ঘটিকাহিনী (৩২)

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে বাচ্চাদের ক্রিকেট। আমরাও গেছি দল বেঁধে এমনি করে খেলতে। আমরাই যেন বেদী, চন্দ্রশেখর, প্রসন্ন। আমরাই যেন বিশ্বনাথ গাভাসকার।
বাংলাদেশের, কলকাতার প্রতিটা ইট-পাথর আমার কাছে পবিত্র।... তোমরা সবাই আমার নিজের লোক, আমার আত্মীয়। আমাকে ভুলে যেও না।

(আগের পর্ব)

(শেষ পর্ব)

শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্বঃ পুত্রা

সংস্কৃত শ্লোক দিয়ে স্মৃতিকথা শুরু করেছিলাম।

সংস্কৃত। আমার কাছে তার অর্থ মনকে সংস্কার করা। শিক্ষিত করে তোলা। একটা উঁচু স্ট্যান্ডার্ড চোখের সামনে রাখা। যেখানে পৌঁছনোর চেষ্টা করে যেতে হবে সারা জীবন। হেঁটে যেতে হবে সেই লক্ষ্যের দিকে।

আমার খুব ভালো লাগত সংস্কৃত ভাষার ধ্বনি। তার ঝংকার। কেমন যেন একটা দিব্য দ্যুতি বেরোয় ওই শব্দগুলোর মধ্যে থেকে। কেমন যেন একটা পবিত্রতা মনকে স্পর্শ করে। আর, নিজেকে খুব মহান মনে হয়। রাজা রামমোহন রায়ের মত। যাজ্ঞবল্ক্য, মৈত্রেয়ী গার্গীর মত। বিদ্যাসাগরের মত। বিদূষী খনার মত। বিক্রমাদিত্য, কালিদাসের মত। বেদ, উপনিষদের মত। বেতাল পঞ্চবিংশতির মত। রামায়ণ মহাভারতের মত।

parthab logo

বাংলা ভাষাও তাই। বাংলা ভাষার সৌন্দর্য। তার পরিশীলিত রূপ। আবার, তার লৌকিক রূপ। গ্রামের মানুষদের ভাষা। শহুরে লোকদের ভাষা। যে ভাষায় কথা বলে মা তার ছেলেমেয়েকে ভাত খেতে ডাকে। যে ভাষায় কথা বলে বাবা তার ছোট্ট মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়, আর ছেলের সঙ্গে বসে তার ইস্কুলের পড়া করিয়ে দেয়। যে ভাষায় দাদু তার নাতনিকে পাকা চুল তুলে দিতে বলে। যে ভাষায় দিদা ঠাকুরমার ঝুলি, সুয়োরাণীদুওরাণী আর উমনো ঝুমনোর গল্প বলে। যে ভাষায় খঞ্জনি বাজিয়ে ভোরবেলা বৈরাগীরা নামগান করে, আর দরজায় দরজায় এসে আস্তে করে বলে, “মা গো, দুটো ভিক্ষে পাবো নাকি মা।” যে ভাষায় ব্ল্যাকে চাল বিক্রি করতে আসে চালঅলি গ্রাম থেকে লোকাল ট্রেনে। তার গলার ওপর গোল বলের মত ফোলা একটা কী যেন।

আমি আমার দাদুকে, ঠাকুরদাকে কখনো দেখি নি। কিন্তু মায়ামাসির বাবাকে দাদু বলতাম। মায়ামাসি আমার মার ছোটবেলার বন্ধু। ওদের বাড়ি গিয়ে দেখেছি, দাদু বসে বসে গড়গড়ায় হুঁকো খাচ্ছে। আমার আর এক দাদু ছিল। মার বাবার এক বন্ধু। কল্যাণী থেকে মাকে, দিদিমাকে দেখতে আসতেন, খোঁজ নিতে আসতেন। আমি তাঁকে বলতাম কল্যাণীর দাদু।

উঁচু দর্শন আর সাধারণ জীবন মিলেমিশে গেছে। আর আলাদা করা যাবে না। রাসায়নিক প্রক্রিয়া। ঠিক যেন রসগোল্লার রস।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে বাচ্চাদের ক্রিকেট। আমরাও গেছি দল বেঁধে এমনি করে খেলতে। আমরাই যেন বেদী, চন্দ্রশেখর, প্রসন্ন। আমরাই যেন বিশ্বনাথ গাভাসকার। - লেখক
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে বাচ্চাদের ক্রিকেট। আমরাও গেছি দল বেঁধে এমনি করে খেলতে। আমরাই যেন বেদী, চন্দ্রশেখর, প্রসন্ন। আমরাই যেন বিশ্বনাথ গাভাসকার। – লেখক

সেই একবার মুজঃফরপুর থেকে আমার এক কাকু আর কাকিমা এসেছিল আমাদের বাড়ি কলকাতায়। বিয়ের পর বেড়াতে এসেছিল। কাকিমা আমাকে সংস্কৃত পড়াত। আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিল “পিতরি প্রীতিমাপন্নেপ্রিয়ন্তে সর্বদেবতা” শ্লোকের মানে। আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিল স্তোত্র, “স্বদেশে পূজ্যতে রাজা, বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে।” রাজা শুধু নিজের দেশে পূজিত হন। কিন্তু জ্ঞানী পূজিত হন সারা বিশ্বে। বিশ্ব। বিশ্বকবি। আমার এক ইস্কুলের বন্ধুর নাম ছিল বিশ্বশোভন। সে কোথায় হারিয়ে গেছে।

সেই আর এস এসের বর্ধমান ট্রেনিং ক্যাম্পে গিয়ে এক মাস ধরে ভোর পাঁচটায় প্রাতঃস্মরণ—”করাগ্রে বসতে লক্ষ্মী করমধ্যে সরস্বতী, করমূলে তু গোবিন্দঃ প্রভাতে করদর্শনম।” একটা গভীর জীবনদর্শনের প্রথমপাঠ। রেডিওতে রবিবার সকাল নটায় পঙ্কজকুমার মল্লিকের সঙ্গীত শিক্ষার আসর। শুরু হবার আগে সংস্কৃত প্রার্থনা। কখনো শিখে নেওয়া হয় নি। সংস্কৃত শিক্ষার আসর সকাল সাতটার কলকাতা ক’এ। “ক্ষীয়ন্তে খলুভূষণানি সততম, ভাগ ভূষণম ভূষণম।”

খুব ভালো লাগত। আমি কখনো ভাবি নি, সংস্কৃত শ্লোক বলার মধ্যে হীনম্মন্যতা আছে। প্রাচীনতা, অনাধুনিকতা আছে। ভালো করে শেখা হয় নি। কালিদাস পড়তে পারি না মূল সংস্কৃত ভাষায়। কিন্তু, ওই অনায়াস দক্ষতায় হারমোনিয়াম বাজাতে শেখার ইচ্ছের মতন, আর একটা সুর শুনেই রাগ রাগিনী বলে দেওয়ার ইচ্ছের মতন সংস্কৃত শেখার অতৃপ্ত ইচ্ছেটা আজ পর্যন্ত থেকে গেছে।

আমার খুব আনন্দ হয় সংস্কৃত কথা শুনলে। শব্দরূপ, ধাতুরূপ। “নর নরৌ নরাঃ।” “মা ফলেষু কদাচন।” পাগলা দাশু বইতে নন্দলাল ভোরবেলা উঠে পড়ছে, “অস্তি গোদাবরী তীরে বিশাল শাল্মলীতরুঃ।” শর্মিলা রায়পোমোর উপনিষদের স্তোত্রপাঠ আর গান শুনেছিলাম নানা দেশের শিল্পীদের তৈরি করা মহাভারত টিভি ফিল্মে। বিশ্ব। আফ্রিকার এক লম্বা কালো মানুষ পিতামহ ভীষ্ম। এক ফরাসী অভিনেতা অর্জুন, না শ্রীকৃষ্ণ।

“শৃন্বন্তু বিশ্বে অমৃতস্বঃ পুত্রা, নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়।”

বর্ষার মধ্যে প্লাস্টিকের পর্দা ফেলে রিকশায় বসে বসে বাড়ি ফেরা। ছবি নাহয় ধরে রাখা যায়। কিন্তু সেই ভেজা ভেজা গন্ধ? সেই ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া? একহাঁটু জলে ছপছপ করে হেঁটে যাওয়া? - লেখক
বর্ষার মধ্যে প্লাস্টিকের পর্দা ফেলে রিকশায় বসে বসে বাড়ি ফেরা। ছবি না হয় ধরে রাখা যায়। কিন্তু সেই ভেজা ভেজা গন্ধ? সেই ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা হাওয়া? একহাঁটু জলে ছপ ছপ করে হেঁটে যাওয়া? – লেখক

পৃথিবী শোনো, ভূলোক দ্যুলোক শোনো, মানুষ শোনো। তোমরা সবাই অমৃতের পুত্র। বিশ্বজনীনতাই ঈশ্বর। ঈশ্বরের কাছে পৌঁছনোর আর অন্য কোনো পথ নেই।

তখন কিছু বুঝি নি। এই বাণী সেই প্রাচীন ভারতবর্ষের ঋষিদের বাণী। সত্যদর্শন। আমি সেই সত্যদ্রষ্টা ঋষিদেরই এক অতি ক্ষুদ্র বংশধর। কিন্তু যতই ক্ষুদ্র হই না কেন, আমার রক্তের মধ্যে তাঁদের ডি এন এ আছে, জিন আছে। তাঁদের আশীর্বাদ আছে। আমি ক্ষুদ্র, কিন্তু আমি ক্ষুদ্র নই। আমিও অমৃতের পুত্র। আমিও পারি মহান এক বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠতে।

এই সংস্কৃত, এই বাংলার সঙ্গে আমার হিন্দু ধর্মের প্রত্যক্ষ, দৈনন্দিন কোনো সম্পর্ক নেই। এর সঙ্গে আমার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দীর্ঘ সংযোগের কোনো সম্পর্ক নেই। এর সঙ্গে আমার যোগ মনের অনেক গভীরে। যেখানে কেউ কোনোদিন পৌঁছতে পারবে না। যেখানে আমি আর আমার জীবনদেবতা আর আমার প্রাণের প্রদীপ। সেখানে আমি যাই নিভৃতে। যেখানে কোনো এক অন্তরতর সে অপেক্ষা করে থাকে আমার জন্যে। আমি গেলে সে খুশি হয়। হাত ধরে তার কাছে আমাকে বসায়। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। হাসে। কপালে চুমু খায় খুব আদরে, স্নেহে, যত্নে। “ডুব ডুব ডুব রূপসাগরে আমার মন। তলাতল পাতাল খুঁজলে পাবি রে প্রেম রত্নধন।”

শুরুতেই লিখেছিলাম।

সবসময়ে সেখানে যেতে পারি না। কিন্তু যখন যাই, পবিত্র হয়ে সেখানে যাই। যেন সে জায়গাটা একটা ঠাকুরঘরের মত। সেই যে কাশীতে আমাদের পুরনো বাড়ির নিচের ছাতের পাশে তালা দেওয়া লোহার দরজার ভেতরে পুজোর জিনিস সব রাখা থাকত। কোষাকুশি, গঙ্গাজলের ঘড়া, পেতলের থালা, কাঁসরঘণ্টা, শাঁখ। যেমন ছিল আমার মায়ের রান্নাঘরটা। যেখানে দুপুরবেলার নিস্তব্ধতায় পা টিপে টিপে গেলে মনে হত, কোনো কিছু যেন অপবিত্র করে না ফেলি। এ আমার মায়ের রান্নাঘর। সেখানে প্রতিটা সামান্য উপকরণই যেন সেই ঠাকুরঘরের পুজোর জিনিসগুলোর মতন। একটা সাদা পন্ডস ক্রীমের কৌটো ছিল, মা তার মধ্যে হিং রাখত। আমি খুব সন্তর্পণে সে কৌটোর মুখের ঢাকা খুলতাম প্যাঁচ খুলে, আর নাকটা একটু নিচু করে হিং-এর গন্ধ শুঁকতাম। যেন, আমাদের পাড়ার দুর্গাপুজো বা সরস্বতী পুজোর ফুল ছুঁচ্ছি সকালবেলা চান করে আর নতুন জামাকাপড় পরে। যেন, ডিসেম্বর মাসে অ্যানুয়াল পরীক্ষার কোশ্চেন পেপার প্রথম ছুঁচ্ছি।

আমার ভাষা, আমার বাংলাদেশ, আমার কলকাতা, আমার ভারতবর্ষ আমার কাছে আমার মায়ের সেই পুরনো হিং-এর কৌটোটার মতন।

***

একটা স্মৃতিকথায় সবকিছু লেখা যায় না। জীবনস্মৃতি যেন একটা নিঃসীম সাগরের মত। তার জলরাশি। তার রত্নরাজি। তার অসংখ্য স্তর। তার নিরবচ্ছিন্ন ঢেউয়ের ঘাত প্রতিঘাত। এই যেন কিছু রঙীন ঝিনুক, নুড়িখুঁজে পেলাম, এই যেন একটা ভুলে যাওয়া গান মনে পড়ল। “চলে চলে মাঝখানে ঘাস উঠে পায়ে চলা পথ হয়ে যায়।” এই যেন একটা কেমন ঘন সবুজ রঙের চওড়া একটা ফিতের মত জীবন্ত শৈবাল ঢেউয়ের সঙ্গে এসে পড়ল বালিতে আমার সামনে। “বলেছিলে তুমি গান শোনাবে, সেই আশায় দিন গুনি।” ওই যে দূরে একটা লালরঙের বিশাল কাঁকড়ার পাল কিলবিল করতে করতে জলের দিকে দ্রুত ফিরে যাচ্ছে। “জীবন পূরণ নাহি হলো মম তব অকৃপণ করে।” ওই যে একটা বিয়েবাড়িতে সবুজ কলাপাতায় গরম লুচি, ছোলার ডাল আর মাটির খুরিতে মাংস দিয়ে গেল। “এমন একটি ঝিনুক খুঁজে পেলাম না।” পাড়ার হিন্দুস্তানি পানঅলার কাছ থেকে বাবা কাশীর পান কিনে খাচ্ছে রবিবার দুপুরবেলা। আমাকে দিল একটু মিষ্টি সুপুরি। আর, নয়তো পকেটে পয়সা থাকলে কিনে দিল একটা গোল্ড স্পট অরেঞ্জ। চল্লিশ পয়সায় একটা ছোট বোতল। একটা যন্ত্র দিয়ে লোহার ছিপিটা খুলে দিল। অমনি, “ফসসসস…।” আর, পেটে গেলেই ঢেঁকুর।

“চলার পথে দেখা দৃশ্যগুলো স্মৃতির ঘরেতে ধরে রেখেছি।”

মাছের বাজার সন্ধেবেলা। ইলিশ, চিংড়ি, রুই, কাতলা, পার্শে, তোপসে। পয়সা নেই সে অন্য কথা। কিন্তু দেখতে ক্ষতি কী? - লেখক
মাছের বাজার সন্ধেবেলা। ইলিশ, চিংড়ি, রুই, কাতলা, পার্শে, তোপসে। পয়সা নেই সে অন্য কথা। কিন্তু দেখতে ক্ষতি কী? – লেখক

আর, তারপরেই স্মৃতি মিশে গেল আলিপুর চিড়িয়াখানায় সাদা বাঘের খাঁচার সামনে বড়দিনের ছুটির সময়ে। ভিড়। লাইন দিয়ে কাতারে কাতারে লোক। হাসি। চিৎকার। “এই আয় না, এদিকে আয়, দেখে যা, হাতি, হাতি।” আমাদের স্কটিশ স্কুলের সায়েন্স একজিবিশনে হই হই, হাজার হাজার লোক, কেমিস্ট্রি ল্যাবের এক্সপেরিমেন্টের গন্ধ, পটাসিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের বেগুনি রং টেস্ট টিউবে, আর মেন বিল্ডিং-এ আর্টস আর কমার্স একজিবিশনে ঘুরে ঘুরে দেখা ছবি আর চার্ট। তার পরেই চলে এলো বর্ষাকালে অন্ধকার ক্লাসরুমে দুপুরবেলা মেঘ ডাকার শব্দ, আর পলতে স্যারের বাংলা ক্লাস। “বৈতালিকদল সুপ্তিতে শয়ান, এখনো ধরেনি মাঙ্গলিক গান, দ্বিধাভরে পিক মৃদু কুহুতান কুহরে। রাজা জাগি ভাবে বৃথা রাজ্যধন, গৃহী ভাবে মিছা তুচ্ছ আয়োজন, অশ্রু অকারণে করে বিসর্জন বালিকা।” কবিরাজবাবু একবার এসে হাসিমুখে উঁকি দিয়ে চলে গেলেন। “কী রে, পাথর? একটি মোরগের কাহিনী পড়েছিস? পড়ে দেখ, পড়ে দেখ।” আমাদের বুক ক্রিকেট খেলা তখন জোর চলছে।

মহালয়ার দিন ভোর চারটেয় উঠে রেডিওতে গান শুনি, “সিংহস্থা শশীশেখরা মরকতবেশা। দূর্গা দশপ্রহরণধারিণী।” অ্যালার্ম দিয়ে রাখা আছে ঘড়িতে। সব বাড়িতেই একসঙ্গে বাজছে সেই সব গান, আর বীরেন্দ্রকৃষ্ণর চণ্ডীপাঠ। ধর্মের থেকেও অনেক বেশি আনন্দ, আর এক সপ্তা পরেই দুর্গাপুজো। প্যান্ডেল তৈরি প্রায় শেষ পাড়ায় পাড়ায়।

স্বপ্নে ডুব দিলাম সেই সাগরের জলে। নেমে যাচ্ছি, নেমে যাচ্ছি কোন অতলে। চারদিকে খেলা করছে হাজার রঙিন মাছ। লাল, নীল, হলদে, গোলাপি, বেগুনি, সাদা, কালো। সেই হাতিবাগানের হাটের মত। পাখি আর রঙিনমাছ বিক্রি হচ্ছে। আমি গেছি অসকার সঙ্গে। রোববার সকালবেলা। শরৎকালের সোনালি রোদ। ওদের লাল আর কালো মাছ রাখার একোয়ারিয়াম আছে। মাছের নাম ব্ল্যাক মলি, রেড সোর্ডটেল, টাইগারএঞ্জেল। ওরা সরু সরু লাল লাল কেঁচো খায়। ছোট্ট ছোট্ট পলিথিনের ব্যাগে জল। একটায় একটা লাল মাছ। আর একটায় একগাদা সরু সরু, লাল লাল কেঁচো। পাখি বিক্রি হচ্ছিল ওখানে। আমি একটা বদ্রু কিনতে চাই। একটা নীল আর একটা সবুজ। আমার বদ্রু পাখিটাকে খাঁচা ভেঙে খেয়ে গেল একটা রাস্তার বেড়াল।

পশ্চিমবঙ্গের ভোটের লাইন। এ ছবিটি শিলিগুড়ির। আমরা কলকাতায় কত লাইন দিয়ে ভোট দিয়েছি। আবার ভোটারদের নিয়ে এসেছি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্যাম্পেন করেছি। গণতন্ত্রের উৎসব। হিংসা ও মিথ্যাচারটা বাদ দিয়ে। - লেখক
পশ্চিমবঙ্গের ভোটের লাইন। এ ছবিটি শিলিগুড়ির। আমরা কলকাতায় কত লাইন দিয়ে ভোট দিয়েছি। আবার ভোটারদের নিয়ে এসেছি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্যাম্পেন করেছি। গণতন্ত্রের উৎসব। হিংসা ও মিথ্যাচারটা বাদ দিয়ে। – লেখক

নানারকম অমূল্য রত্ন আমার পাশ দিয়ে উঠে যাচ্ছে, নেমে যাচ্ছে। আমার নিঃশ্বাসের বুড়বুড়ি কাটছে জলে। আমার চোখ বন্ধ। আমি ডুবছি না। ভেসে আছি। চোখ বন্ধ করেও সব কিছু দেখতে পাচ্ছি যেন। সবকিছু পরিষ্কার।

আনন্দ যেন মনের ভেতর থেকে একটা একটা করে আশ্চর্য রংমশালের ফুলকি। ফুলঝুরির আলো। হাতচরকি। এ আলো জ্বালার জন্যে বড়লোক হতে হয় না। এ আলো সর্বজনীন। ঐশ্বরিক।

জয়সলমীরে আমি আর মুক্তি সোনার কেল্লায়। যোধপুর ফোর্টের ছাতে সারি দিয়ে রাখা কামান, আর নিচে ধবধবে নীল সাদা যোধপুর শহর। সেই যেমন রাণা প্রতাপের আমলে ছিল। বুঁদির কেল্লা দেখা হলো না জীবনে। চিতোরে মীরাবাইয়ের স্মৃতিসৌধ দেখতে গিয়ে টুরিস্ট বাস আমাদের ফেলে রেখেই চলে গেল। যোধপুরের কেল্লায় ঢোকার ঠিক মুখটায় বসে বসে পাগড়ি পরা কতগুলো লোক কী সব যন্ত্র বাজাচ্ছে। অদ্ভুত তার সুর। দার্জিলিঙে বেড়াতে গিয়ে থাকলাম সবাই মিলে বোটানির প্রফেসারদের বাড়িতে। মদনদা, আরো সব কে কে যেন। ম্যাল, আর জলাপাহাড় রোড। পাইন গাছ, আর মেঘ। আর পাইন গাছ। সেখান থেকে জলঢাকা যাওয়া হলো। ছোটমামার বন্ধু মানিকমামা মুরগির মাংস রেঁধে খাওয়ালো। তার মধ্যে আস্ত আস্ত, বড় বড় রসুন। বাড়ির বাইরেই প্রবল শব্দে বয়ে চলেছে তিস্তা আর জলঢাকার একটা স্রোত, পাথর গাছপালা ভেঙে। ঝমঝম করে শব্দ হচ্ছে তার সারাদিন, সারারাত। মিরিক দেখতে গিয়ে রাত্তিরবেলা সারা শহর একসঙ্গে অন্ধকার হয়ে গেল। পথ খুঁজে বাড়ি আসতে পারছি না। এত অন্ধকার আমি জীবনে কখনো দেখি নি। মনে হয় অন্ধ হয়ে গেছি।

কলকাতার বই পাড়া।  কলেজ স্ট্রিট, প্রেসিডেন্সি কলেজ, কফি হাউস। আমাদের একটা তীর্থস্থানের মত ছিল। মন্দিরের মত। নতুন বছরের শুরুতেই স্কুলের বই কেনার ধুম।  - লেখক
কলকাতার বই পাড়া। কলেজ স্ট্রিট, প্রেসিডেন্সি কলেজ, কফি হাউস। আমাদের একটা তীর্থস্থানের মত ছিল। মন্দিরের মত। নতুন বছরের শুরুতেই স্কুলের বই কেনার ধুম। – লেখক

ওই যে প্যারী রোর গলি দিয়ে যাচ্ছি রাত্তিরবেলা পড়া থেকে উঠে গাঙ্গুলিবাবুর চায়ের দোকান থেকে চা পাতা কিনে আনতে। কে যেন এসেছে বাড়িতে, আর চা ফুরিয়ে গেছে। অন্ধকার গলিতে বাদল সরকারের বাড়ি থেকে আলো বেরোচ্ছে জানলা দিয়ে, আর বেরোচ্ছে ওদের নাটকের রিহার্সালের শব্দ। সন্ধেবেলা মানিকতলা বাজারে অন্যরকম বাজার। ঢাকা দেওয়া আলোর নিচে কলাপাতায় মোচা কাটছে একটা লোক। লালচে-বেগুনি রঙের কী সুন্দর বড় বড় মোচা। আর তার ভেতরে লাল পাতাটা তুললেই সরু সরু হলদে হলদে ফুল। তেঁতুল জমিয়ে কলাপাতায় মুড়ে বিক্রি করছে ওই লোকটা। লিচু, তালশাঁস, আমসত্ব। মাছের বাজারে বরফে চাপা দেওয়া ইলিশ মাছ চল্লিশ পাওয়ারের ডুমের নিচে। আর হলদে-কমলা রঙের শুঁড় তোলা তোপসে মাছ। অনেক দাম। রজনীগন্ধার মালা বিক্রি করছে ওই লোকটা। আর কালীপুজোর সময়ে চুড়ো করে রাখা চিনির মঠ বিক্রি হচ্ছে গোলাপী আর সাদা রঙের। ওদিকে চাঁদমালা বিক্রি হচ্ছে, আর বাজি তৈরি করার সোরা আর গন্ধক পাহাড়ের মত রাখা আছে। তার পাশেই একটা দোকানে কাঠকয়লা আর ধূনো কিনছে একটা লোক। ধূনো জ্বালানোর কী সুন্দর গন্ধ আর মিষ্টি মিষ্টি ধোঁয়া। নাক ডুবিয়ে গন্ধ শুঁকে কী মজা!

আমি হেঁটে যাচ্ছি আজ চৌরঙ্গির মোড় থেকে পুরো গড়ের মাঠটা পাড়ি দিয়ে কোনাকুনি সেই ইডেন গার্ডেন, রেড রোড। জর্জ টেলিগ্রাফ, উয়ারি, রাজস্থান, রেঞ্জার্স ক্লাবের পাশ দিয়ে। আরো দূরে চলে যাই ঘাসের ওপর দিয়ে, চটি খুলে। বৃষ্টি পড়েছে একটু আগেই। পা পিছলে যাচ্ছে ঘাসের ওপর একটু একটু। প্যান্ট গুটিয়ে নিয়েছি যাতে বেশি কাদা না লাগে। আমাকে যেতে হবে সেই ফোর্ট উইলিয়াম পার হয়ে যেখানে ট্রাম লাইন শেষ হয়ে গেছে, সেখানে। অবশ্য, যেতে হবেই না। না গেলেও চলে। কিন্তু, আমি যাব আজ। দেখে আসব ওই ট্রাম লাইনের শেষে কী আছে। ওখানটা খুব সবুজ। গাছপালা। ঘাস।

মিটিং মিছিল প্রতিবাদ ধর্মঘট রাস্তায় নেমে অত্যাচার অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই। এই কলকাতাই সারা জীবন জেনে এসেছি। আর পুরুষ নারীর হাতে হাত মিলিয়ে রাস্তায় হেঁটে যাওয়া। - লেখক
মিটিং মিছিল প্রতিবাদ ধর্মঘট রাস্তায় নেমে অত্যাচার অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই। এই কলকাতাই সারা জীবন জেনে এসেছি। আর পুরুষ নারীর হাতে হাত মিলিয়ে রাস্তায় হেঁটে যাওয়া। – লেখক

আরো হাঁটা। আরো হাঁটা। শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় থেকে হেঁটে খুঁজে খুঁজে চলে গেলাম দেবাশিসদের বাড়ি পাল স্ট্রিটে। ওদের বাড়ি সন্ধেবেলা বন্ধুরা জুটেছে সব, আর রেকর্ড প্লেয়ারে দেবব্রত বিশ্বাসের আটাত্তর স্পীডের রেকর্ড বাজছে। “আমি যখন তাঁর দুয়ারে ভিক্ষা নিতে যাই।” দেবাশিসদের বাড়ি খাটের নিচে কার্টন কার্টন ডিম রাখা থাকে। আবার রামচন্দ্রখালিতে রফিকুল ইসলামের বাড়ি খাটের নিচে রাখা থাকে আলু পেয়াঁজ বস্তা বস্তা। আমরা গেলাম বিয়ের পর, আমি আর মুক্তি। রফিকদা নিজের হাতে রান্না করলো হারিকেনের আলোয়। কী আনন্দ! ওর ছোট মেয়েটা, লোপা না ত্রপা কী যেন নাম, আমার কথায় হেসেই কুটিপাটি। পরের দিন সকালে লঞ্চ ধরে মিতাদের কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে সন্দেশখালী টাইগার প্রজেক্ট। পুরন্দরের মুখে বিশাল চওড়া মাতলা নদী। ওখানে নাকি আগেকার দিনে জলদস্যুরা আসত তাদের ছিপখান তিনদাঁড় তিনজন মাল্লা নৌকো নিয়ে, আর বড় বড় জাহাজ লুঠ করে ডুবিয়ে দিত। আমরা যাই জয় বাবা সত্যপীর লঞ্চে করে পাঠানখালী। লঞ্চের নিচের খোলে বয়লারের পাশে বসে থাকি। কানফাটানো বয়লারের শব্দ অব্যেস হয়ে গেছে। গল্পের বই পড়তে পড়তে চলে যাই তিন ঘণ্টা ক্যানিং থেকে হাজী দেশারত কলেজ। সন্ধ্যার মা বসে আছে ছোটবাবুর জন্যে ভাত ঢাকা দিয়ে। নাকি, দেরি দেখে চলেই গেছে বাড়ি।

আরো হাঁটা। আরো হাঁটা। বাড়ি থেকে বিদ্যাসাগর কলেজ, বুবুকে হোলি চাইল্ড স্কুলের সামনে ছেড়ে দিয়ে। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে সন্ধেবেলা প্র্যাকটিকাল ক্লাস করে হেঁটে ফিরি প্রতাপের সঙ্গে। মাঝে মাঝে শুক্লার বাড়ি যাই। মা এখন আর জি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বাড়ি গিয়ে দেখব কানাই হয়ত কিছু রান্না করে রেখেছে। নইলে আবার হাঁটা। রাজলক্ষ্মী হোটেল থেকে টিফিনবাক্সতে করে ভাত আর রুই মাছের ঝোল দুটাকায়। নয়তো আরো একটু হেঁটে দিদির বাড়ি। ওদের নিজেদেরই রান্না হয় না, তো আমাদের আবার কী দেবে। বাবা মাঝে মাঝে রান্না করে অফিস থেকে ফিরে। আমি কোনোদিন রান্না করি নি। মা থাকতে আবার কোন ছেলে রান্না করে আমাদের দেশে?

আরো হাঁটা। গোয়াবাগান পার্কে অলকদের বাড়ির নিচে বসে আড্ডা। সুব্রত, অলক, আমি, শুক্তি, অমরনাথ, প্রণব, প্রতাপ, ডাবলু, রবি, সোনিয়া সমীর, আর মাঝে মাঝে পার্থ মুখার্জী, অঞ্জন আর নিখিল। তারপর, অঞ্জন, নিখিল আর সমীর তিনজনেই কয়েক বছরের মধ্যে শেষ হয়ে গেল। সুব্রত গেল আরো অনেক পরে। আমি ওদের মৃত্যুর সময়ে ছিলাম না। আমি ছিলাম তরুণ বড়ালের সময়ে। ছোটমামার সময়ে। মার সময়ে। রামজেঠুর সময়ে। হেঁটে হেঁটে, হেঁটে হেঁটে সেই নিমতলা শ্মশান। আবার একবার হেঁটে হেঁটে গেলাম সুহৃদবাবুর কফিনের সঙ্গে পার্ক স্ট্রিট সেমিটারি। আর হেঁটে হেঁটে গেলাম দুর্গাপুজোর ভাসানের সঙ্গে, কালিপুজো, সরস্বতী পুজোর ভাসানের সঙ্গে। ঢাক আর কাঁসি বাজছে লরিতে ক্লান্ত সুরে। ঠাকুর বসে আছে লরিতে একা। জেনারেটার চলছে একটানা ঘট ঘট ঘট ঘট…।

কলকাতার রক। কলকাতার বন্ধু। কলকাতার আড্ডা। হাসি, গল্প, গান। আর একটু পরনিন্দা পরচর্চা। এই আমাদের মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য। - লেখক
কলকাতার রক। কলকাতার বন্ধু। কলকাতার আড্ডা। হাসি, গল্প, গান। আর একটু পরনিন্দা পরচর্চা। এই আমাদের মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য। – লেখক

দুঃখ। আবার সুখ। পুজো। গানের জলসা। ক্যারাম টুর্নামেন্ট। স্কটিশ গ্রাউন্ড সেই বাগমারিতে। হেঁটে হেঁটে গিয়ে বর্ষার বিকেলে ফুটবল যুদ্ধ। কাদা মেখে বাড়ি ফিরলাম সন্ধেবেলা। এক বালতি ঠাণ্ডা জলে চান করে রুটি আর এঁচড়ের ডালনা। বাস ধরে প্রতাপের সঙ্গে সেই পাইকপাড়ায় নর্দার্ন এভিনিউতে দীপকবাবুর বাড়ি পড়তে যেতে হবে রাতে। বি এস সি পার্ট টু। সালোক সংশ্লেষ। ইকোনমিক বোটানি। জেনেটিক্স। মাইয়সিস, আর ক্রসিং ওভার। হোয়াইট হাউসের মডেল এবারে নাকি আসবেই পরীক্ষায়। দীপকবাবু প্ল্যান্ট জিওগ্রাফি পড়িয়ে দিয়েছেন কবিতার ছলে, “ফুল যত গোলাপ আর রঙ্গনের সাথে, ক্রোটনের কেবলি চলেছে খেলা…।”

সত্যি, আনন্দ যেন মনের ভেতর থেকে একটা একটা করে আশ্চর্য রংমশালের ফুলকি। ফুলঝুরির আলো। হাতচরকি। এ আলো জ্বালার জন্যে বড়লোক হতে হয় না। এ আলো সর্বজনীন। ঐশ্বরিক। ভগবানে বিশ্বাস রাখতে পারি নি নিজে। এত মৃত্যু, এত বঞ্চনা, অবিচার, দারিদ্র্য, অপমান। কিন্তু “ওই যে দাঁড়ায়ে নতশির, ম্লানমুখে লেখা শুধু শত শতাব্দীর বেদনার করুণ কাহিনী”—তাদের জন্যে যদি কোনো মহাজাগতিক শক্তি একটু আনন্দের আলো ছড়িয়ে দিয়ে থাকেন, জ্বালিয়ে দিয়ে থাকেন, সেই আলোতে নিজেও আলোকিত হতে বাধা কোথায়?

বীরেশ্বর মামার ছোট্ট বইয়ের দোকান স্কটিশের ঠিক উল্টোদিকে। আমাকে বলছে, “এই বইটা নিয়ে যা। পড়। মানুষ এলো কোথা থেকে।” সে কবেকার কথা। কী সুন্দর সব ছবি। নিয়েন্ডারথাল মানুষ। মানুষের বিবর্তনের গল্প। আদিম থেকে আধুনিক হবার গল্প। আবার, অনেক কাল পরে তাঁর ছোটভাই গায়ক ভাস্করমামা তেত্তিরিশ নম্বর বাসে আমাকে দেখতে পেয়ে সহকর্মীকে বলছে, “দেখ দেখ, মামা বাসের কন্ডাকটর, আর ভাগ্নে কলেজের প্রফেসার। দেখে যা।”

অমরনাথ উপাধ্যায়দের বাড়ির ভেতর থেকে রোদে আমের গন্ধ। উঠোনের সরু জায়গাটায় একটা হাঁড়ি বের করে রেখেছে কে, তাতে ভাত লেগে আছে। ভালো ঘুড়ি জোড়া যেত। কলের মুখে একটা ন্যাকড়া জড়ানো। জল পড়ছে চূঁইয়ে চূঁইয়ে। আমরা হাসছি। আড্ডা দিচ্ছি। নাটকের রিহার্সাল দিচ্ছি দুপুরবেলা। চিরকুমার সভা পড়ে হাসতে হাসতে খুন। একাডেমি অফ ফাইন আর্টসে রদ্যাঁর ভাস্কর্যের এক্সিবিশন হচ্ছে। দা থিঙ্কার। চল সব দল বেঁধে। বুঝি বা না বুঝি। উদয়ন, আর কে কে যেন। লম্বা লাইন।

কলকাতার বই মেলা। আমাদের কাছে আর একটা তীর্থস্থান। মাথায় থাকুন কালিঘাট দক্ষিণেশ্বর।  এই আমাদের আসল মন্দির।  - লেখক
কলকাতার বই মেলা। আমাদের কাছে আর একটা তীর্থস্থান। মাথায় থাকুন কালিঘাট দক্ষিণেশ্বর। এই আমাদের আসল মন্দির। – লেখক

কত সুখ। কত আনন্দ। কত মানুষ। কত ঘটনা। কতগুলো বছর। কতগুলো মাস। দিন। হাফপ্যান্ট থেকে ফুলপ্যান্ট। সরু গলা থেকে ভাঙা গলা। তারপর ভারি গলা। ইস্কুল থেকে কলেজ। কলেজ থেকে ইউনিভার্সিটি। ইউনিভার্সিটি থেকে কলেজে পড়ানোর চাকরি। একটু একটু করে, একটু একটু করে জীবনের অনেকটা পথ একেলা চলে এলাম। সঙ্গে ছিল কিছু প্রিয়জন। তাদের কয়েকজন চিরকালের মত চলে গেল। আবার এলো কয়েকজন নতুন লোক। পুরনো ভালবাসার লোককে হারালাম। আবার নতুন ভালবাসার লোককে খুঁজে পেলাম। পুরনো ভালবাসার জিনিসকে ফেলে চলে এলাম। আবার, নতুন ভালবাসার জিনিসকে ধরলাম আঁকড়ে।

***

এবার সখী সোনার মৃগ দেয় বুঝি দেয় ধরা
আয়গো তোরা পুরাঙ্গনা, আয় সবে আয় ত্বরা।

তোমরা এস। পুরাঙ্গনারা এস। পুরনাগরিকরাও এস। পল্লীবালিকা, তুমিও এস। রাখালবালক, কী জানি কোথায় সারাদিন, তুমিও এস। পুরপিতা, তুমিও এস। দেশমাতা, তুমিও এস। আমি তোমাদেরই দেশের ছেলে। আমি আজ বিদেশে যাচ্ছি। যাচ্ছি, কিন্তু ফিরে আসব একদিন নিশ্চয়ই। তোমাদের কাছে আমার মন বাঁধা দিয়ে যাচ্ছি। আমাকে ভুলো না।

সোনার হরিণ কাকে বলে, জানি না। অর্থলোভ, ধনদৌলতের প্রতি লালসা কখনো ছিল না। অর্থের লোভে, ধনের কাঙাল হয়ে আমি আমার গরিব জন্মভূমি পিছনে ফেলে যাচ্ছি না। আমার দেশের রক্ষাকর্তা বিধাতারা আমাকে কোনো স্বীকৃতি দিলেন না। আমাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করেই রেখে দিলেন। আমার কষ্টের শরিক তাঁরা হলেন না। আমার সংগ্রামের সাথী হলেন না। আমার মত গরিব ঘরের একটা ছেলে, যে স্বপ্ন দেখতে চেয়েছিল, বাঁচতে চেয়েছিল দুটো হাত ছড়িয়ে আকাশটাকে ধরে, প্রাণভরে খোলা হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিতে চেয়েছিল, তাকে সে সুযোগ তাঁরা দিলেন না। একটা পবিত্র, তীব্র ইচ্ছের, প্রতিভার সমাদর তাঁরা করলেন না। আমার। আমার মত আরো কত আছে, তাদের। সঠিক মূল্যায়ন তাঁরা করলেন না। মনুষ্যত্বের, অধিকারের, সমান সুযোগের দাবি প্রত্যাখ্যান করলেন তাঁরা। তাই আজ আমি বাধ্য হচ্ছি দেশ ছেড়ে চলে যেতে। এক মহা অনিশ্চিতের দিকে পা বাড়াতে।

স্বদেশের ওপর, দেশের মানুষগুলোর ওপর আমার কোনো রাগ অভিমান নেই। আমার অভিমান, আমার ক্ষোভ শিখরে বসে থাকা সেই লোকগুলোর ওপর। যারা আমাকে মাথা উঁচু করে এদেশে বাঁচতে দিল না। যারা আমার সততা, আমার বাবার সততা, আমার মায়ের সততার, করুণার, ত্যাগের কোনো দাম দিল না। আমি তাদের ক্ষমা করতে পারি না।

বাংলাদেশের, কলকাতার প্রতিটা ইট-পাথর আমার কাছে পবিত্র। প্রতিটা নদী, জলাশয়, রাস্তা, বনজঙ্গল, অলিগলি, ফুটবল মাঠ, গানের ক্লাস, পাড়ার রকে বসে বসে দাবা খেলে যে লোকগুলো সারা দুপুর ধরে, ওই বিশুদা, শিবুদা, চিটুদা, পল্টুদা, ওই কাবেরী, সংঘমিত্রা, শান্তা, শিউলি, কুহু, মাধু, ওই সুব্রত, বাবু, বুড়ো, কার্তিক, গণেশ, হরিশ, রঞ্জন, চন্দন, অলক, প্রতাপ, দেবাশিস, শূলপাণি, রফিক, মতিয়ুর, ওই সন্ধ্যার মা, রামের মা, অশোকা, সনকা, কমলা, মায়া, মহামায়া, লক্ষ্মী—তোমরা সবাই আমার নিজের লোক, আমার আত্মীয়। আমাকে ভুলে যেও না।

একাডেমী অফ ফাইন আর্টসকে বাঁচানোর দাবিতে শিল্পী লেখক কবিদের ধর্ণা। কলকাতার হৃদয় সাহিত্য শিল্পের কাছেই বাঁধা দেওয়া আছে। - লেখক
একাডেমি অফ ফাইন আর্টসকে বাঁচানোর দাবিতে শিল্পী লেখক কবিদের ধর্ণা। কলকাতার হৃদয় সাহিত্য শিল্পের কাছেই বাঁধা দেওয়া আছে। – লেখক

শান্তিনিকেতনের সেই বসন্তের সন্ধ্যায় মধুব্রত, সুরজিৎ, শ্যামল, সত্যব্রত, মলয় আর সব বন্ধুর সঙ্গে উথালি পাথালি যৌবনের গান গাইতে গাইতে হঠাৎ ঢুকে পড়েছিলাম একটা বাড়িতে। বাড়ির দাওয়ায় একজন মানুষ রবীন্দ্রনাথের গান গাইছিলেন। স্বপ্নের মত মনে হয় এখন। একটার পর একটা গান। আর আমরা বাইশ চব্বিশ বছরের কলকাতার সবজান্তা, কলার তোলা, রংবাজ চ্যাংড়া ছেলের দল মন্ত্রমুগ্ধের মত সামনের উঠোনে বসে শুনছিলাম।

“বাকি আমি রাখব না কিছুই
তোমার চলার পথে পথে
ছেয়ে দেব ভুঁই।”

এক সাধক। লালন, নাকি রামপ্রসাদ, নাকি সিরাজ সাই, ভোলা ময়রা, জর্জ বিশ্বাস, নাকি অন্য কেউ? সবই যেন মিলেমিশে একাকার।

তাঁরই বাড়ির দাওয়ায় বসে তিনি নিজের মনে গাইছিলেন,

“আমার প্রাণে আছে জানি সীমাবিহীন গভীর বাণী,
তোমায় চিরদিনের কথাখানি বলব—বলতে যেন পাই।”

তারপর, ঝড় উঠলো। গানের আসর ভেঙে গেল। কিন্তু মনের মধ্যে চিরকালের মত রয়ে গেল সেই গানের রেশ।

সীমাবিহীন গভীর বাণীর কথা। সে কথা কখনো মুছে যাবে না। সেকথা আমার জন্মভূমির কথা। আমার গরিব ঘরের কথা। আমার মায়ের কথা। আমার মায়ের ভাষার কথা।

তোমায় চিরদিনের কথাখানি বলব। বলতে যেন পাই।

বলতে দিও আমায়।

(ঘটিকাহিনী প্রথম খণ্ড সমাপ্ত)

Tags from the story
More from পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়

ঘটিকাহিনী (৩)

ক্লাস থ্রি পর্যন্ত খুব চুপচাপ, লাজুক আর ভালোমানুষ আমি, পার্থ, ক্লাস ফোরে...
Read More