ছোটকালে আমি চাইতাম হাওয়ায় মিলায়ে যেতে। অদৃশ্য হয়ে যেতে। তবে একেবারে নাই হয়ে যাব না। মানে আমি থাকব ঠিকই কিন্তু আমাকে দেখা যাবে না যখন তখন।

তখন আম্মা খুব মারত পড়ার জন্য। সন্ধ্যার সময় ঘরে ঘরে সিরিয়াল চলে। আর আম্মা আমাকে মারে। মাইর খেয়ে আমি যত জোরে চিৎকার করে উঠি, তত জোরে জোরে মারে। পড়ার টেবিলে তিন ঘণ্টা বসে থাকার জন্য মারত। জোরে জোরে চিৎকার করে, কণ্ঠনালী যেন বের হয়ে আসে এরকম চিৎকার করে পড়ার জন্য আমাকে মারত। আমি জোরে জোরে কানতে পারতাম কিন্তু পড়তে পারতাম না। আমার লজ্জা লাগত।

অতক্ষণ আমার পড়ার টেবিলে বসে থাকতে ইচ্ছা করত না। ভাল লাগত না, মাথা চুলকাইত, পা চুলকাইত, খিদা লাগত, তৃষ্ণা পাইত। কিন্তু টেবিল ছেড়ে উঠতে গেলেই আম্মা মারত।

আমি তখন সন্ধ্যাবেলা কাঁধের দুই পাশে দুইটা বেণি ঝুলায়ে পড়ার টেবিলে পা দুলায়ে দুলায়ে ম্যা.. ম্যা.. ম্যা.. ধরনের আওয়াজ করতে করতে বইয়ের কোনো অর্থহীন লাইনের দিকে তাকায়ে ভাবতাম, যদি এমন হইত—একটা ট্যাবলেট খাইলাম আর অদৃশ্য হয়ে গেলাম! তারপর আম্মার চোখের সামনে দিয়ে বের হয়ে চলে গেলাম বাইরে। আর রাস্তার এতসব মানুষের সামনে দিয়েই নাচতে নাচতে গিয়ে আফজালের দোকানের সামনে থামলাম। না থামব না, সেখানে দাঁড়ায়ে একটা খেমটা নাচ নাচলাম! সবার সামনে জোরে জোরে লাফ দিলাম, চিৎকার করে হাসলাম, অথচ কেউ কিছু দেখল না। কেউ শুনল না!

আফজালের দোকানের সামনে যারা সন্ধ্যা থেকে ক্যারাম খেলে, মুড়ি খায়, চিল্লায়, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে ঝগড়া করে তাদের সবার চুল টেনে ধরব আমি। জোরে জোরে হাসলে দিব গালে ঘুষি। ওরা বুঝতেও পারব না কে ওদের এত মাইর দিল!

তারপর নাচতে নাচতে চলে যাব মুন্নির বাড়ি। মুন্নির বাড়ির সবাই সন্ধ্যাবেলায় মুড়ি খেতে খেতে সিরিয়াল দেখে। আমি সেখানে মুন্নির কোলে বসে থাকব। কেউ দেখবে না। না, না, মুন্নি খুবই শুকনা মেয়ে, ওর কোলে না, ওর বাবার কোলে বসলেই ভাল হবে। উনার বাটিতে শুধু মুড়ি না, গুড়ও থাকে। অল্প অল্প খাওয়াও হবে সেইখানে।

রাতের বেলা আমার বাসায় সব ঘুমায়ে গেলে আমি একবার বাইরে গিয়ে হেঁটে আসব। বড় রাস্তায় যাব। বড়লোকদের বাড়িতে ঢুকে যাব। ওরা এসি ছেড়ে ঘুমায়। ওদের নরম নরম কম্বলের নিচে ওদের সাথে ঘুমাব আর সকাল হবার আগেই আবার বাসায় এসে পড়ব। বাসার কেউ টেরও পাবে না আমি রাতে বাসায় ছিলাম না!

এইগুলা ভাবতে ভাবতে কখন আমার চোখ-মুখ-মাথা ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে পড়ে যাইত বইয়ের উপর আর  আম্মা এসে শক্ত করে আমার চুলের মুঠি ধরে চিকন বেত দিয়া মারত। মাইর খাইতে খাইতে, কানতে কানতে আমি আবার ভাবতাম অদৃশ্য হবার কথা।
তারপর একদিন শুনলাম ক্লোনের কথা। মানুষের হুবহু আরেকটা মানুষ বানানো যায়। আমেরিকা-ইউরোপের মানুষ নাকি বানায়া ফেলছে এক মানুষের মত আরো শত শত একই মানুষ।

ইস্! যদি আমার একটা ক্লোন থাকত। ক্লোনটারে পড়ার টেবিলে বসায়া রেখে আমি চলে যেতাম দেশ হতে দেশ-দেশান্তরে! তিন ঘণ্টা পরে ফিরে আসতাম। ক্লোনটারে ব্যাটারি খুলে খাটের নিচে রেখে দিতাম। কেউ টেরও পাইত না।

অদৃশ্য হওয়া অসম্ভব হইলেও ক্লোন কোনো অসম্ভব কিছু না। যাদের টাকা আছে তাদের ক্লোন আছে। তারা নিজেদের কয়েকটা ক্লোন বানাইছে। তারা দেশের প্রধানমন্ত্রী তাই যখন কোনো বোরিং সভা-সমিতিতে যায় তখন ক্লোনরে পাঠায়া দেয় আর আসল প্রধানমন্ত্রী ঘরে বসে চিল করে। বোরিং বিদেশ ভ্রমণে ক্লোনকে পাঠায়া দেয় আর নিজে ঘরে ঘুমায়। কিন্তু আমি তো কোনো প্রধানমন্ত্রী না, কোনো বড়লোক না, বিদেশি না—কোথায় পাব ক্লোন করার টাকা?

টাকা পাওয়ার একটাই উপায় বেশি করে, ভাল করে পড়ালেখা করা। পড়ালেখা করে বড় বড় অফিসে চাকরি করে বেশি বেশি টাকা কামাই করা। আর এই একটা কাজই, এই পড়ালেখাই আমার দ্বারা হবে না।

কিন্তু এই কথাটাই আম্মা বোঝে না। সারাদিন বলে—পড়, পড়, পড়। পড়ালেখার জন্যই আম্মা অনেক কিছু পায় নাই জীবনে। তাদের সময়ে নাকি মেয়েদের কেউ পড়তেই দিত না। পড়ালেখা করানোর কোনো চিন্তাও কারো মাথায় আসত না।

আমার আম্মার বোধহয় খুব ভাল লাগত পড়াশোনা। আম্মা কি ডাক্তার হতে চাইত? নাকি ইঞ্জিনিয়ার? কে জানে! কিছু বলেও না। শুধু বলে, “পড়ালেখা ছাড়া কোনো গতি নাইরে মা, মানুষের ঘরের বান্দির মত জীবন কাটাইতে হবে, গোলাম হয়ে থাকবি, চাকরানি হইতে না চাইলে ভাল করে পড়।”

আম্মা তো কিচ্ছু পড়তে পারে না, এমনকি বাংলা একটু একটু পড়তে পারলেও ইংরেজি দেখলে ভয়ে কাঁপে। আর আমাকে সারাক্ষণ বলে পড়তে। বই নিয়া বসে বসে অর্থহীন বিড় বিড় করলেই আম্মার শান্তি। কার ভাল লাগে সারাদিন বিড় বিড় করতে! মাঝে মাঝে মনে হয়, আম্মার এই পীড়াপীড়ির জন্যই লেখাপড়া জিনিসটা আমার এত অসহ্য লাগে!

হুশ্, কেন আমার এইসব কথা মনে পড়ল? কী ভাবতাম, কেন ভাবতাম, ব্যর্থ সব ভাবনা! এইগুলা ভাবলে আমার বিরক্ত লাগে নিজের প্রতি এইটা ভেবে আমি কুয়ার মধ্যে ঝাঁপ দিলাম। জ্বি, ঝাঁপ  দিলাম। কিন্তু মরার জন্য না। কুয়ার মধ্যে সাঁতার কাটতে আমার ভাল লাগে।

এইরকম একটা কুয়ার পারে পরাগের সাথে আমার প্রেম হইছিল। আমি তখন টেনে পড়ি আর দুপুরের পরে বাসার সামনের উঠানে কুয়ার পাশে পাটি বিছায়া বসি। সমাজ বই নিয়া এমসিকিউ দাগাই। সবাই তখন ঘুমায়। বাইরে অল্প অল্প বাতাস হয়। বাতাসে অল্প অল্প আওয়াজ থাকে। ঘরে ঘরে সিলিং ফ্যানের আওয়াজ ছাড়া কিছু শোনা যায় না। আমার আম্মা তখন ঘুমায় না। আম্মা আমার মাথায় তেল দেয়, উকুন বাছে।

সেদিন অনেক গরম পড়ছে। বৈশাখ মাস। ভ্যাপসা গরম। আমি দর দর করে ঘামতেছি। আম্মাও উকুন বাছতে বাছতে আঁচল দিয়ে নিজের কপালের ঘাম মুছতেছে। বাতাস নাই। গাছের একটা পাতাও নড়ে না। আকাশ কেমন ঘোলা রঙের হয়ে রইছে। আমি একটু পর পর আকাশের দিকে তাকাইতেছি। এমন সময় জোরে একটা বাতাস এসে গেল আর ধাক্কা লেগে তেলের শিশিটা মাটিতে পড়ে গেল। সেটার মুখ ছিল খোলা, তির তির করে সমস্ত তেল পড়ে গেল মাটিতে আর আম্মা আমাকে বকতে বকতে সেই ‘আর একটু খানি তেল আছে’ শিশিটা রাখতে গেল বাসার ভিতরে।

এমন সময় একটা ছেলে গলা খাঁকারি দিল। আমি চমকে উঠলাম। এই ভরদুপুরে গলা খাঁকায় কে?

ওমা কী সুন্দর একটা ছেলে!

লম্বা, চওড়া, বাদামি রঙ, সুন্দর সাদা শার্ট পরা, আর নায়কদের মত ঢেউ খেলানো চুল! হঠাৎ বাতাস বইতে শুরু করল। ঝোড়ো বাতাস। এত ঠাণ্ডা বাতাস, মনে হচ্ছে ঝড়বৃষ্টি নিয়ে আসবে। বাতাসে ছেলেটার সব চুল পেছনের দিকে চলে যাচ্ছে, আর আমার চুলে জপ জপ করে তেল দেওয়া, একটা চুলও টু শব্দ করতেছে না। আমি চোখের কোণা দিয়ে আমার চুলগুলা দেখতে চাইলাম। হইল না। ঠোঁটে অল্প বাতাস বের করে উপরের দিকে পাঠায়ে চুলগুলা নাড়ানোর চেষ্টা করলাম। হইল না।

ছেলেটা তখনই আমাকে বলল, হাকিম সাহেবের বাসা কোনটা?

এত সুন্দর একটা ছেলে অথচ খুঁজল একটা খাইষ্টা লোকের বাসা! হাকিম সাহেবের বাসায় কেউ যায় নাকি? আর কোনো বাসা পাইল না?

আমি বই বন্ধ করে বললাম, আচ্ছা আপনার নাম কী?

ছেলেটা ঢোক গিলে বলল, পরাগ। হাকিম সাহেবের বাসায় যাব।

এমন সময় আবার বাতাস উঠল। এক গাছ থেকে আরেক গাছে। এক ডাল থেকে আরেক ডালে। কয়েকটা কাক ঘুমাচ্ছিল বোধহয়, ওরা কা কা কা করে ডাকতে ডাকতে কই জানি চলে গেল।

আমি উপরের দিকে তাকায়া ফুঁ ফুঁ করতে করতে কাকগুলারে দেখলাম। তারপর পরাগকে বললাম, আচ্ছা, আপনার কি কোনো ক্লোন আছে?

পরাগ বলল, মানে?

আমি বইটা পাটির উপর রেখে বললাম, ধরেন আরেকটা পরাগ যদি থাকে, সে এখন ওই খাইষ্টা লোক হাকিমের বাসায় গেল। আর আপনি এইখানে পাটির উপরে আমার পাশে বসে থাকলেন। আর আমার যদি একটা ক্লোন থাকে সে এখন পাটির উপরে বসে থাকল। আমি আপনার সাথে ঘুরতে গেলাম। তাহলে আপনার কাজও হইল, আমার কাজও হইল।

পরাগের চোখ বড় বড় হয়ে গেল। বাতাসে তার চুল আরো জোরে জোরে উড়ল। এমন জোরে যে আমার মনে হইল ওর মাথা ছেড়েই চলে যাবে সেইগুলা। এমন সময় যার আসার কোনো দরকার ছিল না, সে—আমার আম্মা—চিৎকার করতে করতে এসে হাজির হইল।

বলল, শবনম, ঝড় আসতেছে, ঝড় আসতেছে, ঘরে যা।

ঝড় আর আসতেছে কী, এসেই গেছে। শোঁ শোঁ আওয়াজ করে আমার চোখেমুখে এতগুলা বালি ঢুকে গেল আর আমি আমার বই, খাতা, নীল কলম, লাল কলম, সবুজ কলম, টু বি পেনসিল, ইরেজার—সব, সব হারায়া ফেললাম। আকাশে ভয়ঙ্কর শব্দে বাজ পড়ল। চারদিক নীল হয়ে আবার সাদা হয়ে ঝুম ঝুম করে বৃষ্টি শুরু হইল। এইসবের মধ্যে আমি চোখ খুললাম। দেখি আমার সামনে পরাগ ভিজতে ভিজতে কাঁপতেছে, ওর চুল থেকে সমানে পানি পড়তেছে ওর মুখে আর একটার পর একটা বাজ পড়ে ওর চেহারা হইতেছে পূজামণ্ডপের দেবীর মতন—একবার সাদা, একবার নীল, একবার কালো, একবার সাদা।

আমি দৌড় দিয়া বাসায় ঢুকতে গেলাম। মাঝপথে থেমে গেলাম। কী মনে করে পেছন ফিরে আঙুল দিয়ে ডানে দেখায়া বললাম—ওই যে, খাইষ্টা হাকিমের বাড়ি।

খাইষ্টা হাকিমের বাড়িতে যাওয়া তো দূরের কথা, ওই লোকের বাসার সামনে দিয়াও কেউ হাঁটে না। ওর নাকি কুষ্ঠ রোগ হইছিল। কুষ্ঠ রোগ কী জিনিস আমি জানি না, পোলাপানরা বলে এইটা কুষ্ঠ—ওরা সিনেমায় দেখছে,  কিন্তু আম্মা বলে কুষ্ঠ বলে কোনো কিছু এখন আর নাকি হয় না। খাইষ্টা হাকিমের কান থেকে মাথা, ভ্রু থেকে ঠোঁট পর্যন্ত জায়গায় জায়গায় সাদা সাদা ছোপ। পাড়ার পোলাপান তাকে দেখামাত্র যে যেখানে পারে দৌড়ে পালায়।

এর কারণ অবশ্য কুষ্ঠ না, খাইষ্টা লোকটার খাইষ্টা স্বভাব। আমাদের এই সরকারি কলোনির এ পাড়ায় যত ছেলেমেয়ে আছে, সব ছেলেমেয়ের সাথেই এই লোকের কোনো না কোনো কুকাহিনি আছে। হয় কোনো বাচ্চারে কোলে নিয়ে আদর করার নাম করে সে প্যান্টের চেইন খুলে ওইখানে হাতাইছে, অথবা কোনো মেয়ের জামার ভিতরে হাত দিয়ে কখনো না কখনো কচলাইছে। পাড়ার সব ছেলেমেয়ে নিজেদের মধ্যে এই কথাগুলা আলাপ করে। বাপ-মাকে এগুলা বলা সম্ভব না। তাই সবাই একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিছে যে, ওই খাইষ্টা হাকিমের বাসার সামনে দিয়েও কেউ হাঁটবে না।

এইরকম একটা লোকের বাসায় পরাগ যাবে? কেন কলোনিতে বুঝি আর লোক ছিল না? খাইষ্টা হাকিমের বউ খুব সুন্দরী। কোন গ্রাম থেকে জানি মেয়েটারে বিয়ে করে আনছে! যেমন সাদা গায়ের রঙ, তেমন লম্বা উচ্চতায়, আর তেমনই লম্বা কালো চুল। ওই ব্যাটার বউকে অবশ্য বেশি একটা দেখা যায় না। বাসা থেকে বেরই হইতে দেয় না হারামজাদা লোক! হইতেও পারে পরাগ ওই ব্যাটার শ্বশুরবাড়ির লোক!

আমি বাসায় এসে আম্মার পিছে পিছে থাকলাম। আম্মা যেই রান্নাঘরে চুলা জ্বালাইল সেই বাসার সামনের দরজার ফুটা দিয়ে বাইরে তাকাইলাম। পরাগ কি আছে? নাকি আমার আঙুলের দিকে চলে গেছে?

না যায় নাই। বৃষ্টিতে ভিজতেছে। আর আমার বাসার দরজার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়ে আছে। যেন ওর উপরেই এতক্ষণ ঠাডাগুলা পড়ছে। খুশিতে আমার খিল খিল করে হাসতে ইচ্ছা করল। আমি চাই পরাগ এইখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়ায়া থাক। না যাক ওই বেটার বাড়িতে। ভেবেই আমি ফিক করে হেসে ফেললাম।

হেসে জিভ কাটতে গিয়ে দেখি আম্মা আমার পেছনে। আমার দিকে চোখ গরম করে বলল, এমনে এমনে হাসোস কেন? ভূতে ধরছে তোরে?

আমি মুখ অন্ধকার করে বললাম, কই আমি তো হাসি নাই! হাসি কই দেখলা?

আম্মা আরো রাগ হয়ে বলল, আমি এইমাত্র শুনলাম হাসির শব্দ। হো হো হো করে হাসতেছিস। কী কারণে?

আমি আবার অস্বীকার করলাম। তাছাড়া আমি হো হো হো করছি মনে মনে, আম্মা তো আর মনের শব্দ শোনে না।

আম্মা কড়া কণ্ঠে বলল, আজকে থেকে কুয়ার ধারে যাওয়া বন্ধ। কে জানে কী ভূত-প্রেত আছে ওইখানে। পরীক্ষার আগে তোরে আছড় না করে বসে!

২.
এই কুয়াটা দেখে আমার এতসব কথা মনে পড়ে গেল। আর মনে পড়ল বলেই তো সেইখানে ঝাঁপ দিলাম। প্রথমে ভাবছিলাম, কুয়ার ঠাণ্ডা পানিতে নামলে আমি বরফ হয়ে যাব। এমন কিছুই হইল না। উল্টা খুব ভাল লাগতেছে। মনে হইতেছে সেই ঝড়ের দিনের ঠাণ্ডা বাতাস যেন এখন আমার মনের মধ্যে ঢুকতেছে। নেশা ধরে গেল। সাঁতার কাটতে কাটতে আমি চলে গেলাম আরো নিচে, কুয়ার আরো গভীরে। এইবার ওঠা উচিত। নাহলে আর বাইরের দুনিয়া দেখতে হবে না আমার।

কথাটা মনে আসতেই চট করে একবার উপরে তাকাইলাম। কিচ্ছু দেখা যায় না। দিনের আলো পানিতে পড়ে ঘোলা পানির যে ঘোলা রঙ হয় সেটা আর নিজের শরীরের তৈরি এলোমেলো ঢেউ ছাড়া আর কিছুই না। এইবার সত্যিই আমার দম বন্ধ হয়ে আসতেছে। তাড়াতাড়ি হাত পা ছুঁড়ে উপরের দিকে ওঠার চেষ্টা করলাম আমি। আর তখনই ঘটল ঘটনাটা।

কুয়ার নিচ থেকে একটা হাত উঠে আসল। হাতটা আমাকে টেনে নিয়ে গেল নিচে, আরো নিচে। কুয়ার শেষ কিনারায় সবুজ ঘাসের ওপর লাল ফুল ফুটে আছে। কী আশ্চর্য! এই পানির তলায় ফুলও ফোটে!

দম নেবার জন্য যেন ফেটে যাইতেছে আমার ফুসফুস। হাঁস ফাঁস করতে করতে আর পারলাম না। অক্সিজেনের জন্য আকুলি-বিকুলি করা ফুসফুসটাকে বের করে আনলাম ভিতর থেকে। সেটাকে ভাসায়ে দিলাম কুয়ার পানিতে। ফুসফুসটা কী সুন্দর সাঁতার কেটে কেটে ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠতেছে, আর পানিতে ছড়াচ্ছে লাল রক্তের ফোয়ারা। আমি ভাবলাম এইভাবে নিজের ফুসফুসের পিছে পিছে তো আমিও উঠতে পারি! না,পারলাম না। দমবন্ধ হয়ে মৃত্যু। কী খারাপই না হইল ব্যাপারটা!
হানিমুনে এসে এইভাবে কুয়ায় পড়ে মৃত্যু? লোকে কী বলবে? আসাদ কী ভাববে? আসাদের মা? ভাববে না—আসাদের ব্যর্থতার কারণেই শবনম এমন একটা কাজ করল? আসাদের ডাক্তার নিশ্চয়ই ভাববে, শবনম দুঃখে আত্মহত্যা করছে! আর পরাগ? পরাগ কি ভাববে ওকে বিয়ে করতে না পেরে মরেই গেছি আমি? পরাগের মা কি খুশি হবে নাকি তারও মন খারাপ হবে?
ঘুম ভেঙে গেল। অনেকক্ষণ কড়িকাঠের দিকে স্থির চোখে তাকায়ে থাকলাম আমি। অনেকক্ষণ। কিছুই না ভেবে অনেকক্ষণ! কী যে সব স্বপ্ন দেখি আমি! সমুদ্রের গর্জন একদম কাছেই শোনা যাচ্ছে। এখন জোয়ারের সময়। এই কাঠের বাড়ির চারিদিকে বারান্দা। এখন যে কোনো দিকের বারান্দায় দাঁড়ালে দেখা যাবে নিচে সমুদ্রের ঢেউ এসে আছড়ে আছড়ে পড়তেছে। এই রিসোর্টের ম্যানেজার বলছিল আমাদের কালকে।

আমরা যখন এখানে এসে পৌঁছাইলাম, তখন মনে মনে অনেক বিরক্ত ছিলাম। এইসব প্রমোদ ভ্রমণ আমার ভাল লাগে না। তার উপর আসার আগে আসাদের বাড়িতে কত্ত কাহিনি! কিন্তু এই রিসোর্টটা দেখেই আমার খুব পছন্দ হইল। মনে হয় আসাদেরও। আসাদ অবশ্য কিছু বলে নাই।

আমাকেই জিজ্ঞাসা করল পছন্দ হইছে কিনা, কোন ঘরটা নিবে, দুপুরে কী কী খাবে!

সাত ঘণ্টার বাস জার্নি আর দুই ঘণ্টার জাহাজ ভ্রমণের পর ডাঙায় নেমে আবার পঁয়তাল্লিশ মিনিট ভ্যানগাড়িতে চড়ার পরে আমার মনে হইতেছিল শরীরে আর কোনো এনার্জি নাই। কিন্তু এই চমৎকার বাড়িটা দেখে সব ক্লান্তি চলে গেল। সমুদ্রের খুব কাছে বাড়িটা। কোনো হিন্দু ভদ্রলোকের বাড়ি ছিল মনে হয় কোনো কালে। উঠানের মাঝখানে তুলসি গাছটা আর নাই, কিন্তু বেদীমতন একটা জায়গা এখনো রয়ে গেছে। একসময়কার গেরস্থ বাড়ি এখন রিসোর্ট।

ঘরগুলির অবস্থান দেখলে বোঝাই যায়, কোনটা কেমন ছিল। যেমন এই যে বেশ বড় একটা মাঠমতন উঠান পার হয়ে মাঝারি আকারের পুকুর, এটা নিশ্চয়ই এমন জলা পুকুর ছিল না। হয়ত হাঁস ঘুরে বেড়াত ওটার স্বচ্ছ পানিতে—রাজহাঁস। তারপরেই যে ঘরটা এখন রান্নাঘর, সেটা নিশ্চয়ই আগেও রান্নার ঘরই ছিল। কাঠের দোতলা বাড়ির সামনে গোল করে যে দুইটা ঘর সেইগুলা কি আগেও ছিল নাকি নতুন করে বানানো , সেটা অবশ্য আমি ধরতে পারি নাই। দোতলা বাড়িটার দোতলা ঘরটাই আমার চাই, এই কথা আসাদকে বলতেই হেসে ফেলল ওই ম্যানেজার। কী যেন নাম ওর, এখন আর মনে পড়তেছে না। খুব পাজি সেই ম্যানেজার।

এমন সময় আসাদ ডাকল।

—শবনম, এই শবনম? ঘুম ভাঙল তোমার?

ওরে বাবা আসাদ একদম রেডি। মাথায় ক্যাপ। পরনে হাফ প্যান্ট, টি-শার্ট, চোখে সানগ্লাস। হাতে দু্‌ইটা ডাব। ডাবের কাটা মাথা থেকে দুইটা স্ট্র দুইদিকে মুখ করে বের হয়ে আছে। এই কিম্ভূতকিমাকার আসাদকে দেখে হাসি পাইল আমার।

আসাদ মনে হয় একটু বিব্রত হইল। পায়ের খালি জায়গা সুড় সুড় করতেছিল ওর। সেইটা কি পায়ে লেগে থাকা সমুদ্রের বালুর কারণে নাকি আমার এই বাঁকা হাসিতে সেইটা ঠিক বোঝা গেল না। আসাদ কিছু না বলে একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে চলে গেল বারান্দায়। আমি আবার ওই ছাদের দিকে তাকায়া থাকলাম। ভাবতে লাগলাম আরেকটু ঘুমাব কিনা। ঘুমালে আবার খারাপ খারাপ স্বপ্ন দেখব নিশ্চয়ই। কিন্তু স্বপ্ন ছাড়া আর কোথায় আমি পরাগকে দেখতে পাবো? আচ্ছা, পরাগের সাথে কি আর কোনওদিন আমার দেখা হবে না?

(চলবে)

Write A Comment