নারগিস (৮)

নারগিস বলল, ভালো তো ছিলাম।... এসে শুনি তুই একলা ঘরে ছেলেদের গায়ে মাথা ঘুরে পড়ে যাস, এসে দেখি তুই ঘুমের মধ্যে গান গাস, ঘটনা কী?

আগের কিস্তিপ্রথম কিস্তি

২৪.
এত অন্ধকার বাসা আমি কখনও দেখি নাই। ভরদুপুরে যেখানে দুনিয়াটা রোদে ঝলমল করতেছে, সেখানে এ বাসার ভেতরে বোঝার উপায় নাই এখন দিন নাকি রাত!

ড্রইং রুমে একপাশে সোফা আর একপাশে খাট। খাটে কেউ একজন ঘুমাচ্ছে, আর তার মাথার কাছে একটা কাঠের বড় তাকে রাজ্যের বই। সামনে একটা টেবিল, সেখানেও অনেক বইপত্র। ড্রইংরুমে এই গাদাগাদি করে রাখা জিনিসের মধ্যেই একটা টেলিভিশনও উঁকি দিল। আমি একটু দ্বিধার সঙ্গেই নোংরা পুরোনো সোফাগুলার একটায় বসে গেলাম। বসার সাথে সাথে খেয়াল করলাম আমার মাথা অল্প অল্প দুলতেছে।

ছেলেটা, টেবিলের ওপাশে খাটের উপরে বসে মোটা ফ্রেমের একটা চশমা পড়ে আমার দিকে মুখ করে বলল, কিসে পড় তুমি? আমাকে চিন? আমার নাম সাজ্জাদ।

ক্লাস নাইনে পড়ব। এইট শেষ। আমার নাম রোকসানা। বলতে বলতে খেয়াল করলাম, আমার গলা কাঁপতেছে। আর মাথায় ঘুরতেছে, এ বাসায় আমি কেন আসলাম? আসলামই যখন একটু ভাল পোশাক পরে, চুল আঁচড়ায়ে আসতে পারতাম না?

হঠাৎ শুনলাম, সাজ্জাদ বলল, তোমার এ্‌ই যে কোঁকড়া কোঁকড়া চুল, এমন চুলওয়ালা এক রাজকন্যাকে নিয়ে একটা বিখ্যাত রুপকথা আছে, ইংরেজি, সিনেমাও হইছে, ট্যাঙ্গলড নাম, জানো?

আমি মাথা নাড়লাম। আমি আসলেই জানি না। আর আমার মাথা ঘুরতেছে।

এদিকে, টেবিলের ওইপারে কে যেন বলে যাচ্ছে, তুমি তো দেখি সারাক্ষণ পড়। অবশ্য কি আর করবা, যা একটা রোগ জণ্ডিস। আমার এখানে অনেক বই আছে। ইংলিশ, অনুবাদও আছে। তুমি নিয়ে নিয়ে পড়তে পার। কিন্তু ফেরত দিবা। বই নিয়ে ফেরত না দিলে আমার খুব বিরক্ত লাগে। আর এইগুলা সব আমার একাডেমিক বই। বুঝছ, শুধু শখের গল্পের বই না।

আমি মাথা নেড়ে বললাম, বুঝছি। আমি একটু পানি খাব।

উনি শুনল না। শোনার কথাও না। কারণ আমি কি বললাম সেটা আমি নিজেও ভালভাবে শুনি নাই।

ওদিকে ফটাফট তাক থেকে বই নামাতে নামাতে ছেলেটা বলল, এই যে নাও ‘ওল্ড ম্যান অ্যানড দ্য সি’। খুব বিখ্যাত বই। এবার নোবেল প্রাইজ পেয়েছে। এখানে ইংরেজির সাথে সাথে নিচে বাংলাও দেওয়া আছে। তুমি আগে ইংরেজি পড়বা, না বুঝলে বাংলা। ইংরেজি পড়ার অভ্যাস কর, তাহলে অনেক ভাল ভাল গল্প উপন্যাস পড়তে পারবা জীবনে।

আমি আমার সামনে আবছামতন একটা বই দেখতে পাইলাম। উঠে দাঁড়ায়ে বইটা হাতে নিয়ে বললাম, আমি পানি খাব। শরীর খারাপ।

ছেলেটা উঠে দাঁড়াল, বলল, কি বিপদ! তোমার তো জণ্ডিস, তোমাকে যে গ্লাসে পানি খাওয়াব সে গ্লাসে পানি খেলে আমাদেরও জণ্ডিস হবে। আমি তোমাকে বাসায় দিয়ে আসি। সেখানে গিয়ে একটু ফলের জুসও খাও। আরে আরে, তোমার কি মাথা ঘুরাচ্ছে নাকি?

ছেলেটা কথা শেষ করবার আগেই আমি সত্যি সত্যি মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। উনি আগায়ে এসে আমাকে প্রায় কোলে নিয়ে ফেললেন, অচেতন হবার আগে শুধু এটুকুই আমার মনে আছে।

২৫.
খুব সুন্দর একটা পার্কে দাঁড়ায়ে আছি। লাল নীল সবুজ হলুদ টিউলিপ ফুল সেখানে। আমি সুচিত্রা সেনের ড্রেস পরা। আমার চেহারায়ও কেমন সুচিত্রার চেহারার আদল। একটা পাহাড়ের ওপরে বসে আমি গান করতেছি- ‘গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু/ মায়ার স্বপ্ন ছড়াতে চায়/ হৃদয় ভরাতে চায়। ’ আশ্চর্যজনকভাবে পুরা গানটাই আমি দুলে দুলে হেসে হেসে গাইলাম, যদিও এই গানের কথা আমি কোনভাবেই ভালো করে জানি না। আর সিনেমার গানটার মতই শেষদিকে দেখলাম উত্তম কুমার আমার পাশে একটা গাছ ধরে দাঁড়ায়ে আছে। আরো পরে দেখলাম ছেলেটাকে কাছ থেকে দেখার পর বুঝলাম উত্তম কুমারের চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, সে হেসে হেসে গান শুনতেছে। যেভাবে সিনেমার ওই গানে নায়কটা গাছের ডাল ধরে দাঁড়ায়ে নায়িকার গান শোনে—সেভাবে।

ঘুম ভেঙে গেল। নায়কের জায়গায় কাকে স্বপ্নে দেখলাম বুঝতে পেরে আমার খুবই লজ্জা হইল। চোখ পড়ল বইটাতে। দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী। খুবই বিরক্তিকর একটা বই। এক বুড়া লোক সারাদিন একটা বড়শি হাতে একটা মাছের পেছনে ছোটে। কেবল একটা মাছ নিয়ে মানুষ এত হাবিজাবি কথা লিখতে পারে! এই বই না পড়লে জীবনে আমার ধারণাও হত না। আমি যেদিন ওই বাসায় গিয়ে মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম সেদিন আমার যখন জ্ঞান ফিরল আমি দেখলাম সাজ্জাদের আম্মা আমার মাথায় পানি ঢালতেছে আর অঞ্জনা পাশে দাঁড়ানো। আর এই বইটা আমার বিছানায় রাখা। এত শখ করে একটা বই দিয়ে গেছে তাই কষ্ট হইলেও পড়লাম। তাছাড়া এ কয়দিন আমার বিছানা থেকে উঠাই নিষেধ। শুয়ে শুয়ে এইটা পড়তে পড়তে আরো বিরক্ত লেগে গেল। গল্পের বুড়ো লোকটার জীবন আমার চেয়েও বিরক্তিকর। সেই মাছ ধরে ফেলার পরেও সে ওই মাছটারে ছেড়ে দিল। এইটা কোন গল্প হইল—যে ছেলে এই গল্প পড়ে সে কেমন টাইপের ছেলে?

বিড়বিড় করতে করতে পাশ ফিরলাম আমি। দেখি চারজোড়া হাসি হাসি চোখ আমার দিকে তাকায়ে আছে। নারগিস আর নোভা। ওরে বাপরে, ওরা এইখানে?

কিরে তুই কি ঘুমের মধ্যে গান গাস নাকি? বলে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল নারগিস। হাসতে হাসতে গিয়ে পড়ল নোভার গায়ে। নোভার মধ্যেও হাসি সংক্রমিত হইল। কিন্তু হাসলে ওর ঠোটের চারপাশে রিঙ্কেল পড়ে যাবে মনে পড়তেই ও মুখ আবার গম্ভীর করে ফেলল।

খুব আস্তে বলল, রিঙ্কেল পড়ে যাবে।

আমি বললাম, আমারও। বেশি হাসলে কিডনি নড়ে যাবে। বলে একটুখানি হাসলাম।

এবার নারগিসের হাসি আরো বেড়ে গেল। এ প্রথম ওকে খেয়াল করলাম। চুলের নিচের দিকে সোনালি রং করছে ও। মুখেরও কি একটা পরিবর্তন আছে। গায়ের জামা অদ্ভুত সুন্দর। কালো রঙের ওপর সোনালী সুতার কাজ। আর গায়ের সোয়েটার পুরাই ট্রান্সপারেন্ট। হাতে একটা কালো রঙের ব্রেসলেট। সঙ্গে স্মার্ট ব্যাগ।

আমি বললাম, ভালো আছস তোরা?

নারগিস বলল, ভালো তো ছিলাম। তুই নাকি মুমূর্ষু তাই দেখতে আসলাম।এসে শুনি তুই একলা ঘরে ছেলেদের গায়ে মাথা ঘুরে পড়ে যাস, এসে দেখি তুই ঘুমের মধ্যে গান গাস, ঘটনা কি? কে সেই ছেলে? বাসায় অজ্ঞান হতে পারিস না? এই ধর ওর গায়ে পড়তি—বলতে বলতে অঞ্জনার দিকে আঙুল দেখাল নারগিস। আবারো শব্দ করে হাসতে থাকল। নোভারও হাসি পাচ্ছে, রিংকেল মেইনটেইন করে যতটা সম্ভব না হাসার মত করে হাসল ও।

আমার কান লাল হয়ে গেল লজ্জায়।আমি চোখ তুলে অঞ্জনার দিকে তাকালাম। এমন একটা কথা ওর বলার দরকার ছিল আমার বান্ধবীদের? প্রতিদিন আমার ভাগের ডালিম খাওয়ার এখানেই সমাপ্তি—ভেবে একবার চোখ বন্ধ করে আবার খুললাম আমি।

বললাম, ইচ্ছা করে করি নাই। বলে চুপ করে থাকলাম।

নারগিস বলল, কে সেই ছেলে? আমি দেখতে চাই। তবে শোন এখানকার ছেলেদের দিয়া কিছু হবে না। এদের গায়ে পড়ে কোন লাভ নাই। ঢাকার ছেলেরা অনেক ভাল। ওখানে ছেলেরা মেয়েরা একসাথে সিগারেট খায়। এখানে তো মেয়েদেরকে সিগারেট খাইতে দেখলে ফিট হয়ে যায় ছেলেরা। আর ছিরি কি একেকটার? রিকশাওয়ালার মত পর্দা প্রিন্টের শার্ট পরে, চেক চেক শার্ট। ঢাকার ছেলেরা সব এক কালার শার্ট। নীল, বেগুনী, অ্যাশ, নো চেক, নো প্রিন্ট। সবাই সানগ্লাস পড়ে। দেখতে কত স্মার্ট লাগে। এইসব গ্রাম্য পোলাপান দিয়া হবে না। ঢাকার ছেলেরাই ভালো।

নোভা একটু একটু করে হাসল আর মাথা নাড়ল। আমি তাকায়ে থাকলাম। এমনেই আমার কথা বলা নিষেধ।

নারগিস বলেই গেল, ছেলের গায়ে পড়বি ভালো কথা। বুঝে শুনে পড়বি। এখন তুই অসুস্থ। তোর মন নরম। তুই এখন যাই করবি ভুল, ভুল, মহাভুল।

আমি মিনমিন করে বললাম, আমি আবার কি করলাম। সবকিছু নিয়ে বাড়াবাড়ি ভাল না।

নারগিস বলল, তুই তো ফার্স্ট হইছিস। বৃত্তিও পাবি এবার,তাই না! তুই কিন্তু ঘুমায়া ঘুমায়া সুন্দর হয়ে গেছোস, ওই ছেলে পছন্দ করলেও করতে পারে তোরে। ছেলে নাকি খুব ফর্সা? তোর যে রং তাতে ফর্সা ছেলে কেমনে তোরে পছন্দ করবে বল। তার চেয়ে ডাক ওরে। আমাদের সাথে পরিচয় করায়ে দে।

আমি বললাম, না। সম্ভব না। ফুপু শুনলে সর্বনাশ হবে। তোদের পরিচিত হবার দরকার নাই। রেজাল্ট দিছে সেটা আগে না বলে যত্তসব ফালতু কথা।

মাঝখানে অঞ্জনা বলে উঠল, উনার তো এখন উঠা নিষেধ। আরো তিনদিন পর উঠতে দিবে। তখন কুয়ার ওইখানে গেলে এমনেই দেখা হবে।

নারগিস দাঁড়াল। বলল, তাহলে তিনদিন পরে তোকে আবার দেখতে আসব। ওহ তোর জন্য একটা ব্যাগ নিয়ে আসছি ঢাকা থেকে। আর এই যে একটা স্কেল। এখন তো তুই সায়েন্সে পড়বি তোর কাজে লাগবে।

আমি বললাম, আ্মি সায়েন্সে পড়ব মানে, তুই পড়বিনা?

নারগিস বলল, অসম্ভব। আমি কমার্স নিব। আর আমাকে সায়েন্স দিবে না তো, রেজাল্ট ভালো না।

নোভা বলল, কোন দরকার নাই সায়েন্সে পড়ার। আমাকে দেখ। জীবনটা নষ্ট। খামাখা পড়া। গেলাম আজকে। ভালো হয়ে ওঠ। সেবিকা লাগলে বইল। বলে মুখ টিপে হাসতে গিয়েও হাসল না।

আমি পাশ ফিরে দেয়ালের দিকে মুখ ফিরায়ে শুইলাম। সন্ধ্যাবেলা ফুপু বাসায় ঢোকামাত্র উনাকে বললাম, অঞ্জনা সারা দুপুর টেলিভিশন ছেড়ে রাখছিল। সন্ধ্যা পর্যন্ত। আপনি আসার টাইমে বন্ধ করল। এমনকি আজান দেওয়ার সময়ও টিভি বন্ধ করে না!

বলে আমি আবার দেয়ালের দিকে মুখ ফিরায়ে ঘুমায়ে গেলাম। একটা উচিত শিক্ষা হোক মেয়েটার।

(কিস্তি ৯)

More from পারমিতা হিম

নারগিস (১০)

একদিন সাজ্জাদ নিজেই ওর বান্ধবীর কথা বলতে শুরু করল।
Read More