নারগিস (১০)

আগের কিস্তি প্রথম কিস্তি

২৮.
বিকেলে আব্বা আর আম্মা আসল আমাকে নিয়ে যেতে। তখনই অঞ্জনা বাইরে থেকে এসে জানাল, সাজ্জাদদের বাসায় পুলিশ আসছে। বাইরের রুমে জুতা মোজা পরতে পরতে চোখের কোণা দিয়ে এক ঝলক দেখলাম বাবুকে। পুলিশ গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে ওকে। ওদের দরজায় সাজ্জাদ দাঁড়ানো। বুকের ওপর দুই হাত আড়াআড়ি করে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ায়ে বাবুকে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা দেখতেছে। ওর চোখ ওদিকে, কিন্তু ও যেন ঠিক কোনোকিছুই দেখতেছে না। চপিনস কালেকশনের সুরের চেয়েও বিষাদময় কোনো কিছু হইতে পারে, এইটা আমি এই দৃশ্যে আছে আবার নাই সাজ্জাদের দিকে তাকায়ে বুঝতে পারলাম।   

দেড় মাস পরে বাসায় ফিরলাম। বাসায় ফিরে ব্যাগটা রাখতেই হু হু করে কান্না পাইল আমার। এবং আম্মা কিছু না বুঝেই আমাকে যাচ্ছেতাই বলে গালাগাল করা শুরু করল। তার মনে হইল আমি আমার ফুপুর জন্য কাঁদতেছি। আর বেশি কাঁদলে আমার কিডনি নড়ে যাবে। আবার জন্ডিস হবে। বকতে বকতেই পাঁচটা ক্যাসেট দিল আমার হাতে। ভাইয়া পাঠাইছে আমার জন্য। মাইকেল জ্যাকসনের গান। গানগুলোর একটাও ভালো লাগল না। ক্যাসেটপ্লেয়ার বন্ধ করে দিব এমন সময় একটা গান বেজে উঠল।

Ben, the two of us need look no more
We both found what we were looking for
With a friend to call my own
I’ll never be alone
And you my friend will see
You’ve got a friend in me.

এই প্রথম মাইকেল জ্যাকসনের কোনো গান আমার ভালো লাগল। আর মনে পড়ল আমার বিশ্বাসঘাতক বন্ধু বাবুর কথা। ও কী অবস্থায় জেলে আছে কে জানে!  কিন্তু ওর বেঈমানির কথা মনে পড়তেই আমার আর ওর জন্য খারাপ লাগল না। মনে হল, ওর জন্যই সাজ্জাদের সাথে দেখা হওয়া আমার জন্য কঠিন হয়ে গেল।

পরদিন স্কুলে গেলাম। সত্যি সত্যি নারগিস কমার্সে ভর্তি হয়ে গেছে। আমি সায়েন্সে ক্লাস শুরু করলাম। কিন্তু এক সপ্তাহ কেটে যাবার পরেও নারগিসের দেখা পাইলাম না। ও স্কুলে আসে না। এটা জানুয়ারি মাস হলে একটা কথা ছিল। জানুয়ারি মাসে স্কুলে শুধু ডিসপ্লে আর ডিসপ্লে চলে। টিচাররাও তেমন একটা ক্লাস নেয় না। ট্রেনিং টিচাররা পড়ায়। তাই নারগিসও স্কুলে তখন কম আসে। বলে, শীতকালে সকালের মজার ঘুম ছেড়ে কে আসে মরার স্কুলে! কিন্তু এখন ফেব্রুয়ারি মাসেরও শেষ সময়। শীত চলে যাচ্ছে। সকালে ঝল মল করে রোদ ওঠে। কিছুক্ষণ পরেই রোদের তাপে চামড়ায় জ্বালাপোড়া শুরু হয়। এখনও নারগিসের স্কুলে না আসার কোনো কারণ খুঁজে পাইলাম না।

জীবনটা একদম শূন্য মনে হল। নতুন ক্লাসের কোনো মেয়ের সাথে খাতিরও হইল না। ক্লাস এইটের সব সেকশনের ভাল ছাত্রীরা সায়েন্সে ভর্তি হইছে। এবং এরা কেউ নারগিসকে দুই চোখে দেখতে পারে না। তবে নারগিসের ক্লাসে ও স্টার। কেন ও এতদিন স্কুলে আসে না এটা নিয়ে চিন্তায় আছে ওরাও।

একদিন বিকেলে আমি একাই গেলাম নারগিসের বাসায়। গিয়ে খুব অবাক হলাম। বেল বাজালাম অনেকবার, কেউ দরজা খুলল না। পর পর তিনদিন গেলাম ওদের বাসায়। একই অবস্থা। বাসার দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করলাম। দারোয়ান কিছু জানে না। চতুর্থদিন গেলাম নোভার হোস্টেলে। বিকালবেলা সেখানে যথারীতি নানান মেয়ের আড্ডা। আমি গেছি এ খবরটা ওদেরই কেউ নোভাকে বলে আসল। নোভা আসল একটা বল প্রিন্টের জামা পরে। চুল এলোমেলো। ঠোটে লিপস্টিক নাই। একটু ধাক্কা লাগল ওকে দেখে। নোভাও আমাকে কুয়ার পাশে দেখে অবাক।

বলল, আরে রোকসানা যে! ঘটনা কী? এইদিকে এতদিন পরে কী মনে করে?

আমি বললাম, তোমরা আমাকে আর দেখতে আসলা না, তাই আমিই আসলাম। নারগিস কোথায়?

নোভা ভ্রু কুঁচকে বলল, কেন স্কুলে যায় না?

আমি বললাম, না। বাসায়ও গেছিলাম ওদের। বাসায়ও কেউ নাই। বেল বাজাই খোলে না।

নোভাকে একটু দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে হল প্রথমে। একটু পরেই কাঁধ ঝাঁকায়ে বলল, ও! ওর বাপ আসছে না? ওর নানার বাসায় সবাই।

নারগিসের আব্বা! কেমন দেখতে লোকটা জানতে আমার খুব ইচ্ছা হইল। ওর নানার বাসা আর আমাদের বাসা একই এলাকায়। কিন্তু ওই বাসায় একা যাওয়ার সাহস আমার নাই।  আমি নোভাকে চেপে ধরলাম, বললাম, চল না ওর নানার বাসায় যাই! ও স্কুলে কেন যায় না খোঁজ নিয়ে দেখি। নিশ্চয়ই কোন অসুখ হইছে? এতদিন কেউ স্কুলে না গিয়ে থাকে!

নোভা কেমন যেন রাগ হয়ে গেল। মুখ শক্ত করে বলল, আমার মনে হয় না অসুখ বিসুখ। উল্টাপাল্টা কিছু করে বাসায় ধরা খাইছে কিনা দেখ। আর অসুখ হলেই আমার কী? আমি ওর খোঁজ করতে যাব না। ওই মেয়ের অনেক প্রবলেম আছে।

আমি বললাম, প্রবলেম সব মেয়েরই আছে। কারোটা দেখা যায়, কারোটা সে নিজেই দেখায় না। নারগিসের সবচেয়ে ভালো দিক হইল ও নিজেই দেখায় যে ওর কী প্রবলেম। তোমার সাথে ওর কী হইছে আমাকে বল । আর বলতে বলতে আমার সাথে চল।

নোভা কী ভেবে বলল, একটু দাঁড়াও আমি রেডি হয়ে আসি।

ও চলে গেল। আমি কুয়ার পাশে দাঁড়ায়ে থাকলাম। কয়েক মাস আগেও এখানে আসতাম। তখন জায়গাটা অন্য রকম মনে হত। রঙিন মনে হত। মাত্র কয়েকমাস পরে এ একই জায়গাকে মনে হল খুব দুঃখিত, আমারই মত। সাজ্জাদের কথা মনে হইল। আর বাবুকে পুলিশের নিয়ে যাওয়া এইসব ছবি সিনেমার মত একের পর এক কুয়ার পানিতে যেন ভাসতেছিল।

নোভার ডাকে আবার এ দুনিয়ায় ফিরে আসলাম। নোভা বলল, তুমি কিন্তু অসুখের পরে সুন্দর হয়ে গেছ।

নোভা চুল আঁচড়ায়ে, ঝুঁটি বেঁধে, সুন্দর একটা জামা পরে, ঠোঁটে লিপিস্টিক দিয়ে আসছে। আমি ওর দিকে এক ঝলক তাকায়ে হাঁটা শুরু করলাম।

গেইট পার হওয়া মাত্র নোভা বলল, আচ্ছা রোকসানা, একটা কথা বল তো। ইমন কি তোমাদের স্কুলে যায়? দেখছ তুমি কখনো ওকে?

আমি খুব চমকায়ে গেলাম। হাঁটতে গিয়ে একটা হোঁচটও খেলাম। তারপর নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বললাম, কই নাতো! দেখি নাই।

বলতে গিয়ে আমার গলা একটু কেঁপেও গেল।

নোভা আমার কাঁধে হাত রেখে বলল, রোকসানা, মিথ্যা বলা দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর্ট। সবাই সেটা পারে না। তোমার দ্বারা এই আর্ট হবে না। তুমি চেষ্টাও কইর না। ইটস ওকে। তোমার কিছু বলা লাগবে না।

বলতেই বলতেই নোভা ব্যস্ত হয়ে গেল গাড়ির কাচে, দোকানের আয়নায় নিজের চেহারা দেখতে। আমি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

২৯.
নারগিসের নানার বাসার গেটে টোকা দিলাম। গেইট খুলল নারগিসের ছোট মামা। আর গেইটের ভেতরে ঢুকতে না ঢুকতেই নারগিস বের হয়ে আসল। এ কোন নারগিস?

মাথায় লম্বা করে ওড়না টানা, লম্বা হাতা জামা পরা, প্রথমে বুঝতেই পারলাম না এটা কি নারগিস নাকি নারগিসের আম্মা!

কাছাকাছি আসতেই নারগিস মুখে আঙুল দিয়ে চাপাস্বরে বলল, শ..শ..শ..শ.. স্কুল বন্ধ, বলবি, স্কুল বন্ধ।

আমি উপরে নিচে দুবার মাথা ঝাঁকালাম। নারগিস বলল, কালকে জুমার সময় আমাদের বাসায় আসবি। ঠিক জুমার সময়। হাতের ইশারায় বোঝালো ওদের সাততলার বাসা।

আমি এ কথায়ও হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লাম।

এমন সময় বাসার ভেতর থেকে একটা মোটা কণ্ঠ শোনা গেল, কে? কে ওখানে? নারগিস, কার সাথে কথা বল তুমি?

নারগিস চলে যাবার ইশারা করল আমাদেরকে। হাত নাড়িয়ে বলল, ভাগো। ভাগো। নিজেও ওদিকে চলে গেল। আমরা পালানোর আগেই বাসার ভেতর থেকে সেই কণ্ঠ বের হয়ে আসল। আমরা একটা বিশাল লম্বা লোক দেখলাম, ধবধবে ফর্সা, বুক পর্যন্ত লম্বা কাঁচাপাকা দাড়ি, লম্বা শেরওয়ানি পরা আর মাথায় পাঁগড়ি বাধা। একেবারেই দরবেশের মত দেখতে। আর কিছু ভালভাবে দেখার আগেই গেইট থেকে বের হয়ে গেলাম।

নোভা বলল, আমার মাথা খারাপ! আমি আর জীবনেও ওর সাথে দেখা করতে আসব না।

৩০.
শুক্রবার। সারাদিন অপেক্ষায় ছিলাম জুমার নামাজের। আজান দেওয়ার সাথে সাথে নারগিসের বাসায় রওনা দিলাম। বেল দিতেই দরজা খুলল নারগিস। কালকের মতনই আলখাল্লা টাইপের পোশাক ওর গায়ে। দেখলাম, ওদের ড্রইং রুমে টেবিলের ওপর একটা খুব সুন্দর বই রাখা। খুব দামি আর সুন্দর করে বাঁধাই করা কোরআন শরিফ। ড্রইং রুমের সব ছবিগুলো উধাও। নারগিসের আম্মা বের হয়ে আসলেন রান্নাঘর থেকে। আন্টির মাথায় ওড়না দেয়া, গায়ের জামাকাপড় নারগিসের মতনই।

আমাকে দেখে একটা শুকনা হাসি দিয়ে বললেন, ও রোকসানা!

ওর রুমে নিয়ে গেল নারগিস। দরজা বন্ধ করতেই মুখ খুললাম আমি।

—কীরে, তোর বাপ আসল কখন? ঘটনা কী?

নারগিস ওর আলমারি খুলে ড্রয়ার থেকে নানা রকম জিনিসপত্র ঝট পট একটা ব্যাগে ভরতে ভরতে বলল, আর বলিস না, চালাকের চালাক। বিনা নোটিশে চলে আসছে! কী এক জ্বালা! যতদিন থাকবে, পুরাই জেলখানা লাইফটা। সব ছোট ছোট জামা বাতিল। দেখ কী পরে আছি! বলতে বলতে মাথা থেকে ওড়নাটা টান দিয়ে খুলে ফেলল নারগিস।

একটু থেমে আবার বলল, কোনো স্বাধীনতা নাই। স্কুলে গেলে আরেক ঝামেলা। স্কুলে কি আমি ঘোমটা দিয়া যাব, বল? আমার মান সম্মান থাকবে? দেখা যাবে আমার পিছে পিছে একদিন স্কুলেও চলে গেল!

আমি পরিস্থিতিটা বোঝার চেষ্টা করলাম। বললাম, আংকেল একটু ধার্মিক বোধহয়। কয়েকদিন একটু কষ্ট করে মেনে নে।

নারগিস আমাকে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, ধার্মিক? আমার আব্বা সাইকো। সে মনে করে সে আল্লাহর নবী। আল্লাহ তাকে পাঠাইছে। দেখ এগুলা কী বই লিখছে। কোনো সুস্থ মানুষ এরকম বই লিখে নাকি ভেবে দেখ। সংসারের কোনো খেয়াল নাই, আসছে আমার আল্লাহর নবী!

টেবিল থেকে তিনটা বই নিয়ে আমার হাতে ধরায়ে দিল ও। একটার নাম—আল্লাহর পথে, আরেকটার নাম—আল্লাহর প্রেমে, আরেকটার নাম—আল্লাহর গুণসমূহ। খুলে দেখলাম, আল্লাহকে নিয়ে সব ছন্দকবিতা লেখা। লেখক নিজেকে আল্লাহর ওলী মনে করে নানান কিছু লিখছে ছন্দে ছন্দে। আর লিখছে, শয়তান তার পরিবারের রূপ ধরে তাকে নানাভাবে আল্লাহর পথ থেকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করে!

আমি সত্যিকার অর্থে হা হয়ে গেলাম। ওই পরিবার সংক্রান্ত লাইনগুলা দেখালাম নারগিসকে।

নারগিস বলল, আমি জানি।

আমি বললাম, আন্টি ডিভোর্স দেয় না কেন?  

নারগিস বলল, এত সহজ না।

বলতে বলতে যেসব জিনিসপত্র ব্যাগে ঢোকাচ্ছিল তার মধ্য থেকে একটা জিনিস পড়ে গেল। জিনিসটা আমি চিনতে পারলাম—একটা মোবাইল ফোন!!!

আমি বলে উঠলাম, কীরে ওটা! মোবাইল নাকি রে?

নারগিস ঠোটে আঙুল রেখে বলল, শ..শ..শ, এ সব জিনিস তোরে প্যাকেট করে দিচ্ছি। বাসায় রেখে দিবি। খোলার দরকার নাই। এ যন্ত্রণাটা গেলে ফেরত নিব। ততদিন তোর কাছে থাকবে। খুলবি না কিন্তু।

আমি মাথা ঝাঁকায়ে বললাম, কিন্তু তুই মোবাইল কোথায় পাইলি?

পাইছি, পাইছি—চোখ টিপে বলল নারগিস। এখন যা তাড়াতাড়ি। আবার যে কোনো সময় এসে পড়বে লোকটা। তাহলে সর্বনাশ!

বের হতে হতে আমি বললাম, তোর বাপ কিন্তু হ্যান্ডসাম। কোথাও উনার ছবি রাখিস নাই কেন তোরা?

—ছবি? ইসলামে ছবি তোলা হারাম, হারামজাদী। বলে একটা ভেঙচি কেটে আমাকে বাসা থেকে বের করে দিল নারগিস।

ওর তাড়াহুড়া তো বটেই, ওই প্যাকেটে কী কী আছে দেখার আগ্রহে আমি দ্রুত বাসায় ফিরে আসলাম।

৩১.
একটা কালো সিমেন্স মোবাইল। ক্যামেরা আছে মোবাইলে। তার মানে কত দাম হবে এইটার? চোখ কপালে উঠে গেল আমার। এত মর্ডান মোবাইল সেট আমি আগে কখনো দেখি নাই। খুব কম মানুষের কাছেই মোবাইল ফোন আছে এখন। যারা অনেক ধনী তাদের কাছে আছে। সেগুলাও অবশ্য দেখতে এত ভাল বা সুন্দর না। অনেক বড় আর অ্যান্টেনাওয়ালা সেগুলা। এ প্রথম একটা মোবাইল দেখলাম যেটাতে কোনো অ্যান্টেনা নাই। লাল বাটনটা অনেকক্ষণ চেপে ধরার পর মোবাইলটাতে আলো জ্বলে উঠল। চোখের সামনে ভেসে উঠল আজ কী বার, কয় তারিখ, একটা কদম ফুলের ছবির ওপর লেখা—NARGIS।

এত দামি মোবাইল কোথায় পেল নারগিস?

প্যাকেটের বাকি সব জিনিস খুলে দেখলাম। বেশ কয়েকটা দামি কার্ডও আছে সেখানে। খামের রঙ হালকা গোলাপি না হয় হালকা নীল। খুলেই ফেললাম একটা কার্ডের খাম। ভেতরে একদম নিচে ছোট্ট করে নাম লেখা—ডা. ইমন।

ডাক্তারদের এই একটা বিষয় আমার খুব হাসি পায়। যেন পৃথিবীতে আর কেউ কোনো কিছুতে পাশ করে না। কোনো রকম একটা এমবিবিএস পাশ করতে পারলেই—সবখানে—প্রেমপত্রে, টয়লেটের টিকিটে, মুদির দোকানের বাকির খাতায় সবখানেই নিজের নামের আগে ডা. তাদের লিখতেই হয়।

আর কোনো পেশার মানুষকে নিজের পেশা নিয়ে এত হীনন্মন্যতায় ভূগতে দেখা যায় না। উকিল নিশ্চয়ই প্রেমপত্রে লেখে না ‘উকিল ইমন’! আমার চোখের সামনে গোলাপি রঙের ইমনের চেহারা ভেসে উঠল। স্যুটকেস নিয়ে দাঁড়ানো নোভার হোস্টেলের সামনে। নারগিস আগায়ে গিয়ে হ্যান্ডশেক করল—আর ইমন কেমন যেন লজ্জা পেয়ে কুঁকড়ে গেল। আবার মনে পড়ল—আমাদের স্কুলের সামনে দাঁড়ানো ইমন।

ফোনের দোকানে গিয়ে কার সঙ্গে কথা বলত নারগিস এতদিনে বুঝতে পারলাম। গোবেচারা লাভলুর কাছে কখনো মোবাইল দেখি নাই। একটা পরিষ্কার শার্ট পরতে পারে না যে ছেলে—তার আবার ফোন!

এবার নারগিসের ফোনের মেসেজ বক্স খোলার ইচ্ছা হল আমার। সাথে সাথে সামনে ভেসে আসল বাবুর চেহারা। বেঈমান বন্ধু বাবু। হাতে পিস্তল। সামনে হাঁটতে হাঁটতে পিছনে চলা কম্পমান আমার দিকে তাকায়ে বলল—ধুর।

ফোনটা বন্ধ করে দিলাম আমি। তবে পরদিনই আবার খুললাম। সব মেসেজ পড়লাম। সব ফাংশন দেখলাম। দেখলাম মিগ৩৩ নামে একটা জিনিস। তিন চারদিন পরে সেটা ব্যবহার করাও শিখে গেলাম।

নারগিস স্কুলে যায় না। স্কুলে আর মজার কিছুও ঘটে না। সবাই কেবল পড়ে আর পড়ে। আমি মোবাইল নিয়ে মেতে উঠলাম। মিগ৩৩ এ অনেক সময় কাটতে লাগল আমার। আমার আইডির নাম ছিল, ‘গিফট অফ ম্যাজাই’ এর পর একদিন দেখলাম, একটা আইডি রুমে ঢুকল যার নাম ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী’। আমার হৃদপিণ্ড ধড় ফড় করতে শুরু করল।

প্রথম নক সে আইডি থেকেই করল। ‘ইংলিশ নভেল লাভার? ভেরি গুড।’

সাজ্জাদ! সাজ্জাদ! সাজ্জাদ! সাজ্জাদের কথা  ভেবে ভেবে এতদিন পাগল হয়ে গেছি আমি। সাজ্জাদ নিশ্চয়ই আমাকে কখনো ক্ষমা করবে না। যতই ও ওর ভাইকে ধরায়ে দিক, ওর এক সময় মনে হবে আমিই দায়ী সব কিছুর জন্য! কেন আমাকে সাজ্জাদ বলল আর কখনো এখানে আসবা না! ওখানে যেতে কী সমস্যা ছিল? কিন্তু আজকে আবার এখানেই বা নক কেন?

আমি এর কিছুই জিজ্ঞাসা করলাম না। বললাম না, সাজ্জাদ আমি সারাক্ষণ তোমার কথাই ভাবি। যা কিছু পড়ি, যা কিছু শুনি, সবকিছু তোমাকে নিয়েই ভাবি। বলতে ইচ্ছা করল অনেক কিছুই। কিন্তু আমি বললাম, রিসেন্টলি কী পড়লেন?

সেই থেকে কথা শুরু। রোজ কথা বলি। কখনো গল্প নিয়ে, কখনো গান নিয়ে। বাবুর কী অবস্থা অনেক জানতে ইচ্ছা করে। কিন্তু কখনো সে কথা জিজ্ঞাসা করি না। কথা বলতে বলতে অনেক কথাই বলা হয়। একদিন সাজ্জাদ নিজেই ওর বান্ধবীর কথা বলতে শুরু করল।

(চলবে)

 

About Author

পারমিতা হিম
পারমিতা হিম

লেখক ও সাংবাদিক; এখন সময় টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশে কর্মরত।