নারগিস (২)

(আগের কিস্তি)

রাসেল ভাইয়ের সাথে আমার এখনো দেখা হয়—এমন না যে কথাটা আমি নারগিসকে বলি নাই বা বলতে চাই না। কিন্তু সমস্যা হল সে মেয়ে আমাকে একবারও এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করে না। কোনদিন কোনক্ষণে ভুলেও সে রাসেল ভাইয়ের নাম নেয় না। রাসেল ভাই যেন সেদিন বিকেলের বাতাসে উড়ে গেছে নারগিসের জীবন থেকে।

কিন্তু আমার সমস্যা বড়ই জটিল! রাসেল ভাইয়ের নানা গল্প আমাকে শুনতে হয়। হু হা করতে হয়, মাঝে মাঝে হাসতে হয়। আমি উনার সাথে দেখা করতে যাই না বটে, কিন্তু আমাদের পাড়ায় এদিকে ওদিকে হরহামেশাই উনাকে দেখা যায়। দেখা হলে কথা তো বলতেই হয়। আবার মাঝে মাঝে উনার অনুরোধে এদিকে সেদিকে যেতেও হয়। তবে হ্যাঁ, সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি হয় তার সাথে রিকশা চড়ে কোথাও যাইতে।

একে তো সে বিশাল বপুধারী! তার ওপর রিকশায় বসে ডান দিকে। ছেলেদের নাকি ওইদিকে বসবার নিয়ম। কারণ দুর্ঘটনা হলে ওইদিকে ঝুঁকি বেশি। আমার একবার জানতে ইচ্ছা করছিল, দুইটা ছেলে যদি একসাথে রিকশায় চড়ে, তখন কী হবে? কিন্তু কিছুই জিজ্ঞেস করি নাই। লক্ষ্মী মেয়ের মত উনার বামদিকে বসে গেছি। কারণ উনার সাথে কথা বলতেই আমার ভাল লাগে না। আগ্রহ হারায়ে ফেললে মানুষের কী আর কিছু ভালো লাগে?

আরেকটা বাজে স্বভাব ছিল উনার। রিকশায় বসত বাম হাত আমার পিঠের পিছনে রেখে। আমার রীতিমত ঘেন্না লাগত বিষয়টা। একেকটা সময় আমার কোমরে উনার হাত লাগত। ঘেন্নায় আমার চোখে পানি চলে আসত তখন। কিন্তু ঠোঁট কামড়ে রিকশায় চুপচাপ বসেই থাকতাম আমি। আর বাসায় ফিরেই পিঠ কোমর ভালো করে সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতাম। মনের মধ্যে যে বিরক্তি লেগে থাকত সেটা মুছি কী দিয়ে! সারাটা দিন মন এত খারাপ থাকত আমার!

তখন আমি সিমোন দ্য বোভোয়া পড়ে ফেলছি। ওটা তো হুমায়ূন আজাদ অনুবাদ করছে, সেই সুবাদে পড়া। আমার মনে হয় ছেলেরা রিকশার ডানদিকে বসলে তাদের ডান হাত মুক্ত থাকে, অন্যদিকে মেয়েরা বামদিকে বসলে তাদের ডানহাত যায় অবরুদ্ধ হয়ে—তাই নিশ্চয়ই প্রতিক্রিয়াশীল ছেলেরা ছলচাতুরি করে এইসব বাম-ডান থিওরি করে।

কিন্তু রাসেল ভাইয়ের যন্ত্রণায় আমার বাসা থেকে বের হওয়া বন্ধ হয়ে গেল প্রায়। কেননা নারীবাদী বই কেবল পড়তেই পারি আমি—একটা ছেলের মুখের ওপর ‘না’ বলার সাহস আমার হয় নাই।

নারগিস তখন মহাব্যস্ত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র নিয়ে। তখন সবে মাত্র বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আমাদের স্কুলে আসতে শুরু করছে।

ওদের গাড়ি দেখে একদিন আমি নারগিসকে গিয়ে বললাম, চল আমরা সদস্য হই।

ও ঠোঁট উল্টে বলল, কেন রে মাইরি? মাথা খারাপ হইছে?

আমি বললাম, ওমা, বই পড়ব! কোলকাতার! উপন্যাস! রোমান্টিক!

নারগিস বলে, হুরর, বই পড়বি না মানুষকে দেখাইতে চাস? আঁতেল হইতে চাস?

আমি তো অবাক! এইটা আবার কী বলে!

ও বলে, তুই কি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদরে চিনোস?

আমি বললাম, হুমম চিনি তো!

ও বলল, কেমন লাগে তোর বল দেখি!

আমি একটু ভেবে বললাম, ভালোই—বেশ হাসিখুশি লোক তো!

ও মুখ ভেঙচায়ে বলল—ভালো? ভা…লো!!! ওইটা তো একটা হাফ লেডিস! তুই জানোস আমি ওইটার একটা বক্তৃতা শুনছি। সে নাকি ঢাকা কলেজে বাংলা পড়াইতো। পুরা ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে সে একটা গল্পই পড়াইছে—’হৈমন্তী’! কী নির্লজ্জ! সেইটা আবার গল্প করে বলে!

এই হল নারগিস—সে আসলে জ্ঞানের আধার। কোথাকার কোন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ — সে কী পড়াইছে না পড়াইছে, কতটুকু পড়াইছে সেইটাও এই ক্লাস এইটের মেয়ে জানে। আমি তবু একটু তর্ক করলাম।

বললাম, ভাই রে, সে তো একটা ভাল কাজ করতেছে, তাই না? পড়াইতে পারে না তাতে কী হইছে? এই যে আমরা কত বই পড়তে পারবো এইখান থেকে! বিশ্বসাহি…

আমি শেষ করার আগেই নারগিস ক্ষেপে গেল। বলল, বিইশ্বসাহিত্য না কচু? কয়টা বই আছে ওইখানে? কার্ল মার্ক্সের বই আছে? লেনিন? ট্রটস্কি? কোন বিপ্লবী বই পাবি না ওখানে। পাবি খালি কচুর মাথা রোমান্টিক রবীন্দ্রনাথ আর শরৎচন্দ্র।

আমি বললাম, অসম্ভব, কার্ল মার্ক্স থাকবে না? হতেই পারে না! আছে মানে আছে। তুই কী গিয়ে দেখছোস?

ও বলল, না তোমার মত যাইয়া দেখতে হয় না আমার। উসঠা খাইবার পরে শিক্ষা পাইতে হয় না। আমি তোমার চাইতে ঢের বুদ্ধিমতী।

আমি বললাম,ঠিক আছে। চল গিয়ে দেখি। যদি ভালো বই না থাকে আমারে থাপড়াইস।

এই বলে দুজন মিলে স্কুলের সেই রুমটাতে গেলাম যেখানে সপ্তাহে একদিন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কার্যক্রম চলে। গিয়ে দেখি চশমা পড়া একটা সাধারণ চেহারার মেয়ে বসে আছে। মেয়েটার চেহারা সুন্দরও না, বিশ্রীও না। পরনের জামাটা সুন্দরও না, বিশ্রীও না। মেয়েটার ভঙ্গিমা বই পড়াও না, অশিক্ষিতেরও না। সে চোখ তুলে আমাদের দিকে তাকাল।

এ ধরনের মেয়েদেরকে নারগিস দুই চোখে দেখতে পারে না। স্কুলবাসে যাওয়ার সময় পথে যদি এইরকম মেয়ে দেখে তাহলে সে ওদের দিকে পানি ছুঁড়ে মারে। মেয়েটাকে দেখেই আমি বুঝে গেলাম আমার আজকে খবর আছে!

আমি বললাম, আপু, আমরা যদি সদস্য হতে চাই, কী করতে হবে?

মেয়েটা বলা শুরু করল, দুই ধরনের সদস্য আছে। দুশ টাকা আর পাঁচশ টাকা…

তার কথা শেষ হবার আগেই মুখ ঝামটা দিল নারগিস। বলল, দাঁড়ান, দাঁড়ান, সদস্য পরে। আগে বলেন বই কি আছে?

মেয়েটা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ভ্রুতে স্পষ্টতই বিরক্তি। বলল, শরৎচ…

নারগিস আবারো মুখ ঝামটা দিল, সিমোন দ্য বোভোয়া আছে?

মেয়েটা বলল, নাহ।

নারগিস আবার বলল, জীবনে তো মনে হয় নামও শোনেন নাই, তাই না? হুমায়ুন আজাদ আছে? ‘নারী’?

মেয়েটা বলল,লাল নীল দীপাবলী আছে, কত নদী সরোবর —এই লিস্টে দেখো, এগুলার বাইরে নাই।

নারগিস বলল, ওইসব দেখার টাইম নাই। ডাস ক্যাপিটাল আছে? কার্ল মার্ক্স?

মেয়েটা চরম বিরক্ত। সেও সমান মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, না—নাই।

কী নাই নীপা? হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন বলে উঠল।

আমি আর নারগিস দুজনেই ঘাড় ঘুরায়ে দেখি একটা ছেলে। আমাদের চেয়ে বয়সে বড় তো অবশ্যই। ভার্সিটিতে পড়ে হবে! পরনের শার্ট কোন এক কালে সাদা ছিল হয়ত।কালো প্যান্টের অবস্থাও যথেষ্ট খারাপ। তবে তার সবচেয়ে খারাপ দিক হল তার চেহারা। গাল ভর্তি ব্রণ। কেমন তেলতেলে মার্কা মুখ।

নারগিসের স্বরই বদলে গেল, ভাইয়া আপনাদের তো কার্ল মার্ক্সই নাই!

ছেলেটা বলল, মার্ক্স? ওমা! তুমি মার্ক্স পড়তে চাও? হোয়াট এ ব্রিলিয়ান্ট গার্ল!

নারগিসের চেহারায় ফিলিপস বাত্তির ঝিলিক। আমি হা হয়ে গেলাম।

আমার নাম লাভলু—তোমরা? বলে ছেলেটা একবার নারগিসের, আরেকবার আমার দিকে তাকাল।

নারগিস বলল, আমি নারগিস। ক্লাস এইটে। আমাদেরকে সদস্য করে নেন। আমরা বই পড়ি।

তারপর ছবি টবি জমা দিয়ে পরের সপ্তাহেই আমরা সদস্য হয়ে গেলাম। সদস্য ফরমের এক জায়গায় লেখা ছিল শখ। সেখানে লিখতে হবে সদস্যের শখ কি। নারগিস কি লিখছে আমি দেখি নাই। ফরম জমা দেওয়ার সময় দেখি সে লিখে রাখছে—শখ: ঘুমানো।

আমি তো আঁতকে উঠলাম, এইটা কি লিখছোস? ঘুমানো?

নারগিস বলল, হ্যাঁ, কেন, কোন প্রবলেম?

আমি বললাম, আরে না, বই পড়া লেখ। সবাই ওইটাই লেখছে।

ও ঠোঁট উল্টে বলল, আমি সবাই না।

হুমম সবাই ও না। সবাই বই নিল পাঁচ মিনিটে। আমি প্রথম বই পাইলাম পালামৌ—সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় আর নারগিস পাইলল নূরনবী—গোলাম মোস্তফার লেখা। বই আনতে গিয়ে ‘শখ’ নিয়ে দীর্ঘ তিরিশ মিনিট লাভলু ভাইয়ের সাথে গল্প করল ও। আর ফিরে এসে ক্লাসের বেঞ্চে লিখল—লাভ লু!

আমি তো হেসেই শেষ, এটা কি রে? ছেলের চেহারা তো খুবই খারাপ!

ও বলল, তাতে কী? টাইম পাস হল টাইম পাস।

আমি বললাম, ও আচ্ছা। বেঞ্চে লিখলি তো—আমি ভাবলাম সিরিয়াস!

নারগিস ঠোঁট উল্টে বলল, হ এইরকম বিশ্বসাহিত্য মার্কা পোলার লগে আমি সিরিয়াস! আমার বইটা তুই নিয়া যা। পইড়া কী জানি রিভিউ লিখতে হয় না? লিইখা দিস। এইসব নূরনবী পড়ার টাইম আমার নাই। আমার টাইম মূল্যবান টাইম। যা তা করে নষ্ট করতে পারব না।

আমি তো মহাখুশি। আমার অত মূল্যবান টাইম নাই। প্রতি সপ্তাহেই আমরা বই নিই। আর নারগিস লাভলুর সঙ্গে তিরিশ চল্লিশ মিনিট ধরে আলাপ করে। আমি বইগুলা কখনো ব্যাগে ঢুকাই না। ব্যাগের উপরে রাখি। রাস্তার লোকজন যেন বোঝে আমি সাহিত্যপড়া মেয়ে। এমনকি পাড়ার লোকজনের সামনেও আমি বইগুলা বগলে নিয়ে হাঁটি। রাসেল ভাইয়ের সামনে পড়ার ভয়ও আমি আর পাই না।

৭.
এমনই একদিন বই বগলে নিয়ে রাসেল ভাইয়ের সাথে দেখা। উনি তখন কী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে খুব ব্যস্ত।

আমাকে বলল, চল আমরা খেতে যাই। কাজের চাপে আমি ভালমন্দ খেতেও পারতেছি না।

আমি গেলাম। রিকশায় উনি সেই আগের ভঙ্গিতেই বসা। শুধু আমার হাতে দুইটা বই। প্রাণপণে সেগুলা চেপে ধরে থাকলাম। একটা রেস্টুরেন্টের সামনে রাসেল ভাই রিকশা থামায়ে বলল, এইটা তো নতুন মনে হচ্ছে! চল এইটাতেই যাই।

আমি চললাম। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতেই একটা ছোট্ট টেবিল। মাথায় টাক পড়া এক লোক সেখানে বসে কান চুলকাচ্ছে।

আমাদের দেখে সে বলল, ভিতরে যান, ভিতরে যান।

ভেতরে গিয়ে দেখি ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোথাও কোথাও নীল ডিম লাইট জ্বলতেছে। তাতে কোন কিছু দেখা খুব মুশকিল। এরকম রেস্টুরেন্টে আমি আগেও গেছি। আমি, নারগিস আর রাসেল ভাই।

ওরা দুইজন এক টেবিলে, এক চেয়ারে পাশাপাশি বসতো আর পাশের টেবিলে আমি। আজকে রাসেল ভাই আমার পাশে বসল। উনি তো মোটা মানুষ,ওই অতটুকু চেয়ারে ভদ্রভাবে বসাই দায়! আমি বুঝলাম না আমার মুখোমুখি বসতে উনার কী সমস্যা! খুবই অস্বস্তি শুরু হল আমার।

রাসেল ভাই আমার হাতে মেন্যুটা ধরায়ে দিয়ে বলল, কী খাবে? অর্ডার দাও। তোমার অর্ডারে অনেকদিন খাই না।

আমি বললাম, চোখে তো কিছু দেখতেই পাচ্ছি না। চলেন অন্য দোকানে যাই। এইখানে তেলাপোকা না টিকটিকি দিবে সেইটাও দেখতে পাব না!

উনি আমার গায়ের দিকে আরো চেপে বসে বললেন, কই দেখি, চেষ্টা কর, চেষ্টা কর, পড়ার চেষ্টা কর।

বলতে বলতে আমার পিঠের ওপর হাত দিলেন তিনি। এবং সেইটা আমার অন্তর্বাসের সীমারেখার অংশ।

তারপর হেসে বললেন, ওমা, তুমি তো বড় হয়ে গেছ। আমি তো তোমাকে অনেক পিচ্চি মনে করতাম।

আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেল।

আমি বললাম, রাসেল ভাই, হাত সরান। আই ডোন্ট লাইক।

উনি হাত সরিয়ে ফেলল, আরে ডোন্ট টেক ইট আদারওয়াইজ। আই অ্যাম জাস্ট বিয়িং ফ্রেন্ডলি।

আমি চুপ থাকলাম। মাথা নিচু। থরথর করে কাঁপতেছিলাম। কী বলব, কী করব কিছুই বুঝতে পারতেছি না।

রাসেল ভাই দুইটা আইসক্রিম অর্ডার দিলেন।

তারপর বললেন, শুন আমি তোমার বন্ধু। অনেক ক্লোজ বন্ধু। তোমার যত কথা, যত ইচ্ছা সব আমাকে বলতে পার।

চারিদিকে অদ্ভুত রহস্যময় আঁধার। বিভিন্ন টেবিলে জোড়ায় জোড়ায় ছেলেমেয়ে লেপ্টে-সেপ্টে বসে আছে। অন্ধকারটা চোখে সয়ে যেতেই চারপাশের সব টেবিল চোখে পড়ে। একটু ভাল করে খেয়াল করলেই দেখা যায় কোন টেবিলে ছেলেটার হাত মেয়েটার জামার ভেতর। কোথাও মেয়েটার হাত ছেলেটার প্যান্টের ভেতর। ভয়ে আমার হৃদপিণ্ড একদম শুকায়ে গেল।

আমি বললাম, আমার কোন বন্ধুর দরকার নাই।

রাসেল ভাই বলল,অবশ্যই আছে। সবারই বন্ধুর দরকার হয়। বল, ছেলেদের বিষয়ে কি জানতে চাও তুমি?

হঠাৎ কেমন যেন একটা চেঁচামেচি শুনলাম। দুপদাপ শব্দ। আর এরপরেই হঠাৎ অনেকগুলা লাইট একসাথে জ্বলে উঠল।

আলোতে চোখ ঝলসে গেল আমার। এক ঝলকে দেখলাম, অনেকের ঠোঁটে ঠোঁট লাগানো! আঁতকে ওঠার বিভিন্ন শব্দ পাওয়া গেল টেবিলগুলো থেকে।

এমন সময় রাসেল ভাই চিৎকার করে উঠল, রেইড দিচ্ছে! রেইড দিচ্ছে!

৮.
রেইড কী জিনিস আমি বুঝি না। নকশাল আন্দোলনে পুলিশ রেইড দিত—এতটুকু জানি। কিন্তু রেস্টুরেন্টে পুলিশ রেইড কি সেইটা আমি কিভাবে জানব! রাসেল ভাইকে জিজ্ঞাসা করলাম রেইড কি?

উনি একদম ফ্যাকাসে হয়ে গেছেন। কিছুক্ষণ আগে দেখা নীল আলোয় রাসেল ভাইয়ের ‘বিয়িং এ ফ্রেন্ড’ এর কথা ভাবতে ভাবতে আমাদেরকে গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে গেল পুলিশ।

অভিভাবক না আসা পর্যন্ত কাউকে ছাড়া হবে না। এবং দুপক্ষেরই লোক আসতে হবে। যে সে লোক না—বাবা ও মা। অন্য কেউ আসলে চলবে না। ছেলেমেয়ের বাবা মা আসবে, এরপর নাকি হুজুর ডেকে তওবা পড়ানো হবে, এরপর কাজী ডেকে বিয়ে। সুতরাং যার যার বাসায় ফোন লাগাও।

ওসির সামনের চেয়ারে মাথা হেঁট করে বসে আমি। কেন যেন পুলিশেরা সবচেয়ে বেশি ঘেন্নার চোখে তাকাচ্ছে আমাদের দিকেই। বিশাল বপুধারী রাসেল ভাই আর জীর্ণ শীর্ণ আমি—বাবা মেয়ে না হলেও চাচা ভাতিজির মতই নিশ্চয়ই দেখায় আমাদের!

ছি ছি ছি! কি থেকে কি হল! আমার বাসায় ফোন করা অসম্ভব। আমি এই মুখ আর কাউকে দেখতে পারবো না। আমার বাসায় হয়ত আমাকে আর কখনো ঢুকতেই দিবে না। যদি ঢুকতেও দেয় তাহলে উঠতে-বসতে-খেতে-পড়তে আমাকে লজ্জা দিবে আজকের কথা বলে। হয়ত আমার স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে। হয়ত বিয়েই দিয়ে দিবে আমার! আর আব্বার সামনে!!!

না,না, না। আমি পারব না। ইস কোনভাবে যদি এক ঘণ্টা আগে ফেরত যাওয়া যেত। বিকেলে আমি একদম বাসায় থাকতাম। ছাদে শুয়ে শুয়ে নূরনবী পড়তাম। সত্যি! আল্লাহ সত্যি! আমারে একটা ঘণ্টা আগে ফিরায়ে নিয়ে যাও। আমি পারব না।

বাসা ছাড়া বলার মত আর একমাত্র আছে নারগিস। নারগিসকে এসব বলার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো। কী বলব! বলব যে আমি তোর প্রতারক-লুইচ্চা-এক্স বয়ফ্রেন্ডের লগে অন্ধকার রেস্টুরেন্টে খাইতে গিয়া পুলিশের হাতে ধরা খাইছি! ও যে আমারে ছি ছি করবে! নাহ্ আমি পারব না। ওর কাছে আমার কোন মর্যাদা নাই, না থাক। এইরকম অমর্যাদা আমি মানতে পারব না।

বিশটা মিনিট এভাবে বসে থাকলাম। সময় পার হচ্ছে। ওরা নাকি রাতে লকারে ভরে রাখবে। এদিকে সন্ধ্যার আগে বাসায় না ঢুকলে আস্ত রাখবে না আমাকে। যতই ভাবতেছি– চোখের পানি, নাকের পানি সমানে পড়তেছে। সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরতে হবে। তা যেভাবেই হোক।

থানার ফোনটা নিয়ে নম্বর ডায়াল করলাম। নারগিসের আম্মার নম্বর।

ফোনটা রিসিভ করল নারগিস। দুবার হ্যালোর পরেই কেটে দিলাম আমি।

আবার করলাম। আবার নারগিস। আবার রেখে দিলাম আমি।

তৃতীয়বার ফোন তুলল আন্টি নিজে।

হ্যালো!!

আন্টিকে সংক্ষেপে যা বলার বললাম। আসল কথা কিছুই বললাম না। শুধু বললাম, থানায় আসতে হবে—আমাকে বাঁচান।

আমার কণ্ঠ কেঁপে কেঁপে উঠতেছে। আর একটু হলে কেঁদেই ফেলব।

আন্টির আসতে সময় লাগবে। ততক্ষণে আমার বাসায় ফেরার সময় হয়ে গেছে। বাসার সবার কথা খুব মনে পড়তেছে।

(কিস্তি ৩)

About Author

পারমিতা হিম
পারমিতা হিম

লেখক ও সাংবাদিক; এখন সময় টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশে কর্মরত।