নারগিস (৪)

আগের কিস্তি প্রথম কিস্তি

১৩.
নারগিসের সাথে আমার পরিচয় ক্লাস ফোরে। আমি কে.জি.থেকে ওই স্কুলে পড়ি। ও আসে অন্য স্কুল থেকে। ও আসার আগ  পর্যন্ত আমাদের স্কুলজীবন ছিল খুবই সহজ সরল। ছেলে-মেয়ে পাশাপাশি বসতাম,খেলতাম,মারামারি করতাম। ছেলেরা মেয়েদের ঝুঁটি ধরে টান দিত। বেণি খুলে গেলে মেয়েরা ভ্যাঁ করে কানতো। ছেলেদের জিপার আটকে গেলে মেয়েরা চুলের ক্লিপ দিয়ে খুলে দেয়ার চেষ্টা করত।

আমাদের এ সহজ সরল স্কুলজীবন বদলে গেল ক্লাস ফোরে। নারগিস আসল। পেছনের দিকে রোল এই রকম কয়েকটা মেয়ে মিলে সবসময় শেষ সারিতে বসা শুরু করল। টিচার পড়াইত, ওরা তখন নেইল পলিশ দিত, পাউডার দিত বসে বসে। জীবনে কখনো কোন পড়া পারত বলে আমার মনে পড়ে না। পুরা ক্লাসে টিচার ওদের দাঁড় করায়ে রাখত। তাতে যেন ওরা আরো বেশি খুশি! মাঝে মাঝে এতটাই বিরক্ত করত যে ওদেরকে ক্লাসের বাইরে কান ধরে দাঁড় করায়ে রাখতো রাগী টিচাররা। আর ওরা! ওরা তো আরো উৎফুল্ল হইত তাতে!

আমি ছিলাম ফার্স্ট গার্ল। আর নারগিস লাস্ট। আমি ক্লাস ক্যাপ্টেন। প্রত্যেক ঘণ্টায় ঘণ্টায় কথা বলার জন্য নাম লিখতাম। সব সময়ই আমার তালিকায় প্রথম নামটা থাকত ‘নারগিস’। প্রত্যেক পিরিয়ডে টিচার আসত। লিস্ট দেখত—কে কে কথা বলছে। এরপর স্কেল দিয়ে দুইটা করে বাড়ি মারত।

স্কেলের বাড়ি ওর কাছে কিচ্ছু না। ওর মনে আঁচড়ই লাগত না এইসবে।

আমার আড়ালে ও আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। বলত—মাথায় তেল দিয়ে স্কুলে আসে! সিদ্ধ ডিম নিয়ে আসে টিফিনে! হে হে!

এইগুলা তো তেমন কিছুই না। কিন্তু কতগুলা আচরণ সত্যি অসহ্য ছিল। যেমন- আমাদের ক্লাসের ছেলেগুলা হঠাৎ উদ্ভট আচরণ শুরু করল। ছেলে-মেয়েরা আর একসাথে বসত না। আস্তে আস্তে একই সারিতে বসাও বন্ধ হয়ে গেল। ছেলেরা এক সারিতে আর মেয়েরা এক সারিতে বসত। টিফিনের সময় আমাদের বোম্বাই ফাইট খেলাও বন্ধ হয়ে গেল। মেয়েরা মাঠে বসে টিফিন খাইত, গল্প করত আর ছেলেদের খেলা দেখত।

ছেলেদের খেলার ধরনটাও বদলে গেল। আগে তো সবাই মিলে হাডুডু-কাবাডি খেলতে খেলতে শার্টের বোতাম ছিঁড়ে ফেলা একদম সাধারণ ব্যাপার ছিল। আর নারগিস আসার পর একটা মেয়ে একটা ছেলের গায়ে হাত দিবে—ভাবাই গেল না।

ছেলেদের চালচলন আচার ব্যবহার বদলে গেল। কেমন যেন একটা ভাব করত ওরা—যেন মেয়েরা খুব তুচ্ছ প্রাণী। মেয়েদের আশেপাশে থাকলে জাত চলে যাবে। মেয়েদের সাথে খেললে বীরত্ব কমে যাবে ছেলেদের! নারগিস আর তার সখীরাও কেমন একটা দূরত্ব দূরত্ব ভাব করত। সব মিলায়ে আমাদের ক্লাস ফোর বদলে গেল একদম।

ক্লাসের কোন মেয়ে কিভাবে চুল বাঁধে, টিফিনে কি নিয়ে আসে, কার বই একদম ছিঁড়েবিড়ে গেছে, কার ব্যাগ ওল্ড মডেল এইসব আলোচনা চলত ক্লাসে। এমনকি একদিন ওকে লিপিস্টিক লাগাতেও দেখে ফেললাম আমি। আর সেদিনই টিচারকে নালিশ করে ভীষণ বকা খাওয়ালাম।

নারগিস পোশাকের ব্যাপারে খুব বেশি সচেতন ছিল। এমন একটা ভাব যেন ক্লাস নাইনে পড়ে! চুলের স্টাইল, হাত পা নাড়া সব বড় মেয়েদের মত। এমনকি স্কুলের এসেম্বলিতেও কেমন একটা ঢং করত। ছেলেরা দেখতাম কেমন যেন নার্ভাস হয়ে যাইত ওর সামনে।

নারগিসকে তাই ভালভাবে নিতে পারি নাই আমি। রীতিমত ঘৃণাই করতাম ওকে।

ক্লাস ফাইভের শেষ দিকে তখন আমরা। আমাদের যম ছিল সমাজ টিচার। টিচারটা আর্মি টাইপের কড়া। ওই ক্লাসে বই না নিয়ে আসবে—এমন বুকের পাটা কারো নাই। মহিলা ছয় ফুট লম্বা। তার উপর ইয়া বড় তার বুকের ছাতি। ভীষণ কর্কশ কণ্ঠস্বর। সে হুংকার দিলে আমাদের কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে যায়।

সমাজ ক্লাস একদম শেষের ঘণ্টায়। কারণ ওই শেষ ঘণ্টায় কিছুতেই আমাদেরকে ক্লাসে রাখা যায় না। আমরা এত চেঁচামেচি করতাম যে অন্য ক্লাসেরও বারোটা বেজে যাইত। এরই সমাধান হিসেবে আর্মি ম্যাডাম শেষ ঘণ্টায় আমাদের সমাজ ক্লাস নিতো। তার ফলাফল—পুরো ক্লাসে পিনপতন নীরবতা! ওই আর্মির সবচেয়ে অপছন্দের ছাত্রী- নারগিস।

নারগিসও এই টিচারকে দুই চোখে দেখতে পারত না। উনি পড়া ধরতো আর গালের ব্রণ খুঁটতো। বিষয়টা নারগিস ঘৃণা করত। ও ডাকত—ব্রণ চাষী ম্যাডাম!

আর ব্রণ চাষী টিচারও ওকে খুব অপমান করতো সবসময়।

এই যমের ক্লাসেই নারগিস একদিন বই আনতে ভুলে গেল। বই আনতে ভুলে গেছে ভালো কথা। পড়াটাও তো শিখে আসে নাই! তার সখীদেরও কেউ সেদিন আসে নাই। সুতরাং আমার কাছেই আসতে হল ওকে। সেটাই আমাদের প্রথম কথা।

বলল, এই তুমি সমাজ বই আনছো?

আমি বললাম, হ্যাঁ, আমি তো স্কুলে পড়ালেখা করতে আসি। ঢং করতে না।

নারগিস গায়েই মাখল না। বলল, আমাকে একটু দাও তো। পড়াটা শিখে রাখি। টিফিনের সময় দিয়ে দেব।

আমি দিলাম। কিন্তু টিফিন পিরিয়ডে ও ফেরত দিল না। আমিও বেমালুম ভুলে গেলাম।

মনে পড়ল সমাজ ক্লাসেই। টিচার যখন বলল,সবাই বাড়ির কাজ আর বই বের কর। আমার তো মাথায় হাত। বাড়ির কাজ আনছি,বই তো নারগিস দেয় নাই! আমি প্রথম সারিতে আর নারগিস শেষের সারিতে বসা। আমি ভাবলাম ও হয়ত এখনই আমাকে বইটা দিয়ে দিবে।

টিচার বলল, কারা কারা বাড়ির কাজ আনো নাই, দাঁড়াও।

নারগিস মুখ শুকনা করে দাঁড়াল।

টিচার খুবই রুঢ় একটা ভঙ্গি করল ওর দিকে তাকায়ে। বলল, বই আনো নি কারা কারা দাঁড়াও।

আমার মনে হল, নারগিস বাড়ির কাজ করে নাই, বই আনে নাই, পড়াটাও তো পারলে শিখে নাই—ওরে আজকে টিচার মেরেই ফেলবে! তার চেয়ে বইটা ওর কাছেই থাক!

আমি দাঁড়ালাম। তখন পুরো ক্লাস অবাক।

টিচারও অবাক।

বলল, রোকসানা তুমি বই আনো নাই!

আমি কিছুই না বলে মাথা নিচু করে থাকলাম। কারণ আমার ধারণা ছিল নারগিস তখনই আমার বই দিয়ে দিবে। অবাক করা বিষয় যে,ও বই দিল না। কিছু বললও না।

পুরোটা ক্লাস আমি দাঁড়ায়ে থাকলাম।

ক্লাস শেষে সবাই যখন ব্যাগ নিয়ে দৌড়ানোতে ব্যস্ত তখনও আমি অপেক্ষা করতেছিলাম নারগিসের জন্য।

ও এসে বলল, তুমি পুরো ক্লাস দাঁড়ায়ে থাকলা কেন? আমি খুব অবাক হইছি। বলতেই পারতা টিচারকে!

আমি বললাম, তাহলে তোমাকে আরো অপমান করত। দেখো না তোমাকে পছন্দ করে না। আমাকে তো শুধু দাঁড় করাল।

ও বলল, তোমাকে অন্য রকম ভাবতাম। তুমি তো অনেক ভাল মেয়ে।

আমি হাসলাম। সেও হাসল। ওর চোখে কৃতজ্ঞতা।

এরপর ক্লাস ফাইভ শেষ। ভাল হাই স্কুলে ভর্তির প্রতিযোগিতা। কে কোথায় কিছুই জানি না। আমি খুব ভাল স্কুলে চান্স পেলাম। সেখানেই ভর্তি হলাম। গার্লস স্কুল। কোনো ছেলে নাই।

১৪.
জানুয়ারি মাসে স্কুলে ভর্তি হইছি। মার্চ মাসে দেখি একটা স্কুলড্রেস পরা মেয়ে হাতে একটা ফ্লাক্স নিয়ে মাঠ পার হয়ে আসতেছে। আমার চোয়াল ঝুলে পড়ল। নারগিস! ও এই স্কুলে ভর্তি হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।

আমাকে দেখেই ও হাত মুঠো আর চোয়াল শক্ত করে ফেলল।

প্রথম কথা আমিই বললাম, আরে তুমি এখানে? কেমনে?

ও বলল, তুমি এখানে! খাইছে রে! আগে বল তুমি কোন সেকশন? এ, বি না সি?

আমি বললাম, এ।

ও খুব হতাশ হল। বলল, ও আচ্ছা। আমি তোমার ক্লাসেই।

আমি বললাম, এতদিন কোথায় ছিলা? কিছুই তো বুঝলাম না।

ও হাল ছেড়ে দেয়ার ভঙ্গি করল। বলল, দেখো, সরাসরি বলি। কাউকে বলে বেড়াবা না। আমি টিকি নাই এখানে। তবে ফ্রি ফ্রি ভর্তিও হই নাই। একটা মোবাইল সেট দেওয়া লাগছে—ঘুষ!

আমার চোয়াল ঝুলে পড়ল। দীর্ঘ একমাস কনকনে শীতের মধ্যে পড়ালেখা করে, সবাই যখন পরীক্ষা শেষে ঘুরে বেড়াইছে, সন্ধ্যাবেলা আলিফ লায়লা দেখে সময় কাটাইছে, আমি তখন পড়ছি পড়ছি আর পড়ছি। আর আমি যেই স্কুলে ভর্তি হইলাম, একটা মোবাইল সেটের বিনিময়ে ও সেই একই স্কুলে ভর্তি হইল?

নারগিস যেন মনের কথাটা ধরতে পারল। বলল, কী ভাবো? হাহাহহা। হ্যাঁ, তোমার পড়ালেখার চাইতে মোবাইলের মূল্য বেশি। তবে ওই ব্যাটাকে ছাড়ব না।

সেদিন থেকে আমি নারগিসের পিছনে লেগে থাকলাম। কারণ এটা কোন ব্যাটা আমিও দেখতে চাই। আমিও ছাড়তে চাই না তাকে।

ক্লাসে গিয়ে নারগিস নাম লেখাল। ওর রোল হল ১০১। কারণ এর আগে একশজন ভর্তি হইছে। আমি তখন ওই ক্লাসের ক্লাস ক্যাপ্টেন। অবশ্য আরো চারজন ক্যাপ্টেন আছে। প্রত্যেকের কাজ আলাদা। নারগিসকে আমাদের ছয় নম্বর ক্যাপ্টেন করা হল আমার সুপারিশে। ওর কাজ একটাই। ক্লাসে উপস্থিত অনুপস্থিতের হিসেব রাখা। আর সে অনুযায়ী টিফিন টাইমে টিফিন রুম থেকে খাবার নিয়ে আসা।

এই এক কাজ করতে গিয়ে সে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে গেল। ক্লাসে যদি পঞ্চাশ জন আসে, সে লিখে দেয় পঁয়ষট্টি জন। আর বাড়তি পনেরজনের টিফিন সে একা খায় না! যার যার খুশি সে বাড়তি নিতে পারে। তার এই অভূতপূর্ব ব্যবস্থায় সবাই একেবারে মজে গেল। আর তুমুল জনপ্রিয় হল নারগিস। ওর অনেক বান্ধবী হল। এমনকি বাসেও দেখতাম ওকে সবসময় একপাল মেয়ে ঘিরে থাকে।

আমিও মিশতাম ওর সাথে। খুব একটা পাত্তা পাইতাম না অবশ্য। আমি শুধু এটুকুই জানতে চাইতাম একটা মোবাইলের বিনিময়ে কে ওকে এই স্কুলে ভর্তি করল।

সেই ক্লাসের প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় আরেক অভূতপূর্ব কাণ্ড ঘটাল ও। সব বিষয়ে পাশ করে, গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে ফেল করে বসে থাকল। আর সব ক্লাসের মেয়েরা ওকে দেখতে আমাদের ক্লাসে ভিড় জমাল। কেউ গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে ফেল করতে পারে, এরকম ঘটনা আমাদের স্কুলে কেন কোন স্কুলেই কেউ কখনো ভাবেও নাই, করেও নাই। সুতরাং পুরো স্কুলে এটা নিয়ে শোরগোল পড়ে গেল। হাসাহাসিও কম হইল না। তবে নারগিসকে এইটা নিয়ে খুব একটা খুশি মনে হল না। আবার কান্নাকাটিও করল না সে।

আমাদের স্কুলের খুব কড়া নিয়ম। খাতা নিয়ে যেতে হবে বাসায়। অভিভাবকের স্বাক্ষর নিয়ে তারপর আবার জমা দিতে হবে টিচারের কাছে। যেদিন গার্হস্থ্য অর্থনীতির খাতা দিল সেদিন দেখলাম নারগিস খাতাটা ব্যাগে ঢোকাল না। হাতে নিয়েই চলল। বাড়ি ফেরার সময় স্কুলবাসে উঠেই খাতাটাকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলল প্রথমে। বাসের সবাই তাকে জিজ্ঞেস করল—এটা কি গার্হস্থ্য খাতা?

ও যেন আরো রেগে গেল। খাতাটাকে ঝালমুড়িওয়ালাদের ঠোঙার মত ভাঁজ করে সুর করে বলল, অ্যাইই ঝালমুড়ি, কে খাবে, কে খাবে? অ্যাইইই ঝালমুড়ি।

আমি বুঝলাম বেচারার খুব অপমান লাগতেছে। আমি ওর কাছে গিয়ে বললাম, খাতাটা এইভাবে ভাঁজ কইরো না। তুমি কি পাগল হয়ে গেছ নাকি? কালকে এইটা জমা দিবা না?

ও আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যে আমি আর কিছু বলার সাহস পাইলাম না।

কিন্তু পরদিন বিধি বাম। স্কুলে যাবার পথে কী যে হল, ঠেলাঠেলিতে আমার সালোয়ারের ফিতা গেল খুলে। আর পুরা রাস্তা আমি বিষয়টা টের পাই নাই। বাস থেকে নামার জন্য যেই দাঁড়ালাম, সেই সবার সামনেই সুরসুর করে আমার সালোয়ার নিচে নেমে গেল। আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। আশেপাশের মেয়েরা হো হো হো করে হাসাহাসি শুরু করল। এমন সময় নারগিস আগায়ে আসল। সবাইকে এমন ধমক দিল যে সিনিয়র আর ক্লাসমেটরা সবাই চুপ হয়ে গেল।

আর নারগিস আমার সামনে দাঁড়ায়ে হুংকার দিল—সবাই ওকে ঘিরে দাঁড়াও।

সবাই আমাকে ঘিরে দাঁড়ালো। আমি সালোয়ারের ফিতা বেঁধে নিলাম।

সেইদিনই গার্হস্থ্য অর্থনীতি খাতা আমাকে জমা নিতে বলল টিচার। সবারটার সাথে সাথে নারগিসের ঝালমুড়ির ঠোঙা বানানো খাতাটাও নিলাম। আর সব খাতার মাঝে এমনভাবে ঢুকায়ে দিলাম যেন কিছুতেই টিচারের চোখে না পড়ে। নারগিস হাসল। আমিও হাসলাম। আর আমাদের মধ্যে নীরবে একটা বোঝাপড়া হয়ে গেল।

তবে এক সাবজেক্টে পাশ মার্ক তুলতে না পারায়, প্রথম সাময়িকের রেজাল্টের পরে নারগিসের নাম ছয় নম্বর ক্যাপ্টেন থেকে বাদ গেল। অন্য আরেক মেয়ে এসে টিফিন ক্যাপ্টেন হল। কিন্তু নারগিসের চালু করা বাড়তি টিফিনের সংস্কৃতি চালু থাকল। বহাল থাকল তার তুমুল জনপ্রিয়তা।

অবশ্য, নারগিস শুধু এই একবার না, এরপরেও অনেকবার ফেল করছে। যে টিচার ক্লাস সিক্সে আমাদের গার্হস্থ্য অর্থনীতি পড়াইতেন, তিনিই ক্লাস সেভেনে সমাজ পড়াইতেন। আর সেভেনে প্রথম আর দ্বিতীয় সাময়িকে সমাজে ফেল করে নারগিস। ফাইনাল পরীক্ষায় সমাজে টেনেটুনে ৩৩ পেয়ে ক্লাস এইট শুরু করে।

অবশ্য নাম্বার কম পাওয়ার পেছনে ওর মেধার চাইতে ঘাউরামির অবদান বেশি। সে গার্হস্থ্য ব্যবহারিক পরীক্ষায় আসত না। ২৫ নম্বরের ব্যবহারিক কি কম! অথচ সে পরীক্ষা কঠিন কিছুই না। চাঁদা দাও, রুমাল কিনে বা বানায়ে টিচারকে দাও (জীবনেও ফেরত পাবে না), আর প্র্যাকটিকালের দিন উপস্থিত থেকে বিরিয়ানি খাওয়ায় অংশ নাও। ওই অতটুকু কষ্টই করবে না নারগিস।

সে চাঁদার টাকা দিবে। কিন্তু বিরিয়ানি খেতে আসবে না। অতএব, ব্যবহারিকে অনুপস্থিত থাকার কারণে তার ২৫ নম্বর কাটা যেত প্রতিবার। শুধু কি তাই! কোনদিন কোন পরীক্ষায় রচনা লেখে না নারগিস। তার নাকি ওসব ফালতু লাগে! ভাবসম্প্রসারণ জীবনেও লেখে না। লেখে সারাংশ আর অনুবাদ। নম্বর কম পাবে—পাক! তবু বিরক্তিকর কাজ সে করবে না। ধর্ম পরীক্ষায় প্রশ্নের উত্তরের মাঝখানে গানের লাইন লিখে দিয়ে আসে। কারণ সবাই জানে, আমাদের ধর্ম টিচার, আমাদের হুজুর স্যার পৃষ্ঠা গুণে নাম্বার দেন। কোনদিন এক লাইনও পড়েন না।

নারগিস যতই ফেল করে, আমার আকর্ষণও ততই বাড়ে। ও পরীক্ষায় রচনা না লিখে, ভুয়া ব্যবহারিক পরীক্ষায় না এসে যত বেশি উদ্ধত আচরণ করে—আমি ততই ওকে পছন্দ করতে শুরু করি। এই যে ধর্ম পরীক্ষার খাতায় বাংলা সিনেমার গান লিখে আসা—রীতিমত হিরো বানায়ে দেয় ওকে আমার চোখে। যত এসব ঘটে, তত ওর কাছে ঘেঁষতে থাকি। পৃথিবীর কোন কিছু আমাকে এত মুগ্ধ করে নাই যতটা এই মেয়েটা করে। ওকে আমার খুব মজার একটা বই মনে হয়। মনে হয় প্রতিটা পৃষ্ঠা প্রতিটা শব্দ ভালো করে পড়ি।

এইভাবে ধীরে ধীরে নারগিসের সাথে আমার এত বন্ধুত্ব।

কিন্তু নারগিস আমার ডায়েরি দেখে ক্ষেপে গেল।

বলল, কীরে, আমি তোর সবচেয়ে প্রিয় না? আমার আম্মা প্রিয়?

আমি ঢোক গিলে বললাম, হ্যাঁ, কারণ আমি ভেবে দেখলাম যে তোকে জন্ম দিছে সে বেশি প্রিয় হওয়া উচিৎ।

নারগিস কনভিন্সড হয় না।

বলল, সবচেয়ে শত্রু তোর মা? কেন রে?

আমি চুপ করে থাকলাম।

ও বলল, থাক আর বলতে হবে না। আমি বুঝছি।

আমার বুকটা ধ্বক করে উঠল। তার মানে কী আন্টি সব ওকে বলে দিছে!ও এতদিন আমার সাথে রাসেল ভাইয়ের বিষয়টা নিয়ে কিছু না বলে আছে?

নারগিস নিজেই বলে উঠল, তোর মা আমার মাকে পছন্দ করে না, তাই না? আজেবাজে কথা বলে? তাই তুই শত্রু বানায়ে দিলি!

নারগিসকে কেমন অসহায় দেখায়।

আমি জিজ্ঞেস করি, কিন্তু তোর মায়ের মত ভালো মা আমি তো জীবনেও দেখি নাই। তুই কেন লিখলি তোর সবচেয়ে শত্রু তোর মা?

আমি নিঃসঙ্কোচে বললাম। কারণ সত্যি ওর মাকে শত্রু ভাবার কোনো কারণ আমি দেখি না।

নারগিস বলল, দেখ আমার মায়ের জন্য আমি কোথাও পাত্তা পাই না। প্রদীপের তলায় অন্ধকার—বলে না সবাই? কোথাও গেলে আমার বয়েসী ছেলেরা পর্যন্ত আমার দিকে না তাকায়ে আম্মার দিকে তাকায়ে থাকে! আমার খুব খারাপ লাগে। যে কোন জায়গা, যে কোন অনুষ্ঠান, যে কোন বিয়ে—সেন্টার হইল আম্মা। আমি কিচ্ছু না। উনার জন্য আমি কারো নজরে নাই, কারো কাছে কিচ্ছু না।

নারগিসের চোখে অনেক হতাশা, অনেক দুঃখ। তার বান্ধবীর সবচেয়ে প্রিয় মানুষের তালিকায়ও তার মায়ের নাম উঠে গেছে, নিজের নাম বাদ গেছে।

নারগিস বলল, কিন্তু একটা প্রবলেম আছে রে।

আমি বললাম, কী প্রবলেম?

নারগিস বলল, দেখ, ফ্রয়েড কী বলছে জানিস? আমাদের বয়েসী মেয়েরা নাকি মায়েদের দেখতেই পারে না। ঘৃণা করে। আমরা তো ওই পথেই হাঁটতেছি রে! ফ্রয়েডের পথে হাঁটা যাবে নারে। ওর পাল্লায় পড়া যাবে না।

আমি বললাম, কেন? ফ্রয়েডের পথে হাঁটলে কী সমস্যা?

নারগিস বলল, আরে ফ্রয়েড তো খালি সেক্স আর সেক্স। ননসেন্স ইডিয়ট একটা। ওর চক্করে পড়া যাবে না।

আমি বললাম, সেই ভালো। তাহলে তুই তোর মাকে ভালোবাসা শুরু কর। আমি আমার মাকে ভালোবাসা শুরু করি।

বলেই বুঝলাম আমার পক্ষে সেটা কখনোই সম্ভব না। নারগিসও অসহায়ভাবে আমার দিকে তাকাল।

১৫.
আমাদের পাশের এলাকায় একটা নার্স কোয়ার্টার ছিল। আমি আর নারগিস প্রায়ই সেখানে বেড়াতে যেতাম। সেখানে বলতে তার পাশের এক আবাসিক এলাকায়। সেই আবাসিক এলাকা ছিল পাহাড়ের ওপর। ঘুরে বেড়াতে বেশ মজাই লাগত। তার উপর সেটা চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকাগুলোর একটা। আমরা সেখানে অলিতে গলিতে হাঁটতাম আর যেই যেই বাড়ি পছন্দ হত সে বাড়িতে বেল বাজাতাম। কেউ খুললে একটা আনকমন নাম বলে দিতাম, যেমন, স্পর্শ আছে? এটা কি তিতলীদের বাসা?

চট্টগ্রামের বেশির ভাগ বড়লোকের পোলাপানের নাম হয় আরবি, নাহয় ফারসি। যেমন, আবিয়াজ, মারিয়াম, সাইমুম। সুতরাং এইসব নামের লোকজন থাকার প্রশ্নই ওঠে না!

‘না’ শোনার পরেই আমরা বলতাম, এক গ্লাস পানি হবে?

আমরা দেখতে যথেষ্ট অভিজাত আর ভদ্র। সুতরাং কে ভাববে এটা আমাদের নাটক! বেশির ভাগ বাসাতেই আমাদেরকে ড্রইং রুমে বসতে বলত। এক গ্লাস পানি আনা আর সেইটা খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আমরা এসব বড়লোকদের ড্রইংরুম দেখে নিতাম। যারা ড্রইংরুমে ঢুকতে দিত না, দরজার বাইরেই দাঁড় করিয়ে পানি খেতে দিত তাদের জন্য ছিল কঠিন শাস্তি। পরদিন তাদের ফ্ল্যাটে বেল দিয়ে রুদ্ধশ্বাসে দৌড় দিতাম।

রাসেল ভাইয়ের সাথে নারগিসের প্রেম হওয়ার আগে এসব ছিল আমাদের রোজকার রুটিন । মাঝখানে আমি একেবারে একা হয়ে গেছিলাম। এখন আবার নারগিসের বাসায় আমার যাওয়া নিষেধ। তো আমরা আবার এই ড্রইং রুমে উঁকি মারা ভ্রমণ শুরু করলাম।

এই রকম একদিন বিকেলে এক বাসায় গেলাম। বললাম, রিমঝিম আছে? জানা উত্তরটাই ভেসে এল, না, এটা তো তাদের বাসা না।

আমরা পানি খেতে চাওয়ার আগেই ভেতর থেকে এক নারীকণ্ঠ বলল, আরে কালকে না তোমরা ২ নম্বর রোডে উৎপলকে খুঁজতে গেছিলা?

আমরা পড়লাম মহাবিপদে! প্রতিদিন এত নাম আমরা ব্যবহার করি যে এসব স্মৃতিতে থাকার কারণ নাই। আমি আর নারগিস দুজন দুজনের দিকে ’খাইছি ধরা’ টাইপ চেহারা করে তাকায়ে থাকলাম। আমাদের দুজনের চেহারাতেই কী যেন ছিল, এক পলক তাকায়েই আমরা দুইজনে ভোঁ দৌড় দিলাম। এক দৌড়ে ওয়ার সিমেট্রির সামনে। সেখানে ঘাসের উপরে বসে বসে অট্টহাসি হাসতেছি। এমন সময় এক মহিলা এসে হাজির। আমাদের জিজ্ঞাসা করল, কই থাকো? নাম কী?

আমরা নাম বললাম। ঠিকানা বললাম।

মহিলাটি বলল, তোমাদেরকে প্রায়ই এই এলাকায় দেখি। বেশ ঘোরাঘুরি করো। বাসা এখানে?

আমি আর নারগিস একজন আরেকজনের দিকে তাকায়ে থাকলাম। এ মহিলার কি উদ্দেশ্য কে জানে!

আমরা আমাদের নাম পরিচয় ঠিকানা বললাম।

নারগিস স্পষ্টভাবে বলল, এ এলাকায় আমাদের স্কুলের অনেকে থাকে। আমরাও কাছেই থাকি।

মহিলার কিছু সন্দেহ হইল কিনা বোঝা গেল না। সে এসে আমাদের পাশে ঘাসের উপর শুয়ে পড়ল।

নারগিস ভ্রু কুঁচকে তাকায়ে থাকল। আমাকে ইশারাও করল।

আমিও অবাকই হলাম। এ রকম বড়সড় একটা মেয়ে এইভাবে পাবলিক প্লেসে শুয়ে আছে! তার কোনো সংকোচ আছে বলে তো মনে হয় না! তার চেয়েও বড় কথা এইরকম ঘাসের উপর শুয়ে থাকার মানে এই মেয়ে নারীবাদী। নিজেকে ছাড়া আর কোনো নারীবাদী মেয়েকে নারগিসের পছন্দ হয় না। সে এরকম মেয়ের সাথে মেশে না। এই মহিলা দেখতে ভালো। নারগিস ওর চেয়ে বা ওর মত সুন্দর মেয়েদের সাথেও মেশে না। অহেতুক ঝাড়ি মারে সুন্দরীদের।

মহিলা হঠাৎ বলে উঠল, আমি নার্সিং পড়তেছি। ওইপাশে আমাদের কোয়ার্টার। ওখানেও বেড়াতে আসতে পারো তোমরা।

নারগিস বলল, কেন?

মহিলা বলল, কেন মানে? বেড়াতে! চলো আজকেই যাই।

নারগিস বলল, চলেন!

ব্যাপারটা আমার একটুও পছন্দ হইল না। চিনি না, জানি না, কোত্থেকে আইসা বলে, চলেন! আর নারগিসও সুড় সুড় করে যেতে রাজি হইল! নারগিসের মন পড়তে পারতেছি না আমি। হঠাৎ এই মহিলার সাথে কী!

যেতে যেতে কথা হল তার সাথে। ওর নাম নোভা। বাড়ি ময়মনসিংহ। নার্সিং কলেজে পড়ে। ফার্স্ট ইয়ার। যেতে যেতে আরেকটা বিষয় খেয়াল করলাম। পথে যত চলন্ত গাড়ি, থেমে থাকা গাড়ি, দোকানের কাঁচ বা আয়না জাতীয় কিছু পড়ে, ততবারই নোভা নিজের চেহারা একটু দেখে নেয়। দোকানের সামনে থেমে যায়। পথের গাড়ি দেখলে আস্তে আস্তে চলে। আমি খুবই অবাক হয়ে গেলাম! নিজের চেহারা এত দেখার কী আছে!

কথাটা বলল নারগিস।

–কীরে ভাই, আপনি হাতে আয়না নিয়া হাঁটলেই পারেন!

নোভা মুচকি হাসল। একটুও বিব্রত হল না।

দুপাশের চুলে হাত বুলায়ে বলল, দেখলাম, হেয়ারস্টাইল ঠিক আছে কিনা।

নার্স হোস্টেলের সামনে গিয়েই বুঝে গেলাম এ জায়গা আমাদের পছন্দ হবে। তবে সমস্যা হল একপাশের বক্স সাইজের ঘরে সারাক্ষণ দণ্ডায়মান দারোয়ান।

নোভা বলল, শুনো, দারোয়ান চোখে দেখে না। শুধু মেয়ে না ছেলে এতটুকু বুঝে। মেয়ে ঢুকলেই হল।

নোভার ধারণা একেবারেই ভুল। যখনই আমরা ঢুকতে গেলাম দারোয়ান পুরানো চেয়ারের মত ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে উঠল।

—ওই এইগুলা কে যায়? এতগুলা কী যায়? কই যায়?

নোভা নাক মুখ কুঁচকায়ে ফেলল। বলল, ওরা ফুল নিতে আইছে। হিন্দু। পূজায় দিবে।

বলতে বলতে আমরা হোস্টেলে ঢুকে পড়লাম।

আমি তো ঘোর আপত্তি জানালাম, তওবা তওবা। কে হিন্দু? আমরা দুইজনেই মুসলমান। কেন হইতে যাব হিন্দু?

নারগিস বলল, জ্বি না, আমি সেক্যুলার। নাস্তিক। হিন্দু কইলে কী হইছে?

নোভা বলল, আমি তো হিন্দু। বলেই হাসল ও।

নারগিস আমার দিকে চোখ টাটানি দিল। আমি তো লজ্জায় মরে গেলাম!

(কিস্তি ৫)

About Author

পারমিতা হিম
পারমিতা হিম

লেখক ও সাংবাদিক; এখন সময় টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশে কর্মরত।