১.

আমার বান্ধবী নারগিস জীবনে প্রথম ছ্যাঁকা খাইল। ছ্যাঁকা খাওয়া মানে প্রেমে বিফল হইল। আমরা তখন অনেক ছোট। প্রেম-ট্রেম অত বুঝি না। তবে ও যখন প্রেম করত, আমাদের বেশ ভালো লাগত।

তারপর ওর বিরহকালে ও আমার বাসায় আসলো। আমাকে ডেকে নিয়ে গেল ছাদে। তখন আমাদের ছাদ থেকে আরো অনেক ছাদ দেখা যায়।

ছাদের ময়লা রেলিংয়ে কনুই রেখে চুলগুলা মুখের ওপর থেকে সরায়ে নারগিস বলল, দোস্ত আমি তো ছ্যাঁকা খাইছি, এখন আমার কী হবে?

আমি একটু অপ্রস্তুত, তাই বললাম, কী হবে আবার?

সে বলল, সেটাই তো! কী-ই বা হবে!

আমি বললাম, খুলে বল তো কী হইছে!

ও গোমড়া মুখটা আরো গোমড়া করে দ্রুত বলল, সেটাই তো! কিছুই হয় নাই! আমি ছ্যাঁকা খাইলাম কিন্তু দ্যাখ কিছুই হচ্ছে না! সবকিছু আগের মতন আছে। সূর্য উঠতেছে, চাঁদ জ্বলতেছে। আম্মা সকালবেলা ইসুবগুলের ভুষি খাইতেছে।

বলতে বলতে কেঁদেই ফেলল নারগিস। চোখ কুঁচকায়ে, কপাল কুঁচকায়ে, শ্বাস টেনে একটা ভয়াবহ অবস্থা হইল। আর আমি কিছুই বুঝলাম না। মেয়ে ছ্যাঁকা খাইলে আম্মা কেন ইসুবগুলের ভুষি খেতে পারবে না! এটাতে এমন দুঃখ পাওয়ার কী আছে!

তবু চুপ থাকলাম। কারণ নারগিস—সে খুবই সংবেদনশীল মেয়ে। এই যে বিকালবেলার ছাদের ওপরে সন্ধ্যা প্রায় আসি আসি করতেছে, পাখিরা দল বেঁধে নিজের নিজের বাসায় ফিরতেছে, বাতাসে ‘দিন শেষ’ ‘দিন শেষ’ গন্ধ—এইটাতেও নারগিসের অনেক উদাস লাগে, মন খারাপ হয়।

আজকে এমন একটা আউলা বাতাস চারিদিকে, তার ওপর ছ্যাঁকা খাইছে, এখন কী বলতে কী বলে ফেলি আর ওর মন আরো খারাপ করে ফেলি! তাই ময়লা পড়া ওই রেলিংয়েই ভর দিয়ে একটু দূর থেকেই চুপচাপ ওকে দেখতে থাকলাম।

ওর চোখে সত্যি সত্যি একটু পানি। তবে সেটা গড়াচ্ছে না। সারা মুখে গড়াগড়ি খাচ্ছে দারুণ যন্ত্রণা। সূর্য ডুবে যাবার আগে সারা আকাশ লাল করে আছে। সে লালচে আভা ওর মুখে ছড়ানো।

নারগিস একবারও আমার দিকে তাকাল না। কখনো মাটির দিকে, কখনো পাশের নারকেল গাছের পাতার একশো ডালের দিকে, কখনো লালচে আকাশের দিকে তাকিয়ে গড় গড় করে বলেই চলল—অথচ আমার প্রেম ‌আর নাই, প্রেম ভেঙে গেছে। এটা কেমন কথা যে তাতে দুনিয়ার কারো কিছু যায় আসে না! আমার তো কিছু একটা করা উচিত। অন্তত এইভাবে তো ছ্যাঁকা খেয়ে বসে থাকা যায় না।

ওর চেহারা দেখে আমার মনটাও হু হু করে উঠল। এবার আমার কিছু বলতেই হবে। “আমার দুঃখে আর কেউ দুঃখী নয়”—এ অনুভূতি তো আসলেই খুব যন্ত্রণার। তার চেয়েও যন্ত্রণার “সবাই কত সুখী আর আমিই কেবল দুঃখী”—এ ধারণা।

আমি বুদ্ধি করে বললাম, গান শোন, দুঃখের গান। ছাদে বসে থাক, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর না খেয়ে থাক, পানিও খাবি না।

মানুষ তো এগুলাই করে বিরহে, তাই আমিও এগুলাই বললাম। এইবার ও আমার দিকে তাকাল। ওর কুঁচকানো ভ্রু  আর  শক্ত চোয়াল দেখেই বোঝা গেল আমার আইডিয়া ওর মোটেও পছন্দ হয় নাই।

ও হাত নেড়ে বলল, ধুর, আমি না খাইয়া থাকতে পারব না।

আমি বললাম, তো বিষ খা!

ও বলল, এগুলা তো মেয়েলি। আমাদেরকে তো এসব প্রথা ভেঙে ফেলতে হবে। এগুলার বাইরে কিছু বল।

আসলেই আমার আইডিয়া খুবই বাজে টাইপের ছিল। বাংলা সিনেমার আইডিয়া প্রায়। আমরা তো তখন হুমায়ুন আজাদ পড়ি, তাই খুবই প্রথাবিরোধী। আমি ভাল করে প্রথাবিরোধী চিন্তা করে বুঝলাম, এইসব মেয়েলি জিনিস করা যাবে না। অন্য কিছু করতে হবে। মদ খেতে হবে, সিগারেট খেতে হবে, পারলে ডাইল আর গাঞ্জাও। খেয়ে টাল হয়ে উদাস মনে রাস্তার মাঝবরাবর হাঁটতে হবে। তাহলে বিরহ ব্যাপারটা ভালভাবে বোঝা যাবে। যুগে যুগে ছেলেরা বিরহকালে এসবই করছে।

নারগিসকে বলতেই ওর খুব পছন্দ হইল বিষয়টা। বিশেষ করে মদ গাঞ্জা খাওয়া। তখনকার দিনে মেয়েরা মদ গাঞ্জা খাওয়ার কথা ভাবতো না। তাও আবার চট্টগ্রামে! ও মনমরা ভাব এক মুহূর্তে ঝটকা মেরে ফেলে রেলিং ছেড়ে দুই হাত দিয়ে ব্যায়ামের ভঙ্গি করতে করতে বলল, চল খাই।

আমি খুব উৎসাহ নিয়ে বললাম, চল চল।

তারপর আমরা দুইজন ছাদ থেকে নেমে চলে গেলাম রাস্তায়। কেউ বুঝল না যে আমরা দুইজন আসলে সাধারণভাবে রাস্তায় নামি নাই, এর একটা উদ্দেশ্য আছে। আমরা প্রথা ভেঙে দিচ্ছি।

 

২.

এরপর বেশ কয়েকদিন আমরা রাস্তায় এদিক-ওদিক ঘুরলাম। সমস্যা হইল এই যে মদ গাঞ্জা কোথায় পাওয়া যায়, কীভাবে পাওয়া যায় সেইটাই আমরা জানি না। এমনকি আমরা সিগারেটও কিনতে পারতাম না। আমাদের অনেক সঙ্কোচ হতো। কিন্তু আমরা খুব খুঁজতাম একটা মদের আস্তানা, অন্তত একটা গাঞ্জার দোকান। বস্তিতে বস্তিতে আমরা ঘুরতাম। ওইখানে নালা আর গু ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যেত না।

কিছুতেই কিছু হল না। মাসের পর মাস কাটতে লাগলো।

একদিন এই রকম সময়েই নারগিস হঠাৎ একটা বুদ্ধি বের করল, শোন আমাদের এই সংকোচ নিয়ে তো একটা সিগ্রেটও কিনতে পারলাম না মাইরি! আমার মনে হয় কী আমাদের আগে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে হবে।

আমি আকাশ থেকে পড়লাম। কীসের সাথে কী!

ও বলে, হ্যাঁ, তাহলে স্মার্টনেট আসবে। শার্পনেস আসবে। সংকোচ কেটে যাবে।

আমরা দুইজন তখন কলকাতার উপন্যাস পড়া শুরু করছি। আমরা মানে আমি। নারগিসের এত ধৈর্য্য নাই যে পুরা উপন্যাস পড়বে। শুধু রোমান্টিক অংশগুলি আমি দাগায়ে দিতাম,ও অতটুকুই পড়তো। আর তাতেই কথা বদলে গেল নারগিসের। ঢং করে সিগারেটকে বলত সিগ্রেট। কথায় কথায়—মাইরি!

আমার অবশ্য ভালই লাগত। নিজেদের বেশ ব্যতিক্রম মনে হইত। তবে দোকান থেকে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনা—এইটা একেবারেই বাড়াবাড়ি মনে হইল আমার। এইটা হইল কোলকাতার উপন্যাস পড়ার ফল। আমাদের উদ্দেশ্য নারগিসের ছ্যাঁকা খাওয়া বিষয়টাকে ভালভাবে অনুভব করা। এর সঙ্গে স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার সম্পর্ক কী? আমি কোন প্রতিবাদ না করে  একেক দিন একেক অজুহাত দেখাতাম। আজ মাথাব্যথা, কাল চোখব্যথা, পরশু মন ভাল না। কিংবা মুড নাই।

একদিন নারগিস ভীষণ রেগে গেল। চোখ মুখ লাল করে আবার সেই যন্ত্রণার কণ্ঠে বলল,  ভাই তোরে দিয়া কোনো কাম হয় না, তোরে আমি ভুল বুঝছিলাম। তুই আসলে খুব কমন টাইপের মাইয়া। এতদিন চলে গেল আমি ছ্যাঁকা খাইলাম। একটু মাতলামিও করতে পারলাম না। বিরহের কোন উদযাপনও হইল না। তোর লগে আর মিশব না আমি। যা যা যা।

আমি এই রকম তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্য একটুও প্রস্তুত ছিলাম না। তাই প্রথমে থ হয়ে গেলাম। অনেক কিছুই তো সে আমাকে বলতে পারত কিন্তু কমন—মানে গতানুগতিক—মানে সাধারণ বলল! নারগিস সত্যি আমাকে ফেলে দৌড়ে চলে গেল। আমি বাসায় ফিরলাম।

 

৩.

আমাদের বাসার পিছনে তেজপাতা গাছ ছিল। মানে ওই গাছের পাতাই তেজপাতা হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমরা মাটি থেকে সেই পাতা কুড়ায়ে বয়ামে ভরে রাখতাম। ছাদে সেই বয়াম রেখে দিতাম। একদিন দেখি নারগিস বয়াম হাতে আমাদের ছাদে বসে আছে। মুখ ঈষৎ বেদনার্ত। কিন্তু বরাবরের মতই সুন্দর। তেজপাতা রোল করে তার মাথায় আগুন ধরায়ে সেটা টানতেছে। সিগারেটের মতন। চারপাশে তেজপাতার গন্ধ।

এইসব দেখে আমি হেসে ওঠার আগেই সে হেসে উঠল, বলল, আয় আয় আমার ব্যর্থ ড্রাগ ডিলার।

আমি হাসলাম, বললাম, ধুর শালা, কী সব করিস!

কতক্ষণ এখানে এসে বসে আছে ও কে জানে! আমাকে ডাকে নাই। বাসার কেউ দেখলে আমার খবর ছিল। আম্মা নারগিসকে একদম পছন্দ করে না। ছাদে যে কেউ যে কোনো সময় এসে পড়তে পারে, এসে যদি নারগিসের এই কাণ্ড দেখে ফেলে তাহলে সর্বনাশ হবে। তাই ওকে নানারকম রঙিন প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেদিনের মত বাসায় পাঠায়ে দিলাম।

 

৪.

 

নারগিস আমার বাসায় কমই আসে। ওর বাসায় আমি প্রায়ই যাই। শুধু যাই-ই না—খাই, গল্প করি, টিভি দেখি, শুয়ে থাকি।

 

ওরা দুই বোন। নারগিস বড়। ছোটজন ওর চেয়ে ছয় বছরের ছোট। একদম পিচ্চি। ওদের বাবা বিদেশে থাকে। আর ওর মহাসুন্দরী মা একদমই আমাদের বান্ধবীর মতন। তাই ওদের বাসা রীতিমত স্বর্গ আমার কাছে। ওর মাসানন্দা ম্যাগাজিনে রেসিপি দেখে দেখে প্রায়ই মজার মজার খাবার বানায়। ওদের বাসায় গেলে নতুন নতুন খাবার খাওয়া যায়।

 

খুব স্মার্ট আর সৌখিন নারগিসের মা। সবসময়ই মুখে আটা না হয় ময়দা না হয় ডালবাটা—কোনো না কোনো রূপচর্চাসামগ্রী থাকেই। এদিকে আমার আম্মা একেবারেই তার উল্টা চরিত্র। রূপের প্রতি যত্ন তো দূরের কথা, গ্ল্যামার বলে কোনো কিছু আমার আম্মার মধ্যে নাই। তার না শাড়ি পরার স্টাইল ভাল, না চুলের সাজ। আম্মার চুলের আর সাজ কী—সবসময়তেলদিয়েজবজবা।নারগিসেরআম্মাকেদেখলেমনেহয়এইমাত্রটেলিভিশনথেকেবেরহয়েআসছে—তাইনারগিসের আম্মাকে অসম্ভব পছন্দ করি আমি। আর তাকে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করে আমার আম্মা। নারগিসের বাসায় যাওয়া, ওর আমার বাসায় আসা কিংবা ওর সাথে মেলামেশায় আমার আম্মার খুব আপত্তি। কারণটা বেশ গুরুতরই বটে।

নারগিসের আব্বা বিদেশে থাকে। কাতারে। আমি তাকে কখনো দেখি নাই। আট দশ বছরে একবার দেশে আসেন বলে শোনা যায়। নারগিসের আম্মার একজন প্রেমিক আছেন। বড় আর্মি অফিসার উনি। উনি নারগিসদের বাসাতেই থাকতেন। আমার সাথেও অনেকবার দেখা হইছে। আমি উনাকে ডাকি‘বাদশা আংকেল’বলে। দেখলে সালাম দেই। উনিও সহজভাবে কথা বলেন। বাদশা আংকেল নারগিসের আম্মার রুমে থাকেন। নারগিস বা তার ছোটবোন—ওরাও‘বাদশা আংকেল’বলেই ডাকে উনাকে। এটা নিয়ে ওদের মধ্যে কোনো জটিলতা দেখি নাই। তবে জটিলতা আছে আমার আম্মা এবং আম্মা জাতীয় অনেকের। ওরা বলে, নারগিসের আম্মা নাকি চরিত্রহীন।

আর্মি অফিসারের ক্ষমতার ভয়ে অবশ্য কেউ সামনে কিছু বলার সাহস পায় না। আমাদের পাড়ার কেউই ওই পরিবারের সাথে মেশে না। বিষয়টা আমার ভালই লাগে। ওদের একটা স্বাধীনতা আছে। চমক আছে। আভিজাত্য আছে। অগতানুগতিক ব্যাপার আছে। মাথা উঁচু করে ড্যাম কেয়ার ভঙ্গিতে হাঁটে নারগিসের আম্মা। উনার ঠাঁটবাটে আমি মুগ্ধ হয়ে যাই।