দশ বছর আগের চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত স্থানে আমি পৌঁছাই ঠিকই, তবে তা কোনওভাবেই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে নয় যে, সত্যিই জুঁইও সেখানে, এমনকি আমার আগে থেকেই উপস্থিত থাকবে। আর, আবারও সত্যিই ওকে আমি দেখতে পাব। বরং এরকম যে হতে পারে, অন্তত পাঁচ বছর ধরে সেই সম্ভাবনাটাকে নাকচ করতে করতেই আমি বড় হচ্ছিলাম। ফলে বিমানবন্দর রেলস্টেশনের ওভারব্রিজের নির্ধারিত কোণায় ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল আমার বড় হতে থাকা।

জুঁইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ২০০৫ সালে। হঠাৎই একদম হুট করে। তখন কত বয়স আমার, সবেমাত্র কলেজে যাই, সতের, বা তারও কম? অবশ্য জুঁই বয়সে আমার বড় ছিল, তিন বছরের। ফোনে পরিচয়। লং ডিস্টেন্স রিলেশনশিপ। হুট করে একগাদা মোবাইলফোন কোম্পানি এসে পাড়া-মহল্লার ছাদেই, কলেজ যাবার রাস্তার মোড়েই ঘটতে পারত প্রেমগুলোকে বেশ একটা জাতীয় মানের রাত জেগে কথা বলা প্রেমে রূপান্তর করে দিল তো? বলতে গেলে পরিবর্তিত বা নবগঠিত ওই সংস্কৃতির প্রথম জেনারেশনের প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলাম আমরা। ডিজুস টু ডিজুস দুই টাকায় সারারাত কথা বলার একটা অফার ছাড়ে গ্রামীণফোন। মূলত ওই সময়ই একটা ফালতু নাম্বার পাজলিং থেকে জুঁইয়ের সঙ্গে আমার প্রেম হয়ে যায়।

আমরা তখন সারারাত জেগে ফোনে কথা বলতাম। এমনও হয়েছে, ভোর হয়ে গেছে জন্য এখন আর সারাক্ষণ ফোনে ‘লাইনে’ থাকতে পারব না ভেবে শেষরাত থেকেই আমাদের কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেছে। এতই রাতজাগা প্রেমিক-প্রেমিকা ছিলাম আমরা। সত্যি বলতে, আমাদের তুলনা ছিল না। আমার, এবং জুঁইয়েরও, পরিচিত এমন একজন কেউ ছিল না, যে অন্তত আমাদের সিকি পরিমাণ প্রেমও ওইসময় করতে পারত। আমরা জানতাম যে, আমরাই সেরা।

তবে আমরা কেউ কাউকে দেখি নি কখনও। শুধু কথা বলে প্রেম করি। একদিন তাই ভয় হলো, মনে হলো, আমাকে দেখে যদি ওর পছন্দ না হয়। কিংবা আমারই যদি পছন্দ না হয় ওকে! কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে জিভ কামড়ে আমি অনুতপ্ত হই। ছিঃ‍ এ আমি কী ভাবছি। জুঁই দেখতে যেমনই হোক না কেন, ও তো জুঁই। আমি ওকে কখনওই ছেড়ে যেতে পারি না, কারণ সেটা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের একবার দেখা তো হোক? দুজনেই রাজি। আমি আমার আশঙ্কার বিষয়ে ওকে বললাম, ‘আমি তো দেখতে অতো ভালো না, তোমার যদি পছন্দ না হয়!’ তুড়ি মেরে আশঙ্কাটাকে উড়িয়ে দেয় জুঁই। উল্টো ওকে এরকম অগভীর আর চেহারা দেখে প্রেমে পড়া টাইপ থার্ডক্লাস ভাবার কারণে রাগ করে ওই রাতে আর কথাই বলল না আমার সাথে।

এমনিতে কথা না হওয়া রাত, তখনসময় আমার জন্য ভয়াবহ বেদনার বিষয় ছিল। কিন্তু ওকে ‘চেহারা দেখে প্রেমে পড়া’দের কাতারে ফেলবার শাস্তি হিসেবে পাওয়া ওই কথা না বলা রাতটা আমার জন্য বলতে গেলে স্বর্গসম ছিল। বরং আমি চাইছিলাম, এ রাগ আরও দীর্ঘ, আরও গাঢ় হোক। কেননা তাতেই আমার নিরাপত্তার বোধটা আরও বলিষ্ঠ হয়।

পরদিন গর্ব করে ক্লাসের বন্ধুদের, জুঁইয়ের এমন উদার মন-মানসিকতার গল্প শোনাতে গিয়ে এক ব্যাখ্যাতীত বিবমিষায় আক্রান্ত হই। গল্প শুনে মোস্তফা বলে, “দেখ গিয়ে পাতিলের কালির মতো কালো আর কঙ্কালসাড় হাড়গোরসর্বস্ব এক পেত্নী হবে সে। তার তো একটা পেনিস হলেই হয়। ফলে নিজের উদারতার বাড়াবাড়ি প্রদর্শন করে সে আসলে তাকে দেখার পর তোর উদারতাটাকে কনফার্ম করতে চাইছে।” উপস্থিত বাকিরা হোঃ হোঃ করে হেসে উঠল। এত বিশ্রী লাগল দৃশ্যটা যে আমি উঠে এলাম। বেরিয়ে বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসছি যখন, জানালা দিয়ে শুনতে পেলাম জিকু বলছে, “এ জীবনে আমি জুঁই নামের কাউকে সুন্দরী হতে দেখি নি। সবগুলোকেই দেখেছি দুঃস্বপ্নের মতো ভয়ঙ্কর হতে।” আর এতেও অন্যরা সশব্দে হেসে উঠল। আমি দৌড়ে পালালাম। জুঁইকে এমন বাজারী আলোচনার বিষয় করে দেওয়ায় খুব রাগ হলো নিজের ওপর। দোষটা তো আমারই।

কিন্তু যা হলো, সে রাতেই ভয়ঙ্করদর্শন এক জুঁইকে স্বপ্ন দেখলাম। ড্রাকুলা মার্কা দাঁত, নোংরা চুল আর আশি বছরের কোনও ডাইনি বুড়ির এক বিকট প্রতিকৃতি। এটাই ছিল স্বপ্নের জুঁই, আমি থরোথরো ভয়ে যার খসখসে হাত ধরে পার্কে হেঁটে বেড়াচ্ছি। লাফ দিয়ে ঘুম ভাঙে আমার। মনে পড়ে, মাইগ্রেনের ব্যথার জন্য জুঁই রাত দুটোর দিকেই শুয়ে পড়েছিল। এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো, ভোরের স্বপ্ন কি সত্যি হয়? মুহূর্তেই আবার মনে হলো, এ কথা ভাবছি কেন! তার মানে সত্যি হলে, অর্থাৎ জুঁই দেখতে সত্যিই ওরকম হলে আমার তবে আপত্তি? এই তবে ভেতরকার আমি! নিজের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা সবচেয়ে গোড়ার দিকের আমার স্বরূপ তবে এই! প্রতিটা রক্ত কণিকায় আত্মধিক্কারের তীব্র আলোড়ন আমাকে পাগল করে ছাড়ল। নিজেকে শাস্তি দিতে ছুরি দিয়ে আমি হাত কাটতে লাগলাম। কিন্তু কিছুই টের পেলাম না। কেননা, কী করে আমার এত সাহস হয় যে, এমনকি ভয়ঙ্কর দেখতে হলেও জুঁইকে আমি ফিরিয়ে দেবার কথা ভাবি!

ঢাকায় গেলাম। আমাদের দেখা হলো। একটা ভোরের ট্রেন আমাকে বিমানবন্দর স্টেশনে নামিয়ে দিল। আর তরতর সিঁড়ি ভেঙে আমি উঠে গেলাম ওভারব্রিজে। কেননা ওখানে নির্ধারিত একটা কোণে দাঁড়িয়ে জুঁই দাঁত মাজছে। এটাই ওকে চিনবার কোড। সারারাত আমরা ‘লাইনে’ই ছিলাম। আমি ট্রেন থেকে আর জুঁই ওর বাসা থেকে। ভোর পাঁচটায় ফোন রেখে ও চেঞ্জ করল। আর আবার কথা বলতে বলতে বেরিয়ে পড়ল বাসা থেকে। ও যখন সিএনজিতে উঠল, আমার ট্রেন তখন ঘোড়াশাল ব্রিজ পার হচ্ছে। কিন্তু ওভারব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে এ কাকে আমি দাঁত মাজতে দেখছি! পরী বললেও ভুল হবে। পরীর চেয়েও পরী দেখতে ও। হা হয়ে গেলাম। ঠোঁটের কোণে মোস্তফা জিকুদের জন্য একটা তাচ্ছিল্যের হাসি না চাইতেও ফুটে উঠল। আর নিজের জন্য হলো করুণা। এই তো, ট্রেন থেকে নামার ঠিক আগেও বাথরুমে ঢুকে (তাও কিনা আবার নিজেকে দেখার জন্যই!) নিজের চেহারার মুখোমুখি হলাম। একে কি চেহারা বলা যায় কিনা কে বলবে! আর এই বেহেশতী হুর, বলা চলে, বিভ্রান্ত হয়ে আমার মতো এক চামারের জন্য এখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। একবার ভাবলাম, আমাকে চিনতে পারার তো কোনও কোড নেই, পালিয়ে যাব নাকি! কিন্তু হতবিহ্বল দাঁড়িয়ে পড়া আমার কাছে এসে জুঁই-ই প্রথম কথাটা বলল, “দাঁত মাজবে?”

একবারের জন্য মনে হলো, যাক! আমি দেখতে অন্তত আমারই মতো তাহলে। নয়ত জুঁই আমাকে চিনতে পারল কীভাবে? ওভারব্রিজে আরও তো মানুষজন ছিল। আমার বয়সীই আরও দুয়েকজন ছিল, নিজের চোখে দেখা। নিশ্চয়ই এমন হয় নি যে, সেকেন্ড কিংবা থার্ড অফারে ও সত্যিকারের আমাকে খুঁজে পেয়েছে! সেরকম হলে আমার দেখা আমার বয়সীগুলোর কারও মুখে ঠিকই টুথপেস্টের ফেনা লেগে থাকত। যেমন আমি ওর মাজতে থাকা ফেনাসুদ্ধই ব্রাশটা নিজের মুখে পুরে নিলাম। ও বলল, “ওয়াক থু!” পরবর্তী এক বছর নিয়মিত আমি কোলগেট টুথপেস্টটাই ব্যবহার করতাম, ওর মুখের ফেনার স্মৃতি জাগিয়ে রাখার জন্য।

ও বলল, “জেগে থাকতে সমস্যা হবে না? সারারাত তো একটুও ঘুমাও নি।” কী জানি, ভাবি নি এ বিষয়ে। সাধারণ অর্থে তো সমস্যা একটু হবারই কথা। কিন্তু সঙ্গে জুঁই থাকা সত্ত্বেও এটা নিশ্চয়ই ভালো দেখাবে না যে, পাশেই নাক ডেকে আমি ঘুমাচ্ছি! জুঁই বলল, “চলো কোথাও গিয়ে দুমুহূর্ত একটু ঘুমাই।” স্বপ্নের মতো লাগল কথাটা। বিশেষত ‘দুমুহূর্ত’ ঘুমানোর ব্যাপারটা। অবশ্য ওর মধ্যে আগে থেকেই ব্যাপারটা ছিল, খানিকটা কবি কবি ভাব! এই তো সেদিন আকাশে একটু মেঘ করল বলে মেসেজ পাঠিয়েছিল ‘আজকে আমার মেঘলা দিন, আজকে আমার একলা দিন।’ বুঝলাম ওই ঔদাসীন্যই এখানে দু’ মুহূর্তের ঘুম হিসেবে হাজির হয়েছে। বললাম, “আমার তো চেনা কেউ নেই ঢাকায়। কোথায় ঘুমাব? আর তুমিই বা কোথাও আমাকে নিয়ে ঘুমাতে যাবে কী করে!” দু’ মুহূর্ত ভেবে ও বলল, “চলো আমরা একটা ইয়োলো ক্যাব ভাড়া করে ফেলি, তারপর ক্যাবের ভেতর ঘুমাই।” আইডিয়া খারাপ নয়। নয়টা দশটার দিকে জেগে উঠে ফ্রেশ একটা দিন শুরু করা যাবে। ভাবলাম আমি।

অচেনা ঢাকা শহরের ব্যস্ততম এলাকাগুলোয়, কখনও জ্যামে আটকে, কখনও ফাঁকা রাস্তার দ্রুতটানে, টানা সাতদিন এক নাগাড়ে হালচষে ক্লান্ত মহিষের মতো গায়ের জোরে আমি ঘুমালাম। ঠিকই সেই ওর পাশে বসে! কিন্তু ফাঁকে ফাঁকে সেই ঘুমও ভাঙল। চোখ খুলে, কিছুই বুঝে উঠতে না পারা দৃষ্টিতে ক্যাবের জানালা দিয়ে আড়াআড়িভাবে কত যে সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। একবার দেখলাম আজাদ প্রোডাক্টসের সাইনবোর্ড। এরা কী কারণে যেন বিখ্যাত? ভাবতে ভাবতে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। দেখলাম তোতা পাখি কাঁধে নিয়ে একটা লোক হেঁটে যাচ্ছে। ক্যাবল লাইনের জঞ্জালে কাকেদের পুরনো হাগু। জুঁইও ঘুমাচ্ছে আমার পাশে। আমাদের দূরে কোথাও পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে। পৌঁছে ড্রাইভার আমাদের ডেকে দেবে। দূরে কোথাও পৌঁছাতে সত্যিই অনেক দেরি হয় আমাদের।

শহরের প্রায় আরেকটা কোনও প্রান্তে, নাকি শহর ছাড়িয়ে, কোথায়, তা আমার মনে নেই। এরমধ্যে আমরা প্রায় তিন ঘণ্টার কাছাকাছি সময় ধরে ঘুমিয়েছি। ভাবলে এখনও অবাক লাগে, এর আগে যে আমার কোনও যোগ্যতাই ছিল না, কোনও একটা এমনকি মাঝারি মানের সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে বসেও কথা বলবার, সেখানে পরীরও পরীর মতো একটা মেয়ের পাশে আধশোয়া হয়ে, বিশ্রীভাবে হা করে (না চাইতেও আমার তাই হয়) আমি ঘুমাতে পারলাম কী করে। কিন্তু আজ বুঝি, ক্লান্তিই সেই মহান মনোযোগের যথার্থ দাবিদার, যার দাবি না মেটালে আদতে আর কোনও দাবিই মেটানো সম্ভব হয় না। ‘আজকে বুঝি’র ভারিক্কি চালটার ব্যাপারে একটু ব্যাখা দেওয়া প্রয়োজন, জানানো প্রয়োজন, সেদিনের সেই বেকার ও নির্ভার লোকটা, আমার মধ্যে কোথাও আজ আর বেঁচে নেই। পারিবারিক দারিদ্র্য আর বাস্তবতার অনিবার্য ঘাঁয়ে লোকটার গলিত অবয়বটিও এখন বাষ্পাতীত। গত চার বছর ধরে একটা পত্রিকা অফিসে কম্পোজিটরের চাকরি করি আমি। টোলারবাগে সরকারি কোয়ার্টারগুলোর একটায় ছোট একটা রুম ভাড়া করে থাকি। সে যাই হোক, নিজের দরিদ্রতার বর্ণনা দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। মোটকথা আগের মতো নিশ্চিন্ত নির্ভার জীবনটা আর নেই।

আমরা যেখানে গেলাম, দেখতে অনেকটা গ্রামের মতো। ব্যস্ততম দালানগুলোর ফাঁক ফোকড় দিয়েও পেছনের ধানক্ষেত উঁকি দিচ্ছে। আমরা একটা ধানক্ষেতের মধ্যদিয়ে ঢুকে মুহূর্তের মধ্যেই আরও অসংখ্য ধানক্ষেত পার হতে থাকি। সিনেমার দৃশ্যের মতো জুঁই আমাকে টেনে নিয়ে যায়। যেন এক গোপন সংকেত মান্য করে করে একটা আঁল থেকে পরবর্তী দুটো আঁলের একটাকে বাছাই করতে করতে এগোয় ও। যেন একেবারে শেষে, সবচেয়ে অবাক করে দেওয়ার মতো ঘটনাটা ঘটবে। আর হলোও তাই, একমাঠ সমান ঝকঝকে মেঝের একটা ধানের কলে গিয়ে আমরা উঠলাম। এখানে ওখানে টুকরো টুকরো মেঘের মতো শুকোতে দেওয়া ধান।

জুঁই জানাল, সেদ্ধ ধানের গন্ধ ওর খুব পছন্দ। আমার মনে হলো, এ পছন্দের কথা তো ফোনে কখনও বলে নি আগে! কিন্তু আবার ভাবলাম, হয়ত সব পছন্দের কথা ফোনে বলতে হয় না। জুঁই যেমন কবি স্বভাবের, এমন আলাদা কোনও সিদ্ধান্তও যদি সত্যিই ওর থেকে থাকে, মোটেই অবাক হব না।

সারাটাদিন আমরা সেদ্ধ ধানের গন্ধ শুঁকে শুঁকে কাটিয়ে দিলাম। আর যা মনে পড়ে, ধানের কলের পাশেই একটা পুকুর ছিল, আর কবুতরের বিষ্ঠায় ভরে থাকা একটা ঘাট। কবুতরগুলোকে ধানের কলের সবটা জুড়েই সহাস্যে চলাফেরা করতে দেখা যাচ্ছিল। দুপুরে ধানের কলের ম্যানেজার তার অফিসরুমে ডেকে নিয়ে আমাদের ডিমের সালুন দিয়ে ভাত খাওয়ালো (ওর পূর্বপরিচিত?)। তারপর বিস্তীর্ণ মেঝের ছায়া ঢাকা একটা অংশে গিয়ে বসবার পর জুঁই বলল, দুপুরের পর নাকি কবুতর এমনভাবে ডাকে, যাতে করে মানুষের ঘুম পায়। ও বলার কারণেই কিনা কে জানে, কবুতরগুলোর নিরবচ্ছিন্ন বাক্‌ক্‌-বাকুম্‌ম শব্দে সত্যিই একটা ধান ভাঙানোর হাত-মেশিনের কাছে গিয়ে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। একদমই ঘুমিয়ে পড়বার মুহূর্তে মেশিনটাকে আমি সাব্যস্ত করলাম ‘ঘুরন্ত কোলবালিশ’ বলে।

যখন উঠলাম, পরিপূর্ণ বিকেল। টের পেলাম এবং স্বচক্ষেও দেখলাম যে, আমার মাথার নিচে জুঁইয়ের কোল। ঈষদুষ্ণ, খুব পুরনো নয় একটা রঙের গন্ধভরা ওর কোলটাকে আমার এক টুকরো মাতৃগর্ভের মতো লাগল।

কিন্তু এবার ফিরতে হবে। সন্ধ্যার পর আমার ট্রেন। দুটো বাসে চড়ে আমাদের ফিরতে হলো। প্রথম ফাঁকা বাসটার একদম পেছনের কোণায় বসে জীবনে প্রথম কাউকে ঠোঁটচুমু খেলাম। সমস্ত শরীর, পরিস্থিতির তুলনায় অপর্যাপ্ত পুষ্টির কারণে ঠাঁ ঠাঁ করে কাঁপল। জীবনে প্রথম যখন কারও জিভ চাটছি, নুন ছিটানো কাঁচা ঝিনুকের স্বাদে আলোড়িত হচ্ছে মগজ । (ফলে চুমুর স্মৃতি ফিরিয়ে আনতেও পরবর্তীতে নুন ছিটানো কাঁচা ঝিনুক খেতে হয়, তবে, ব্যাপারটা চূড়ান্ত রকমের হতাশাজনক, অর্থাৎ চুমুর স্মৃতির তাতে কানাকড়িও ফিরে আসে না) মনে পড়ছে ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ আত্মজীবনী গ্রন্থে মার্গারেটকে সহ বা ছাড়া সুনীলের কাঁচা ঝিনুক খাওয়ার বর্ণনা। আমরা আরও পাগল হয়ে উঠি এবং একপর্যায়ে অন্য যাত্রীদের আপত্তি সাপেক্ষে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে মাঝপথে আমাদের বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় বাসের প্রয়োজন পড়ে মূলত এ কারণে। নেমে দেখি সূর্য ডুবছে। তারপর হাইওয়ের অল্প দূরে একটা গির্জা পেয়ে ওটায় ঢুকে পড়ি। আর দুজনে মিলে অসহ্য সব চুমু খাই।

যখন ট্রেন ছাড়ল, আমার জানালা ঘেঁষে প্লাটফর্ম ধরে হাঁটতে হাঁটতে কথাটা ও বলল। “যদি আর খোঁজ না থাকে, ঠিক দশ বছর পর এই তারিখে এই স্টেশনের ওভারব্রিজে থেকো, বিকেল পাঁচটায়।” সত্যি বলতে, তখন পর্যন্ত বাক্যটাকে যে আবার আমাকে সাজিয়ে মনে করতে হবে কখনও, বুঝতেই পারি নি। উল্টো বোকার মতো হাসি হাসি মুখে হাত নাড়তে থাকি। বলতে গেলে, তার কিছুক্ষণ পর থেকেই দশ বছরের জন্য ও হারিয়ে গেল। ট্রেন যখন টঙ্গী স্টেশন পার হচ্ছে তখনই ফেরার কিছু পেল কিনা জানতে ওকে কল দেই, আর নাম্বার বন্ধ পাই।

অবশ্য তাতেই যে আমি বুঝে ফেলি, অন্তত দশ বছরের জন্য ও হারিয়ে গেছে, তা নয়। প্রথমত ভাবি, হয়ত ফোনের চার্জ শেষ। আর সেটা স্বাভাবিকও ছিল, কারণ সারারাত কথা বলার পর দিনে আর ফোন চার্জে দেওয়ার সুযোগ হয় নি। এ ধারণা আরও মজবুত হয়, যখন ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আমার নিজের ফোনটাও বন্ধ হয়ে গেল।

এরপর ট্রেনের মধ্যে, জানালায় মাথা এলিয়ে সারাটা পথ আমি একটা খামচে থাকা ঘুমের সঙ্গে লেপ্টে রইলাম। পরবর্তী দুয়েকদিনেও যখন ফোনটা আর অন হলো না, তখন, জানালার পাশে প্লাটফর্মে হাঁটতে হাঁটতে ওর বলা, প্রায় ভুলে যাওয়া কথাটা মনে পড়ল। যেন অনেক ঘুমের নিচে চাপা পড়ে ছিল কথাটা। কিন্তু তাই বলে এরকম ছেলেমানুষি একটা কথাকে ও সত্যিই বাস্তবায়িত করতে চাইবে, এটাই বা মেনে নিই কী করে! তার মানে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? আমি আর কিছুই ভাবতে পারলাম না।

মোস্তফা বলল, ওর আসলে আমাকে পছন্দই হয় নি, সরাসরি কথাটা বলতে না পেরে এখন ফোন অফ রেখে বুঝিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তাহলে বাসের মধ্যে, হাইওয়ের পাশের গির্জায় আমাদের যে মুহূর্তগুলি, ওগুলোর কী ব্যাখ্যা? জিকু বলল, ঢাকায় ওরকম পার্টি নাকি অনেক আছে। মূলত বেশ্যা, মাঝেমাঝে একটু রিলেশনশিপের ওম লাগে, এরকম আরও অনেকের কথাই নাকি সে জানে। ঘুষি মেরে আমি জিকুর নাক ফাটিয়ে দিলাম। বুঝতে পারি নি, এতটা রক্তারক্তি হবে। সবাই ওকে ধারেকাছের কোনও একটা ফার্মেসিতে নিয়ে গেল। আমি আগ বাড়িয়ে ওর বাসায় চলে গেলাম, বাসায় গিয়ে ওর মাকে বলে আসলাম, “এটা কী করে সম্ভব যে, আপনার ছেলে ঢাকার অনেক বেশ্যাদের সম্পর্কে হুবহু অনেক কিছুই জানে!” বলেই বেরিয়ে এসে রিকশা ভাড়া করে শহরের বাইরের একটা মাঠে নিয়ে নিজেকে শুইয়ে দিলাম।

আসলে ওই সময়টায়, পরবর্তী একটা বছর পর্যন্ত, কখন কোথায় আমি জেগে ছিলাম বা ঘুমাচ্ছিলাম, তার কোনও হিসেব আমার কাছে ছিল না। আমাদের প্রেম ছিল মাস কয়েকের, তাই সবাই ভেবেছিল, পরবর্তী মাস কয়েকেই ব্যাপারটা চুকে যাবে। কিন্তু আমি সবার সংঘবদ্ধ ধারণাকে বৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করে এক জুঁইয়ের ব্যাপারেই নিজেকে আরও আরও পাগল করে তুললাম। আর উঠতে বসতে, কিছুতেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারলাম না এজন্য যে, একজন অন্তত কোনও বন্ধুবান্ধব অথবা পরিচিত কারও ফোন নাম্বারও কখনও আমি চাই নি জুঁইয়ের কাছে! আমি শুধু জানতাম ও ঢাকায় মাটিকাটা নামের একটা জায়গায় থাকে। মা-বাবা আর একটা বোন সহ ও থাকে, ও বলেছিল।

কোন একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে যেন পড়ত। আশ্চর্য যে, ইউনিভার্সিটির নামটাও কখনও জিজ্ঞেস করা হয় নি। জুঁইয়ের সম্পর্কে আমার বাহ্যিক জানাশোনা যে এত কম, আমি নিশ্চিত, ও হারিয়ে যাওয়ার আগেই কখনও যদি এটা আমি টের পেতাম, তখনও এ নিয়ে আমাকে লজ্জিত হতে হতো।

ছয় মাস পর আবারও একটা রাতের ট্রেনে চেপে আমি ঢাকায় চলে যাই। আগেরই মতো খুব ভোরে বিমানবন্দর রেলস্টেশনে নেমে, দৌড়ে গিয়ে ওভারব্রিজে উঠে আগেরবারের মতো ওকে আর কোথাও না পেয়ে (অথচ জানতামই তো যে, পাব না!) চিৎকার চেঁচামেচি করে আমি কাঁদতে থাকি। চারপাশে লোক জমে যায়। জিজ্ঞেস করে, আমার সমস্যা কী। আমি কিছুই না বলে দৌড়ে পালাই, আর স্টেশনের বাইরে গিয়ে একটা ইয়োলো ক্যাব দাঁড় করিয়ে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করি, এখান থেকে এখন রওনা দিলে তিন ঘণ্টা পর ঢাকার অন্য কোন কোন প্রান্তে গিয়ে পৌঁছানো সম্ভব? ড্রাইভার ক্যাবের গতি বাড়িয়ে দেয়। দিনভর মাটিকাটা এলাকায় ঘুরে বেড়াই। বিকেলে খেতে বসে মাটিকাটারই একটা খাবার হোটেলের ক্যাবিনে ঘুমিয়ে পড়ি। কেউ ডিস্টার্ব করে না। যখন জেগে উঠি, রাত হয়ে গেছে। বের হয়ে সিএনজি নিয়ে আবার স্টেশন এবং সেখান থেকে আবার ট্রেন।

প্রথম এক বছরের মধ্যে কয়েকবার আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলাম। সবচেয়ে বড় কথা, এক পর্যায়ে বুঝতে পারলাম যে, ব্যাপারটা আমার দ্বারা কিছুতেই সম্ভব নয়। আর তাতেও নিজের ওপর বিরক্তি বাড়ে। আমি তো জানতাম, কখনও জুঁই না থাকলে, আমিও আর বাঁচব না। কিন্তু সত্যিই যখন নেই, মরতে গিয়েও মরতে পারা যাচ্ছে না। এ সময় মোস্তফার একটা একদমই হাসিচ্ছলে বলা কথাকে আমি আকড়ে ধরি। ও বলেছিল, “আরে মরবিই যদি, দশ বছর পর ওইদিন ওভারব্রিজে যাবে কে, আমি? গিয়ে বলব, বহু আগে, অন্তত নয় বছর আগেই তুই মরে ভূত?” তাই তো। দশ বছর পর তো ও থাকবে। একই তারিখ, বিকেল পাঁচটায়। কিন্তু এত দীর্ঘ অপেক্ষার ভার নিয়ে কীভাবে একজন মানুষ তার স্বাভাবিক জীবন যাপন চালিয়ে যেতে পারে, যে জীবনের প্রতিটা ফাঁক ফোকড়েই আসলে ওই এক অপেক্ষাই নাক গলিয়ে থাকে!

এত আয়োজন সত্ত্বেও পরবর্তী একবছরে জুঁইকে আমি পুরোপুরি ভুলে যাই। এই ভুলতে পারার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রাখে, বাবার মৃত্যু। আর সেই সূত্রে হঠাৎই আমার একটু তাড়াহুড়ো করে বড় হয়ে যাওয়া। এরমধ্যে নতুন আরেকটা প্রেমও হয় আমার। একই শহরের, সাংস্কৃতিককর্মী টাইপের একটা মেয়ের সঙ্গে। বর্ষবরণ, রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তীর মতো নানাবিধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে একক ও দলীয়ভাবে গান গাইত। নাম, শোভা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মেয়ে। বাবার চাকরির সুবাদে আমাদের শহরে থাকত। সত্যি বলতে, এ প্রেমটাও খুব জমে যায়। আর একপর্যায়ে তো এমনও মনে হয় যে, কোথাকার কোন জুঁইয়ের জন্য কিনা মরতে বসেছিলাম!

শোভা একদিন জানতে চাইল, এখনও আমি জুঁইকে মনে রেখেছি কিনা। চমকে উঠি প্রশ্ন শুনে। আর জানতে চেয়েছিলাম বিষয়টা ও জানল কীভাবে। বলল, এ ব্যাপারে জানে না, এমন লোক নাকি খুব কমই আছে। ব্যাপারটাকে একটা ফালতু প্রসঙ্গ হিসেবে আখ্যায়িত করে আমি শোভার হাত ধরি। ওকে সহ রিকশায় শহর ঘুরে বেড়াই। সন্ধ্যার পর চুমুও খাই। এভাবে বছর খানেকের মধ্যে আমরাই আমাদের সবচেয়ে মেইনস্ট্রিম প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে উঠি। ফলে দীর্ঘস্থায়ীভাবে চাপা পড়ে যায় একদিনের জুঁই।

বছর খানেকের শোভাও অবশ্য অনিবার্যভাবেই একদিন নিজের বিয়ের কথা জানিয়ে যায়। আর খুব অনুরোধ করে, এ ব্যাপারে আমি যেন কোনও পাগলামি না করি। আসলে সব মিলে এ ইস্যুতে আমি খানিকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম, তাই শোভার এমন প্রতারণার জবাবে আমি প্রায় কিছুই করলাম না। শুধু মাসখানেকের জন্য দূরসম্পর্কের এক খালার বাড়িতে, অন্য আরেকটা শহরে গিয়ে ঘাপটি মেরে পড়ে থাকলাম।

তারপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকমভাবে ছিলাম। লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে গত চার বছর ধরে ঢাকায়, আগেই বলেছি। এরমধ্যে জুঁইয়ের কথা খুব একটা আর মনে পড়ে নি। আবার একেবারেই যে পড়ে নি, তাও নয়। কিন্তু আমি ধরে নিয়েছিলাম, জুঁইয়ের ব্যাপারে জিকুর করা মন্তব্যটাই হয়ত ঠিক। মনে হয়েছে, হয়ত এমন হয়ে থাকবে, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে, প্রেম করিয়ে মফস্বল থেকে কাউকে ঢাকায় নিয়ে আনতে পারা না পারা বিষয়ে ধরা কোনও বাজির অংশ ছিলাম আমি। অবশ্য সেসব নিয়েও আলাদা কোনও দুঃখবোধ এতদিনের ব্যবধানে আমার মধ্যে আর অবশিষ্ট ছিল না।

তবে একদমই অভ্যেসবশত এ দশ বছরের পুরোটা সময় জুড়েই ওর নাম্বারে আমি মাঝেমাঝেই ডায়াল করে গেছি। কিন্তু তা কোনওভাবেই ওকে ফিরে পেতে চেয়ে নয়, বা এমনকি আবার কোনও যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হোক, সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেও নয়। আগাগোড়াই অভ্যেসবশত। এমনও হয়েছে, দিনের পর দিন আমি ওই নাম্বারে ডায়াল করেছি, অন্তত এই ব্যাপারেও সতর্ক না থেকে যে, মূলত এ নাম্বারটা কার। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এরমধ্যে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম দশ বছর পর, কোন মাসের ঠিক কত তারিখে আবার আমাদের দেখা হবার কথা! মোটকথা এটা একটা পরিত্যক্ত প্রসঙ্গ হিসেবে জীবনের কোনও এক কোণে পড়ে ছিল।

তবু চুক্তি অনুযায়ী দশ বছর পরের নির্ধারিত দিনে আমি যে ওভারব্রিজে এসে হাজির হতে পারি, এটা সম্ভব হয় শুধু এ কারণে যে, ঠিক একদিন আগেই লন্ডন থেকে ফোন করে মোস্তফা আমাকে, কালকে যাচ্ছি কিনা জিজ্ঞেস করে। ওকে অবশ্য বিশ্বাস করানো যায় নি, নিজে আমি তারিখটার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু বেশ অবাকই হতে হলো, এতদিন ধরে তারিখটা ওর মনে রেখে দেওয়ার ঘটনায়। এমনকি তারপরও বিকেল পাঁচটায় বিমানবন্দর স্টেশনের ওভারব্রিজে আমি যাব কিনা, সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম না। কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাখ্যাতীত একধরনের কৌতূহল আমাকে গ্রাস করে ফেলল। বিকেল তিনটার দিকে জরুরি ছুটি নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ি। আর জ্যামেধরা শহরের এক মাথা থেকে রওনা দিয়ে আরেক মাথার বিমানবন্দর স্টেশনে পৌঁছাতে সোয়া পাঁচটা বেজে যায়। ওভারব্রিজে উঠে, দশ বছর আগেকার সেদিনের মতোই জুঁইকে আমি দেখতে পাই আবার। ওই যে বললাম, হঠাৎই থমকে দাঁড়ায় আমার বড় হতে থাকা? আসলেই ব্যাপারটা তাই। জুঁই এগিয়ে এসে বলল, “এখন বোধহয় এ শহরেই থাকো?” আমি কী বলব ভেবে পেলাম না। ওকে ঘিরে সেই আবেগ, সেই উত্তেজনা তো আর নেই, উল্টো দশ বছর পর ওর এমন উপস্থিতি খানিকটা ভুতুড়েই ঠেকল।

যতটা সম্ভব স্বাভাবিকভাবে আমি বললাম, “তুমি তো একটুও বদলাও নি! উনিশ বছরের তুমিই রয়ে গেছো।” ও হাসল, বলল, “আমি তো একই রকম থেকে যাই!” আমিও হাসলাম, কবি স্বভাবটা আর গেল না ওর। ওকে বলি, “আমি জানি, তুমি কারও সঙ্গে বাজি ধরেছিলে।”

“যেমন?” জানতে চায় ও। সব ওকে খুলে বলি, ওর জন্য আমার প্রথম এক বছরের পাগলপ্রায় দশার কথা, ছয় মাস পর ঢাকায় এসে ওকে খুঁজে বেড়ানোর কথা, ওকে নিয়ে জিকুর মন্তব্য, আর এক পর্যায়ে ওই মন্তব্যেই নিজের বিশ্বাস স্থাপনের কথা। সব শুনে বিস্ময়করভাবে ও কাঁদতে শুরু করল। বুঝলাম আমার করুণ দশা শুনেই এ কান্না। সুতরাং ঔদার্যে আমি হৈ হৈ করে উঠি, “আরে! কাঁদছো কেন? ওসব ফিলিংস এখন তো আর নেই। কত আগের কথা সেসব!” আর এও জানাই যে, মোস্তফা ফোন না করলে আমার তো আজকে আসাই হতো না।

“বরং এবার বলো, কী ধরনের বাজি ছিল সেটা, এখন কোথায় আছো, বিয়ে করেছো?” জানতে চাই আমি। হতভম্ব মুখে ও আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। একবার নিজেকেই শুনিয়ে বলে, “তার মানে”… তার মানে? কী তার মানে? “তারমানে তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না? চাও না এখন আর?” সত্যি না রসিকতা বোঝার চেষ্টা করি। বুঝতে না পেরে বলি, “মানে এটা কী ধরনের রসিকতা হচ্ছে, তুমি নিশ্চয়ই বলবে না যে, সত্যিই তুমি আমার সঙ্গে সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায় কাটাতে এখানে এসে হাজির হয়েছো? দশ বছর পর!” জুঁই কাঁদল, সে কান্না থামাতেও পারল। বলল, “আমি তো আসলেই তোমার কাছেই এসেছি। তুমি আমাকে নিয়ে যাবে না?” দিশেহারা হয়ে আমি ওর দুই বাহু ধরে ঝাঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কোথায় ছিলে এতদিন!”

“নিয়ে যাবে না তোমার সঙ্গে?” বারবার একই কথা জানতে চায় ও। আমার মধ্যে কী হলো, বলে বোঝানো যাবে না। হঠাৎ করে না চাইতেই, আরও ভালোভাবে বললে, চাওয়া যে যেতে পারে, সেই ধারণারও অনেক দূরে থেকেই সব পেয়ে যাওয়ার যে আনন্দ আর উত্তেজনা, আমার মধ্যে তার সবটা এসে ভর করল। একেবারে পাগল হয়ে গেলাম আমি। প্রকাশ্যে, ব্যস্ত স্টেশনে চড় থাপ্পড় দিতে দিতে ওকে আমি চুমু খেতে লাগলাম।

সে রাতেই বিয়ে করতে আমরা কাজী অফিসে যাই। কিন্তু রেজিস্ট্রি খাতায় পিতা-মাতার নাম, স্থায়ী ঠিকানা ইত্যাদি লিখবার প্রসঙ্গ যখন আসলো, জুঁই বলল ও এসব তথ্য দিতে চায় না। কেন, জানতে চাই না। কাজীকে বলে দুটো ফেইক নাম আর একটা ফেইক স্থায়ী ঠিকানা সেখানে বসানোর ব্যবস্থা হয়। আর জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা পাসপোর্ট কোনওটাই ওর না থাকায় সে ব্যাপারটা ম্যানেজ করতে ভালো অংকের ঘুষ দিই কাজীকে। ঢাকায় বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মেসে থাকাকালে বন্ধুত্ব হওয়া রুমমেটদের ডেকে এনে কাউকে উকিলবাপ, কাউকে সাক্ষী ইত্যাদি বানিয়ে আমাদের বিয়ে হয়। হুট করে ভয়াবহ রকমের সুখী হয়ে, সুখানুভূতির ব্যাপারটাই আমার অবশ হয়ে গেল। সবকিছু যে এতটা স্বপ্নের মতো আসলেই হয়ে উঠতে পারে কারও জীবনে, বহু বইপত্র পড়েও আগে এ ব্যাপারে জানতে পারি নি। অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছিল সবকিছু।

কিন্তু জগত সংসারের কিছু কমন প্রশ্ন এসে আমার মাথায়ও গুঁতো দিল, যেমন, জুঁই এ দশ বছর কোথায় ছিল, কীভাবে, কাদের সঙ্গে ছিল, এরকম নানা প্রশ্ন। কিন্তু আবার নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম, যতদিন না নিজে থেকে ও কিছু বলবে, আমিও এ ব্যাপারে কিছুই ওকে জিজ্ঞেস করব না।

করলামও না। এমনকি, ওভারব্রিজে এসে দাঁড়ানোর আগেই ও কোন এলাকা থেকে বেরিয়ে এসেছে, ওর ওই মা-বাবা আর বোন তারা কোথায় থাকে এখন, বিয়ের খবরটা তাদের দেওয়া উচিত কিনা, কিংবা কেনই বা রেজিস্ট্রি খাতায় বাবা মায়ের ফেইক নাম দিতে হলো, এসব কোনও ব্যাপারেই কিছুই ওকে জিজ্ঞেস করলাম না। যেন ও যদি একটা ধূমকেতুও হয়ে থাকে, আর ওর কাজ যদি হয় দশ বছর পর পর পৃথিবীতে এসে দুয়েক মাস আমার সঙ্গে সময় কাটিয়ে যাওয়া, তাতেও আমার কোনও আপত্তি নেই। আর কী অবাক, কত কিছু নিয়েই আমাদের কথা হলো, কতখানেই আমরা বেড়াতে গেলাম, কিন্তু কোনওভাবেই নিজে থেকে জুঁই ওর নিজের অতীত, বা শেষ দশ বছরের জীবন যাপন সম্পর্কে কিছুই বলল না। নিজের কাছেই একদিন অস্বাভাবিক লাগল বিষয়টা, তার কারণ হয়ত এই যে, ততদিনে বিয়ের প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেছে।

“আবার কবে উধাও হচ্ছো?” আপাত অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে, কিন্তু এ প্রশ্নে ওর চেহারার স্বল্পতম পরিবর্তনটুকুও আমাকে বুঝে নিতে হবে, আগে থেকেই ঠিক করে রাখা এমন পরিকল্পনায়, ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় প্রতিবিম্বিত ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করি। ও হাসে, নিঃশব্দে। প্রতিবিম্বিত চেহারার ব্যাপারে অসচেতন বলেই কি? “বললে না?” আবারও জানতে চাই। এবার ও সশব্দে হাসে। যেন খুব ছেলেমানুষি কোনও প্রশ্ন। বলল, “কেন, যেকোন মুহূর্তেই তো!”

“হুঁম, আমারও তাই ধারণা।” বলি আমি। জুঁই বলল, “আচ্ছা তুমি কি আমার অতীত, এ দশ বছর কোথায় ছিলাম, এসব জানতে চাচ্ছো? ভাবছো খুব অন্ধকার কোনও জগতে আমি ছিলাম কিনা?” এবার আমিই লজ্জিত হই। বলি, “অন্ধকার জগতের কথা ভাবি নি।” কিছু ভাবল ও। আর বলল, “ধরো অন্ধকার জগতেই যদি ছিলাম, ভালোবাসবে না আর, অপেক্ষা করবে না?” আমার আশঙ্কার অ্যাঙ্গেলগুলো ও বুঝে ফেলছে, আর তাই খানিকটা ঝাঁকি দিয়ে নিজেকে ফেরানোর মতো করে আমি বলি, “বাদ দাও এসব। যেখানে ইচ্ছে সেখানে ছিলে, এখন আমার সঙ্গে আছো, এটাই যথেষ্ট।” মজা করতে চেয়েই মূলত, যোগ করি, “আবার হারিয়ে গেলে কোথায় খুঁজব?” ও হেসে বলল, “কেন, বিমানবন্দর স্টেশনের ওভারব্রিজ!” আর এ জবাবে দুজনেরই খুব হাসি তামাশা পায়।

তবু ও আবার চলে যাবে এ আশঙ্কাটাকে আমি তাড়াতে পারি না। করুণ চোখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওর দিকে তাকিয়ে থাকি, ও চোখ নামিয়ে নেয় না, আবার কিছু জিজ্ঞেসও করে না। এভাবে দিনের পর দিন চলতে থাকার একপর্যায়ে আমি টের পাই ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ঠিক আর স্বাভাবিক নয়। নিজেদের মধ্যে গল্প করারও কোনও বিষয় আমরা খুঁজে পাই না। জুঁই যেহেতু ওর অতীত বা গত দশ বছরের জীবনের ব্যাপারে একেবারেই মুখ খোলে না। ফলে ও যা বলে ওঠে মাঝেমাঝে, তাও এই গত চার মাসের বিবাহিত জীবন আর দশবছর আগে ফোনে বলা আমাদের কথাবার্তা এবং ওই দফার শেষদিনের বেড়াতে যাওয়ার স্মৃতিচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

এমনকি ওর থুতনিতে বছর কয়েকের পুরনো একটা কাটা দাগ দেখেও এটা জানার উপায় থাকে না, কীভাবে এমনটা হয়েছিল বা ও যখন শাকিরার ওয়াকা ওয়াকা গানটা গুনগুন করে কখনও, জিজ্ঞেস করা হয় না ওই বছরের বিশ্বকাপের সময় কোথায় ও ছিল। আমি বলি, “গানটা খুব ভালো ছিল, ওই বিশ্বকাপের সময়ই আমি ঢাকায় চলে আসি।” ও উৎসাহিত হয়, বলে, “বিশ্বকাপ চলার সময়, নাকি শেষ হয়ে যাওয়ার পর?” বলি, “চলার সময়। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের দিন।” জুঁই হাসে, ইনফর্মড হওয়ার ভদ্র ও মাপা হাসি। কিন্তু নিজের বিশ্বকাপের ব্যাপারে নীরব থাকে।

সে রাতে শাকিরাকে স্বপ্ন দেখি। সেদ্ধ ধানের স্যাম্পল নিয়ে শাকিরা আমার অফিসে আসে। আর নিজেকে দশ বছর আগের ওই ধানের কলের বর্তমান ম্যানেজার দাবি করে ওয়াকা ওয়াকা বলতে বলতে একটা দুইটা করে ধান ছিটাতে থাকে। রেগে গিয়ে বলি, ‘ফাইজলামি করো! আমি জানি তুমি কে।’ শাকিরা হাসে। বলে, “সবাই যা জানে তুমিও তাই জানো কেন?” আমি দাবি করি, “সবাই যা জানে আমি তা জানি না, আমি অন্যকিছু জানি।” জিজ্ঞেস করে, “কী জানো তুমি?” বলি, “তুমি শোভা, দুই পয়সার রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী”, এবং আমি ইংরেজিতেও বলি, “ইউ আর নট শাকিরা।” ঘুষি দিয়ে আমি নকল শাকিরার নাক ভেঙে দিই। আর স্বপ্নের মধ্যেই একটা রিকশা ঠিক করে আমি শোভাদের বাসায় গিয়ে শোভার মাকে বলি, “এটা কী করে সম্ভব যে দুই পয়সার দলীয়সংগীত শিল্পী নিজেকে শাকিরা বলে দাবি করে!”

পরদিন জুঁই আমাকে জিজ্ঞেস করে, “শোভা কে গো?” আমি ভালো করে ওর দিকে তাকাই। বলি, “তুমি এ দশ বছর কলকাতায় ছিলে?” চমকে ওঠে ও। কিন্তু আবার হাসে, বলে, “আমার তো পাসপোর্টই নেই।” “সে তো আমাকে ওরকম জানানো হয়েছে বলে নেই, বাস্তবে থাকতে পারে না?” ঠাণ্ডা মাথায় বলার ভঙ্গিতে বলি। মুহূর্তেই কালো মেঘের মতো হয়ে যায় ও, নাটকীয়ভাবে পানি বেরোয় ওর চোখ দিয়ে। “তুমি আমাকে বিশ্বাস করো না” কাঁদতে কাঁদতে বলে। আমি বোঝাতে পারি না, এখানে বিশ্বাস বা অবিশ্বাসের কিছু নেই। বিশ্বাস কিংবা এমনকি অবিশ্বাস করতে গেলেও ন্যূনতম ইনফর্মেশন থাকা লাগে, অর্থাৎ ব্যাপারটিকে তো থাকতে হবে, যেটাকে বিশ্বাস করব, অথবা করব না। “তোমার তো কোনও ব্যাপারই নেই!”

তারপর নিয়ম করে প্রায় প্রতিরাতে আমি শোভাকে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। হঠাৎ শোভাকে স্বপ্ন দেখতে শুরু করার কোনও ব্যাখ্যা আমি নিজেকে দিতে পারলাম না। শুধু টের পেলাম, জেগে ওঠার পরও ওই রেশ থেকে যায়। জুঁইয়ের সঙ্গে সম্পর্কটা পুরোপুরি ফর্মাল হয়ে ওঠে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কোনও কথাই আর হয় না আমাদের। বরং, জুঁইয়ের চলে যাওয়ার আশঙ্কাটাকেই কেমন যেন সম্ভাবনার মতো লাগতে শুরু করে। মনে হয়, ও এখনও যাচ্ছে না কেন? দশ বছরের জন্য ওর কি কোথাও যাওয়ার নেই আর! যেন এবার আমি শোভার ব্যাপারে একান্তে কিছু ভাববার অবসর চাই। শোভার চলে যাওয়ায় না-জাগা বিরহটাকে জাগিয়ে দেখতে চাই ওটা কেমন। যেন আমি নিশ্চিত হতে চাই, যে কখনও ফিরে আসবে বলে নি, তার চলে যাওয়া বা তার না থাকাই বেশি দামি ছিল কিনা।

অল্প সময়ের মধ্যেই এই চাওয়া এত তীব্র হলো, আর সেইসূত্রে আমার বদলে যেতে থাকাও এত স্পষ্ট হলো যে, আমি নিশ্চিত, ঘাবড়ে গিয়ে জুঁই এখন ওর অতীত এবং গত দশ বছরের সব ঘটনা আমাকে খুলে বলতে রাজি। কিংবা যেকোন কারণেই হোক, রাজি। বিভিন্নভাবে সে এটা বোঝায় আমাকে। বোঝায় যে, আগ বাড়িয়ে প্রসঙ্গটা ও একা একা তুলতে পারবে না সত্যি, তবে আমি যদি তুলি, ও বলবে। কিন্তু কী অদ্ভুত, প্রেম বলি, থাকা বলি, কী নাটকীয়তা, বা নিদেনপক্ষে স্বাভাবিক কৌতূহল, কোনও অ্যাঙ্গেল থেকেই প্রসঙ্গটা আমি আর তুলতে পারি না। যেন এবার উল্টো আমিই হারিয়ে গেছি ওর থেকে, আর তা, কোথায় আবার আমাকে খুঁজে পাওয়া যাবে, না বলেই।

SHARE
Previous articleঘটিকাহিনী (২৮)
Next articleঘটিকাহিনী (২৯)
তানিম কবির
জন্ম ফেনী জেলার পরশুরাম-বিলোনীয়া এলাকায়। কবিতা ও গল্প লেখেন। প্রকাশিত কবিতার বই তিনটি, ‘ওই অর্থে’ (শুদ্ধস্বর ২০১৪), ‘সকলই সকল’ (শুদ্ধস্বর ২০১৫) ও 'মাই আমব্রেলা' (আদর্শ ২০১৬) এবং একটি গল্পের বই 'ইয়োলো ক্যাব' (ঐতিহ্য ২০১৬)। সম্পাদনা করেন দৈনিক ভোরের পাতার সাপ্তাহিক সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘চারুপাতা’। এর আগে অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ ও প্রিয়.কমে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রকাশিতব্য বই, ‘ঘরপলায়নসমূহ’ (ফেব্রুয়ারি ২০১৭) ফেসবুক পেজ: ফেসবুক পেজ: Tanim Kabir (Writer)