নারগিস (১)

১.
আমার বান্ধবী নারগিস জীবনে প্রথম ছ্যাঁকা খাইল। ছ্যাঁকা খাওয়া মানে প্রেমে বিফল হইল। আমরা তখন অনেক ছোট। প্রেম-ট্রেম অত বুঝি না। তবে ও প্রেম করে, আর আমাদেরও কেমন ভালো ভালো লাগে। তারপর ওর বিরহকালে ও আমার বাসায় আসলো। ডেকে নিয়ে গেল ছাদে। তখন আমাদের ছাদ থেকে আরো অনেক ছাদ দেখা যায়।

বলল, দোস্ত আমি তো ছ্যাঁকা খাইছি, এখন আমার কী হবে?

আমি বললাম, কী হবে আবার?

সে বলল, সেটাই তো! কী-ই বা হবে!

আমি বললাম, খুলে বল তো কী হইছে!

ও বলল, সেটাই তো! কিছুই হয় নাই! আমি ছ্যাঁকা খাইলাম কিন্তু দেখ কিছুই হচ্ছে না! সবকিছু আগের মতন আছে। সূর্য উঠতেছে, চাঁদ জ্বলতেছে। আম্মা সকালবেলা ইসুবগুলের ভুষি খাইতেছে।

বলতে বলতে কেঁদে ফেলল নারগিস। আর আমি কিছুই বুঝলাম না। মেয়ে ছ্যাঁকা খাইলে আম্মা কেন ইসুবগুলের ভুষি খেতে পারবে না! তবু চুপ থাকলাম। কারণ নারগিস—সে খুবই সংবেদনশীল মেয়ে।

নারগিস বলেই চলল,অথচ আমার প্রেম ‌আর নাই, প্রেম ভেঙে গেছে। এটা কেমন কথা যে তাতে দুনিয়ার কারো কিছু যায় আসে না! আমার তো কিছু একটা করা উচিত। অন্তত এইভাবে তো ছ্যাঁকা খাইয়া বসে থাকা যায় না।

আমি বললাম, গান শোন, দুঃখের গান। ছাদে বসে থাক, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর না খেয়ে থাক, পানিও খাবি না।

ওর চেহারা দেখে বোঝা গেল আমার আইডিয়া ওর পছন্দ হয় নাই।

ও বলল, ধুর, আমি না খাইয়া থাকতে পারব না।

আমি বললাম, তো বিষ খা!

ও বলল, এগুলা তো মেয়েলি। আমাদেরকে তো এসব প্রথা ভেঙে ফেলতে হবে। এগুলার বাইরে কিছু বল।

আমরা তখন হুমায়ুন আজাদ পড়ি, তাই খুবই প্রথাবিরোধী। ভেবে দেখলাম, আসলেই এইসব মেয়েলি জিনিস করা যাবে না। প্রথাবিরোধী হতে হবে। মদ খেতে হবে, সিগারেট খেতে হবে, পারলে ডাইল আর গাঞ্জাও। খেয়ে টাল হয়ে উদাস মনে রাস্তার মাঝবরাবর হাঁটতে হবে। তাহলে বিরহ ব্যাপারটা ভালোভাবে বোঝা যাবে। যুগে যুগে ছেলেরা তাই করছে। নারগিসের খুব পছন্দ হইল বিষয়টা। বিশেষ করে মদ গাঞ্জা খাওয়া। তখনকার দিনে মেয়েরা মদ গাঞ্জা খাওয়ার কথা ভাবত না। তাও আবার চট্টগ্রামে!

ও বলল, চল খাই।

আমি খুব উৎসাহ নিয়ে বললাম,চল চল।

তারপর আমরা দুইজন রাস্তায় নেমে পড়লাম। কেউ বুঝলও না যে আমরা প্রথা ভেঙে দিচ্ছি। এরপর বেশ কয়েকদিন আমরা রাস্তায় নামলাম। সমস্যা হইল এই যে, মদ গাঞ্জা কোথায় পাওয়া যায়, কীভাবে পাওয়া যায় সেইটা আমরা জানি না। এমনকি সিগারেটও কিনতে পারতাম না। আমাদের অনেক সঙ্কোচ হত। কিন্তু আমরা খুব খুঁজতাম একটা মদের আস্তানা, অন্তত একটা গাঞ্জার দোকান। বস্তিতে বস্তিতে আমরা ঘুরতাম। ওইখানে নালা আর গু ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যেত না। কিছুতেই কিছু হল না। মাসের পর মাস কাটতে লাগল।

একদিন নারগিস একটা বুদ্ধি বের করল, শোন আমাদের এই সংকোচ নিয়ে তো একটা সিগ্রেটও কিনতে পারলাম না মাইরি! শোন আমার মনে হয় কী আমাদের আগে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে হবে।

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। কীসের সাথে কী!

ও বলে, হ্যাঁ, তাহলে স্মার্টনেট আসবে। শার্পনেস আসবে। সংকোচ কেটে যাবে।

আমরা দুইজন তখন কলকাতার উপন্যাস পড়া শুরু করছি। আমরা মানে আমি। ওর এত ধৈর্য্য নাই যে পুরা উপন্যাস পড়বে। শুধু রোমান্টিক অংশগুলি আমি দাগায়ে দিতাম, ও অতটুকুই পড়ত। আর তাতেই কথা বদলে গেল নারগিসের। ঢং করে সিগারেটকে বলত সিগ্রেট। কথায় কথায়—মাইরি! আমার অবশ্য ভালোই লাগত। নিজেদের বেশ ব্যতিক্রম মনে হইত। কিন্তু দোকান থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনা আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব না।

তাই একেক দিন একেক অজুহাত দেখাতাম। আজ মাথা ব্যথা, কাল চোখ ব্যথা, পরশু মন ভাল না। কিংবা মুড নাই।

কিন্তু একদিন নারগিস ভীষণ রেগে গেল—ভাই তোরে দিয়া কোনো কাম হয় না, তোরে আমি ভুল বুঝছিলাম। তুই আসলে খুব কমন টাইপের মাইয়া। এতদিন চলে গেল আমি ছ্যাঁকা খাইলাম। একটু মাতলামিও করতে পারলাম না। বিরহের কোনো উদযাপনও হইল না। তোর লগে আর মিশব না আমি। যা যা যা।

আমি দুঃখে থ হয়ে গেলাম। অনেক কিছুই তো সে আমাকে বলতে পারত কিন্তু সে আমাকে কমন মানে গতানুগতিক বলল! এ দুঃখ কীভাবে ম্যানেজ করব আমি! পতঙ্গ যে রকম আগুনের প্রতি আকৃষ্ট, আমার বান্ধবী নারগিসের প্রতি আমার তেমনই দুর্দান্ত আকর্ষণ । সে আমাকে যখন বলে ‘যা যা যা’—তখন আমি কই যাই!

আমাদের বাসার পিছনে তেজপাতা গাছ ছিল। মানে ওই গাছের পাতাই তেজপাতা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আমরা মাটি থেকে সেই পাতা কুড়ায়ে বয়ামে ভরে রাখতাম। একদিন দেখি নারগিস সেই বয়াম হাতে আমাদের ছাদে বসে আছে। মুখ ঈষৎ বেদনার্ত। কিন্তু সুন্দর। তেজপাতা রোল করে তার মাথায় আগুন ধরে টানতেছে। সিগারেটের মতন। চারপাশে তেজপাতার গন্ধ। আমি হেসে ওঠার আগেই সে হেসে উঠল, বলল, আয় আয় আমার ব্যর্থ ড্রাগ ডিলার।

আমি হাসলাম, বললাম, ধুর শালা, কী সব করিস!

নারগিস আমার বাসায় কমই আসে। কিন্তু ওর বাসায় আমি প্রায়ই যাই। শুধু যাই-ই না—খাই, গল্প করি, টিভি দেখি, শুয়ে থাকি। ওরা দুই বোন। বাবা বিদেশে থাকে। আর ওর মহাসুন্দরী মা একদমই আমাদের বান্ধবীর মতন। তাই ওদের বাসা রীতিমত স্বর্গ আমার কাছে। ওর মা সানন্দা ম্যাগাজিনের রেসিপি দেখে দেখে সবসময়ই কিছু না কিছু মজার খাবার বানায়। ওদের বাসায় গেলেই নতুন কিছু না কিছু খাবার খাওয়া যায়।

খুব স্মার্ট আর সৌখিন মহিলা নারগিসের মা। সবসময়ই মুখে আটা না হয় ময়দা না হয় ডাল বাটা—কোন না কোন রূপচর্চাসামগ্রী থাকেই। এদিকে আমার আম্মা একেবারেই তার উল্টা চরিত্র। গ্ল্যামার বলে কোনো কিছু আমার আম্মার মধ্যে নাই।

সুতরাং নারগিসের আম্মাকে অসম্ভব পছন্দ করতাম আমি। আর তাকে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করত আমার আম্মা। নারগিসের বাসায় যাওয়া, ওর আমার বাসায় আসা কিংবা ওর সাথে মেলামেশায় আমার আম্মা খুবই আপত্তি করতেন। কারণটা অবশ্য বেশ গুরুতর।

নারগিসের আব্বা বিদেশে থাকে। কাতারে। আমি তাকে কখনো দেখি নাই। আট দশ বছরে একবার দেশে আসেন বলে শুনেছি। নারগিসের আম্মার একজন প্রেমিক আছেন। বড় আর্মি অফিসার উনি। উনি নারগিসদের বাসাতেই থাকতেন। আমার সাথেও অনেকবার দেখা হইছে।

আমি উনাকে ডাকি বাদশা আংকেল বলে। দেখলে সালাম দেই। উনিও সহজভাবে কথা বলেন। বাদশা আংকেল নারগিসের আম্মার রুমে থাকেন। নারগিস বা তার ছোটবোন—ওরাও বাদশা আংকেল বলেই ডাকে উনাকে।

এটা নিয়ে ওদের মধ্যে কোনো জটিলতা দেখি নাই। তবে জটিলতা আছে আমার আম্মা এবং আম্মা জাতীয়দের। ওরা বলে, নারগিসের আম্মা চরিত্রহীন। আর্মি অফিসারের ক্ষমতার ভয়ে অবশ্য কেউ সামনে কিছু বলার সাহস পায় না। তবে আমাদের পাড়ার কেউই ওই পরিবারের সাথে মেশে না।

কেন যেন বিষয়টা আমার ভালই লাগে। ওদের একটা স্বাধীনতা আছে। চমক আছে। আভিজাত্য আছে। অগতানুগতিক ব্যাপার আছে। মাথা উঁচু করে ড্যাম কেয়ার ভঙ্গিতে হাঁটে নারগিসের আম্মা। উনার ঠাঁটবাটে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই।

সেদিন বাসায় ফিরে দেখি আমার আম্মার মুখ থমথমে। ড্রইংরুমে নারগিস বসা। আমার বাসায় নারগিসের যাতায়াত খুব সহজ ব্যাপার না। নারগিসকে আমি বললাম, কী হইছে?

ও হাসে। কথা বলে না। এরপর এক সপ্তাহ আম্মা আমাকে রুমে তালা বন্ধ করে রাখলেন। কী হল আমি কিছুই বুঝলাম না।

এক সপ্তাহ পর আমাদের কাজের মেয়ের মাধ্যমে জানতে পারলাম, ও সেদিন আম্মাকে এসে বলে গেছে যে, ছেলেরা আমাকে পাত্তা দেয় না তাই আমি হতাশ! আমি মদ গাঞ্জা খুঁজতে একদিন আলমাস সিনেমা হলের সামনে পতিতাদের কাছে গেছিলাম। ওর কাছ থেকে এক হাজার টাকা ধার নিয়ে গেছি, সেইটা ফেরত দেই নাই। তো আমার আম্মা সেদিন ওকে এক হাজার টাকা দিয়ে দিছিল।

ঘটনাটা সত্যি। তবে সত্যিটা আংশিক। অনেক সত্যের সঙ্গে একটু অল্প মিথ্যা মিশায়ে দিলে সেটা পুরা মিথ্যার চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে যায়। আমি আর ও দুইজনেই ওইখানে গেছিলাম। ওইখানে যাওয়ার প্ল্যানও নারগিসই করছিল। ও বলে, পতিতারাই নাকি সবচেয়ে স্বাধীন, একমাত্র ওদেরই সব জায়গায় অ্যাকসেস আছে!

আমরা গেছিলাম এক হাজার টাকা নিয়ে। অবশ্য পুরো টাকাটা নারগিসের। টাকা ফেরত-টেরত দেওয়ার কথা আসে কেমন করে জানি না! কারণ ওই মেয়েগুলা আমাদের সব টাকা রেখে দিল। এ রকম কিছু ঘটতে পারে সে আশঙ্কাও আমার ছিল। তবু আমি ওর সাথে যেতে রাজি হয়ে গেছিলাম। কারণ নারগিস। ও কষ্ট পাচ্ছিল। ও কেমন মলিন হয়ে যাচ্ছিল দিন দিন।

এক সপ্তাহ পর ওর সঙ্গে যখন স্কুলে দেখা হইল তখন আমরা এ বিষয়ে কোনো কথা বলি নাই। কেন বলি নাই জানি না। তবে আমার মাথায় নতুন আইডিয়া আসল, আমাদের কোনো ছেলেবন্ধু নাই। তাই আমরা সিগারেট মদ গাঞ্জা খেতে পারি না। ব্যাপারটা ওকে বুঝায়ে বললাম।

ও বলল, আয় এখন ছেলে খুঁজি।

আমরা ছেলে খুঁজতে বের হলাম। দুই দিনের মধ্যেই সব ছেলে দেখা হয়ে গেল। ছেলেরা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে আগ্রহী। হাত পা চিবুক ধরতে আগ্রহী। তারা মদ সিগারেট দিবে না। একটা ছেলেও প্রথাবিরোধী না। ওরা রবীন্দ্রনাথ পড়ে। নারগিস কাঁদতে শুরু করল। আমারও কান্না আসি আসি করল। তখন আমি ওকে একটা প্রস্তাব দিলাম।

২.
ওর প্রাক্তন প্রেমিকের সাথে আমার ভালই খাতির ছিল। রাসেল ভাই—ওর সাথে যেদিন প্রথম দেখা করতে আসল সেদিন আমরা একটা আইসক্রিমের দোকানে বসছিলাম।

উনাকে দেখে তো আমার মারা যাওয়ার অবস্থা! আমি তখনো জীবনে এত মোটা মানুষ দেখি নাই। টিভিতে আদনান সামিকে দেখছি। আর বাস্তবে দেখলাম রাসেল ভাইকে। উনাকে নেভি ব্লু শার্ট পড়ায়ে দিলে দূর থেকে সিএনজি মনে করে ভুল হবে, আমি আস্তে আস্তে কানে কানে বলছিলাম নারগিসকে। সেইটা শুনে ও হা হা হা করে অট্টহাসি শুরু করল। আমি পড়লাম লজ্জায়। পরে পরে আমি রাসেল ভাইকে ‘গামা’ নামে ডাকতাম। ওদের ভালই প্রেম ছিল।

অন্ধকার অন্ধকার সব রেস্টুরেন্টে ওরা ডেটিং করত। সাথে আমিও যেতাম। নারগিসের বাসায় আমাকে ছাড়া বাইরে যাওয়ার কোনো পারমিশন ছিল না।

ওরা প্রেম করত, আমি খাবারের অর্ডার দিতাম। আমার যা খুশি, যত খুশি অর্ডার দিতাম। একদিন আমি জাম্বো বার্গার অর্ডার করলাম। তিনটা। আমার, গামার আর নারগিসের। তাতে ও ভীষণ রেগে গেল। আমি বুঝলামই না রাগার মতন কী হল! ও খেল না, তাই গামাও খেল না। আমি একাই সব খেলাম।

বাসায় ফিরতে ফিরতে নারগিস বলল, তুই আর কখনো আমাদের সাথে যাবি না।

আমি তো অবাক—কেন? আমি কী করলাম?

তুই শালা কেন জাম্বো বার্গার অর্ডার দিলি? পৃথিবীতে কি আর কিছু ছিল না? আমি কি ওইটার সামনে হা কইরা জিহ্বা বের কইরা ওইটা খাব? তুই কি বুঝস না রে কী খাইতে হয় ডেটিংয়ে গেলে?

কী খাইতে হয়?

স্যুপ ট্যুপ এইসব। যেগুলা মুখ টিপে টিপে খাওয়া যায়। যা শালা। তোর তো আর প্রেম হবে না কোনোদিনও। তোরে শিখাইয়া লাভটা কী?

মনে মনে রাগ হলেও আমি আর রা করি নাই। এটা ঠিক যে আমার প্রেম হবে না। অন্তত এই ক্লাস এইটে। নারগিস ফর্সা, অনেক। মোটা সোটা, সুন্দর পুতু পুতু চেহারা। তাছাড়া কী যেন একটা আছে ওর চেহারায় যেইটায় প্রেম প্রেম ভাব ধরে। কেমন জানি একটা ম্যাচিউরড ভঙ্গি ওর চলাফেরায়। আমার সেইটা নাই। আমি কালো। চুল ম্যাগি নুডলসের মত। এগুলা নিয়ে হাসে ও। হাসুক তাতে কী। আল্লাহ তো ওকেই দিল সব। ওকে তো আমারই ভাল লাগে।

এরপর শুধু আরেক দিন ওর সাথে গেছিলাম আমি। লালখান বাজার নামে এক এলাকায়। সেইখানে ও, আমি আর আরেক বান্ধবী মিলে গেলাম একটা বাসায়। সেইটা নাকি রাসেল ভাইয়ের আত্মীয়ের বাসা। বাসার মতই লাগল অবশ্য। আমরা স্কুল ড্রেসে ছিলাম। গিয়ে সোফায় বসে থাকলাম। আর নারগিস ভিতরে চলে গেল।

গেল তো গেল আর ফিরে আসার নাম নাই। চার ঘণ্টা পরে আমার সাথের মেয়েটা কান্নাকাটি শুরু করল। আমি পড়লাম বিপদে। ওকে ডাকি। ও কোনো উত্তর দেয় না। মাঝে মাঝে ওর হাসির শব্দ শোনা যায়। কাছেই কোনো রুমে ও হাসতেছে। সাথে রাসেল ভাইও। কী যে হচ্ছে ওই রুমে বোঝার মত অভিজ্ঞতা না থাকলেও কেমন কেমন যেন লাগতেছিল। আমরা অনেকক্ষণ ধরে ওকে ডাকলাম। ও এমন ভাব করল, যেন চালের উপর কাউয়া ডাকে! পাত্তাই দিল না।

সন্ধ্যা হয়ে গেলে আমরা দুইজন রাগে দুঃখে অপমানে বের হয়ে আসলাম।

অবশ্য এইটা নিয়েও আমাদের মধ্যে কখনো কোনো আলাপ হয় নাই। আমি আর ওদের সাথে কখনো যাই নাই। ওরাও ডাকে নাই। রাসেল ভাই আমাকে পছন্দই করত। তো আমি রাসেল ভাইয়ের সাথে বন্ধুত্ব করার সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ নারগিসের দুঃখ আমার আর সহ্য হচ্ছিল না।

৩.
নারগিস এই বন্ধুত্বে ব্যাপক মজা পাইল। রাসেল ভাই আমাকে সিগারেট কিনে দিত। পাইন, মোর, গ্রাম এইসব সিগারেট। আমি পাইন ভালবাসতাম, নারগিস গ্রাম।

ও বলত, পাইন মাইয়াদের সিগারেট। গ্রাম হল জেন্টস ব্র্যান্ড।

পাইনের জন্য আমি নারীবাদীও হতে পারলাম না। আমাদের ছাদ থেকে আশেপাশের অনেক ছাদ দেখা যেত। তবে লোকজন বেশি একটা দেখা যেত না। আমরা মোটামুটি আরামেই সিগারেট টানতাম। কিন্তু নারগিসের দরকার মদ। অন্তত একবার মাতলামো। দুঃখ দুঃখ ভাব।

এদিকে রাসেল ভাই মদ কিনে দেয় না। মদের গল্প করে—সিঙ্গেল মল্ট, ডাবল মল্ট! বলে, মেয়েরা পছন্দ করে ভদকা—রাশান ভদকা অবশ্য ভালই। তবে আমি খাই হুইস্কি। জ্যাক ড্যানিয়েল।

আমি তাড়াতাড়ি বলি, না না আমারে হুইস্কিই দিয়েন।

উনি হাসে। কিন্তু কোনোদিন দেয় না। হুইস্কি পাওয়ার জন্যে আমি উনার সাথে সাথে ঘুরি। উনিও আমার সাথে সাথে ঘুরেন। নারগিসের চাপে আমিও উনাকে চাপাচাপি করি। তবে নারগিসের ব্যাপারটা বলি না।

আমি বলি, ভাই মদ তো দেন না আপনি!

রাসেল ভাই বলেন, আরে তোমার অত তাড়া কীসের। আমি জানি তো কেন এগুলা করো। তোমার বান্ধবী বলছিল।

আমার বান্ধবী? নারগিস?

হুম। ও বলছে, তোমার নাকি অনেক ফ্রাস্টেশন। তোমারে ছেলেরা পাত্তা দেয় না। এইগুলা কোনো বিষয় নাকি, বলো? তুমি মিয়া এইসব খাইতে চাও ছেলেদের জন্যে! আরে কত ছেলে আসবে যাবে। মেয়েদের জীবনে ছেলেরা হল লোকাল বাস—একটা যায়, দশটা আসে।

আমি চুপ করে থাকি। আমার চোখে পানি চলে আসে। কিছু বলতে পারি না। গলা ফ্যাস ফ্যাস করে। রাসেল ভাই হয়ত ভাবে ছেলেদের দুঃখে আমি কাঁদছি। এ বিষয়ে আর কিছু বলেন নাই উনি। আমিও না।

উনি বলে, নারগিসকে কখনো বইলো না আমার সাথে দেখা হয় এইটা।

আমি দুঃখ নিয়া তাকাই, জিজ্ঞাসা করি—কেন?

ও তো ফালতু কথা বলে অনেক। সাইকো একটা! আমি জাস্ট বলছিলাম তোমারে নিয়া আসে না কেন। ব্যাস, ওর ইন্জিন স্টার্ট হয়ে গেল। সেই জন্যেই তো ব্রেক আপ হইল। ভালই হইছে, বুঝছো।

৪.
অবশেষে একদিন বিকালে আমরা মদ খেলাম। প্রিমিয়াম হুইস্কি।

বেশ ভালই লাগছিল। সেদিন অনেক বাতাস ছিল। আমাদের বাসাটা ছিল একটা আন্ডার কন্সট্রাকশন দশ তলা বিল্ডিংয়ের চার তলায়। উপরের ছয় তলা তখনো খালি। আমরা দশ তলা ছাদের পানির ট্যাংকের উপরে উঠে সেখানে শুয়ে থাকতাম।

সেদিনও ওখানে গেছিলাম। আমার কেমন জানি অনেক খুশি খুশি আর অনেক দুঃখ দুঃখ লাগতেছিল।

নারগিস গান গাইতেছিল—পাল পাল পাল পাল…!

আমি বললাম, ‘পাল’ কী রে?

পাল পাল তেরি ইয়াদ সাতায়ে…!

তখন ফাল্গুনী পাঠকের যুগ। নারগিস পাল-এর বেশি গাইতে পারে না। আমি হাসি।

ও বলল, তুই গানের কী বুঝোস?

আমি হাসলাম।

তুই কীসেরই বা কী বুঝোস?

আমি তখন কেঁদে ফেললাম।

কান্দিস না, কান্দিস না, আমি তো কান্দি না, দেখ না একটা গের লগে প্রেম করলাম। গামা তো একটা গে।

আরো কী কী যেন বলা শুরু করল। আমার তখন সেই বাসার কথা মনে পড়ল। সেই দিন, যেদিন সারাদিন একটানা ওকে ডেকে গেছি আর ও পাশের রুমে হাসাহাসিতে মশগুল, আমাদের সাড়া দেয় নাই!

সেদিন অনেক বাতাস ছিল মনে আছে। নারগিসের সুন্দর চুলগুলো উড়ছিল। আমার অনেক ভাল লাগতেছিল। এত তীব্র ভালো লাগা যে মাঝে মাঝে আমার দমবন্ধ হয়ে যাইতেছিল। ধীরে ধীরে বিষণ্ণ সন্ধ্যা নামা শুরু করল। উপরে, অনেক উপরে, অনেক চিল আমাদেরকে ঘিরে ঘুরতেছে।

নারগিস বলল, কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে চায়?

আমি বললাম, কে চায়?

ও বলে, কেন তুই!

সঙ্গে সঙ্গে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। জীবনের যত দুঃখ, অপমান, জ্বালা, যন্ত্রণা সব মনে পড়ে গেল। যেসব বিষয় নিয়ে কখনো আমার মনে কোনো প্রশ্ন ছিল না, সেগুলি হঠাৎ মনে পড়ে যেতে থাকল।

আমি বললাম, নারগিস, তুই আমাকে ছোট করিস কেন?

ও বলল, কারণ তুই বড়। তোকে ছোট করে রাখতে হয়।

আম্মার কাছ থেকে এক হাজার টাকা নিলি কেন?

তুই তো ভোঁতা। ভোঁতা মানুষদেরকে আঘাত না করলে ধারালো হয় না মাইরি।

নারগিস, রাসেল ভাইয়ের সাথে কী হল তোর? তার সাথে ওই রকম করলি কেন? কাজটা ঠিক হয় নাই।

তোর বাপ মা নিয়া যদি কেউ কথা বলে, তুই কী করবি? কথা কবি হেই পোলার লগে?

না তা বলব না।

সে আমার মারে নিয়া কথা বলে দোস্ত।

মানে? কী বলে?

বলে আমার মা সেক্সি মহিলা।

ওহ। তাতে কী হইছে? সেটা তো সবাই বলে!

কিছু হয় নাই। প্রথম প্রথম আমি তো এইটারে আধুনিকভাবে নিছি। পরে দেখি এইটা আস্তা লুইচ্চামি।

ওহ। এটা তো সরল মনে বলা হইতে পারে ব্যাটা।

আরে না, সে আমার মারে করতে চায়।

করতে চায় মানে? করতে চায় মানে কী?

আমার নেশা ছুটে যায়। আমি একই প্রশ্ন বার বার করতে থাকি।

নারগিস শুধু বলে, গামা আমার মাকে বেশ্যা বলছে। তুই বল, ওর লগে কি প্রেম করব কি না?

আমি জোর দিয়ে বললাম, না। কখনো না।

৫.
সেইদিনের পর সব ঠিক ঠাক হয়ে গেল। মানে নারগিসের সব ঠিক ঠাক হয়ে গেল। সে আবার আগের মতন ফুর ফুরে। বাতাসে ওড়ে এমন তার মুড। হাসি খুশি। স্কুলে যায়। ছোট বড় সব মেয়েদের সাথে ঝগড়া করে, মারামারি করে। স্কুলবাসে করে ফেরার পথে আচার খেয়ে খেয়ে রিকশাযাত্রী ছেলেদের গায়ে আচারের বিচি ছুঁড়ে মারে। আচার শেষ হলে বোতল বের করে পানি ছুঁড়তে শুরু করে।

ওর সব ঠিকঠাক হয়ে গেল। আর আমার এলোমেলো হতে শুরু করল। কারণ রাসেল ভাইয়ের সাথে ওর সম্পর্ক শেষ, আর আমার অকারণ খাতির শেষ করব করব করেও করতে পারি না। কেমন করে তাকে বলি যে, মদ খাওয়ার জন্যই তার সাথে এতদিন দেখা করছি। অতএব এখনো তার সাথে দেখা করতে হয়। হুদাই তার মিথ্যা কথাগুলো শুনতে হয়। মাথা নাড়তে হয়। মনে মনে নারগিসের কাছে হাজার বার ক্ষমা চাইতে হয়।

(কিস্তি ২)

About Author

পারমিতা হিম
পারমিতা হিম

লেখক ও সাংবাদিক; এখন সময় টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশে কর্মরত।