নঞ

একটা আনইউজুয়াল শুরু হবে গল্পটার, আশা করা গেছিল। হইল না। যে কোনো গল্পের মত এই গল্পেও হয়তবা থাকবে চরিত্র। এবং ঘটনা। এবং বিবেচনা। এবং সংশয়।

থাকবে কিছু স্পেইস।

দূরবর্তী।

কোরিয়ান প্লেনে কইরা আসবেন প্রোট্যাগনিস্ট। নাম লি। ন্যারেট করবে কে এই গল্পটারে?

লি হবেন হিজড়া। থার্ড জেন্ডার। তৃতীয় লিঙ্গ। আমেরিকান। ছোটবেলায় ব্যাপক টরচার-টরমেন্টের উপর দিয়ে যাওয়া আমাদের লি হবেন অনাকর্ষণীয়। তার মা মৃত হবে। নাইলে মাইরা ফেলব। তার বাপ ড্রাঙ্ক ব্যবসায়ী।

ঋতু নাই কোনো, গল্পটায়। ধরেন, নাতিশীতোষ্ণ পরিবেশ বিরাজমান। আপাতত। চলছিল আত্মহত্যার সিজন। এইটা সমগ্র বিশ্বে একটা বিশেষ সময়ে ঘইটা থাকে।

শোনা যাবে, মানে গল্পটার এক অংশে, বা অংশটার স্পেইসে, শোনা যাবে, তিন বন্ধুর কথা। বা তাদের গল্প। গল্পের ভেতর গল্প। এই গল্পটা লেইখা মজা পাব আমি। এক বন্ধু হবে রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্য। একজন কবি। একজন প্রোগ্রামার। বা প্রোগ্রামার হইতে চাওয়া ছাত্র। তিনজনেরই বয়স ১৯ বছর। এইটা আমার চাপানো। খারাপ সময়। তারা ঠিক করবে একসাথে আত্মহত্যা করার। ছাত্রনেতা কইবে, “ব্যপার না। বন্দুক আর গুলির ব্যবস্থা আমি করুম।”

তারা একসাথে হাসবে। চা খাবে। সুমন ভাইয়ের দোকানে। খাবে সিগারেট।

“বাংলা ভাষায় আগ্রহ কেন তোমার?”, প্রশ্নটা করে আইরিন। ডেনমার্কের। আমেরিকায় লি’র সাথে পড়ালেখা করে। গাড়িঘোড়া চড়ে। সাবজেক্ট নৃতত্ত্ব। তাদের থিসিসের বিষয় হিসেবে তারা নির্বাচন করছে বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার ময়নামতির আশেপাশের বস্তিগুলার হালচাল।

illustration imran 2

“না, এমনেই।”

“তোমার বাবা বোধহয় বাংলাদেশের?”

“কে, গল্পকার কইছে নাকি? তবে, সে টোটাল ড্রাঙ্ক। আমার সাথে সর্বোচ্চ দুই কি তিনবার কথা হয়েছে বাংলায়। তাই আমি বাংলা পারি না।”

“তাহলে, বাংলাদেশই কেন সিলেক্ট করলা?”

“এমনেই, তুমিও তো করলা।”

“ইন্টারেস্টিং কিছু করব আশা করি।” আইরিন বলল।

***

“নিজেরে রিলেট কর সিচুয়েশনটার লগে।”

“কেমনে?”

“হয় তুই নিজে যেইটা সমর্থন করস, সেইটার পক্ষে থাক, নাইলে মারা খা।”

“তাইলে মৌলবাদীগো লগে তোগো গ্যাপ কই?”

“রাজনীতিতে মানুষ মরবই। পাকনামি দেহাইস না।”

ছাত্রনেতা আর সহকর্মীর আলাপ। কোনটা কে, তা বলবো না। লজ্জা লাগে!

***

ছয় বছর আগে, গল্পটা লেখার ছয় বছর আগে জো’স কিচেন-এ লি’র সাথে পরিচয় হয় জ্যাকসন এর। ক্যাজুয়াল কনভারসেশন হয়। তবে, লি’র একটা গ্রাউন্ড ব্রেকিং ডিসকাভারি হয় নিজের সম্বন্ধে। সে নিজেকে হয়তবা বেশিই লাইট ভাবে। সেক্সুয়াল অরিয়েন্টেশন হয়তবা তাকে এতটাও ডিফারেনশিয়েট করে না। ৪৭ মিনিটের আলাপ, জ্যাকসনের সাথে (জর্জ অরওয়েল, অরুন্ধতী রায়, গায়ত্রী চক্রবর্তী, বুশ, অবামা, নিওলিবারিজম, এডওয়ার্ড সাঈদ, দেরিদা নিয়া), যার পর তার ভয়ানক রকম রিফ্রেশিং লাগে। ৪৭ মিনিট। হঠাৎ। আর কখনো আমার গল্পে তাদের দেখা হবে না।

পাঠক, আমি একটু লাজুক। মানুষকে পাই ভয়। তাই কথা বলি কম, লেখি কম। ফেইসবুকে একদিনে তিন-চারটা ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট আসলে ভয়ে আমি পাঁচদিন ক্লাসে যাই না। তিন বন্ধুর একজন, প্রোগ্রামার। প্রতিদিন ক্লাস করে। পড়ালেখা করে। প্রোগ্রামিং প্র্যাকটিস করে। বন্ধুর ল্যাপটপে।

আইরিন আর লি’র নৃতত্ত্বে ভর্তি হওয়াটা দুই ঘরানার হবে। আইরিনের সমাজবিজ্ঞান পড়া বাবা প্রায় জোর কইরা তাকে নৃতত্ত্বে ভর্তি করায়। আইরিনের ইচ্ছা ছিল অর্থনীতি। লি’র বাবা তার জন্মের পর থেকেই তাকে অনধিকার করতে চায়। তার মা’র মৃত্যুর পর থেইকা হয়তবা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক একটা শেলটার হিসাবেই থাকবেন। লি’র বড় হইতে থাকা, ঘটবে ইচ্ছার স্বাধীনতায়।

বাংলাদেশে আসার পর, এখানকার সিজন বোঝার পর, তারা তাদের কাজে নামবে। তিনদিন কুমিল্লা, চারদিন ঢাকা। একদিন এরই মধ্যে খুব আকস্মিক একটা খবর পাবে। ফ্যাসিনেটিং। আত্মহত্যার ঋতুতেও, দেখা যাবে, একটা হত্যা। শোনা যাবে। যাকে খুন করা হইল, বা হবে, সে অনলাইন একটিভিস্ট। আইরিন শার্লক হোমস পড়া লোক/মহিলা। সে বলবে, “চল, গিয়া খবর নেই, কেমনে কী ঘটলো।” তাদের সাহায্য করবে ইমরান। ফেইসবুক ফ্রেন্ড। আমেরিকান ছাত্র। বাংলাদেশী শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের। সেক্যুলার। হাসে, কথা বলে বেশি। বা বলবে। ইমরান কইবে, “যারে মারল, তার বিপরীত মতাদর্শের কেউই হত্যাটা করবেন, নাইলে, এই রকম একটা সময়ে, এইটা… খুবই অস্বাভাবিক। উই নিড টু ফাইন্ড দিস আউট।” আইরিন উপস্থিত এক্সাইটমেন্ট এড়াইতে পারবে না।

তিন বন্ধুর মধ্যে যে কবি, সে তার শেষ ‘বিরহের মায়রে বাপ’ কবিতাটা লিখবে। তার ভাষা আলাদা। আউট অফ দা বক্স। সে একটা মেয়েকে পছন্দ করবে। জানাবে না। সে চাইবে শামীম কবীরের নিয়তি। সে আড্ডায় যাবে নিয়মিত এবং আত্মহত্যাপ্রবণতা ভুইলা দুর্দান্ত সব আবৃত্তি করবে। আর বলবে, “আবৃত্তি ব্যাপারটাই ‘শিল্প-হিসাবে-কবিতারে’ খাইয়া দিতাসে।” তার কবিবন্ধুরা এইটা শোনার পরও মাথা থেইকা আত্মহত্যার ভূত তাড়াইতে পারবে না।

লাইফরে বিভিন্ন প্রসপেক্টে মনোরম মদ খাইতে খাইতে বর্ণনা করতে গিয়া দেখলাম, শব্দের একটা মহা প্যাঁচ বা প্রশ্ন রিপিটেডলি অনুবাদ কইরা যাইতেছি। লি’র সাথে আমার দেখা হইয়া যাওয়াটা ইনএভিটেবল। ইমরাইন্যা ঘটনাটা ঘটাইব জানা ছিল। লি’র সেন্স অফ হিউমার দেইখা আমি মুগ্ধ। যেন, অন্য কোনো প্রাণী, আমাদের সব সিক্রেট জাইনা বইসা আছে। পায়ের উপর পা। হাতে কফিকাপ। সবাই খুনটা সম্পর্কে আমাকে এমনভাবে জিগায় যেন আমি কিছু জাইনাও বলতেছি না।

তিন বন্ধুর গল্পটা
১ম (নেতা): পলিটিকাল খুন এইটা। শিওর। খবর পাইছিলাম ভার্সিটিতে।

২য়(কবি): পিস্তল রেডি?

১ম: হ! অফকোর্স।

৩য় (প্রোগ্রামার): কারে কী কইছস? মানে, বিদায়-টিদায় নিছিলি নাকি?

১ম: কেউ চুদে না। আর সবাইর হোগাত আগুন জ্বলতেছে এখন।

৩য়: তোরা কি ডরাইতেছস?

২য়: ধুর চুতমারানি। প্রশ্নই উঠে না।

১ম: তো… হইয়া যাক।

সুমন ভাইয়ের দোকান বন্ধ। রাস্তায় কেউ নাই।

২য়:  আডিওস!

(গুলি!)

(নিজের মাথায়)

১ম জন ২য় জনের লাশের হাত থেইকা পিস্তল নিয়া। “সি ইউ ইন হেল, মেইট” (গুলি!)

তৃতীয়জন দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে দেখে। চেক করে আশেপাশে কেউ কিছু দেখছে কিনা। মনে মনে, হ্যাঁ পাঠক, মনে মনে সে বলে, “ধুর এই বালের কাম করমু কেন, থাক। হলে যাই। পড়ালেখা করি। দুইদিন পড়ি না কিছু। এই চিন্তায়।” বইলা হাঁটা ধরবে।

এমনিতেও, সামনে তার ইনকোর্স পরীক্ষা।

ছোটবেলায়, আইরিন স্বপ্ন দেখত একটা। (বা দেখবে, এই গল্পে) তার বাবা গাড়ি ড্রাইভ করতেছেন। পাশে সে বসা। ব্লন্ড। তার চুল নাড়তে তার বাবা তার মাথায় হাত রাখবেন। সে মনে মনে আশা করবে, হয়তবা, তার ছোট ভাই, জন্মের দশ দিন পর যে মারা যায়, তার সম্পর্কে তার বাবা কিছু বলবেন। তার আগেই তাদের এক্সিডেন্ট হইয়া যাবে।

ড্রাইভিং সাবধানে করা উচিত।

(কলিং বেলের শব্দ)

গুলশানের মনোরম সকাল।

ইমরান হাজির। পাশের রুম থেকে লিকে ডাইকা তুলবে আইরিন।

ইমরান: খবর পাইলাম। ফুল ডিটেইলড।

লি: আরেকটু পরেও আসতে পারতা। ইটস অনলি নাইন।

(লি মগে কফি ঢালে।)

(কাউকে অফার করে না।)

আ: হ্যাঁ, ক্যারি অন।

ই: যে খুন করে সে অন্য পার্টির। সে খুনের আগের দিন ধইরা নিয়া যায় ভিকটিমকে।

লি: what’s so fascinating about it?

আ: Ah, let him speak.

আইরিন ইমরানের গা ঘেইঁষা বসে।

ই: তাকে হেল্প করে দুই সাথী। ঢাকা থেকে ভিকটিমকে নিয়া যায় চিটাগাং। রাউজান। রুমে বন্দি করে শর্ত দেয়…।

আ: কী শর্ত?

ই: আহা, কইতেছি তো!

লি: হুমমম।

ই: বলে, “ফেইসবুকে তোমার পলিটিকাল ভিউস চেঞ্জ করো। আমাদের মতাদর্শের সুনাম গাইয়া স্ট্যাটাস আপডেট করো।” তারপর তাকে ৭টা পেইজের নাম দিয়া বলে লাইক দিতে। এগুলা সব বিরোধী মতের পেইজ। মানে, ভিকটিমের বিরোধী মত।

লি: দ্যান?

ই: ভিকটিম বলে, “যা-ই করি, মাইরা তো ফেলবাই শেষমেশ। কেন পালন করমু তোমার শর্ত?”

উত্তরে কিলার বলে, “দেখো, আমি আর তুমি দুইজনই জানি, এই একটা অস্তিত্ব—এর নাই অর্থ, না ভর, আছে অনর্থ এবং অনর্থেরও না-থাকা। উই বোথ নোউ দ্যাট। আমি চাই তুমি তোমার ইহজাগতিক মতাদর্শের বাইরের কেউ হইয়া মারা যাও। যখন তোমার লাশ আমি টিভিতে দেখব, আমি শুধু এই প্রশ্ন করব না, এই লাশে এমন কী নাই, যা আমার আছে; বরং তোমার লাশটাকে বা বস্তুটাকে আমি ইন্টায়ারলি ভিন্নভাবে দেখব।”

লি: এরপর কি থ্রেট দেয়?

ই: না, আর কোনো থ্রেট-টরচার করে না। ভিকটিম নিজেই কনভিন্সড হইয়া কাজগুলা করে। খবরটা প্রকাশ করল দুই সাথীর একজন।

আ: পুলিশ কি ধরবে কিলারকে?

ই: দেখা যাক। আত্মহত্যা না কইরা ফেললে, হয়তবা ধরতেও পারে।

২০১৫

About Author

ইমরান আহমেদ
ইমরান আহমেদ

জন্ম. চাঁদপুর ৫ জানুয়ারি ১৯৯৬। তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।