এম. এ. অর্থোফার

অনুবাদ: মৃদুল শাওন

২০১৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত লেখক জিয়া হায়দার রহমানের উপন্যাস ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো উপন্যাস। উপন্যাসটি বেশ ভালোভাবেই বিশ্বসাহিত্যের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

আন্তর্জাতিক সাময়িকীগুলির করা এই উপন্যাসের কয়েকটি রিভিউর আলোকে একটি রিভিউ করেছেন এম. এ. অর্থোফার। তার আলোচনার আগে সে রিভিউগুলি থেকে কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করে নিয়েছেন তিনি। এখানে অনুবাদে সে ধারা বজায় রাখা হলো।


শিরোনাম – ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো
লেখক – জিয়া হায়দার রহমান
ধরন – উপন্যাস
প্রকাশিত – ২০১৪
দৈর্ঘ্য – ৪৯৭ পৃষ্ঠা
পাওয়া যাচ্ছে – যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ভারত

 

‘কমপ্লিট রিভিউ’র মূল্যায়ন:

B : এর বেশিরভাগ অংশই মুগ্ধ করে, কিন্তু এটি উচ্চাভিলাষ দ্বারা আচ্ছন্ন

 

রিভিউ সংক্ষেপ

উৎস রেটিং তারিখ রিভিউ লেখক/ আলোচক
দি গার্ডিয়ান . ১৩/০৬/২০১৪ অয়ালেক্স ক্লার্ক
দি ন্যাশনাল . ১৬/০৪/২০১৪ ম্যালকম ফোর্বস
দি নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউ . ১৩/০৪/২০১৪ আমিতাভ কুমার
দি নিউ ইয়র্কার . ১৯/০৫/২০১৪ জেমস উড
দি অবজার্ভার A+ ৩১/০৫/২০১৪ অ্যালেক্স প্রেস্টন
পাবলিশার্স উইকলি . ১৪/০৪/২০১৪ .
সানডে টাইমস . ১/৬/২০১৪ ডেভিড গ্রিলস
দি টেলিগ্রাফ . ৯/৭/২০১৪ সামির রহিম
টিএলএস . ৪/৭/২০১৪ এডমান্ড গর্ডন
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল . ১৮/৪/২০১৪ স্যাম স্যাকস

 

রিভিউ থেকে

“যদি এটা তাচ্ছিল্যের মত শোনায় — লেখা সম্পর্কে লেখা, কর্তৃত্ব নিয়ে কৌশলী খেলা এবং নির্ভরযোগ্যতা — এটা সে ধরনের উপন্যাসের মধ্যে পড়ে না। বইটির গভীরতা আসলেই চিত্তাকর্ষক, এর গল্পগুলি সেগুলির প্রভাবে এতটাই বাস্তব যে সেগুলি বিভ্রম তৈরি করে। উপন্যাসের মূল উচ্চাভিলাষ শেষপর্যন্ত যেভাবে স্পষ্ট হয় তা মুগ্ধ হওয়ার মত; এই বইটিতে গল্পের সংগ্রহ, ঘটনাগুলির নৈপুণ্য, এতে ধৈর্য্যশীলভাবে সব সহজলভ্য প্রমাণের সাহায্যে প্রামাণ্যকরণ এমনভাবে রয়েছে যে আসলেই সেগুলি আমাদের কোথাও নিয়ে যায় — কিন্তু এটা আমাদের সব জায়গায় নিয়ে যেতে পারে না। — অ্যালেক্স ক্লার্ক, দি গার্ডিয়ান

 

এটা একটা বিশাল, আঁকাবাঁকা এবং একদম প্রাণবন্ত বর্ণনার মধ্যে অনেককিছুর বিচিত্র এক মিশ্রণ; একটি উপন্যাস এত বড় যে এটার ধসে পড়া উচিৎ, উদ্দেশ্যের দিক থেকে এতই উচ্চাভিলাষী যে এর হোঁচট খাওয়া উচিৎ। কিন্তু রহমান আমাদের শুরু থেকেই এমনভাবে জড়িয়ে রাখেন এবং এর তিক্ত সমাপ্তি পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান। এমন না যে বইটি সমালোচনার ঊর্ধ্বে। ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো খুব সরলভাবে এর জ্ঞান প্রদর্শন করতে আগ্রহী। একইসাথে এই উপন্যাসটি সম্পাদনার জন্য সম্পাদকের লাল কলম যথেষ্ট নয়, দরকার একটি কাস্তে। — ম্যালকম ফোর্বস, দি ন্যাশনাল

 

এই বইটি একে সারসংক্ষেপ করার কোনো চেষ্টাকে চ্যালেঞ্জ করে। অল্প কিছু সহজ পৃষ্ঠা ইঙ্গিত দেয় যে উপন্যাসটি ডামিগুলির জন্য অর্থনৈতিক ধ্বসে পরিণত হতে পারে। বইটি অনেক লম্বা, কিন্তু এর দৈর্ঘ্য উপন্যাসের ভিতরের ক্রোধ গোপন করার চেষ্টার মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত হয়েছে। তার দোষ কাটানোর জন্য জাফর তার আবেগের সহিংসতা অনুভব করেন। আমি অবাক হয়েছি যে এটা আমার হাতের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় নি। — অমিতাভ কুমার, দি নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউ

 

এটি একটি উপন্যাস যেটা এলিট জ্ঞানের সাথে একটি সমীহ জাগানো পরিচয় সামনে নিয়ে আসে। বইটি পড়ার জন্য বিমূর্ত ও বৈশ্বিক উভয় চিন্তা গ্রহণ করার সামর্থ্য থাকতে হয়। যদিও ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো জ্ঞানে পরিপূর্ণ, তবুও এটা কোনোভাবেই নিছক জানার ব্যাপার নয়। যেমন সালমান রুশদি একবার বলেছিলেন, ‘সবকিছুই উপন্যাস’, ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো তাই। এটার দুই হাত দুই দিকে ছড়ানো এবং এটি অতিথিপরায়ণ, তর্কপ্রবণ, বৈশ্বিক ও চিন্তার ক্ষেত্রে আলোড়ন ঘটানোর মত। প্রতিটি পৃষ্ঠায় রয়েছে আইডিয়া এবং প্ররোচনা। যদিও সেসব আইডিয়া ও প্ররোচনাগুলিকে কিছুটা যত্নহীনভাবে পরিত্যক্ত মনে হয়, তবু সেখানে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোড়নের আবহ রয়েছে। — জেমস উড, দি নিউ ইয়র্কার

 

ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো মানব-জ্ঞানের ব্যবহার এবং সীমাবদ্ধতার উপর অসাধারণ একটি উপলব্ধি, একটি হৃদয়ভাঙা প্রেমের উপন্যাস এবং একজন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের আঁকড়ে ধরা বর্ণনা। আমি আশা করেছিলাম এটা জোনাথন ফ্রাঞ্জেনের ফ্রিডম উপন্যাস হবে (কিন্তু হয় নি) — উপন্যাসটি ৯/১১ এর পরের পৃথিবীকে উন্মোচন করে। এই উন্মোচন ব্যক্তিগত এবং রাজনৈতিক, মহাকাব্যিক এবং চলমান। — অ্যালেক্স প্রেস্টন, দি অবজার্ভার

 

এটি আগ্রহোদ্দীপক ও চিন্তাশীল। তবে কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলি একটি পথের অস্পষ্ট বর্ণনা দেয়। বইয়ের বেশিরভাগ অংশেই সেগুলি সামনে আগানোর সাথে সাথে স্পষ্ট হয় না। তাছাড়া সেগুলি দুর্বলভাবে সংজ্ঞায়িত। শুধু শেষে এসে উপন্যাসের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয় এবং জাফরের বর্ণনার অনুরণন পাওয়া যায়। — পাবলিশার্স উইকলি

 

পর্যবেক্ষণগুলি প্রায়ই লেখা থামিয়ে দেয়। এখানে বুদ্ধির প্রদর্শনীর প্রশংসা করতে হবে। প্রতিটি পাঠক দেখতে পাবে কিছু জিনিসের উপর আলো পড়েছে যেগুলি তারা আগে জানত না। — সামির রহিম, দি টেলিগ্রাফ

 

কিছু জানার জন্য সামাজিক বাধ্যবাধকতার প্রতি রহমানের মনোযোগ স্থায়ী আনন্দের উৎস। বইটির অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটি — বইটি সংকীর্ণতা ও আত্মপ্রসাদের বিপরীতে একটি সুন্দর যন্ত্রণাপূর্ণ তিরষ্কার। — অ্যাডমান্ড গর্ডন, টাইমস লিটারেরি সাপ্লিমেন্ট

 

মি. রহমানের বিস্ময়কর অভিষেক প্রচেষ্টা একবিংশ শতাব্দীর শাসন শক্তিকে হস্তক্ষেপ করার উদ্দেশ্যে অর্থনৈতিক ধ্বস এবং জাতি-গঠনের বেপরোয়া বিষয়গুলিকে মোকাবেলা করে। আমি মনে করি মি. রহমান এরকম প্লট ৩৫০ পৃষ্ঠার মধ্যে আনতে পারতেন। তারপরও বলা যায় উপন্যাসের এই আপাত আকারহীনতার একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। অনিশ্চয়তা এবং অসংলগ্নতা মিলে এমন একটি পৃথিবী যেখানে বাজার ধ্বসে পড়তে পারে এবং দখল করা দেশগুলি দ্রুত গণ্ডগোলে পরিণত হতে পারে এইসব বিষয়ের দিকে এই উপন্যাসটি আলোকপাত করে। অপরিচিত এবং নিয়ন্ত্রণ-অযোগ্য যে উদ্দেশ্যগুলি বাকি থাকে সেগুলি উপস্থাপন করার তীক্ষ্ণ প্রচেষ্টা এটি। — স্যাম স্যাকস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল

 

লক্ষ্য রাখতে হবে এই রেটিংগুলি সম্পূর্ণ রিভিউ এর উপর ভিত্তি করে যে ব্যাখ্যা এবং বিষয়ভিত্তিক মতামত একদম সেগুলি উপস্থাপন করে। এবং এটা রিভিউ লেখকদের মতামতের নিখুঁত প্রতিফলন বা উপস্থাপন হওয়ার দাবি করে না। যে উদ্ধৃতিগুলি রিভিউ এর পুরোপুরি মর্ম বহন করে এবং উপন্যাসটিকে যেভাবে বিচার করা হয়েছে তা উপস্থাপন করে সেই উদ্ধৃতিগুলি এখানে বাছাই করা হয়েছে। আমরা স্বীকার করি ( এবং আপনাকে মনে করিয়ে ও সাবধান করে দেই) উপন্যাসটির অন্যান্য রিভিউ এখানে তুলে দেয়ার বিপরীত হতে পারে এই লেখাটি। – লেখক

ziahr4

কমপ্লিট রিভিউ এর রিভিউ

এম. এ. অর্থোফার

ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না এমন একটি উপন্যাস, বাঁক এবং জট এবং বৃত্তাংশে পরিপূর্ণ (এবং, ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করুন, ফুটনোট)। এর অনেক অংশই মুগ্ধ করে কিন্তু এর উচ্চাভিলাষের ওজন বহন করা এর জন্য বেশি হয়ে যায়। এতে প্রচুর স্থূল কল্পনা এবং দরকারি অংশ আছে, কিন্তু যখন তাদেরকে চূড়ান্তভাবে একত্রিত করা হয় তখন সবকিছু মিলে এই বড় পাজলটিকে প্রাণবন্ত করতে পারে না।

উপন্যাসটি শুরু হয় ২০০৮ সালে ইতস্তত ভ্রমণরত জাফরের লন্ডনে অনামা বর্ণনাকারীর বাড়িতে পৌঁছানো দিয়ে। তার (বর্ণনাকারীর) নিজের ক্যারিয়ারে কঠিনভাবে আঘাত এসেছে এবং ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কে তার বড় জালিয়াতির জন্য হঠাৎ করে অর্থনৈতিক সংকট শুরু হওয়ায় বিশৃঙ্খলার কারণে সে অধঃপতিত অবস্থায় রয়েছে। জাফরও সেখানে কাজ করত — আসলে জাফরই তাকে চাকরিটি পেতে সাহায্য করেছিল — কিন্তু জাফর কিছুটা পিছনের দিকে যায়। এখন, যাই হোক, সে বর্ণনাকারীর বাড়িতে থাকে, মাঝে মাঝে কিছুদিনের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই সে থাকে এবং নিজের গল্প বলতে থাকে, খুব বেশি পারিপার্শ্বিক ফ্যাশন সম্বন্ধে সে বলে না কিন্তু অনেকটা নিজের মত করে গল্পগুলি পূর্ণ করে। অনেকটা-ই। তারপর বর্ণনাকারী (কিছু পরিপার্শ্বের বর্ণনা এবং নিজের মতামত দিয়ে) তাদের মধ্যকার সংলাপ তুলে এনে, সেগুলির যে রেকর্ডিং সে করেছে সেগুলি থেকে এবং জাফরের নোটবুক থেকে এবং — “যেখানে দরকার সেখানে আমার (বর্ণনাকারী) নিজস্ব গবেষণা অনুসরণ করে” এখানে উপস্থাপন করে।

বর্ণনাকারী এবং জাফর দুজনেই অক্সফোর্ডে গিয়েছে, কিন্তু তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড একদম আলাদা। জাফর জন্মগ্রহণ করেছে পূর্ব পাকিস্তানে, সেটা এখন বাংলাদেশ। বর্ণনাকারীর পরিবার একদম মূল পাকিস্তানের। দুজনই বড় হয়েছে বিদেশে। বর্ণনাকারীর পরিবার উচ্চ শ্রেণীর, তার বাবা একজন প্রভাবশালী একাডেমিক। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তারা খুব সাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করেছে। সেখানে জাফরের পারিবারিক অবস্থা বেশ দরিদ্র। জাফর দুর্দান্ত একাডেমিক, অক্সফোর্ড থেকে গণিতে প্রথম তারপরে হার্ভার্ড থেকে আইনে ডিগ্রী। তারপরে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্কে বড় পরিবর্তনের পরে ইংরেজ বার-এ ভর্তি।

আরেকটি সংযোগ হলো এমিলি হ্যাম্পটন-উইভার্ন, জাফরের জীবনের ভালোবাসা। জাফরের সাথে দেখা হওয়ার আগে থেকেই বর্ণনাকারী তাকে চিনত। তার বাবা হাই কোর্টের জজ, তার পরিবার জাফরের পরিবার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এক শ্রেণীর — এবং জাফর/রহমানের জন্য শ্রেণিপার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পয়েন্ট (দুঃখজনকভাবে জাফরের ব্যাকগ্রাউন্ডই লেখক রহমানের ব্যাকগ্রাউন্ড এবং শ্রেণী সম্পর্কে অনেক পর্যবেক্ষণ এবং দৃষ্টিভঙ্গি খুব নিকট সাদৃশ্যপূর্ণ — এবং উপন্যাস সেগুলির মধ্যেই চিত্রিত — অস্বস্তিকরভাবে এইসবকিছু লেখকের ব্যক্তিগতও মনে হয়)।

জাফরের গল্পের একটি কেন্দ্রীয় অংশ হলো ২০০২ সালে তার আফগানিস্তান ভ্রমণ। উপন্যাসে শুধু একটি ছদ্ম প্রচেষ্টা হিসেবে পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্র-গঠনকে নেওয়া হচ্ছে। এমিলি তাকে ডেকে পাঠায় (যদিও তার যাওয়ার অন্যান্য কারণ রয়েছে), এবং এই ভ্রমণ এই পয়েন্টে এমিলির সাথে তার সম্পর্কের একটি ফ্যাক্টর। তাদের সম্পর্কের এই ফ্যাক্টর তার এই গল্পের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

ziahr1
জিয়া হায়দার রহমান

শুরু থেকে গোডেলের অসম্পূর্ণতার উপপাদ্য গল্পে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাফর এটার একজন বড় ভক্ত এবং সে বারবার এটা নিয়ে আসে। সে বলে — “একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় তিনটি অবদানের” এটি একটি (সাথে থিওরি অব রিলেটিভিটি এবং ডিএনএ’র ডাবল-হেলিক্স গঠন আবিষ্কার) এবং এর “জনপ্রিয় কল্পনায় কোনো জায়গা নেই”। যদিও এই উপপাদ্য দুঃসাহসীভাবে নির্ভর করে ‘জনপ্রিয় কল্পনা’ বলতে যা বোঝায় তার উপরই। তাই এটাকে মনে হয় কোনো অনিশ্চিত প্রস্তাব। রহমানের উপন্যাস যেকোনো ভাবে এই উপপাদ্যের ফিকশনাল ট্রিটমেন্ট হিসাবেও পরিগণিত হয়। কোনো সিস্টেম একইসাথে সম্পূর্ণ এবং স্থায়ী হতে পারে না ও (একদম সরলভাবে এখানে রাখা হয়েছে) — কোনো সিস্টেমের ভিতর সত্য ওই সিস্টেম ছাড়া প্রমাণ করা যায় না — এই আইডিয়ার কারণে। জাফরের নিজের পক্ষেই নিজেকে সম্পূর্ণ জানা সম্ভব নয়। বর্ণনাকারীর চেষ্টাগুলি একজন মানুষের সম্পূর্ণ এবং স্থায়ী রূপ তুলে ধরতে ঝামেলায় পড়ে। (রহমান এই ইস্যুটিতে একটু জোর প্রয়োগ করেছেন, কিন্তু এটা নিয়তি নয় — এবং এখানে যে মৌলিক আইডিয়া কাজ করে (অথবা এটা উপন্যাসে রাখতে) তা যথেষ্ট যৌক্তিক)।

অসম্পূর্ণতা উপপাদ্যের যে দিকটি এখানে কাজ করে সেটি বর্ণনাকারী। সে জাফরের তথ্যগুলি পুরো সিস্টেমের ছবি আঁকতে একসাথে যুক্ত করে। তাদের অনেকগুলি সংলাপের এক জায়গায় বর্ণনাকারী জাফরকে পরামর্শ দেয় যে তার নিজেরই এই কাজটি করা উচিৎ — “আপনার একটি বই লেখা উচিৎ[…] একটি স্মৃতি আলেখ্য। একটি আত্মজীবনী।” জাফরের এরকম কোনো উদ্দেশ্য নেই (যদিও তার নিজস্ব তথ্যে পরিপূর্ণ একটি নোটবুক রয়েছে…) এবং তারা দুজন ফিকশন এবং আত্মজীবনী নিয়ে তর্ক করে। কিন্তু জটিল বিষয় হলো, জাফর ব্যাখ্যা করে–

“আমি বলছি না যে একটি বই লেখা হবে না — আপনি এটা করতে পারেন। আমি যা বলছি তা হলো আমি লিখতে চাই, আমি লিখতে পারি না, হয়ত এটা লেখা হবে না।”

জাফর গণিত ছেড়ে দিয়েছে — নিঃসন্দেহে আংশিকভাবে গণিতের সীমাবদ্ধতার কারণে। একইভাবে গোডেলের অন্তর্দৃষ্টির ফলাফলের জন্য সে একটি সম্পূর্ণ এবং স্থায়ী সিস্টেম বর্ণনা করা এড়িয়ে চলে। বিশেষ করে এই সিস্টেম সাথে নিয়েই সিস্টেমের বর্ণনা করা সে এড়িয়ে চলে। এবং সে জানে ভাষা এই কাজ যথেষ্ট নয়, নয়ত–
“কাগজে কিছু রাখা ব্যাপারটিকে সত্যি করে তোলে, কঠিন করে, তাকে অপরিবর্তিত বানিয়ে ফেলে, এমনকি জিনিসগুলি কোনো অর্থ তৈরি করার আগেই। ঠিক কখন থেকে বই কোনোকিছু সমাধান করেছে? সেগুলি আরো প্রশ্ন তুলেছে তারপর উত্তর দিয়েছে। অন্যভাবে দেখলে তারা নিছক বিনোদন মাত্র, এবং আমি এখানে কোনোভাবেই আপনাদের বিনোদিত করার জন্য না।”

(রহমানের কাছে নিশ্চিতভাবে বইয়ের এই উত্তর প্রদানের থেকে প্রশ্ন তোলাটাই এর প্রধান আকর্ষণ। তবুও সে এই পয়েন্টটিকে প্রকৃত অর্থে স্পষ্ট আঘাত করে না।)

জাফরের গল্প এক ধরনের স্বীকারোক্তিমূলক। এবং তা বর্ণনাকারীর মাধ্যমে একটি ভিন্নকোণ থেকে প্রকাশ পায়। এর সাথে বর্ণনাকারীরও অল্প স্বীকারোক্তি আছে এবং অতীতমুখীতা আছে (এবং ব্যর্থ দাম্পত্য এবং ব্যর্থ ক্যারিয়ারের বর্তমান)। উপন্যাসের শেষের দিকে সে বলে — “জাফরের বেশির ভাগ গল্পই একধরনের প্রতিরক্ষা।” উপন্যাসের জাফর যা স্বীকার করছে, সে যা থেকে নিজেকে রক্ষা করছে সেই দীর্ঘ উন্মুক্ত প্রশ্নটিই উপন্যাসের টানাপোড়েন।

উপন্যাসে কয়েকটি অসম স্তর রয়েছে, কিন্তু এগুলি একত্রিত হলে সঙ্গতিপূর্ণ হয়। রহমান একটি বড় ছবির উদ্দেশ্যে কাজ করছেন — একটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সিস্টেম। এবং তার কাজের বেশিরভাগেরই একটি জায়গা রয়েছে, তারপরও এটা অনেক দীর্ঘ। জাফর কৌতূহলীভাবে শ্রেণিপার্থক্য নিয়ে সচেতন (বিশেষ করে ব্রিটিশ শ্রেণিপার্থক্য), এবং শ্রেণী নিয়ে তার পর্যবেক্ষণ প্রায়ই আগ্রহোদ্দীপক। তবু কেউ সন্দেহ করতে পারে যে এগুলি রহমানের নিজস্ব অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণের নিকট প্রতিফলন। সে এগুলি নিয়ে বেশি একঘেয়েভাবে চিন্তা করতে থাকে (যদিও অন্যভাবে তারা কতটা বাজে (শ্রেণী) সমাজ এটা ব্রিটিশদের মনে করিয়ে দেওয়াতে হয়ত ভালো কিছু আছে এবং সম্ভবত ক্ষতি খুব সামান্যই আছে)। গণিতও এখানে আগ্রহোদ্দীপক ভূমিকা পালন করে, আংশিকভাবে ব্যাঙ্কিং খাতে এর প্রয়োগ করা (এবং এর গোলমেলে ফলাফল) বিবেচনায় — যদিও এখানেও জাফরের ক্লাস নিয়ে একঘেয়েমি ভালোভাবে কাজ করেছে (“গণিত কর্তৃত্ব নিয়ে মাথা ঘামায় না, আপনি কে, কোথা থেকে, আপনার চোখের রঙ কী অথবা আপনি কার সাথে রাতের খাবার খাচ্ছেন গণিত সে ব্যাপারে পরোয়া করে না”)।

২০০১ সালের পরে আফগানিস্তানে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি (এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ঐতিহাসিক আমেরিকান ব্যর্থতা) আগ্রহোদ্দীপক উপাদান তৈরি করে (সাথে জাফরের পরিবারের এই ব্যাপারে জড়িত হওয়ার বিপরীতে অবস্থান)। এবং অবশেষে মূর্খ পশ্চিমাদের মজার প্রতিক্রিয়া দেখানোর মাধ্যমে জাফরের বাংলাদেশী ব্যাকগ্রাউন্ড পূর্ণতা পায়। (এই হতাশার গল্পের বর্ণনার মধ্যে জাফর তার বাংলাদেশে শৈশব কাটানোর সময় পুরোপুরি বর্ণনা করে না, শুধু তার পৌঁছানো ছাড়া)।

ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো এর উপস্থাপনের দিক দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক একটি উপন্যাস। এটা শুধু গল্পকেই লক্ষ্যভ্রষ্ট করে না, সারা উপন্যাসেই পিছনের পটভূমি বর্ণনা করে। এটাতে ফুটনোটও আছে। এবং প্রতিটি অধ্যায় শুরু হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর উপন্যাসে যেরকম জনপ্রিয় ছিল সেরকম একটি অথবা তার অধিক ভাণপূর্ণ পরিচিতিমূলক বর্ণনা দিয়ে। তাছাড়া জাফর যে অল্প জ্ঞান অর্জন করেছে তা দেখাতেও পছন্দ করে। কিছু কিছু জায়গায় তাকে (বিরক্তিকরভাবে) অতিরিক্ত চতুর মনে হয় —
“মরিস সরবনে ছিল।
তার বয়স কি পঞ্চাশের বেশি?
তোমার এমন মনে হল কেন?
১৯৬৮ পর্যন্ত কোনো প্রশাসনিক সত্ত্বা ছাড়া সরবনে কেউই ছিল না।”

ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো একটি ষড়যন্ত্র ধরনের চরিত্র-বর্ণনা। এমনকি এটা সবসময়ই দাবি করে যে সত্তাকে (এবং অন্যান্যদেরকে) সম্পূর্ণভাবে জানা যায় না (গোডেল যেমন প্রমাণ করেছেন)। বদলে যেতে থাকা, চতুর জাফর অবশ্যই একটি আগ্রহোদ্দীপক চরিত্র এবং সে সফলভাবেই ধরাছোঁয়ার বাইরে। যেমন কোনো এক জায়গায় কেউ একজন তাকে বলে — “তুমি যা বহন করছো তা সম্পর্কে তুমি এতটাই অনিশ্চিত যে তুমি অবাক হও তুমি আসলে যা তা হওয়ার জন্য ভান করছো কিনা।”

এটা রহমানের কৃতিত্ব যে তিনি তার চরিত্রের সাথে যা করেন এবং যেভাবে গল্প উন্মোচন করেন তারপরও পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন।

রহমান অনেক আগ্রহোদ্দীপক আইডিয়া নিয়ে স্পষ্টতই একজন স্মার্ট মানুষ, এবং তিনি ভালো লেখেন (যদিও এমন মনে হয় না যে একটি দৃঢ় সম্পাদকের হাত এই বেপরোয়া বর্ণনাটিকে বাঁধার চেষ্টা করেছে)। ইন দ্য লাইট অব হোয়াট উই নো সুন্দর এবং নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ দিয়ে পাঠযোগ্য উপন্যাস (যদিও এটা বারবার নিস্তেজ হয়ে যায় এবং এটি হয়ত সব পাঠককে সন্তুষ্ট করে না)। যদিও এর অনেক অংশই প্রকৃত অর্থে বেশ আগ্রহোদ্দীপক, চূড়ান্তভাবে — সব মিলিয়ে এটি ‘আগ্রহোদ্দীপক এবং একই সাথে ব্যর্থ’ এই ক্যাটাগরি থেকে বেশিদূরে উঠতে পারে না।

১৮ এপ্রিল, ২০১৪

সূত্র: complete-review.com

ওয়েব লিংক


Literary Quartet: Two on Two with Zia Haider Rahman – ভিডিও, পেন আমেরিকা