নারগিস (৫)

আগের কিস্তি প্রথম কিস্তি

১৬.
নার্সিং হোস্টেলটা সত্যিই খুব সুন্দর জায়গা। আমাদের এত পছন্দ হইল বলার মত না। চারদিকে অনেক গাছপালা। বিরাট সবুজ মাঠ। মাঠের এদিক ওদিক মেয়েরা শুয়ে বসে আছে। একটা কুয়াও আছে। কুয়ায় জন্মের ময়লা। তার মধ্যেই শাপলা ফুল। আর এইসবের মাঝখানে একটা সাদা মলিন দালান। ওইটাই ওদের থাকার জায়গা। ওই দালানে শত শত কাপড় মেলে দেওয়া। বেশিরভাগই অন্তর্বাস। মানুষের যে এত আজব কিসিমের এবং আজব রঙের অন্তর্বাস থাকতে পারে এই হোস্টেল না থাকলে আমি জানতেই পারতাম না।

নারগিস জিজ্ঞাসা করল, ওই, তোমাদের কয়টা করে আন্ডারওয়্যার?

নোভা হাসল, হে হে হে।

নারগিস বলল, বমি আসতেছে তোমাদের হোস্টেল দেখে।

আমি সায় দিয়ে মাথা নাড়লাম।

নোভা বলল, অ্যাই, এইটা তোমার চামচা নাকি? ভাল চামচা তো! তোমার বমি পাইলে ওরও বমি পায়!

আমি আরেকবার মরে গেলাম অপমানের লজ্জায়।

নারগিস বলল, না। ও রোকসানা। ভালো মেয়ে। লেখাপড়ায় ভালো। সবকিছুতে ভালো। সকাল ছয়টায় ওঠে। ছয়টা দশে ব্রাশ করে। ছয়টা তিরিশে নাশতা করে। বাবা মায়ের কথা শোনে। আমরা এক স্কুলে পড়ি।

নোভা বলল, বাহ বাহ খুব ভাল। ওর জামাইও হবে এরকম। সকাল আটটায় উঠে ভাঁজ করা শার্ট পরবে। একটা ডিম দুইটা কলা খাবে। দশ মিনিট সেক্স করবে। এরপর বলবে যাই আমার টাইম শেষ।

হাসতে হাসতে একজন আরেকজনের গায়ে ঢলে পড়ল নারগিস আর নোভা। আমি লজ্জায় রাগে লাল হয়ে গেলাম। অনেকের সাথেই পরিচয় হল ওই হোস্টেলের। আর কিছুক্ষণ পরে বুঝলাম এরা এ রকমই। কমবেশি সবারই আলাপ ফিগার, সেক্স আর এইসব হাবিজাবি।

যাই হোক, নারগিস ওইখানেও তুমুল জনপ্রিয় হয়ে গেল। প্রথম দিনেই বুক নামায়ে উঠায়ে ‘চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়’ নাচ দেখালো ওদেরকে। ওদের ভাষা আর ভঙ্গির সাথে আমিও মানায়ে নিলাম।

ফেরার সময় সন্ধ্যা হয়ে গেল।

পথে আমি নারগিসকে জিজ্ঞেস করলাম, তোর লাভলুর কী খবর?

ও খুব ভালো মুডে ছিল। বলল, কেন? তোরও কি লাভলু দরকার?

আমি বমি আসার ভঙ্গি করলাম। মুখে বললাম, ইয়াক।

১৭.
এরপর আমাদের বিকেলের রুটিন পাল্টে গেল। আমরা আর মানুষের বাসায় বেল দেই না। শুয়ে থাকি নার্স কোয়ার্টারে। আরো অনেকেই থাকে। অনেকে মেয়ে সিগারেট খায় । যা মুখে আসে তাই বলে। নারগিসও ওদের সাথে ওসব কথায় যোগ দেয়। ও খুব ভালো সিগারেট টানতে পারে এখন। মুখ থেকে ধোঁয়া বের করে গোল গোল রিং বানায়।

আমিও একদিন টানার চেষ্টা করছিলাম। কাশতে কাশতে আমার এমন অবস্থা হল আর সবাই এমন হাসল যে আমি আর কোনোদিন ওই সাহস করি নাই। ওদের গল্প শোনা আর সিগারেট টানা দেখে দেখে আমার বিকাল ভালোই কেটে যায়।

অনেক কিছু আলোচনা হয় সেখানে। সবচেয়ে বেশি সেক্স। আর ছেলেদের নিয়ে আলোচনা। নোভা বেশ চটপটে মেয়ে। ও সবচেয়ে বেশি গল্প করে। আর নারগিস মাঝে মাঝে রসালো মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়। নোভাকে ও ডাকে ‘সেবিকা’। কেমন যেন খারাপ শোনায় ওই ডাক। নোভা অবশ্য হেসেই মরে।

নোভা মাঝে মাঝে বলে, বুঝছো নারগিস, আমি কিন্তু সেবিকা-টেবিকা হব না। আমার বাসায় থাকতে ইচ্ছা করে না। হোস্টেলে থাকলে অনেক স্বাধীনতা। তাই এইসব পড়ি।

নারগিস বলে, আমিও হোস্টেলে থাকব।বাসায় থাকব না।

আমি মনে মনে বলি, আমিও হোস্টেলে থাকব।

নোভা বলে, একটা সুন্দরমতন ডাক্তার ছেলে পটায়ে বিয়া করে ফেলতে পারলেই হল। ও ডাক্তারি করবে আর আমি পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকব। আমার অবশ্য এক জ্বালা। অনেক ডাক্তারের সাথেই তো লাইনঘাট হয়, কিন্তু একটাও তো হিন্দু না।

নারগিস বলে, আই ডোন্ট লাইক হিন্দু ছেলে। কেমন জানি লেডিস টাইপের সব। হাবাগোবা।

নোভা বলে, তোমার মাথা। দে আর সেলফিস। খুব সেলফিস। ছোটলোক। এক টাকা খরচ করলে দশ টাকা লাভ চায়। আচ্ছা নারগিস, তুমি কেমন ছেলে বিয়া করবা?

নারগিস হাসে আর হাসে। বলে, খুব বিশ্রী দেখতে। কাইল্যা। বাট্টু।

আমি মনে মনে লাভলুর চেহারা ভেবে বললাম, মুখভর্তি ব্রণ?

নারগিস চোখ দিয়ে আমাকে ধমকায়। আবার বলতে শুরু করে, দেখতে যাই হোক এক বাপের এক ছেলে হইতে হবে। অনেক টাকা পয়সা থাকবে। আর শান্ত শিষ্ট ভদ্র ছেলে, আমার কথায় উঠবে, আমার কথায় বসবে—এই রকম ছেলেই আমি বিয়া করব।

আমি মনে মনে ভাবি, একদম ডাহা মিথ্যা এইগুলা। নারগিস এমনিই বলল। এতটা বাজে কি নারগিস হতে পারে!একটা ড্যাশিং ছেলে ছাড়া নারগিস নিজেই কাউকে বিয়ে করতে পারবে না।

নোভা বলে, সবই বুঝলাম। কিন্তু বিশ্রীটা কেন? পাশে একটা কুৎসিত বানর নিয়ে ঘুমাবা নাকি? সকালে উঠে ওরকম মুখ দেখতে ইচ্ছা করবে তোমার?

নারগিস বলল, যাতে সারাজীবন হীনম্মন্য হয়ে থাকে। সুন্দরী বউয়ের পা টিপে বসে বসে।

দুজনে জোরে জোরে হাসে।

নারগিস বলে, নোভা আপু, চলো না একদিন মদ খাই। খুব ইচ্ছা করে।

নোভা বলে, স্বরস্বতী পূজায় আসো। দেশী বিদেশী সব পাবা।

কী, তুমিও আসবা?—আমাকে জিজ্ঞাসা করে নোভা।

আমি বলি, আসবো কিন্তু খেতে পারবো না। আমার বাসায় মাইরা ফেলবে।

ওরা দুজন আবারো হাসে। এমন সময় কে যেন একটা ‘মৌচাকে ঢিল’ নিয়ে আসে। ওরা প্রায়ই পড়ে এই ম্যাগাজিন। আরো কয়েকজন জুটে যায়। একজন বলে জোরে জোরে পড়ো। যে মেয়েটাকে পড়তে দেয়া হইছে ওর রিডিং তত ভালো না। মজা পাওয়া যায় না।

নারগিস হঠাৎ চেঁচায়, রোকসানারে দেন। রোকসানারে দেন।

আমি চমকে উঠি। আপত্তি জানাই।

ও বলে, আরে ক্লাসে তো ও সবসময় রিডিং পড়ে। ওই পড় তুই, পড়।

আমাকে জোর করে নারগিস। ক্লাসে বাংলা বই রিডিং পড়া আর এইসব অশ্লীল ভাবি-দেবর কাহিনী রিডিং পড়া কি এক হইল! কিন্তু আমি না বলতে পারি না নারগিসকে। পড়তে শুরু করি সেইসব গল্প।

বই খুবই বাজে আর নিম্নমানের লেখা। বেশিরভাগ লেখকের নিজের জীবনের পরকীয়ার কাহিনী। কখনো ভাবির সাথে কখনো কাজের মেয়ের সাথে। এমন সব ডিটেইল বর্ণনা যে পড়তে গিয়ে আমি লজ্জায় মরে যাই। আমি যত লজ্জা পাই আমার দর্শক শ্রোতা ততই উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। কেউ কেউ শিস দেয়। কেউ কেউ লাইনগুলো রিপিট করে। বোঝাই যায় ওদের ভালো লাগে। প্রতি সন্ধ্যায় সাজগোজ করে প্রায় বেশিরভাগই যায় প্রেম করতে। সেগুলা নিয়েও অনেক হাসি তামাশা হয়। ভালো লাগে ওদের স্বাধীন জীবন। নারগিসের আম্মা তো তাও খ্যাট খ্যাট করে না সারাদিন। আমার আম্মা আল্লায় দিলে সন্ধ্যার পরে ঘরে ঢুকতে দেখলেই দুনিয়ার আকথা কুকথা বলতে শুরু করে আমাকে। আল্লায় জানে কবে যে আমিও এই মেয়েগুলার মত স্বাধীন হইতে পারব!

১৮.
বাসায় যেতে যেতে এই কথা বললাম নারগিসকে একদিন সন্ধ্যায়। ও বলল, তাহলে নিজের পয়সা নিজে কামা। অর্থনৈতিক মুক্তিই নারীমুক্তির এক নাম্বার উপায়।

আমি বুঝলামই না এটা ও কী বলল! তাছাড়া ও নিজে কী ওর পয়সা কামায়?

উত্তরে নারগিস একটা রহস্যময় হাসি দিল।

তার পরের দিনই নোভার সাথে দেখা। দেখলাম নোভা লাগেজ নিয়ে বেরুচ্ছে। আমাদের দেখেই একটা প্রাণখোলা হাসি দিল। খুব খুশি দেখেই বোঝা যায়। নারগিসকে চোখ টিপে বলল, কক্সবাজার যাই।

নারগিসের যে একটু হিংসা হচ্ছে সেটাও বোঝা যাচ্ছে। চোখের মণি বড় বড় হয়ে গেল তার, তবে, নারগিস স্মার্ট, শুধু বলল, কখন?

নোভা বলল, এখনই। ইমন বাইরে।

আমরা ওর সাথেই গেটের বাইরে গেলাম। দেখলাম মোটামুটি লম্বা, বেশ ফর্সা, লাল এবং গাল্লুগুল্লু টাইপের একটা ছেলে বেশ সুন্দর একটা শার্ট পরে দাঁড়ায়ে আছে। নোভা পরিচয় করায়ে দিল, ওরা স্কুলে পড়ে। নারগিস, রোকসানা। এখানে আসে প্রায়ই, বেড়াতে।

নারগিস হ্যান্ডশেক করল ইমনের সাথে। ছেলেটা কেমন যেন লজ্জায় কুঁকড়ে গেল মনে হল। নোভা বলল, যাই, টা টা। এক সপ্তাহ পরে দেখা হবে। আর এর মধ্যে হোস্টেলে আইসো না। যদি কারো সাথে দেখা হয় কিছু বইলো না। আমি বলছি বাড়িতে যাচ্ছি।

বলেই নোভা দাঁড়ায়ে থাকা হলুদ ট্যাক্সিটাতে উঠে হাত নাড়তে নাড়তে চলে গেল। আমরা দুইজন বেকুবের মতন কিছুক্ষণ দাঁড়ায়ে থাকলাম।

প্রথম কথা বলল নারগিস।

বলল, প্রসটিটিউট একটা। বলে হাঁটতে শুরু করল।

আমার কেমন যেন বিরক্তই লাগল।

আমি বললাম, কেন? এখানে প্রসটিটিউটের কী আছে? ওর বয়ফ্রেন্ড, ও তো যাবেই।

নারগিস বলল, কীসের বয়ফ্রেন্ড? ডাক্তার ছেলেটা! ও ভাঙাচ্ছে, বোঝাই যায়।

আমাকেও কি এক জেদ পেয়ে বসল। বললাম, ভাঙানোর কী আছে? ও নার্সিং পড়ে বইলা কি ডাক্তার ওর বয়ফ্রেন্ড হতে পারে না? আর ও তো অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন।

নারগিস চোখ গরম করে আমার দিকে তাকালো। বলল, কীসের স্বাধীন? ও কি চাকরি করে? ও এত নতুন নতুন জামা কই পায়? কয়টা মাইনষের মোবাইল আছে বল তো? ও মোবাইল পাইছে কই? তোর মত হাবলু না, যেন কিছু বুঝি না। কোত্থেকে একটা সুন্দর পোলা পাইছে, কক্সবাজার যাইতেছে!

আমার মনে হইল নারগিস খুবই জেলাস। এইটা তো ঠিকই যে নারগিসের কোনো বয়ফ্রেন্ড ডাক্তার না, এমন সুন্দর না বা বড়লোক না দেখতে। কিন্তু প্রসটিটিউট শব্দে আমার আপত্তি হইল।

তাই আমি বললাম, যেটাই হোক নোভাও দেখতে সুন্দর। এবং তার যৌন স্বাধীনতা আছে।

নারগিস চোখ বড় বড় করে ফেলল, বলল, কী বললি তুই?

আমি আবারো বললাম, ওর বা যে কোনো মেয়ের– ইভেন তোরও যৌন স্বাধীনতা আছে।

ও বলল, তুই কেন বললি এটা? কোথায় শিখলি?

আমি বললাম, আমি সিমোন দ্য বোভোয়ার পড়ছি। সেখানে ও বলছে।

নারগিস বলল, আমি আর নোভার সাথে মিশবো না।  হোস্টেলেও আর আসবো না। আর তোর আম্মাকে যাইয়া বলব তুই কি বই পড়িস! সামনে না আমাদের ফাইনাল?

এ আর নতুন কী! আগেও তো সে আম্মাকে আমার ব্যাপারে আবোলতাবোল বলছে। যদিও আম্মা ওকে এতটুকুও পছন্দ করে না বা ভালো মেয়েও মনে করে না, তবু আমার বান্ধবী, আমার বাসায় গিয়ে, আমার আম্মাকে এমন কথা বলা, যাতে আমি ঝামেলায় পড়ি—এই রকম আচরণ একমাত্র নারগিসের পক্ষেই সম্ভব। এটাকে মেয়েলি আচরণ বা কূটকাচালি বলা যাবে না কারণ সে ঘোষণা দিয়ে এমন করে।

নারগিসের অনেক আচরণই অন্য রকম। কখনো কখনো নির্যাতনের সমান। স্কুলে ও সিরিয়াসলি মারধোর করে অন্যদেরকে। টেবিল থেকে বই ফেলে দেয়। অন্যদের স্কুল ব্যাগের চেইন খুলে দেয় এমনভাবে, যাতে কাঁধে নেয়া মাত্র সড় সড় করে সব বই পড়ে যায় মাটিতে। এটা করে, বিশেষ করে স্কুল ছুটির পরে। স্কুলের টয়লেটে কেউ গেলে বাইরে থেকে ছিটকিনি বন্ধ করে দিয়ে টয়লেটের বাইরে দাঁড়ায়ে ভূত প্রেতের আওয়াজ করা ওর প্রিয় কাজ। আর ক্লাসের সময় অন্যের মাথার স্কার্ফ একটানে খুলে দেয়াতে তো ও চ্যাম্পিয়ন!

আমাদের ক্লাসের এক মেয়ে মাথা ন্যাড়া করছে, মাথায় স্কার্ফ প্যাঁচায়ে রাখে খুব টাইট করে, তার স্কার্ফ ও অ্যাসেম্বলিতে সবার সামনে টান মেরে খুলে দিছে। আমাদের ক্লাসের তো বটেই, জুনিয়র ক্লাসের মেয়েরাও ওর ন্যাড়া মাথাওয়ালা অদ্ভুত চেহারা দেখে হো হো করে হাসছে। মেয়েটা পরে হেডমিস্ট্রেসের কাছে নালিশ করে। আর সেই দিনই নালিশ করার অপরাধে, ক্লাসের ফাঁকে নারগিস ওই মেয়ের বেঞ্চে গিয়ে ওই মেয়েরই মোটা নীল ডায়েরি দিয়ে ওর মাথায় ধুম ধাম ধুম ধাম পাঁচটা বাড়ি দেয়। মেয়েটা তিন দিন স্কুলে আসে নাই।

অনেক মেয়েই ডমিনেটেড হতে ভালোবাসে। তারা মাস্তান বা রুড টাইপের ছেলেদের সাথে প্রেম করে। নায়কের চেয়ে ভিলেনদের তাদের বেশি ভালো লাগে। বাবার কড়া শাসন কিংবা খুব বেশি আদর যারা পায় না, তারা এরকম কর্তৃত্ব ফলানো ছেলে খুব পছন্দ করে। তাদের জীবনে এসব পুরুষ বন্ধুর ভূমিকা আসলে বন্ধুর না, কর্তৃত্ব ফলানো দায়িত্ববান পিতার। বাপের কাছে যেটা পায় না, অবচেতন মনে সেটা প্রেমিকের কাছে পেতে চায়।

আবার অনেক ছেলেই ডমিনেটেড হতে ভালোবাসে। পুতু পুতু, শান্ত, ভালো মেয়ের চেয়ে ঢিস ঢাস, মাস্তান, চঞ্চল মেয়ে ভালো লাগে। এবং এ ছেলেরা সবসময় নিজেরা শান্ত আর অহিংস টাইপের। নিজে যেসব করে নাই কখনো, একটা মেয়ে সেইসব করলে একধরনের স্নেহবোধ করে তারা,আকর্ষণ বোধ করে। এইসব ছেলেদের অধিকাংশের মা-ই জাদরেল শিক্ষিকা কিংবা পরিবারে আধিপত্যবাদী কড়া মা। নিজেরা কড়া নিয়মকানুনের মধ্যে, ভদ্রতা-বিনয়-অহিংসার পরাকাষ্ঠা হতে হতে দুর্নিবার আকর্ষণ তৈরি হয় এর বিপরীত চরিত্রের মেয়েদের প্রতি।

নারগিসের এইসব মাস্তানি আমাদের ক্লাসের বেশির ভাগ মেয়েরই ভালো লাগে। এমনকি ক্লাসে যারা অহিংস প্রকৃতির মেয়ে, তারাও খুব মজা পায়। অবশ্য কয়েকজন আদর্শবাদী ভালো মেয়ে ছাড়া। ওরা নারগিসকে যে কোনো কিছুর চেয়েও বেশি ঘৃণা করে। তবে ভুলেও ওকে ঘাটায় না। ওরা কয়েকজন ছাড়া, তুমুল জনপ্রিয়ই বলতে হবে নারগিসকে। ডমিন্যান্ট, অ্যাগ্রেসিভ, উইটি নারগিসকে মনে মনে তো হিংসাও করে কতজন! আমি অহিংস, তবু ওর সহিংসতায় আমার রাগ হয় না। ওকে আমার ‘লেডি বাকের ভাই’ মনে হয়। আর বাকের ভাইয়ের মত ওর হাতেও একটা চেইন থাকলে খুব ভালো লাগতো আমার। কিন্তু আমার আম্মাকে গিয়ে কিছু বলা মানে বাসায় আমার ইমেজ ক্ষুণ্ন করা। এমনিতেই বিকালে এত সময় বাসার বাইরে থাকায় নানান কথা শুনতে হয়। তার উপর যদি নারগিসও গিয়ে কিছু বলে দেয়!

বাতাসে কেমন শীত আসছে, শীত আসছে ঘ্রাণ পেলাম। নারগিসকে বললাম, কীরে শীতকাল চলে আসল  নাকি?

ও মুখ ঝামটা মেরে বলল, শীত না আসলে কেউ কক্সবাজার যায়?

আমি ভুলেই গেলাম যে কেউ কক্সবাজার যাচ্ছে। ভাবলাম পিকনিকের কথা বলল কিনা।

বললাম, না, শীতের চেয়ে এই শীত আসি আসি সময়টা আরো ভালো।

নারগিস ক্ষেপে গিয়ে চলে গেল। আমরা তখন বাসার গলিতে।

১৯.
তখন শীতকাল। ফাইনাল পরীক্ষা আসন্ন। আমার বাসায় এমন অবস্থা– যেন ক্লাস এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি না পাইলে আমার আম্মার নাক কাটা যাবে। আমি পড়াশোনা নিয়ে এমন ব্যস্ত হয়ে গেলাম যে নোভার হোস্টেলে যাওয়ার কথা আমার মনেও আসল না। আর নারগিসও একটু কম কম আসতে থাকলো স্কুলে। এমনিতেই ও স্কুলে আসত চারদিন। দুইদিন আসতোই না। এখন ও দুইদিন আসে চারদিন আসে না। স্কুলের পাশের ফোনের দোকানে গিয়ে অনেকক্ষণ কার সাথে যেন কথা বলে। লাভলু হয়ত। তাই আমি জিজ্ঞাসা করি না। কিন্তু ও আর স্কুলবাসে বাড়ি ফেরে না। আমরা দুইজন রিকশায় চড়ে যাই। ভাড়া অবশ্য ও-ই দেয়।

এমন সময় আমাদের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পরীক্ষার টাইম হইল। যেইসব বই আমাদের দেয়া হইছিল, সেইগুলার ওপর ছোট ছোট প্রশ্নের পরীক্ষা। পরীক্ষার হলে যথারীতি সেই মেয়ে আর লাভলু পড়ল গার্ড হিসাবে। আমি লাভলুর দিকে তাকায়ে একটু হাসলাম। সেও হালকা হাসিতেই উত্তর দিল।

আমার পাশেই নারগিস বসা। বলল, কি চলতেছে?

নারগিস একটা বইও পড়ে নাই। তাই আমি এমনভাবে লিখতেছি যেন নারগিস পুরা খাতাটাই দেখতে পায়। এতক্ষণ আমারটা দেখে দেখে লিখতেছিল ও। কিন্তু আমাদের হাসি বিনিময়ের পরে ও থেমে গেল।

আবার বলল, ওই লাভলুর সাথে কি তোর?

আমি বললাম, আমার আবার কি? লেখ লেখ।

কিছু তো লিখলোই না নারগিস উল্টা এতক্ষণ যা লিখছিল সব কেটে দিল। লাভলু আমাদের বেঞ্চের আশেপাশেই পায়চারি করতেছিল। ও আড়চোখে দেখল। কিছু বলল না।

আমার লেখা শেষ হইলে আমি নারগিসের খাতার দিকে নজর দিলাম। দেখলাম সব প্রশ্নের অদ্ভুত অদ্ভুত উত্তর লিখে রাখছে ও।

প্রশ্ন: দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত বায়েজীদ কি খেয়ে স্কুলে যেত?

নারগিসের উত্তর: এক বালতি পানি।

প্রশ্ন: টমাস আলভা এডিসনের বাবা কি করতেন?

নারগিসের উত্তর: ঘোড়ার আণ্ডা।

অথচ সব প্রশ্নের উত্তরই আমি জানি। লিখেও ফেলছি। ওকে বললাম, এ্‌ইসব কী? এইটা লিখ, ওইটা লিখ।

ও পাত্তাই দিল না। বলল, লাগবে না। ফার্স্ট প্রাইজ আমিই পাব। বলে লাভলুর দিকে তাকাল।

লাভলু হাসল। নারগিস হাসল। আমিও হাসলাম। খাতা জমা দিয়ে দিলাম।

নারগিস বলল, আচ্ছা আজকে আমি খালার বাসায় যাবো। তুই একা চলে যাইস।

আমার একটু মন খারাপ হইল। কিন্তু আমি কিছু বললাম না। স্কুলবাসে নারগিস ছাড়া জমে না। তবে ওকে ছাড়া বাসযাত্রায় আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু রিকশায় যেতে ভালোই লাগে। বাসে আর যেতে ইচ্ছা করে না। সেদিন পকেটে দশ টাকার মত ছিল। তাতে রিকশা ভাড়া হয়ে যাবে। তাই একা একা রিকশায় চড়েই বাসায় যাব ভাবলাম। স্কুল শেষে নারগিসকে দেখলাম কেন্দ্রের রুমটাতে বসে লাভলুর সাথে খাতা গোছাতে ব্যস্ত। অন্য মেয়েটা নাই। ও যেহেতু যাবেই না আমিও আর অপেক্ষা করলাম না। রওনা দিলাম একাই। স্কুলের গেইট ছাড়ায়ে নারগিসের সেই ফোনের দোকানের সামনে যেতেই দেখি একটা পরিচিত চেহারা, রোদে লাল হয়ে দাঁড়ায়ে আছে সেখানে। খুব চেনা চেনা লাগল। চিনতে পারলাম না।

রিকশায় ওঠার সাথে সাথে ছেলেটার নাম মনে পড়ল— ইমন। ডা. ইমন। ওহ্ নোভার সাথে তো আমার আর দেখাই হলো না! কিন্তু ইমন এইখানে কী মনে করে!

সেইদিন আমার প্রথম একলা একলা রিকশা ভ্রমণ। আমি ইমনের কথা ভুলে গেলাম। হুড ফেলে দিয়ে চারপাশ দেখতে থাকলাম। ভালোও লাগল, ভয়ও লাগল। আর কেমন যেন মনে হইল রাস্তার সব লোক আমার দিকেই তাকায়ে আছে। আর কারো সাথে চোখাচোখি হইলে তো শেষ! খুশিও লাগল আবার কেমন একটু অস্বস্তিও লাগল। মনে হইল, আমার দিকে তাকাইল কেন? আমার ওড়না ঠিক আছে তো? অবশ্য বেশিরভাগ লোকই আমার দিকে তাকায় নাই। বেশিরভাগই তো ব্যস্ত পথচারী! কিছুদূর যাওয়ার পর একটা হইহুল্লোড় শুনলাম। তাকায়া দেখি পাশের রিকশায় তিনটা ছেলে। আমাদের চেয়ে বড়ই হবে বয়সে। একজন একটা মন্তব্য ছুঁড়ে দিল, ওই দাম কত? এই কত দাম?

পাশের ছেলেটা বলল, এহ্, চেহারা দেখছোস্, ফ্রি দিলেও নিমু না।

আমার রিকশাওয়ালা ওদের দিকে তাকায়ে দাঁত বের করে হাসল। জবাবে ওদের রিকশাওয়ালাও হাসল। কী অশ্লীল,কী কুৎসিত সেই হাসি! প্রথমে ভয় পাচ্ছিলাম। পরে এমন ঘেন্না লাগতে শুরু হইল,মনে হইল যেন মাটির সাথে মিশে যাই। কিছু বলা আমার সাহসে কুলালো না। অন্যদিকে তাকায়ে থাকলাম যেন কিছু শুনিও নাই, দেখিও নাই। বাসা আসতেই রিকশাওয়ালার দিকে না তাকায়ে ভাড়া দিয়ে নেমে গেলাম। তাকাই নাই, তবু মনে হইল রিকশাওয়ালার মুখে সেই কুৎসিত হাসিটা তখনও আছে।

বাসায় ঢুকে এমন মন খারাপ হইল যে কি বলব! ওরা কি বলছে, কিভাবে হাসছে সেইটা তো বড় কথা না। বড় কথা হইল আমি কিছুই বলি নাই। বলতে পারি নাই। তাকাতেও পারি নাই। এত বড় বড় কথা বলে, নারীবাদ করে, শেষে কিনা রাস্তায় একটা ইভটিজিং-এর উত্তর দিতে পারলাম না?

নারগিস থাকলে কি কখনো চুপ করে থাকত! যাইতে দিত এইভাবে ছেলেগুলাকে? আমার মনে আছে, আমরা এরকম একদিন যাইতেছি রিকশায়, পাশের রিকশায় কোন ছেলে জানি কী বলল, নারগিস সাথে সাথে বড় গলায় উত্তর দিল, ইউ ওয়ানা ফাক, ফাক ইউর মাদার, গো হোম অ্যান্ড ফাক হার টোয়াইস।

ছেলেগুলা এমন অবাক হইছিল, এমন ডিস্টার্বড হইছিল ওর কথায় যে আমাদের দিকে আর তাকায়ই নাই।

আর আমি! রিকশাওয়ালা পর্যন্ত কিনা আমাকে নিয়ে মজা নেয়! আমি মাথা উঁচু করে তাকাতেই পারি না! রিকশাওয়ালারে একটা থাপ্পড় দিতে পারি না! নিজেরে এত ছোট মনে হইল আমার! সারাদিন মনে মনে ভাবলাম ওইসময় কী বলা যেত, কী করা যেত, কিন্তু আমার মন থেকে সেই ঘটনার গ্লানি এতটুকুও মুছল না।

(কিস্তি ৬)

About Author

পারমিতা হিম
পারমিতা হিম

লেখক ও সাংবাদিক; এখন সময় টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশে কর্মরত।