নারগিস (৩)

আগের কিস্তি প্রথম কিস্তি

১০.
আমার বাপ মা দুজনেই নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। দুজনেরই বাবা ছিলেন গ্রামের গরীব কৃষক।

শুনছি,বাবা পড়াশোনায় বেশ ভাল ছিলেন। কৃষকের ছেলে টেনেটুনে কলেজ পর্যন্ত পাশ করে ফেলেন। তার গ্রামের নাম পরৈকোড়া। আর আমার মা ছিলেন পাশের গ্রাম আনোয়ারার। পড়ালেখা করতে চান নাই মোটেও। ক্লাস এইটে নাকি ফাইনাল পরীক্ষার সময় রেললাইনে শুয়েছিলেন। পরীক্ষা দেওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া ভাল—তাই। পরে আর পরীক্ষা দিতে হয় নাই। স্কুলে যেতেও আর হয় নাই।

প্রেম করতেন গ্রামের এক ধনী পরিবারের ছেলের সাথে। আর আমার গোবেচারা বাবা ছিল তাদের পত্রবাহক। ধনী পরিবারের ছেলে খুব সম্ভবত আমার মাকে প্রেমে ছ্যাঁকা দেয় অথবা আমার মায়ের বিয়ে ঠিক হয় তার প্রেমপত্রবাহকের সাথে।

মা ‘না’ বলতে পারে নাই অথবা তার ‘না’ কেউ শুনেই নাই। এইসব ভাসা ভাসা কথাবার্তা শুনছি আমার মামা-খালাদের কাছ থেকে।

আম্মা এইসব আলাপ করতেন না।

মায়ের কাছ থেকে শুনছি ভয়াবহ অভাব অনটনের কথা। আমাদেরকে কখনো খাবার নষ্ট করতে দেন না ‌আম্মা। খুব খুব রাগ করেন। বলেন, ভাত পাইতাম না, ভাতের মাড় খেয়ে থাকছি। আর তোরা ক্ষুধা না লাগলেও খাবার পাস!

পত্রবাহক বাবার সাথে পত্রলেখক মায়ের সংসার। তবু সেখানে মায়েরই চোটপাট বেশি। আব্বাকে কখনো এইসব চিঠি নিয়ে কথা বলতে শুনি নাই। অথচ এইসব নিয়ে সবসময় হম্বিতম্বি করে আমার মা। কথায় কথায় খোঁটা দেয় আব্বাকে। তবে আব্বা কখনোই কোনো মন্তব্য করেন না।

আব্বা সবসময় চুপচাপ। নির্বিকার। তবু তাকেই বেশি ভয়। সে যদি আজকের এই ঘটনা জানে কী করবে আমাকে কে জানে! হয়তো মেরেই ফেলবে।

এখনো আসল না নারগিসের মা! বাড়ি ফেরার বৈধ সময়টা অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। নারগিসের মা নিশ্চয়ই সাজুগুজু করতে করতে এত সময় পার করে দিচ্ছে!

নারগিসের মায়ের আব্বা বেশ বড়লোক। অন্তত আমার মনে হয়। কারণ আমাদের পাড়ার শেষ প্রান্তেই ওর নানার বিশাল পাঁচতলা বাড়ি। আগে অবশ্য সেটা ছিল টিনশেড ঘর। সেখানে নারগিসের আম্মাসহ তার পাঁচ ভাই পাঁচ বোনের জন্ম আর বিবাহ। নারগিসের আম্মা সুন্দরী ছিলেন আগে থেকেই। প্রেমও করতেন খুব। পাড়ার বিভিন্ন হাই প্রোফাইল যাদেরকে এখন আমরা মামা কিংবা চাচা ডাকি—নারগিসের আম্মার এক কথাতেই কাত হয়ে যাইতেন। এগুলা সবই অবশ্য পাড়াতো খালা-আন্টিদের মুখে শোনা। এখন ওইসব মামা-চাচারা নারগিসের আম্মাকে দুই চোখে দেখতে পারে না।

নারগিসের আম্মার বিয়ে দিছিল নারগিসের মামা। বিয়ে ফোনে ফোনেই হইছিল। বিয়ের আরো অনেক পরে নারগিসের আব্বা আসেন। নারগিসের আব্বা থাকেন কাতার। ওইখানে তার কী যেন ব্যবসা। সাত আট বছরে একবার তিনি বাংলাদেশে আসেন। আমি অবশ্য নারগিসের আব্বাকে কখনো দেখি নাই। তাকে কেন, নারগিসের বাবার পক্ষের কোন আত্মীয়কেই আমি কখনো দেখি নাই। নারগিসের আম্মার বিয়ের ছবিতে দেখছি,বেনারসী শাড়ি পরা একটা কম বয়েসী মেয়ে হাতে টেলিফোন ধরা, সামনে কাজী বসা। বিয়ের ছবি হিসেবে খুবই অদ্ভুত ওই ছবি। ওর বাপের বিয়ের কোন ছবি নাই।

একসময় নারগিসরা ওর নানাবাড়ির পাশেই এক টিনশেড বাসায় ভাড়া থাকত। তারপর নারগিসের নানার পাঁচতলা বাড়ি উঠল আর সেই পাঁচতলায় নারগিসের আম্মার পাঁচ ভাইয়ের সাজানো সংসার হল। তার পাশে টিনশেড বাসায় থাকা অসম্ভব হল উনার জন্য। উনি উনার আব্বার বাসা থেকে একটু দূরে, এখনকার বাসায় উঠে পড়লেন।

১১.
থানার বাইরে একটা বড় গাড়ির শব্দ। বুঝলাম সেই আর্মি অফিসারের গাড়ি। আন্টি আসলেন। আর থানার ভেতরে জোড়ায় জোড়ায় বসে থাকা ছেলেমেয়েগুলোর দিকে একটা অর্থহীন দৃষ্টি দিলেন। কিন্তু আমার দিকে তাকানোটা তার মোটেও অর্থহীন ছিল না। আমার দিকে তাকায়ে একবার রাসেল ভাইয়ের দিকে তাকালেন। নর্দমার কীটের দিকেই কেউ ওইভাবে তাকাতে পারে। থানার ওসির সাথে কি কথা বললেন আর কার সাথেই বা ওসির ফোনে কথা বলায়ে দিলেন বুঝতে পারলাম না।

কিন্তু দেখলাম, ওসি বিনয়ে গদ গদ করতেছে। সে যেন পারলে নারগিসের মাকে সেজদাই দিয়ে ফেলে। আর এসব দৃশ্য দেখে রাগে গরগর করতেছে রাসেল ভাই। চাপা স্বরে একবার বলেই ফেলল—বেশ্যা।

নারগিসের মা আমাকে নিয়ে থানা থেকে বের হয়ে গেলেন। গাড়িতে দেখলাম বাদশা আংকেল গম্ভীর মুখে বসে আছেন। নারগিসের মাকে বললেন, আগেই বলেছিলাম, মেয়েরা কাদের সাথে মেশে না মেশে একটু খেয়াল রেখো। নারগিস তো অনেক ভাল মেয়ে। অনেক ব্রাইট। যার তার সাথে মিশে নষ্ট হয়ে যাবে।

এই ‘যে-সে’টা যে কে আমার তা বুঝতে বাকি রইল না। রাগে-দুঃখে আমার ভীষণ কষ্ট হইল। কিন্তু কী আশ্চর্য! আমার একটুও কান্না পাচ্ছে না।

নারগিসের আম্মা আমাকে ডাকল, রোকসানা!

আমি বললাম, জ্বি আন্টি।

আন্টি একবার আড়চোখে ড্রাইভারটার দিকে তাকাল, তারপর বলল, যে ছেলেটার সাথে গেছ, ওকে চিনো? ও তোমার চেয়ে কত বড় বয়সে তুমি জানো না? তোমাকে তো আমি খুব ভাল মেয়ে মনে করতাম। আমার মেয়ে বেশি লাফালাফি করে, আমি তো ওরে বিশ্বাস করতাম না এজন্য। আর তুমি একটা শান্তশিষ্ট মেয়ে ভেতরে ভেতরে এগুলা করো?

আমি বললাম, আন্টি আমি কিছু করি নাই। ওই ছেলে আমাকে ওখানে নিয়ে গেছে। তার সাথে আমার কোন কিছু না।

আন্টি একটু চুপ হয়ে গেলেন। এরপর বললেন, তোমাকে আমি বিশ্বাস করি। প্রেম-ট্রেম তো অবশ্যই করবা। কেন করবা না। কিন্তু এখন কি তোমার প্রেম করার বয়স? ক্লাস এইটে পড়ো। দুইটা দিন পর তোমাদের স্কলারশিপ এক্সামে বসতে হবে। নারগিস দিনরাত পড়তেছে আর তুমি কী করতেছ?

নারগিস দিনরাত কী লাভলু পড়তেছে আমি জানি। তাও চুপ করে গেলাম।

আন্টি বলল, দেখ প্রেম করো, যাই করো, তোমার আব্বার বয়সী লোকের সাথে রেস্টুরেন্টে যাওয়ার আগে একটু ভাইবো। আর এমন বিশ্রী মোটা যে ছেলে, তার সাথে কথা বলার ইচ্ছা কেমনে হইল তোমার?

বলতে বলতে হাসি আটকালেন নারগিসের আম্মা। উনার চোখে বিজয়ের হাসি। উনার মেয়ে ভীষণ ভালো, সতী-সাধ্বী। শুধু লাফালাফি বেশি করে। আর আমি, শান্ত শিষ্ট লেজবিশিষ্ট—এমন একটা চাহনি দিলেন তার পাশে বসা বাদশা আংকেলের দিকে।

জবাবে বাদশা আংকেল একটা বিরক্তিমূলক চাহনি দিলেন আর মাথা নাড়লেন।

এমন সময় আমার বাসাটাও এসে পড়ল। আর গাড়ি থেকে নামার আগে আন্টি বললেন, রোকসানা, কয়েকটা দিন মন দিয়ে পড়ো। আর আমাদের বাসায় আইসো না কেমন! তুমি ভাল মেয়ে আমি জানি। কিন্তু নারগিসের সাথে মিশবে না। ওকে? বাই দ্য ওয়ে, নারগিস কী এই ছেলের কথা জানে?

আমি না সূচক মাথা নাড়লাম।

আন্টি বলল, ওকে মা। জানে না যখন, জানবেও না। আমি কিচ্ছু বলব না। তুমি ওর সাথে আর মিশবে না। ও একটু পড়াশোনায় মন দিয়েছে। পরীক্ষাটা যাক কেমন?

আমি কিছুই বললাম না। কারণ এই মুহূর্তে আমি নারগিসের আম্মার চেয়ে আর কারো প্রতি এতটা কৃতজ্ঞ না। তারপরেও অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভাবতে ভাবতেই আমার বাসার দিকে তাকালাম। আর দেখলাম আমার আম্মা আর পাড়া প্রতিবেশীনী সবাই আমার বাসার সামনে দাঁড়ায়ে হা করে দেখতেছে যে আমি নারগিসের আম্মার সাথে কথা বলতেছি। নারগিসের আম্মা ঠাস করে গাড়ির দরজা বন্ধ করে সাঁই করে চলে গেলেন। আর আমি বাসায় ঢুকতে গেলাম। কিন্তু আম্মা ঢুকতে দিলেন না।

পাশের বাসার এক আন্টি বলে উঠলেন, বেডি তো চুলও লাল করছে!

আম্মা চিৎকার করে বললেন, তোরে কতবার বলছি ওই মাগীর মাইয়ার লগে ঘুরবি না? লজ্জা-শরম নাই তোর? এতক্ষণ রাতে তুই ওই বেডির গাড়ি থেইকা নামোস? কেন আসছোস বাসায়? যা ওর বাসায় যা। ওরে মা ডাক। খবরদার তুই আমার ঘরে ঢুকবি না।

আমার মাথা গরম হয়ে গেল। কারে কি বলে আমার অশিক্ষিত মূর্খ আনস্মার্ট আম্মা। এ মহিলা জানে আজকে আমার কপালে কি ছিল! নারগিসের আম্মা না থাকলে কি হইত আজকে?

পাড়ার সব মহিলারা মজা দেখতেছে। আম্মা আমাকে বাসায় ঢুকতেই দিবে না। উনি উনার মত করে গালিগালাজ করেই যাইতেছেন। আমাকে যা-ই বলতেছেন শুরুটা হচ্ছে নারগিসের আম্মাকে কোন একটা অপমানমূলক কথা বলা দিয়ে। বুঝতে কষ্ট হয় না, দর্শকদের বিনোদন দেওয়াই আম্মার উদ্দেশ্য। অন্য কিছু না। এই মহিলা ভাবছে এতক্ষণ আমি আমার বান্ধবীর সাথে সপরিবারে কোথাও বেড়াতে গেছি। কিছু না বলে আবার বাসায় ঢুকতে গেলাম আমি। এবার আম্মা বাধা দিলেন না।

বাসার ভেতরেও শুরু করলেন হইচই।

এবারের বিষয় পড়াশোনা। উনার মেয়ে পড়াশোনায় ভালো না। রোল নাকি একশো! (মোটেও না! নারগিসের রোল ৫৮)। আমি পড়াশোনায় ভালো, তাই নাকি আমাকে খারাপ করার জন্য মা-মেয়ে উঠে পড়ে লাগছে! কী আজব, কী গেঁয়ো কথাবার্তা আমার আম্মার! মেজাজটাই বিগড়ে গেল! যে তার মেয়েকে বাঁচাল, তাকেই কিনা যা তা বলে যাচ্ছে এই মহিলা!

হঠাৎ এমন রাগ হইল আমার বাসার সব কিছু ভাঙতে শুরু করলাম। যত কাঁচের জিনিস, যত প্লেট-গ্লাস হাতের কাছে পেলাম সব একেবারে আঁছড়ে ফেললাম মাটিতে।

আর অবাক হয়ে গেল আমার আম্মা। সোজা আমার চুলের ঝুঁটি ধরে বাসার বাইরে নিয়ে গেল।

আর বলল, তোর এত্ত বড় সাহস! যা তুই ওই মাইয়ার বাসায় থাক। ওই মাগীরে আম্মা ডাক। খবরদার এই ঘরে ঢুকবি না। এই ঘরে যেন আর তোরে না দেখি।

আমি পড়লাম আরেক জ্বালায়। অন্য যে কোন দিন জাস্ট হাহ্ বইলা দেমাগ দেখায়ে নারগিসের বাসায় চলে যাওয়া যাইত। আজকে তো ওই বাড়ির দরজাও বন্ধ আমার জন্য। এদিকে আমার পাড়ার সব লোক যেন আমার বাসার সামনে। এতক্ষণ শুধু বেকার মহিলারা রাতের টিভি সিরিয়াল বাদ দিয়ে আমার বাসার সামনে দাঁড়ায়ে ছিল। আর এখন পোলাপান আণ্ডাবাচ্চা, বুড়া-বুড়ি, আংকেলরাও মজা দেখতে চলে আসছে।

আমার আম্মা তাদেরকেও হতাশ করলো না। সুর করে বলা শুরু করল, আমার মেয়েরে তাবিজ করছে রে, তাবিজ করছে মহিলায়। কী খাওয়াইছে রে বাসায় নিয়া, পাগল কইরা ফেলছে রে আমার ভাল মাইয়াটারে। নিজের মাইয়ারে বৃত্তি পাওয়ানের লাইগা… তাবিজ করছে রে… তাবিজ করছে!

১২.
আণ্ডাবাচ্চারা হাসি-হাসি মুখ করে আমার চারপাশে ঘুরঘুর করতেছে। আর একটু দূরে বাকি জনসমাবেশ। কি করব, কোথায় যাবো! মাথায় কিছু ঢুকতেছে না। আম্মাটাও এমন নাট্যকার। আব্বা আসার আগে সে ঠিকই তার নাটক বন্ধ করবে। আব্বা এসে যদি এই জনসমাবেশ দেখে, আম্মারে দিবে নে ভালোরকম। ঠিক করলাম আজকে আম্মাকে একটা ভালো শিক্ষা দিব। আব্বা না আসা পর্যন্ত ঘরে ঢুকবো না।

আমি ছাদে চলে গেলাম। সাড়ে দশটায় আম্মা ডাকতে আসল।

–ওই রোকসানা ঘরে ঢোক। বদমাইশ মাইয়া।

আমি কিছুই বললাম না। আম্মা বুঝে গেল আমার উদ্দেশ্য। আমি যে তাকে পাল্টা নাজেহাল করবো! তার হাতে সময়ও বেশি নাই। এগারোটা বাজলেই আব্বা চলে আসবে।

সব শক্তি দিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করল। যত শক্তিই থাক, যে সরতে চায় না তাকে কী সরানো যায়? যায় না।

অনেক গালাগাল,হুমকির পরেও মহিলা যখন আমাকে টলাতে পারল না তখন একেবারে মধুর ব্যবহার শুরু করল।

–তোর আব্বাকে কিচ্ছু বলব না। তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়।

–সকালে স্কুল। তোদের বাস তো তাড়াতাড়ি আসে।

–তোর ফুপু কি জানি আনছে তোর জন্য। কালকে ওইটা নিয়ে আসবো।

কোনো কিছুতেই কাজ হলনা। আমি দাঁতমুখ খিঁচে বসে থাকলাম। অনেক হইছে! বইপত্রে পড়ি, টিভিতে দেখি মানুষের আম্মারা কত নির্লোভ, সন্তানের জন্য নাকি জান কোরবান করতে পারে! আর আমার আম্মা! উনার স্বভাব চরিত্র এক কথায় হল—পোলাপানদের যতটা বেচা যায়। যতভাবে ব্যবহার করা যায়।

ধরেন কোনো বিয়েতে গেলাম। আম্মা ব্যস্ত নিজের সাজগোজ নিয়ে আর অন্যের সাজগোজ নিয়ে হাসিঠাট্টায়। প্রত্যেক মাকে দেখি নিজে খাওয়ার আগে বাচ্চারা খাইছে কিনা খোঁজ নেয়। আর আমার আম্মা? জীবনেও না।

বাসায়ও তো কোনদিন টিভি সিরিয়াল দেখা বন্ধ করে খাবার টেবিলে আসে না আম্মা। কে কি খাইল, নাকি খাইলোই না—তার কিছুই আসে যায় না।

তবে মেহমান আসলে অন্য কথা। তখন সে মধু মধু করে ডাকতে শুরু করে। ভাতটা পর্যন্ত তুলে দেয়। ডায়লগ দেয়—শাক খা, বেশি বেশি খা। মাছের ঝোলটা নে না। তোর জন্য ঝাল কম দিলাম।

না, এটা আমার সৎ মা না। তারপরেও লোকের সামনে তার এত আদিখ্যেতা। আর লোকের আড়ালে শুধু মুখ ঝামটা।

নিজের খাওয়া, নিজের ঘুম, নিজের পরচর্চা—ব্যাস! আমার অসহ্য লাগে তাকে।

আমাকে টলাতে না পেরে আম্মা হতাশ হয়ে চলে যায় নিচে।

আমিও নামি। ঠিক এগারোটায়।

এগারোটা বাজল। আম্মা রেডি আব্বাকে কি কি বলবে আমার নামে।

আমিও রেডি।

আব্বা আসল। আমাকে বাসার সামনে দেখে ভ্রু কুঁচকে গেল।

–কী ব্যাপার? তুই এখানে কেন?

এবার আমি ভ্যাঁ করে কেঁদে দিলাম।

আব্বা একেবারে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। আমার হাত ধরে বাসায় নিয়ে গেল।

উনারে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে নাই। কিন্তু গলগল গলগল করে কথা বলতেছেন উনি। উনি মানে আমার আম্মা। কথা মানে কৈফিয়ত। কেন আমারে বাসায় ঢুকতে দেয় নাই সেই কৈফিয়ত।

আম্মার কথা হইল, সন্ধ্যা পড়ে যাবার পরেও আমি কেন বাসায় ঢুকলাম না? কেন আমি নারগিসের বাসাতেই বসে আছি? পড়াশোনা না করে কেন সময় নষ্ট করতেছি?

আব্বা বলল, সন্ধ্যার আগে কেন বাসায় আসে নাই, এইজন্য রাত পর্যন্ত ওরে বাইরে দাঁড় করায়ে রাখবা? এতক্ষণ ওর সময় নষ্ট করছে কে?

আমি বললাম, দাঁড় করায় নাই। বলছে বাসা থেকে বের হয়ে যাইতে। যেদিকে দুই চোখ যায় চলে যাইতে।

আব্বা কড়া চোখে আম্মার দিকে তাকালেন। আম্মা কড়া চোখে আমার দিকে। যেন আমি আম্মার চিরশত্রু!

আব্বা আমার হাতের বই দুইটা নিলেন। উল্টে পাল্টে দেখলেন। পালামৌ বইয়ের পেছনে বিশ্বসাহিত্যের স্টিকারে আমার নাম লেখা—রোকসানা পারভীন। সদস্য নং ৫৩১।

নূরনবী বইয়ের পেছনেও একই স্টিকার। লেখা—নারগিস হুসেইন। সদস্য নং ৫৩০।

আব্বা আমার দিকে তাকালেন।

বললেন, ওর বই আনছো কেন?

আমি বললাম, আমারটা পড়া শেষ। তাই ভাবছি ওরটাও পড়ে ফেলি।

আব্বা যে খুশি হইলেন তা না বললেও চলে। আম্মার দিকে এমন রাগী রাগী চোখে তাকালেন যে খুশিতে আমার একটা লাফ দিতে মন চাইল।

রুমে এসে আমার ডায়েরিটা বের করলাম।

কত কিছু লেখা!

প্রিয় বই, প্রিয় লেখক, প্রিয় রং, সবচেয়ে বন্ধু, সবচেয়ে শত্রু।

শত্রুর ঘরটা খালি। বন্ধুর ঘরে লেখা নারগিস। সেটা কেটে দিলাম। লিখলাম, নারগিসের আম্মা।

আর শত্রুর ঘরে লিখলাম—আমার আম্মা। সাথে একটা ভেংচির ইমো।

সেই রাত থেকে আমার আম্মার সাথে আমার চরম শত্রুতা শুরু হইল।

(কিস্তি ৪)

About Author

পারমিতা হিম
পারমিতা হিম

লেখক ও সাংবাদিক; এখন সময় টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশে কর্মরত।