নারগিস (৭)

আগের কিস্তি প্রথম কিস্তি

২২.
আমার ফুপু একজন আদ্যেপান্ত অসুখী মানুষ। উনি বেশ সুন্দরী কিন্তু উনার জামাই আরেক বিয়ে করছেন। উনি জামাই এর সাথে থাকেন না। একসময় আমার আব্বার সাথেই থাকতেন। আম্মার সাথে ঝগড়াঝাটি করে চলে গেছেন।

উনার দুই ছেলে। ছেলেগুলাও উনার সাথে থাকে না। উনার সাথে থাকে গ্রাম থেকে আসা কিশোরী বয়েসী কাজের মেয়ে। উনার যন্ত্রণায় তারাও কিছুদিন পর পর বাড়িতে চলে যায়। আবার নতুন কিশোরী আসে। আবার যায়।

ফুপুর বাসায় সব জিনিসের দুইটা করে ডিব্বা। একটা ভালো বিস্কুটের ডিব্বা। আরেকটা মেহমানদের বিস্কুটের ডিব্বা। তার মানে সেটাতে সব নরম পুরানো বিস্কুট। শুধু খাওয়া দাওয়া না, সব ব্যাপারেই এমন কিপটা মানুষের জুড়ি মেলা দায়!

উনি সবখানেই যান পায়ে হেঁটে। যত দূরের পথই হোক! হেঁটে গিয়ে হাঁপায়ে হাঁপায়ে বলেন, হাঁটা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।

নিজের জীবনে ভীষণ অসুখী এ মানুষটা কারো ন্যূনতম আরাম আয়েশ, সুখ দেখতে পারেন না। সব জায়গায়, সব কিছুতে একটা ঝামেলা বাঁধানো উনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাই আমার আব্বা, তার আপন বড় ভাই ছাড়া প্রত্যেকটা মানুষ তার কাছ থেকে দশ হাত দূরে থাকে।

যাই হোক, আমি সাত সকালে ওই বাসায় গিয়ে উঠলাম। ওখানে আমার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আগে থেকেই করা ছিল। খুব পুরানো দিনের বাসা ওইটা। দেয়ালের পলেস্তারা উঠে গেছে। পানিতে ভিজে জায়গায় জায়গায় অদ্ভুত আর্ট। আমার ব্যবস্থা যে রুমে সেখানে একটা খাট, একটা টিভি আর আলমারি। আমি আমার ন্যাশনাল প্লেয়ার নিয়ে খাটে শুয়ে পড়লাম।

ফুপু নয়টা পাঁচটা চাকরি করেন। বাসায় থাকে কিশোরী বুয়া অঞ্জনা। তাকে আমার ব্যাপারে পই পই করে নির্দেশনা দেওয়া হইছে। আমার সাথে কথা বলা যাবে না। আমাকে কোনো ধরনের চিপস চকলেট দেওয়া যাবে না। আমার জন্য তৈরি বিশেষ খাদ্য ছাড়া আর কোনো খাবার আমি যাতে না খাই সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মিনিটে তের বার আমাকে পানি খাওয়াইতে হবে। কিন্তু কোনো নড়াচড়া করানো যাবে না।

বাসায় ডিশের লাইন নাই। কিন্তু আশেপাশের সবার বাসায় আছে। এ বাসায় ঝির ঝির করে কোনো কোনো চ্যানেল দেখা যায়। কোনোটায় সাউন্ড আসে না, আসলেও তিন চার চ্যানেলের সাউন্ড মিক্স হয়ে যায়। আবার কোনোটায় সাউন্ড ঠিকমত আসলেও ছবি আসে না।

অঞ্জনা দুপুরে এ ঝির ঝির করা টিভিতেই বাংলা সিনেমা দেখে। কিন্তু ফুপু সেটা জানে না। কারণ বিদ্যুৎ বিল বেশি আসবে বলে উনি কখনোই টিভি দেখেন না। এদিকে আমাকে যে রুমের বিছানায় রাখা হল সেটাই টিভি রুম।

অঞ্জনার অনেক মন খারাপ। আমাকে অনেক ইনায়ে বিনায়ে বলল, চলেন, টিভি দেখি। চলেন, টিভি দেখি।

আমি ওর অবস্থা বুঝতে পেরে বললাম, চলো দেখি।

ও টিভি দেখে, আমি ওর কাণ্ড দেখি। প্রত্যেক ডায়লগের সাথে সাথে ওর মুখভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে যায়। প্রেমের দৃশ্যে ও প্রেমে পড়ে যায়, ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে এমন লজ্জা পায় যেন ও নিজে সেখানে অভিনয় করেছে! আবার চোখের কোণা দিয়ে আমাকে দেখে। আমি ওই দৃশ্য দেখছি কিনা বোঝার চেষ্টা করে। দুঃখের দৃশ্যে একেবারে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে। আমি বেশিরভাগ সময়ই টেলিভিশনের সামনে ওকে দেখতে দেখতে ঘুমায়ে পড়তাম।

ধীরে ধীরে ওর সাথে আমার একটা বোঝাপড়ার সম্পর্ক হয়ে গেল। ডালিম ওর প্রিয় ফল। আর আমার রোগের মহৌষধ। আমার ফুপু প্রতিদিন সকালে একটা পুরো ডালিম ভেঙে আমার বিছানার পাশে রেখে যাইতেন। ওই বাটি দেখলে মেয়েটার চোখ চক চক করত। ফুপু চলে গেলেই আমি ওকে বাটিটা দিয়ে দিতাম। বিনিময়ে, আমি মাঝে মাঝে বিছানায় উঠে বসলে বা বাইরের দরজায় দাঁড়ালে ও কোনো আপত্তি করত না।

বেশ কয়েক দিনই দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা আমার শুয়ে থাকতে হইল। ফুপুর বাসা প্রায় গ্রাম মতন একটা জায়গায়। সবচেয়ে বড় কথা, সেটা একটা কলোনি। সেখানে বাসার সামনে ছোট্ট উঠান, ছোট্ট নালা আছে। আবার, তার সামনেই বড় উঠান যাকে ঘিরে চারপাশে একেকটা বাড়ি। মাঝখানে আছে একটা বড় কুয়া, আর কিছুদূর পরে পরেই নলকূপ, সবাই যেটাকে ডাকে চাপকল।

খুব কাছেই কর্ণফুলী নদী, কান পাতলে কল কল শব্দ টের পাওয়া যায়। একদিন আমাকে অঞ্জনা বলল, চলেন, আপনাকে সুন্দর একটা জায়গা দেখাই। বলে আমাকে পাশের একজনের বাড়ির পেছনে নিয়ে গেল। সেখানে সীমানা দেয়ালের পাশে একটা রঙের ড্রামের মধ্যে মোটামুটি বড় সাইজের পেয়ারা গাছ। সেই পেয়ারা গাছের মসৃন গা বেয়ে তার ওপর উঠে বসে থাকে ওই কলোনির ছেলেমেয়ে। অঞ্জনা আমাকেও সেখানে উঠতে বলল। আমি একটু দ্বিধায় ছিলাম। অসুখ বিসুখ নিয়ে গাছে ওঠা ঠিক হবে কিনা। কিন্তু সবার সামনে সে কথা বলতে পারলাম না লজ্জায়। সেই গাছে উঠে একটা ডালে বসে দেয়ালের ওপারে তাকাতেই চমকে গেলাম। দূরে এ যে পাহাড় দেখা যায়! এত কাছে!

অঞ্জনা বলল, চিনছো?

আমি মাথা নেড়ে না বললাম। ও বলল, আরে বাবা, তুমি তো পড়তে জানো, পড়ে দেখো।

পাহাড়ে আবার কী পড়বো, ভাবতে ভাবতে চোখ নিচে নামাতেই টের পেলাম। খুব সুন্দর সুন্দর গাছ ছেটে পার্কের মতন বানানো, আর মাটির ওপর সুন্দর করে ছাটা সবুজ ঘাসের ওপর ছোট ছোট নামফলক। তারপরেই চোখে পড়ল ক্রুশ চিহ্ণটা। এটা ওয়ার সিমেট্রি! বাহ, জায়গাটা তো খুব সুন্দর!

কখনো কখনো এই পেয়ারা গাছের ওপরে উঠে পার্ক আর পাহাড় দেখা গেলেও, নদী দেখতে যাবার কোনো উপায় ছিল না। বাকি সময় বাসার ওই ছোট্ট রুমের জলপড়া প্লাস্টার উঠানো দেয়ালের দিকে তাকায়ে নানা ধরনের ছবি কল্পনা করতে করতে ঘুমায়ে পড়াই ছিল একমাত্র কাজ। এমন একটা বাসা, একটা পত্রিকা রাখার খরচ পর্যন্ত আমার ফুপু করেন না। পড়ার কিছু বলতে ধর্মীয় বই। সেগুলোও পড়ে আমি শেষ করে ফেললাম কবেই।

২৩.
কদিন পরেই আমার পথ্যে পরিবর্তন আসল। বাইরে গায়ে রোদ লাগালে নাকি জন্ডিস ভালো হয়—তাই প্রতিদিন সকালে বাইরে কুয়ার পাশে বসার অনুমতি দেওয়া হল। তবে, বেশি না। এক ঘণ্টা।

শীতকাল তখন। সকাল দশটা পর্যন্ত কুয়াশা থাকে। এই এক ঘণ্টা বাইরে থাকার পারমিশন পেয়ে আমার জীবনটাই তখন বদলে গেল। ঠিক সকাল আটটায় কুয়ার পাড়ে গিয়ে বসে থাকি আমি। কলোনির  সব লোকজন সেখানে আড্ডা দেয়। মধ্যবয়েসী পুরুষেরা দাঁত মাজে, মহিলারা পানি ভরে কলসে, বাচ্চারা কুয়ার চারপাশে এসে খেলে, বুড়ারা পেপার পড়ে।

আমি তাদের কাছ থেকে পেপার চেয়ে নেই। বাচ্চারা নানারকম খেলনা নিয়ে খেলতে আসে। হাড়ি পাতিল দিয়ে রান্না বান্না খেলে। আমিও যোগ দেই।

দেখতে দেখতে সবার সাথে খাতির হয়ে গেল খুব। কোন বাড়ির সামনে কী গাছ, কী রঙের ফুল, কেমন ধরনের পাতা সব আমার মুখস্ত হয়ে গেল। অনেকেই আমাকে ডেকে এটা সেটা খেতে দিত। সবই ফলজাতীয় খাবার। আবার কেউ কেউ আমাকে সেবা প্রকাশনীর দুই একটা বই এনে দিত পড়তে। সেগুলা পড়েই আমার ভালো দিন কাটতেছিল। তবে প্রতিদিন একটু একটু করে কুয়ার পারে বসার সময় বাড়ায়ে দিলাম আমি। সকাল আটটা থেকে সেটা এক ঘণ্টার জায়গায় তিন ঘণ্টা নাগাদ হয়ে গেল। সারাদিন ভাল কাটে। কিন্তু দুপুরে সবাই যখন ঘুমায় তখন আমার খুব অসহ্য লাগে।

সেদিনও সময়টা ভর দুপুর। সারা কলোনির মানুষ ঘুমাচ্ছে। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নাই। নদী যে ছল ছল শব্দ করে সেটা আমি তখন বুঝলাম। কান পাতলেই কেমন শব্দ পাওয়া যায়। গাছের পাতায় বাতাসের হালকা ছটফটানি টের পাওয়া যায়। মনে হয় দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে। এমন সময় খুব জোরে একটা ঘুঘু পাখি ডেকে উঠলো। মাত্র একবার ডেকেই থেমে গেল পাখিটা।

এমন মুহূর্তে যে কেউ মরেও যেতে পারে। আমি অনেকক্ষণ কান বাড়িয়ে অপেক্ষা করলাম সে আরেকবার ডাকুক। ডাকল না। আমার এত শূন্য লাগতে লাগল চারপাশ—বলার মত না। চারদিকের সবুজ আর নীল আর খয়েরি সবই যেন এক বিশাল শূন্যতাকে ফুটিয়ে তুলছে।

দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণা আমি সইতে পারি না। বিশেষ করে এরকম শূন্যতা। আমার মন খা খা করে। আমি কখনো দুঃখের গান, বিরহের গান শুনি না। পাছে আমার মন খারাপ হয়। কোনো মন খারাপ গান থাকলে সেইটা আমি টেনে দিই। চ্যানেল পাল্টায়ে ফেলি। যে সিনেমায় দুঃখ বেশি, কিংবা বিরহাত্মক সমাপ্তি ঘটে সেগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেই আমি। ভাল লাগে না।

এই নির্জন দুপুরে এই বদমাশ ঘুঘুটাকে গুলি করে মেরে ফেলতে মন চাইল আমার। অন্তত আরেকবার যদি সে ডাকত হয়ত আমি তাকে ক্ষমা করে দিতাম। কিন্তু এভাবে আমার মাথাটা খালি করে গাছের ডালে পাতার  ছায়ায় বসে হেলতে দুলতে পারে না সে। এসব আবোল তাবোল ভাবতে ভাবতে ঘুঘুটাকে খুঁজতে গিয়ে দেখি একটা লাল মুখ আমার দিকে ভ্রু উচায়ে আছে। চোখে চোখ পড়তেই বলল, আরে তোমার কি শরীর খারাপ?

আমি মাথা নেড়ে বললাম, না।

ছেলেটাকে চিনতে পারলাম। ডানপাশের বাড়ির আন্টির মেজ ছেলে। তার অন্য ছেলেগুলো দেখতে বিদঘুটে হলেও, এই ছেলেটা খুবই সুন্দর। সে ইংরেজিতে অনার্স পড়ে। আন্টি আমাকে বলছিল।

ছেলেটা আবার বলল, “তোমার না জন্ডিস? তুমি এখানে এত বসে থাকো কেন? খারাপ লাগলে বলো। আমার আম্মাকে ডাকব?”

আমি আবারো মাথা নেড়ে বললাম, “না।”

ছেলেটা আমাকে হাত ধরে জোর করে তাদের বাসায় নিয়ে গেল। আমি লজ্জায় মরে গেলাম। সে বাসায়ও সবাই গভীর ঘুমে তখন।

(কিস্তি ৮)

About Author

পারমিতা হিম
পারমিতা হিম

লেখক ও সাংবাদিক; এখন সময় টেলিভিশন, ঢাকা, বাংলাদেশে কর্মরত।