Pages Menu
TwitterRssFacebook
Categories Menu

Posted by on Aug 1, 2014 in অনুবাদ | Comments

ধর্মীয় সহিংসতার মিথ

ধর্মীয় সহিংসতার মিথ

[ধর্ম সহিংস বা সহিংসতা উস্কে দেয় এটা পশ্চিমের প্রচলিত ধারণা। পশ্চিম শুধু জিওগ্রাফিকাল সীমানা নয়, বরং একটা মতাদর্শ। ধর্মীয় সহিংসতা নিয়া আমরা এত পেরেশান, কিন্তু তামাম দুনিয়ায় জারি থাকা এত এত যুদ্ধ, খুন-খারাবি এগুলিকে তারা আলাদা ট্যাগ লাগান না। দেশের জন্যে জীবন দিলে বীর হওন যায়। প্রশ্নটা শুধু ধর্মের না, ক্ষমতারও। এইসব বিষষ-আশয় ও তার জিনিয়ালজি নিয়াই কাভান-এর বই মিথ অফ রিলিজিয়াস ভায়োলেন্স। এখানে বইয়ের ভূমিকা অংশের তরজমা পেশ করা হইল। — অনুবাদক]

উইলিয়াম কাভান-এর মিথ অফ রিলিজিয়াস ভায়োলেন্স বইয়ের ‘ভূমিকা’ অংশ

অনুবাদ: সাব্বির আজম

 

ধর্মের সহিংসতা উসকে দেয়ার প্রবণতা আছে — এই ধারণা পশ্চিমা সমাজের প্রচলিত এলেমেরই অংশ আর তা অনেক প্রতিষ্ঠান ও পলিসির (চার্চের জাহেরি ভূমিকাকে সীমিত করা, মধ্যপ্রাচ্যে উদারবাদী গণতন্ত্র কায়েমের প্রচেষ্টা ইত্যাদির) বুনিয়াদরূপে কাজ করে। যাকে আমি ‘ধর্মীয় সহিংসতার মিথ’ বলছি সেই ধারণা মোতাবেক, রাজনীতি কিংবা অর্থনীতির মতো সেকুলার বৈশিষ্ট্য থেকে ধর্ম সম্পূর্ণ আলাদা, ধর্ম বরং মানব জীবনের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ঊর্ধ্ব এক ও অপরিবর্তনীয় (transhistorical and transcultural*) বৈশিষ্ট্য যা সহিংসতাকে প্রবলভাবে উসকে দেয়। সে কারণে জনক্ষমতার (public power) পরিসরে ধর্মের প্রবেশাধিকার বন্ধ করে একে বশ মানাতে হবে। ফলে ধর্মের মজ্জাগত মসিবত সম্বন্ধে একটা বৈশ্বিক ও শ্বাশত সত্য দাঁড় করানো হয়, যার সাপেক্ষে সেকুলার জাতি-রাষ্ট্রকে আমাদের কাছে একদম স্বাভাবিক মনে হয়।

আমার বইয়ে এই প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। ‘সেকুলার’ তকমা আঁটা মতাদর্শ ও প্রতিষ্ঠানগুলি ‘ধর্মীয়’ তকমা আঁটা মতাদর্শের মতোই সমান সহিংস—এই যুক্তির বদলে কীভাবে খোদ ধর্মীয় ও সেকুলার এই দুইটা ক্যাটেগরি নির্মিত হয় তা বিচার-বিশ্লেষণ করে আমি একে চ্যালেঞ্জ করেছি। রাজনৈতিক ক্ষমতার নির্দিষ্ট বিন্যাস মাফিক আধুনিক পশ্চিমে ও ঔপনিবেশিক প্রেক্ষিতে ‘ধর্ম’ কীভাবে ক্যাটেগরি আকারে নির্মিত হয়েছে সে বিষয়ে বর্তমানে পণ্ডিতরা তালাশ চালাচ্ছেন। এই এলেমকে আমি এস্তেমাল করেছি এবং ধর্ম সহিংসতা ঘটায়—এই বাহাসে কীভাবে ধর্ম ও সেকুলারের শ্বাশত ও ট্রান্সকালচারাল ক্যাটেগরি ব্যবহৃত হয় তা বিশ্লেষণ করে দেখেছি। আমি দেখাব ধর্মের ইতিহাস ও সংস্কৃতি উর্ধ্ব স্থির কোনো মর্মশাঁস (essence) নাই এবং মূলনীতিবাদীরা (essentialist) ধর্মীয় সহিংসতাকে সেকুলার সহিংসতা থেকে আলাদা করার যে কোশেশ করে তা একেবারেই অসঙ্গতিপূর্ণ। একটা নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতে কোনটা ধর্মীয় আর কোনটা সেকুলার হিশেবে গণ্য হবে তা ক্ষমতার বিভিন্ন বিন্যাস মাফিক নির্ধারিত হয়। সওয়াল উঠতে পারে মূলনীতিবাদীদের এই নির্মাণ এত মজবুত হয়ে উঠল কেন? আমার দাবি—ধর্ম সহিংস বা সহিংসতাকে উসকে দেয় এই ধারণা যাকে আমরা ‘পশ্চিমা’ সমাজ বলি সেই সমাজের উদারবাদী জাতি-রাষ্ট্রকে জায়েজ করার বুনিয়াদি মিথগুলোর মধ্যে অন্যতম। ধর্মীয় সহিংসতার মিথ ধর্মীয় অপরকে নির্মাণ ও কোণঠাসা করতে সাহায্য করে এবং যুক্তিবাদী, শান্তিকামী সেকুলার কর্তা সৃষ্টি করে। এই মিথ ধর্মীয় তকমা সেঁটে দেয়া বিভিন্ন গ্রুপ ও তাদের বিভিন্ন চর্চাকে কোণঠাসা করার রাজনীতিতে কাজে লাগে এবং এ ধরনের কাজকে হালাল করে। অপরদিকে, এটি নাগরিকের কাছ থেকে দেশের জরুরতে নিজেকে শহীদ ও অন্যকে খুনের সমর্থন আদায় করে নেয়। বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে এই মিথ নন-সেকুলার সমাজ ব্যবস্থাকে (বিশেষত মুসলিম সমাজগুলি) খল আকারে দেখতে সাহায্য করে। তারা এখনো রাজনৈতিক জীবন থেকে ধর্মের ভয়ঙ্কর আছরকে খেদাতে শিখে নাই। সে কারণে তাদের সহিংসতা অযৌক্তিক ও উন্মত্ত। আমাদের সহিংসতা (যেহেতু সেকুলার) যৌক্তিক ও শান্তিকামী আর অনিচ্ছাসত্ত্বেও, তাদেরকে রুখতে মাঝে মাঝে সহিংস হতে হয়। উদারবাদী গণতন্ত্র কায়েমের জন্য তাদের ওপর বোমা মারতে বাধ্য হই আমরা।

mythorv

বিশেষত, ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১ এর পর থেকে ইতিহাসবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ধর্মীয় শিক্ষার অধ্যাপক ও অন্যান্যরা ধর্মের সহিংস প্রবণতার আজব খাসলতকে ব্যাপকভাবে কাটাছেঁড়া করছেন। একই সাথে, কেউ কেউ পশ্চিমা আধুনিকতায় ‘ধর্মের’ নির্মাণের যে মতাদর্শিক ব্যবহার সেদিকটা খতিয়ে দেখছেন। একদিকে, কিছু আলেম আছেন যারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, ধর্মের সহিংসতাকে উসকে দেয়ার সহজাত প্রবণতা আছে। অন্যদিকে, কিছু আলেম আছেন যারা সওয়াল করছেন ধর্মের নির্মিত মতাদর্শিক ক্যাটেগরি ছাড়া ‘ধর্ম বলে আদৌও’ কোনো কিছু আছে কিনা। তারা এই মতাদর্শিক নির্মাণের পরিবর্তনশীল ইতিহাসকে সতর্কতার সাথে তালাশের কথাও বলছেন।

“তারা এখনো রাজনৈতিক জীবন থেকে ধর্মের ভয়ঙ্কর আছরকে খেদাতে শিখে নাই। সে কারণে তাদের সহিংসতা অযৌক্তিক ও উন্মত্ত। আমাদের সহিংসতা (যেহেতু সেকুলার) যৌক্তিক ও শান্তিকামী আর অনিচ্ছাসত্ত্বেও, তাদেরকে রুখতে মাঝে মাঝে সহিংস হতে হয়। উদারবাদী গণতন্ত্র কায়েমের জন্য তাদের ওপর বোমা মারতে বাধ্য হই আমরা।”

সংজ্ঞা নিয়ে একাডেমিকদের বাদানুবাদের থেকেও আরো বেশি কিছু এখানে বিপন্ন। আমরা যখন সওয়াল করি ধর্ম ও সহিংসতার বয়ানে ‘ধর্ম’ বলতে তারা কী বোঝায়, তখন তারা কাকে ধর্ম হিশেবে গণ্য করা হয় আর কাকে গণ্য করা হয় না সে সম্পর্কিত কিছু অসমর্থিত অনুমানের বরাতে ইনিয়ে বিনিয়ে ব্যাখ্যার কোশেশ করে। নির্দিষ্ট কিছু রেওয়াজ ও প্রতিষ্ঠানকে তুলোধোনা করা হচ্ছে, অথচ অন্যান্যগুলিকে (যেমন: জাতীয়তাবাদ) আমলেই নেয়া হয় না। কেন? আমার প্রস্তাব হচ্ছে—ধর্ম ও সহিংসতার বয়ান পশ্চিমের ভোক্তাদের নির্দিষ্ট চাহিদা হাসিল করে। এই যুক্তি আবার এনলাইটেনমেন্টীয় কিস্‌সারই অংশ যা ধর্ম ও সেকুলারের মধ্যকার বৈপরীত্য (dichotomy) পয়দা করেছে এবং ধর্মকে অযৌক্তিক ও ভয়ঙ্কর প্রবণতারূপে নির্মাণ করেছে, যাতে জনগণকে যুক্তিবাদী সেকুলার ক্ষমতার হাতে কুক্ষিগত করতে সুবিধা হয়। পশ্চিমে ধর্মের নামে খুনাখুনির প্রতি বিতৃষ্ণাই জাতি-রাষ্ট্রের নামে খুনাখুনিকে ছহি ও জায়েজরূপে কবুল করার অন্যতম এক হাতিয়ার। ধর্মীয় সহিংসতার মিথের মারফতে সেকুলার সমাজ ব্যবস্থা কোনো সওয়াল ব্যতিরেকেই অনুমোদন পায় আর ধর্মীয় উন্মত্তদেরকে দুশমন হিশেবে দাঁড় করায়। কার্ল স্মিট হয়ত ঠিকই বলেছিলেন (বর্ণনামূলকভাবে, মান নির্ধারণমূলক অর্থে নয়) যখন তিনি আমাদেরকে দেখান যে, আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিকের জন্মের খাতিরে শত্রু-মিত্রের বিভাজনটা জরুরি হয়ে ওঠে।

তিনি মনে করতেন, শুধু পদ্ধতিগত উদারবাদ শত্রু-মিত্রের বিবাদ থেকে রাজনৈতিকতাকে বঞ্চিত করবে এবং ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক এলাকাগুলিতে ছড়িয়ে পড়বে। হাল আমলের উদারবাদ মুসলিমদের মাঝে তার আসল দুশমনের হদিশ পেয়েছে যারা ধর্ম ও রাজনীতির ফারাক কবুলে নারাজ। মসিবত হচ্ছে যে, এই অপর নির্মাণের মধ্য দিয়ে (যে অপর অযৌক্তিক, উন্মত্ত ও সহিংস) তাদের ওপর যে জোরজবরদস্তি ও বলপ্রয়োগ করা হয় তাকেই আমরা জায়েজ করি।

সন্দেহ নাই, যেকোনো কিসিমের মতাদর্শ ও চর্চা (যেমন: ইসলাম ও খ্রিষ্টধর্ম) নির্দিষ্ট শর্ত বা অবস্থানের আওতায় সহিংসতাকে উসকে দিতে পারে (এবং দিয়েও থাকে)। কিন্তু যে যুক্তিকে আমি অসঙ্গত ও খাপছাড়া বলে চ্যালেঞ্জ করছি সেটা হলো—সেকুলার মতাদর্শ ও প্রতিষ্ঠানগুলি অপেক্ষা ধর্ম নামক একটা ক্যাটেগরি (যার মধ্যে খ্রিষ্টধর্ম, ইসলাম, হিন্দুধর্ম ও অন্যান্য ধর্ম আছে) আবশ্যিকভাবেই অধিক মাত্রায় সহিংস বা সহিংসতার প্রবণতা ধারণ করে। ধর্ম ও সহিংসতার অন্যান্য বইগুলির মতো আমি যুক্তি দেখাব না যে, ধর্ম সহিংসতাকে আশকারা দেয় বা দেয় না, বরং যেসব রাজনৈতিক শর্ত বা অবস্থানের কারণে ধর্ম নামক ক্যাটেগরি পয়দা হয় সেদিকটা খতিয়ে দেখব।

তাই এই বই সহিংসতার অভিযোগের বিরুদ্ধে ধর্মের সমর্থনসূচক নয়। যারা নিজেদেরকে ধার্মিক হিশেবে শনাক্ত করেন তারা অনেক সময় যুক্তি দেখান যে, তথাকথিত ধর্মীয় সহিংসতার খাস প্রণোদনা মূলত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক; ধর্মের সাথে এর কোনো যোগসাজশ নাই। ক্রুসেডাররা যেমন আদতে খ্রিষ্টানই না কারণ খ্রিষ্টধর্মের ছহি মর্মই তারা বোঝে নাই। আমি মনে করি এ ধরনের যুক্তি ধোপে টেকার মতো নয়। পয়লা, ধর্মীয় উদ্দেশ্যকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থেকে এমনভাবে আলাদা করা সম্ভব নয় যেখানে ধর্মীয় উদ্দেশ্য সহিংসতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। কীভাবে একজন ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখতে পারে, যেখানে অধিকাংশ মুসলমান নিজেরা এ ধরনের ফারাকের পরোয়া করে না? দ্বিতীয় অধ্যায়ে আমি দেখাব যে, ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখা নেহাতই আধুনিক পশ্চিমের আবিষ্কার। দ্বিতীয়ত, হতে পারে ক্রুসেডাররা খ্রিষ্টের ছহি বার্তা তছরূপ করেছে, কিন্তু এই কথা বলে খ্রিষ্টবাদকে কেউ সব দায়দায়িত্ব থেকে বেকসুর খালাস দিতে পারে না। খ্রিষ্টধর্ম স্রেফ কিছু মতধারার জমায়েত নয় যা ঐতিহাসিক পরিবেশ পরিস্থিতি থেকে খালাস পাবে, বরং এটা জীবন্ত ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা যা খ্রিষ্টানদের অভিজ্ঞতাজাত আমলনামা ও গতিবিধি দ্বারা অবয়ব পায়। খ্রিষ্টধর্ম বা ইসলাম বা অন্য যেকোনো চিন্তা বা রেওয়াজকে গভীর পর্যবেক্ষণ থেকে রেহাই দেয়ার খায়েশ আমার নাই। যেমন: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলিকে শুধুমাত্র তেল ও স্বাধীনতার বরাতে নয়, খ্রিষ্টিয় শাস্ত্রের মিলেনারিয়ান পাঠের মারফতেও হালাল করা সম্ভব। প্রকৃতপ্রস্তাবে, খ্রিষ্টিয় চার্চগুলি জাতীয় সামরিক বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত যুদ্ধগুলিকে জায়েজের মতো অপকর্মের দোসরই বটে।

cavanaugh3

উইলিয়াম কাভান

প্রচলিত এলেম আমাদের শেখায়—ধর্ম (যেমন: খ্রিষ্টধর্ম, ইসলাম, হিন্দুধর্ম, ইহুদিধর্ম) এবং সেকুলার মতাদর্শ ও প্রতিষ্ঠানের (যেমন: জাতীয়তাবাদ, মার্কসবাদ, পুঁজিবাদ ও উদারবাদ) মাঝে বিস্তর ফারাক বিদ্যমান; ধর্ম সেকুলার মতাদর্শের তুলনায় অনেক বেশি সহিংসতার প্রবণতা ধারণ করে—অধিক মাত্রায় একচ্ছত্রবাদী (absolutist), বিভেদ সৃষ্টিকারী ও অযৌক্তিক। এই দাবিকে আমি ভয়ঙ্কর মনে করি, যুক্তির বিচারেও এটা টেকার মতো নয়। এই যুক্তি ঠুনকো কারণ সেকুলার লেবেল আঁটা মতাদর্শ ও প্রতিষ্ঠানগুলি ধর্মীয় লেবেল আঁটা মতাদর্শগুলির মতোই একচ্ছত্রবাদী, বিভেদ সৃষ্টিকারী ও অযৌক্তিক হতে পারে (বা হয়ে উঠতে পারে)। এই দাবি ভয়ঙ্কর কেননা এটা ধর্মীয় লেবেল আঁটা জীবনব্যবস্থাকে কোণঠাসা করে, এমনকি তাদের বিরুদ্ধে যে সহিংসতা হয় তাকে হালাল করে। তাই কোনটা ধর্মীয় লেবেল পাচ্ছে আর কোনটা পাচ্ছে না সেই বিভাজনটা জরুরি হয়ে ওঠে। ধর্মীয় সহিংসতার মিথ ধর্মীয় ও সেকুলার ক্যাটেগরিকে শ্বাশত, সার্বিক ও স্বাভাবিক নির্মাণরূপে প্রতিষ্ঠার কোশেশ করে কিন্তু আদতে তা পশ্চিমা নির্মাণ। যারা এই ক্যাটেগরিকে শ্বাশত, সার্বিক ও স্বাভাবিক হিশেবে কবুল করে না তাদের ওপর বলপ্রয়োগ করা হয়।

মিথ শব্দটা এখানে শুধুমাত্র মিথ্যা অর্থে ব্যবহার করা হয় নি, বরং পশ্চিমা সমাজগুলিতে এই দাবির (অর্থাৎ ধর্ম অধিকতর সহিংস) আছর সম্পর্কে পাঠকরা যাতে আঁচ করতে পারে সেদিকটা আমার খেয়ালে ছিল। একটা কিস্‌সা তখনই মিথের আরশে বসে যখন তা প্রশ্নাতীত হয়ে ওঠে। মিথ যে জিনিস একবার প্রতিষ্ঠা করে ফেলে সেই কাঠামোর বাইরে চিন্তা করা অনেক কঠিন হয়ে যায় কারণ মিথ ও বাস্তবতা পরস্পরকে মজবুত করে। মিথ যা প্রকাশ করে তাকে সত্য মেনেই সমাজ গঠিত হয় এবং যাকে বাস্তব বলে ধরা হয় তাতে ক্রমাগত মিথের রঙ মাখানো হয়। অপরকে যত বেশি কোণঠাসা করা হয়, তারা তত বেশি অপর হয়ে ওঠে। একই সাথে, সমাজ ব্যবস্থা যত বেশি মিথকে কবুল করে, মিথ তত বেশি সওয়ালের ঊর্ধ্বে ওঠে। ক্যাটেগরিতে ভাগ করে সমাজকে এমন আদল দেয়া হয় যে মিথের কর্মপ্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক ও অনিবার্য বলে মনে হয়।

এসব কারণে মিথকে খণ্ডানো কঠিন হয়ে পড়ে। লিন্ডা জেরিলি ‘পুরাণকথা’ সম্বন্ধে যে মন্তব্য করেছিলেন তা এখানে প্রযোজ্য: ‘একটা মিথকে কখনোই খণ্ডানো সম্ভব না কারণ একজন আরেকজনকে যুক্তি কিংবা তথ্য-সাবুদের জোরে হারায়; যুক্তির মাধ্যমে মিথকে ভিত্তিহীন বিশ্বাসরূপে হাজির করে একে খণ্ডানো যাবে না কারণ সে-নিজেই সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন, কাজেই স্থিতিশীলও। নিষ্ঠুর কিংবা সাদাসিধা দিক নয় (মিথ খুবই জটিল ও অত্যাধুনিকও হতে পারে) বরং আমাদের যাচাই-বাছাই করা ও যুক্তি খণ্ডানোর রেওয়াজকে ফাঁকি দিতে পারাই মিথকে বিশিষ্টতা দিয়েছে।’

সমাজে ক্ষমতার নির্দিষ্ট বিন্যাস ভিত্তিহীন হতে পারে, আর ঠিক এ কারণেই এর বিরুদ্ধে বাহাস করা কঠিন কারণ এগুলির সূচনা যুক্তির মারফতে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। যেমন: ধর্মীয়-সেকুলার বিভাজনটা মানুষের সামাজিক জীবনকে সবচেয়ে ভালোভাবে বয়ান করবে সে সম্পর্কিত কোনো যুক্তিশীল তত্ত্ব হিশেবে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অধ্যায়ে আমি দেখাব, আদি আধুনিক ইয়োরোপে সিভিল ও গির্জার কর্তৃপক্ষের মধ্যে যেভাবে ক্ষমতা বিলিবণ্টন হতো তার আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে এটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে যুক্তি নয়, সহিংসতা দ্বারা এটা কায়েম হয়েছে। এই মিথকে খণ্ডানোর একমাত্র উপায় হতে পারে আকস্মিক পরিবর্তনগুলির কুলজি (genealogy) ঘাঁটা এবং দেখানো যে, ধর্মীয় সহিংসতার মিথ যে ফ্যাসাদ (সমাজে সহিংসতা) শনাক্ত করে ও সুরাহার দাবি করে তা প্রকৃতপক্ষে মিথ কর্তৃক অনুমোদিত ক্ষমতার নানা রকমফেরের দ্বারা বৃদ্ধি পেয়েছে। ধর্মীয় সহিংসতার মিথ তখনই ধসে পড়বে যখন দেখানো সম্ভব হবে এটি যে ফ্যাসাদকে শনাক্ত করেছে তা সুরাহার পর্যাপ্ত তাকদ তার নাই।

ধর্মীয় সহিংসতার তাত্ত্বিকরা ‘সহিংসতা’কে যে অর্থে এস্তেমাল করে থাকেন আমিও এখানে সে অর্থেই গ্রহণ করেছি। ‘সহিংসতা’ সম্পর্কিত তাদের ধারণা মূলত শারীরিক সহিংসতাকে ঘিরে আবর্তিত (যেমন: যুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদ)। এখানে সেই সাধারণ সংজ্ঞাকেই এস্তেমাল করা হয়েছে।

যখন আমি বলছি ধর্মীয় সহিংসতা আদতে ‘পশ্চিমা’ ধারণা এবং ‘পশ্চিমে’ তা কীভাবে কাজ করে—তখন আমি পশ্চিম বলতে কোনো একাট্টা (monolithic) ভৌগলিক অবস্থানকে বোঝাচ্ছি না। পশ্চিম এক ধরনের নির্মাণ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ প্রকল্প, কোনো একাট্টা সত্তার ফিরিস্তি নয়। পশ্চিম একটা আদর্শ যা, স্যামুয়েল হান্টিংটনের ভাষায়, ‘পশ্চিম ও বাদবাকি দুনিয়া’ এই বাইনারি চোখে দুনিয়াকে পাঠ করতে শেখায়। আমার বাহাসের বিষয় হচ্ছে, এই নির্মিত বাইনারিকে সওয়ালের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।

ধর্মীয় সহিংসতার সর্বগ্রাসী খাসলতের কারণে এই মিথের কাঠামো, এর কুলজি ঘাঁটা এবং কী মতলবে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে — এগুলি দেখাতে গিয়ে আমি যথাসম্ভব পুঙ্খানুপুঙ্খ থাকার কোশেশ করেছি। যেমন: পয়লা অধ্যায়ে আমি এই মিথের ৯টা ভিন্ন ভিন্ন একাডেমিক ভার্সন নিয়ে আলাপ করেছি, তৃতীয় অধ্যায়ে ৪০ টারও বেশি নজির টেনেছি যেখানে ‘ধর্মযুদ্ধে’ প্রোটেস্ট্যান্ট-ক্যাথলিক বিরোধিতার বয়ান খাটে না। অনেকে বলতে পারেন এত তথ্য-সাবুদের জরুরত ছিল কিনা। আমি কোশেশ করেছি কোনো ফাঁক না রাখতে এবং এগুলোকে গভীরভাবে পাঠ করতে যাতে এই মিথের সর্বগ্রাসী কায়েমি সুরত চিনতে সুবিধা হয়। আরেকটা কারণ হল—কেউ যাতে অভিযোগ তুলতে না পারে আমি আপনাদের সামনে পছন্দসই বিচ্ছিন্ন কিছু নজির পেশ করেছি। তাছাড়া, পুঙ্খানুপুঙ্খ না হলে এই মিথকে ধসানো সহজ হবে না। একটা মিথ আমাদের প্রচলিত যাচাই-বাছাই ও যুক্তিপদ্ধতিকে যত বেশি ফাঁকি দিতে সক্ষম তার মুখোশ উন্মোচনে তত জোরালো তথ্যসাবুদ পেশ করা দরকার। এই মিথ শুধু সর্বগ্রাসীই নয়, খোদ যে ক্যাটেগরির (বিশেষত ধর্মীয়-সেকুলার ও ধর্মীয়-রাজনীতি ক্যাটেগরি) ভিতরে বাতচিতগুলি হয় সেগুলি এতই মজবুত বুনিয়াদের ওপর দাঁড়ানো যে একে একেবারেই স্বাভাবিক বলে মালুম হয়। একমাত্র চুলচেঁরা কুলজি ঘেঁটেই দেখানো সম্ভব এই নির্মাণ আর যাই হোক অনিবার্য নয়।

এই বইয়ে মোট ৪টা অধ্যায় আছে। পয়লা অধ্যায়ে আমি ধর্মের সহিংস প্রবণতা আছে এই ধারণার পক্ষের ৯ জন নামজাদা একাডেমিকের যুক্তি-তর্কগুলিকে পর্যালোচনা করেছি। তারা বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের আলেম ব্যক্তি এবং তারা ধর্মের সহিংসতার বিভিন্ন ব্যাখ্যা পেশ করেছেন—ধর্ম একচ্ছত্রবাদী, বিভেদ সৃষ্টিকারী, অযৌক্তিক। তারা সবাই একই দোষে দুষ্ট: ধর্মীয় সহিংসতাকে সেকুলার সহিংসতা থেকে আলাদা করার যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য পথ বাতলাতে তারা অক্ষম। তাদের প্রত্যেকটা যুক্তি স্ববিরোধিতায় ভরা। তারা ধর্মের সাবস্টেনটিভিস্ট ধারণা ধরে নেন যেখানে ধর্মবিশ্বাসের স্বভাবের ওপর ভিত্তি করে ধর্মকে সেকুলার ফেনোমেনা থেকে আলাদা করা যায়। আমি দেখাব, কীভাবে এই পৃথকীকরণ তাদের নিজেদের বিশ্লেষণের মারফতেই ধসে পড়ে। যাদের নিয়ে আমি আলোচনা করেছি তাদের একজন ধর্মের সাবস্টেনটিভিস্ট ধারণার স্ববিরোধিতা খেয়াল করে ধর্মের ফাংশনালিস্ট ধারণা এস্তেমাল করেছেন এবং ধর্মের সংজ্ঞাকে এমনভাবে বিস্তৃত করেছেন যে সেকুলার মতাদর্শ ও চর্চাও (যেমন: জাতীয়তাবাদ ও ভোগবাদ) ধর্মের সংজ্ঞার মধ্যে শামিল হয়। অর্থাৎ মানবজীবনের সবকিছুই (মানুষের জীবনকে বিন্যস্ত করে ও অর্থবহ করে এরকম কোনো কিছু) ধর্মের সংজ্ঞার আওতায় পড়ে। ফলে তিনি যেভাবে ধর্মকে সংজ্ঞায়িত করেন তা কোনো বিশ্লেষণী উদ্দেশ্যে কাজে লাগে না।

ধর্ম ও সহিংসতা তর্কের ৯টা ভিন্ন ভিন্ন উদাহরণ বিচার-বিশ্লেষণ করে আমি দেখাব কীভাবে তারা নিজেদেরকে পর্যবেক্ষণজাত (empirical) তথ্য-সাবুদ থেকে সরিয়ে রাখে। যেমন: কোনটা ‘পরম’ হিশেবে গণ্য হবে সেটা আগে থেকেই নির্ধারণ করে দেয়া হয় এবং পর্যবেক্ষণের ধার ধরা হয় না। ঈমানদারদের আদাব-ব্যবহার, গতিবিধিকে পর্যবেক্ষণ করে নয়, বরং ঈমানের ধর্মীয় ফিরিস্তির ওপর ভিত্তি করে এটা নির্ধারিত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায়, প্রকৃতপ্রস্তাবে কোন কোন মতাদর্শ ও চর্চা সহিংসতার প্রবণতা ধারণ করে তা তালাশের জন্যে আমি একটা সহজ পর্যবেক্ষণজাত পরীক্ষার প্রস্তাব পেশ করেছি। আমার যুক্তি, তথাকথিত সেকুলার মতাদর্শ ও প্রতিষ্ঠানগুলি (যেমন: জাতীয়তাবাদ ও উদারবাদ) ধর্মীয় মতাদর্শের মতোই একচ্ছত্রবাদী, বিভেদ সৃষ্টিকারী ও অযৌক্তিক হতে পারে। মানুষ নানা কারণে খুন-খারাবি করে। এই মসিবতকে বুঝতে হলে পর্যবেক্ষণজাত কৌশল অবলম্বন ছাড়া উপায় নাই: কোন কোন শর্ত বা অবস্থানের কারণে নির্দিষ্ট বিশ্বাস ও চর্চা (জেহাদ, বাজারের ‘অদৃশ্য হাত’, যিশুর আত্মোৎসর্গীকৃত কাফফারা, সারা জাহানের মুক্তিদাতা হিশেবে আমেরিকার ভূমিকা) সহিংস হয়ে ওঠে? নিরেট পর্যবেক্ষণজাত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে আরো অনেক দরকারি কাজ করা সম্ভব। এই লেখকরা তখনই ভুল পথে গেছেন যখন তারা ধর্ম সম্পর্কে এইভাবে যুক্তি নির্মাণ করেছেন। সেকুলার সহিংসতাকে ধর্মীয় সহিংসতার মতোই সমান গুরুত্ব দিতে হবে ব্যাপারটা শুধু এমন নয়। মূল বাহাস হচ্ছে, খোদ সেকুলার ও ধর্মীয় সহিংসতার বিভাজনটাই অকার্যকর, বিভ্রান্তিকর এবং সত্যকে আড়ালের পাঁয়তারা মাত্র।

পয়লা অধ্যায়ে আমি যাদের লেখা নিয়ে আলোচনা করেছি — জন হিক, মার্টিন মার্টি, মার্ক জার্গেনস্মায়ার, ডেভিড র‌্যাপোপর্ট ও স্কট অ্যাপলবিসহ প্রত্যেকেরই সহিংসতার গোড়া সম্বন্ধে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আছে। তাদের যুক্তি-তর্ক ব্যর্থ হওয়ার মূল কারণ ধর্মীয় ক্যাটেগরি এস্তেমাল করার সাথে জড়িত। দ্বিতীয় অধ্যায়ে, বিভিন্ন ক্ষমতা বিন্যাস মাফিক কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ধর্মের ধারণা আকার লাভ করেছে তার কুলজি ঘাঁটার কোশেশ করেছি।

ধর্ম সহিংস—এই দাবি নির্ভর করে ধর্মের একাট্টা ধারণার ওপর যা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে একই মর্মশাঁস ধরে রাখে এবং তাত্ত্বিকভাবে অন্তত একে সেকুলার বাস্তবতা (যেমন: রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান) থেকে আলাদা করা সম্ভব। দ্বিতীয় অধ্যায়ে দুইটা সিদ্ধান্তের সাবুদ পেশ করা হয়েছে। পয়লা সিদ্ধান্ত হলো: ইতিহাস ও সংস্কৃতির বাইরে ‘ধর্ম’ বলে কিছু নাই যা রাজনীতি থেকে আলাদা। ধর্মের ইতিহাস আছে এবং কোনো নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতে কাকে ধর্ম বলা হবে আর কাকে বলা হবে না তা ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের নানা বিন্যাসের ওপর নির্ভরশীল। দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত হল: ধর্মের ট্রান্সহিস্টরিকাল ও ট্রান্সকালচারাল ধারণা আছে যা ধর্মনিরপেক্ষ ফেনোমেনা থেকে আলাদা—এরকম জবানি নিজেই ক্ষমতার প্রচলিত বিন্যাসের অংশবিশেষ (আর তা আধুনিক উদারবাদী জাতি-রাষ্ট্রের অংশ হিশেবে পশ্চিমে বিকশিত হয়েছে)। এই প্রেক্ষিতে ধর্মকে ট্রান্সহিস্টরিকাল, ট্রান্সকালচারালরূপে নির্মাণ করা হয় যার আওতা বড়জোর ব্যক্তিগত; অন্যদিকে, এটা সেকুলার যুক্তিবাদ থেকে সহজাতভাবেই আলাদা যার আওতা আবার জনপরিসর (public sphere)। খ্রিষ্টবাদকে ধর্ম আকারে নির্মাণ তাই আমাদেরকে খোদার প্রতি আনুগত্যকে জাতি-রাষ্ট্রের প্রতি জাহেরি আনুগত্য থেকে আলাদা করে ফেলতে সাহায্য করে। ধর্মের সহিংসতার প্রবণতা আছে বলে ধর্মকে জনক্ষমতার পরিসর থেকে খেদাতে হবে—এই আবদার আদতে ধর্মের এক ধরনের মূলনীতিবাদী নির্মাণ।

২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তনের বাগরাম এয়ার বেজের ন্যাটোর সৈন্যদল তালেবান কয়েদির কোরান শরিফ পুড়িয়ে ফেলে। তার প্রেক্ষিতে নানা ধরনের সহিংস প্রতিবাদ লক্ষ করা যায়।

২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আফগানিস্তনের বাগরাম এয়ার বেজের ন্যাটোর সৈন্যদল তালেবান কয়েদির কোরান শরিফ পুড়িয়ে ফেলে। তার প্রেক্ষিতে নানা ধরনের সহিংস প্রতিবাদ লক্ষ করা যায়।

দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৫টা ভাগ আছে। পয়লা দুইভাগে আমি দেখাব, ধর্ম কোনো ট্রান্সহিস্টরিকাল ধারণা নয়। পয়লাভাগে আছে প্রাচীন ও মধ্যযুগের ধর্মসংক্রান্ত ইতিহাস; দ্বিতীয়ভাগে আধুনিক পশ্চিমে নিকোলাস অফ কুস, মারসিলিনো ফিচিনো, হারবার্ট চেরবেরি ও জন লকের মতো ব্যক্তিরা কীভাবে ধর্মের ধারণা পয়দা করেছেন তার ইতিহাস আছে। তৃতীয়ভাগে আমি ডেভিড চিডেস্টার, এস.এন.বালাগঙ্গাধারা, টিমোথি ফিটজেরাল্ড, টমোকো মাসুজাওয়া ও অন্যান্যদের লেখা উদ্ধৃত করেছি এবং দেখিয়েছি ধর্ম ট্রান্সকালচারাল কোনো ধারণা নয়। বরং এটা হয় পশ্চিমাদের কাছ থেকে হাওলাত করা নয়ত উপনিবেশায়ন প্রক্রিয়ার সময় উপনিবেশিক সমাজের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। চতুর্থভাগে আমি দেখিয়েছি, আধুনিক পশ্চিমেও ধর্মীয়-সেকুলার বিভাজন বিতর্কিত বিষয়ই থেকে গেছে। পঞ্চমভাগে যুক্তিসহ পরিসমাপ্তি টেনে বলেছি, কোনটা ধর্মীয় আর কোনটা সেকুলার সেটা নির্ভর করে কোন ধরনের চর্চাকে মঞ্জুর করা হচ্ছে তার ওপর। খ্রিষ্টবাদকে ধর্ম হিশেবে নির্মাণ করা হয় কিন্তু জাতীয়তাবাদকে করা হয় না—এই বাস্তবতা খ্রিষ্টানদের প্রাণঘাতী আনুগত্যকে জাতি-রাষ্ট্রের প্রতি নিবেদিত হতে সাহায্য করে। ধর্মের মধ্যে সহিংসতার আজব প্রবণতা আছে এই কিস্‌সাকে পশ্চিমা জাতি-রাষ্ট্রের মতাদর্শিক বৈধ্যতার অংশ হিশেবেই অনুসন্ধান করা উচিত। পশ্চিমে ধর্মীয়-সেকুলার বিভাজন নির্দিষ্ট কিছু চর্চাকে মজ্জাগতভাবে অযৌক্তিক ও সহিংস দেখিয়ে কোণঠাসা করে এবং ব্যক্তিগত মামলা হিশেবে চালায়, যাতে করে রাষ্ট্র ও বাজারের অধিক ‘যৌক্তিক’ ও শান্তিকামী প্রয়াস প্রভাব বিস্তার করতে পারে। পরবর্তী দুই অধ্যায়ে আমি দেখাব যে, রাষ্ট্র ও বাজারের যে প্রয়াস তারও নিজস্ব সহিংসতা আছে, কিন্তু ধর্মীয় সহিংসতার মিথের বরাতে একে আড়াল ও গায়েব করা হয়।

তিন নম্বর অধ্যায়ে আমি ধর্মীয় সহিংসতার সবচেয়ে পরিচিত ও বহুল উদ্ধৃত ঐতিহাসিক নজিরগুলিকে (অর্থাৎ ইয়োরোপে ১৬ ও ১৭ শতকের ‘ধর্মযুদ্ধ’) খতিয়ে দেখব। এই যুদ্ধগুলির কিস্‌সা আধুনিক রাষ্ট্রের হয়ে মিথ তৈরির মতলব হাসিল করে। এই মিথ মোতাবেক, প্রোটেস্ট্যান্ট ও ক্যাথলিকরা দুই সিলসিলার মতভেদের কারণে পরস্পরকে খুন করা শুরু করে এবং ধর্মীয় মতপার্থক্যের সহজাত সহিংস ও একরোখা খাসলত জাহির করে। এই প্রেক্ষিতে শান্তি কায়েমের জন্য আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা পয়দা হয়। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা ধর্মকে জনপরিসর থেকে খেদিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে নির্বাসিত করে এবং বিভিন্ন ধর্মের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য আদায় করে।

এ অধ্যায়ে ঐতিহাসিক তথ্য-সাবুদ ঘেঁটে এই আদর্শ কিস্‌সাকে সওয়ালের মুখে দাঁড় করিয়েছি। আদর্শ এই কিস্‌সা মাফিক আমরা যে সোজাসাপটা গাল-গপ্পো শুনি, ঐতিহাসিক বাস্তবতা আদতে এত সাদাসিধা ছিল না। খ্রিষ্টানরা নিশ্চয়ই পরস্পরকে খুন করেছে, সহিংসতাকে রুখতে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু চার্চ থেকে রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতার হাতবদল স্রেফ সহিংসতার দাওয়াই ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, খ্রিষ্টদুনিয়া ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টে ভাগ হওয়ার আগেই চার্চ থেকে রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল এবং অনেক দিক থেকে তথাকথিত ধর্মযুদ্ধের সহিংসতার কারণও ছিল ক্ষমতার এই পালাবদল। প্রাপ্তি আর হারানো মিলিয়ে মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগে পরিবর্তন (চার্চের ক্ষমতা থেকে রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতা) খুবই দীর্ঘ ও জটিল একটা প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে গেছে। আর যাই হোক সহিংসতা থেকে শান্তির পথে রওনার মতো সাদাসিধা কোনো প্রক্রিয়া ছিল না এটা। আন্তর্জাতিক চার্চের প্রতি আনুগত্যের বদলে জাতি-রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য কায়েমের কারণে ইয়োরোপে সহিংসতা খতম হয়ে যায় নাই বরং পবিত্রতা এখন চার্চের বদলে রাষ্ট্রের কবজায় গেছে। স্বদেশের জন্য শহীদ হওয়া কিংবা অন্যকে খুন করাকে আদর্শ হিশেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

তৃতীয় অধ্যায়ের পয়লা অংশে হবস, লক ও রুশোর মতো আদি আধুনিক চিন্তাবিদ এবং জুডিথ শাকলার, জন রলস ও ফ্রান্সিস ফুকোয়ামার মতো হাল আমলের তাত্ত্বিকরা কীভাবে ধর্মযুদ্ধের কিস‌্সা বয়ান করেছেন তা তুলে ধরা হয়েছে। নানান ফারাক সত্ত্বেও এদের প্রত্যেকেই এই যুদ্ধগুলির কারণ হিশেবে ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যকার বিবাদের চিত্র তুলে ধরেছেন এবং এই যুদ্ধের দাওয়াই হিশেবে আধুনিক সেকুলার রাষ্ট্র নাযেলের কথা বলেছেন। তৃতীয় অধ্যায়ের পরবর্তী অংশে আমি ধর্মযুদ্ধের এই মিথকে চারটা অংশে ভাগ করেছি এবং দেখিয়েছি এর প্রত্যেকটাই ঐতিহাসিকভাবে গলদে ভরা ও বিভ্রান্তিকর।

আমি দেখাব, ধর্মযুদ্ধগুলিতে ক্যাথলিকরা ক্যাথলিকদেরকে খুন করেছে, লুথারানরা লুথারানদের খুন করেছে এবং ক্যাথলিক-প্রোটেস্ট্যান্টদের মধ্যে সহযোগিতার নজিরও আছে। এখানে শুধু একটা নজির পেশ করছি—কার্ডিনাল রিশেলু ও ক্যাথলিক ফ্রান্স, লুথারান সুইডেনের তরফে ত্রিশ বছরব্যাপী যুদ্ধের (The Thirty Year’s War) মধ্যে হস্তক্ষেপ করেন এবং এই যুদ্ধের শেষভাগ মূলত ইয়োরোপের দুই বৃহৎ ক্যাথলিক সাম্রাজ্যের (হাবসবুর্গস ও বারবানস) ভিতরকার যুদ্ধ ছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা নারাজ হলেও ইতিহাসবিদরা কবুল করেছেন যে, এই যুদ্ধগুলিতে ধর্মের পাশাপাশি অন্যান্য কারণগুলিও (রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক) হাজির ছিল। তাহলে সওয়াল ওঠে: বিভিন্ন কারণগুলির মধ্যে কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ? যদি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলি যথেষ্ট পরিমাণে গুরুত্বপূর্ণ হয় তাহলে কি আমরা এই যুদ্ধগুলিকে আর ধর্মযুদ্ধ বলব না? আমি দেখাব, ইতিহাসবিদরা এ বিষয়ে দুইভাগে বিভক্ত। এই দুই ধারার আলেমদের জবান মাফিক সিদ্ধান্ত নিতে হলে ধর্ম থেকে রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক কারণগুলিকে আলাদা করার জরুরত পড়ে। আমার মতে, এই বিভাজন প্রচেষ্টার মধ্যে মূলনীতিবাদী ঝোঁক ও গুলিয়ে ফেলার প্রবণতা আছে। ১৬ শতকে ধর্ম ও সমাজের আধুনিক বুৎপত্তি একেবারেই নাবালেগ অবস্থায় ছিল; যেখানে ইউক্যারিস্ট ছিল সমাজ ব্যবস্থার প্রাথমিক প্রতীক, সে সময়ে ধর্মীয় এবং সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক কারণগুলির মধ্যে ভেদরেখা ছিল না। অর্থাৎ শুধুমাত্র ধর্মই যে এই যুদ্ধগুলি ঘটিয়েছে নির্দিষ্ট করে সেরকম বলা এবং জনক্ষমতার চর্চা থেকে একে ছেঁটে ফেলাও সম্ভব নয়। আদর্শ বয়ান আমাদের বলে — আধুনিক রাষ্ট্র ধর্মকে ফিতনা-ফ্যাসাদের গোড়া হিশেবে শনাক্ত করেছে এবং রাজনীতি থেকে একে আলাদা করেছে। কিন্তু ধর্ম ও রাজনীতি দুইটা আলাদা সত্তা ছিল না। বাস্তবে, জন বসির ভাষায় বলতে গেলে শুধুমাত্র ‘পবিত্রতার স্থানান্তর’ ঘটেছে অর্থাৎ চার্চের তখ্‌তে রাষ্ট্র বসেছে। আপাতদৃষ্টিতে, পবিত্রতা শান্তির কারণে রাজনীতি থেকে আলাদা ছিল। কিন্তু বাস্তবে, উদ্ভূত রাষ্ট্র পবিত্রতাকে তছরূপ করে নিজেই নয়া কিসিমের ধর্ম হয়ে ওঠে।

পাশাপাশি, চার্চ থেকে রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরই ছিল ১৬-১৭ শতকের যুদ্ধের দাওয়াই—এই ধারণার অসারত্বও আমি দেখাব। রাষ্ট্র নির্মাণের প্রক্রিয়া (যা রিফর্মেশনের বেশ আগে থেকেই শুরু হয়েছিল) সহজাতভাবে সাংঘর্ষিক ছিল। মধ্যযুগের শেষভাগ থেকে এই প্রক্রিয়া সাবেকি আমলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন ক্ষমতার অভ্যন্তরীণ ঐক্য-সংহতি আনার এবং অন্যান্য বিদেশী রাষ্ট্রের বহির্গত সীমারেখা নির্ধারণের সাথে যুক্ত ছিল। হেঞ্জ শিলিং, জে. এইচ. এম. স্যামন, রনি পো-চা শা, ম্যাক হল্ট ও ডোনা বোহানান সহ অন্যান্য ইতিহাসবিদদের লেখা এস্তেমাল করে আমি দেখিয়েছি, ১৫ থেকে শুরু করে ১৭ শতকের সহিংসতাকে রাজা-বাদশাদের কেন্দ্রীয়করণ প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে স্থানীয় এলিটদের প্রতিরোধ আকারে তাফসির করা সম্ভব।

এই যুদ্ধগুলি আসলে রাজনৈতিক ছিল, ধর্মসংক্রান্ত ছিল না—একথা বলা আমার মতলব নয়। আমি বলছি না রাষ্ট্রই যুদ্ধগুলির কারণ আর চার্চ ছিল নিষ্পাপ। আমার দাবি হচ্ছে, চার্চ থেকে রাষ্ট্রের হাতে ক্ষমতার হাতবদল ১৬-১৭ শতকের সহিংসতার কোনো দাওয়াই বাতলে দেয় নাই, বরং যুদ্ধগুলির একটা কারণ ছিল এই হাতবদল। সহিংসতার সাথে চার্চ খুব ভালোভাবেই জড়িত ছিল কারণ এটি ক্রমাগতভাবে রাষ্ট্র গঠনের প্রকল্পের সাথে অঙ্গীভূত হয়ে যায়। এই অধ্যায়ে আমার সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আধুনিক রাষ্ট্রের উত্থানের কারণে ইয়োরোপ ধর্মের সহিংসতা থেকে নিস্তার পেয়েছে এই ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো দেদার ঐতিহাসিক তথ্য-সাবুদ হাজির আছে। আধুনিক রাষ্ট্রের উত্থান শান্তিপূর্ণ ইয়োরোপের বিসমিল্লাহ করে নাই, বরং এর ফলে মানুষ আগে যে কারণে মরতে ও মারতে রাজি ছিল সেই কারণের বদল ঘটেছে। ‘নিজের দেশের জন্য শহীদ হওয়া কত মধুর’—এ জাতীয় জবান এখন মান নির্ধারকের মর্যাদা পায়। আমার দাবি, ধর্মযুদ্ধের মিথ শুধু বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস নয়, বরং এটি নিজেই পশ্চিমা ক্ষমতা বিন্যাস বদলের সহযোগী, বিশেষত নয়া উত্থিত রাষ্ট্রের কাছে প্রাণঘাতী আনুগত্য হস্তান্তরের ক্ষেত্রে।

চতুর্থ অধ্যায়ে আমি সওয়াল করেছি—ধর্ম সহিংসতার কারণ এই ধারণা হালফিল পশ্চিমে এর ভোক্তাদের কী মতলব হাসিল করে? আমি দেখিয়েছি, এই মিথ কীভাবে আমেরিকায় নির্দিষ্ট কিছু ক্ষমতা মঞ্জুর করার কাজে লাগে (দেশীয় রাজনীতি ও বৈদেশিক নীতি উভয় ক্ষেত্রেই)। দেশীয় রাজনীতিতে এটা নির্দিষ্ট কিছু চর্চাকে কোণঠাসা করে (যেমন: পাবলিক স্কুলের প্রার্থনা বা চার্চ প্যারিশ সাহায্য)। একই সাথে, এটা দেশপ্রেম আসক্তি মজবুতে সহায়তা করে যার অছিলায় জাতি আমাদের অন্যান্য বিভক্ত আত্মপরিচয়ের হাত থেকে নিস্তার পায়। বৈদেশিক নীতিতে এই মিথ অ-পশ্চিমা দেশগুলির বিশেষত মুসলিম সমাজের প্রতি পশ্চিমা আচার-ভঙ্গি ও নীতিকে মজবুত করায় ও জায়েজে সহায়তা করে (বেশিরভাগ মুসলিম সমাজের সাথে পশ্চিমা সমাজের প্রধান ফারাক হলো তারা ধর্মকে জনপরিসর থেকে সরাতে নারাজ)। এখানে বলে রাখা দরকার, ধর্ম ও সহিংসতার বয়ান কিন্তু সবসময় ধর্ম-বিরোধী হবে এমন নয়, বরং এই সিলসিলা জনপরিসরে ধর্মের প্রবেশাধিকারের বিরোধী। অধিকাংশ আমেরিকান নিজেদেরকে ধার্মিক মনে করে, আবার তারাই সেকুলারায়নের রাজনীতিকে যেকোনো যুক্তিশীল ও সভ্য সমাজের আসল বুনিয়াদ মানে। মুসলমানদের সাধারণত উন্মত্ত ও ভয়ঙ্কররূপে হাজির করা হয় কারণ তারা আমাদের মতো ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা করতে শিখে নাই।

চতুর্থ অধ্যায়ের পয়লা অংশে আমি দেখিয়েছি, চল্লিশের দশক থেকে আমেরিকার সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তগুলিতে কীভাবে এই মিথ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আগে ধর্মকে একতার শক্তিরূপে দেখা হতো, জাতিকে একই বন্ধনে বেঁধে রাখার কাজে লাগতো। চল্লিশের দশকের শুরু থেকে পয়লা সংশোধনীর (First Amendment) ধর্মীয় ধারা সম্পর্কিত একের পর এক মামলায় ধর্মীয় সহিংসতার পরিধির কথা উল্লেখ করা হয় এবং আদালত স্কুলের প্রার্থনা, প্যারিশ স্কুলগুলির রাষ্ট্রীয় সাহায্য, সরকার কর্তৃক পাবলিক ধর্মীয় প্রদর্শনী ও অন্যান্য রেওয়াজকে নিষিদ্ধ করে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, আমেরিকার ইতিহাসে ধর্মীয় সহিংসতার মিথ তখনই কাজে লেগেছে যখন সম্প্রদায়গত সহিংসতার আশঙ্কা সবচেয়ে কম ছিল। আমি আরো দেখাব, আদালত কীভাবে ধর্মীয় বিভাজনের দাওয়াই হিশেবে দেশপ্রেমের উদ্রেক ঘটায়। খোদার প্রতি দেশপ্রেমিক প্রকাশ্য আহ্বানকে ধর্মীয় ক্যাটেগরি থেকে খারিজ করা হয়, ফলে ধর্মের ওপর যে বিধিনিষেধ আছে সেটা এখানে কাজ করে না। আবারো, কোনটা ধর্ম হিশেবে গণ্য হবে আর কোনটা হবে না সেটা খোদার ওপর ঈমানের হাজিরা কিংবা গরহাজিরার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং তা জাতি-রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যকে গেঁথে দেয়ার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে।

চতুর্থ অধ্যায়ের পরবর্তী দুই অংশে বিশ্লেষণ করে দেখাব, কীভাবে এই মিথ অ-পশ্চিমা অপর নির্মাণে সাহায্য করে এবং তাদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতাকে হালাল করে। মার্ক জার্গেনস্মায়ার, বার্নার্ড লুইস, এন্ড্রু সলিভান ও ক্রিস্টোফার হিচেন্সের মতো আলেমদের লেখা বিশ্লেষণ করে দেখাব যে, এই ধারণাটা ‘পশ্চিমা ও বাদবাকি দুনিয়া’ নামক যে বাইনারি নির্মিত হয় তার অন্যতম উপাদানরূপে কাজ করে। ধর্মের যদি সহিংসতার প্রবণতা থেকে থাকে তাহলে যেসব সমাজ ধর্মীয় জোশকে জনপরিসরে বশে রাখতে পেরেছে তাদেরকে উচ্চতর বা শ্রেষ্ঠতর এবং অন্যান্য সমাজের থেকে সহজাতভাবে শান্তিপূর্ণ মনে করা হয়। বিশেষত, মুসলিম সমাজগুলিকে মুশকিল আকারে দেখা হয় কারণ তারা ধর্মীয় ও সেকুলারের মধ্যে ভেদরেখা টানতে পারে না। ইসলামকে আজব ও অস্বাভাবিক ধর্ম মনে করা হয় কারণ ইসলাম ছহি ধর্মকে রাজনীতির সাথে মেশায়। পশ্চিম এবং ইসলামিক সরকার ও সংস্কৃতির বিবাদকে সে কারণে ইসলামের সহজাত অসুস্থ খাসলতের বরাতে ব্যাখ্যা করা হয়। যেমন: ১৯৫৩ সালে যে ক্যু এর অছিলায় শাহকে মসনদে বসানো হয় এবং নির্মম সেকুলার জমানার বিসমিল্লাহ হয় তাতে আমেরিকার পূর্ণ সমর্থন ছিল। কিন্তু ১৯৭৯ এর পর থেকে কেন ইরান আমেরিকার বড় দুশমনে পরিণত হলো সেটা বোঝার ক্ষেত্রে এই ঘটনাকে এড়িয়ে বলা হয়—এর পেছনে আরো ‘গভীরতর’ কারণ আছে। বিশেষত, ধর্মের সহজাত পরিবর্তনশীল খাসলতের কথা ও ইরানের রাজনীতিতে এর বিষাক্ত আছরের ফিরিস্তি শোনা যায়। আমি দেখাব ছহি ঐতিহাসিক ঘটনাগুলিকে এড়াতে কীভাবে এই মিথ ব্যবহৃত হয় এবং ‘কেন তারা আমাদের ঘৃণা করে?’ এই সওয়ালের জবাব তারা ধর্মীয় বুনিয়াদে গড়া সমাজ ব্যবস্থার রুগ্ন যুক্তিহীনতার মধ্যে তালাশ করে আর সেক্ষেত্রেও কাজে লাগে এই মিথ।

cavanaugh2

উইলিয়াম কাভান

পরবর্তী অংশে, ইসলামি দুনিয়ায় পশ্চিমা সামরিক আক্রমণকে হালাল করতে কীভাবে এ ধরনের যুক্তি এস্তেমাল করা হয় তার নজির আছে। যুক্তিটা একদম খাসা: সহজাতভাবে সহিংস ও অযৌক্তিক সমাজ ব্যবস্থাকে যুক্তি দিয়ে কোনো কিছু বোঝানো সম্ভব নয় বলেই সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রস্তুতি নিতে হয়। স্বাভাবিক ও জবরদস্তির বরাতে হয়ত আমরা ইসলামিক দুনিয়ায় উদারবাদী সমাজ ব্যবস্থার বরকত ছড়িয়ে দিতে পারব। এভাবে সহিংসতাকে জায়েজকরণে ধর্মীয় সহিংসতার মিথ কাজে লাগে। ধর্মীয় সহিংসতা ও সেকুলার সহিংসতার মধ্যে বিস্তর ফারাক টানা হয়। ধর্মীয় সহিংসতা সবসময়ই বিষাক্ত ও নিন্দনীয়; অপরদিকে, সেকুলার সহিংসতাকে সহিংসতা হিশেবেই আমলে নেয়া হয় না কারণ তা সহজাতভাবেই শান্তিকামী। সেকুলার সহিংসতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দরকারি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারিফযোগ্য, বিশেষত যখন তা ধর্মীয় সহিংসতাকে দমানোর কাজে লাগে।

উদারবাদের বরকতকে নাকচ করা বা অন্যান্য সমাজ ব্যবস্থার অপকর্মকে মঞ্জুর করার কোনো খায়েশ আমার নাই। আমি মনে করি, চার্চ ও রাষ্ট্রের পৃথকীকরণ সাধারণ অর্থে ভালো জিনিশ। একদিকে, মুসলিম বিশ্বাসের নির্দিষ্ট ধারা ও চর্চা সহিংসতাকে আশকারা দেয়। এই ধারাগুলিকে পর্যালোচনা করা উচিত। কিন্তু সেই সমালোচনা যদি আমরা ভিত্তিহীন ধর্মীয়-সেকুলার বৈপরিত্যের লেন্স দিয়ে করি তাহলে সেটা কোনো কাজে আসবে না কারণ সেক্ষেত্রে সেকুলার ধারার সাম্রাজ্যবাদ ও সহিংসতা আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। আগেও আমরা দেখেছি, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ অ-পশ্চিমা অপরের অধঃস্তনতার দাবি জানিয়েছে, তাদেরকে আমাদের মতো করে তোলার খায়েশে মাতব্বরি করেছে এবং নিজেদের আমলনামাকে হালাল করেছে। এই কিসিমের পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ থেকে ধর্মীয় সহিংসতার মিথের খুব একটা ফারাক নাই। কারণ এটিও ভিলেন তৈরি করে এবং নিজের উদারবাদী সমাজ ব্যবস্থাকে শ্রেষ্ঠ বলে ধরে নেয়।

এই বইয়ে আমি বিকল্প কোনো ধর্মীয় রাজনীতির প্রস্তাব পেশ করিনি। তাই এই বইয়ের উদ্দেশ্য ঋণাত্মক: ধর্মীয় সহিংসতার মিথকে ধসানো। এই মিথকে ধসানোর বেশ কিছু ফজিলত আছে। পয়লা, এটা সহিংসতার পর্যবেক্ষণজাত গবেষণাকে ধর্মীয় ও সেকুলার ক্যাটেগরির বিকৃতি থেকে রেহাই দিবে। আমরা দেখতে পারব, সমাজ ব্যবস্থা পত্তনের সম্ভাবনা শুধুমাত্র ধর্মতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার মতো মোটা দাগের বাইনারিতে আটকা নয়। এটা আমাদেরকে নন সেকুলার অপরকে ধর্মীয় উন্মাদ হিশেবে দেখার গৎবাঁধা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে এবং এই অপরের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধগুলি জারি আছে তার বৈধতাকে সওয়াল করতে শিখাবে। পাশাপাশি ‘কেন তারা আমাদের ঘৃণা করে?’ এই সওয়ালের কার্যকরী আলোচনায়ও অবদান রাখবে, কারণ তখন আমরা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নাক গলানোকে ধর্মীয় উন্মত্ততা দমনের নিশান আকারে দেখব না।

আমাদের এবং তাদের মধ্যকার ফারাক ঘুচাতে হলে শুধু অপরকে জানলেই চলবে না, নিজেদেরকেও জানতে ও বুঝতে হবে। সেই প্রয়াসে অবদান রাখাই এই বইয়ের আসল মতলব।

ফুটনোট
১. [‘রাজনৈতিক আমল ও মতলবকে যে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিভাজন দ্বারা সবচেয়ে বেশি শনাক্ত করা সম্ভব সেটা হল শত্রু ও মিত্র।’ কার্ল স্মিট, দ্য কনসেপ্ট অফ দি পলিটিক্যাল (নিউ ব্রুমসউইক, রাটগার্স ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৭৬), পৃ. ২৬।]

২. [কিথ ওয়ার্ডের ইজ রিলিজিয়ন ডেঞ্জারাস? (গ্রান্ড র‌্যাপিডস, ২০০৭) এরকম একটা বই। এর ভূমিকা অংশে তিনি ধর্মের সংজ্ঞার সওয়াল নিয়ে ডিল করেছেন এবং এর ভয়াবহতা দেখিয়েছেন। ওয়ার্ড শর্টার অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি থেকে ধর্মের একটা পরিচিত সংজ্ঞা তুলে ধরে দেখিয়েছেন এই সংজ্ঞা মাফিক সুপারম্যান ও লেবার পার্টির গঠনতন্ত্রও ধর্মের আওতাভুক্ত। তিনি বলেছেন, ‘আমরা যদি নাই জানি ‘ধর্ম’ কী বস্তু, তাহলে সেটা ভয়ঙ্কর কিনা সেই সিদ্ধান্তও নেয়া সম্ভব নয়।’ (পৃ. ৯)। এরপর তিনি প্রসঙ্গ বদল করেছেন এবং এই সওয়ালকে আর অনুসন্ধান করেন নি। পরে পয়লা অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন, ‘অবশেষে ধর্ম কী সে বিষয়ে আলোচনা করে এবং পাশ কাটিয়ে, ধর্ম ভয়ঙ্কর কিনা এই সওয়ালের জবাব আমি ভালোভাবে দিতে পারব।’ (পৃ. ২৭) ফলে যদিও আমরা ধর্মের সংজ্ঞায়ন নিয়ে মসিবতে পড়ি কিন্তু ধরেই নেয়া হয় ধর্ম বলে কিছু না কিছু আছে। বইটার বাদবাকি অংশ ধর্ম সহিংস — এই অভিযোগের বিরুদ্ধে ধর্মের আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক জবানি।]

৩. [লিন্ডা এম. জি. জেরিলি, ‘ডুয়িং উইথআউট নোয়িং: ফেমিনিজম’স পলিটিকস অফ দি অর্ডিনারি’, পলিটিকাল থিয়োরি (২০:৪) (অগাস্ট ১৯৯৮) পৃ. ৪৪৩। উদ্ধৃত এলিজাবেথ শাকমান হার্ডের দ্য পলিটিকস অফ সেকুলারিজম ইন ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস (প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস, ২০০৮) পৃ. ১০৯।]

৪. [এই ৯ জনের মধ্যে শুধু চালর্স সেলেনগাট সহিংসতার সংজ্ঞা দিয়েছেন। এই সংজ্ঞা আবার জন হলের কাছ থেকে নেয়া, ‘জখম করা বা হুমকি দেয়া’ আর এই ধরনের কাজ ‘শারীরিক, লিখিত কিংবা মৌখিক’ হতে পারে, চালর্স সেলেনগাট, সেকরেড ফিউরি: আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভায়োলেন্স (ওয়ালনাট ক্রিক: আলটামিরা, ২০০৩) পৃ. ৯। সেলেনগাট এভাবে সহিংসতার সংজ্ঞাকে শারীরিক জখমের থেকে বিস্তৃত করেছেন।]

৫. [স্যামুয়েল হান্টিংটন, ‘ইফ নট সিভিলাইজেশন, হোয়াট?’ ফরেন এফেয়ার্স, ৭২ (নভেম্বর-ডিসেম্বর, ১৯৯৩): ১৯২।]

অনুবাদকের টীকা
*ট্রান্সহিস্টরিকাল ও ট্রান্সকালচারাল বলতে কাভান’ সেই ধারণাকে বোঝাচ্ছেন যেখানে ধর্ম মানব ইতিহাসের সকল সময় ও সকল স্থানে পাওয়া যায়। কিন্তু তার দাবি — ধর্ম আধুনিক পশ্চিমা ধারণা ও নির্মাণ। তালাল আসাদও একে আধুনিক ধারণা বলেছেন কারণ ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে ধর্মের হরিহর আত্মার সম্পর্ক (siamese twin) (আসাদের প্রবন্ধ, রিডিং এ মডার্ন ক্লাসিক: ডব্লিউ. সি. স্মিথ’স দ্য মিনিং এবং এন্ড অফ রিলিজিয়ন, পৃ. ২২১)।]

লেখক পরিচিতি
উইলিয়াম টি কাভান’ (Willam Cavanaugh) ডিপল ইউনিভার্সিটির ক্যাথলিক স্টাডিজের অধ্যাপক। তিনি পড়ালেখা করেছেন ইউনিভার্সিটি অফ নটরডেম, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি ও ডিউক ইউনিভার্সিটিতে। তার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে আছে — বিয়িং কনসিউমড: ইকনমিকস এ্যান্ড ক্রিশ্চিয়ান ডিজায়ার (২০০৮), মিথ অফ রিলিজিয়াস ভায়োলেন্স (২০০৯); মাইগ্রেশন অফ হলি (২০১১)।

লিংক