাড়ির হিন্দুস্তানী মেয়েটার সঙ্গে লাইন করে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসে। কথা বলে। ওর হ্যান্ডসাম চেহারার জন্যে আমাদের পাড়ার অনেক মেয়েই ওকে পছন্দ করে। কিন্তু ওই পর্যন্তই। আমি পল্টুদাকে কখনো কোনো যাকে বলে মেয়েঘটিত ব্যাপার, তাতে জড়িয়ে পড়তে দেখি নি। বরং, ভোটের সময়ে আমাদের বাড়ির সামনে দীপুদের বাড়ি গিয়ে ভোটের কালি তুলে আবার জাল ভোট দিতে যেতে দেখেছি অনেকবার। এমনিতে হাসিখুশি, দিলদরিয়া লোক। আমি তো ওদের বাড়ির ছাতে গিয়ে ঘুড়িও উড়িয়ে এসেছি বিশ্বকর্মা পুজোর দিন। ওদের বাড়ি, স্বপনদা-দের বাড়ি। আমাকে তো সবাই ভালবাসত। কিন্তু, মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গেলেই সবাই এত চোখ রাঙাতো কেন? ওদের সব বন্ধু কারুর না কারুর সঙ্গে লাইন করার চেষ্টা করে। সমীরদা প্রদীপ ব্রহ্মর দিদি কেকার সঙ্গে অনেকদিন ধরে লাইন করার চেষ্টা করছে। কেশবদা লাইন করছে স্বপনদাদের দোতলায় থাকে একটা মেয়ের সঙ্গে। ওই বাঙাল বাড়িতে। ওদের কারুর নাম আমি জানি না।

কিন্তু, সবকটা মেয়েই খুব রিজার্ভড। ওই পাড়া ছেড়ে চলে আসার পর আমি আর খোঁজ রাখি নি কার সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কার কী হলো।

শুধু শুনেছিলাম, ছুঁচোদার সঙ্গে নিরাদির ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেছিল। বিয়ের দিন নাকি নিরাদি কাঁদতে কাঁদতে উঠে পড়েছিল পিঁড়ে থেকে। বলেছিল, “আমি ছুঁচোকে ছাড়া কারুকে বিয়ে করব না।” সে নাকি এক হুলুস্থুলু কাণ্ড।

অসকা আর ওদের বাড়ির সামনের বাড়ির রামু বলেছিল। ওরা তখন আমাকে যৌনজীবনের প্রথম পাঠ দিচ্ছে। লুকিয়ে কোথা থেকে জীবন যৌবন, মনোরঞ্জন, আর পঞ্চশর ম্যাগাজিন নিয়ে এসে পড়াচ্ছে। আর, কোথায় কোন যুবতী মেয়ের সঙ্গে সিরিয়াস শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে ওদের, তার রগরগে বর্ণনা। নারীর দেহসৌন্দর্য, বিশেষ করে স্তনের বিশদ বর্ণনা ওদের।

আমার যৌনজীবনের পাঠ হলো সুনীল গাঙ্গুলির একা এবং কয়েকজন, সমরেশ বসুর প্রজাপতি, আর বুদ্ধদেব বসু প্রতিভা বসুর লেখা থেকে। দেশ পত্রিকা। বাবা মাইনে বেশি পেতনা উষা কারখানায়। কিন্তু ওদের হাউস জার্নাল প্রকাশ করত বলে কিছু ম্যাগাজিন, পত্রপত্রিকা এসব ফ্রিতে পেত। দেশ, আনন্দবাজার, অমৃত। ওটাই ছিল আমাদের বিলাসিতা। আমি স্কুলে পড়ার সময়ে কখনো সাদা কাগজ কিনি নি। খাতা কিনেছি কালেভদ্রে। কারণ, বাবার কাছে আসত একটা সাপ্তাহিক নিউসলেটার সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ ও অভিমত। তার একদিকে সাইক্লোস্টাইল করে লেখা থাকত ওদের প্রোপাগান্ডা। আর একদিক থাকত একেবারে সাদা। আমি সেই তুলোট-মত কাগজেই লিখতাম। বন্ধুদের দেখতাম ব্রাউন পেপার দিয়ে মলাট দেওয়া সাদা বা লাইন টানা খাতা নিয়ে এসেছে। আমি নিয়ে যেতাম সংবাদ ও অভিমত।

বাবা প্রথম দিকে স্প্যান আর লাইফ বলে দুটো আমেরিকান ম্যাগাজিনও পেত। আশ্চর্য, রঙিন, চকচকে ম্যাগাজিন। তাতে সেই নীল আর্মস্ট্রং’এর চাঁদের মাটিতে অবতরণের সব ছবি, আমেরিকার সব ছবি—নিউ ইয়র্ক, মায়ামি, হিউস্টন। অবাক হয়ে যেতাম দেখে। কত গাড়ি! হাজার হাজার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।

সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি জটায়ু আমাদের কৈশোরে এক অমল আনন্দ দিয়ে গেছে। জটায়ুর হাস্যরস। সিধু জ্যাঠার বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি। ফেলুদার মেধা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা।  - লেখক
সত্যজিৎ রায়ের অমর সৃষ্টি জটায়ু আমাদের কৈশোরে এক অমল আনন্দ দিয়ে গেছে। জটায়ুর হাস্যরস। সিধু জ্যাঠার বুদ্ধি ও স্মৃতিশক্তি। ফেলুদার মেধা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা। – লেখক

মা আর আমি সাপ্তাহিক দেশ, দৈনিক আনন্দবাজার ভাগাভাগি করে পড়তাম। তারপর, শারদীয়া এলে তো গোগ্রাসে গেলা। প্রথমেই সত্যজিৎ রায়। গ্যাংটকে গন্ডগোল, সোনার কেল্লা, কৈলাসে কেলেঙ্কারি। জটায়ু আর সিধু জ্যাঠা। হাসি আর বুদ্ধির গল্প। তারপর ধরলাম সুনীল, সমরেশ, বিমল কর, রমাপদ চৌধুরী, শীর্ষেন্দু। একা এবং কয়েকজনে পঁচিশ বছরের সূর্য দশ বছরের বড় সুন্দরী দীপ্তিদির জামার বোতাম একটা একটা করে খুলে দিতে লাগলো, আর দীপ্তিদি বলল, “আমাকে একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধর।” সমরেশ বসুর “যুগ যুগ জীয়ে”তে যুবক ত্রিদিবেশকে স্কুলের ভলাপচুয়াস দিদিমণি মধুদি ঝড়ের রাতে আশ্লেষে জড়িয়ে ধরছে। আমাদের সব বন্ধুদের তো মাথা খারাপ হয়ে যাবার অবস্থা। আমারও। নিষিদ্ধ যৌন উত্তেজনা।

***

ছোটমামা কেন মারা গেল, কী করে মারা গেল, কেউ ঠিক জানতে পারল না। কেউ বলল সুইসাইড, কেউ বলল মার্ডার। রথীন মামা মেডিকেল কলেজের সিঁড়ির নিচে মাটিতে বসে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো “বুদ্ধ বুদ্ধ” করে। আমি ভয় পেয়ে একটা অন্ধকার বাথরুমে গিয়ে মলত্যাগ করে ফেললাম। ছোটমামা এইমাত্র মারা গেছে। ওর অফিসে স্টেট ইলেকট্রিসিটি বোর্ডের অফিসঘরে, রাত নটা দশটার সময়ে। মাথায় গুলি ঢুকে গিয়েছিল, আর “মেশিন”টা পাওয়া গিয়েছিল কয়েক ফুট দূরে একটা খবরের কাগজের নিচে। তাতেই সবাই বলল, সুইসাইড নিশ্চয়ই, নইলে “চেম্বার”টা তো খুনি নিয়েই যেত। আমার মনে হলো, কেউ যদি নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করে, তাহলে সে কি সেই অবস্থায় রিভলভারটা যত্ন করে সাবধানে একটা খবরের কাগজের নিচে চাপা দিয়ে তারপর মরতে পারে?

ছোটমামা নাকি অনেক হাজার টাকা ধার করেছিল অনেক লোকের কাছে। পাগলের মত নাকি টাকা যোগাড় করত, আজ এর কাছ থেকে, কাল তার কাছ থেকে। হাজার হাজার টাকা। সেই ধারে জর্জরিত হয়ে নাকি সুইসাইড করেছে।

আবার শুনলাম, যেদিন ছোটমামা মারা যায়, সেদিনই সকালবেলা নাকি সেই গদার ভাই কুলকুলি, সে তখন অন্য জিনিস হয়ে গেছে, সে তার দলবল নিয়ে হরতুকি বাগানে দিদিকে থ্রেট করে গেছে। বলেছে, “বুদ্ধদাকে আমরা ছেড়ে দেব না। বলে দেবেন।” দিদি আমাকে বলেছিল, তাদের চোখ নাকি রক্তবর্ণ, খুনির চোখ। দিদি, মাসি এরা কেউ কোনোদিন বিশ্বাস করে নি ছোটমামা আত্মহত্যা করতে পারে।

আমিও করি নি। কারণ, ছোটমামা জীবনবিমুখ হতে পারে কখনো, আমি তা ভাবতেও পারি না। তখনো পারি নি, এখনো পারি না। বুদ্ধদেব ভট্‌চাজ আমার ছোটমামা ছিল জীবনের প্রতীক।

আমার বাবা খবরের কাগজে চিঠি লিখেছিল দিদিমার পক্ষ থেকে। কোনো কাজ হয় নি। লালবাজার পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে কয়েকজনকে নিয়ে গিয়েছিল ইন্টারোগেট করার জন্যে। কোনো লাভ হয় নি। একটা ব্রিলিয়ান্ট ছেলে ছত্রিশ বছর বয়েসে কেন এভাবে শেষ হয়ে গেল, তার কোনো তদন্ত, বিচার কিছুই হলো না।

ছোটমামার শেষ কয়েকটা মাসের কথা আমি জানতাম না কলকাতার বাইরে থাকার জন্যে। পরে জেনেছি, ও এমন এমন লোকের সঙ্গে ঘুরে বেড়াত, যারা ডেঞ্জারাস। যারা ওকে সবসময়ে ব্যবহার করেছে। ওকে দিয়ে টাকা তুলিয়েছে। ওকে দাবার ঘুটির মত ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে। আমি পরে এদের কয়েকজনের সঙ্গে দেখা করেছি ছোটমামার জায়গায় মাসির একটা কাজের জন্যে।

আমি এমন অনেক কিছু লক্ষ্য করেছি যা একটা ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র নির্দেশ করেছে। অনেকে অনেক কিছু জানত, কিন্তু সবাই গোপন করেছে। আমি বুঝেছি ওরা অনেক কিছু লুকোচ্ছে। ওরা অনেক কিছু জানে, কিন্তু বলছে না। ওরা নিজেদের পাপ ঢাকছে। নিজেদের পার্টির, গোষ্ঠীর লোকদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে। ওরা জানে, কে মেরেছে বুদ্ধকে।

আমি তখন দেশ থেকে চলে যাবার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছি। আর আমার তখন একমাত্র উদ্দেশ্য মাসি যেন একটা রিপ্লেসমেন্ট চাকরি পায়। নইলে ওরা সব না খেতে পেয়েই মরে যাবে। আমি একবার দেশ ছেড়ে চলে গেলে মাসির চাকরি আর হবে না। ছোটমামার মৃত্যু ওদের জীবনের শেষ আশ্রয়, শেষ সম্বলটাকে কেড়ে নিয়ে গেছে।

কিন্তু তখনো দিদি গাইছে, “আমায় সকল রকমে কাঙাল করিয়ে গর্ব করিতে চূর…”

এদের আমি আর কী বলব!

***

সে রাত্তিরে মেডিকেল কলেজ থেকে ফিরে আমি দিদি মাসি মেজমামা ওদের সঙ্গে দেখা করার সাহস পাই নি। আমি ঘুমিয়েছিলাম সেই পাশের বাড়ি অমর মামা ওদের বাড়িতে। সারা রাত আমি জ্বরে কেঁপেছি। ছটফট করেছি যন্ত্রণায়, দুঃখে, ভয়ে। আমি সবাইকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমাকে কেন কেউ কিছু বললে না তোমরা? তোমরা তো জানতে কী চলছে। কেন বললে না, কেন বললে না?”

ওরা ওদের ব্যাখ্যা দিয়েছিল। সে ব্যাখ্যা এখন নিষ্প্রয়োজন।

ফুটবল-পাগল ষাটের ও সত্তরের দশকের কলকাতা। আমরা পাড়ার খেলা দেখতাম আর গলা ফাটাতাম। কালেভদ্রে হঠাৎ একটা টিকিট পেয়ে ময়দানে বড় ক্লাবের খেলা দেখতে গেছি। মনে আছে, প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে ইডেন গার্ডেনে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের খেলা। আর মাঠে বিক্রি হচ্ছে সাদাকালো ফুটবল পত্রিকা "খেলার মাঠ," "অলিম্পিক।" - লেখক ছবি. Sreeman Pal, Ichapura
ফুটবল-পাগল ষাটের ও সত্তরের দশকের কলকাতা। আমরা পাড়ার খেলা দেখতাম আর গলা ফাটাতাম। কালেভদ্রে হঠাৎ একটা টিকিট পেয়ে ময়দানে বড় ক্লাবের খেলা দেখতে গেছি। মনে আছে, প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে ইডেন গার্ডেনে মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের খেলা। আর মাঠে বিক্রি হচ্ছে সাদাকালো ফুটবল পত্রিকা ‘খেলার মাঠ’, ‘অলিম্পিক’। – লেখক
ছবি. Sreeman Pal, Ichapura

আমি ছোটমামার এক পার্শ্বচরের বাড়ি সকালবেলা গিয়েই দেখা করলাম। সে আমাকে অপেক্ষা করতে বলে একঘণ্টা ধরে তার সমস্ত চিঠিপত্র, কাগজপত্র পুড়িয়ে নষ্ট করে তবে আমার সঙ্গে কথা বলতে এলো।

আমার উচিৎ ছিল একেবারে পুলিশ নিয়ে গিয়ে ওর বাড়ি রেড করা। ও জানত কী হয়েছে। আমি জানি, ও জানত।

আমার ক্ষমতা ছিলো না তখন পুলিশ নিয়ে যাওয়ার। আমার অর্থ ছিলো না। আমার কোনো উপায় ছিলো না।

এখনো, এই তিরিশ বছর পরেও আমাকে হন্ট করে সেই দিনটা। সেই তেইশে ডিসেম্বর, উনিশশো তিরাশির দিনটা।

পরের দিন পোস্ট মর্টেম হওয়ার পরে ছোটমামার সৎকার হলো সেই নিমতলা ঘাটে। যেখানে মাকে নিয়ে গেছিলাম কয়েক বছর আগেই। আবার চিতার আগুন জ্বললো দাউ দাউ করে। ছোটমামার ছফুট লম্বা শরীরটা পুড়ে শেষ হয়ে গেল। মেজমামা বসে রইলো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে।

এক সপ্তা, দশ দিন পরে জি আর ই, টোয়েফল পরীক্ষা দিলাম।

আর দেশে পড়ে থাকার সত্যি কোনো মানে হয় না।

(কিস্তি ৩১)

Tags from the story
More from পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘটিকাহিনী (২৮)

কলেজে পড়াতে শুরু করলাম। লণ্ঠনের আলো। ইলেকট্রিসিটি নেই ওখানে। জনমানবশূন্য এলাকা। একটা...
Read More